Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১

শ্বশুর বাড়িতে প্রথম পা রাখার মুহূর্তেই শাশুড়ি মা তীব্র চিৎকারে তিক্ত কণ্ঠে বললেন,
“এই মেয়ে যেন আমার ঘরে প্রবেশের সাহস না করে। আমি এই মেয়েকে কোনোভাবেই আমার ঘরের পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেব না!”
​আমি মাথায় ঘোমটা টেনে দরজার বাইরে থমকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলাম। শাশুড়ির মুখ থেকে এমন কটূক্তি শুনে যেকোনো মেয়েই হয়তো বিস্মিত হতো, কিন্তু আমি হলাম না। কারণ, এমনটাই যে ঘটবে, আমি তা আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিলাম। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম, আর দু’চোখে জল ভরে আসতে লাগল।
​পাশে দাঁড়ানো স্বামীটির দিকে তাকালাম। তাঁর মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে সাহস পেলাম না,শুধু দেখলাম, শেরওয়ানি পরিহিত লোকটি নিবিষ্ট মনে কাউকে মেসেজ পাঠাচ্ছে, তাঁর মুখে স্পষ্ট চিন্তার রেখা।বুঝতে পারলাম লোকটি নিজের স্ত্রীর অপমানে চিন্তিত না বরং অন্য কোনো কারণে। তবুও ভেবেছিলাম তিনি নিজ স্ত্রীর অপমানে অন্ততপক্ষে কিছু বলবে।কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রামানিত করে লোকটি তড়িঘড়ি কাউকে ফোন করতে করতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমাকে বাইরে একা দাঁড় করিয়েই, একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকালেন না। আমার হৃদয়টা আরও শূন্য ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।

​শাশুড়ি মা আরও সামনে এগিয়ে এলেন, ক্রোধে কপাল কুঁচকে, আমার গালে আঙুল দিয়ে শক্ত করে চাপ দিয়ে বললেন, “কী রে দুশ্চরিত্রা, শেষ পর্যন্ত আমার ঘরে ঢোকার জন্য আমার ছেলেটাকে বিয়ে করলি? যা, এই মুহূর্তে আমার চৌকাঠ থেকে বিদায় হ!”

​আমি শুধু চিৎকার করে কেঁদে উঠতে পারলাম না। এত এত মানুষ আর সকলের দৃষ্টি আজ আমার এই অপমানের সাক্ষী!এবার একজন মহিলা আমার শাশুড়ীকে টেনে নিয়ে বোঝানোর স্বরে বলল,
​“আপা এসব বাইরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললে তো আমাদের পরিবারের মানসম্মান যাবে। যা হওয়ার হয়েছে, আগে বউকে ঘরে তুলি, তারপর না হয় সব কথা হবে।”

​মির্জা পরিবারের নতুন বধূর এই অপমানের দৃশ্য এলাকার সবাই খুব মজা নিয়ে দেখছে। এই সময় দুজন মহিলা এগিয়ে এসে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। এই দুজনকে আমি চিনি একজন আমার চাচি শাশুড়ি আর অন্যজন কাকি শাশুড়ি। মির্জা পরিবার বিরাট বড়। বিয়ের আগে শুধু তাদের নামডাক শুনেছিলাম।
​আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম বিশাল বড় একটি ড্রয়িংরুম। বাড়িতে অনেক মানুষ, যৌথ পরিবার বলে কথা।কিন্তু কারে মুখে নতুন বধূর জন্য কোনো উচ্ছাস লক্ষ্য করতে পারলাম না।
★★★

​আজ বিয়ের প্রথম রাত।একজন মেয়ে আমাকে একটা ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেল।ওই মেয়েটা হয়তো আমার ভাসুরের স্ত্রী আমার ঠিক জানা নেই।শুধু যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে,
“আজ রাতে যাই হোক না কেন মুখ বুঁজে সহ্য করে নিও বোন।”

এই কক্ষটা বিশাল বড়।আধুনিক আসবাপত্র দিয়ে সাজানো। আমি এখনো আমার স্বামীর মুখ দেখিনি। ঘরে একটি ছবিও নেই।শুধু পুরুষটির নামটাই আমার জানা।পুরুষটির নাম বিয়ে পড়ানোর সময় কাজীর মুখ থেকে শুনেছিলাম #আরিয়ান_মির্জা।

এবার আমার পরিচয়টা দেওয়া যাক। আমার নাম #তৃণা_হাওলাদার। হাওলাদার বাড়ির বড় মেয়ে। বড় মেয়ে হলেও কখনো বাড়ির মেয়ের মতো মর্যাদা পাইনি। আমার সাথে সব সময় কাজের মেয়ের মতোই ব্যবহার করা হতো। মা না থাকলে তো তাই হয়।
​আমার বাবা উমর হাওলাদার, একজন ডক্টর। আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আমার কথা চিন্তা করে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন, তখন আমার বয়স ছিল এগারো বছর। আমার দ্বিতীয় মা (সৎ মা) আমার সাথে সব সময়ই খারাপ ব্যবহার করতেন। আমার সৎ মায়ের আগের পক্ষের স্বামীর ঘরে একটি মেয়েও ছিল, যার বয়স তখন চৌদ্দ বছর।
বেশ কিছুদিন খুব আদর করতেন কিন্তু কিছুদিন পরই মায়ের আসল রুপ বেরিয়ে গেল।​তখন থেকেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।মায়ের অত্যাচারের সাথে বড় বোন রিনির থেকেও অত্যাচারিত হতে হতো। বাবা যখন বাসায় থাকতেন না, তখন সব সময় আমার সৎ মা আমার ওপর অত্যাচার করতেন এবং বাড়ির সব কাজ আমাকে দিয়েই করাতেন।আমি সব কিছু সহ্য করে নিলাম।প্রথম প্রথম বাবার সাথে সব কিছু বলতাম।বাবা রেগে মায়ের সাথে এই বিষয়ে ঝগড়া করত কিন্তু মাকে বুঝাতে বাবা কখনো সক্ষম হয়নি।যখন থেকে বুঝ হলো তখন বাবা কেও এসব বিষয়ে বলা ছেড়ে দিলাম।
​এভাবেই আমার জীবন কেটেছে। বাড়িতে বসেই টেনেটুনে পড়াশোনা করে কলেজ পাশ করলাম। এরপর আমাকে আর পড়তে দেওয়া হলো না।
পড়াশুনা করার ভীষণ ইচ্ছে ছিল আমার কিন্তু কথায় আছে না সবার কপালে সবকিছু থাকে না।

​ঘড়ির দিকে তাকালাম, রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। ভীষণ ঘুমও পেয়ে গেছে। আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। চোখ লেগে আসার আগেই হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ হলো। আমার ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল।
​দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন, লম্বা চওড়া পুরুষ। বুঝতে পারলাম এটাই হয়তো আমার স্বামী। এক কথায় বলা যায় সুদর্শন পুরুষ। পুরুষটির আমার গায়ের রংয়ের চেয়ে ওনার গায়ের রং ফর্সা। মুখে কুচকুচ হালকা চাপ দাঁড়ি।
​তবে পুরুষটিকে দেখে একদমই স্বাভাবিক লাগছে না। আঁকাবাঁকা পা ফেলে সামনে এগিয়ে আসছেন। লোকটি হয়তো মদ্যপান করেছেন। আমার বুক দুরুদুরু করে কাঁপছে, ভেতরে ভয়টা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

​লোকটি একদম আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি ভয়ে পেছনে সরে গেলাম। লোকটি আমার দিকে বেশ কিছুক্ষন অদ্ভুত নয়নে তাকিয়ে রইল।পা থেকে মাথ পর্যন্ত পরখ করে বলল,
​“তুই তাহলে আমার বউ?”

​আমি কথা বলতে পারলাম না, ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। লোকটির চোখ অস্বাভাবিক রকম লাল।
​“তুই এখানে কী করছিস? যা, বের হ আমার রুম থেকে!”
​লোকটি চিৎকার করে কথাটা বললেন।
​আমি তোতলিয়ে বললাম,
“কো…কোথায় যাব আমি?”

​“তুই জাহান্নামে যা! তোকে যেন আমার ঘরে না দেখি।”

​আমি গেলাম না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমিও দেখি, আমার জীবনে আর কত খারাপ দিন আসে। আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে বললাম,
​“আপনি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারেন না। আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী।”

​লোকটি চিৎকার করে দাঁত কিঁচিয়ে বলল,
​“ মাই ফুট! আই সেড, গেট আউট অফ মাই রুম!”

লোকটির চিৎকার কেঁপে উঠল আমার পুরো শরীর। ​আমি শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। সকল মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন থাকে। আর আমার সাথে এসব কী ঘটছে!


আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাগে আমাকে জোরে ধাক্কা দিল। আমি গিয়ে পড়লাম শো-পিসটার ওপর। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগলো। কপালে হাত দিয়ে বুঝতে পারলাম কপাল কেটে গেছে।আমি কুঁকড়ে কেঁদে উঠলাম।
​লোকটির আর সাড়াশব্দ না পেয়ে আমি পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম, লোকটি বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে, হয়তো মাতাল থাকার কারণে ঘুমিয়ে গেছেন।

আমি লোকটির পায়ের জুতো জোড়া খুলে দিতে চাইলাম, কিন্তু লোকটি পা সরিয়ে নিলেন। বুঝতে পারলাম, লোকটি সম্পূর্ণ অচেতন হননি। আরিয়ান আমার দিকে মিটমিট করে তাকালেন এবং বললেন,
​“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, গিয়ে ঘুমা।”

​বলেই একটি বালিশ আমার দিকে ছুঁড়ে মারলেন।
​আমি সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম, বালিশটা তুলে নিলাম। চোখের সামনে নিজের স্বপ্নগুলো ভেঙে যেতে দেখার চেয়ে বড় কষ্ট পৃথিবীতে আর নেই। কত স্বপ্ন ছিল কোনো একদিন কেউ এসে আমাকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু আমার জীবনে আবারও কষ্ট এসে ভিড় করল।
​এত কিছুর মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে গেল তৌহিদের কথা। ছেলেটা এখন কী করছে? তৌহিদ ছিল আমার প্রথম ভালোবাসা। সে ছেলেটাকেই নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম, একটি সুখের সংসার গড়ব, কিন্তু তা আর হলো না।

চলুন, আসল ঘটনাটা জেনে আসা যাক…

​আমার সৎ বোন রিনির আজ এই বাড়িতে আরিয়ান মির্জার স্ত্রী হয়ে আসার কথা ছিল।
​আমার বোন রিনি আর আরিয়ানের বিয়েটা ঠিক হয় পারিবারিকভাবেই। আরিয়ানের বাবা আর আমার বাবা স্কুলজীবনের বন্ধু ছিলেন। সেই হিসেবেই তাঁদের স্বপ্ন ছিল ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অটুট রাখবেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল তখন, যখন বর চলে এলেন অথচ রিনিকে নিজের ঘরে খুঁজে পাওয়া গেল না। পুরো বাড়ি খোঁজা হলো, কিন্তু কোথাও রিনি নেই। এরপর রিনির পড়ার টেবিল থেকে একটি চিঠি পাওয়া যায়, যেখানে লেখা ছিল সে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গেছে।

​বাবা তাঁর মানসম্মান বাঁচাতে আরিয়ান মির্জার সাথে আমার বিবাহ দিলেন। একবারও কেউ ভাবলো না, এই বিয়েতে আমি রাজি আছি কি না। এই বিয়ে যে সুখকর হবে না, সেটা আমি জানি।
​আমার জীবনচক্র কেন এতটা ভয়াবহ হলো, তা আমার জানা নেই। জীবনে তো কখনোই সুখের মুখ দেখতে পারিনি। ভেবেছিলাম একটা সুন্দর জীবন হবে, কিন্তু এখন আমি বাঘের খাঁচা থেকে পালিয়ে সিংহের খাঁচার মুখে পড়ে গেলাম

​বালিশটা ফ্লোরে মাথার নিচে রেখে শুয়ে পড়লাম। পরনে তখনও সেই বেনারসি শাড়ি। কেউ বলেনি শাড়িটা পাল্টে নিতে। বলেনি বললে ভুল হবে, আমার শাশুড়ি কাউকে আমার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেননি।
​কখন ঘুমিয়ে গেলাম, টের পেলাম না।

​ঘুম ভাঙল অনেকক্ষণ পর। কয়টা বাজে, তা আন্দাজ করতে পারলাম না। উঠে বসলাম। ভীষণ খিদে পেয়েছে। সামনের সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা ঠেকছে। বিয়ের আগের দিন রাতে শেষ খেয়েছিলাম। এই বাড়িতে আসার পরও আবেগের তোড়ে খিদেটা ঠিক টের পাইনি। এই বাড়ির এতগুলো মানুষ অথচ কেউ আমাকে একফোঁটা খাবারও খেতে দিল না। আর এখন ঘুম থেকে ওঠার কারণে খিদে আরও বেড়ে গেল। পেটেও তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম।

​উঠে গিয়ে টেবিল থেকে জল খেলাম। কিন্তু জল খেয়েই আরও বিপত্তি হলো নাড়িভুঁড়ি যেন এখুনি উল্টে বেরিয়ে আসবে। দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম, কিছুক্ষণ বমি করলাম। এখন শরীরে এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ট নেই। ওয়াশরুমের ফ্লোরেই অবসন্ন হয়ে বসে পড়লাম। মনে হচ্ছে, এখুনি বুঝি দুনিয়া ছেড়ে চলে যাব।

​আমার জন্মদাত্রী মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছে। কিন্তু মা আমার কাছে এসে একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন না। ইচ্ছে করছে মায়ের কোলে মাথা রেখে একটা গভীর ঘুম দিতে, কিন্তু তা আর হচ্ছে না।
​আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। এই ঘরটা দ্বিতীয় তলায়। নিচতলায় ড্রয়িংরুমে মৃদু আলো। আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। রান্নাঘরে ঢুকে চারদিক হাতড়ে খুঁজতে লাগলাম খাবার। এখন না খাবার খেলে বাঁচব বলে তো মনে হয় না।

​ফ্রিজ খুলে দেখলাম ভেতরে অনেক খাবার। অনুষ্ঠান উপলক্ষে হয়তো অনেক কিছু রান্না করা হয়েছিল। আমার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। খাবার বের করে ফ্লোরে বসে খেতে শুরু করলাম। আহা! কী শান্তি লাগছে খাবার খেয়ে!
​হঠাৎ টের পেলাম, সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমার হাত থেমে গেল। বুঝতে পারলাম, এতক্ষণ যে খাবারগুলো খেলাম, সেটা হয়তো আর হজম করতে পারব না। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে আসলো। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগলো।

চলবে…

সূচনা_পর্ব

গল্প #রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
(প্রথম পর্ব কেমন হলো জানাতে ভুলবেন না।)

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply