রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১৫
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস জানান দিচ্ছে শীত জেঁকে বসেছে। মিতু উষ্ণতার আশায় কম্বলের নিচে ঢুকে নিজের মোবাইলটা হাতে নিল। তার মনের ভেতর এখন খুশির জোয়ার বইছে, ভাবতেই ভালো লাগছে মাত্র একটা দিন পরেই এই শূন্য ঘরে, এই বিছানায় রোহান তার পাশে থাকবে।
মিতু পরম আবেশে কল লিস্ট থেকে রোহানের নাম্বারটা খুঁজে বের করে ডায়াল করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে রোহান কলটা ধরল। মিতু ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে কণ্ঠে একরাশ হাসি মাখিয়ে বলল, “কেমন আছো?”
“হুম, ভালো।” ওপাশ থেকে সংক্ষিপ্ত আর নিস্পৃহ উত্তর এল।
মিতু সেদিকে খেয়াল না করে আদুরে স্বরে বলল,
“শুনলাম আগামীকাল তুমি বাড়িতে ফিরছ। কই, আমাকে তো একবারও বললে না!”
“শুনতেই যখন পেরেছ, তখন আলাদা করে বলার আর কী প্রয়োজন?” রোহানের কণ্ঠ থেকে যেন বরফ ঝরছে, কাঠখোট্টা আর নিরস জবাব।
মিতুর সজীব হাসিটা মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা একবার ছ্যাঁত করে উঠলেও সে দমল না। আবারও জোর করে কণ্ঠে খুশি ফুটিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, বলতে হবে না। জানো রোহান, আমার না আজ ভীষণ আনন্দ হচ্ছে! কতদিন পর তোমাকে ছুঁয়ে দেখব, কাছে পাবো ভাবতেই কান্না পাচ্ছে।”
রোহান এবার চরম বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
“এসব ফালতু কথা বলার জন্যই কি কল করেছ? যদি কথা শেষ হয়ে থাকে তবে রাখি, আমার অনেক কাজ আছে।”
মিতুর মুখের কথাগুলো গলার কাছে আটকে গেল। রাজ্যের একরাশ অপমান আর বিষণ্ণতা এসে তার ওপর ভর করল। মিতুর উত্তরের অপেক্ষায় না থেকেই ওপাশ থেকে কলটা কেটে দেওয়া হলো। টু-টু শব্দটা মিতুর কানে বিদ্রূপের মতো বাজতে লাগল।
মিতু অপমানে আর যন্ত্রণায় হাতের ফোনটা বিছানার এক কোণে ছুঁড়ে মারল। তারপর দু-হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল মেয়েটা। অবশ্য এই অবহেলা মিতুর জীবনে নতুন কিছু নয়। এই ঘরের প্রতিটা দেওয়াল জানে রাতের পর রাত মিতুর চাপা দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকারের কথা।
রুমে কারো মৃদু পদচারণা টের পেয়ে মিতু চমকে মাথা তুলল। ঝাপসা চোখে দেখল সামনে তৃণা দাঁড়িয়ে আছে। তৃণাকে দেখামাত্রই মিতু তাড়াহুড়ো করে ওড়না দিয়ে চোখ মুছে ফেলল, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু ফোলা চোখ আর লাল নাক সব সত্যি বলে দিচ্ছিল। তৃণা বিছানার পাশে এসে আলতো করে বসল, তারপর খুব ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ভাবি, তুমি কাঁদছিলে কেন?”
মিতু একটা ম্লান হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে লুকানোর চেষ্টা করল, “কই, কাঁদছি না তো! চোখে বোধহয় কিছু পড়েছে।”
তৃণা সরাসরি মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “রোহান ভাইয়া তোমার সাথে সবসময় এরকম আচরণ করেন কেন ভাবি?”
মিতুকে বিচলিত হতে দেখে তৃণা নিজেই পরিষ্কার করল, “না, আমি তোমাদের পার্সোনাল কথা আড়ি পেতে শুনিনি। নৌশি বলছিল, ভাইয়া নাকি তোমার সাথে ফোনেও ঠিকমতো কথা বলেন না। কিন্তু কেন ভাবি? রোহান ভাইয়া কি আগে থেকেই এমন ছিলেন?”
মিতুর চোখের কোণে আবারও জল টলমল করে উঠল। সে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, “না তৃণা, একদমই না। রোহান আগে ছিল এক খাঁটি প্রেমিক, এক আদর্শ স্বামী। আমার হাতটা ধরার জন্য ও কত কী যে করেছে! অথচ হঠাৎ…”
“হঠাৎ এরকম কী করে বদলে গেলেন উনি?” তৃণার কণ্ঠে একরাশ কৌতুহল আর মায়া।
“জানি না। বিশ্বাস করো তৃণা, আমি এর উত্তর আজও জানি না।”
তৃণা চুপ করে মিতুর বিধ্বস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। মিতু এখন হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে এক ধ্যানে বিছানার চাদরের নকশার দিকে তাকিয়ে আছে। সহসা সে হু হু করে ডুকরে কেঁদে উঠল না ঠিকই, তবে তার কণ্ঠ থেকে একরাশ বিষাদ ঝরল। সে বলতে লাগল,
“মানুষ হঠাৎ করে কেন এভাবে বদলে যায় বলতে পারো তৃণা? কেন এত ভালোবাসা তিল তিল করে জমানোর পর মরিচিকার মতো উধাও হয়ে যায়? মানুষ তো গিরগিটি না, তবুও কেন তারা এত রং বদলায়? ওরা কি একবারও বোঝে যে, ওদের একটা নিষ্ঠুর কথার পরিপ্রেক্ষিতে অপর পাশের মানুষটার কলিজা ঠিক কতটা জর্জরিত হয়?”
তৃণা থমকে তাকিয়ে রইল মিতুর দিকে। মিতুর চোখ বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ঘর একদম নিস্তব্ধ। কান্নার কোনো শব্দ নেই, শুধু হাহাকার আছে। তৃণা মিতুর মাথায় হাত রাখল, কিন্তু মুখে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারল না। কারণ, এই প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেও নেই। সে নিজেই তো আরিয়ানের অবহেলা জর্জরিত।
★★★
রেস্টুরেন্টের এক কোণে নির্জন বসে আছে তার দুই বন্ধু হাসান আর নীরের সাথে। নির্জনের চোখেমুখে অস্থিরতা। সে হাসানের দিকে তাকিয়ে বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“তোকে যে বলেছিলাম নুসরাতের সম্পর্কে খোঁজ নিতে, কিছু জানলি?”
হাসান কফিতে চুমুক দিয়ে মাথা নাড়ল।
“হুম, আমার ছোট বোন নুসরাতের সাথে একই ভার্সিটিতে পড়ে। ওর মাধ্যমেই খবর নিলাম। কিন্তু দোস্ত, আমার কেন যেন মনে হয় না মেয়েটা তোকে কোনোদিন এক্সেপ্ট করবে।”
নির্জনের মেজাজটা এবার বিগড়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
“এক্সেপ্ট করবে না মানে কী? আমি কি দেখতে খারাপ? নাকি আমার কোনো যোগ্যতা নেই?”
“আরে না, ব্যাপারটা সেরকম না।” হাসান একটু আমতা আমতা করে বলল। “আমার বোন কায়দা করে নুসরাতকে জিজ্ঞেস করেছিল সে কেমন ছেলে পছন্দ করে। নুসরাত সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে এমন ছেলে পছন্দ করে যে দিন আনে দিন খায়। সহজ কথায়, একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত ছেলে যার অনেক টাকা নেই, কিন্তু অনেক মায়া আছে।”
এতক্ষণ চুপ করে থাকা নীর এবার টিপ্পনী কেটে বলে উঠল, “কিরে ভাই নির্জন, তোর তো তাহলে কপাল পুড়ল! নুসরাত যদি জানতে পারে তুই এত বড় একজন নামী ডক্টর, তাহলে তো তোকে কোনোদিন পাত্তা দিবে না।”
নির্জন দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। বিড়বিড় করে বলল, “দূর! এতদিন পর একটা মেয়েকে মনে ধরল, তাও কিনা এখন আমার স্ট্যাটাসের জন্য রিজেক্ট হতে হবে? এটা কোনো কথা হলো?”
হাসান হতাশ গলায় বলল, “পরিস্থিতি তো সেরকমই দেখছি।”
নির্জন কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল। হঠাৎ তার চোখের মণি চকচক করে উঠল। সে টেবিল চাপড়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল, “আইডিয়া পেয়ে গেছি!”
নীর আর হাসান দুজনেই উৎসুক হয়ে একসাথে জিজ্ঞেস করল, “কী আইডিয়া?”
নির্জন সোজা হয়ে বসে দৃঢ় গলায় বলল, “বাদাম! আমি ওর ভার্সিটির সামনে বাদাম বিক্রি করব।”
নীর আর হাসান দুজনেই বড় বড় চোখ করে একই সুরে বলে উঠল, “কী বলছিস এসব? মাথা ঠিক আছে তোর?”
“যা বলছি একদম ঠিক বলছি। আমি বাদামের ব্যবসা করব।” নির্জনের কণ্ঠে এখন পাহাড়প্রমাণ আত্মবিশ্বাস।
হাসান অবিশ্বাসের সুরে বলল, “তুই ডক্টর নির্জন ইমতিয়াজ হয়ে শেষমেশ কিনা রাস্তার ধারে বাদাম বিক্রি করবি? প্রেস্টিজ বলে কি তোর কিছু নেই?”
নির্জন মুচকি হেসে বন্ধুদের দিকে তাকাল। “আরে ভাই, প্রেমে পড়ে মানুষ তো পর্যন্ত খু’ন করে ফেলে, আর আমি নুসরাতের মনের মানুষের মতো সাজতে একটু সামান্য বাদামওয়ালা হতে পারব না? ভালোবাসা পেতে হলে একটু ত্যাগ তো স্বীকার করতেই হয়!”
★★★
উমর হাওলাদার নিজের বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটি ইংরেজি ক্ল্যাসিক পড়ছিলেন। অবসর সময়ে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকাটাই তাঁর বহু বছরের অভ্যাস। আগে এই সময়টিতে তৃণার মা মেহেরজান বেগম হাসিমুখে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর সেই দায়িত্বটা পালন করত তৃণা। কিন্তু এখন সেই ঘরটা খাঁ খাঁ করছে, চায়ের কাপ নিয়ে আসার মতো প্রিয় মানুষটি আর এই বাড়িতে নেই। তৃণা অসুস্থ থাকাকালীন উমর হাওলাদার তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েটাকে ক’দিনের জন্য নিজের কাছে নিয়ে আসেন, কিন্তু এই বাড়ির বিষাক্ত পরিবেশ আর রৌশনারা বেগমের আচরণের কথা ভেবে তিনি পিছিয়ে এসেছেন। মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে যেটুকু শান্তিতে আছে, এখানে আসলে হয়তো সেটুকুই হারাবে।
হঠাৎ রৌশনারা বেগম ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে চায়ের কাপ দেখে উমর হাওলাদার কিছুটা অবাক হলেন। রৌশনারা বেগম মুখে এক কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রাখলেন। উমর হাওলাদার চশমার ওপর দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ হঠাৎ এবেলায় চা? কী মতলব তোমার?”
রৌশনারা বেগম একটু আহ্লাদী স্বরে বললেন,
“আমার কি সবসময় কোনো না কোনো মতলবই থাকে? নিজের স্বামীর সেবা করতে এসেছি।”
“তা নয় তো কী? মধুমাখা কথার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো তিক্ত আবদার আছে। যা বলার বলে ফেলো,”
উমর হাওলাদার বইটা বন্ধ করে সরাসরি তাঁর দিকে তাকালেন।
রৌশনারা বেগম এবার কাজের কথায় এলেন,
“বলছিলাম যে, তোমার এই বিশাল সহায়-সম্পত্তি সবকিছু তো তোমার নামেই রয়ে গেল। আমার মেয়ে রিনির নামে তো তেমন কিছুই দিলে না। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে কি তোমার কোনো চিন্তা নেই?”
উমর হাওলাদার চশমার ফ্রেম ঠিক করে বাঁকা হাসলেন। “দুই ফ্ল্যাট ইতিমধ্যে তোমার আর রিনির নামে লিখে দিয়েছি। তবুও আরও প্রয়োজন? আমার সব সম্পত্তি গ্রাস করার শখ জেগেছে বুঝি?”
“এভাবে কেন বলছো? রিনি তোমার নিজের সন্তান, আর আমি তোমার বিবাহিত স্ত্রী। আমাদের কি কোনো দাবি নেই?” রৌশনারা বেগমের কণ্ঠে এবার অভিমান মেশানো অধিকারবোধ।
উমর হাওলাদার হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এবার বরফের মতো ঠান্ডা আর কঠোর শোনাল, “তোমরা মনে মনে যা ছক কাটছ, সেটা কখনোই সফল হবে না। তৃণার হক আমি নষ্ট হতে দেব না।”
রৌশনারা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি জানতেন সরাসরি উমর হাওলাদারকে টলানো কঠিন। রৌশনারা চলে যেতেই উমর হাওলাদার তাঁর উকিলকে কল দিলেন। ওপাশ থেকে উকিল কল ধরতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“রহমান সাহেব, আমি যে ডকুমেন্টগুলো রেডি করতে বলেছিলাম, সেগুলো কি কমপ্লিট হয়েছে?”
“জি স্যার, সব তৈরি। কাল সকালে কি আপনার বাড়িতে নিয়ে আসব?”
“না, বাড়িতে আসার প্রয়োজন নেই। রৌশনারা টের পেলে সমস্যা হবে। আগামীকাল হাসপাতালে আমার কেবিনে ডকুমেন্টগুলো নিয়ে আসবেন। আমি ওখানেই সই করব।”
কলটা কেটে দিয়ে উমর হাওলাদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
★★★
রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। কোণের মৃদু নীল আলোটা অন্ধকারকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। বাইরে হাড়কাঁপানো শীত, আর জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় তৃণা ফ্লোরে শুয়ে কুঁকড়ে আছে। পাতলা একটা কম্বল শীত আটকাতে পারছে না। তৃণা হালকা মাথা তুলে দেখল আরিয়ান অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আজ আরিয়ান বেশ তাড়াতাড়িই বাড়িতে ফিরেছে, অথচ বলেছিল কাজ শেষ করতে দেরি হবে। লোকটার চোখেমুখে ইদানীং একরাশ ক্লান্তি আর অস্থিরতা দেখা যায়, যেন কোনো গভীর চিন্তায় সে ডুবে আছে। তৃণা তা বুঝেও কোনো কথা বাড়ায়নি।
বেশ অনেকক্ষণ পর তৃণার চোখে মাত্র একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল, কিন্তু সেই কাঁচা ঘুমটা নিমেষেই ভেঙে গেল আরিয়ানের একটা ভয়ার্ত চিৎকারে। তৃণা ধড়ফড় করে উঠে বসল। দেখল আরিয়ান বিছানায় উঠে বসে দুহাতে মাথা চেপে ধরে আছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভীষণ দ্রুত, যেন কোনো বিভীষিকা তাকে তাড়া করছে।
তৃণা আতঙ্কিত হয়ে কাছে এগিয়ে গেল। খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আপনার? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন?”
তৃণার হাত আরিয়ানের কাঁধে স্পর্শ করতেই লোকটা হঠাৎ অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে চেনা কোনো মানুষ নেই, আছে এক ভয়ানক উন্মাদনা। আরিয়ান নিজের সর্বশক্তি ব্যবহার করে তৃণাকে সজোরে একটা ধাক্কা দিল। তৃণা ছিটকে ফ্লোরে গিয়ে পড়ল, কনুইয়ে বেশ ব্যথা পেল সে। বিস্ময়ে সে হতভম্ব হয়ে গেল,এই ব্যবহারের মানে কী?
আরিয়ান এবার বিছানা থেকে নেমে উন্মত্তের মতো ড্রেসিংটেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রাখা পারফিউমের বোতল, প্রসাধনী আর কাঁচের জিনিসপত্র এক ঝটকায় ফ্লোরে আছাড় দিয়ে ভাঙতে শুরু করল। কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে রুমটা প্রকম্পিত হয়ে উঠল। তৃণা ভয়ে কাঁপলেও নিজেকে সামলে নিয়ে আরিয়ানের হাত চেপে ধরার চেষ্টা করল।
“আরিয়ান! প্লিজ থামুন! কী করছেন আপনি? সবাই জেগে যাবে!”
তৃণা আরিয়ানকে থামানোর জন্য সবটুকু শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে।
কিন্তু আরিয়ানের শরীর যেন তখন ইস্পাতের মতো শক্ত। সে তৃণার কোনো কথাই কানে নিচ্ছে না। রাগে আর যন্ত্রণায় সে গরগর করছে। আরিয়ানের মতো বিশাল দেহের একজন মানুষের সামনে তৃণার মতো ছিমছাম গঠনের মেয়ের শারীরিক শক্তি কিছুই নয়। আরিয়ান তৃণাকে আবার সরিয়ে দিয়ে দেয়ালে ঘুসি মারতে লাগল। তৃণা বুঝতে পারছে, আরিয়ান এখন স্বাভাবিক নেই। সে কোনো এক মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
বেড সাইডে রাখা অ্যালার্ম ঘড়িটাও আরিয়ান সজোরে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারল। ঘড়িটা ভেঙে তার একটা বড় কাঁচের টুকরো ছিটকে এসে সরাসরি তৃণার কপালে লাগল। মুহূর্তেই তৃণার কপাল কেটে টকটকে লাল র’ক্ত গলগল করে গড়িয়ে পড়তে লাগল। যন্ত্রণায় তৃণার চোখ বুজে আসলেও আরিয়ানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলোর ওপর দিয়েই পাগলের মতো পায়চারি করছে আর ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় ঘুসি মারছে।
তীব্র শব্দ আর ভাঙচুরের আওয়াজ শুনে ইতিমধ্যে বাড়ির সবাই তৃণার ঘরের দরজায় জড়ো হয়েছে। সবাই মিলে চিৎকার করে দরজা ধাক্কাচ্ছে, কিন্তু ভেতর থেকে লক করা। তৃণা টলতে টলতে গিয়ে কোনোমতে দরজাটা খুলে দিল। দরজা খুলতেই বাড়ির সবার চোখ ছানাবড়া সারা ঘরে ভাঙা কাঁচের স্তূপ, আর আরিয়ানের রক্তবর্ণ চোখ!
মায়মুনা বেগম “বাবা আরিয়ান!” বলে ছেলেকে আটকাতে গেলেন, কিন্তু আরিয়ান তাঁকে চিনতেই পারল না যেন। এবার আদনান আর এমদাদুল মির্জা দুজনে মিলে আরিয়ানকে জাপটে ধরল। আরিয়ান তখনও ছটফট করছে, যেন দানবীয় কোনো শক্তি ভর করেছে তার ওপর। আদনান চিৎকার করে তার মাকে বলল, “আম্মু, সেই ইনজেকশন গুলো কি এখনো আছে? তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো!”
মায়মুনা বেগম মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন, তারপর দ্রুত পায়ে নিজের রুমে দৌড়ে গিয়ে একটা ইনজেকশন নিয়ে এলেন। তৃণা অবাক হয়ে দেখল, কী অবলীলায় তারা আরিয়ানের সাথে এসব করছে! আদনান জোর করে আরিয়ানের হাতে ইনজেকশনটা পুশ করল। কয়েক মিনিটের মাঝেই আরিয়ানের শরীর নেতিয়ে পড়ল, উন্মত্ততা কমে গিয়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
মায়মুনা বেগম ছেলের পাশে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “আমার ছেলেটা তো সুস্থ হয়ে গিয়েছিল, তবে আবারও কেন এসব শুরু হলো? কার নজর লাগল ওর ওপর!”
রাহি বেগম আর ফারহানা বেগম তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “সব ঠিক হয়ে যাবে মেজো, তুমি শান্ত হও।”
আহাদ মির্জা ছেলের এই অবস্থা দেখে বিধ্বস্ত বোধ করছেন। তিনি সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। নৌশি দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে তার চাচ্চুর হাতে দিল। পুরো বাড়িতে একটা শ্মশানের নীরবতা নেমে এসেছে।
মিতু ভিড়ের মাঝে তৃণার কাছে এগিয়ে এল। মমতার সাথে জিজ্ঞেস করল,
“তৃণা, তুমি ঠিক আছো তো?” কথা শেষ করতে করতেই মিতুর নজর গেল তৃণার কপালের দিকে। সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। মিতু আঁতকে উঠে বলল, “আরে! তোমার তো কপাল কেটে গেছে! অনেক রক্ত পড়ছে তো!”
তৃণা ফ্যাকাশে মুখে উত্তর দিল, “না ভাবি, তেমন কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আরিয়ান এমন কেন করল? ওর কী হয়েছে?”
মিতু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৃণার কপালে হাত রাখল। নিচু স্বরে বলল, “পরে একসময় সব বলব। এটা অনেক দীর্ঘ কাহিনি।”
তৃণার পা দুটে এখনো কাঁপছে। লোকটি একটি মানসিক রোগির মতো আচরণ করছিল।সকলেই একে একে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।সারা বাড়ি শান্ত হয়ে এলেও তৃণার মনের ভেতর ঝড়ের মাতম চলছে। সে ধীর পায়ে আরিয়ানের বিছানার পাশে গিয়ে বসল। মাত্র কিছুক্ষণ আগে যে মানুষটা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল, ইনজেকশনের প্রভাবে সে এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আরিয়ানের ফর্সা মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে আছে। এই অবস্থায় লোকটাকে দেখতে অনেকটা নিষ্পাপ শিশুর মতো লাগছে।
তৃণা নিজের অজান্তেই মায়ার বশবর্তী হয়ে আরিয়ানের কপালে আর গালে পরম ভালোবাসা মাখা পরশ বুলিয়ে দিল। হঠাৎ তার নজর গেল আরিয়ানের হাতের দিকে। আঁতকে উঠল তৃণা! কাঁচের এক-দুটো ছোট টুকরো চামড়ার ভেতরে গেঁথে আছে, সেখান থেকে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। উন্মত্ততার সময় হয়তো আরিয়ান নিজেই খেয়াল করেনি, আর বাড়ির সবাই তাকে শান্ত করতেই ব্যস্ত ছিল।
তৃণা দেরি না করে ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে এল। একটা টুইজার দিয়ে খুব সাবধানে কাঁচের টুকরোগুলো বের করতে শুরু করল সে। ঘুমের ঘোরেও ব্যথায় আরিয়ানের শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছিল, কপালে ভাঁজ পড়ছিল। উমর হাওলাদার টুকটাক প্রাথমিক চিকিৎসা তৃণাকেও শিখিয়েছিলেন, বাবার কাছ থেকে শেখা সেই জ্ঞানটুকু আজ খুব কাজে লাগছে। অত্যন্ত নিপুণ হাতে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে সে ব্যান্ডেজ করে দিল।
সারা ঘরজুড়ে কাঁচের ভাঙা টুকরো আর আসবাবপত্রের ধ্বংসাবশেষ। তৃণা একবার সেগুলোর দিকে তাকাল, কিন্তু শরীর আর একটুও সায় দিচ্ছে না। সারা দিনের ধকল, জ্বর থেকে ওঠা দুর্বল শরীর আর নিজের কপালের ক্ষত সব মিলিয়ে সে অবসন্ন। ঘরের এই বেহাল দশা পরিষ্কার করার মতো শক্তি তার অবশিষ্ট নেই।
সে বিছানার এক কোণে আরিয়ানের মাথার কাছে খুব সামান্য জায়গা করে কাচুমাচু হয়ে শুয়ে পড়ল। নিজের কপালের ক্ষতটা এখন দপ দপ করে তিতিয়ে উঠছে। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তৃণা ভাবতে লাগল, আরিয়ানের জীবনের এই কালবৈশাখীর রহস্যটা আসলে কী? মিতু ভাবি কোন দীর্ঘ কাহিনীর কথা বলছিলেন?
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪