রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১২
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
ঝড়-বৃষ্টির এই গভীর রাতে চারপাশটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাস্তার সোডিয়ামের আলোগুলো অনেক দূরে দূরে, যা অন্ধকারের বুক চিঁড়ে খুব সামান্যই আলো ছড়াতে পারছে। সেই ম্লান আলোতে পথ চলা প্রায় অসম্ভব। আরিয়ান দিশেহারা বোধ করছে,তৃণাকে এই অবস্থায় কোলে নিয়ে সে এখন কোথায় যাবে?
এরই মধ্যে দেখল একটা গাড়ি দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে। আরিয়ান চিৎকার করে গাড়িটিকে থামার ইশারা করল, কিন্তু ড্রাইভার গতি না কমিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আরিয়ান তিক্ত মনে বুঝল এই বিপদে কেউ অপরিচিত কারো জন্য ঝুঁকি নেবে না, এটাই বর্তমানের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। অনেকটা পথ তৃণাকে কোলে নিয়ে হাঁটলেও এখনো কোনো লোকালয় বা নিরাপদ আশ্রয়ের দেখা পায়নি সে। এই রাস্তাটাও তার খুব একটা পরিচিত নয়।
আরো কিছুটা পথ এগিয়ে আরিয়ান একটি পুরোনো পরিত্যক্ত কুঁড়েঘর দেখতে পেল।
ঘরটির চালের একপাশ ভেঙে ঝুলে আছে। নিরুপায় হয়ে আরিয়ান কোনো চিন্তা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাইরে থেকে ঘরটা যতটা জীর্ণ মনে হয়েছিল, ভেতরে অবস্থা ততটাও খারাপ নয় অন্তত বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচার মতো মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। দেয়ালের সাথে একটা পুরোনো মাদুর দাঁড় করানো।
নিচের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান দেখল কিছু তাস আর সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। তার বুঝতে বাকি রইল না যে এখানে নিয়মিত জুয়া আর নেশার আসর বসে। আজ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির কারণেই হয়তো আড্ডাটা বসেনি, যা তাদের জন্য এক প্রকার আশীর্বাদই বটে।
আরিয়ান খুব সাবধানে তৃণাকে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসাল। তৃণার ম্লান মুখটা ভিজে একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মেয়েটা এখনো চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে আছে, যেন কোনো গভীর যন্ত্রণার ঘোরে সে আচ্ছন্ন। ভেজা চুলগুলো লেপ্টে আছে কপালে আর গালের পাশে। আরিয়ান অস্থির হয়ে তৃণার কপালে হাত রাখল মেয়েটার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে।আরিয়ান তৃণার মুখে লেপ্টে থাকা চুলগুলো ধীর হাতে স্লাইড করে দিল।
অচেতন থাকা অবস্থায় তৃণার ঠোঁট দুটো অবিরত কাঁপছে। বৃষ্টির জলে ভেজা ওর নাক, মুখ আর ওই কম্পিত ওষ্ঠাধর সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সৌন্দর্য ঠিকরে বেরোচ্ছে। আরিয়ান আর তৃণার মাঝে এখন এক হাত জায়গাও ফাঁকা নেই। এই নিস্তব্ধ জীর্ণ কুঁড়েঘরে বৃষ্টির শব্দের মাঝে আরিয়ান একধ্যানে তৃণার মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে রইল।
তৃণার সিল্কের শাড়িটা ভিজে গিয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। আরিয়ানের নজর একবার সেদিকে যেতেই এক অজানা অস্বস্তিতে সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। এই কনকনে ঠান্ডায় মেয়েটাকে বাঁচানো দরকার। আশেপাশে গরম কাপড় বা চাদর জাতীয় কিছু খুঁজে না পেয়ে, আরিয়ান নিজের পরনের কোটটা খুলে খুব সাবধানে তৃণার শরীরের ওপর জড়িয়ে দিল।
তৃণার কম্পন কমছে না, বরং ঠান্ডায় সে আরও বেশি কুঁকড়ে যাচ্ছে।এমনিতেই এখন শীতকাল তার উপর হঠাৎ বৃষ্টি। ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় বাইরের বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ছিটকে ভেতরে ঢুকছিল। আরিয়ান আর কোনো উপায় না দেখে তৃণার ঠিক সামনে একটা দেয়াল বা ঢাল হয়ে বসল, যাতে তার নিজের পিঠে বৃষ্টির ঝাপটা লাগলেও তৃণার গায়ে এক ফোঁটা জল না লাগে।
পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই আরিয়ানের মেজাজ বিগড়ে গেল। স্মার্টফোনটা জলে ভিজে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। বারবার পাওয়ার বাটন চেপেও কোনো লাভ হলো না। রাগে আর হতাশায় তার নিজের ওপরই চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে। তবুও শেষ চেষ্টার আশায় সে মোবাইলের কভারটা খুলে নিজের শার্টের শুকনো অংশ দিয়ে সেটটা মুছতে শুরু করল যদি একবারের জন্য ফোনটা অন হয়, যদি একবার বাড়ির মানুষের সাথে যোগাযোগ করা যায়!
বাইরে তখন বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দ আর অঝোর ধারায় বৃষ্টি।
★★★
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আদনান, নৌশি আর মিতুর মধ্যে যেন বিশ্বযুদ্ধ চলছে। চলছে লুডু খেলা। আদনান ছেলেটা লুডুর চালে এতটাই পটু যে তার চাল দেখে মনে হয় সে কোনো এককালে লুডু সম্রাট ছিল! মিতু আর নৌশি বেচারি নিজেদের হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও আদনানের একটা ঘুঁটি কাটতে পারছে না। জিতার জন্য তারা দুজনে মিলে অনেক ফন্দিফিকির আর বাটপারি করার চেষ্টা করল, কিন্তু আদনানের বাজপাখির মতো নজরের কাছে সব ভেস্তে গেল।
খেলার একদম শেষ মুহূর্ত। আদনান যখন জিতার আনন্দে একটা ভিক্টরি স্মাইল দিতে যাবে, ঠিক তখনই নৌশি দেখল সম্মান বাঁচাতে হলে এখন ডিজিটাল হামলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সে ঝটপট নিজের মোবাইলটা হাতে নিল আর এক সেকেন্ডের মধ্যে গেইমটাই ডিলিট করে দিল!
আদনান হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“কিরে নাদানের বাচ্চা! গেইম ডিলিট করলি কেন? আমি তো জিতেই গিয়েছিলাম!”
নৌশি একদম ইনোসেন্ট একটা ভাব নিয়ে কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“আমার মোবাইল, আমার মেমোরি। আমি গেইম রাখব নাকি ডিলিট করব তাতে তোর কী?”
মিতু পাশে বসে কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বিড়বিড় করে বলল,
“শুরু হয়ে গেল আবার টম অ্যান্ড জেরি শো!”
ঠিক তখনই রাহি বেগম মিতুকে ডাক দিলেন। মিতু উঠে যাওয়ার সময় সাবধান করে দিয়ে গেল, “খবরদার! একদম ঝগড়া করবি না বলে দিলাম।”
কিন্তু তারা কি আর সেই কথা শোনার পাত্র? মিতু আড়াল হতেই আদনান তাচ্ছিল্যের সুরে টিপ্পনী কাটল,
“বুঝেছি রে, যখনি দেখলি ভরাডুবি নিশ্চিত, তখনি লেজ গুটিয়ে গেইম ডিলিট করে দিলি। হারু পার্টি কোথাকার!”
নৌশি বলে উঠল, “হ্যাঁ করেছি, তাতে তোর কী?”
আদনান এবার একটু শরীর জাঁকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে গান গাওয়ার মতো করে বলল,
“তাতে তোর কী… তাতে তোর কী! এই এক ডায়ালগ ছাড়া তুই কি আর নতুন কিছু পারিস না? ওহ আচ্ছা, ভুলেই গিয়েছিলাম!শুনলাম এবার পরীক্ষায় নাকি বিশাল এক রসগোল্লা দিয়ে ফেইল করেছিস?”
নৌশি এবার সত্যিই যেম আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় করে সে আদনানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই গোপন খবরটা সে সিন্দুকের মতো মনের ভেতর তালা মেরে রেখেছিল, আদনান এই খবর উদ্ধার করল কীভাবে?
নৌশি ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল,
“তুই… তুই কীভাবে জানলি?”
আদনান সোফায় পা তুলে জাঁকিয়ে বসে বলল,
“হাজার হোক তোর বড় ভাই! আমার নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী। এখন বল, গিয়ে সবাইকে অ্যানাউন্স করে দিই? ‘ব্রেকিং নিউজ: নৌশি ম্যাডাম পরীক্ষায় ডাব্বা মেরেছেন!’”
নৌশি এবার একদম লাইনে চলে এল। মিনমিন করে বলল, “না, না! প্লিজ কাউকে বলিস না। আম্মু জানলে আমার জানাজা পড়িয়ে দেবে।”
আদনান মনে মনে এক শয়তানি হাসি হাসল। নৌশি আঙুলের নখ কুটতে কুটতে আপনমনেই বিড়বিড় শুরু করল,
“ধুর! এসব পড়াশোনা আমার দ্বারা হবে না। এই পড়াশোনা করে মাথা নষ্ট করার চেয়ে বিয়ে করে স্বামীর সেবা করা অনেক শান্তির কাজ। ইসস! কবে যে বিয়েটা হবে আর আমি এই পড়ার নরক থেকে উদ্ধার হবো!” কথাটা বলতে বলতে নৌশি গালে হাত দিয়ে কল্পনায় হারিয়ে গেল।
নৌশির বিয়ের শখ দেখে আদনান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসি থামিয়ে চোখ সরু করে বলল,
“এখনি বিয়ের চিন্তা? আগে গিয়ে নিজের ঘরটা চেক করে আয়, বিছানায় তোর ছোটবেলার হিসুর গন্ধ এখনো ঠিকমতো যায়নি। নাক টিপলে দুধ বের হবে, আর মেয়ে কিনা এখনই বরের সেবা করার স্বপ্ন দেখছে! নাদানের বাচ্চা!”
নৌশি রাগে একদম লাল হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে গরগর করে বলল,
“আদুর বাচ্চা!! তুই কি আমাকে শান্তি দিবি না?”
আদনান সেসব রাগকে তোয়াক্কাই করল না। সে উল্টো আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলল,
“শোন একটা ঐতিহাসিক কাহিনি। তোর বয়স তখন মাত্র নয় মাস। তোকে খুব আহ্লাদ করে কোলে নিয়ে একটু আদর করতে গিয়েছি, অমনি তুই ‘পুত’ করে একদম আমার গায়ে পটি করে দিলি! উফ, সেই কী গন্ধ! আমার শার্টটাই সেদিন জ্বালায় দিতে হয়েছিল।”
আদনান নাক কুঁচকে এমন ভাব করল যেন গন্ধটা এখনো পাচ্ছে।
নৌশি আর সহ্য করতে পারল না। সম্মানের একদম দফারফা হতে দেখে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আদনানের গলা চেপে ধরল। তারপর নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আম্মুউউউ… দেখো আদু কী বলছে!”
আদনানও কম যায় না। সে গলা টিপে ধরা অবস্থায় মুখটা বাঁকিয়ে মেয়েলি স্বরে একদম নৌশিকে নকল করে চিৎকার দিল, “আম্মুউউউ!”
এরই মাঝে আহাদ মির্জা এসে সোফায় বসলেন। তিনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না, কারণ এই বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা আছে যে, আদনান আর নৌশির ঝগড়া মানেই কোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড। এটা অনেকটা বৃষ্টির মতো, যখন-তখন শুরু হয়।
ফারহানা বেগম হন্তদন্ত হয়ে উপর থেকে নিচে নেমে এলেন। রাগে মুখ লাল করে বললেন,
“কী হয়েছে তোদের দুইটার? এভাবে ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছিস কেন? পাড়া-প্রতিবেশী তো ভাববে বাড়িতে ডাকাত পড়েছে!”
আদনান সুযোগ পেয়েই ছোটমার কাছে এগিয়ে গেল। খুব ইনোসেন্ট একটা চেহারা বানিয়ে বলল,
“কী হয়েছে সেটা আমি বলছি তোমায় ছোট-মা। তোমাদের আদরের মেয়েকে আমি ওর সোনালী ছোটবেলার কিছু স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছিলাম, তাতেই ও রেগে মেগে আগুন হয়ে গেল।”
নৌশি আবারও দাঁত কিড়মিড় করে তাকাল, মনে মনে ভাবল ‘আজ তোকে আমি মেরেই ফেলব!’
আহাদ মির্জা এবার একটু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। খবরের কাগজটা সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তা কী রকম স্মৃতিচারণ করেছিস রে আদনান?”
নৌশি চিৎকার করে সাবধান করে দিল,
“খবরদার আদুর বাচ্চা! মুখ খুললে তোর কিন্তু খবর আছে!”
আদনান এবার তার বাবার একদম গা ঘেঁষে বসে বলল, “আব্বু, আমি শুধু বলেছি যে ও যখন ছোট ছিল, তখন আমার কোলে একবার ‘পুত’ করে পটি করে দিয়েছিল। ব্যস! এই সামান্য সত্যি কথাটা বলাতেই ও খেপে লাল হয়ে গেছে।”
কথাটা শোনামাত্র আহাদ মির্জা হো হো করে হেসে দিলেন। নৌশি এবার ছোট বাচ্চাদের মতো শরীর জাঁকিয়ে কান্নাসুরে বলল, “চাচ্চু! তুমিও হাসছো? তুমিও আদুর দলে?”
আহাদ মির্জা হাসি থামিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে মাথা নাড়ালেন, যেন তিনি কিছুই করেননি। ঠিক তখনই আগুনে ঘি ঢালার জন্য এন্ট্রি নিলেন নৌশির আম্মু রাহি মির্জা। তিনি এক গাল হেসে বললেন,
“আরে ও তো শুধু আদনানের কোলে না, নৌশি ছোটবেলায় যার কোলেই যেত, তাকেই উপহার দিয়ে দিত!”
নৌশি এবার দুই কানে হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলে উঠল,
“হ্যাঁ, সবাই মিলে আমার মান-সম্মান একদম ধুয়েমুছে পানির সাথে মিশিয়ে খেয়ে নাও! আমি আর এ বাড়িতে থাকবই না!”
মায়মুনা বেগম হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন। তিনি নৌশিকে আদুরে ঢঙে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“কেন এসব বলছো তোমরা? আমাদের নৌশিটা তো এখন বড় হয়েছে, এভাবে লজ্জা দিচ্ছো কেন!”
নৌশি মায়মুনা বেগমের বুকে মুখ লুকিয়ে অভিমানী স্বরে বলল,
“বড়মা, তোমার ছোট ছেলেটা দিন দিন বড্ড পাজি হয়ে যাচ্ছে। ও সবসময় আমাকে এভাবে পচায়!”
মায়মুনা বেগম নৌশির থুতনিতে আঙুল ছুঁয়ে আদর করে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি ওকে আজ খুব বকা দিয়ে দেব।”
আহাদ মির্জা সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে ফারহানা বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আচ্ছা, নুসরাত হঠাৎ কোনো কিছু না বলেই হোস্টেলে ফিরে গেল কেন?”
ফারহানা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“জানি না ভাইজান। মেয়েটা ইদানীং আবারও কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে। আমি অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু প্রতিবারই এক উত্তর এখানে নাকি তার পড়াশোনায় খুব সমস্যা হচ্ছে।”
আহাদ মির্জা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠল। চোখের চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখলেন আরিয়ানের কল। এই অসময়ে আরিয়ানের ফোন দেখে তিনি কিছুটা অবাক হয়ে বিড়বিড় করলেন, “এত রাতে আরিয়ান ফোন দিচ্ছে কেন!”
কলটা রিসিভ করতেই আহাদ মির্জা বললেন,
“হ্যাঁ আরিয়ান, বল। তোরা কি আজ ফিরতে পারবি? বাইরে তো প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।”
ওপাশ থেকে আরিয়ান বিস্তারিত সব খুলে বলল। সব শুনে আহাদ মির্জা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “
তৃণার শরীর কি খুব বেশি খারাপ?”
ওপাশ থেকে আরিয়ানের উত্তর শুনে তিনি আবারও বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখনই গাড়ি পাঠাচ্ছি। তুই সাবধানে থাক।”
আরিয়ান কল কেটে দেওয়ার পর ড্রয়িংরুমের সেই হাসিখুশি পরিবেশে মুহূর্তেই এক থমথমে ভাব নেমে এল। মায়মুনা বেগম ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে আরিয়ানের? ও ঠিক আছে তো?”
আহাদ মির্জা সংক্ষেপে জানালেন,
“আরিয়ানের কিছু হয়নি। আসলে রাস্তায় হঠাৎ ওদের গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। গাড়ি থেকে নামতেই বৃষ্টির মধ্যে পড়ে যায় ওরা। অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার কারণে তৃণা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ইকবাল মির্জা এবং এনামুল মির্জা অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আহাদ মির্জা আদনানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আদনান, তুমি আর তোমার ছোট চাচ্চু এখনই আরেকটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। আরিয়ানরা রাস্তার মোড়ে আটকে আছে।”
আহাদ মির্জা দ্রুত আরিয়ানের লোকেশন বুঝিয়ে দিলেন। আদনান আর এনামুল মির্জা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বৃষ্টির মাঝেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
★★★
অনেকটা সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু গাড়ি নিয়ে এখনো কেউ এসে পৌঁছালো না। আরিয়ান তৃণা থেকে খানিকটা দূরত্বে বসে অস্থিরভাবে সময় গুনছিল। বৃষ্টির বেগ এখন কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু বাতাসের হিমেল ঝাপটা কমেনি। হঠাৎ আরিয়ান খেয়াল করল, অচেতন তৃণা ঠোঁট নাড়িয়ে অস্ফুট স্বরে কিছু বলার চেষ্টা করছে।
আরিয়ান উৎসুক হয়ে কান পাতল, কিন্তু বৃষ্টির শব্দের মাঝে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। সে আরও একটু ঝুঁকে তৃণার মুখের কাছে কান নিল। খুব ক্ষীণ স্বরে তৃণা বারবার বলছে, “পানি… পানি…।”
তৃণার তৃষ্ণার্ত কণ্ঠ শুনে আরিয়ান চিন্তায় পড়ে গেল। এই ভাঙা ঘরে পানি পাবে কোথায়? আকাশের বৃষ্টির পানি এই অসুস্থ শরীরে খাওয়ানো একদমই ঠিক হবে না। আরিয়ান মরিয়া হয়ে দরজার কাছে উঁকি দিল। ঘরের সামান্য দূরেই একটা টিউবওয়েল দেখতে পেল সে। হাতের কাছে পানি আনার মতো কোনো পাত্র না পেয়ে, আরিয়ান শেষমেশ নিজের দুই হাতের তালু আজলা করে টিউবওয়েল থেকে পানি ভরে নিয়ে আসলো। তারপর তৃণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে খুব সাবধানে তার ঠোঁটে পানির ছোঁয়া দিল। তৃণা কয়েক ঢোক পানি পান করতেই তার চোখের পাপড়িগুলো সামান্য কেঁপে উঠল।
তবে তৃণার শরীর এখনো ভীষণভাবে কাঁপছে। ঠান্ডার তীব্রতায় কাঁপুনিটা এতটাই বেড়েছে যে আরিয়ান আর স্থির থাকতে পারল না। সে নিজের সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে তৃণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের বুকের উষ্ণতায় তাকে আগলে নিতেই আরিয়ান চমকে উঠল তৃণার শরীর আগুনের মতো গরম! মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে মেয়েটার শরীরে ধুম জ্বর চলে এসেছে।
তৃণার চেতনা সামান্য ফিরেছে। ঘোরের মধ্যে সে বুঝতে পারছে না কার বুকের উষ্ণতায় সে আশ্রয় পেয়েছে। সে যদি স্বাভাবিক থাকত, তবে হয়তো লজ্জায় নিজেকে সরিয়ে নিত। কিন্তু এখন সে নিঃসাড়। আরিয়ান আরও শক্ত করে তাকে নিজের সাথে চেপে ধরল, যাতে জ্বরে পোড়া শরীরটা একটু স্বস্তি পায়। ধীরে ধীরে তৃণার তীব্র কম্পনটা কিছুটা থিতিয়ে এল।
আরিয়ানের রাগে গা রি রি করছে। এতক্ষণ আগে কল দিয়েছে, অথচ এখনো কেউ পৌঁছাতে পারল না! ঠিক সেই মুহূর্তে নিস্তব্ধতা ভেঙে বাইরে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল। গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো কুঁড়েঘরের ভাঙা চালে এসে পড়ল। বাইরে থেকে আদনানের উচ্চস্বর শোনা গেল,
“ভাইয়া! ভেতরে আছো তোমরা?”
আরিয়ান যেন প্রাণ ফিরে পেল। সে সজোরে উত্তর দিল, “হ্যাঁ আদনান, ভেতরেই আছি! জলদি আয়!”
এনামুল মির্জা আর আদনান তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। তাদের দেখেই আরিয়ান রাগী স্বরে ফেটে পড়ল,
“ কখন আসতে বলেছি! এতটুকু রাস্তা আসতে এত দেরি লাগে?”
এনামুল মির্জা আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,
“শান্ত হ আরিয়ান। মেইন রাস্তায় একটা গাছ উপড়ে পড়ে রাস্তা পুরোপুরি ব্লক হয়ে ছিল। পুলিশ আর ফায়ার সার্ভিস আসার অপেক্ষায় না থেকে আমাদের অন্য দীর্ঘ রাস্তা ঘুরে আসতে হয়েছে, তাই এতটা দেরি হয়ে গেল।”
আরিয়ান আর তর্কে গেল না। সময় নষ্ট না করে সে তৃণাকে পাজাখোলা করে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসল। আদনান ড্রাইভিং সিটে বসে স্টার্ট দিল। এনামুল মির্জা পাশ থেকে জিজ্ঞেস করলেন,
“এখন কি তৃণাকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাবি?”
আরিয়ান তৃণার জ্বরে তপ্ত কপালে হাত রেখে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“না চাচ্চু, এখন হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শরীরে শুধু প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। বাড়িতে গিয়ে আগে ভেজা কাপড় পাল্টে নিলে আর ডক্টর চাচাকে কল করে একটা চেকআপ করালেই আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।”
আরিয়ানের কথা শুনে আদনান জানাল,
“ভাইয়া, তোমার ফেলে আসা গাড়িটার জন্য আমি অলরেডি টোয়িং সার্ভিসকে কল করে দিয়েছি। ওরা ওটা গ্যারেজে নিয়ে যাবে।”
আরিয়ান খুব নিচু স্বরে বলল, “ভালো করেছিস।”
গাড়ি দ্রুতগতিতে বাড়ির দিকে ছুটছে। আরিয়ানের কোল ঘেঁষে তৃণা অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। বাইরের অন্ধকারের মাঝেও গাড়ির ভেতরের আবছা আলোয় আরিয়ানের চোখ বারবার তৃণার মুখে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। যতবার সে তৃণার শান্ত আর অসহায় চেহারার দিকে তাকাচ্ছে, ততবার এক অজানায় আরিয়ানের গলা শুকিয়ে আসছে। নিজের অজান্তেই সে তৃণার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল,এক মুহূর্তের জন্য তৃণার দিক থেকে সে তার মনোযোগ সরাতে পারছে না।
চলবে…
(লেখায় ভুল থাকলে ধরিয়ে দিয়েন।আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭