রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২৩
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
প্রতিদিনের সেই পরিচিত মোড়টিতে নির্জন আজও দাঁড়িয়ে আছে। নির্জনতা আর মিষ্টি রোদে মাখামাখি এই রাস্তায় নুসরাতকে আসতে দেখে সে কয়েক পা এগিয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ নুসরাতের চোখেমুখে কোনো বিরক্তির রেশ নেই, বরং নির্জনকে দেখে তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চিকন হাসি ফুটে উঠল।
নির্জন অভ্যাসবশত নুসরাতের সামনে কিছুটা ঝুঁকে, দুই হাত পেছনের দিকে বেঁধে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
“কেমন আছেন চশমাওয়ালি ম্যাডাম?”
নুসরাত মুচকি হেসে চশমার ফ্রেমটা নাকে ঠিক করে নিয়ে বলল,
“হুম, অনেক ভালো। তা আপনার কী খবর বাদামওয়ালা? আজ যে আপনার ঝুড়িতে বাদামের দর্শন পাওয়া যাচ্ছে না?”
নির্জন স্মিত হেসে উত্তর দিল,
“প্রতিদিন কি আর বাদামের ব্যবসা করতে ভালো লাগে বলুন? মাঝে মাঝে শুধু মানুষ দেখতেও ভালো লাগে।”
নুসরাত আর কথা বাড়াল না, শুধু মৃদু হাসল। দুজনে এবার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। বিকেলের নরম বাতাস বয়ে যাচ্ছে তাদের ছুঁয়ে। নুসরাতকে আজ বড় স্নিগ্ধ লাগছে,পরনে তার সাদা রঙের ঘেরওয়ালা জামা, ওড়নাটা সযত্নে কাঁধে জড়ানো। বাতাসের অবাধ্য ঝাপটায় তার কয়েক গাছি চুল কপালে এসে নাচছে। নির্জন আড়চোখে নুসরাতের এই পবিত্র রূপের দিকে চেয়ে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলল।
হঠাৎ সে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলে উঠল,
“জানেন, আপনাকে আজ একদম শুভ্রপরীর মতো লাগছে!”
নির্জনের এই অকপট প্রশংসায় নুসরাত কোনো প্রতিউত্তর করল না, শুধু লাজুক চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে তার হাঁটার গতি বজায় রাখল। কিন্তু নির্জনের মনের ভেতর তখন এক অস্থির তোলপাড় চলছে। কিছু একটা বলার জন্য বুকটা তার ঢিপঢিপ করছে। কিছুটা পথ পেরিয়ে সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল।
নির্জন মৃদু স্বরে ডাকল,
“শুনুন না, একটা কথা ছিল…”
নুসরাত থমকে দাঁড়াল। তারপর ধীরপায়ে ঘুরে নির্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে থিতু হলো। সেই নির্জন নুসরাতের চোখের মায়ায় শান্তভাবে দৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়ে গভীর এক আবেগে বলে উঠল,
“আপনি কি আমার হবেন চশমাওয়ালি ম্যাডাম? আমি না হয় বাদামওয়ালা হয়েই আপনার জীবনে থেকে যাবো। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের ভোরে আপনার চশমার কাচে জমে থাকা ধূসর কণাগুলো আমি সযত্নে মুছে দেব। সারাজীবন আমার বুকের মধ্যখানে আপনাকে আগলে রাখার এই সুযোগটুকু কি আমায় দেওয়া যায়?”
নুসরাত পলকহীন দৃষ্টিতে নির্জনের দিকে তাকিয়ে রইল। একজন পুরুষের কণ্ঠে এতটা মায়া আর এতটা আকুতি থাকতে পারে, তা নুসরাতের কল্পনার বাইরে ছিল। তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নুসরাত আর নিজেকে শক্ত করে রাখতে পারল না। অত্যন্ত কোমল স্বরে সে বলে উঠল,
“আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস আমার নেই বাদামওয়ালা। আপনি যদি রাখতে চান, তবে আমি আপনার জীবনেই সারাজীবন থেকে যেতে রাজি।”
মুহূর্তেই নির্জনের মুখটা অমায়িক এক হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছেলেটা যেন এখনই রাস্তায় নেচে উঠবে এমন দশা। সে উত্তেজনায় ডগমগ হয়ে বলে উঠল,
“তবে কি আজই বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেব?”
নুসরাত এবার নির্জনের দিকে ফিরে হাসলো। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“এত তাড়া কিসের? আর হ্যাঁ, আপনার ডাক্তারির খবর কী শুনি?”
নুসরাতের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নির্জনের ঠোঁটের হাসিটা নিমিষেই থমকে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল। সে তো কোনোদিন নুসরাতকে নিজের আসল পরিচয় বলেনি, তবে নুসরাত জানল কী করে? নির্জন আমতা আমতা করে ভীষণ অবাক স্বরে বলল,
“আ… আপনি জানেন আমি একজন ডাক্তার?”
নুসরাত এবার চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে তার সেই ভুবনভোলানো হাসিটা হাসল, যা দেখে নির্জন আরও বেশি বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নুসরাত খিলখিল করে হেসে উঠল, সে নির্জনের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতুকের স্বরে বলল,
“আপনার কী মনে হয়, আপনি শহরের এত বড় একজন নামী ডাক্তার আর আমি আপনাকে চিনতে পারব না? ভুলে যাবেন না, আমিও কিন্তু মেডিকেলেরই স্টুডেন্ট। তাই বড় বড় ডাক্তারদের বিষয়ে একটু খোঁজখবর তো রাখতেই হয়। একদিন টিভিতে আপনার ইন্টারভিউ দেখেছিলাম, তখনই চিনে ফেলেছি।”
নির্জনের চোখেমুখে এবার ভয়ের আভা ফুটে উঠল। সে অনেকটা অসহায় ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“ওরে বাবা! আপনি তো আগে বলেছিলেন বড়লোক বা নামী-দামি ছেলেদের আপনার পছন্দ না। এখন ডাক্তার পরিচয় জানার পর কি তবে আমাকেও বাদ দিয়ে দেবেন চশমাওয়ালি ম্যাডাম?”
নুসরাত নির্জনের ভয়ার্ত মুখ দেখে আরও একটু হাসল। তারপর ধীরপায়ে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
““আপনি মনে হয় জানেন না, আমি কিন্তু পেশায় ডাক্তার এমন ছেলেদের ভীষণ পছন্দ করি।”
নির্জনের অন্ধকার মুখে যেন এক নিমেষে এক হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠল। তার সব আশঙ্কা কেটে গিয়ে পুনরায় সেই চিরচেনা অমায়িক হাসিটা ফুটে উঠল। সে একধাপ এগিয়ে এসে আদুরে গলায় বলল,
“যাক, ধড়ে প্রাণ এল! তা ম্যাম, সবকিছু যখন জেনেই ফেললেন, তবে কি এবার আমরা এই আনুষ্ঠানিক ‘আপনি’ থেকে সুন্দর একটি ‘তুমি’তে পৌঁছাতে পারি?”
নুসরাত লাজুক হাসিতে মাথা নাড়িয়ে নিঃশব্দে সায় দিল। কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে সেই নির্জন রাস্তায় দুজনের এক নতুন সম্পর্কের গল্প শুরু হলো।
★★★
আরিয়ানের জ্বর সারার আজ দুই দিন হলো। এই দুটো দিন আরিয়ান অফিসের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পুরোপুরি ঘরবন্দি ছিল। পুরো সময়টা তৃণা ছায়ার মতো তার পাশে থেকেছে। তৃণার সেই অকৃত্রিম সেবা আর ছোট ছোট যত্নের দিকে আরিয়ান শুধু বোকার মতো অপলক তাকিয়ে ছিল। আজ তার শরীর অনেকটাই ঝরঝরে লাগছে, তাই সিদ্ধান্ত নিল আজ আর কাজে ফাঁকি দেবে না।
তৃণা হাতে এক গ্লাস পানি নিয়ে রুমে ঢুকতেই দেখল আরিয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কোট-প্যান্ট পরে পরিপাটি হয়ে তৈরি হচ্ছে। আরিয়ানকে এভাবে দাপ্তরিক পোশাকে দেখে তৃণার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এই অবস্থায় কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
আরিয়ান আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতেই শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“অফিসে। শুয়ে বসে থেকে শরীরটা আরও জ্যাম হয়ে যাচ্ছে। এখন জ্বরটাও তো নেই।”
তৃণা ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না। আরিয়ানের কথার ওপর ভরসা না করে সে অবচেতন মনেই এগিয়ে গেল। আরিয়ানের কপাল ছুঁয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করার জন্য সে হাত বাড়াল। হ্যাঁ, কপালটা এখন বেশ শীতল, জ্বরের সেই তপ্ত ভাবটা সত্যিই কেটে গেছে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তৃণা টের পেল, সে আরিয়ানের একদম গায়ের কাছে চলে এসেছে। তার হাতের আঙুলগুলো তখনো আরিয়ানের কপাল ছুঁয়ে আছে, আর আরিয়ানের গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে তৃণার চোখের ওপর। দুজনের নিঃশ্বাসের দূরত্ব তখন নামমাত্র। লহমায় তৃণার ভেতরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সম্বিত ফিরতেই সে তড়িঘড়ি করে হাত সরিয়ে নিল এবং কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দূরত্ব তৈরি করল।
তৃণা এবার নিজের অস্বস্তি লুকাতে মিনমিন করে বলল, “হ্যাঁ, জ্বর কমেছে। এখন যেতেই পারেন।”
আরিয়ান এবার পূর্ণদৃষ্টিতে তৃণার দিকে তাকাল। তার দুচোখে এক গভীর কৌতূহল। সে খুব ধীরস্থিরভাবে প্রশ্ন করল,
“এত কেন আমাকে নিয়ে চিন্তা করো তৃণা? আমার পেছনে দিনরাত এত যত্ন করার কারণ কী?”
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে গভীর এক দৃষ্টি দিয়ে ধীর গলায় বলে উঠল,
“আপনি আমার স্বামী। কালেমা পড়ে তিন কবুল বলে আপনাকে নিজের করে গ্রহণ করেছি। আপনি আমাকে স্ত্রী হিসেবে না-ই বা মানতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আপনার সেবা করা আমার কর্তব্যের মাঝেই পড়ে। স্ত্রী হিসেবে আপনার প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে।”
আরিয়ানের চোখেমুখে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। সে যেন তৃণার এই সহজ স্বীকারোক্তির মাঝে কোনো এক কঠিন সত্য খুঁজে পেল। আরিয়ানকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তৃণা চটজলদি পরিবেশটা হালকা করার জন্য বলল,
“এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যান, অফিসের দেরি হচ্ছে তো।”
আরিয়ান রুম থেকে বের হতে গেলে তৃণা হঠাৎ পেছন থেকে বলে উঠল,
“শুনুন! আমি আজ আমাদের বাড়ি যাব।”
আরিয়ান দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে তৃণার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, “কেন? হঠাৎ!”
“অনেকদিন হলো আব্বুকে দেখি না। তাই একটু দেখে আসব। সকালে আব্বুর সাথে কথা হয়েছে, তিনি আজ বাড়িতেই থাকবেন বলেছেন।”
আরিয়ান ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“চলো, তোমাকে নামিয়ে দিয়েই না হয় অফিসে যাই।”
তৃণা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “ধন্যবাদ, তবে তার প্রয়োজন নেই। আমি একাই যেতে পারব। আর বাবা তো বললেনই যে আজ আপনার অফিসে খুব জরুরি মিটিং আছে। আপনি কাজে যান।”
আরিয়ান আর কথা বাড়াল না, গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তৃণা স্থির দাঁড়িয়ে আরিয়ানের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। যখন তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল, তখন তৃণা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল
“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি থেকে দূরে যেতে হবে। তা না হলে আপনার এবং আমার, দুজনের জন্যই অমঙ্গল হবে। দিন দিন যে আমি ভীষণভাবে আপনার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি রাগি সাহেব… এই মোহ আমায় শেষ করে দেবে।”
★★★
দুপুর গড়িয়ে বিকেল এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। আকাশের লালচে আভা রান্নাঘরের জানালায় এসে লুটিয়ে পড়ছে। মিতু খুব মনোযোগ দিয়ে দুই কাপ চা বানাচ্ছে এক কাপ নিজের জন্য, অন্যটা রোহানের জন্য। হঠাৎ পেছন থেকে কারও এক জোড়া শীতল হাতের স্পর্শ পেতেই মিতু চমকে উঠল। তবে ভয়ের রেশটুকু মুহূর্তেই কেটে গেল, কারণ এই চিরচেনা স্পর্শটা কার, সেটা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও দেরি হলো না।
রোহান মিতুর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি মিতুর মাথার দিকে যেতেই বিরক্তি ফুটে উঠল। চুলগুলো একটি হেয়ার ক্লিপ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। রোহান কালক্ষেপণ না করে হাত বাড়িয়ে এক টানে ক্লিপটা খুলে নিল। মিতু অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
“করছ কী রোহান? রান্নাঘরে এসে মাথার চুল খুলছ কেন?”
রোহান উত্তর না দিয়ে মিতুর সেই রেশমি চুলের বন্যায় নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। গভীর আবেশে চুলের সুগন্ধ নিয়ে নেশাতুর গলায় বলল,
“আমার নীলাঞ্জনাকে তো আমি আগেই বলেছিলাম, কোনোভাবেই আমার সামনে চুল বাঁধবে না। তবে আজ কেন অবাধ্য হলে?”
মিতু একটু আমতা আমতা করে বলল,
“এখন তো রান্নাঘরে কাজ করছি, তাই…”
“কোনো অজুহাত শুনতে চাই না আমি।” রোহানের গলায় একরোখা অধিকারবোধ।
রোহান মিতুর পিঠ থেকে চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে ওর উন্মুক্ত কাঁধ আর গলায় মুখ রাখল। সেই শীতল ও তপ্ত পরশে মিতু শিউরে উঠল, তার শরীর যেন বিদুৎবেগে কেঁপে গেল। মিতু অস্ফুট স্বরে সতর্ক করে দেওয়ার চেষ্টা করল,
“বাড়িতে সবাই আছে রোহান, কেউ দেখে ফেলবে!”
রোহান মিতুর কথা কানেই নিল না। সে মিতুকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“সো হোয়াট? আমি পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে দেখে এসেছি। মা, মেঝো মা আর ছোট মা সকলেই ছাদে আড্ডায় মগ্ন। নৌশি কলেজে, আদনান ভার্সিটিতে। তৃণা আরিয়ানও বাড়িতে নেই। পুরো বাড়ি এখন শুধু আমাদের দুজনের।”
মিতু রোহানের মতলব বুঝতে পেরে চটজলদি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে কড়া চোখে তাকিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,
“একদম না রোহান! এসব ফালতু চিন্তা বাদ দাও তো। পরে বাড়ির সবার সামনে আমাকেই লজ্জায় পড়তে হয়।”
রোহান বাঁকা হেসে মিতুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“একটু-আধটু লজ্জা না পেলে তো ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে না, নীলাঞ্জনা।”
মিতু এবার কোনো উপায় না দেখে হঠাৎ চোখ বড় বড় করে আতঙ্কিত স্বরে বলে উঠল,
“আরে মা… আপনি এখানে!”
মায়ের নাম শুনে রোহান এক ঝটকায় মিতুকে ছেড়ে দিয়ে তটস্থ হয়ে দরজার দিকে ফিরল। কিন্তু সেখানে ধূসর অন্ধকার ছাড়া আর কেউ নেই। মিতু খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল,
“কী ব্যাপার প্রেমিক পুরুষ? খুব তো বীরত্ব দেখাচ্ছিলেন, মা’র কথা শুনেই তো ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেলেন দেখছি!”
রোহান মুহূর্তেই বুঝতে পারল সে মিতুর বুদ্ধির কাছে হেরে গেছে। সে মিছে রাগে মিতুর দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে পাজা করে কোলে তুলে নিল। মিতু একদম অপ্রস্তুত ছিল, এমন আকস্মিক আক্রমণে সে রোহানের গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,
“আরে! করছ কী? নামাও আমাকে!”
“কিছু না, অনেক কথা হয়েছে। এখন সোজা রুমে চলো, সেখানেই সব হিসাব হবে।”
মিতু রোহানের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“ছাড়ো বলছি বেয়াদব পুরুষ! ওদিকে আমার চা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।”
রোহান মিতুর চোখের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে নেশাতুর গলায় বলল,
“যাক পুড়ে! ওদিকে তোমার রূপের আগুনে যে আমি প্রতি মুহূর্তে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছি, তার খবর কি রেখেছ?”
মিতু এবার আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। সে সমানে রোহানের চওড়া বুকে ছোট ছোট কিল মারতে শুরু করল, কিন্তু তাতে রোহানের কোনো হেলদোল হলো না। সে মিতুকে কোলে নিয়েই লম্বা লম্বা পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে এগোতে লাগল।
★★★
তৃণা দুপুর নাগাদ নিজের বাড়ি পৌঁছাল ঠিকই, কিন্তু কপাল মন্দ হলে যা হয় তৃণা পৌঁছানোর মাত্র কিছুক্ষণ আগেই এক জরুরি ইমারজেন্সির কারণে উমর হাওলাদারকে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। তৃণা যখন দেখল বাবা বাড়িতে নেই, তার ভেতরে এক অজানা ভয়ের সঞ্চার হলো। সে চাইল তখনি আরিয়ানদের বাড়িতে ফিরে যেতে, কারণ এই চার দেয়ালের মাঝে অতীতে তাকে অনেক লাঞ্ছনা সইতে হয়েছে।
কিন্তু আজ সব যেন ওলটপালট। অদ্ভুত এক বিস্ময় নিয়ে তৃণা লক্ষ করল, রৌশনারা বেগম এবং রিনি দুজনেই তার সাথে ভীষণ অমায়িক ব্যবহার করছে। এত মধুমাখা কথা তৃণা এই বাড়িতে কোনোদিন শোনেনি। সবচেয়ে বড় তাজ্জবের বিষয় হলো, আজ তৃণা আসার সুবাদে রৌশনারা বেগম নিজে হাতে রান্নাঘরে ঢুকেছেন রান্না করতে । তৃণা সোফায় বসে এসব দেখছে আর অবাক হচ্ছে। তার কোলে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে পোষা বিড়াল মিহু। তৃণার কেন যেন মনে হলো, তার মতো ছোট মিহুও এই আচমকা পরিবর্তনের পেছনের রহস্যটা বোঝার চেষ্টা করছে।
রিনি সামনে বসে নির্বিকার ভঙ্গিতে মোবাইল টিপছে। আজ তার মুখেও কোনো বিষাক্ত ছায়া নেই। তৃণা মনে মনে এক চিলতে সুখ খুঁজে পেল। সে ভাবল, হয়তো মানুষগুলো সত্যিই বদলে গেছে। হয়তো সে অন্য বাড়িতে চলে গেছে বলেই আজ তাদের মনে তৃণার জন্য কিছুটা মায়া জন্মেছে।
হঠাৎ রান্নাঘর থেকে রৌশনারা বেগমের মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল,
“তৃণা মা, একটু রান্নাঘরে আয় তো!”
তৃণা মুখে হাসি ফুটিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। মিহুকে ফ্লোরে নামিয়ে দিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তাকে দেখে রৌশনারা বেগম হাসিমুখে বললেন,
“তোর বাবা কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। তোর জন্য বিশেষ কিছু রান্না করব মা? বল কী খেতে চাস?”
তৃণা অবাকের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“না মা, লাগবে না। যা রান্না করছো তাই খাব।”
ঠিক সেই সময় দরজায় এসে দাঁড়াল রিনি। রৌশনারা বেগম হাতের খুন্তিটা রেখে তৃণার একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন। খুব আপন করে তৃণার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“শোন তৃণা মা, তোকে একটা ভালো কথা বলি।”
তৃণা এবার সতর্ক হয়ে গেল। মানুষগুলোর অতিভক্তি আর অদ্ভুত মায়ার আড়ালে যে কোনো কুটিল মতলব আছে, তা সে টের পেল। সে চুপ করে রইল। এরই মাঝে রিনি তার মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি তৃণার দিকে তাকিয়ে বিষ মেশানো গলায় বলে উঠল,
“শোন তৃণা, তুই আরিয়ানকে খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্স দে, বুঝলি? এমনিতেও তো আরিয়ান তোকে দু-চোখে দেখতে পারে না, পছন্দই করে না। এই নামমাত্র সম্পর্ক টেনে কী লাভ?”
তৃণা যেন আকাশ থেকে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত আগে পাওয়া সব সুখ আর বিশ্বাস মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল। সে রিনির দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “এসব… এসব কী বলছো আপা?”
রৌশনারা বেগম রিনির দিকে তাকিয়ে একটু ধমক দেওয়ার ভান করে বললেন,
“আহা রিনি মামনি, এখনই এসব কথা কেন তুলছিস? আরিয়ানের সাথে তৃণার বিচ্ছেদ তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এখন আমাদের যেটা আসল কাজ, সেটা নিয়ে কথা বলি।”
তৃণার বুকের ভেতরটা কু ডাক দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই অস্বাভাবিক মধুর আচরণের আড়ালে কোনো এক বীভৎস ষড়যন্ত্র ডালপালা মেলছে। রৌশনারা বেগম মুখ খোলার আগেই তৃণা চটজলদি বলল,
“আমাকে এখনই যেতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তৃণা ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রৌশনারা বেগম অতর্কিতে তার হাত চেপে ধরলেন। এবার আর সেই মেকি মমতা নেই, কণ্ঠে ফুটে উঠল কঠোর এক কর্কশ ভাব। তিনি বললেন,
“যাবিই তো। তার আগে একটা কাজ করে দিয়ে যা। তোর বাপকে আমি কতবার বললাম এই বিশাল সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিতে, কিন্তু বুড়োটা তো কোনোভাবেই রাজি হচ্ছে না। তুই তো উনার আদরের ধন, তুই বললে উনি এক কথায় সব লিখে দেবেন। তুই আজই উনাকে রাজি করাবি।”
তৃণা চরম বিস্ময় আর ঘৃণা নিয়ে রৌশনারা বেগমের দিকে তাকাল। তার গলার স্বর কাঁপছে,
“আমি পারব না আব্বুকে এমন কোনো কথা বলতে। আর আপনাদের এত লোভ? এই জঘন্য মতলব হাসিলের জন্যই কি এতক্ষণ মিথ্যে আদিখ্যেতা দেখাচ্ছিলেন?”
রিনির চোখেমুখে পৈশাচিক আনন্দ। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“হ্যাঁ, এই কারণেই দেখাচ্ছিলাম। এখন সোজা কথায় বল ড্যাডিকে সম্পত্তি আমাদের নামে লিখে দিতে বলবি কি না?”
তৃণা এবার নিজের তেজ বজায় রেখে চিৎকার করে বলল,
“কখনোই না! আমি কখনোই আমার বাবার সারাজীবনের অর্জন তোমাদের মতো লোভীদের হাতে তুলে দিতে বলব না। তোমাদের যা মনে চায় করতে পারো, আমি…”
তৃণা কথাটি শেষ করতে পারল না। এক মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র, অসহনীয় যন্ত্রণায় তার শরীরটা কুঁকড়ে গেল। রৌশনারা বেগম পাশে রাখা চুলা থেকে উত্তপ্ত খুন্তিটা নিয়ে সরাসরি তৃণার কোমল পিঠে চেপে ধরেছে। চামড়া পোড়া গন্ধে আর আগুনের মতো তপ্ত কামড়ে তৃণা যন্ত্রণায় ফেটে পড়ল। সে নিজের অজান্তেই তার গর্ভধারিণী মাকে স্মরণ করে আকাশ বিদীর্ণ করা চিৎকার দিয়ে উঠল,
“ও আম্মুউউউ গো!”
তৃণার সেই করুণ আর্তনাদ পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে রৌশনারা বেগমের লোহার মতো শক্ত মুঠো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। এক হাতে তৃণার চুল মুঠি করে ধরে অন্য হাতে তিনি উন্মত্তের মতো গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিতে লাগলেন।
রিনি পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। সে তার মাকে আরও উৎসাহ দিয়ে বলল,
“আরও দাও মা, আরও ছ্যাঁকা দাও! খুব তো মুখে মুখে তর্ক করে, এখন দেখি ওর তেজ কত!”
তৃণা চোখের জল আর পিঠের পোড়া ক্ষত মিশে একাকার হয়ে গেল। এই বাড়িটা তার কাছে আবারও এক নরকে পরিণত হলো।
তৃণা ডুকরে কেঁদে উঠল, যন্ত্রণার তীব্রতায় তার কণ্ঠ বুজে আসছিল। সে অবুঝের মতো অনুরোধ করতে লাগল,
“ও মা, দোহাই তোমার, ছেড়ে দাও! আমার পিঠ পুড়ে যাচ্ছে… আমি আর সইতে পারছি না। এবারের মতো মাফ করে দাও মা, আমি আর কখনো তোমাদের কথার বিরুদ্ধে যাব না।”
তৃণার ছটফটানি আর আর্তনাদে যেন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ছোট্ট মিহুও বোধহয় এই নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে পারছিল না, সে বারবার মিউ মিউ করে তৃণার চারপাশে ঘুরছিল আর চিৎকার করছিল। গরম খুন্তির সেই লেলিহান দাহ তৃণার শরীরের গভীরে ঢুকে যাচ্ছিল।
অবশেষে রৌশনারা বেগম তৃনাকে ছেড়ে দিলেন, কিন্তু তৃণার নিস্তার মিলল না। রিনি হিংস্র বাঘিনীর মতো এগিয়ে এসে তৃণার গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল। তৃণা টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে ফ্লোরে পড়ল। ঝাপসা চোখে সে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎ দেখল সে কারো পায়ের কাছে পড়ে আছে। ধীর পায়ে মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাতেই তৃণার কলিজা কেঁপে উঠল সামনে দাঁড়িয়ে আরিয়ান!
আরিয়ানকে এই সময়ে এখানে দেখে রৌশনারা বেগম আর রিনির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আরিয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে তৃণাকে ফ্লোর থেকে তুলে নিল। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছে। সে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল, “হাউ ডেয়ার ইউ! আপনাদের সাহস কী করে হলো আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার?”
আরিয়ানের ফর্সা মুখটা রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। সে আবারও চিৎকার করে উঠল,
“শুয়োরের বাচ্চারা! তোরা কি আদেও মানুষ? একটা মেয়ের ওপর এভাবে জানোয়ারের মতো অত্যাচার করতে তোদের হাত কাঁপল না?”
রিনি নিজের রাগ সামলাতে না পেরে তেড়ে এল আরিয়ানের দিকে,
“খবরদার আরিয়ান! মুখ সামলে কথা বলো। আমাদের গালি দেওয়ার সাহস হয় কী করে তোমার?”
রিনি কাছে আসতেই আরিয়ান ক্ষিপ্র গতিতে রিনির দুই গালে সপাটে পাঁচ-পাঁচটি চড় কষিয়ে দিল। রিনি ছিটকে পড়ল সোফার ওপর। আরিয়ান যখন আরও আঘাত করতে উদ্যত হলো, তখন তৃণা কোনোমতে আরিয়ানকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আরিয়ানের শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরটা তৃণার স্পর্শ পেয়ে কিছুটা শিথিল হলো। আরিয়ান রৌশনারা বেগমের দিকে আঙুল তুলে চরম ঘৃণাভরে বলল,
“আপনি আমার মায়ের বয়সি বলে আজ ছেড়ে দিলাম, নয়তো রিনির চেয়েও বেশি থাপ্পড় আপনার গালে পড়ত। লজ্জা করে না নিজের মেয়ের বয়সী একটা বাচ্চার ওপর এভাবে পৈশাচিক অত্যাচার করতে ?”
আরিয়ান আরও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তৃণা তার বাঁধন আলগা করে দিল। পিঠের সেই অসহ্য জ্বলুনি আর মানসিক আঘাতে তার শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। সে অচেতন হয়ে মাটির দিকে গড়িয়ে পড়তে নিলেই আরিয়ান চোখের পলকে তাকে জাপটে ধরল। পরম মমতায় তৃনাকে কোলে তুলে নিয়ে সে দ্রুত পায়ে নরকতুল্য ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
চলবে…
(তোমরা সকলে রেসপন্স করো না কেন?একটা সামন্য রিয়েক্ট দিতেও তোমাদের কষ্ট লাগে?!)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২