রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২৭
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
সারাদিনের দীর্ঘ পথচলা শেষে বিকেলের রোদে যখন মিঠে আভা ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখন আরিয়ান আর তৃণা ময়মনসিংহের পৈতৃক বাংলোতে এসে পৌঁছাল। লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে গাছগাছালি ঘেরা এই বাংলোটি বেশ নির্জন, কিন্তু অপূর্ব ছিমছাম। কেউ না থাকলেও বাড়িটি বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্,হয়তো আরিয়ানদের আসার খবর পেয়ে আগেই সব তদারকি করা হয়েছে।
তৃণা খুব ক্লান্ত হয়ে হেলেদুলে হাঁটছে। গাড়িতে দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণের অভ্যাস তার নেই, তার ওপর পথে কয়েকবার বমি করে শরীরটা একদম ছেড়ে দিয়েছে। বাংলোর মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দুজন মানুষ এগিয়ে এলেন। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা, বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। লতিফ চাচা আর জমেলা চাচি এই দম্পতিই বছরের পর বছর ধরে এই বাংলো আগলে রেখেছেন।
লতিফ চাচা হাসিমুখে এগিয়ে এসে আরিয়ানের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিলেন। আরিয়ান আগে বেশ কয়েকবার এখানে এসেছে, তাই তাদের সাথে তার বেশ সখ্য। আরিয়ান মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,
“ভালো আছেন লতিফ চাচা?”
লতিফ চাচা পরম আদরে বললেন,
“হ বাজান, ভালা আছি। তুমি ভালো আছো তো? অনেকদিন পর আসলা।”
“জ্বি চাচা, ভালো।”
জমেলা চাচিও এগিয়ে এসে মায়াবী চোখে তৃণার দিকে তাকালেন। পরম যত্নে তৃণার হাত ধরে কুশল বিনিময় করলেন। তারপর লতিফ চাচার ইশারায় জমেলা চাচি তাদের দুজনকে বেডরুমের দিকে নিয়ে গেলেন।
আরিয়ান আগে আগে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুলতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তাকে এভাবে স্থবির হয়ে থাকতে দেখে তৃণা পাশ থেকে উঁকি দিল এবং সাথে সাথে সে-ও ভীষণ অবাক হলো। পুরো ঘরটা টাটকা ফুলের সুবাসে ম ম করছে। বিছানার ওপর নিখুঁতভাবে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে একটি বড় ‘হার্ট’ চিহ্ন আঁকা, আর তার ঠিক মাঝখানে লাল পাপড়ি দিয়ে আরিয়ান ও তৃণার নাম লেখা।
দৃশ্যটা দেখে আরিয়ানের কপাল কুঁচকে গেল। তার বুঝতে বাকি রইল না যে, এটা তার ছোট চাচ্চুর সেই রোমান্টিক পরিকল্পনারই অংশ। হয়তো লতিফ চাচাকে আগে থেকেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরিয়ানের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল আদনানের কল।
আরিয়ান কলটা রিসিভ করেই গম্ভীর গলায় বলল,
“মাত্রই রুমে ঢুকলাম।”
ওপাশ থেকে আদনানের দুষ্টুমি ভরা হাসি শোনা গেল।
আদনান ওপাশ থেকে বেশ হাসিখুশি গলায় বলল,
“ভাইয়া, রুম সাজানো কেমন হয়েছে? পছন্দ হয়েছে তো? লতিফ চাচাকে ভিডিও কলে রেখে আমি নিজে সবকিছু তদারকি করে সাজিয়েছি। একদম রাজকীয় ব্যাপার, তাই না?”
আরিয়ান মেজাজ গরম করে ধমক দিয়ে বলল,
“এসব ফালতু কাজ করতে তোকে কে বলেছিল, ইডিয়ট? ফোন রাখ এখন!”
আরিয়ান ধমক দিলেও আদনান থামল না,সে ওপাশ থেকে হো হো করে একচোট হেসে নিয়ে কলটা কেটে দিল। আরিয়ান ভাবতেই পারেনি যে এই কাঁচা ফুলের কারসাজির পেছনে ছোট চাচ্চুর পাশাপাশি আদনানেরও হাত থাকতে পারে।
ফোনটা পকেটে রেখে আরিয়ান তৃণার দিকে তাকাল। মেয়েটার চেহারায় স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। টানা কয়েক ঘণ্টা জার্নি করে আসা তার শরীরের জন্য বেশ কষ্টকর হয়েছে, তার ওপর পথে বমি করে সে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরিয়ান নিজেও বেশ ক্লান্ত, তবে সে সেটা মুখে প্রকাশ করতে চাইল না।
আরিয়ান তৃণার অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে বেশ নরম স্বরেই বলল,
“ ওইদিকে মনে হয় ওয়াশরুম। গিয়ে একটা শাওয়ার নিয়ে নাও। তারপর ফ্রেশ হয়ে হালকা কিছু খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো।”
তৃণা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ম্লান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি শাওয়ার নেবেন না?”
“তুমি আগে যাও, তুমি বেশি টায়ার্ড। আমি পরে যাচ্ছি,” আরিয়ান নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল।
তৃণা আর কথা বাড়াল না। লাগেজ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় কাপড় আর একটা সুতি শাড়ি বের করে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
★★★
নৌশি নিজের রুমে জানালার পাশে বসে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে। গানের তালে তালে সে হালকা শরীর দোলাচ্ছে, বাইরের অন্ধকার আকাশটার দিকে তাকিয়ে হয়তো কিছু একটা ভাবছে। হঠাৎ কানের হেডফোনে হ্যাঁচকা টান পড়তেই নৌশি চমকে পেছন ফিরল। দেখল আদনান তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছে।
নৌশি বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এভাবে হাদারামের মতো হাসিস না তো, দেখতে বিশ্রী লাগে।”
আদনান আজ নৌশির কটু কথায় একটুও রাগ করল না, বরং হাসিমুখেই ড্রেসিংটেবিলের সামনের টুলটাতে আয়েশ করে বসল। নৌশির হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই সে একটু বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করল,
“ও হ্যাঁ, তোর সেই পছন্দের মানুষ তার খবর কী? মনের কথা কি জানানো হলো?”
আদনান এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশার ভঙ্গিতে বলল,
“নাহ, এখনো বলিনি। তবে খুব তাড়াতাড়িই বলে দেব। আর শোন, তুই যে ফুলকপির আইডিয়াটা দিয়েছিলি না? ওটাই ফাইনাল করলাম। ওর চেয়ে আনকমন প্রপোজ আর হতেই পারে না। একদম ছক্কা মেরে দেব!”
নৌশি উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটার অদ্ভুত এক অভ্যাস সবসময় শার্টের বোতাম খোলা রাখবে আর ভেতরে একটা টি-শার্ট। আদনানকে দেখতে সত্যিই খুব হ্যান্ডসাম লাগে। মাথার চুলগুলো খুব কায়দা করে ছাঁটা, কয়েকটা অবাধ্য চুল সবসময় ঝুলে এসে ভুরুর ওপর পড়ে থাকে। নৌশি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মেয়েটা কি খুব সুন্দরী?”
আদনান এবার জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তার চোখেমুখে তখন একরাশ মুগ্ধতা। সে আচ্ছন্ন স্বরে বলল,
“হুম, ভীষণ সুন্দর! আমার চোখে তো ও একদম স্বর্গের অপ্সরার মতো। সত্যি বলছি নাদানের বাচ্চা, জীবনে প্রথমবার কোনো মেয়ের প্রতি আমি এতটা টান অনুভব করছি।”
আদনানের গলার সেই আকুলতা শুনে নৌশির বুকের ভেতরটা কেমন জানি খচখচ করে উঠল। সে একটা ম্লান হাসি দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, এবার তুই যা তো। আমাকে পড়তে হবে, আগামীকাল পরীক্ষা আছে।”
আদনানও আর কথা বাড়াল না। তাকেও যে পড়ার টেবিলে বসতে হবে! আদনান রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নৌশি এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার এই দীর্ঘশ্বাসের মানেটা হয়তো তার নিজের কাছেও পরিষ্কার নয়।
★★★
গোধূলির শেষ আভাটুকু মিলিয়ে গিয়ে চারদিকে এখন আবছা আঁধার। আরিয়ান আর তৃণা রাতের খাবার শেষ করে বাংলোর বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। দুজনের হাতে ধোঁয়া ওঠা কফি। এখান থেকে ব্রহ্মপুত্র নদটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নদতীরে মানুষের আনাগোনা, আর নদের বুকে পাল তোলা নৌকার নিঃশব্দ চলাচল সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য। তৃণার সারাদিনের ক্লান্তি যেন এই এক মুহূর্তেই উবে গেল। আগে কখনো তার এই শহরে আসা হয়নি, কিন্তু প্রথম দেখাতেই শহরটা তার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেছে।
শীতের হিমেল হাওয়া এসে তৃণার চুলগুলো বারবার উড়িয়ে দিচ্ছে। তৃণা মুগ্ধ চোখে নদের দিকে তাকিয়ে আরিয়ানকে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু পাশ ফিরে দেখল আরিয়ান সেখানে নেই। সে এতটাই মগ্ন ছিল যে খেয়ালই করেনি আরিয়ান কখন ভেতরে চলে গেছে। তৃণা পিছু ফিরতে যেতেই হঠাৎ শক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেল। চমকে সামনে তাকাতেই দেখল আরিয়ান তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে।
তৃণা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এভাবে হুট করে পেছনে এসে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী?”
আরিয়ান শান্ত স্বরে বলল,
“দাঁড়িয়ে ছিলাম না, রুম থেকে এটা আনতে গিয়েছিলাম। এই নাও।”
আরিয়ান তার হাতে থাকা একটা মোটা শাল তৃণার দিকে বাড়িয়ে ধরল। তৃণা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান আবারও বলল,
“কী অদ্ভুত মেয়ে তুমি! ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে কাঁপছ, অথচ শরীরে পাতলা একটা শাড়ি। নিজের যত্ন নিতে কি ভুলে যাও?”
তৃণা সত্যি অবাক হচ্ছে, এই মানুষটা কি তবে আড়ালে তার খেয়াল রাখছিল? তৃণা কিছু বলার আগেই আরিয়ান নিজের হাতে শালটা তৃণার কাঁধের ওপর জড়িয়ে দিল। তার আঙুলের মৃদু স্পর্শ তৃণার শরীরের কাঁপুনি আরও বাড়িয়ে দিল। আরিয়ান শালটা জড়িয়ে দিয়ে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না, সোজা রুমে চলে গেল।
তৃণার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে বারান্দায় রেলিং ধরে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি আমার নন, তবুও আপনার প্রতি এত মোহ কেন জন্ম নিচ্ছে রাগি সাহেব? কেন আপনাকে বারবার আপন করে পেতে ইচ্ছে করছে?”
খানিকক্ষণ পর তৃণা রুমে ফিরে দেখল আরিয়ান বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সে আরিয়ানের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে বিছানার এক কোণে বসল। আরিয়ান তখনো মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে কী যেন দেখে যাচ্ছে। ঘরভর্তি গোলাপের ঘ্রাণে পরিবেশটা এখন ভারী হয়ে আছে। তৃণা সহসা নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি? যদি কখনো আপনার সেই ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে না পান, তখন আপনি কী করবেন?”
তৃণার প্রশ্নে আরিয়ানের মোবাইল চালানো থেমে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে একবার তৃণার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন হাজারটা না বলা কথা খেলা করছে।
আরিয়ান তৃণার দিকে অবাক নয়নে তাকাল। তার চোখের গভীরে এক বিশাল শূন্যতা। সে বেশ নিচু স্বরে, অনেকটা নিজের মনেই বলল,
“জানি না। তবে তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা নিতান্তই তুচ্ছ। আমার মন বলে, তাকে হয়তো আমি আর কোনোদিন খুঁজে পাবো না।”
তৃণা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর অনেকটা জেদের বশেই অবাক স্বরে বলল,
“জানেনই যেহেতু পাবেন না, তাহলে এখনো হৃদয়ে এভাবে তালা দিয়ে রাখার মানে কী রাগি সাহেব? একটা মরিচিকার পেছনে ছুটে কেন নিজের জীবনটা নষ্ট করছেন? ভুলে যান না তাকে।”
তৃণার কথাগুলো শেষ হতে না হতেই আরিয়ানের চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। তার নাক-মুখ শক্ত হয়ে আসতে লাগল, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তৃণা আজ ইচ্ছে করেই আগুনের ওপর ঘি ঢালছে। সে দেখতে চায়, আরিয়ান কি কেবল ওই রহস্যময়ী মেয়ের কথা শুনলেই এতটা উত্তেজিত হয়, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে।
তৃণা নিজেকে থামাল না। সে আবারও ধারালো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি মেয়েটাকে মনে মনে ঘৃণা করেন? হয়তো সে আপনাকে পাত্তা দেয়নি বলেই আপনার এই পাগলপন!”
আরিয়ান এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে তৃণার দিকে আগুনের মতো চোখ তুলে তাকাল। ভীষণ রাগী আর গম্ভীর স্বরে চিৎকার করে বলল,
“ঘৃণা? তাকে ঘৃণা কেন করব আমি? কোন সাহসে তুমি এই শব্দটা উচ্চারণ করলে?”
আরিয়ান দ্রুত আর জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করল। রাগে তার বুক ওঠা-নামা করছে। তৃণা শান্তভাবে আরিয়ানের এই রুদ্রমূর্তি দেখছে। সে ঠিক এটাই চেয়েছিল আরিয়ানকে উসকে দিয়ে তার মনের ভেতরের আসল তোলপাড়টা সামনে আনতে।
তৃণা জানত, আরিয়ানকে সুস্থ করতে হলে তাকে এই আগুনের ওপর দিয়েই হাঁটতে হবে। আরিয়ানের এই অস্বাভাবিক আচরণের কারণ খুঁজতে সে কিছুদিন আগে তার বাবা উমর হাওলাদারের সাথে কথা বলেছিল। উমর হাওলাদার একজন অভিজ্ঞ মানুষ, তিনি তৃণার বর্ণনা শুনে বেশ গম্ভীর হয়েই বলেছিলেন,
“মা তৃণা, তোর কথা অনুযায়ী আরিয়ানের সমস্যাটা আমার কাছে Intermittent Explosive Disorder (IED) বা মাঝেমধ্যে বিস্ফোরক ব্যাধি বলে মনে হচ্ছে। এটি একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি, যেখানে মানুষ হঠাৎ করেই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কোনো ছোটখাটো বিষয় বা সামান্য উত্তেজনাতেই সে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো নিজের আবেগকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে,
অতীতের ট্রমা,ছোটবেলায় কোনো সহিংসতা দেখা বা নিজে মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া।
রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতামস্তিষ্কের সেরোটোনিনের মতো উপাদানের তারতম্য।
আচ্ছন্নতা (Obsession),সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, কোনো একটি কল্পনা বা ঘটনাকে মস্তিষ্কে গভীরভাবে গেঁথে ফেলা। সারাক্ষণ সেই বিষয়ে ভাবতে ভাবতে মানুষটি বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানের রেখাটা হারিয়ে ফেলে।
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে এখন ঠিক সেই কল্পনা করা অবস্থায় চলে গেছে। আরিয়ানের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ।
তৃণা জানত সে আগুনের সাথে খেলছে, কিন্তু আরিয়ানের এই রোগটা গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে হলে তাকে আজ চরম পরীক্ষা দিতেই হবে। উমর হাওলাদারের কথাগুলো তৃণার কানে বাজছে আরিয়ান এখন আর বাস্তবে নেই, সে তার অবচেতন মনের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়ে গেছে।
তৃণা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব কঠোর আর বিদ্রূপাত্মক করে তুলল। সে আরিয়ানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“আপনার কি মাথায় সমস্যা আছে? মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা একটা মেয়ের জন্য আপনি এভাবে পাগলামো করছেন? লজ্জা করে না আপনার? আপনার উচিত সেসব আবর্জনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া!”
আরিয়ানের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। সে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার দৃষ্টি সেখানে নেই। তার কপালে রগগুলো ফুলে উঠছে, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। তৃণা বুঝতে পারল আরিয়ান এখন একটা ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা তীব্র আগ্রাসনের পর্যায়ে চলে গেছে।
তৃণা নিজের ভয়কে লুকিয়ে শেষ চালটা চালল। সে আরিয়ানের আরও কাছে গিয়ে বলল,
“আপনার উচিত আমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেওয়া। আজ থেকে আমি আপনার কাছে পূর্ণ অধিকার চাই। ওই কাল্পনিক মেয়েটার ভূত মাথা থেকে নামিয়ে আমাকে সময় দিন!”
তৃণার কথা শেষ হতে না হতেই বাজ পড়ার মতো ঘটনা ঘটল। আরিয়ান ক্ষিপ্র গতিতে তৃণার গলা চেপে ধরল। তার হাতের বাঁধন এতটাই শক্ত যে তৃণা এক মুহূর্তের জন্য চোখে অন্ধকার দেখল। অক্সিজেনের অভাবে তার মুখ নীল হয়ে আসছে, কিন্তু আরিয়ানের চোখে কোনো মায়া নেই সেখানে শুধু এক আদিম হিংস্রতা।
তৃণা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আরিয়ানের হাত সরিয়ে দিয়ে দূরে ছিটকে পড়ল। সে কাশতে কাশতে হাঁপাতে লাগল। দম ফিরে পেয়েও সে হাল ছাড়ল না। নিজেকে সামলে নিয়ে চিৎকার করে বলল,
“এভাবে খুনি হওয়ার অভিনয় করবেন না! আপনি কি নিজেকে খুব শক্তিশালী ভাবছেন?”
আরিয়ান এবার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো দিয়ে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে। সে উন্মাদের মতো তেড়ে এসে তৃণার দুই বাহু খামচে ধরল। তার নখের চাপে তৃণার নরম চামড়া দেবে যাচ্ছে। আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠে বলল,
“কে তুই? কেন এসেছিস এখানে? কেন আমার স্মৃতিগুলো নষ্ট করতে চাস? কে পাঠিয়েছে তোকে?”
তৃণা যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু পরক্ষণেই চোখের পানি আড়াল করে পাথরের মতো শক্ত গলায় জবাব দিল,
“আমি আপনার স্ত্রী! আমি আপনার বৈধ অর্ধাঙ্গিনী তৃণা! আপনি চাইলেও এই সত্য অস্বীকার করতে পারবেন না!”
আরিয়ানের চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্তি দেখা দিল, কিন্তু পরক্ষণেই সে আরও জোরে তৃণার বাহু ঝাঁকিয়ে ধরল।
আরিয়ানের উন্মাদনা এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। ঘরের ফুলদানি, কাঁচের গ্লাস যা হাতে পেল সব আছড়ে ভাঙতে শুরু করল সে। পুরো ঘর মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। তৃণা বুঝতে পারল, পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই পরীক্ষা নেওয়াটা কি তার ভুল ছিল?
আরিয়ানকে পেছন থেকে টেনে ধরার চেষ্টা করতেই সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দানবীয় শক্তিতে তৃণাকে দেওয়ালে চেপে ধরল। এক হাতে তৃণার চোয়াল এমনভাবে পিষে ধরল যে, তৃণার গালের ভেতরের নরম চামড়া দাঁতের চাপে কেটে গেল। নোনা রক্তের স্বাদ জিভে লাগতেই তৃণা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। সর্বশক্তি দিয়ে আরিয়ানকে একটা ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সে। আরিয়ান ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
তৃণার মুখ দিয়ে তখন গলগল করে রক্ত পড়ছে, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কিন্তু সে দমে গেল না। সে জানত আইইডিতে (IED) আক্রান্ত রোগী কতটা হিংস্র হতে পারে, তাই আগে থেকেই ড্রয়ারে ঘুমের ইনজেকশন প্রস্তুত করে রেখেছিল। টলমলে পায়ে ড্রয়ার থেকে ইনজেকশনটা বের করে সে দ্রুত আরিয়ানের শরীরে পুশ করে দিল।
ওষুধের প্রভাবে আরিয়ানের শরীরটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল, কিন্তু তার চোখ দুটো তখনো স্থির। তৃণা হাঁটু গেঁড়ে আরিয়ানের সামনে বসে পড়ল। তার নিজের ঠোঁট কাটা, রক্ত ঝরছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে কাঁপাকাঁপা হাতে আরিয়ানের মুখটা ছুঁয়ে করুণ স্বরে বলল,
“কষ্ট হচ্ছে কি আপনার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমায় বলুন প্লিজ… আমায় মারুন কিন্তু চুপ থাকবেন না।”
আরিয়ানের চোখের সেই হিংস্রতা এখন এক অদ্ভুত বিষাদে রূপ নিয়েছে। তার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এল। সে তৃণার রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, যেন সে চিনতে পারছে এই মেয়েটি কে। হঠাৎ সব শক্তি হারিয়ে আরিয়ান আছড়ে পড়ল তৃণার কাঁধে। দুহাতে তৃণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে, যেন এক অসহায় শিশু তার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।
ভাঙা কন্ঠে আরিয়ান ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“খুব কষ্ট হচ্ছে আমার… তৃণা! মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলছে, অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। আমায় বাঁচাও… আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।”
আরিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস তৃণার কাঁধে আছড়ে পড়ছে। লোকটার শরীরের উত্তাপ যেন তৃণার নিজের ভেতর অব্দি কাঁপিয়ে দিল। তৃণা আর কোনো দ্বিধা করল না, সবটুকু মমতা দিয়ে আরিয়ানকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। এই প্রথম আরিয়ানের জন্য তার মনে অধিকারের চেয়েও বেশি মায়া জন্মাল। সে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করল, “কিচ্ছু হবে না আপনার, আমি আছি তো।”
চলবে…
(খুব তাড়াতাড়ি সেই পাহাড়ি মেয়েটার সন্ধান বের হবে।সেই পর্যন্ত ধৈর্য ধরুন।পর্বটা হয়তো সুন্দর কর সাজাতে পারিনি।ব্যস্ততায় আছি খুব।কিন্তু যেহুতু কথা দিয়েছিলাম আজ পর্বটা দিব তাই লিখতেই হলো।ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭