সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_৪
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
আকসার বাসায় আজ কলি এসেছে। হঠাৎ কলিকে নিজ বাড়িতে বলা নেই কওয়া নেই উপস্থিত হতে দেখে আকসা অবাক হলো বেশ। ওকে সোফায় টেনে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “তুই হঠাৎ?”
“কেন আসতে পারি না?”
“অবশ্যই আসতে পারিস। কিন্তু না বলে-কয়ে তো কখনো আসিস না। তাছাড়াও, তোকে তো দূরবীক্ষণ দিয়েও সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না৷ তাই এমন আচনক দেখে অবাক হলাম।”
কলি বললো, “আসলে আমাকে আন্টি ডেকেছে।”
“আন্টি ডেকেছে মানে? আম্মু কেন তোকে ডাকবে?”
“আন্টি কল দিয়েছিল আমাকে। বললো, কি একটা জরুরি কাজ আছে, আমাকে আসতে হবে। তাই সকাল সকাল চলে এলাম।”
“কারণটা কি—”
আকসা পুরো কথা শেষ করার আগেই আয়েশা বেগম ড্রয়িংরুমে এসে কলিকে দেখে বললেন, “ওহ তুই চলে এসেছিস মা৷ বোস। আমি চা-নাস্তা নিয়ে আসি।”
আয়েশা বেগম রান্নাঘরে চলে গেলেন। আকসা কলির কাছ ঘেঁষে ফিসফিসিয়ে বললো, “কেন ডেকেছে আম্মু তোকে?”
“কারণটা তো জানি না। আন্টি বললো, আসার পরে জানাবে।”
“তোকে তো আম্মু কখনো এভাবে কল দিয়ে ডাকে না। তাই ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত ঠেকছে।”
আকসা চিন্তায় পরলো৷ কি এমন কাজ, যার জন্য এমন জরুরি তলব?
এরইমধ্যে আয়েশা বেগম ড্রয়িংরুমে আসলেন চা-নাস্তা নিয়ে। টি-টেবিলের ওপরে ট্রে রেখে সামনের সোফায় বসলেন। কলিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর বল মা, দিনকাল কেমন চলছে?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আন্টি। তোমরা সবাই কেমন আছো?”
“এইতো আছি ভালো। তোর বাসার সবাই কেমন আছে?”
“সবাই ভালো আছে।”
আয়েশা বেগম চায়ের কাপে চিনি মিশিয়ে চামচ নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “তোর সাথে কিছু কথা ছিল মা।”
“জি আন্টি বলো, কি কথা?”
“আমাদের বাসায় আজ মেহমান আসবে বুঝলি। আমার আকসাকে দেখতে আসবে। এখন কথা হচ্ছে, আকসার তো আর কোনো বোনও নেই যে, ওর পাশে থাকবে এই সময়ে বা ওকে সাহায্য করবে। ওর কাছের মানুষ বলতে তুই আছিস। ওর সাথে থাকিস সবসময়, ওকে বুঝিস ভালোভাবে। তুই একটু আজকের দিনটা আমাদের এখানে থেকে যা মা। বিকালে বাসায় চলে যাস। আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা বিকালের আগে আসবেন ক’জন। কিন্তু এখানে তো বলতে গেলে আমি একা মানুষ। ইফানের আব্বুও নেই দেশে। একা হাতে সবকিছু সামলানো একটু কষ্টকর হয়ে যাবে। তুই আকসার সাথে থাকলে তবুও সাহায্য হতো কিছু।”
মিহি এবার নড়েচড়ে বসে বললো, “ও এই কথা আন্টি! কোনো সমস্যা নেই৷ আমি তো ভাবতেই পারিনি, আকসাকে দেখতে আসবে আজ! আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আকসার সাথে থেকে ওকে তৈরি করিয়ে দেবো। সবকিছু ঠিকঠাক মতো হবে। নিশ্চিন্ত থাকুন।”
আয়েশা বেগম একটু চিন্তামুক্ত হলেন। গতকাল থেকেই এ নিয়ে চিন্তায় চিন্তায় তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তার আত্মীয়েরাও বেশিরভাগ সবাই দূরে। তেমন কেউ কাছাকাছি নেই যে, জরুরি তলবে এসে তাকে সাহায্য করতে পারবে। আয়েশা বেগম সকালেই ইফানকে বাজারে পাঠিয়েছেন। ইফান আসলে তিনি রান্নার কাজ শুরু করে দেবেন।
আয়েশা বেগম কলিকে বললেন, “তাহলে তুই ওকে নিয়ে ঘরে যা মা। দুপুরের পর রেডি করিয়ে দিস।”
.
.
আকসা পুরো ঘরময় পায়চারি করছে আর দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। কলি বিছানার ওপরে বসে একটার পর একটা বিস্কুট খাচ্ছিল। আকসাকে চিন্তিত দেখে প্রশ্ন করলো, “তোর কী হইসে দোস্ত? এমন দার্শনিক হয়ে গিয়েছিস কেন?”
কলির প্রশ্ন শুনে আকসা চট করে এসে বিছানার ওপরে বসে বললো, “ভাবছি।”
“কী ভাবছিস?”
“আমাকে হঠাৎ দেখতে আসবে কেন?”
“দেখতে কেন আসে তুই জানিস না?”
“জানবো না কেন? অবশ্যই জানি৷ তবে কথা হচ্ছে, এমন হুট করে হচ্ছে কেন সবকিছু? আম্মু তো আমাকে আগে কিছু বলেনি। তার হাবভাব দেখেও কোনোকিছু আন্দাজ করতে পারিনি। একদম স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কারা দেখতে আসছে, ছেলে কে— এসব কিছুই তো জানি না।”
কলি বললো, “তুই বরং এক কাজ কর, আন্টিকে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর।”
আকসা কপট বিরোধ করে বলে, “ধুর কি যে বলিস না! আম্মুকে কি এসব কিছু জিজ্ঞাসা করা যায়? কি না কি ভেবে বসবে!”
“তাহলে আর কি করবি, ওয়েট কর। বিকালে তো পাত্রপক্ষ আসছেই। তখন নাহয় দেখে নিস।”
পাত্রপক্ষের কথা শুনে আকসার স্বাভাবিক মুখ কিঞ্চিৎ বিবর্ণ হয়ে উঠলো। ও বিরবির করে কি যেন বললো৷ কিন্তু সেসব কথা কলির কান অবধি পৌঁছালো না।
.
.
দুপুরের খাবার খেয়ে আধ ঘন্টাখানেকের মতো বিশ্রাম নিয়েই কলি তাড়াহুড়ো করে আকসাকে তৈরি করতে শুরু করেছে। এমনিতে আকসা নিজেই খুব ভালো শাড়ি পরতে পারে। তবে আজ কলি ওকে শাড়ি পরতে সাহায্য করলো। তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে খুব। মেহমান নাকি আর আধঘন্টার মধ্যেই চলে আসবে। আকসা দাঁড়িয়ে ছিল। কলি ওর শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিচ্ছিল বসে। তখনই ইফান বাইরে থেকে দরজায় নক করলো। ভাইকে দেখে আকসা ভেতরে আসতে বললো। ইফান ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলো, ওর হাতে একটা বেলি ফুলের খোঁপার গাজরা। সাধারণত, ইফান প্রায়ই তার ছোটবোনকে ফুল কিনে দেয়৷ মানুষ প্রেমিকের কাছ থেকে ফুল পাওয়ার জন্য ছটফট করে; এদিকে আকসা তার ভাইয়ের নিকট হতে ফুল পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। অন্যদিন ফুল দেখলে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হতো ও। চট করে ভাইকে জড়িয়ে ধরে “আই লাভ ইউ ভাইয়া” বলে দিতো। তবে আজ সেসব কিছুই ঘটলো না। আকসার মুখের বলিরেখার নূন্যতম কোনো পরিবর্তন ঘটলো না৷ বরং, মুখ আগের মতোই নীল বিবর্ণ হয়ে রইলো। ইফান ড্রেসিং টেবিলের ওপরে ফুলের গাজরা রেখে কলিকে উদ্দেশ্য করে বললো, “বোনুকে ফুলের গাজরা পরিয়ে দিও তো কলি৷ আর মুখে বেশি প্রসাধনী ব্যবহার কোরো না। আমার বোনকে ন্যাচারালি-ই ভালো লাগে।”
ইফান কলিকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে দিয়ে ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আকসা পেছন থেকে ডাক দিলো ভাইকে। ইফান পেছনে ফিরে তাকাতেই আকসা ওকে জিজ্ঞাসা করলো, “হঠাৎ আমাকে দেখতে আসছে কেন?”
ইফান একটু ইতস্তত করে বললো, “আসলে তাদের একটু তাড়া আছে আকসা৷ এজন্যই সবকিছু তাড়াহুড়ো করে হচ্ছে। নাহলে আমরা সময় নিতাম।”
“কারা দেখতে আসছে?”
“সে তো আসলেই দেখতে পাবি।”
ইফানের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। বোঝা গেল, ও এখনই কিছু বলতে চাইছে না। তবে এই বিষয়টা নিয়ে ভীষণ খুশি। তখনই ইফানের ফোন বেজে উঠলো। ও ফোন বের করে হাতে নিয়ে স্ক্রিনে দেখে বললো, “এইতো আব্বু কল দিয়েছে। নে, তুই আগে কথা বল।”
আকসার হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল ইফান। আকসা ফোন কানে নিয়ে বললো, “আসসালামু আলাইকুম আব্বু, কেমন আছো?’
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি আম্মু। তুমি কেমন আছো?”
“এইতো ভালো আছি। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করেছো তো ঠিকমতো?”
“হ্যাঁ আম্মু। মাত্র খেয়ে উঠলাম। তুমি কি এখন তৈরি হচ্ছো?”
“জি আব্বু।”
“মেহমান এখনো আসেনি?”
“এইতো চলে আসবে এখুনি।”
আকসা ভালো করেই বুঝলো, ওর অজান্তেই সবকিছু হয়েছে এবং এর সাথে প্রত্যেকে সংযুক্ত। সবাই সবকিছু জানে। ইসহাক খন্দকার ফোনের ওপাশ থেকে বললেন, “কিছু কথা বলি আম্মু, শোনো।”
“জি আব্বু, বলো।”
“বিয়ের এসব কার্যকলাপ যে আমরা খুব তাড়াহুড়ো করে করতে চেয়েছি, তা ঠিক নয়। আসলে ছেলের জন্যই তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে। ছেলের বাবা জানিয়েছেন, ছেলের হাতে সময় খুব কম। এজন্য বিয়েটা তাড়াতাড়ি সারতে হবে। তাছাড়াও ছেলে ভালো বলে আমরা এই সম্বন্ধটা হাতছাড়া করছি না। তোমার আম্মার কাছে শুনেছি সব। এই পর্যন্ত অনেক পাত্র তো দেখলাম তোমার জন্য। কিন্তু কোনোটাই আমার মনে ধরেনি। এবার যেই ছেলের সাথে তোমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তাকে আমার খুব পছন্দ। প্রথমে শুনেই রাজি হয়ে গেছি। তাহলে বুঝতেই পারছো, সম্বন্ধটা আমার ঠিক কতোটা পছন্দের। আশা করি তুমি তোমার আব্বুর পছন্দের ওপর বিশ্বাস রাখবে। তবে, তোমাকে আমরা কোনোকিছুতেই জোর করছি না। বিয়ের বয়স হয়েছে, তাই বিয়ের কথাবার্তা বলছি। যদি তুমি চাও, তাহলে নিষেধ করে দেবো৷ আর যদি তোমার নিজের কোনো পছন্দ থাকে, তাহলে বলতে পারো। আমি তোমার আব্বু, অবশ্যই গুরুত্ব দেবো। তোমার ইচ্ছার ওপরে কোনোকিছু যাবে না।”
আকসা ওর আব্বুকে ভরসা দিয়ে বললো, “আমার কোনো পছন্দ নেই আব্বু। তোমার ওপর বিশ্বাস আছে আমার। তুমি কখনোই আমার জন্য খারাপ ছেলে পছন্দ করবে না।”
“ঠিক আছে মা। ওরা আসুক। তুমি ওদেরকে দেখো, কথাবার্তা বলো; তারপর রাতে কল দিয়ে আমাকে তোমার সিদ্ধান্ত জানিয়ো। এখন রাখছি আম্মু। তুমি তৈরি হয়ে নাও।”
ইসহাক খন্দকার কল কেটে দিলেন। আকসা লম্বা করে শ্বাস টেনে নিলো। অস্বস্তি হচ্ছে ওর। এর আগে বিয়ের কথাবার্তা হলেও এমন আয়োজন করে ওকে দেখেনি কোনোদিন। আজ-ই প্রথম। এজন্যই নার্ভাস লাগছে প্রচন্ড। এই হালকা শীতের মধ্যেও ও প্রচন্ড পরিমাণে ঘামতে শুরু করলো।
ততক্ষণে শাড়ি পরানো হয়ে গেছে। কলি উঠে আকসার চুল সুন্দর করে পেছনে ক্লিপ দিয়ে টেনে পিঠের ওপরে ছড়িয়ে দিলো। আকসা ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে চায়নি। তবুও কলি জোর করে হালকা শেডের একটা লিপস্টিক দিয়ে তারওপর লিপগ্লোস দিয়ে দিলো। তখনই দরজার বাইরে থেকে আকসার খালা রেশমি খাতুন ডাক দিলেন, “ও আকসা, চলে আয় মা। ওরা চলে এসেছে।”
বাইরে মোটামুটি লোক সমাগম বোঝা গেল। ইতিমধ্যেই আকসার চাচা-চাচি, ফুপু আর মামা-খালারা চলে এসেছেন। কলি আকসাকে নিয়ে বাইরে গেল। কয়েক কদম এগিয়ে ডাইনিং-এর পাশ কাটিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো ওরা৷ আকসা এতোক্ষণ মুখ নুইয়ে রেখেছিল। ধীরে ধীরে ও অস্বস্তি জড়িত মুখটা তুলে সামনের সোফার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো। মেজবাহ’র পরিবারের সকলে বসে আছে সোফায়। মেজবাহ তার বাবার পাশে বসা। ওর দৃষ্টি হাতে থাকা ফোনের দিকে৷ কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। মুখের প্রতিক্রিয়া কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। একদম স্বাভাবিক। তবে আকসা শকড হয়েছে এখানে মেজবাহকে দেখে। একদমই আশা করেনি লোকটাকে। ও বিরবির করে বললো, “মেজবাহ ইফতেখার এখানে!”
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১০
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৭
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১১
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৫
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৯
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৬