ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৬৭
তাজরীন ফাতিহা
দুপুরের খাবার খেয়েই দুই বন্ধু বেরিয়েছিল যেন কোথায়। সন্ধ্যার বাসায় ফিরে মারওয়ান বলল,
“শোন কাল ফাইয়াজের মুসলমানি করাবো। তুই থাকিস।”
ইহাব অবাক হয়ে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি কেন? এতটুকু বাচ্চা ব্যথা পাবে বেশি।”
“ওর মা বলছিল দ্রুত মুসলমানি করানো ভালো। তাই আমি আর অমত করিনি। চেয়েছিলাম কয়েকদিন পরে করতে তবে তুই যেহেতু চলেই এসেছিস আর দেরি না করি। বড় হয়ে গেলে আর করতে চাইবে না। এখন তো নিজেই করার জন্য লাফালাফি করছে।”
“কি বলিস!”
“দাড়া ডেকে জিজ্ঞেস করব এখন, দেখবি এমন লাফ দিবে বাইম মাছ ফেল।”
ইহাব কিছুটা অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে। মারওয়ান ছেলেকে ডাকতেই বাচ্চাটা দৌড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। মারওয়ান বলল,
“খৎনা করবি?”
নাহওয়ান মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“কব্বো, বিশি বিশি কব্বো।”
“দেখেছিস।”
“দেখলাম!”
ইহাবের আশ্চর্য ভঙ্গিই এখনো কাটছে না। বলল,
“এইটুকু বাচ্চা খৎনার কি বুঝে?”
“এজন্যই তো লাফ মারছে। বুঝলে কি আর লাফ দিতো? চিক্কুর দিয়ে বিছানায় চেগাইয়া থাকত।”
“যেহেতু করতে চাচ্ছে করিয়ে ফেল। সমুন্দির বেটার লাফালাফি, দাফাদাফি বের হয়ে যাবে।”
“হুম, কালকে খৎনা করিয়ে একদম খাটে শুইয়ে ফেলব।”
যথারীতি দুই বন্ধু পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে পরদিন নাহওয়ানকে নিয়ে হাসপাতালে চলে এল। নিশাতও সঙ্গে আছে। নাহওয়ান খুশিতে বারবার হাততালি দিচ্ছে। খুশিটা মূলত সবাই মিলে বাইরে বেরিয়েছে এজন্যই বেশি। নিশাত উদ্বিগ্ন হয়ে ওয়েটিং রুমে বসে আছে। তাদের এখনো সিরিয়াল আসেনি। বাসা থেকে এক্সট্রা কাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিস সব নিয়ে এসেছে সে। তার বেশ ভয় করছে। মায়ের মন তাই ছটফটাচ্ছে বেশি। পাশে মারওয়ান বসা। নাহওয়ান ইহাবের সাথে গেছে। ইহাব কোলে নিয়ে সামনে হাঁটতে গেছে। নিশাতকে অস্থির হতে দেখে মারওয়ান বলল,
“এমন অস্থির হচ্ছ কেন? তুমিই খৎনার জন্য পাগল হচ্ছিলে। এখন অস্থির হয়ে লাভ কী?”
“ওসব আপনি বুঝবেন না। মা হলে বুঝতেন।”
“থাক আমার বোঝার দরকার নেই। নিয়তি মেনে নিতে শেখো। সামান্য কারণে অস্থির হওয়া খারাপ। এখন খৎনা করতে বেশিক্ষণ লাগেও না। হুদাই টেনশন করার মানে নেই কোনো।”
নিশাত জবাব না দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বসে রইল। একটুপর পাশ থেকে উঠে ওয়াশরুমে গেল। নাহওয়ান কোত্থেকে দৌড়ে এসে বলল,
“বাবা চুমু পুপা কৎনা কব্বে।”
মারওয়ান কপাল সংকুচিত করে বলল,
“ওর হঠাৎ বুড়ো বয়সে খৎনা করতে মন চাইলো কেন?
নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেসে বলল,
“আমি বলেচি। চুমু পুপা, আমি, তুমি চবাই কব্বো। বিশি বিশি কৎনা কব্বো।”
“কি সাংঘাতিক!”
ইহাব দূর থেকে বলল,
“একদম তোর মতো।”
ভাগ্যিস নিশাত ওয়াশরুমে গিয়েছিল নয়তো ইজ্জত টিজ্জত সব বিক্রি করে দিতে হতো।
ডাক্তারের রুমে অর্থাৎ সার্জারি ওয়ার্ডে শুধু পিতাকে ঢোকার পারমিশন দেয়া হলো। মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। নাহওয়ান বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। অপরিচিত মানুষ দেখে ভয় পাচ্ছে। ডাক্তার নিজের মাস্ক ঠিক করে সরঞ্জাম গোছাতে লাগলেন। আশেপাশে নার্সরা দাঁড়িয়ে আছে। নাহওয়ানকে প্রোসিজার টেবিলে বসানো হলো। মারওয়ান পাশে দাঁড়ানো। নাহওয়ান বাবার হাত মুঠ করে ধরে আছে। ডাক্তার প্রথমে নাহওয়ানের হার্ট ও ফিজিকাল কন্ডিশন চেক করলেন। তারপর ক্লিনিক্যাল স্যানিটেশন করল। ডাক্তার নাহওয়ানের সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করলেন। আদর করে গাল টিপে দিলেন। বিভিন্ন কথা বলে তাকে সহজ করতে চাইলেন। নাহওয়ান ভয় পাচ্ছে অপরিচিত এত মানুষ দেখে। মারওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাবা গাল টিপি ডিচে।”
“থাক, তোমাকে আদর করেছে।”
ডাক্তার নাহওয়ানের বাচ্চামি ও কিউট কিউট কথা শুনে আবারও আদর করলেন। নাহওয়ান বাবাকে আবারও অভিযোগ জানালো,
“বাবা বিশি বিশি দরে। কালি টিপ ডেয়।”
ডাক্তার হেসে নাহওয়ানের ফুলো ফুলো গাল ধরে বললেন,
“এত কিউট কিউট কথা কিভাবে বলে? ওর বয়স কত?”
মারওয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তিন বছর।”
ডাক্তার আরও কিছুক্ষণ কথা বলে নাহওয়ানকে টেবিলে শুইয়ে পজিশন বেল্ট বেঁধে দিল। তারপর প্যান্ট খুলে নিতেই নাহওয়ান কেঁদে দিয়ে বলল,
“বাবা মাচ্চে, নাঙ্গা কচ্চে।”
মারওয়ান বলল,
“এখন গোসল করাবে। চুপ কথা বলেনা।”
নাহওয়ান কোনরকম নড়েচড়ে বলল,
“নাঙ্গায় চলম চলম। চব ডেকি পেলেচে।”
“থাক দেখুক। না দেখলে খৎনা করাবে কিভাবে?”
“ইননা, বিশি বিশি ডেকে।”
ডাক্তার এপর্যায়ে হেসে বললেন,
“আচ্ছা আচ্ছা বেশি বেশি দেখব না, কম কম দেখব।”
নাহওয়ান কান্না বন্ধ করে ঠোঁট ফুলিয়ে ডাক্তারের দিকে চাইল। নাহওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অংশে ক্রিম ও ইনজেকশন পুশ করতেই নাহওয়ান আবার কেঁদে উঠে বলল,
“বাবা বুটু দচ্চে, বেতা ডিচে।”
মারওয়ান ছেলেকে বিভিন্ন কথা বলে সেদিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল। নাহওয়ান কিছুক্ষণ শান্ত রইল কিন্তু যেই খৎনা করানো হলো অমনি আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে বাচ্চাটা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। মারওয়ান শক্ত হয়ে ছেলেকে ধরে আছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে খৎনা শেষ হলেও নাহওয়ানের কান্না আর থামানো গেল না। ঢুকরে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল,
“মাচ্চে, বিশি বিশি মাচ্চে। বুটু কাটি ডিচে।”
ডাক্তার ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে বিভিন্ন ওষুধ, ক্রিম প্রেসক্রিপশনে লিখে দিল। সাত দিনের ফুল বেড রেস্টে থাকার নির্দেশ দিলেন। এছাড়াও নানা ইন্সট্রাকশন দিয়ে দিলেন। দুই তিনদিন ক্ষত স্থানে পানি লাগালো যাবেনা, প্রস্রাব খুব সাবধানে করাতে হবে এরকম নানা উপদেশ। মারওয়ান কান্নারত ছেলেকে নিয়ে সব শুনে রুম থেকে বেরোলো। মাকে দেখতে পেতেই নাহওয়ান আবার একযোগে কাঁদতে লাগল। ইহাব এখানে নেই। সে নিচে চলে গেছে। নিশাত এগিয়ে এসে ছেলেকে চিৎ করে কোলে নিল। ছেলের নাকে নাক ঘষে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ আমার আব্বার মুসলমানি হয়ে গেছে। সুন্নতে খৎনা হয়ে গেছে।”
নাহওয়ান গলা ছেড়ে কেঁদে কেঁদে বলল,
“কৎনা কলেনি। আমাল বুটু কাটি ডিচে। বেতা ডিচে।”
মারওয়ান মুখ কুঁচকে বলল,
“এখন কাদিস কেন? খৎনার জন্য না পাগল হয়ে যাচ্ছিলি।”
নাহওয়ান কারো কথায় পাত্তা না দিয়ে গুনগুন করে কাঁদতে কাঁদতে একমনে বলে যেতে লাগল,
“কৎনা হয়নি, বুটু কাটি ডিচে। চবাই পুচা।”
ইহাব এসে নাহওয়ানের কান্নাকাটি দেখে বলল,
“কী অবস্থা?”
নাহওয়ান ইহাবকে দেখতে পেতেই জোরে কেঁদে উঠে হাত বাড়িয়ে দিল। ইহাব অবাক হয়ে বলল,
“কি হলো! কাঁদছেন কেন?”
“আমাকে চিপ ডিচে, বুটু কাটি ডিচে, বিশি বিশি মাচ্চে। বেতা ডিচে। কৎনা হয়নি।”
ইহাব খুব সাবধানে কোলে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“এটাকেই খৎনা বলে সমুন্দির বেটা। আর কত খৎনা করবেন? এখনো খৎনা করার শখ মেটেনি?”
“ইননা, ইটা কৎনা না।”
“আচ্ছা? তাহলে খৎনা কী?”
নাহওয়ান ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“কৎনা মানে কেলা করা, মুজা মুজা কাওয়া।”
ইহাব হাসতে হাসতে বলল,
“কে বলেছে?”
“আমি জানি।”
“কচু জানেন। এটাকেই খৎনা বলে। আর করবেন খৎনা?”
নাহওয়ান গোলগোল চোখে তাকিয়ে রইল ইহাবের দিকে। চোখ ভর্তি পানি টুইটুম্বর করছে। এখনই গড়িয়ে পড়বে পড়বে ভাব। ইহাব আবার চোখ দিয়ে ইশারা করতেই নাহওয়ান জোরে কেঁদে উঠে বলল,
“ইননা। আমি কৎনা কব্বো না। কুনুডিন কব্বো না।”
_
বাসায় আসতেই নাহওয়ান শুধু একটা কথাই বলছে,
“বাবা, চুমু পুপা দোকা ডিচে। তারা কৎনা কলেনি।”
মারওয়ান ও ইহাব নাহওয়ানের সামনে পড়ছে না। কি সাংঘাতিক কথা বলছে! মারওয়ান ছেলেক নিশাতের কাছে দিয়ে অন্য রুমে ঘাপটি গেড়েছে। নিশাত ছেলেকে এসব কথা বলতে দেখে জোরে ধমক দিয়েছে। মায়ের ধমকে বাচ্চাটা আবার কেঁদেকুটে শান্ত হয়ে চিৎ হয়ে হাত , পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে জীবন যুদ্ধে পরাজয় বরণ করা বিধ্বস্ত ছোট্ট এক যোদ্ধা।
সময় পেরিয়েছে বেশ কিছুদিন। নাহওয়ান এখন পুরোপুরি সুস্থ। আবার আগের মতো লাফালাফি, ফালাফালি করতে পেরে সে বেশ আনন্দিত। দৈনন্দিন নিয়মে জীবন চলছে তাদের। রোজকার নিয়ম অনুযায়ী মারওয়ান রাতে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুতেই নাহওয়ান এসে হাজির।
“বাবা বেতা, বিশি বেতা।”
নাহওয়ান পাছা দেখিয়ে বলল। মারওয়ান চিন্তিত হয়ে বলল,
“ব্যথা কেন?”
“মা বলেচে পুড়া উটেচে।”
মারওয়ান চোখ কপালে তুলে বলল,
“সেকি দেখি তো।”
বলেই ছেলের প্যান্ট খুলে দেখল পাছায় ফোঁড়া উঠে লাল হয়ে আছে। সে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল,
“ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং।”
নিশাত এগিয়ে এসে ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
“এখানের ইন্টারেস্টিং এর কী দেখলেন?”
“তুমি বুঝবে না। আমি বুঝেছি বলে ইন্টারেস্টিং বলেছি।”
“তা আপনি কি বুঝেছেন শুনি।”
“বুঝলাম পটলের পাছায় বিচি উঠেছে। এটাকে বলে পটল দানা অর্থাৎ পটল পিপস। বৈজ্ঞানিক নাম ‘ট্রাইকোস্যানথিস ডায়ওইকা’। এটাকে মনে রাখবে কিভাবে জানো?”
“কিভাবে?”
“ট্রাই করিস না সিনথী ডায়পার, ও ইয়াক!”
“কি অদ্ভুত! ফোঁড়া থেকে সোজা ডায়পারে চলে গেলেন?”
“ডায়পারে কোথায় চলে গেছি? তোমাকে বৈজ্ঞানিক নামের সহজ উপায় বলে দিচ্ছি।”
“আপনার কাছে তো আমি এসব জানতে চাইনি।”
“তোমার কাছেও তো আমি এসব বলতে যাইনি।”
“ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলবেন না।”
“ত্যাড়া ত্যাড়া কথা কী? তুমিই তো এসেছ আমার কাছে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার শোনার জন্য। আসোনি?”
“তখন কি বুঝেছি আপনার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার এসব ডায়পার ফায়পার হবে?”
“মোটেও এসব ডায়পার ফায়পার না। পটলের বিচির বৈজ্ঞানিক নাম ট্রাইকোস্যানথিস ডায়ওইকার সহজীকরণ। ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার। তোমার মাথায় এসব ঢুকবে না। তুমি এখান থেকে যাও আমাকে পটল দানার গবেষণা করতে দাও।”
“আপনার উপরে আমার এত রাগ লাগে মাঝেমধ্যে মনে হয়… মনে হয়..”
“কি মনে হয়?”
নিশাত রেগে ছেলেকে কোলে নিতে নিতে বলল,
“মনে হয় আপনার মহামূল্যবান ব্রেইনটা খুলে বিজ্ঞানীদের দিয়ে আসি। তারা গবেষণা করে দেখুক, আল্লাহ এই ব্রেইনের মধ্যে কি দিছে। কোন অদ্ভুত জিনিস দিয়ে এই ব্রেইন গড়া? একটা স্বাভাবিক মানুষ এমনও হতে পারে? যে জগৎ সংসারের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিকে থোড়াই কেয়ার করেনা কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পটলের বিচি নিয়ে তার সাংঘাতিক চিন্তা। গবেষণায় নেমেছে। পারলে একটা পটলের বংশ বানিয়ে ফেলুন।”
মারওয়ান নিশাতের কোলে ইশারা করে বলল,
“বানিয়েছি তো। ঐযে তোমার কোলে। আমার পটলের ছাও। আর পটলের বিচি মোটেও অপ্রয়োজনীয় নয়, আমার ছাওয়ের কষ্টদায়ক ফোঁড়া। একে নিয়ে তো গবেষণা করতেই হবে। জাস্ট উপড়ে ফেলতে হবে।”
“যা ইচ্ছে করুন। এতক্ষণ ধরে তালগাছের সঙ্গে কথা বলেছি। অসহ্য।”
বলেই হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মারওয়ান নিশাতের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,
“কি আশ্চর্য এমন রেগে গেল কেন? একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম। যাজ্ঞে মাথামোটা মেয়েছেলে এসব বুঝবে না এটাই স্বাভাবিক।
__
মানহার প্রেগন্যান্সির প্রায় দুইমাস চলে। উর্মি ভুঁইয়া তার যত্নের কমতি রাখছেন না। মাহবুব আলম মেয়েকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু ইহাব রাজি হয়নি। সে যে কয়েকদিন গ্রামে থাকবে নিজেই দেখভাল করবে। যখন পুরোদমে কাজের প্রেশার বেড়ে যাবে সেই মানহাকে দিয়ে আসবে। এখন আপাতত স্ত্রীর যত্নে কোনো ত্রুটি রাখা যাবেনা।
মানহা বিছানায় হেলান দিয়ে ফল খাচ্ছিল আর ফ্লাফির সঙ্গে কথা বলছে,
“বেশি লাফালাফি করিস না। তোরা হলি আমার অভদ্র বাচ্চা। একটা কথাও শুনিস না। আরেকটা আসছে। মাকে শান্তি দেবে নাকি তোদের মতো বদমাইস হবে কে জানে?”
ফ্লাফির চারটা ছানা পুরো ঘর মাতিয়ে রাখে। পাঁচটা হয়েছিল। একটা নাহওয়ানকে দিয়েছে আর বাকিগুলো নিজের সাথে রেখেছে। পেলে পুষে বড় করছে। এরা থাকাতে তবুও শান্তি। চারপাশটা মাতিয়ে রাখে। নয়তো পুরো বাড়িতে কথা বলার তেমন মানুষ নেই। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। মানহার কথা বলার মাঝেই ইহাব রুমে ঢুকল। মানহাকে বিড়ালদের সাথে কথা বলতে দেখে এগিয়ে এসে বলল,
“করছ কী?”
“ফল খাই।”
“ডাক্তারের প্রেসক্রাইব ফলো করে সবকিছু খাবে। নিয়ম করে হাঁটাচলা করবে। তুমি অলস হয়ে গেছ। সারাদিন ঘুমিয়ে থাকো।”
“আমি কি করব? আমার খালি ঘুম পায়।”
“ঘুমাবে তবে লিমিট অনুযায়ী। লিমিট ক্রস করলেই ক্ষতি। কোনো কিছুরই লিমিট ক্রস ভালো না।”
“আচ্ছা আচ্ছা আর জ্ঞান দিতে হবেনা। এ কয়েকদিনে এত জ্ঞান পেয়েছি যে এখন পেট ফুলে গেছে জ্ঞানে।”
ইহাব ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
“পেট জ্ঞানে ফুলেছে নাকি ভালোবাসায় ফুলেছে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে দেখতে হবে।”
মানহা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ইহাব আবারও বলল,
“সবই কিন্তু জানি।”
মানহা মুখ ঘুরিয়ে রেখেই বলল,
“জানলে ভালো।”
ইহাব আর কথা না বাড়িয়ে মুখ ধুতে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে মানহার পাশে বসতেই মানহা ইহাবের মুখে একটা একটা করে আঙ্গুর, কমলা, আপেল, পেয়ারা তুলে দিল। ইহাব খেয়ে বলল,
“আমাকে খাওয়াচ্ছ কেন? তুমি আর আমার ইন্টু পিন্টু খাও।”
“ওরা খেয়েছে।”
“আরও খাওয়াও। তুমি তো খাও কবুতরের মতো। কবুতরও তোমার চেয়ে বেশি খায়। যা খাও এতে তোমার খাবারই হয়না বাচ্চার খাবার তো দূরের কথা।”
মানহা রাগ দেখিয়ে বলল,
“বেশি জানেন। আমি পেট ভরেই খাই।”
“ঘোড়ার ডিম খাও। আম্মুর কাছে শুনেছি না তোমাকে খাবার দিলে তুমি নখরামি করো। খেতে চাও না। আদর করছি ভালো লাগেনা? মাইর খেতে ইচ্ছে করে?”
মানহা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আমার পেটে যতটুকু জায়গা ততটুকুই তো খাবো। তাছাড়া এসময়ে কোনো খাবারই ভালো লাগেনা। বমি বমি লাগে।”
ইহাব কাঠিন্য স্বরে বলল,
“লাগুক। দরকার হলে খেয়ে বমি করবে। বমি করে আবার খাবে। তাও তো পেটে কিছু থাকবে। কিছুই যদি না খাও বাচ্চা সুস্থ ও হেলদি হবেনা নাতো মানহা? তুমি একটা কথাও কেন শোনো না বলোতো?”
মানহা মুখ কালো করে বলল,
“আচ্ছা খাবো।”
ইহাব আবার বলল,
“এখন তো বাচ্চার দোহাই দিয়ে বলো বমি আসে হ্যান ত্যান নানা অজুহাত। তুমি যে সুস্থ থাকতে কতটুকু খেতে তা তো দেখেছিই। তুমি আজকের চোরা না, ঠান্ডা মাথার চোরা। খাদ্য না খাওয়া চোরা।”
“আমি চোর নই।”
“আমি ওই চোর বলিনি। খাবার খাওনা, ফাঁকি দাও এটাই বুঝিয়েছি।”
মানহার মন খারাপ বুঝতে পেরে ইহাব ঠান্ডা গলায় বলল,
“আচার খাবে?”
মানহা জবাব দিল না। ইহাব টেবিল থেকে আচার এনে বলল,
“একটা বিরাট বাচ্চা গোসসা করেছে? তাকে আমার বাচ্চার মা বলতে শরম করছে। আচার খেতে চাইলে খেতে পারে, আমি চোখ বন্ধ করে রাখব।”
মানহা তবুও কিছু বলল না। ইহাব আচারের বয়াম রেখে চলে যেতেই মানহা হাত ঢুকিয়ে আচার খেতে লাগল। ইহাব পর্দার ভেতর থেকে মাথা বের করে বলল,
“দেখে ফেলছি।”
মানহা রেগে পা দাঁপিয়ে কেঁদে দিল। ইহাব দৌঁড়ে এসে মানহার মাথাটা বুকে চেপে বলল,
“আরে বোকা কাঁদছ কেন?”
মানহা ফুঁপিয়ে বলল,
“আপনি দেখেছেন কেন?”
ইহাব হাসতে হাসতে বলল,
“আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি।”
বলেই উঠে চলে যেতে নিলে মানহা ইহাবের শার্ট মুঠোতে চেপে বলল,
“ওই চেয়ারম্যানের পোলা”
ইহাব ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কি?
“আমারে বকোস ক্যালা?”
“আর বকব না।”
মানহা ঠোঁট উল্টে বলল,
“তাহলে কি করবেন? আদর?”
ইহাব এগিয়ে এসে মানহার নাকে নাক ঘষে বলল,
“ওহে চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ,
আপনাকে খাওয়াব মধু।
করলে বেজায় আদর,
আপনি হবেন বাঁদর।”
মানহা ঠোঁট ফুলিয়ে চাইতেই ইহাব আবার বলতে শুরু করল,
“মাঝেমধ্যে করব শাসন,
ঠোঁট ফুলিয়ে হবেন কাতর।
যেই আমি রাগবো,
গলায় জড়িয়ে ধরব।”
মানহা হেসে ইহাবের গলা জড়িয়ে ধরল।
চলবে…
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭০.২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫১+৫২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৯+৩০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৯,১০)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৩+৫৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪