রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব ২৯
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
(প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
মায়মুনা বেগম বিছানার এক কোণে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে একটা শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিলেন। সুঁই-সুতার কাজে তার নিপুণ হাত চলছে। ঠিক তখনই আহাদ মির্জা গুনগুন করতে করতে রুমে ঢুকলেন। মায়মুনা বেগম খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করলেন না, নিজের কাজেই মগ্ন রইলেন। অল্প বয়সে বিয়ে হলেও মায়মুনা বেগম এখনো আগের মতোই সতেজ আর সুন্দরী। বয়সের ছাপ তার চেহারায় তেমন একটা পড়েনি।
আহাদ মির্জা গিয়ে সোজা স্ত্রীর মুখোমুখি বসলেন। মায়মুনা বেগম কাজ থামিয়ে একবার ভ্রু কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকালেন। আহাদ মির্জা বেশ রসিকতা করে বলে উঠলেন,
“আহা! কী রূপ তোমার গো মায়মুনা! তোমাকে দেখলে এখনো ইচ্ছে হয় আবারও বিয়ে করে ধিংতাড়া ধিংতাড়া গানে নেচে কুঁদে একাকার করি।”
মায়মুনা বেগম হাতের কাজটা শেষ করে সুতো ছিঁড়ে সোজা হয়ে বসলেন। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি চেপে বললেন,
“কী ব্যাপার সাহেবের মুখে আজ দেখি মধু ঝরছে! কী মতলব আপনার?”
আহাদ মির্জা শব্দ করে হাসলেন,
“সবসময় কি শুধু মতলব নিয়েই আসি? ভালোবাসার কথা বলতে পারি না? যাক ওসব কথা, তোমার কোমরের ব্যথার কী খবর?”
“আজ কিছুটা ভালো,” মায়মুনা বেগম সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।
“গরম পানি করে এনে দেব সেঁক দেওয়ার জন্য?”
আহাদ মির্জার কণ্ঠে রাজ্যের যত্ন।
স্বামীর এমন আহ্লাদ দেখে মায়মুনা বেগম হেসেই ফেললেন। তিনি বললেন,
“এতো রং-ঢং ভালো না। সবই তো বুঝি। বড় ছেলে বিয়ে করালেন, বাড়ির বাচ্চারা সব বড় হয়ে গেল, অথচ আপনার এখনো দুষ্টুমি বুদ্ধি গেল না?”
আহাদ মির্জা এবার মায়মুনার হাতটা আলতো করে ধরে বললেন,
“আহা মায়মুনা, ভালোবাসার কি কোনো বয়স আছে বলো?”
মায়মুনা বেগম লজ্জা পেয়ে কথার মোড় ঘুরাতে চাইলেন। তিনি গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তা আরিয়ান আর তৃণার খোঁজ নিয়েছিলে? ওরা কেমন আছে?”
“হ্যাঁ, কথা হয়েছে। আজ অফিসের একটা পার্টি আছে, সেখানেই তারা দুজনে গিয়েছে।”
আহাদ মির্জার কথা শুনে মায়মুনা বেগমের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,
“তৃণা তো এসব হৈ-হুল্লোড় আর পার্টি একদম পছন্দ করে না। ও তো বেশি মানুষের ভিড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আরিয়ান ওইসব জায়গায় কেন নিয়ে গেল ওকে? মেয়েটা যদি এখন আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন কে দেখবে?”
আহাদ মির্জা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন, “আরিয়ান সাথে আছে, ও নিশ্চয়ই সামলে নেবে। আর এখন ওদের একটু বাইরের মানুষের সাথে মেলামেশা করাও দরকার।”
আহাদ মির্জা তার স্ত্রীর কণ্ঠে তৃণার জন্য এমন ব্যাকুলতা দেখে মনে মনে খুব খুশি হলেন। মুখে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“তার মানে তুমি কি তৃণাকে পুত্র বধূ হিসেবে মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছ, মায়মুনা?”
আহাদ মির্জার এমন সরাসরি প্রশ্নে মায়মুনা বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। সামলে নিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
“মেয়েটা তো আসলে খারাপ না। বেশ শান্ত আর লক্ষ্মী।”
“তাহলে শুরুর দিকে ওর সাথে এত খারাপ ব্যবহার কেন করেছিলে?”
আহাদ মির্জার প্রশ্নে এবার সত্যটা বেরিয়ে এল।
মায়মুনা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরনো দিনের কথা মনে করলেন। তিনি অপরাধীর স্বরে বললেন,
“আসলে তৃণার সৎ মা যখন ওর সম্পর্কে বাজে কথা বলেছিল, আমি সেটাই বিশ্বাস করেছিলাম।”
আহাদ মির্জা চমকে উঠে ভ্রু কুঁচকালেন,
“বাজে কথা মানে? সে আবার কী বলেছিল?”
মায়মুনা বেগম আজ সবটুকু খুলে বললেন,
“তোমাকে আগে বলা হয়নি। আমি যখন প্রথম ওদের বাড়িতে মেয়ে দেখতে যাই, তখনই আমার চোখ আটকে গিয়েছিল তৃণার ওপর। মেয়েটার গায়ের রঙ শ্যামলা হলে কী হবে, ওর চোখে-মুখে এমন একটা মায়াবী স্নিগ্ধতা আছে যা বড় মেয়েটার মধ্যে ছিল না। ওর ধীরস্থির স্বভাবটাও আমার খুব মনে ধরেছিল। কিন্তু বড় মেয়ে থাকতে ছোট মেয়ের বিয়ের কথা তোলাটা দৃষ্টিকটু দেখাবে বলে চুপ করে ছিলাম। হয়তো তৃণার সৎ মা আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছিলেন।”
আহাদ মির্জা উৎসুক হয়ে শুনছিলেন। মায়মুনা বেগম বলতে থাকলেন, “
তিনি তখন আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বললেন, তৃণা দেখতে ভালো হলেও ওর চরিত্র নাকি ভালো নয়। ও নাকি বাইরের ছেলেদের সাথে মেলামেশা করে সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। আমি একজন মা হয়ে আরিয়ানের জন্য এমন মেয়েকে মেনে নিতে পারছিলাম না, তাই ওর ওপর সব রাগ ঢেলে দিতাম।”
আহাদ মির্জা হতাশায় মাথা নাড়লেন। তিনি তৃণাকে ছোটবেলা থেকেই চেনেন, জানেন মেয়েটা কতটা নির্মল। তিনি শুধু বললেন,
“কারও কথায় কান দিয়ে হীরের টুকরো মেয়েটাকে চিনতে ভুল করেছিলে তুমি।”
মায়মুনা বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়ে বললেন,
“সেসব অনেক হয়েছে, পুরনো কাসুন্দি আর না ঘাটি। এবার অনেক রাত হলো, ঘুমানো উচিত।”
আহাদ মির্জা এবার তার চিরচেনা দুষ্টু হাসি দিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন,
“এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবে? আমি তো ভেবেছিলাম আরও কিছুক্ষণ গল্প করব।”
মায়মুনা বেগম মিছে রাগের ভান করে আহাদ মির্জার গায়ের ওপর কাঁথা টেনে দিয়ে বললেন, “আর রং-ঢং করতে হবে না, এবার চুপ করে ঘুমান দেখি।”
★★★
পার্টির এক কোণে বসে বিষাক্ত হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে আছে মীরা। তার চোখে শয়তানি বুদ্ধি খেলছে। তৃণা যে গ্লাসের পর গ্লাস সফট ড্রিংকস ভেবে খাচ্ছে, তাতে মীরা নিজেই অনেক কড়া অ্যালকোহল মিশিয়ে দিয়েছিল। নেশার প্রথম ধাক্কাতেই তৃণা ঝিমিয়ে পড়েছে।
মীরা বিড়বিড় করে বলল,
“আজ তোকে সবার সামনে এমন তাসে উড়াই দেব যে, তুই মুখ দেখানোর জায়গা পাবি না।”
আরিয়ান এখনো দূরে তার ম্যানেজার আর বিজনেস পার্টনারদের সাথে কথা বলতে মগ্ন। মীরা এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইল। সে ধীরপায়ে তৃণার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তৃণা এখন আধবোজা চোখে সামনের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছে।
মীরা ডাকল, “তৃণা…”
তৃণা কোনোমতে মিটিমিটি চোখে মীরার দিকে তাকাল। তার চোখের মণিগুলো স্থির হতে পারছে না। তৃণা কিছু বলার আগেই মীরা আদিখ্যেতা করে বলল,
“তোমার কি মাথা ঘুরছে তৃণা? শরীরটা কি খারাপ লাগছে?”
তৃণা নেশাতুর গলায় জড়িয়ে জড়িয়ে বলল,
“হুম… মনে হচ্ছে পুরো ঘরটা বনবন করে ঘুরছে… মনে হচ্ছে আমি আকাশে উড়ছি…”
মীরা মনে মনে বিজয়ের হাসি হাসল। প্ল্যানমাফিক কাজ হচ্ছে দেখে সে তৃণার একটা হাত শক্ত করে ধরল। মীরা বলল, “চলো তৃণা, এই কোণে বসে থেকো না।”
তৃণা টলতে টলতে প্রশ্ন করল,
“কো… কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”
“চলো তো, গেলেই দেখতে পাবে। একটা সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য,” মীরা কথাগুলো বলে তৃণাকে ভিড়ের মাঝখানে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
মীরার আসল উদ্দেশ্য হলো তৃণাকে মাঝখানের ড্যান্স ফ্লোরে নিয়ে গিয়ে এমনভাবে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়া, যাতে সে সবার সামনে উপহাসের পাত্র হয়। নেশায় চুর হয়ে থাকা তৃণা তখন নিজেকে সামলাতে পারবে না। মীরা ভাবল,
‘তোর জন্যই আরিয়ান আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না। আজ তুই অপমানে শেষ হয়ে যাবি আর আরিয়ান তোকে এই অবস্থায় দেখে ঘৃণা করতে শুরু করবে।’
মীরা যখন দেখল তৃণা পুরোপুরি নেশায় আচ্ছন্ন, সে মোক্ষম সুযোগটা লুফে নিল। ড্যান্স ফ্লোরের ঠিক মাঝখানে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে মীরা হুট করে তৃণার হাত ছেড়ে দিল। তৃণা তখন নিজের শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে, তার পা টলমল করছে। মীরা বাঁকা হেসে নিজের পা বাড়িয়ে তৃণার পায়ে ল্যাং মারল।
তৃণা টাল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। মীরা মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিল এই ভেবে যে, এখন সবার হাসাহাসির পাত্র হবে তৃণা। কিন্তু তার সেই আনন্দ কয়েক সেকেন্ডও স্থায়ী হলো না।
তৃণা শক্ত মেঝেতে পড়ার আগেই একজোড়া শক্ত হাত তাকে পতন থেকে রক্ষা করল। তৃণা সজোরে আছড়ে পড়ল এক চওড়া বুকের ওপর। তাকে কেউ পরম মমতায় আগলে ধরেছে। মীরা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখল, সে আর কেউ নয় স্বয়ং আরিয়ান!
আরিয়ান দূর থেকেই লক্ষ্য করছিল তৃণা আর মীরাকে। তৃণা টলে যাওয়ার সাথে সাথেই সে চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় এসে তাকে ধরে ফেলেছে। তৃণা নেশার ঘোরে আরিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে বিড়বিড় করছে।
আরিয়ান এবার মুখ তুলে মীরার দিকে তাকাল। তার দুচোখে তখন যেন আগুন ঝরছে। সেই চাহনিতে এত রাগ ছিল যে মীরার রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার জোগাড়। আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল,
“কী করার চেষ্টা করছিলে মীরা? আমি পাশে নেই বলে ভেবেছ যা খুশি তাই করবে?”
মীরা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“না… মানে আরিয়ান, ও তো একা একা হাঁটতে পারছিল না, আমি তো শুধু সাহায্য…”
“চুপ করো!” আরিয়ানের হুংকারে আশেপাশের দু-একজন তাকিয়ে পড়ল।
তৃণা আরিয়ানের বুকে নিজের নাক-মুখ ঘষল কিছুক্ষণ। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তৃণার দিকে তাকালো, মেয়েটার এমন অস্বাভাবিক আচরণ সে আগে কখনো দেখেনি। তৃণা এবার আরিয়ানের মুখের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে ‘হি হি’ করে হাসলো। হাসতে হাসতেই সে হঠাৎ মীরার দিকে তাকালো। হেলেদুলে হেঁটে একদম মীরার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মীরাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার পরখ করে নিয়ে জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“তু… তুই আমাকে ল্যাং দিয়ে ফেলতে নিলি কেন?”
মীরা ঘৃণাভরে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“সরো তো এখান থেকে, অসহ্য!”
বলেই মীরা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু সাথে সাথেই তৃণা মীরার চুল শক্ত করে টেনে ধরল। এহেন কাণ্ড দেখে আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে দ্রুত এগিয়ে গেল তৃণাকে ফেরাতে, কিন্তু তৃণা মীরার চুল টেনে ধরেই আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছে। আরিয়ান তৃণার দুই বাহু ধরে টেনে তাকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগল। তৃণা মীরার চুল ছেড়ে দিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের পায়ের জুতো খুলে সজোরে ছুঁড়ে মারল মীরার দিকে।
পুরো পার্টির লোকজন এখন হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মীরা অপমানে আর রাগে নাক-মুখ কুঁচকে নিল। সে চারদিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে আঙুল তুলে শাসিয়ে বলল,
“তোকে আমি দেখে নিব!”
বলেই গটগট পায়ে পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে গেল মীরা। চারপাশের উৎসুক জনতাকে উদ্দেশ্য করে আরিয়ান তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,
“আপনারা প্লিজ এনজয় করুন, বিশেষ কিছু হয়নি।”
সকলে আবার নিজেদের মতো কথা বলা শুরু করলে আরিয়ান তৃণার দিকে কড়া নজরে তাকালো।
“কী হয়েছে তোমার? ড্রিংকস করেছো নাকি?”
তৃণা একদম আরিয়ানের গায়ের কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে বলল,
“উঁহু… একদমই না। ওসব পচা জিনিস আমি খাই না।”
তৃণা টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে নিজের টেবিল থেকে সেই জুসের গ্লাসটা তুলে নিল। সেটা আরিয়ানের মুখের সামনে ধরে বলল,
“এই নিন, আপনি খান। খেয়ে দেখুন, কী দারুণ মজা!”
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকালো। সে বুঝতে পারল মীরা নিশ্চয়ই এই জুসে কিছু মিশিয়েছিল। সে জুসটা হাতে নিয়ে নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুঁকে বোঝার চেষ্টা করল এর মধ্যে কী আছে। কিন্তু আরিয়ানের কিছু বোঝার আগেই তৃণা গ্লাসটা উঁচু করে পুরো জুসটা আরিয়ানের মুখের ভেতর ঢেলে দিল। আরিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেকটা জুস গিলে ফেলল।
আরিয়ান এবার তৃণার দিকে প্রচণ্ড রাগী চোখে তাকালো। কিন্তু তৃণা সেই রাগী মুখ দেখে একটুও ভয় পেল না, বরং ছোট বাচ্চার মতো খিলখিল করে হেসে উঠল।
★★★
রোহান আর মিতু এক সাথে রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আবহাওয়াটা আজ বেশ চমৎকার। শীতের তীব্রতা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে, বাতাসে এখন বসন্তের হালকা ছোঁয়া। আকাশে গাঢ় কুয়াশা নেই বললেই চলে, কেবল চাদর পাতলা কুয়াশার বুক চিরে ঝাপসা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। দুজনে একই চাদরে নিজেদের জড়িয়ে নিয়ে প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতা উপভোগ করছে।
রোহান হঠাৎ মিতুর হাতটা শক্ত করে ধরে খুব শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“নীলাঞ্জনা, সারাজীবন আমাদের ভালোবাসা কি এভাবেই অটুট থাকবে?”
মিতু এক পলক চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে হাসল। রোহানের দিকে না তাকিয়েই সে ধীরস্বরে উত্তর দিল,
“যদি তুমি চাও তবে নিশ্চয়ই থাকবে। নাকি ওই আগেরবারের মতোই কোনো তুচ্ছ কারণে ভুল বুঝে আবার আমায় ছেড়ে দূরে সরে যাবে?”
রোহানের বুকে যেন তীরের মতো বিঁধল কথাটা। সে অপরাধী স্বরে বলল,
“প্লিজ, এভাবে পুরনো কথা বলে আমায় লজ্জা দিও না। নিজেকে আসলেই খুব অপরাধী মনে হয়।”
মিতু কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আজ মা নিচতলায় বসে বলছিলেন, ‘এই বাড়িতে খেলার কোনো সাথী নেই, কোনো ছোট বাচ্চা নেই’। বাড়িটা নাকি খুব শূন্য লাগে ওনার কাছে।”
রোহান মিতুর দিকে ফিরে তাকাল,
“তো! মা বলছেন তো তাতে কী হয়েছে?”
মিতু এবার সরাসরি রোহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তো মানে কী? মা চাচ্ছেন আমাদের ঘরে নতুন কেউ আসুক। উনি নাতি-নাতনির মুখ দেখতে চান।”
রোহানের চোখেমুখে হঠাৎ রাগের আভা ফুটে উঠল। সে কিছুটা কঠোর গলায় বলল,
“বাচ্চার কথা আর কক্ষনো বলবে না মিতু। এই বাচ্চার পাল্লায় পড়েই আমাদের সাজানো ভালোবাসা একবার ভাঙতে বসেছিল। আমি আর ওই ঝুঁকি নিতে চাই না।”
মিতু শান্ত স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল,
“তখন তো তুমি আমায় ভুল বুঝেছিলে রোহান। আশা করি এবার আর তেমন কিছু হবে না।”
“হুম বুঝেছি,” রোহান মিতুকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কিন্তু আমার কোনো সন্তানের প্রয়োজন নেই। তুমি এমনিতেই অসুস্থ, এখন একটা বাচ্চার জন্য আমি তোমার জীবনের রিস্ক নিতে পারব না। আমি চাই না আমার নীলাঞ্জনাকে হারাতে। আমি সারাজীবন তোমাকে এভাবেই নিজের কাছে পেতে চাই।”
মিতু এবার রোহানের কথা অগ্রাহ্য করে জেদ ধরে বলল,
“কিন্তু আমার যে সন্তানের খুব শখ রোহান। পৃথিবীর সব নারীরই মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার তীব্র ইচ্ছে থাকে। আমি কেন বঞ্চিত হব? আমিও চাই আমাদের একটা অংশ এই পৃথিবীতে আসুক।”
রোহান কিছুক্ষণ মিতুর চোখের গভীরতা মেপে দেখল। তারপর দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বলল,
“সত্যিই কি এটা তোমার শখ?”
মিতু নিচু স্বরে বলল, “হুম।”
রোহান এবার মৃদু হেসে বলল, “তাহলে আর দেরি কিসের? চলো তবে…”
মিতু লজ্জায় লাল হয়ে রোহানের বুকে ছোট একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল,
“ধ্যাৎ! কী যে বলো না তুমি!”
রোহান হাসতে হাসতে বলল,
“আরে, আমি তো ঘরে গিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার কথা বললাম। তুমি আবার কী ভাবলে?”
মিতু এবার সত্যিই ভীষণ লজ্জা পেল। লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা না পেয়ে সে রোহানের বুকেই নিজের মুখ গুঁজে দিল। রোহান প্রাণখোলা শব্দ করে হেসে উঠল, আর তার সেই হাসির সাথে মিতুর মিষ্টি হাসির শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল বেলকনির ওই ঝাপসা চাঁদের আলোয়।
★★★
আরিয়ানদের বাংলোর সামনে এসে গাড়িটা থামলো। ড্রাইভার সামনে থেকে বিনীত সুরে বলল,
“স্যার এসে পড়েছি।”
আরিয়ান কোনোমতে মাথা ঝাকিয়ে ঘোর কাটানোর চেষ্টা করল। সে গাড়ি থেকে নামতেই তৃণাকে প্রায় টেনে নামাতে হলো। আরিয়ানের কোম্পানির ম্যানেজার তাদের পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই ড্রাইভারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আরিয়ান নিজেও কিছুটা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, যদিও সেটা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই পানীয়র কারণেই হয়েছে।
তৃণা টলমল পায়ে আরিয়ানের আগে আগে কোনোমতে বাড়ির ভেতর ঢুকল। আরিয়ানের নেশা তৃণার মতো অতটা গাঢ় না হলেও, সে নিজেও বেশ টালমাটাল অবস্থায় আছে। রুমে ঢুকেই তৃণা কোনো কিছু না ভেবেই বিছানায় ধপাস করে ঢাল হয়ে শুয়ে পড়ল।
আরিয়ান দরজায় ভর দিয়ে রুমে ঢুকে তৃণাকে ওভাবে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই যে মেয়ে, বিছানায় এভাবে ব্যাঙের মতো শুয়ে আছো কেন? ওঠো বলছি!”
তৃণা আরিয়ানের কথা শুনে চোখ মিটমিট করে তাকালো। তারপর বিছানায় দুই হাতে ভর দিয়ে অনেক কসরত করে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। সে একদম আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ নজরে আরিয়ানের মুখের দিকে তাকালো। হুট করেই আরিয়ানের দুই গালে হাত রেখে মুখটা দুই পাশে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভালো করে দেখে নিয়ে আহ্লাদী স্বরে বলল,
“ওমা! এই লোকটা এত সুন্দর কেন?”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেই তখন দেয়াল না ধরলে পড়ে যাবে এমন অবস্থা। তৃণা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জোকস শুনেছে। হাসতে হাসতেই সে বলল,
“রাগি সাহেব, আপনি দেখতে একদম ‘তেঁতো করলার’ মতো সুন্দর!”
আরিয়ান নিজের ভারসাম্য সামলাতে সামলাতে শব্দ করে হেসে উঠল। সে-ও পাল্টা জবাব দেওয়ার নেশায় বলে উঠল,
“তুমিও ঠিক কচুর মতো সুন্দর!”
তৃণা এবার আরিয়ানের দিকে আরেকটু এগিয়ে আসলো। আরিয়ানের শার্টের কলারটা এক আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি… আপনি না একদম মিহুর পাছার মতো সুন্দর!”
আরিয়ান এবার নাক-মুখ কুঁচকে বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল,
“অ্যাহহ!”
আরিয়ান আরও দুই পা সামনে এগিয়ে এল। তৃণার অবাধ্য হাতগুলো তখন আরিয়ানের গলার কাছে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তৃণার শীতল আঙুলের স্পর্শ আরিয়ানের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। আরিয়ান আরও কিছুটা ঝুঁকে এল তৃণার দিকে। চারপাশের সবকিছু যেন এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। আরিয়ান খুব গভীর আর আচ্ছন্ন গলায় হঠাৎ বলে উঠল,
“তৃণা, তুমি কি আমার হবে? সারাজীবনের জন্য শুধুই আমার?”
তৃণা নেশাতুর চোখে মিটমিট করে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে অস্ফুট স্বরে শুধু বলল,
“আমি… আমি…”
তৃণাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না আরিয়ান। মুহূর্তেই তাকে পাঁজাকোলে করে নিজের বলিষ্ঠ বাহুবন্দি করল। অত্যন্ত ধীরস্থির আর কোমলভাবে তাকে বিছানার নরম বালিশে শুইয়ে দিল। তৃণা ফ্যালফ্যাল করে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ানের মনে হচ্ছে, আজ তার সামনে যে মেয়েটা শুয়ে আছে, তার চেয়ে রূপবতী আর মায়াবতী কোনো মানবী বুঝি এই পৃথিবীর বুকে আর জন্ম নেয়নি।
তৃণার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। এক অজানা অনুভূতিতে সে হঠাতই আরিয়ানকে আলতো করে ধাক্কা দিল। কিন্তু তার এই শক্তিহীন দুখানা নরম হাত দিয়ে আরিয়ানের মতো একজন সুঠামদেহী পুরুষকে টলানো সম্ভব ছিল না। আরিয়ান পরম আবেশে তৃণার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তারপর খুব সন্তর্পণে তৃণার স্নিগ্ধ ললাটে নিজের ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করল। সেই অতর্কিত গভীর স্পর্শে তৃণা এক লহমায় কেঁপে উঠল, তার সমস্ত শরীর যেন শিউরে উঠল এক অজানা মাদকতায়।
এখন দুজনের মাঝে এক ইঞ্চি জায়গাও খালি নেই। আরিয়ান তৃণার রেশমি চুলের সুবাসে নিজের মুখ লুকিয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। পুরো ঘরে তখন এক অপার্থিব নীরবতা, যা কেবল দুটি হৃদস্পন্দনের শব্দে মুখরিত।
ঘরের বাতাসও যেন আজ সেই ভালোবাসার ভারে মন্থর হয়ে এল। এক আত্মার সাথে অন্য এক আত্মার মিলনের এই কাহিনি ঘরের দেয়ালে দেয়ালে এক মায়াবী আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে কে জানে, এই পরম মুহূর্তের কাছে আসাই কি ভবিষ্যতে কোনো ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে কিনা?
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১