শেষপাতায়সূচনা [১৭]
সাদিয়াসুলতানামনি
জাওয়াদের মন হুট করেই তাকে বলে ওঠে–
—এই মেয়েটা ভালোবাসার কাঙ্গালি। তোর উচিত নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ওকে ভালোবাসা। কম তো চেষ্টা করছে না তোর ভালোবাসা অর্জনের জন্য।
তাদের দু’জনের ঘোর কাটে মি.শেখের গলার আওয়াজে।তিনি ছেলেকে জুম্মার নামাজে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছেন। জাওয়াদ হালকা মুচকি হেঁসে পূর্ণতার বাম পাশের গাল টিপে দিয়ে বলে–
—ফ্ল্যার্ট করছো মেয়ে?
—করলেই বা কি? আপনি তো আমারই, একান্ত ব্যক্তিগত আমার প্রিয় পুরুষ।
জাওয়াদ তার সামনে থেকে উঠতে উঠতে কথাটা শুনতে পায়। পূর্বের হাসিটা আরেকটা চওড়া হয় তার। জাওয়াদ রেডি হয়ে জায়নামাজ নিয়ে বের হতে নেয়, আবারও ফিরে এসে বলে–
—শুনো, এই হাত দিয়ে বেশি কাজ করতে যেও না। আমি এসে হেল্প করবো নে।
পূর্ণতা নিজেও বসা থেকে উঠে দাড়িয়েছে, তারপর জাওয়াদের সামনে এসে মিছে মিছে তার পাঞ্জাবি ঠিক করে দিয়ে নিজের দুইহাত তার বুকে রেখে বলে–
—আপনি যত্ন নিলেন না, এর উপহার স্বরূপ মজার খাবার রেঁধে হাজির করছি। আর এমন ছোটখাটো হাত পুড়েই রাঁধতে গেলে, তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবো? আম্মারও তো কতবার হাত পুড়েছে, বড় মা (পূর্ণতার চাচী) কেও দেখেছি হাত পুড়া নিয়ে কাজ করেছে। তারা করতে পারলে আমি কেন পারবো না? হাত পুড়িয়ে রেঁধে-বেড়ে খাওয়াতে পারলেই আপনার পেটের থেকে মনে জায়গায় করে নিতে পারব জনাব।
—যত্তসব বাজে কথা তোমার। তোমার সাথে কথা বলা আর দেওয়ালের সাথে মাথা ঠোকা একই কথা।
তার কথা শুনে পূর্ণতার হাসিটা আরেকটু চওড়া হয়। সে জাওয়াদের আরো কাছে এসে নিজের দুই পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে জাওয়াদের মুখোমুখি হয়। তারপর দুই হাত দিয়ে জাওয়াদের কাঁধ পেঁচিয়ে ধরে চোখে-মুখে দুষ্টুমি ফুটিয়ে তুলে জাওয়াদের ঠোঁটের দিকে নিজের ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলে–
—কথা বলতে কে বলেছে আপনাকে? এর বদলে আদরও দিতে পারেন। আমি অবশ্য মাইন্ড করবো না আপনি আদর দিলে, বরংচ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপনার সাথে কো-অপারেট করবো।
জাওয়াদ হকচকিয়ে যায় পূর্ণতার এমন বেসাইজ কথা শুনে। সেই সাথে বিস্ময়ে তার চোখজোড়া রসগোল্লার ন্যায় বড় বড় হয়ে যায়। মেয়ে হিসেবে সে আগ বাড়িয়ে আদর চাইছে কম বড় কথা না। জাওয়াদ হুড়মুড়িয়ে পূর্ণতাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে ছুট লাগায় নামাজের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে কয়েকবার বিরবিরিয়ে আওরায়–
—হে উপরওয়ালা একে একটু হায়া দান করো। কেমন বেহায়ার মতো আদর চাইছে!
পূর্ণতা তার এহেন কান্ডে হাহা করে হাসতে হাসতে বিছানায় বসে যায়।
নামাজ শেষ করে জাওয়াদ বাসায় এসে দেখে রান্নাবান্না সব শেষ। পুরো বাসা খাবারের সুবাসে ম-ম করছে। খাবারগুলোর ঘ্রাণই বলে দিচ্ছে সেগুলো কতটা মজাদার হয়েছে। মি. শেখ, জিনিয়া ও জাওয়াদ এসে বসে খাবারের টেবিলে। মিসেস শেখ মাথা ব্যথার অজুহাতে আসেনি খেতেন। পূর্ণতা তাদের তিনজনকে খেতে দিয়ে মিসেস শেখের নিকট যায়।
মিসেস শেখের বেডের পাশে বসে তার ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করতে থাকে সে। কিন্তু মিসেস শেখ মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। পূর্ণতা কোমল গলায় বলে–
—আম্মা, অল্প কিছু খেয়ে একটা মাথা ব্যথার ঔষধ খেয়ে তারপর শুয়ে থাকেন। এমন না খেয়ে শুয়ে থাকলে তো শরীর আরো খারাপ লাগবে।
মিসেস শেখ চোখের উপর হাত দিয়ে শুয়ে আছেন। তিনি সেই অবস্থাতেই বলেন–
—আমাকে নিয়ে তোমার এত না ভাবলেও চলবে। এখন আমার রুম থেকে বিদায় হও তো, তোমার প্যানপ্যানানিতে আরো মাথা ধরে গেলো।
মিসেস শেখ খুবই কর্কশ গলায় কথাগুলো বলেন। পূর্ণতার মনে মনে খারাপ লাগলেও সে বিষয়টাকে এতটা ধরে না। সে মনে করে, তার মা থাকলেও তো তাকে এমনভাবেই বকাঝকা করত। মিসেস শেখও তো তার মা’ই, তার স্বামীর মা তারও তো মা’ই হয়।
পূর্ণতা চুপচাপ তার পাশ থেকে উঠে গিয়ে একটা প্লেটে অল্প কিছু খাবার নিয়ে আবারও মিসেস শেখের রুমে এসে আগের জায়গাতেই বসে পড়েন। তারপর খাবারের প্লেট টা একপাশে রেখে মিসেস শেখের চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে বলে–
—এই শাশু মা! নাতি-নাতনিদের জোর করে খাওয়ানোর বয়সে আপনাকে আমায় জোর করে খাওয়াতে হচ্ছে। উঠুন না আম্মাজান, অল্প কিছু মুখে দিয়ে আমার এই রান্নাকে ধন্য করুন।
মিসেস শেখ পূর্ণতার এহেন কাজে প্রচন্ড রেগে যায়। সে শোয়া থেকে উঠে ঠাস করে পূর্ণতার গালে একটা থাপ্পড় মেরে দেয়। পূর্ণতা গালে হাত দিয়ে অবাক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মিসেস শেখের মাথায় ক্রোধে দপদপ করছে। সে খাবারের প্লেটটা ছুড়ে ফেলে দেন। সাথে সাথে প্লেটটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায়। প্লেট ভাঙার আওয়াজে মি.শেখ, জাওয়াদ, জিনিয়া সকলে দৌড়ে এই রুমে আসে।
তারা এসেমদেখতে পায় পূর্ণতা গালে হাত দিয়ে মিসেস শেখের দিকে তাকিয়ে আছে আর মিসেস শেখ ক্রোধে ফসফস শব্দ করছে। মিসেস শেখ তাদের কাউকে তোয়াক্কা না করে চেঁচিয়ে চেচিয়ে বলতে থাকেন–
—এই গায়ে পড়া অসভ্য মেয়ে! লজ্জা করে না এত দূরছাই করি তারপরও বেহায়ার মতো আশেপাশে ঘুরঘুর করো? মা তো নাহয় কিছু শেখাতে পারেনি, কিন্তু বাবাও কিছু নূন্যতম শিক্ষাটুকু দেয় নি?
এত গদগদ করতে হবে কেন শ্বাশুড়ির সাথে? বলেছি না আমার সময় হলে আমি খেয়ে নিবো, তাও এত ঢং করার কি আছে? আমার সংসার টা খেয়ে শান্তি হয়নি, এখন আবার আমাকে খাওয়ানোর জন্য উঠেপরে লেগেছো? নিশ্চয়ই খাবারের সাথে বিষটিষ মিশিয়ে এনেছো, কারণ আমিই তো বর্তমানে তোমার সুখের সংসারের পথে সবচাইতে বড় কাটা।
—আম্মাআআ….
পূর্ণতা জোরে ডেকে ওঠে মিসেস শেখকে। মি.শেখ তাড়াতাড়ি এসে নিজের মিসেসকে পেছনে সরিয়ে নেন। ধমক দিয়ে তাকে চুপ করতে বলেন। জাওয়াদ ও জিনিয়াও মায়ের এমন রূপ দেখে বাকরূদ্ধ হয়ে গিয়েছে। হ্যাঁ, তাদের মা কঠোর হৃদয়ের। কিন্তু মায়া-মমতাও তার কম নেই সন্তানদের জন্য। কিন্তু আজ তারা তাদের মায়ের ভিন্ন রূপের সাথে পরিচিত হলো।
পূর্ণতা মিসেস শেখের হাতের আঘাতে যতটা না কষ্ট ও ব্যথা পেয়েছে, তার থেকেও বেশি কষ্ট পেয়েছে তার মুখের কথায়। পূর্ণতা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে–
—সেই আট বছর বয়সে নিজের মা’কে নিজেরেই চোখের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখেছি। আট বছর পর্যন্ত ছিলো মায়ের আদর, ভালোবাসা, স্নেহ, শাসন পাওয়া আমার। আজ আমার বাইশ চলছে। মাঝের চৌদ্দটা বছর বাবাই আগলে রেখেছেন যক্ষের ধনের মতো। বড় মা শুধু দায়িত্বের বেলায় আছে, কিন্তু সে আমাকে কোনদিন একবেলাও নিজ হাতে খাইয়ে দেয়নি। খোঁজ খবর নিতো সময় মতো ঠিকই, কিন্তু ঐ যে শুধু দায়িত্বের খাতিরে। দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে।
মাকে বাবা অসম্ভব ভালোবাসতেন, আর নতুন মা ভালো হয় কিনা, আমাকে ভালোবাসে কিনা এসব সংশয়ে বাবা আর জীবনে কাউকে স্থান দেন নি। বাবা যতটুকু পেরেছে করেছে। বাবার দেওয়া শিক্ষা দিয়েই আমি আজ দেশের টপ বিজনেস ওমেনদের মাঝে একজন হয়েছি। কিন্তু আমার শখ ছিলো একটা সাজানো গুছানো সংসারের। বলতে পারেন আমার জীবনের একটাই ইচ্ছে এটা। আমি খুব কম বয়সে সংসার ভেঙে যেতে দেখেছি। তাই আমার এই অদ্ভুদ ইচ্ছে।
আমি বিজনেস ওমেনের চেয়ে গৃহিণী হতে বেশি পছন্দ করি। তাই তো সবসময় আপনার পেছন পেছন আঠার মতো লেগে থাকি। একটু আদর, স্নেহ, ভালোবাসা পাওয়ার লোভে। একজন পাক্কা গৃহিণী হতে কি কি জিনিস জানতে হয়, কীভাবে সব কিছু একা হাতে সামলাতে হয়, সর্বোপরি ইট-পাথরের তৈরি একটা দালানকে কিভাবে সংসারে রূপ দিতে হয় এসব জানার জন্য বেহায়ার মতো আপনার পেছন পেছন লেগে থাকি। আমি আপনার সংসার ভাঙতে নয়, আপনাদের এই সুখের সংসারের একটা অংশ হতে চাই। কিন্তু সবার সব ইচ্ছে কি পূরণ হয়? হয় না তো। আমারটাও বোধহয় সেসব মানুষদের তালিকাতেই থেকে যাবে।
কথাগুলো শেষ করে পূর্ণতা ছুটে সেই রুম থেকে বের হয়ে নিজেদের রুমে চলে যায়। যাওয়ার আগে সকলেই তার চোখে অশ্রুর আগমন লক্ষ্য করে। জাওয়াদ তার মায়ের দিকে কয়েক পলকের জন্য তাকিয়ে থেকে সেও পূর্ণতার পেছন পেছন ছুট লাগায়।
পূর্ণতা নিজেদের রুমে এসে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। জাওয়াদ কয়েকবার তাকে ডাকে কিন্তু পূর্ণতা দরজা খুলে না। বেশ কিছুক্ষণ পর পূর্ণতা বের হয় ভেজা হাত-মুখ নিয়ে। তার ফর্সা মুখখানা টকটকে লাল হয়ে আছে। যে কেউ দেখে বলে দিতে পারবে সে এতক্ষণ কেঁদেছে। পূর্ণতা ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই বেলকনিতে চলে যায়। সেখান থেকে টাওয়াল নিয়ে এসে মুখ মুছে বাহিরে যাওয়ার জন্য রেডি হতে থাকে।
জাওয়াদ তাকে রেডি হতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে–
—এই ভরদুপুরে না খেয়ে কোথায় যাচ্ছো?
পূর্ণতা থমথমে গলায় বলে–
—কাজ আছে একটা বাহিরে যাচ্ছি।
—কি কাজ? আর না খেয়ে যাচ্ছো কেনো? পোড়া হাত নিয়ে রাঁধলে এখন না খেয়েও চলে যাচ্ছো বাহিরে।
—এসে খাবো। কাজটা জরুরি।
পূর্ণতা মাথায় ওড়না চাপিয়ে পার্স নিয়ে বের হয়ে আসে। ফোনটা নিতে ভুলে যায়। তাদের রুম থেকে বের হতেই পাশের রুম থেকে মিসেস শেখের চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পায়। মি.শেখ আজকের বিষয়টা নিয়ে তাকে ঝাড়ছেন। অবাক করার বিষয় হলো, মিসেস শেখ এত বছরের সংসারে আজ প্রথম স্বামীর সাথে এমন উঁচু গলায় কথা বলছেন।
পূর্ণতা এই অশান্তি আর সহ্য করতে পারে না। আজ প্রথমবারের মতো নিজেকে মস্তবড় অপরাধী মনে হতে থাকে তার নিজেকে। সে ছুটে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। বাসার নিচেই একটা খালি রিকশা পেতেই সেটাতে চড়ে মিরপুর ৮ এ যেতে বলে। সেখানেই তাদের পারিবারিক কবরস্থান অবস্থিত। তার আজকের ঘটনার পর তার মায়ের কথা প্রচন্ড মনে পরছে। মায়ের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। অভিমান করে বলতে ইচ্ছে করছে–
—মা, তুমি এত তাড়াতাড়ি কেন আমায় একা করে চলে গেলে? কেন তোমার আদর, স্নেহ, ভালোবাসা, শাসনের স্থায়ীত্ব মাত্র আট বছর হলো? কেন আজ আমি তোমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে পারছি না? আমার কষ্টে বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে অথচ সামান্য কাঁদার জন্য আমি ভরসা যোগ্য একটা বুক বা কাঁধ পাচ্ছি না। কেন মা আমায় এত একা করে চলে গেলে? কেন শ্বাশুড়ি আম্মু আমাকে তোমার মতো আগলে নেয় না? শুধু মাত্র আমি তার পুত্রবধূ বলে? তার ছেলের সাথে নিজের ভাতিজির বিয়ে না হতে দিয়ে আমি তার পুত্রবধূ বলে তার আমার প্রতি এত ক্ষোভ। আমিও তো তার ভাতিজির মতো এতিম। তার ভাতিজি তো তাও কতগুলো বছর নিজের বাবা-মায়ের সানিধ্যে থাকতে পেরেছে, কিন্তু আমি তো জনমদুখিনী মা।
মা, ও মা! আমায় তোমার বুকে আগলে নাও মা। আমি তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তির ঘুম দিতে চাই। আম্মু জানো, জাওয়াদ সাহেবও না আমার উপর অনেক বিরক্ত। প্রতিরাতে জোর করে তার বুকে মাথা রাখি বলে তার সে কি রাগ আমার উপর! সেও আমায় ভালোবাসে না, তার মা-ও ভালোবাসে না। কেউ পূর্ণতাকে ভালোবাসে না। তার নিজের মাও না। এই পৃথিবীতে একমাত্র বাবা পূর্ণতাকে ভালোবাসে। তাই তো তার বুকে মাথা রেখে আমি এখনো ছোট পূর্ণতার মতো কাঁদতে পারি, আবদার করতে পারি। বাবা আমার উপর একটুও বিরক্ত হয় না, আর নাই বা রাগ করে বকা দেয়। আমি না খেয়ে থাকলে একমাত্র বাবা ব্যতীত আর কেউ আমার মুখের সামনে খাবার ধরে না। কেউ জোর করে, আহ্লাদ করে আমার মুখে খাবার তুলে দেয় না।
একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পূর্ণতা বুক ভাঙা কষ্টের স্বাক্ষী হয় জাওয়াদ। পূর্ণতা তার মায়ের কবরে বুকের কাছ টায় মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছে। আশেপাশে লোকসমাগম নেই বললেই চলে। আর মিসেস আহমেদের কবরটা একটু ভেতরের দিকে হওয়ায় একদম শুনশান জায়গাটা। এমন এক শুনশান জায়গায় পূর্ণতা কাঁদতে কাঁদতে বলা কথাগুলো সহজেই জাওয়াদের কর্ণগোচর হয়।
পূর্ণতা ক্রন্দন ও কথা উভয়ই জাওয়াদের বুকে জ্বলনের সৃষ্টি করে। মেয়েটা সবসময় এমন এক শক্ত ভাব ধরে থাকে যে, সেটা ভেদ করে তার অন্তরের খবর জানা অত্যন্ত দূরুহ ব্যাপার। অফিসে সে গম্ভীর মুখ বানিয়ে রেখে কাজ করে, আর বাসায় হাসি-খুশিতে মেতে থাকা এই রমণীর অন্তরেও যে এত এত কষ্ট রয়েছে জাওয়াদ তা কখনো কল্পনাও করেনি। সে তার মানসপটে পরপর কিছু ঘটনার সমীকরণ মেলায়। সমীকরণ গুলোর উত্তর হিসেবে এমন এক পূর্ণতাকে পায়, যে পূর্ণতা একদম নরম এঁটেল মাটির মতো। তাকে সামান্য ভালোবাসা, স্নেহ, আদর দিলেই তাকে যেমন ইচ্ছা তেমন রূপে গড়ে তোলা যাবে।
পূর্ণতা ও জাওয়াদ সেখানে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত থাকে। মাগরিবের সময় এসে পড়লে কবরস্থানের পাহারাদার পূর্ণতাকে বলে, এখন কবরস্থান বন্ধ করে সে নামাজ পড়তে যাবে। পূর্ণতা ধুলোবালি থেকে উঠে নিজের জামাকাপড় ঝেরে নেয়। পূর্ণতা কবরস্থান থেকে বের হওয়ার আগেই জাওয়াদ আবারও লুকিয়ে পড়ে।
পূর্ণতা সেখান থেকে বের হয়ে রিকশা বা কোন যানবাহনে না চড়েই এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে জাওয়াদও তার বাইক নিয়ে পূর্ণতার পেছন পেছন যেতে থাকে। অনেকখানি রাস্তা হেঁটে আসার পর ক্লান্তি ও ক্ষুধার তাড়নায় পূর্ণতার পা আর চলতে চায় না। তাই সে একটা রিকশায় চড়ে বসে বাসায় এসে পড়ে।
জাওয়াদ তাকে বাসায় যেতে দেখে সেও ভিন্ন পথ ধরে দ্রুত বাইক চালিয়ে পূর্ণতার আগে আগে বাসায় এসে পড়ে। পূর্ণতা বাসায় আসার পর দেখতে পায়, বাসার পরিবেশ আপাতত শীতল। সে দূর্বল পায়ে হেঁটে তার রুমে চলে যায়। হাত-পায়ে ও জামায় ময়লা থাকায় সে একেবারে শাওয়ার নিয়ে আসে। শাওয়ার শেষ করে এসে রুম থেকে বের হয়ে জিনিয়ার রুমে চলে যায়। সেখানে গিয়ে মিসেস শেখের খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে, জিনিয়া জানায় মিসেস শেখ এখনি কিছু খায়নি।
এটা শুনে পূর্ণতা রান্নাঘরে গিয়ে এক প্লেট খাবার বেড়ে নিয়ে জাওয়াদের কাছে এসে দাঁড়ায়। জাওয়াদ এতক্ষণ বেডের উপর বসে ল্যাপটপে কাজ করার বাহানায় সবটা খেয়াল করছিল। পূর্ণতা তার কাছে এসে স্বাভাবিক গলায় বলে–
—এই খাবারটা নিয়ে গিয়ে শাশুড়ী মা’কে খাইয়ে দিন। সারাদিন না খাওয়া, মানুষের উপর রাগ করে খাবার না খেয়ে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার কোন মানে হয় না। উনি খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়াবেন। একেবারে ঔষধ খাইয়ে দিয়ে তারপর আসবেন।
আর হ্যাঁ, চাইলে আমি এই প্লেট থেকে খেয়ে দেখাতে পারি কোন বিষটিষ আছে কিনা। কিন্তু আমার মনে হয় না আমার ঝুটা খাবার উনি খেতে চাইবে, আর নাই বা আপনি খাওয়াতে চাইবেন। কিন্তু আমি আমার মরা মায়ের কসম কেটে বলছি, খাবারে কোন বিষ মেশায়নি। না এমন কোন পরিকল্পনা আমার আছে।
কসম কাটার কথা শুনে জাওয়াদ রেগে যায়। সে পূর্ণতার হাত থেকে খাবারের প্লেট টান দিয়ে কেড়ে নিয়ে হিসহিসিয়ে বলে–
—বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। মুখটা একটু কম চালাতে পারো না। অফিসে তো বো””ম মারলেও মুখ দিয়ে প্রয়োজন ব্যতীত কথা বের হয় না। বাসায় এত কথার ফুলঝুরি ফুটে কেনো?
পূর্ণতা তার প্রশ্নের জবাবে নীরবতা অবলম্বন করে। আসলে সে প্রচন্ড ক্লান্ত। শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক দিয়েই। জাওয়াদ খাবারের প্লেটটা নিয়ে মিসেস শেখের রুমে চলে যায় এবং বহু কসরত করে তাকে খাবারটা খাওয়াতে সক্ষম হয়।
মিসেস শেখকে খাওয়ানো শেষ করে জাওয়াদ আরেক প্লেট খাবার নিয়ে রুমে এসে দেখে পূর্ণতা শুয়ে পড়েছে। দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে সে। এমন দৃশ্য তাদের এই দেড় দুই মাসের বৈবাহিক জীবনে বিরল।
জাওয়াদ দরজা চাপিয়ে দিয়ে পূর্ণতার কাছে এসে তাকে উঠে বসায়। তারপর সে তার মুখের সামনে এক লোকমা খাবার তুলে ধরে। জাওয়াদের এমন কাজে পূর্ণতা এতটাই অবাক হয় যে, খাবারটা মুখে নিতেও ভুলে যায়। তার বিষয়টা কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হতে থাকে।
জাওয়াদ তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে তাকে খাইয়ে দিতে থাকে। সেই রাতে জাওয়াদই প্রথমবারের মতো পূর্ণতাকে নিজের বুকে আগলে নেয়। জাওয়াদের শক্তপোক্ত হাত যখন কোমলভাবে পূর্ণতার মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তখনই তাকে কানে আসে গম্ভীর পুরুষালি গলায় বলা আস্বস্ত বাণী,–
—আজ থেকে আমি হোলাম, তোমার সেই ভরসা যোগ্য বুকের মালিক, যার বুকে তুমি বিনা সংকোচে কাঁদতে পারবে। শান্তিতে মাথা এলিয়ে দিয়ে ঘুমাতে পারবে। জাওয়াদ আজ থেকে তোমায় ভালোবাসবে। জাওয়াদের ভালোবাসাই একদিন তার মাকেও পূর্ণতাকে ভালোবাসতে বাধ্য করবে৷
বর্তমান~
—কেউ ভালোবাসে না পূর্ণতাকে, কেউ না। না তার বাবা-মা, না জাওয়াদ সাহেব, আর নাই বা জাওয়াদ সাহেবের মা। সবাই শুধু পূর্ণতাকে ভালোবাসার লোভ দেখিয়ে মাঝপথে ছেড়ে দেয়।
এই পুরো ব্রাহ্মণ্ডে পূর্ণতা সম্পূর্ণ একা। রাতের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশকে আলোকিত করা সেই চাঁদটির মতোই পূর্ণতাও একা, নিসঃঙ্গ, আপনজন হীন এক ক্লান্ত পথিক। আমার নাম পূর্ণতা হলেও, আমার জীবন অপরিপূর্ণতায় ভরপুর।
আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই বিরবিরিয়ে কথাগুলো আওরায় পূর্ণতা।
📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধু মহলের নিকট পৌঁছে দিন।
শব্দসংখ্যা~২৩০০
~চলবে?
[এই পর্বে আপনারা বেশি বেশি রেসপন্স করলে সামনে সকল পর্বগুলো বড় বড় আসবে ইনশা আল্লাহ। আর অতীত আর ৩/৪ পর্বের মাঝেই শেষ হবে ইনশা আল্লাহ, তাই ধৈর্য ধরার অনুরোধ করা হলো।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮