ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||৩৩||
সারিকা_হোসাইন
রণ’র প্রশ্নে ইতিউতি ভয়ার্ত নজর বুলালো সাদনান মির্জা।ইশতিয়াক নামক ছেলেটাকে দোকানের আশপাশে দেখা যাচ্ছে না।এমনিতেই সার্বক্ষণিক সাদনান মির্জার দোকানের আশেপাশে প্রহরীর মতো লেগে থাকে।অনুসরণ করে প্রতিটি পদক্ষেপ।এতেও শেষ হয়।কারো সাথে হেসে দুটি কথা বললেও খবর যায় নোমান শাহরিয়ার এর কাছে।বিনিময়ে ফিরতি মেলে হুমকি ধামকি।সাদনান মির্জার ভীত পাণ্ডু মুখ দেখে রণ তপ্ত শ্বাস ছোড়ে বললো
“প্রত্যেকটা মিনিট সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ ছোট আব্বু।আমার হাতে সময় খুব কম।এভাবে মুখ বন্ধ রাখলে নিজেও মরবে সঙ্গে সবাইকেই মারবে।আমি জানি নোমান তোমাকে ভয় দেখিয়ে এসব করাচ্ছে।কিন্তু কেন?হঠাৎ নোমান তোমার পেছনে কেন লাগবে?হসপিটালে তোমাদের সব কথা আমি শুনে নিয়েছি।তুমি মুখ না খুললেও আমি সব সত্য বের করতে পারবো।কিন্তু তাতে সময় প্রয়োজন।আপাতত আমার হাতে সময় নেই।তাই তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছি।
কিছুটা মেজাজ দেখিয়েই উঁচু গলায় কথা গুলো বললো রণ।তার মাথা কাজ করছে না।নোমান ইতোমধ্যে বড় কোনো ষড়যন্ত্র সাজিয়ে ফেলেছে রণ তা জানে।কিন্তু কি ধরনের ষড়যন্ত্র তা জানেনা।পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করছে।অহেতুক নাটক কেবল মৃত্যু ডেকে আনবে এখন।
সাদনান মির্জা ধীর লয়ে গলা খাকরি দিয়ে নিচু গলায় বলল
“যেটা আমার দেখা অনুচিত ছিল সেটা আমি দেখে ফেলেছি রে রণ।তার জন্য তোদের সবাইকে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে সেই সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে আমার মেয়ের জীবন।
রণ ভ্রু কুঁচকে উদ্বেগ নিয়ে শুধালো
“কি দেখেছো তুমি?
সাদনান মির্জার কপালে চিবুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলো।সেগুলো করপুটে মুছে ফাঁকা ঢোক গিলে বললো
“বিল্লালের মৃত্যু!
রণ’র চোখ বিস্ফারিত হলো।সেই সঙ্গে সাদনান মির্জা বলে উঠলো
“আমি থানায় এ নিয়ে কেস পর্যন্ত করতে গেছি।কিন্তু পুলিশ আমার কেস নেয়নি।উল্টো ওই পিশাচের কাছে আমার নাম বলে দিয়েছে।সেই থেকে আমার জীবন নরক হয়ে যাচ্ছে।দিন রাত কিভাবে গড়াচ্ছে কিচ্ছুটি জানিনা আমি।সারাক্ষন মৃত্যু ভয়ে তটস্থ থাকছি সেই সঙ্গে মৌনতার জীবন নাশে ভীত হচ্ছি।আমি যে নিরুপায়।
রণ চুল টেনে ধরলো মাথার।ঘটনার বিস্তৃতি বহুদূর।তবুও এটার মীমাংসা প্রয়োজন।রণ সন্দিহান গলায় শুধালো
“ভাইয়ার বিয়ের আগে জানতে ওই লোকটি নোমান?
সাদনান মির্জা মাথা নেড়ে জবাব দিলো
“বৌভাতের দিন থেকে ওই ছেলে আমাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে চলেছে।এক মুহূর্তের জন্য শান্তি দিচ্ছে না।আমি আত্মহত্যা করবার অনেক চেষ্টা করেছি রে বাবা।কিন্তু সেটাও পারছি না।
“কাউকে জানাও নি কেন?
“সারাক্ষন একটা ছেলে আঠার মতো লেগে থাকছে।আমার সমস্ত তথ্য তার কাছে।আমি মুখ খুললেই মৌনতা আর মাহির মুইনের ক্ষতি করে দেবে।আমি নিরুপায়।
রণ সব বুঝে গেলো।নোমানের খেলা শেষ না করে মিশনে গেলে মৌনতা যে হারাতে হবে চূড়ান্ত ভাবে।শুধু তাই নয়,নোমান মির্জা বাড়ির মানুষ গুলোকে উনুনে পুড়িয়ে কাবাব করে ছাড়বে।তাই সবার আগে যত দ্রুত সম্ভব নোমানের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
রণ আর দাঁড়ালো না।থানায় যেতে হবে একবার।ওসির সাথে পোস্ট মর্টেম এর প্রমাণাদি নিয়ে কথা বলতে হবে।
মনের ভাবনা মনে পুষে বেরিয়ে গেলো রণ।যাবার আগে বলে গেলো
“আমি থানায় যাচ্ছি।তোমাকে ফোন করলে থানায় আসবে।যা দেখেছো তার সাক্ষী দেবে।আমিও দেখতে চাই আইনের উর্দি পরে আইনের লোক গুলো কিভাবে দেশের সাথে,দেশের মানুষের সাথে বেইমানি করতে পারে!…
হনহন করে নিজের জিপে গিয়ে উঠলো রণ।ছুটলো উপজেলা থানায়।আজ অনেক কাজ তার ।নোমানের প্রাপ্য সাজা নোমানকে পেতেই হবে।নয়তো মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে প্রশাসন থেকে।
গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ফেলে হাইওয়ে ধরেছে রণ।এখান থেকে এক ঘন্টার রাস্তা উপজেলা।তাদের গ্রামটা শহর থেকে বেশ ভেতরে।হাতের নাগালে চাইলেও সব কিছু মেলে না।রণ গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে ভাঙা পিচ ঢালা রাস্তা ধরলো।এমন সময় বেজে উঠলো ফোন।স্ক্রিনে দুর্জয়ের নম্বর।এত ব্যস্ততার মাঝেও রাস্তার এক পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফোন তুললো রণ।
“হ্যালো….
ওপাশ থেকে উচ্ছসিত দুর্জয়ের কন্ঠ পাওয়া গেলো
“গেস কর আমি কোথায়?
এই মুহূর্তে হেয়ালির সময় নেই রণ’র।রণ তর্জনী আর মধ্যমা আঙ্গুলি দিয়ে কপাল স্লাইড করলো অতঃপর বললো
“খুব ডিপ্রেশনে আছি দূর্জয়।এই মুহূর্তে এসব ভালো লাগছে না।
দূর্জয় কিছুটা মিইয়ে গেলো।সে উচ্ছাস দমিয়ে বলে উঠলো
“আমি কদমতলী বাস স্ট্যান্ড এ দাঁড়িয়ে আছি।চেয়েছিলাম তোকে সারপ্রাইজ দেবো।বাট তোদের গ্রামের নাম কিছুতেই মনে করতে পারছি না।প্লিজ ভাই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা।নয়তো বল গ্রামের টা কি আমিই কিছু একটা ধরে আসছি।
রণ ফস করে শ্বাস ফেললো।বললো
“আমি কদমতলীর কাছাকাছি।একটু উপজেলা শহরে যাচ্ছিলাম।তুই দাঁড়া আমি আসছি।
বলেই কল কাটলো রণ।অতঃপর আবারো ছুটে চললো।
মিনিট পাঁচেক পরেই কদমতলী বাসস্ট্যান্ড এ এসে পৌছালো রণ।রাস্তায় ব্যাগ বোঁচকা নিয়ে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে দূর্জয়।রণ জিপ থেকে নেমে দৌড়ে গেলো এরপর মেকি রাগ দেখিয়ে বললো
“আমাকে জানিয়ে আসবি না?
“জানিয়ে এলে তুই সারপ্রাইজড হতি?
“এমনিতেও সারপ্রাইজড হইনি।
“তো?
“বিরক্ত হয়েছি।খুব প্রেশারে আছি।
“নব বধূ বেশ পেরেশানি করছে বুঝি?
রণ বুঝলো দূর্জয় সিরিয়াস মুহূর্তে তার মেজাজ বিগড়ে দেবে।সহ্য করতে না পেরে সে দুর্ব্যবহার করবে।তাতে দূর্জয় মনোকষ্ট পাবে।তাই সে দুর্জয়ের কথার উত্তর না দিয়ে চারপাশে ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা খুজলো।কিন্তু ভর দুপরে পুরো বাস স্ট্যান্ড খালি।পরিচিত মানুষ জন ও দেখা যাচ্ছে না।রণ উপায় না পেয়ে নিজের জিপের চাবি দিয়ে বলে উঠলো
“গ্রামের নাম ফতেহ পুর।এই রাস্তা ধরে চলতে থাকবি।মিনিট বিশেক পর হাতের বা দিকে একটা ছোট খালের উপর ব্রিজ পাবি তার পর ইটের গাঁথুনির রাস্তা ।ওটা ধরে দশ মিনিট গেলে হাতের ডানে একটা কাঁচা রাস্তা পরবে।কাঁচা রাস্তার শেষ মাথায় মির্জা বাড়ি।তুই চলে যা একা।আমার কাজ আছে।বিকেলে দেখা হবে তোর সঙ্গে।
দূর্জয় ফট করে বললো
“আমিও যাই তোর সঙ্গে সমস্যা কোথায়?যেতে যেতে বাসর রচনা সমর্পকেও জানা হলো আমারও এক্সপেরিয়েন্স হলো।সামনে তো বিয়ে সাদি করতে হবে নাকি?
রণ দাঁত চেপে চুপ করে জিপের চাবি দুর্জয়ের হাতে গুঁজে চিবিয়ে বললো
“আল্লাহর দোহায় লাগে মাফ কর।
হঠাৎ দুর্জয়ের নজর গেলো রণ’র হাতে,ফট করে বলে উঠলো
“নাইস ওয়াচ
বলেই জোর করে হাত থেকে ঘড়ি খানা খুলে নিজের হাতে পরতে পরতে জিপে উঠে প্রশস্ত হাসি দিয়ে জিপ স্টার্ট করলো।অতঃপর বললো
“একদিন আমার খুব মিস করবি।সেদিন আর পাবিনা।ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকবো।সেদিন বুঝবি কি হারিয়েছিস!থাকতে পাত্তা দিচ্ছিস না তো?
রণ বাই জানিয়ে একটা সিএনজি ধরে উপজেলায় রওনা হলো।দূর্জয় ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে ছুটলো ফতেহপুর এর উদ্দেশ্যে।
কিছুদূর যেতেই নিজ পকেটে হাত বুলালো রণ।দরকারি একটা কল করা প্রয়োজন।কিন্তু একি!পকেটে ফোন নেই।তপ্ত শ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ালো রণ এরপর ওয়ালেট খুজলো।সেটাও লাপাত্তা।সব পকেট থেকে বের করে জিপের ড্রয়ারে রেখেছিলো।নিজের এমন ভুলোমনা দেখে মাথা ঠুকে মরে যেতে ইচ্ছে হলো রণ’র।নোমানের প্রমান ওয়ালা নোট টা ওই ওয়ালেট এ।কোন ভাবেই ওটা হারানো যাবে না।উপায়ন্তর না পেয়ে সিএজি ড্রাইভার কে রণ অনুরোধ করলো
“ভাই একটু গাড়ি ঘোরান।জিপে টাকা,মানিব্যাগ ,মোবাইল সব ফেলে এসেছি।
গ্রামীন পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে রাস্তার দুপাশে নজর বুলাতে বুলাতে ছোট ব্রিজ ওয়ালা খালটার সামনে চলে এলো দূর্জয়।এমন সময় সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো একটা মাঝারি আকৃতির ইটের ট্রাক।দূর্জয় সাইড দিয়ে ব্রিজের কিনার ঘেষে চলতে লাগলো।কিন্তু হায়েনা ট্রাক ড্রাইভার এর মনে বুঝি অন্য কিছু।সে ইট ভর্তি ট্রাক তুলে দিলো ছোট জিপটার উপর।মুহূর্তেই ট্রাকের ধাক্কায় দুমড়ে গেলো জিপ।অতঃপর বার কয়েক ধাক্কা।শেষমেশ ব্রিজের রেলিং ভেঙে মোচড়ানো জিপ পরে গেলো খালে।নির্জন পথে কেউ এই দৃশ্যের সাক্ষী হলো না, কেউ জানলোও না যে,একটা নিঠুর মানব মুহূর্তেই কেঁড়ে নিলো একটা তাজা প্রাণ।দূর্জয় আর্তনাদ টুকুন করতে পারলো না।তার থেঁতলানো দেহ সমেত ছোট জিপ তলিয়ে গেলো খালের পানিতে।রাস্তায় পরে রইলো শুধু টকটকে তাজা রক্তের ধারা।এমন সময় পেছন থেকে কেউ চিৎকার করে উঠলো
“আরে কে কোথায় আছো?মির্জা সাহেবের নাতি সহ জিপ গাড়ি খালে পরে গেছে।তাকে বাঁচাও!
ট্রাক ড্রাইভার পেছনে মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ট্রাক থেকে নেমে ঝাঁপিয়ে পড়লো পানিতে।এরপর ডুব সাঁতার দিয়ে পালিয়ে গেলো কোথাও।
ধীরে ধীরে খালের হলুদ পানি লাল রঙে রঙিন হলো
কেউ দৌড়ে গিয়ে মির্জা বাড়িতে খবর পাঠালো
“মিলিটারি সাহেব যে এক্সিডেন্ট করে বেঘোরে প্রাণ হারালো গো….
চলবে….
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৬