রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২১
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
গোধূলির আকাশ তখন রক্তিম আভায় সেজেছে। দিগন্তের সেই লাল আভা বাগানের প্রতিটি পাতায় এক মায়াবী পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। মৃদু দখিনা বাতাসে বাগানের হাসনাহেনা আর কামিনীর ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে। মিতু, তৃণা আর নৌশি বাগানের সবুজ ঘাসের গালিচায় গোল হয়ে বসে আছে। চারদিকের স্নিগ্ধতা থাকলেও তৃণার মনের ভেতর এক অস্থির ঝড় বইছে।
অনেকক্ষণ টুকটাক গল্পের পর তৃণা কিছুটা ইতস্তত করে মিতুর দিকে তাকাল। গলার স্বর নিচু করে জিজ্ঞেস করল, “ভাবি, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
মিতু ঘাসের ওপর হাত রেখে আরাম করে বসে ছিল। সে হাসিমুখে বলল, “হুম করো, কী বলতে চাও?”
তৃণা একটু আমতা আমতা করে বলল,
“ওইদিন রাতে তুমি বলেছিলে আরিয়ানের জীবনে কোনো একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল… যার কারণে ও মাঝে মাঝে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করে। আজ কি সেটা বলা যাবে?”
মিতুর চোখের চনমনে ভাবটা নিমিষেই মিলিয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে দূরের আকাশের দিকে তাকাল। যেন স্মৃতির পাতা উল্টে কয়েক বছর পেছনে চলে গেল সে। মিতু বলতে শুরু করল,
“হ্যাঁ তৃণা, তোমাকে তো বলেছিলাম বলব, কিন্তু গত কয়েকদিনের ঝামেলার মাঝে আর সুযোগ হয়নি। আরিয়ান আগে এমন ছিল না। ঘটনাটা ঘটেছিল কয়েক বছর আগে, যখন ও বন্ধুদের সাথে একটা ট্যুরে গিয়েছিল। সেখানে ও হুট করে একটা মেয়েকে দেখেছিল। মেয়েটাকে ওর এতটাই ভালো লেগে যায় যে, ও জীবনের প্রথম কারও প্রেমে পড়ে। কিন্তু মেয়েটা ছিল ক্ষণিকের দেখা এক মায়া।”
তৃণা অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ, ভালোবাসতেই পারে, তাই বলে এমন পাগলামি করার কী আছে ভাবি?”
মিতু ম্লান হেসে বলল,
“পাগলামি করার কারণটা ভালোবাসায় নয় তৃণা, কারণটা ছিল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। আরিয়ান যখন মেয়েটাকে ফলো করে রাস্তার ওপাশে যেতে চাইল, ঠিক তখন পাহাড়ের বাঁক নিয়ে প্রচণ্ড গতিতে একটা প্রাইভেট কার আসছিল। আরিয়ানকে বাঁচাতে গিয়ে কারের ড্রাইভার খুব জোরে ব্রেক কষেন, কিন্তু গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা পাহাড়ের খাদে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে এক বিকট শব্দে গাড়িটা ব্লাস্ট হয়।”
মিতু থামল। তৃণা আর নৌশি দুজনেই স্তব্ধ হয়ে শুনছে। মিতু আবার বলতে লাগল,
“সেই দুর্ঘটনায় আরিয়ান মাথায় আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর ও যে সত্যটা জানতে পারে, তা ওকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। ওই গাড়িতে একটা সুখী পরিবার ছিল স্বামী, স্ত্রী আর তাদের মাত্র ছয় বছরের একটা ফুটফুটে বাচ্চা। ড্রাইভার আরিয়ানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের পুরো পরিবারসহ মারা যান। আরিয়ান নিজেকে খুনি ভাবতে শুরু করে। ওর মনে গেঁথে যায় যে, ওই মায়াবী মেয়েটাকে খুঁজতে গিয়েই ও তিনটে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।”
তৃণার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। মিতু আরও যোগ করল, “এরপর আরিয়ান মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ওকে দিনের পর দিন অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা হতো। ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হতো। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ও সুস্থ হয় ঠিকই, কিন্তু ওর ভেতরে এক গভীর অপরাধবোধ বাস করতে শুরু করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তোমাকে বিয়ের পর থেকে ওর সেই পুরনো পাগলামিগুলো আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। হয়তো তোমাকে দেখলে বা তোর কোনো কথায় ওর সেই পুরনো স্মৃতির ক্ষতগুলো দগদগে হয়ে ওঠে।”
তৃণা এবার পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ সকালে দেখা সেই লাল বক্স আর আরিয়ানের রক্তবর্ণ চোখের চাহনি। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“এই কারণেই কি আরিয়ান ওই কাল্পনিক মেয়েটির কথা শুনলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে? তবে কি ওই লাল বক্সটিতে সেই দুর্ঘটনার কোনো স্মৃতি বা ওই মেয়েটির কোনো চিহ্ন লুকিয়ে আছে?”
বাতাসে গোধূলির সেই লাল আভা যেন ম্লান হয়ে এল।
তৃণা এবার আরিয়ানের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে মিতুর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
“ভাবি, অনেক তো হলো। এবার কি রোহান ভাইয়ার সাথে তোমার সব রাগ-অভিমান মুছে ফেলা উচিত নয়?”
তৃণার কথা শুনে মিতুর মুখটা ম্লান হয়ে গেল। সে কোনো উত্তর না দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। চার বছরের পাহাড়সম অভিমান কি এত সহজে এক নিমেষে ধুয়ে ফেলা যায়?
ঠিক তখনই পাশে বসে থাকা নৌশি মিতুর অন্য হাতটি ধরে করুণ সুরে বলল,
“ভাবি, এবার অন্তত ভাইয়াকে মাফ করে দাও না, প্লিজ! জানো, আজ দুপুরে যখন ছাদে গেলাম, তখন দেখলাম ভাইয়া একা এক কোণে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। একদম অসহায়ের মতো দেখাচ্ছিল তাকে। আমি যখন ‘ভাইয়া’ বলে ডাকলাম, তখন দেখলাম ভাইয়া তড়িঘড়ি করে নিজের চোখ মুছে নিল। আমাকে বুঝতে দিতে চায়নি যে সে কাঁদছে।”
নৌশির কথা শুনে মিতু চমকে উঠল। তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে ধরল। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“রোহান কি কাঁদছিল?”
নৌশি ভারী মনে ওপর-নিচ মাথা নাড়াল। মিতুর চোখের সামনে ভেসে উঠল রোহানের সেই গম্ভীর আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ মুখটা। যে পুরুষটার একটুখানি হাসিমাখা মুখ দেখে মিতু তার জীবনের সব দুঃখ ভুলে যেত, সেই কঠোর মানুষটা আজ লোকচক্ষুর অন্তরালে চোখের জল ফেলছে?
মিতু টের পেল তার নিজের বুকের ভেতরটাও ব্যথায় টনটন করে উঠছে। অভিমান নামক দেয়ালটা যেন বালুর বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ভালোবাসার মানুষের চোখের জল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র, যা সবচেয়ে কঠিন হৃদয়কেও মুহূর্তেই গলিয়ে দিতে পারে।
★★★
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে অনেকক্ষণ হলো। গত কয়েকদিন ধরে আরিয়ান সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরে আসছিল, কিন্তু আজ এখনো তার দেখা নেই। আরিয়ানের সাথে তৃণার বিয়ের এক মাস পার হয়ে গিয়েছে। এই অল্প কদিনেই লোকটার প্রতি মনে মনে এক অদ্ভুত টান অনুভব করতে শুরু করেছে তৃণা।
কনকনে শীতের রাত, তাই বাড়ির বড়রা সাধারণত এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন না, যে যার মতো তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছেন। তৃণা কয়েকবার আরিয়ানের নাম্বারে ফোন করল, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকায় সে বাধ্য হয়ে শ্বশুর আহাদ মির্জাকে কল দিল। ওপাশে আহাদ মির্জার ব্যস্ত কণ্ঠ শোনা গেল,
“তৃণা মা, এত রাতে ফোন দিলে যে? কোনো প্রয়োজন?”
“না বাবা, আসলে আপনার ছেলে এখনো বাসায় ফেরেনি তো, তাই ভাবলাম আপনাকে একটু জিজ্ঞেস করি।”
“ওহ! আরিয়ান তো এখনো অফিসে। আমরা তিন ভাই অফিসের বাইরে একটা জরুরি কাজে এসেছি। ও ওখানেই আছে হয়তো।”
তৃণা আর কোনো প্রশ্ন না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দিল। কিন্তু তার মন মানল না। বুকের ভেতর কেমন জানি একটা অস্থিরতা কাজ করছে। শেষমেশ সাহসে ভর করে সে একাই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ড্রাইভার কোয়ার্টারেই থাকে, তাকে ডেকে গাড়ি বের করতে বলল তৃণা।
কাজের চাপে আরিয়ান মাঝে মাঝেই দেরি করে ফেরে, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজ তৃণার মনে তীব্র জেদ আর প্রবল ইচ্ছা জাগল সে নিজে গিয়ে দেখবে আরিয়ান কী করছে। কুয়াশাভেজা শীতল রাস্তা মাড়িয়ে গাড়ি ছুটে চলল আরিয়ানের অফিসের দিকে।
আরিয়ান নিজের ডেস্কে বসে গভীর মনোযোগে ল্যাপটপে কাজ করছিল। নিস্তব্ধ অফিসে কিবোর্ডের খুটখাট শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ দরজায় কারো পদশব্দ পেয়ে আরিয়ান মাথা তুলে তাকাতেই তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। মীরা আসছে পা টলছে, অবিন্যস্ত চুলে এক অদ্ভুত চপলতা। হাঁটুর ওপর পর্যন্ত পরা ছোট পোশাকে সে আরিয়ানের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।
মীরা নেশাসক্ত গলায় জড়িয়ে জড়িয়ে বলল,
“বেবি, এত রাত পর্যন্ত কেন কাজ করছো? চলো না আজ আমাদের বাসায়। পাপা বাড়িতে নেই, পুরো বাড়ি খালি।”
আরিয়ান রাগে চোখ বড় বড় করে তাকাল। মীরার চোখের চাউনি আর কথা বলার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কোনো ক্লাব বা পার্টি থেকে নেশা করে সোজা এখানে এসেছে। আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল,
“নেশা করেছ?”
মীরা একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “হুম, একটু।”
“তা তো দেখতেই পাচ্ছি! সামান্য করেছ নাকি অনেক বেশি, সেটা বড় কথা নয়। এখানে তোমার কোনো কাজ নেই, এখনই বাড়ি যাও,” আরিয়ান কঠোর স্বরে নির্দেশ দিল।
কিন্তু মীরা যেন আজ অন্য কিছু ঠিক করে এসেছে। সে টেবিল ঘুরে আরিয়ানের দিকে এগোতে এগোতে বলল, “বাড়ি তো যাবই জান! কিন্তু তুমিও চলো আমার সাথে। আজ রাতটা না হয় শুধু তোমার আর আমারই হবে।”
মীরাকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আরিয়ান সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে হুশিয়ারি দিয়ে বলল, “খবরদার! আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবে না। এর পরিণতি কিন্তু খুব খারাপ হবে, মীরা।”
মীরা এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। সে ব্যাকুল গলায় বলল,
“আই রিয়েলি লাভ ইউ আরিয়ান! তুমি কেন বুঝতে চাও না?”
কথাটা শেষ করেই আরিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মীরা দ্রুত গতিতে এসে তাকে জাপ্টে ধরল। আরিয়ান এই আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। রাগে আর ঘৃণায় তার সারা শরীর রি রি করে উঠল। সে সজোরে চিৎকার করে উঠল, “ছাড়ো! বলছি আমাকে ছাড়ো মীরা!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই অফিসের দরজায় এসে দাঁড়াল তৃণা। ভেতরে আরিয়ানকে অন্য একটি মেয়ের আলিঙ্গনে আবদ্ধ দেখে তৃণা যেন পাথর হয়ে গেল। তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে।
আরিয়ান মীরাকে সর্বশক্তিতে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল, কিন্তু মীরার যেন আজ কোনো হুঁশ নেই। নেশার ঘোরে সে আবারও টলতে টলতে আরিয়ানের দিকে এগোতে চাইল। ঠিক তখনই মীরা অনুভব করল তার কাঁধে কারোর হিমশীতল স্পর্শ। বিরক্ত হয়ে মীরা পেছনে ফিরে তাকাল আর কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “কে রে?”
কথাটা শেষ করার আগেই ‘ঠাস’ করে এক প্রচণ্ড চড় এসে পড়ল মীরার গালে। চড়ের শব্দে পুরো নিস্তব্ধ কেবিন যেন কেঁপে উঠল। আরিয়ান স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছ। তার দুচোখে তখন আগুনের ফুলকি, রাগে পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। তৃণাকে এমন রণচণ্ডী মূর্তিতে দেখে আরিয়ানের অবাক হওয়ার কথা থাকলেও, তার মনের কোণে কেন জানি এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
মীরা নিজের গাল চেপে ধরে রাগে চিৎকার করে উঠল,
“হাউ ডেয়ার ইউ?” সে পাল্টা হাত তুলতে গেলে তৃণা এক ঝটকায় তা প্রতিহত করল এবং সময় নষ্ট না করে অন্য গালে আরও জোরালো একটা চড় বসিয়ে দিল। এরপর বিদ্যুৎবেগে মীরার হাত মুচড়ে পিঠের সাথে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এই বেলাজ মেয়েগুলোকে দেখলে আমার মাথা এমনিতেই গরম হয়ে যায়! হাত বাড়াচ্ছিস তো বাড়াচ্ছিস, তাও আবার আমার স্বামীর দিকে? এত সাহস পেলি কোথায়?”
আরিয়ান তৃণার এই রূপ দেখে রীতিমতো অবাক । সে তৃণার সাহসে উৎসাহ দিয়ে আড়াল থেকে বলে উঠল,
“একদম ঠিক করেছ! আরও দাও, জুতমতো আরও কয়েকটা লাগিয়ে দাও।”
তৃণা এবার মীরাকে ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে দিল এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া সেই অগ্নিদৃষ্টি দেখে আরিয়ানের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তৃণা তার শাড়ির আঁচলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিয়ে আরিয়ানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
“আপনিই বা কী, হুহ? আমার বেলায় তো যত্তসব রাগি সাহেবের ভাব দেখান! আর এখন দেখছি একবারে ভেজা বিড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন? একটা নেশাখোর মেয়েকে সামলাতে পারছেন না? ধমক দিয়ে বের করে দিতে পারলেন না?”
আরিয়ান এবার বেশ অপ্রস্তুত বোধ করল। সে মাথা নিচু করে খুব মিনমিন করে বলল,
“আরে আমি তো ধাক্কা দিয়েছিলাম… তবুও ও তো শুনছিল না।”
তৃণা আর আরিয়ানের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনতে চাইল না। সে আবারও মীরার দিকে এগিয়ে গেল। মীরা তখন নেশার ঘোরে কোনোমতে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করছে,
“আই উইল কিল ইউ… আই উইল…” তার অসংলগ্ন কথার বাকিটা আর পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না।
মীরাকে একা ওই অবস্থায় অফিসে ফেলে আসা সম্ভব ছিল না, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ড্রাইভারকে দিয়ে তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে হলো। মীরাদের বাড়ি থেকে নিজেদের গন্তব্যে ফেরার পথে তৃণা একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। পুরোটা রাস্তা সে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো মুখ ভার করে জানালার দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। আরিয়ান আড়চোখে তৃণার সেই অভিমানী মুখটা দেখছিল আর মনে মনে বারবার হাসছিল।
বাড়ি ফিরতেই আরিয়ান কৌতুকভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার শ্যামলিনী? এত ক্ষেপে যাওয়ার কারণটা কী শুনি?”
তৃণা আরিয়ানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“এমনি! আমার এসব বেলাজ মেয়েদের দেখলে মাথা গরম হয়ে যায়, তাই।”
আরিয়ান এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তৃণার খুব কাছে এসে দাঁড়াল সে, তারপর চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“নাকি আমার গায়ে মীরা ঢলে পড়ছিল বলে তুমি প্রচণ্ড জেলাস ফিল করছিলে?”
আরিয়ানকে এভাবে হঠাৎ কাছে আসতে দেখে তৃণা থতমত খেয়ে গেল। সে কোনো পাল্টা যুক্তি খুঁজে পেল না, শুধু নিস্পলক চেয়ে রইল। আরিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে তার শরীরের কোটটা খুলে বিছানায় রাখল এবং ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
তৃণা নিজের ঠোঁটের কোণে একটা লাজুক হাসি চেপে আরিয়ানের কোটটা হাতে নিল। গুছিয়ে আলমারিতে রাখতে গিয়ে সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। কী এক অজানা আবেশে সে কোটটা নিজের নাকের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। আরিয়ানের শরীরের সেই অদ্ভুত পুরুষালি ঘ্রাণ আর পারফিউমের সুবাস তার স্নায়ুকে যেন অবশ করে দিচ্ছে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে তার মনে। সে আলতো করে কোটটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।
এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ ঘোরলাগা আচ্ছন্নতায় কাটল তার। হঠাৎ ওয়াশরুমের জলের শব্দে তৃণার হুশ ফিরল। সে নিজেই নিজের কর্মকাণ্ডের ওপর চরম লজ্জিত বোধ করল। পরক্ষণেই তার মনে মিতুর বলা সেই অতীতটা বিষাদের মতো ছেয়ে ফেলল। সে নিজেকে নিজে সতর্ক করে বিড়বিড় করল,
“মায়ার এই মরীচিকায় পা বাড়ানো আমার বড্ড ভুল হবে। রাগি সাহেবের এই সাজানো জীবন থেকে আমাকে একদিন বিদায় নিতেই হবে। তার স্মৃতির আকাশে আজও সেই অচেনা মায়াবী মেয়েটা ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলে, আর আমি? আমি তো সেখানে কেবল এক ক্ষণস্থায়ী মেঘের ছায়া মাত্র।”
★★★
মিতু নিজের রুমে ফিরে দেখল রোহান সেখানে নেই। গত দুদিন ধরে সে রোহানকে আপ্রাণ অবহেলা করে গেছে, কিন্তু আজ কেন জানি মনটা বড্ড কু গাইছে। সারা বাড়ি খুঁজেও যখন রোহানের দেখা মিলল না, তখন মিতুর মনে সুপ্ত থাকা মায়াটা হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। গায়ের চাদরটা টেনে নিয়ে সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল।
ছাদের দরজায় এসে দাঁড়াতেই মিতুর চোখে পড়ল হালকা
আলোয় রোহানের ছায়া। এই হাড়কাঁপানো শীতেও মানুষটা কেবল একটা পাতলা শার্ট পরে রেলিং ধরে শূন্য দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। মিতু নিঃশব্দে গিয়ে রোহানের পাশে দাঁড়াল। পাশে কাউকে অনুভব করতেই রোহান কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। মিতুকে দেখেই তার চোখেমুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা ভর করল। সে অস্থির হয়ে বলে উঠল,
“মিতু! তুমি এখানে কেন আসলে? কুয়াশায় তোমার শরীর আরও খারাপ করবে তো! যাও, এখনই নিচে চলে যাও।”
রোহানের এই আকুলতা দেখে মিতুর ওষ্ঠাধরে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে খুব শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি নিজে কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছো? এই ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় তোমার কষ্ট হচ্ছে না?”
রোহান এবার ম্লান হেসে আকাশের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ঝরে পড়ল এক সমুদ্র বিষাদ,
“ঠান্ডা? না মিতু, একটুও ঠান্ডা লাগছে না। যেখানে আমার পুরো দুনিয়াটাই আমার ওপর প্রচণ্ড অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে আছে, সেখানে এই শীতের চেয়েও বড় অস্বস্তি আর কী হতে পারে?”
রোহানের কণ্ঠস্বর কাঁপছে। মিতু পলকহীন চোখে রোহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রোহান আবারও বলতে শুরু করল, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আবারও ইংল্যান্ডে ফিরে যাব।”
কথাটা কানে যেতেই মিতু চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই হাহাকার করে উঠল। রোহান হতাশাভরা কণ্ঠে বলতে লাগল,
“আমি চলে গেলে হয়তো তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে, তাই না? দিয়ে দিও। তারপর ভালো কোনো মানুষকে খুঁজে নিও মিতু। আর সাবধান, আমার মতো কোনো খারাপ মানুষের পাল্লায় যেন আর না পড়ো।”
মিতু আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। সে কয়েক কদম এগিয়ে একদম রোহানের বুকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রোহানের চোখে চোখ রেখে তীব্র ভালোবাসায় বলে উঠল,
“কিন্তু আমার যে এই খারাপ মানুষটাকেই চাই রোহান! আমি যে কেবল আমার সেই হারানো প্রেমিক পুরুষটাকেই ফিরে পেতে চাই!”
রোহান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। তার বিস্ময় কাটানোর আগেই মিতু শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। রোহানের বুকে মাথা রেখে আবেগী কণ্ঠে বলল, “আমি সারাজীবন এভাবেই তোমার বুকে মাথা রেখে কাটাতে চাই। আমাকে আর একা করে কোথাও যেও না।”
রোহানের বিষণ্ণ মুখে এক অপার্থিব সুখের হাসি ফুটে উঠল। সে মিতুকে দুহাতে আগলে নিয়ে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তোমাকে সারাজীবন এভাবেই আগলে রাখতে চাই নীলাঞ্জনা। ঠিক যেমন করে এই শীতের গভীর রাত কুয়াশাকে পরম মায়ায় আলিঙ্গন করে জড়িয়ে রাখে।”
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২