রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৩০
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
ধরণীর বুকে সূর্যের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ হলো। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা হালকা এক চিলতে রোদ্দুর তৃণার চোখেমুখে পড়তেই তার তন্দ্রা ভাবটা কেটে গেল। শরীরটা প্রচণ্ড ভারী হয়ে আছে, প্রতিটি পেশিতে এক তীব্র ব্যথা আর ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে। তৃণা এখনো চোখ মেলেনি, তবে তার শরীর আর মন জানান দিচ্ছে যে গত রাতে বড় কোনো ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে।
চোখ বন্ধ রেখেই সে অনুভব করতে পারল, এক জোড়া শক্ত এবং বলিষ্ঠ হাত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। তৃণার মস্তিষ্কে হঠাৎ কোনো এক অশুভ আশঙ্কার কথা বিঁধতেই সে জোর করে নিজের আঁখিদ্বয় মেলল। কিন্তু দৃষ্টি মেলতেই সে সামনে একটা মাংসল দেওয়ালের মতো কিছু দেখতে পেল। তৃণা ধীরু পায়ে একটু নড়েচড়ে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে তাকাতেই ভয়ে শিউরে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আরিয়ানের উন্মুক্ত ও প্রশস্ত বুক।
তৃণা বিস্ময় আর আতঙ্ক নিয়ে আরিয়ানের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল, “আমি ওনার বুকে কী করছি? কীভাবে এখানে এলাম?”
কিন্তু কোনো উত্তর মিলল না। সে আরিয়ানের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসতে চাইল, কিন্তু শরীরের প্রতি হাড়ের জয়েন্টে জয়েন্টে তীব্র যন্ত্রণায় তার মুখ দিয়ে অস্ফুট এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল। ঠিক তখনই তৃণার নজর গেল নিজের বিপর্যস্ত অবস্থার দিকে। নিজের শরীরের চিহ্নগুলো দেখে সে থরথর করে কেঁপে উঠল। আবারো আরিয়ানের দিকে ফিরে দেখল লোকটার শরীরে কোনো শার্ট বা গেঞ্জি নেই।
তৃণা যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশের সবকিছু তার কাছে ঝাপসা হয়ে আসছে। সে দ্রুত চাদর দিয়ে নিজের শরীরটা টেনেটুনে ঢেকে নিয়ে বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। তার ঠোঁট দুটো অবাধ্যভাবে কাঁপছে, পুরো শরীরে এক অসহ্য কম্পন শুরু হয়েছে। তার মনে হচ্ছে, গত রাতের ওই কয়েকটা ঘণ্টা তার সমস্ত অস্তিত্বকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে।
তৃণা বিছানার সাইডে বসে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই হাতে মুখ ঢেকে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। কান্নার তীব্র বেগে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে বুঝতে পারছে, আজ থেকে তার জীবনের গল্পটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
আরিয়ান সকালের কাঁচা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতেই বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে চোখ খুলল। কিন্তু পরক্ষণেই এক করুণ কান্নার শব্দ তার কানে পৌঁছাতেই সে পুরোপুরি সজাগ হয়ে গেল। বিছানায় পাশ ফিরতেই সে দেখল তৃণা দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কাঁদছে। আরিয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করল,
“হোয়াট হ্যাপেনড? কাঁদছ কেন?”
আরিয়ানের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই তৃণা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। আরিয়ানকে চোখের সামনে দেখে সে ভয়ে ও ঘৃণায় চাদরটা শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরিয়ান প্রথমে পুরো ব্যাপারটা ধরতে না পারলেও, হঠাৎ করেই তার মস্তিষ্কে গত রাতের এলোমেলো স্মৃতিগুলো ভিড় করতে শুরু করল। তার নজর নিজের অনাবৃত বুকের দিকে যেতেই সে থমকে গেল সেখানে স্পষ্ট তৃণার নখের খামচির দাগ।
আরিয়ানের পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। সে বুঝতে পারল তৃণার এই কান্নার উৎস কোথায়। রাতের সেই ঘোরে থাকা মুহূর্তগুলো যখন চলচ্চিত্রের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, তখন আরিয়ানের মাথা অপমানে আর অপরাধবোধে নুইয়ে পড়ল। সে দ্রুত বিছানার পাশে পড়ে থাকা নিজের শার্টটা টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল।
তৃণার কান্নার বেগ বাড়ছে, সেই সাথে তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে।
আরিয়ানের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। সে দ্বিধাভরে তৃণার কাঁপে থাকা বাহুতে হাত রাখল, শান্ত গলায় বলতে চাইল,
“তৃণা, আই অ্যাম রিয়েলি সরি।”
কিন্তু ‘সরি’ শব্দটা শোনামাত্রই তৃণা ঝট করে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো কান্নায় টকটকে লাল হয়ে আছে, আর সেই চোখ দিয়ে যেন ঘৃণা ঠিকরে বেরোচ্ছে। আরিয়ানের হাতের স্পর্শ যেন তার শরীরে আগুনের মতো বিঁধল। এক ঝটকায় আরিয়ানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল তৃণা,
“সরি! আপনি জাস্ট একটা সরি বলছেন? কেন করলেন এটা আপনি? আমি আপনাকে অনেক ভালো মানুষ মনে করতাম। বিশ্বাস করেছিলাম আপনাকে! সেই বিশ্বাসের মর্যাদা এভাবে দিলেন?”
তৃণার প্রতিটি কথা তীরের মতো আরিয়ানের বুকে বিঁধতে লাগল। আরিয়ানের কাছে তখন কোনো উত্তর ছিল না। সে কি বলবে যে তারা দুজনেই কাল রাতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল? নাকি এই পরিস্থিতির জন্য নিজেকেই পুরোপুরি দায়ী করবে?
আরিয়ান অত্যন্ত ধীর এবং শান্ত কণ্ঠে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। সে নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে বলল,
“তৃণা, বোঝার চেষ্টা করো। এখানে আমার বা তোমার কারও কোনো পরিকল্পিত দোষ নেই। পুরোটাই একটা এক্সিডেন্ট ছিল।”
তৃণা কান্নার দমকে কথা বলতে পারছিল না, তবুও সে ঘৃণায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল,
“বাহ্! কত সুন্দর অবলীলায় বলে দিলেন এটা একটা এক্সিডেন্ট! আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি আমার কত বড় ক্ষতি করে ফেলেছেন? আমার সারাজীবনের একটা বিশ্বাসের জায়গা ভেঙে দিয়েছেন আপনি।”
আরিয়ান তৃণার আর্তনাদ দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। সেও কিছুটা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে উঠল,
“সব দোষ আমার ওপর দিও না তৃণা। তুমিও কিন্তু কাল রাতে সায় দিয়েছিলে। কেবল আমার একার চেষ্টায় এমনটা হওয়া সম্ভব ছিল না।”
আরিয়ানের এই কথা শোনামাত্রই তৃণা যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে এক ঝটকায় আরিয়ানের শার্টের কলারটা দুই হাতে চেপে ধরল। আজ যেন তৃণার দুচোখ দিয়ে অশ্রু নয়, বরং রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আরিয়ান কোনো বাধা দিল না, স্থির হয়ে বসে তৃণার চোখের গভীরে জমে থাকা সেই হাহাকার আর তীব্র ব্যথা অনুভব করার চেষ্টা করল।
তৃণা রাগে আর অভিমানে গর্জে উঠল,
“আমি সায় দিয়েছিলাম? আপনি খুব ভালো করেই জানতেন কাল রাতে আমি ড্রিংকস করার পর নিজের হুঁশে ছিলাম না। কিন্তু আপনার তো হুঁশ ছিল! আপনি জানতেন কী ঘটছে, তবুও কীভাবে এমন জঘন্য কাজ করতে পারলেন? আসলে আপনারা সব পুরুষই এক! আপনাদের জৈবিক চাহিদা মিটে গেলেই সব শেষ, মনের খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।”
বলেই তৃণা কলার ছেড়ে দিয়ে নিজের দুই হাতে নিজের চুলগুলো খামচে ধরল,নিজের ওপরই তার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। আরিয়ান এবার গলা কিছুটা উঁচিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তৃণা, আমরা আইনত স্বামী-স্ত্রী! তাই এটা কোনো পাপ নয়।”
তৃণা লাল টুকটুকে চোখ মেলে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বিষাদ মাখানো কণ্ঠে বলল,
“স্বামী-স্ত্রী? আমায় কোনোদিন আপনি বউ হিসেবে মেনেছেন? নামমাত্র একটা সম্পর্কের দোহাই দিয়ে এখন নিজের অপরাধ ঢাকতে চাইছেন?”
“মেনে নিলাম! আজ এই মুহূর্ত থেকে তৃণা হাওলাদারকে আরিয়ান মির্জা নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মনে-প্রাণে গ্রহণ করল। এই মুহূর্ত থেকে আমি তোমায় শুধু আমার সহধর্মিণীই নয়, বরং আমার পুরো অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিলাম।”
আরিয়ানের এই আকস্মিক স্বীকারোক্তিতে তৃণা পাথর হয়ে গেল। তৃণা নিথর হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো সে কোনো ভ্রম দেখছে কিংবা কথাগুলো শুনতে ভুল করেছে। আরিয়ানের চোখের মনিতে সে অনেক খুঁজল, কিন্তু সেখানে কোনো মিথ্যার ছায়া বা মেকি অভিনয়ের চিহ্ন পেল না। তৃণার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর ফুটল না।
আরিয়ান বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি এখনই উকিলকে কল দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি যে, ডিভোর্স পেপারের আর কোনো প্রয়োজন নেই। ওসব ছিঁড়ে ফেলতে।”
কথাটা বলেই আরিয়ান আলমারি খুলে একটি সুন্দর শাড়ি বের করে আনল। তৃণার দিকে শাড়িটা বাড়িয়ে দিয়ে নিস্পৃহভাবে বলল,
“যাও, শাওয়ার নিয়ে নাও। শরীরটা ভালো লাগবে।”
তৃণা এখনো পাথর হয়ে আছে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের এক অদ্ভুত দোলাচলে তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তাকে স্থির হয়ে বসে থাকতে দেখে আরিয়ান কিছুটা ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,
“ওয়াশরুম পর্যন্ত কি একা যেতে পারবে?”
তৃণা যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল অর্থাৎ সে পারবে। সে বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়াতেই সারা শরীরে এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ খেলে গেল। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে সে দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিল। গতকালের সেই নেশাজাতীয় পানীয়র প্রভাব আর রাতের অনাঙ্ক্ষিত ঘটনা সব মিলিয়ে শরীরটা ভেঙে আসতে চাইছে।
হঠাৎ তৃণা অনুভব করল সে শূন্যে ভাসছে। চমকে চোখ খুলতেই দেখল সে আরিয়ানের বলিষ্ঠ দুই বাহুর মাঝে বন্দি। আরিয়ান তাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়েছে। তৃণা অবচেতনেই আরিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। আরিয়ান তাকে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে লাগল।
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“কিছুক্ষণ আগে আপনি যা যা বললেন, সেসব কি রাতের এই ঘটনাটাকে চাপা দেওয়ার জন্যই বললেন? কারণ আমি জানি, আপনি কোনোদিনও আমাকে মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারবেন না। এটা আপনার দয়া, তাই না?”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার মুখটা ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে রইল। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে তৃণাকে ওয়াশরুমের ভেতরে সাবধানে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর এক পলক তৃণার ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল এবং বাইরে থেকে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে রুম ছেড়ে চলে গেল।
তৃণা বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাঁপাকাঁপা হাতে শাওয়ারটা অন করে দিল। হুড়মুড় করে শীতল জলরাশি গায়ে পড়তেই ব্যথায় শরীরটা আবার রি রি করে উঠল। কিন্তু এই মুহূর্তের শারীরিক ব্যথার চেয়েও মনের ভেতরের তোলপাড় তাকে বেশি দগ্ধ করছে। সে চোখ বন্ধ করে জলের ধারার নিচে দাঁড়িয়ে রইল। সে মনে-প্রাণে চাইছে, এই জলের স্রোত যেন তার শরীর থেকে গত রাতের প্রতিটি স্পর্শ আর প্রতিটি দাগ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়। কিন্তু হৃদয়ে যে দাগ বসে গেছে, তা কি এত সহজে মোছা সম্ভব?
তৃণা প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে দীর্ঘ শাওয়ার নিল। আসলে শাওয়ার নেওয়া নয়, সে পাথরের মতো ঝরনার নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল পুরোটা সময় যেন জলের ধারায় নিজের অস্তিত্বকে ধুয়ে ফেলতে চাইছে। আলমারি থেকে বের করে দেওয়া সেই শাড়িটা কোনোমতে জড়িয়ে, ভেজা চুল না মুছেই সে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল।
ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে, তৃণা যেখানে পা ফেলছে সেখানেই ভিজে যাচ্ছে রুমটা। চুলের জল চুইয়ে তার শাড়িটাও প্রায় অর্ধেক ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
তৃণা টলমল পায়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় প্রতিফলিত নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারছে না। চোখ দুটো ফোলা, ঠোঁট ফ্যাকাসে। সে চোখ বন্ধ করলেই আরিয়ানের শরীরের সেই তীব্র ঘ্রাণ যেন এখনো নিজের নাকে-মুখে পাচ্ছে। সে মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
“আরিয়ান মির্জা তো আইনত আমার স্বামী, তবে কেন সবকিছু আজ বিষের মতো লাগছে? কেন মনে হচ্ছে আমি নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে গেছি?”
তৃণা কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের গলায় আর ঘাড়ের কাছে ফুটে থাকা কালচে দাগগুলোর ওপর আঙুল বুলালো। ওই দাগগুলো গত রাতের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নিজের শরীরের ওপর নিজেরই এক তীব্র ঘৃণা কাজ করতে শুরু করল। তার মনে হচ্ছে, কাল রাতের ওই দুর্ঘটনা তার শান্ত জীবনটাকে চিরতরে এলোমেলো করে দিয়েছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তৃণার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল সে সহ্য করতে পারছে না নিজের এই বিধ্বস্ত রূপ।
আরিয়ান করিডরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। তার আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত একটি সিগারেট, যেটাতে হয়তো দু-একবার টান দিয়েছে সে। ধোঁয়াগুলো কুন্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে, কিন্তু আরিয়ানের মনের ভেতরকার অস্থিরতা কিছুতেই কাটছে না। হঠাৎ জ্বলন্ত সিগারেটের অংশটা আঙুলে ছ্যাঁকা লাগতেই তার ঘোর কাটল। সে ঝট করে ওটা নিচে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে দিল।
চোখের সামনে বারবার গত রাতের সেই মায়াবী অথচ বিশৃঙ্খল দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে। হঠাৎ সে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। পকেট থেকে ফোন বের করে তাদের পারিবারিক উকিলকে কল করল সে। ওপাশ থেকে উকিল কিছুটা অবাক হয়েই বললেন,
“আরিয়ান? তুমি এত সকালে কল দিলে যে সব ঠিক আছে তো?”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,
“আঙ্কেল, আপনাকে যে ডিভোর্স লেটারটা রেডি করতে বলেছিলাম, সেটা কি কমপ্লিট?”
“হ্যাঁ বাবা, প্রসেসিং তো প্রায় শেষ। কেন বলো তো?”
“আর কোনো প্রসেসিংয়ের দরকার নেই আঙ্কেল। আমি তৃণাকে ডিভোর্স দিচ্ছি না। পেপারগুলো ক্যানসেল করে দিন।”
ওপাশ থেকে উকিল বেশ খুশি মনেই বললেন,
“এই তো বাবা, এতদিনে একটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করলে। আমি তো আগেই বলেছিলাম, সময় নাও, হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। বিয়ে একটা পবিত্র বন্ধন, এটাকে রক্ষা করাই বীরত্বের কাজ।”
আরিয়ান শুধু বলল, “ঠিক আছে আঙ্কেল, এখন রাখছি।”
ফোনটা কেটে দিয়ে আরিয়ান ধীর পায়ে রুমে ঢুকল। দেখল তৃণা তখনো ড্রেসিং টেবিলের সামনের টুলটায় স্থির হয়ে বসে আছে। মেয়েটার দৃষ্টি নিজের নখের ওপর নিবদ্ধ, আরিয়ানের উপস্থিতি সে টেরই পেল না। ভেজা চুল থেকে এখনো টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। আরিয়ান নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে একটি শুকনো তোয়ালে হাতে নিল।
সে খুব সাবধানে তৃণার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আরিয়ান ঝুঁকে তৃণার চুলে তোয়ালে স্পর্শ করতেই তৃণা চমকে হুঁশে ফিরে এল। সে আঁতকে উঠে টুল ছেড়ে দাঁড়াতে চাইলে আরিয়ান তার বাহু চেপে ধরে ইশারায় বারণ করল। আয়নার দিকে তাকিয়ে তৃণা দেখল, আরিয়ান অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তার চুলগুলো মুছে দিতে শুরু করেছে। তৃণা ফ্যালফ্যাল করে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
চুল মুছতে মুছতে আরিয়ান শান্ত স্বরে বলল,
“মাত্রই উকিল আঙ্কেলকে জানিয়ে দিয়েছি। আমাদের মাঝে আর কোনো ডিভোর্স হবে না।”
তৃণার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। একটা মানুষের মাঝে এক রাতে এত বড় পরিবর্তন কী করে সম্ভব, তা সে কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারছে না। আরিয়ান চুল মুছতে মুছতে আয়নার দিকে তাকাল। সেই আয়নার ফ্রেমেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল শ্যামবরণী রমণীর মায়াবী মুখের ওপর। তৃণার ভেজা মুখ আর উদাস চাউনি দেখে আরিয়ানের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘আগে তো কখনো এই মেয়েটার সামনে দাঁড়ালে এমন অনুভব হয়নি, তবে আজ কেন নিজেকে সামলানো এত কঠিন মনে হচ্ছে?’
নিজের প্রশ্নের কোনো উত্তর সে পেল না। আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করতে শুরু করল। সে তড়িঘড়ি করে আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিল। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না সে। তোয়ালেটা পাশে রেখে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে গেল শাওয়ার নেওয়ার জন্য।
তৃণা একইভাবে টুলের ওপর বসে রইল। সে আজ এই আরিয়ানকে চিনতে পারছে না। যে আরিয়ানের কণ্ঠে সবসময় রাগের হুংকার থাকত, আজ সেখানে কেবল এক প্রশান্ত গভীরতা। তৃণা এই প্রথম অনুভব করল একজন স্বামীকে, একজন সত্যিকারের জীবনসঙ্গীকে যাকে ঘিরে প্রত্যেকটি নারী একরাশ ভালোবাসা, সম্মান আর যত্নের স্বপ্ন দেখে।
চলবে…
(এবার খুশিতো?গতকালের পর্বে তোমরা সবাই নিজেদের মতো ধারণা করে নিয়েছিলে আর কিছু নেগেটিভ কমেন্টও এসেছিল।যাক সেসব বাদ।কেমন হলো জানাবে।আর তোমাদের কোনো মন্তব্য থাকলে বলে যেও)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩