রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২৫
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
সকালের স্নিগ্ধ রোদে আরিয়ানের ঘুম ভাঙল। জানালার ধূসর রঙের পর্দা ভেদ করে এক চিলতে রোদ এসে সরাসরি তার চোখের ওপর পড়েছে। আরিয়ান কপাল কুঁচকে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ কচলে সামনে তাকাতেই তার দৃষ্টি থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস-প্রশ্বাস যেন স্তব্ধ হয়ে এল।
পাশে তৃণা শুয়ে আছে, মুখটা আরিয়ানের দিকেই ফেরানো। ভোরের নরম আলোর আভা তার শ্যামলা চেহারায় এক অপার্থিব মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে। তৃণা এক হাত মাথার নিচে দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অবাধ্য কিছু চুল গালের ওপর আর কপালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আরিয়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল,তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। ঘুমের ঘোরে তৃণা মাঝে মাঝে ছোট বাচ্চার মতো ঠোঁট নাড়াচ্ছ , নিস্পাপ, নির্ভেজাল এক সৌন্দর্য। আরিয়ান হাত বাড়াল তৃণার মুখের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে, কিন্তু আঙুল ছোঁয়ার আগেই হঠাৎ কী ভেবে সে থমকে গেল।
মুহূর্তেই তার মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। আরিয়ান দ্রুত বিছানা থেকে নেমে নিচে পা ঝুলিয়ে বসে রইল। নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে নিজেকেই ধমক দিল সে ‘কেন আমি এতটা বাড়াবাড়ি করছি? তৃণার জায়গায় আমার পরিবারের অন্য কেউ থাকলেও তো আমি ঠিক একই ভাবে তার সেবা করতাম। এটা নিছক দায়িত্ববোধ ছাড়া আর কিছু নয়।’
হঠাৎ পেছনে নড়াচড়ার শব্দে আরিয়ান ফিরে দেখল তৃণা উঠে বসছে। মেয়েটা কপাল কুঁচকে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, সম্ভবত পিঠের পোড়া ক্ষতটা সকালে আবারও জানান দিচ্ছে। আরিয়ান স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“গুড মর্নিং।”
তৃণা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে উত্তর দিল,
“শুভ সকাল।”
আরিয়ান উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ফিরে এল। দেখল তৃণা তখনও স্থির হয়ে বিছানায় বসে আছে। আরিয়ান বলল, “বসে থেকো না, ফ্রেশ হয়ে এসো।”
তৃণা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বেলা দশটা বেজে গেছে। গতকাল রাতের অসহ্য যন্ত্রণা আর মানসিক ধকলের পর শেষ রাতের দিকে একটু ঘুম এসেছিল। সে কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
এদিকে আরিয়ান ড্রয়ার থেকে ফাস্ট এইড বক্সটা বের করল। ডাক্তার যে মলমগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো হাতে নিয়ে খুব মন দিয়ে ব্যবহারের নিয়মগুলো দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর তৃণা বেরিয়ে এল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলেও তার কপালের দুপাশে থাকা ছোট ছোট ভিজে চুলগুলো মুখের সাথে লেপ্টে আছে। জলের ছোঁয়ায় তার মুখটা এখন আরও সতেজ আর করুণ দেখাচ্ছে। আরিয়ান মলমটা হাতে নিয়ে তৃণার দিকে তাকাল।
আরিয়ান মলমটা হাতে নিয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এদিকে এসে আমার সামনে বসো।”
তৃণা হুট করে আরিয়ানের এমন আদেশে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
আরিয়ান মলমের টিউবটা খুলতে খুলতে নির্লিপ্তভাবে বলল,
“ক্ষত জায়গাটায় মলম লাগিয়ে দিতে হবে।”
মলম লাগানোর কথা শুনতেই তৃণার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। গতকাল ক্লিনিকে ডক্টরের হাতে পাওয়া সেই অসহ্য যন্ত্রণার স্মৃতি মনে পড়তেই সে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“অসম্ভব! আমার পিঠে এখন আর কোনো ব্যথা নেই, তাই মলম দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। আমি ঠিক আছি।”
আরিয়ান এবার গলার স্বর কিছুটা শক্ত করল। ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি কি সব বিষয়ে একটু বেশি বোঝো? আমি যা বলেছি ঠিক সেটুকুই করো। চুপচাপ আমার সামনে এসে বসো।”
তৃণা মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনাল, ‘লুচ্চা বেটা একটা! যত সব সুযোগ সন্ধানী কাজ। সুযোগ পেয়েই পিঠে হাত দেওয়ার জন্য রঙডং শুরু করে দিয়েছে।’
আরিয়ান যেন তৃণার মনের কথা টের পেয়ে গেল। সে তৃণার দিকে না তাকিয়েই ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমি শুধু মলমটা লাগিয়ে দিব। তোমার পিঠে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার কোনো বিচ্ছিরি ইচ্ছে আমার নেই, নিশ্চিন্ত থাকো।”
তৃণা এবার বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকাল। লোকটা কি অন্তর্যামী? সে অবলীলায় জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
“আপনি কি মানুষের মনের কথা শুনতে পান নাকি?”
আরিয়ান এবার মুখ শক্ত করে তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল, “কেন? আমাকে কি মনে মনে খুব কড়া ভাষায় বকা দিচ্ছিলে?”
তৃণা লজ্জায় আর কোনো উত্তর দিল না। আরিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে তৃণার হাত ধরে একরকম জেদ করেই তাকে বিছানায় বসাল। তৃণা এবার আর বাধা দিল না, মাথা নিচু করে বসে রইল। আরিয়ান আঙুলে কিছুটা মলম নিয়ে তৃণার পিঠ থেকে আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিল। ভোরের ম্লান আলোয় তৃণার শ্যামলা বরণের কোমল পিঠটা দৃশ্যমান হলো, যার ওপর লালচে পোড়া ক্ষতটা বিষম দেখাচ্ছে।
আরিয়ান কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে অত্যন্ত সাবধানে আর আলতো ছোঁয়ায় ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিতে শুরু করল। শীতল মলমের ছোঁয়ায় প্রথম দিকে তৃণার শরীরটা একটু কেঁপে উঠলেও পরক্ষণেই চিনচিনে একটা ব্যথা শুরু হলো। মেয়েটা আজ একটা শব্দও করল না, শুধু ব্যথার ঝটকায় বারবার বিছানার চাদরটা মুঠোর ভেতর চেপে ধরছিল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে সে দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করার চেষ্টা করছিল।
আরিয়ান ড্রেসিং করার সময় একবার তৃণার কুঁকড়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। তার স্পর্শে যতটা সম্ভব মমতা মিশিয়ে সে মলম লাগানো শেষ করল। কাজ শেষ হতেই তৃণা এক মুহূর্ত আর সেখানে বসল না। দ্রুত নিজের শাড়ির আঁচল ঠিক করে কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে চলে গেল। তার বুকের ভেতরটা তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল ব্যথায় নাকি আরিয়ানের সেই মায়াবী স্পর্শে, সেটা সে নিজেই বুঝতে পারল না।
★★★
সোফায় গুমোট মুখে বসে আছে রৌশনারা বেগম আর রিনি। তাদের ঠিক পাশেই কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে বসে আছেন রৌশনারা বেগমের ভাই খলিল। গতকাল উমর হাওলাদার বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর তারা খলিলের বাড়িতেই এসে উঠেছে। খলিলের স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগে, এখন এই বাড়িতে সে আর তার ছেলে তৌহিদ থাকে।
রিনি তার ফুলে থাকা গালটা একবার স্পর্শ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করল,
“মাম্মি, এখন আমাদের কী হবে? তুমি কি গিয়ে ড্যাডির নামে মামলা করবে?”
মেয়ের কথায় রৌশনারা বেগম যেন বিরক্ত হলেন। তিনি ঠাণ্ডা কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
“মামলা করে লাভ কী শুনি? উমরের যে পরিমাণ টাকা আর প্রভাব আছে, ও চাইলে এক দিনেই মামলা ফানুস করে উড়িয়ে দিতে পারবে। এত বছর তো শুধু এই মামলার ভয় দেখিয়েই ওকে হাত করে রেখেছিলাম। এখন আর ওসব কাজে দেবে না।”
খলিল এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন, এবার নড়েচড়ে বসে বললেন,
“তাহলে এখন কী করবি রৌশনারা? তোরা কি সারা জীবন আমার এখানেই পড়ে থাকবি?”
রৌশনারা বেগম এবার কুটিল এক হাসি হাসলেন। তার চোখের মণি দুটো যেন হিংস্রতায় চিকচিক করে উঠল। তিনি বললেন,
“চিন্তা নেই ভাইজান। উমর হাওলাদার নিজেকে খুব চালাক ভাবে, কিন্তু ও জানে না যে ঘুমের ঘোরেই আমি ওর আঙুলের ছাপ একটা সাদা কাগজে নিয়ে রেখেছি অনেক আগে।”
মায়ের মুখে এই মোক্ষম চালের কথা শুনে রিনির মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল, “হাউ জিনিয়াস মাম্মি! তোমার সত্যিই কোনো জবাব নেই। আমি তো ভেবেছিলাম আমরা সব হারালাম।”
রৌশনারা বেগম এবার দাঁতে দাঁত চেপে আক্রোশ নিয়ে বললেন, “এবার সব কিছু আমার হবে। বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা সব। আর উমর গিয়ে বসবে একদম রাস্তার মাঝখানে। ওই হাওলাদার বাড়ি থেকে আমি ওকে ছুঁড়ে ফেলব।”
এতক্ষণ খলিলও খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি নিচু স্বরে বললেন, “সব মানে? রৌশনারা, তুই কি আসল কথাটা ভুলে যাচ্ছিস?তোর একার সব মানে কি?”
রৌশনারা বেগম এবার রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন। শান্ত গলায় বললেন,
“না ভাইজান, কিছুই ভুলিনি। তবে আগে যে প্ল্যানটা করেছিলাম, এখন আর সেটার প্রয়োজন নেই। সময় আসুক, প্রয়োজন পড়লে ওসব নিয়ে নতুন করে ভাবা যাবে।”
তাদের কুটিল আলোচনায় ঘরের পরিবেশ যেন আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল।
★★★
তৃণা সিঁড়ি বেয়ে খুব সাবধানে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে মায়মুনা বেগম, রাহি বেগম, ফারহানা আর মিতু বসে পারিবারিক আলাপ করছিলেন। তৃণাকে দেখেই মিতু ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল। মমতাভরা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ব্যাথাটা কি একটু কমেছে?”
তৃণা ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিল, “হ্যাঁ ভাবি, একটু কমেছে।”
মিতু তৃণার হাত ধরে বলল, “আচ্ছা যাক, এবার চলো তো। তুমহ গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসো, আমি তোমার খাবার নিয়ে আসছি।”
ঠিক সেই সময় আরিয়ানও নিচে নেমে এল। সে কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে ডাইনিং চেয়ারে বসল। মিতু খাবার আনতে উদ্যত হতেই তৃণা তাকে বাধা দিয়ে বলল,
“না ভাবি, আমি এখন খাব না। পরে খেয়ে নেব না হয়।”
মিতু অবাক হয়ে বলল, “কী বলছো? খাবে না মানে? বাড়ির সবার খাওয়া হয়ে গেছে, শুধু তুমি আর আরিয়ানই বাকি।”
তৃণা নিজের অস্বস্তি লুকাতে চেয়ে আবারও বলল,
“প্লিজ ভাবি, এখন ইচ্ছে করছে না। পরে খাব।”
হঠাৎ পেছন থেকে মায়মুনা বেগমের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“খাবে না মানে কী? এমনিতেই অসুস্থ শরীর, এখন না খেয়ে ঢং করলে কি পরে বাড়ির সবাই মিলে তোমাকে সামলাবে? বাড়ির ওপর চিন্তা বাড়ানো কি তোমার কাজ?”
তৃণা থতমত খেয়ে মায়মুনা বেগমের দিকে ফিরল। লোকজনের সামনে এমন কথায় সে আরও সংকুচিত হয়ে গেল। আবারও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে। মায়মুনা বেগম মিতুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“মিতু, দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও গিয়ে খাবার নিয়ে এসো।”
তৃণা আবারও মিতুকে বারণ করতে চাইল, কিন্তু এবার মায়মুনা বেগম বেশ চড়া গলায় বলে উঠলেন,
“একদম চুপ করো! বড়রা যখন বলছে, তখন মুখে মুখে কথা বলছ কেন? তুমি তো দেখছি ভীষণ অভদ্র একটা মেয়ে!”
তৃণার বুকের ভেতরটা অভিমানে ভেঙে এল। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল। দূর থেকে মরিয়ম বেগম দৃশ্যটা লক্ষ্য করলেন এবং মনে মনে ভীষণ হতাশ হলেন। মিতু আরিয়ানের সামনে খাবার সাজিয়ে দিল, তৃণা কোনো উপায় না পেয়ে আরিয়ানের পাশের চেয়ারটাতে গিয়ে বসল।
তৃণা থালার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মুখে খাবার তোলার মতো শক্তি নেই। হঠাৎ সে টের পেল, তার ঠিক পাশের চেয়ারটা টেনে কেউ একজন বসল। তাকিয়ে দেখল স্বয়ং মায়মুনা বেগম সেখানে বসেছেন। ড্রয়িংরুমের বাকি সবাই রাহি, ফারহানা বেগমও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
মায়মুনা বেগম কোনো ভণিতা না করে নিজের হাতে খাবারটা খুব ভালো করে মাখিয়ে নিলেন। তারপর এক গ্রাস ভাত তৃণার মুখের সামনে ধরে শান্ত গলায় বললেন,
“হাঁ করো।”
তৃণা যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে মহিলাটি তাকে বাড়ির আপদ মনে করতেন, যে তাকে দুচোখে দেখতে পারতেন না, তিনি আজ নিজে হাতে তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন! আরিয়ানও খাবার থামিয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরো ডাইনিং রুমে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল, শুধু তৃণার টলমলে চোখে অবিশ্বাসের ঘোর লেগে রইল।
বাড়ির প্রত্যেকের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে তৃণা আর মায়মুনা বেগমের দিকে। তৃণা যেন এক ঘোরের মধ্যে আছে, সে এখনো হাঁ করে তাকিয়ে আছে মায়মুনা বেগমের দিকে। তাকে এভাবে পাথরের মতো বসে থাকতে দেখে মায়মুনা বেগম আবারও মৃদু ধমক দিয়ে বললেন
, “কী সমস্যা? হাঁ করো।”
তৃণা যন্ত্রচালিতের মতো হাঁ করল। মায়মুনা বেগম পরম মমতায় প্রথম গ্রাস খাবারটুকু তৃণার মুখে পুরে দিলেন। তৃণা মুখের খাবারটুকু নিয়ে নিথর হয়ে বসে রইল। তার ঝাপসা চোখের সামনে মায়মুনা বেগমের বদলে নিজের মা মেহেরজানের মুখটা ভেসে উঠছে। এতদিন তৃণা শত চেষ্টা করেও মায়ের মুখটা স্পষ্ট মনে করতে পারত না, কেমন যেন ধোঁয়াশা লাগত। কিন্তু আজ এই পরম আদরের ছোঁয়ায় হাজার বছরের সেই ঝাপসা পর্দাটা যেন সরে গেল, সে তার মায়ের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল।
তৃণার চোখের কোণে জল টলমল করছে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নার জন্য সে মুখের খাবারটুকু চিবোতে পারছে না। মায়মুনা বেগম আবারও তাগাদা দিলেন,
“কী হলো? খাচ্ছ না কেন? খাবার কি ভালো লাগেনি?”
তৃণা কোনোমতে নিজের চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করে খাবারটুকু চিবিয়ে গিলে নিল। কতগুলো বছর ধরে একটা লোকমা আদরের ভাতের জন্য এই মেয়েটা হাহাকার করেছে! কত রাত সে না খেয়ে শুয়েছে, উল্টো কপালে জুটেছে সৎ মায়ের নিষ্ঠুর মার। অথচ আজ যা ঘটছে, তা ছিল তার কল্পনারও অতীত। তৃণার চোখ বেয়ে এবার টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তে দেখে মায়মুনা বেগম নিজের আঁচল দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিলেন। খুব নরম স্বরে বললেন,
“পাগলি মেয়ে! সামান্য এইটুকুর জন্য এভাবে কাঁদছে কেন?”
তৃণা তখন কোনো কথা বলার অবস্থায় ছিল না, তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছিল অপার্থিব এক সুখে। পাশে বসে থাকা আরিয়ান এই আবেগঘন পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্য কিছুটা রসিকতার স্বরে বলে উঠল,
“কী ব্যাপার আম্মু! কতদিন হয়ে গেল আমাকে তো এভাবে খাইয়ে দিলে না! আমি কি পর হয়ে গেলাম?”
মায়মুনা বেগম ছেলের কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠলেন। তার সেই হাসিতে ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা নিমিষেই কেটে গেল। তিনি আবারও এক লোকমা ভাত মেখে হাসিমুখে আরিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“নে খা, হিংসুটে ছেলে একটা!”
আরিয়ান তৃপ্তির সাথে মায়ের হাতের লোকমাটা মুখে তুলে নিল। পুরো পরিবারটি আজ এক নতুন সকালেই যেন পা রাখল, যেখানে দীর্ঘদিনের ঘৃণা আর অবিশ্বাসের বরফ গলতে শুরু করেছে।
★★★
তৃণা খাবার খাওয়ার পর অনেকটা সময় ড্রয়িংরুমের সোফায় মায়মুনা বেগমের কাছাকাছি বসে কাটাল। তার বারবার মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা যেন কোনো এক সুন্দর স্বপ্ন। এই বাড়িতে আসার পর যে মায়মুনা বেগমের থেকে সে কেবল অবহেলা আর ঘৃণা পেয়েছে, সেই মানুষটার এই মমতাময়ী রূপ তৃণার ভাবনারও অতীত ছিল।
কিন্তু সুখের মুহূর্তগুলো বোধহয় তৃণার জীবনে খুব একটা স্থায়ী হতে চায় না। হঠাৎ তার মনে পড়ল মিহুর কথা। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে মিহুকে খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে সারাটা সময় মিহু তার পিছু পিছু ঘোরে। কখনও তার কোলের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু আজ সকাল থেকে একবারও সেই ছোট্ট প্রাণীটার ডাক শোনেনি সে।
কথাটা মাথায় আসতেই তৃণার বুকের ভেতরটা অজানা এক আশঙ্কায় ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে চটজলদি সোফা ছেড়ে উপরে নিজের রুমের দিকে দৌড় দিল। ঘরে ঢুকে দেখল মিহু কোথাও নেই। বিছানার নিচে, আলমারির আড়ালে এমনকি ব্যালকনিতেও খুঁজল কোথাও নেই! তৃণা পুরো বাড়ি একপ্রকার তোলপাড় করে ফেলল, কিন্তু মিহুর কোনো হদিস মিলল না।
তৃণার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। তার মনে হতে লাগল, সারাজীবন তার সাথে এটাই হয়ে আসছে একদিক দিয়ে কোনো বড় সুখ এলে অন্য দিক দিয়ে প্রিয় কিছু হারিয়ে যায়। হঠাৎ তার মনে হলো, মিহু কি ছাদে চলে গেল? যদিও ছাদের দরজা বন্ধ থাকে, তবুও এক ক্ষীণ আশা নিয়ে সে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
নিজের পিঠের সেই যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের কথা এই মুহূর্তে সে একদম ভুলে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে উঠেছে মেয়েটা। ছাদের দরজার কাছে গিয়ে দেখল সেটা খোলাই আছে। তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছাদে পা রাখতেই তার চোখের সামনে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য ফুটে উঠল।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে আরিয়ান ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে হালকা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট। আর তার হাতের বেড়ের মধ্যে পরম শান্তিতে শুয়ে আছে ছোট্ট মিহু। আরিয়ান খুব আদরে মিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর মিহু চোখ বন্ধ করে সেই আদর উপভোগ করছে।
তৃণার বিষণ্ন মুখে মুহূর্তেই এক উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। তার সব ভয়, সব দুশ্চিন্তা নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। যে আরিয়ানকে সে এতদিন কেবল এক রাগী আর গম্ভীর মানুষ হিসেবেই চিনেছে, তার এই কোমল আর মায়াবী রূপটা তৃণার হৃদয়ে এক নতুন দোলা দিয়ে গেল।
তৃণা গুটিগুটি পায়ে আরিয়ানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আরিয়ান ওকে দেখে একটু অবাক হয়ে বলল,
“এখানে তুমি?”
তৃণা অভিমানের সুরে বলল,
“পুরো বাড়ি মিহুকে খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান! আর আপনি ওকে এখানে নিয়ে এসে বসে আছেন? কেন নিয়ে আসলেন?”
প্রশ্নটা করেই তৃণা নিজেই নিজের মনে একটা ভয়ানক উত্তর সাজিয়ে ফেলল। সে চোখ কপালে তুলে আঁতকে উঠে বলল,
“ও আচ্ছা! তার মানে আপনি মিহুকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার প্ল্যান করে এখানে নিয়ে এসেছেন বুঝি?”
আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“কী বললে তুমি? আমাকে দেখে কি খু’নি মনে হয় নাকি? এসব আজগুবি কথা তোমার মাথায় ঢোকে কী করে?”
তৃণা আর তর্কে না গিয়ে এক ঝটকায় আরিয়ানের কোল থেকে মিহুকে ছিনিয়ে নিল। মিহুকে জাপটে ধরে আদর করতে করতে ফিসফিস করে বলল,
“মিহু সোনা, ওই রাগী সাহেব তোকে বকেনি তো?”
আরিয়ান রাগী চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। তৃণা আবার বলল,
“নিশ্চয়ই সকাল থেকে আমার মিহু কিচ্ছু খায়নি।”
আরিয়ান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে অলস ভঙ্গিতে বলল,
“আমি খাইয়ে দিয়েছি।”
তৃণা এবার সত্যিই অবাক হলো। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তৃণা আর মিহুর দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,
“এই মেয়ে, আমি না তোমাকে বলেছি মিহুকে এভাবে এত চেপে ধরবে না?”
তৃণা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন? কী হয়েছে?”
আরিয়ান মুখটা অন্য পাশে ফিরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“তোমাকে অন্য একটা মেয়ে বিড়াল কিনে এনে দেব। তবুও ওকে নিয়ে এভাবে এত আদিখ্যেতা করার প্রয়োজন নেই।”
তৃণা বেশ তেজ নিয়ে বলল,
“এহ্, আসছে! এটাই আমার প্রিয়, অন্য কোনো বিড়াল লাগবে না। আর এটা বিড়াল না, এটা আমার সন্তান।”
আরিয়ান নাক-মুখ কুঁচকে তৃণার দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর মুখে বলল,
“সন্তানই যদি হয়, তবে সব মা-বাবার উচিত সন্তানের সঠিক বয়সে বিয়ে দেওয়া। সেই হিসেবে মিহুরও এখন বিয়ে দেওয়া উচিত।”
তৃণা কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে মাথা নাড়ল। তারপর বলল,
“হ্যাঁ, কথাটা কিন্তু মন্দ বলেননি। কিন্তু আমি যদি মিহুর মা হই, তবে মিহুর বাবা কে?”
“অবশ্যই আমি!”
কথাটা আরিয়ান এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল। কিন্তু বলার সাথে সাথেই তার হুশ ফিরল যে সে আসলে কী বলে ফেলেছে! আরিয়ান একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কেউ ওকে জ্যান্ত পাথর বানিয়ে দিয়েছে। তৃণা আরিয়ানের এই সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে আর আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাতে পারল না।
দ্রুত পা চালিয়ে ছাদ থেকে নামতে নামতে সে মিহুকে খুব গম্ভীর হয়ে বোঝাতে লাগল,
“খবরদার মিহু! ওই রাগী সাহেবের কাছে আর যাবি না। দেখলি তো, লোকটা কত বড় বদ! কত আজেবাজে কথা বলে!”
আরিয়ান ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিজের ওপর ভীষণ রেগে যাচ্ছে। সে ভাবছে, ছি ছি! নিজের মুখকে একটুও লাগাম দিতে পারি না আমি? কী বলতে কী বলে ফেললাম!
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫