Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫


শেষপাতায়সূচনা [০৫]

সাদিয়াসুলতানামনি

[গল্পের শেষের কথাগুলো পড়ার অনুরোধ রইলো🙏]

মেয়ে বা নারী শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই অপরিহার্য অংশ। যুগ যুগ ধরে তারা যেমন শক্তির উৎস, প্রেরণার কারণ হয়েছে। তেমনিভাবে তাদের বয়ে বেড়াতে হয়েছে অবহেলা, লাঞ্ছনা ও সহিংসতার ভার। যে নারীজাতি প্রতিনিয়ত নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে যাওয়ার আলো দেখিয়েছে, জ্ঞান ও মানবতার পথ শিখিয়েছে, বিচিত্র পরিহাসের দরুণ সেই নারীর জন্যই রাতের অন্ধকার এখনো হয়ে ওঠে ভয়, আশঙ্কা আর অনিরাপত্তার আরেক নাম।

আলো ছড়িয়ে দেওয়া হাতগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি ছায়ার ভেতর সুরক্ষার খোঁজে থাকে, এ যেন সময়ের নির্মম সত্য।

জাওয়াদ, তার বাবা নিয়াজ শেখ, জাওয়াদের কয়েকজন বন্ধু পাগলের মতো ঢাকার রাস্তায় ছুটছে। কেনো? কারণ তাদের বাড়ির সম্মান, তাদের মেয়েদের যে পাওয়া যাচ্ছে না আজ সারাদিন। সকলের মনেই আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জাওয়াদের নাইনে পড়ুয়া বোন জিনিয়া ও তার বাগদত্তা আঞ্জুমানকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত জিনিয়াকে কোচিং থেকে আনতে যায় আঞ্জুমান, তারপর থেকেই তারা দু’জনই নিখোঁজ। বর্তমানে রাত বারোটা বাজছে, তাও তাদের কোথাও খুজে পাওয়া যায়নি।

বাড়ির দুই মেয়ের নিখোঁজ হওয়ায় জাওয়াদের মা শারমিন বেগম অসুস্থ হয়ে পরেছেন। তাকে প্রতিবেশী মহিলাদের কাছে রেখে এসে জাওয়াদরা জিনিয়া ও আঞ্জুমানকে খুঁজছে।

রাত পেরিয়ে নতুন দিনের সূচনা হয়। ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ির পুরুষেরা বাসায় ফিরে, কিন্তু খালি হাতে। কোথাও তাদের ঘরের মেয়েদের পাওয়া যায়নি। এই পর্যায়ে এসে জাওয়াদের বাবা মি.শেখও ভেঙে পরেন। জাওয়াদের বাবা হাইস্কুলের প্রধাণ শিক্ষক ছিলেন। জীবনে সে যেমন উজার করে শিক্ষা বিলিয়ে দিয়েছেন, তেমনি তার শিক্ষা তার জন্য সম্মান, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা বয়ে এনেছে।

আর্থিকভাবে তাদের অবস্থান বেশি উঁচুতে না থাকলেও, সম্মানের দিক দিয়ে জাওয়াদদের পরিবারকে এলাকার সকালে বেশ মান্য করে। তাই তো দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই শেখ সাহেবের মেয়ে ও হবু পুত্রবধূর নিখোঁজের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পরেছে। অনেকে এসে তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন তো অনেকেই নানান রকমের কুমন্তব্য করছে। কেউ কেউ বলছে, মেয়েরা বোধহয় পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পরেছে। আবার কেউ কেউ বলছে, বিষয় অন্যকিছু হয়ত। মূলত এসব মন্তব্যের কারণেই তারা মানসিকভাবে ভেঙে পরছে। এই সংবাদ পেয়ে গ্রাম থেকে শেখ সাহেবের ভাইয়েরাও রওনা হয়েছে।

সকলে ভেঙে পরলে, ভেঙে পরে না একমাত্র জাওয়াদ। কিছুক্ষণ মায়ের পাশে বসে থেকে তাঁকে তাকে সান্ত্বনা দেয় সে, তারপর শাওয়ার নিতে চলে যায়। সারা রাত না ঘুমানোর কারণে তার মাথা ব্যথা করছে। শাওয়ার নেওয়া শেষ করে সে মাত্রই বের হয়েছিল, তখন তার ফোন বেজে ওঠে।

ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে একটা এমএমএস। জাওয়াদ সেটা অন করলে যা দেখে, তাতে তার চক্ষু কপালে উঠে যায়। জিনিয়া ও আঞ্জুমানকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। দু’জনের মুখই বিধ্বস্ত ও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

এমএমএসটার সাথে আরেকটা মেসেজও আসে, তাতে লেখা ছিলো, ” বোন আর হবু বউকে এমন অবস্থায় দেখে কেমন লাগছে, মি.জাওয়াদ শেখ? ফিলিং ঠু গুড বেইব?”

জাওয়াদ এমএমএস ও মেসেজটা দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। একে তো তার বোন ও হবু বউকে কাল থেকে অপহরণ করে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তার মধ্যে তাকে জিজ্ঞেস করছে, তার কেমন লাগছে এই ধরণের পরিস্থিতিতে। আবার “বেইব” বলেও সম্বোধন করল। কে এই অপহরণকারী? কি উদ্দেশ্য তার? কেন সে তার বোন ও হবু বউকে কিডন্যাপ করে রেখেছে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার কৌতূহল নিজের মধ্যে চেপে না রাখতে পেরে জাওয়াদ ফটাফট সেই নাম্বারে কল করে। কিন্তু ফোন রিসিভ করে না কেউ, বরংচ আরো একটি মেসেজ সাথে সাথে সাথেই। মেসেজটা ছিল এমন, “আমি কে? কেনই বা আপনার বোন ও পিরিও (ব্যঙ্গ করে) হবু বউকে কিডন্যাপ করে রেখেছি? কি-ই বা আমার উদ্দেশ্য জানার বড্ড তাড়া বুঝি শেখ সাহেবের?”

মেসেজটি পড়ে জাওয়াদ আরো একবার থতমত খেয়ে যায়। লোকটি জানল কিভাবে জাওয়াদ এসব প্রশ্ন করতেই তাকে ফোন দিয়েছিল? সে কিছু রিপ্লাই করতে যাবে, তার আগেই আবারও সেই নাম্বার থেকে মেসেজ আসে, “একটু তড়পান আপন মানুষদের কষ্ট দেখে, আমিও একটু মজা নেই আপনার তড়পানো দেখে। সত্যি বলতে বড্ড বেশি মজা পাচ্ছি আপনার এই দুঃশ্চিন্তা, হাহাকার, ছটফটানি দেখে। অন্যকে কষ্ট দিলে নিজেকেও যে কষ্ট পেতে হবে এটা কেন ভুলে যান, শেখ সাহেব?

চিন্তা করবেন না, আপনার বাড়ির সম্মান মানে আমারও সম্মান। সযত্নে রেখেছি। এখন আমার ভালো মানুষীর ফায়দা নিয়ে যদি, পুলিশকে এই নাম্বারটা দিয়ে দেন তাহলে বিশ্বাস করুন, পুলিশ আমার কিচ্ছুটি করতে পারবে না।

কিন্তু, হ্যাঁ একটা কিন্তু আছে এরপর। সেটি হলো, এরপরের এমএমএস আসবে আপনার বোন ও হবু বউকে পাচার কারীদের হাতে তুলে দেওয়ার। পুলিশ আমার কাছে পৌছানোর আগেই, এই বিউটিফুলদের পৃথিবীর এমন প্রান্তে পাঠিয়ে দিবে যে ইহজনমে তাদের মুখ দেখার দ্বিতীয় বার সুযোগ পাবেন না।

আমার কথাগুলোকে হালকাভাবে নিয়ে নিজের জীবনের দ্বিতীয় ভুলটি করবেন না। পরে আমায় দোষ দিতে পারবেন না কিন্তু বলে দিলাম। “

পুরো মেসেজ পড়ে জাওয়াদের মনে ভয় ডুকে যায়। সে যদিও ভেবেছিল, পুলিশদের এই বিষয়ে ইনফর্ম করবে কিন্তু মেসেজটা পড়ে তার বিচক্ষণতা তাকে জানান দিচ্ছে, কিডন্যাপকারী তার ধারণার চাইতেও শক্তিশালী। সেই সাথে এই কিডন্যাপকারীর শত্রুতা যে ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে সেটাও সে বেশ ভালোই বুঝতে পারছে। কিন্তু তার তো মনে পরছে না, সে সজ্ঞানে কারো ক্ষতি করেছে। তাহলে কে এই ব্যক্তি?


সময় এখন সাঁঝবেলা। আকাশের গায়ে নরম কমলা আর বেগুনির মিশেলে আঁকা এক নিঃশব্দ কবিতা। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যটাও যেন ক্লান্ত ভ্রমণকারী, সারা দিন আলো বিলিয়ে এবার ধীরে ধীরে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতিতে। আলোটা ফিকে হয়ে আসছে, কিন্তু সেই ফিকে রঙের মধ্যেও আছে এক অদ্ভুত শান্তি।

চারদিকে হালকা শীতল হাওয়া বইছে, আর সারাদিন খাবারের খোঁজে ছুটে চলা পাখিগুলো একে একে ফিরে যাচ্ছে নিজেদের নীড়ে। তাদের ডানার শব্দে, মাঝে মাঝে ভেসে আসা ডাকের সুরে, সন্ধ্যার নরম নিস্তব্ধতাটাও যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এমনই এক শান্ত, কোমল সময়েও কয়েকজন মানুষের বুকের ভেতরে কালবৈশাখী ঝড়ের ন্যায় তান্ডব চালাচ্ছে ভয়েরা। তারা সকলেই নিজেদের প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পেতে উদগ্রীব হয়ে বসে আছে। জাওয়াদের মা মিসেস শেখ একটু পরপর গুনগুনিয়ে কেঁদে উঠছে মেয়েদের কথা মনে করে।

অপহৃত দুইজন রমণীই তার হৃদয়ের খুব কাছের কেউ। একজন রমণী তার নারী ছেড়া ধন, আরেকজন তারই মৃত ভাইয়ের শেষ চিহ্ন। সে যে তার ভাইকে কথা দিয়েছে, তিনি যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন তার ভাইয়ের এই শেষ চিহ্নটির উপর একবিন্দু পরিমাণ আচ আসতে দিবে না। কিন্তু আজ সে যে ব্যর্থ হলো তার ভাইকে দেওয়া শেষ কথাটি রাখতে। এসব ভেবেই সে কেঁদে কেঁদে উঠছে।

মিসেস শেখ যখন বেলকনিতে বসে তাদের বিল্ডিংয়ের মেইন গেইটের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে ছেলের ফিরে আসার, ঠিক তখনই তার পাশে এসে কেউ একজন বসে পরে। নিজের পাশে আরেকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে মিসেস শেখ ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যক্তিটির পানে চায়। দেখতে পান তারই অর্ধাঙ্গ এসে বসেছে তার পাশে।

স্বামীকে পাশে বসতে দেখে মিসেস শেখ যেন বাচ্চা হয়ে যান। ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। মি.শেখ প্রিয়তমা স্ত্রীকে আগলে নেন নিজের বক্ষে। সময় নিয়ে শান্ত করেন প্রিয় নারী টিকে। তাদের বয়স হয়ে গেলে কি হবে, ভালোবাসাটা এখনও সেই আগের মতোই আছে। গুরুগম্ভীর মিসেস শেখের মায়াবী মুখখানা দেখে বাসররাতেই তার প্রেমে পরেছিলেন নিয়াজ শেখ। জীবনের প্রথম নারী বলে সবসময় একটু বেশিই ভালবাসা দিয়েছেন সে এই নারী টিকে। এর বিনিময় দিতে মিসেস শেখও কার্পন্য করেন নি।

একটু সুখী,সুন্দর পরিবার তাকে উপহার দিয়েছেন। দিয়েছেন দুটো সন্তানের বাবা হওয়ার অধিকার। মাগরিবের আজান শেষ হতেই নিয়াজ শেখ শারমিন বেগমকে ধরে বসা থেকে উঠান। তারপর নিজেই তাকে ওয়াশরুমে যেতে সাহায্য করতেন। অজু করে এসে দু’জনই আগ পিছ করপ নামাজে দাঁড়ান। দুই হাত তুলে সর্বশ্রেষ্ঠ রবের দরবারে নিজেদের সন্তানদের সুরক্ষার জন্য দোয়া করতে থাকেন।


মোটামুটি টাইপের একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে বাইক থামায় জাওয়াদ। বাড়ির নেইম-প্লেটের দিকে তাকিয়ে তার ফোনে আসা ঠিকানার সাথে উক্ত বাড়ির ঠিকানা মেলায়। হ্যাঁ, ঠিক জায়গায়তেই এসেছে।

জাওয়াদ বাইক ছেড়ে গেইটের সামনে আসতেই দরজা খুলে দেয় দারোয়ান, যেনো তার আসার অপেক্ষাতেই ছিল। জাওয়াদ বড় বড় কদম ফেলে ভেতরে ঢুকে যায়। সদর দরজা খোলা থাকায় সে আবারও সম্পূর্ণ বিনা বাঁধাতেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। ভেতরে ঢুকে সে কিছুটা অবাকই হয়ে যায়। কারণ দরজার ঠিক সামনেই একটা রাস্তা। যেমন-তেমন রাস্তা না, ফুলের পাপড়ির তৈরির রাস্তা। ফুলের তৈরি সেই রাস্তাটি সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গিয়েছে।

জাওয়াদ সময় ব্যয় ব্যতীত সেই রাস্তা ধরে উপরে উঠতে থাকে। দোতলায় আসতেই জাওয়াদ দেখে সেখানেও একই ভাবে ফুলের রাস্তা রয়েছে। জাওয়াদ সেটা অনুসরণ করতে করতে একটা রুমের সামনে এসে থামে। রুমের দরজাটি লাগানো, আর দরজায় বড় বড় করে লেখা “Push”।

জাওয়াদ ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলতেই অসংখ্য ফুলের পাপড়ি এসে তার উপর পরতে থাকে। জাওয়াদ এহেন কান্ডে কিছুটা ভরকে যায়। ফুলের পাপড়ি পরা বন্ধ হলে, জাওয়াদ সামনে তাকালে দেখতে পায় একজন ব্যক্তিটিকে। তাকে দেখে জাওয়াদের মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই বের হয়ে আসে–

—আপনি এসব করেছেন?

📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুমহলের কাছে গল্পটি পৌঁছে দিন।

~চলবে?

[

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply