Golpo romantic golpo বাবরি চুলওয়ালা

বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৩


বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৩

২৩
আজ শুক্রবার। আমার বিয়ে।

বুকের ভেতর ঢেউয়ের মতো উঠানামা করছে অনুভূতি গুলো। আনন্দ, ভয় আর এক অজানা শুন্যতা। আজ আমি কারো স্ত্রী হবো, এই অনুভূতিটা একইসাথে আনন্দের আবার ভীষণ ভয়েরও।

সারাটা রাত একবিন্দু ঘুমাতে পারিনি। কেবলই ছটফট করেছি। অন্ধকার ঘরে এপাশ ওপাশ করে কাটিয়েছি কয়েকটা ঘন্টা। শেষ রাতে একবার ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, দেখি আকাশে লক্ষ কোটি নক্ষত্র। আমার পুরো জীবনে একসঙ্গে এত তারা কক্ষনো দেখিনি!

হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়ায় সে। আমার বাবরি চুলওয়ালা। এক শীতল বাতাস এসে গায়ে লাগে। আমি দুশ্চিন্তা, শংকা আর উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলাম। সে আমাকে অভয় দিয়ে বললো, ‘টেনশন কোরো না মীরা। সব ঠিক থাকবে।’

তার ভরসায় আমি শতভাগ আস্থা রাখতে পারি। তবুও! অন্যরকম এক উত্তেজনা আমাকে ক্রমশ অস্থির করে তুলছে। এত বেশী অস্থির লাগছে যে শুধু দরদর করে ঘামছি আমি।

সকালবেলা খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। কেউ ডাকেনি একটিবারও। এরমধ্যেই সব আত্মীয়রা চলে এসেছে। পুরো বাড়ি মেতেছে কোলাহল, হাঁড়ি- ঢাকনার শব্দ আর আদা রসুনের ঘ্রাণে। ঘুম থেকে উঠে একদৃষ্টে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। খানিকটা ভালো লাগছে এখন। তাকে আপন করে পাবার সুখ আর স্বস্তিতে ভেতরটা শান্ত হয়ে আছে।

হঠাৎ বাবাকে দেখলাম আমার রুমে আসছেন। আমি উঠে বসি। বাবা পাশে এসে আমার মুখের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘মীরা, মা আমার। কী বলবো বুঝতে পারছি না। তুই অনেক ভালো থাকবি রে মা।’
‘জানি আব্বু। উনি অনেক ভালো একজন মানুষ।’
‘মা রে..’

বাবা আর কিছুই বলতে পারলেন না। তাঁর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগলো। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। জীবনে কখনো বাবাকে কাঁদতে দেখিনি এভাবে! বাবার হাতের ওপর মাথা ঠেস দিয়ে অনেক্ষণ আমিও কাঁদলাম। জানিনা কেন! এত আনন্দের ভীড়েই অদ্ভুত এক হাহাকার আমাকে আঁকড়ে ধরলো।

ঘর থেকে বের হয়ে দেখি বিশাল বড় ডেকচিতে করে খিচুড়ি রান্না করা হয়েছে। সবাই ব্যস্ত যার যার মতো। মাঝেমাঝে হাসির শব্দ কানে আসছে।

বারান্দার বসে মুরুব্বীরা পান সুপারির ডালা সাজাচ্ছে। সুপারি, চুন, জর্দা সবকিছু সাজানো হচ্ছে যত্ন করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা লুকিয়ে জর্দা পান খাওয়ার চেষ্টা করছে, ধরা পড়লেই বকা খাচ্ছে। মুরুব্বীরা গল্প জুড়ে দিয়েছেন। কার বিয়ে কত আগে হয়েছে, কত কম টাকায় পুরো বিয়ে পার হয়েছে, সেইসব স্মৃতিচারণ। সবকিছু দেখতে দেখতেই আমার মনটা অসম্ভব আনন্দে ভরে উঠলো।

এর ফাঁকেই খবর পেলাম, এখন আমার গায়ে হলুদ হবে! কী আশ্চর্য, এই জিনিসটার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমারও যে হলুদ হবে, তা মাথায়ই ছিলোনা। অথচ চাচী, ফুফুরা ঠিকই আয়োজন করে ফেলেছেন।

বাবরি চুলওয়ালা আর আমাকে পাশাপাশি বসিয়ে আমাদের গালে ও হাতে হলুদ ছোঁয়ালো সবাই। একগাদা ছবি তোলা হলো, মিষ্টি মুখ আর বড়দের ফাজলামিতে হলুদের আসর একেবারে জমজমাট। আমার আর প্রোগ্রাম করার প্রয়োজন নেই। একদিনের আয়োজনে এত ধুমধাম করে আমার বিয়ে হচ্ছে দেখেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি।

গোসল শেষ করে সবেমাত্র রুমে এসেছি। এমন সময় বাবা ছুটে এসে খবর দিলেন, আমাদের অফিসে পুলিশ গিয়ে মুনযিরকে খুঁজছে!

পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো আমার। স্তব্ধ চোখে আমি বাবার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাবা আর কিছুই না বলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ক্ষণিকের মধ্যেই বাড়িতে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো। থেমে গেলো সাউন্ডবক্স, নীরব হলো কোলাহল। হুট করেই বিয়েবাড়িতে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা এসে ভর করলো। যেন রোদ ঝলমলে দুপুরের সূর্য হঠাৎ করে মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে।

সত্য মিথ্যা কিছুই জানিনা এখনো। শুধু জানি, ওর নামে ওয়ারেন্ট আছে!

রুমে একা বসে আমি রীতিমতো কাঁপতে লাগলাম। কথাটা শুনেই প্রথম যে শব্দটা মাথায় এসেছে, সেটা হলো- তনয়। এসব তনয়ের ষড়যন্ত্র। তবুও! তবুও কিসের যেন ভয়ংকর এক দুশ্চিন্তা ক্রমশ আমাকে গ্রাস করতে লাগলো। উৎকন্ঠায় দম বন্ধ হবার জোগাড়।

শরীরটা এখনো গোসলের পানিতে ঠাণ্ডা। পিঠের ওপর এলিয়ে রাখা ভেজা চুলের জলে আমার ব্লাউজ সিক্ত। অথচ মাথার ভেতর দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন! বুকের মাঝখানটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আবার সেই শুন্যতায় অজানা আশংকা এসে জায়গা দখল করে বসছে।

প্রচণ্ড ব্যথাতুর হৃদয়ে আমি যেন ভেঙে পড়ছি। আমার আশংকা কি তবে এভাবেই সত্যি হয়ে যাবে! বিয়েটা কি ভেঙে যাবে আমাদের?

যখন খানিকটা ধাতস্থ হলাম, ছুটে বের হয়ে এলাম রুমের বাইরে। সবার নজর আমার দিকে। সেই দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আমি চিৎকার করে মাকে বললাম, কি হয়েছে আমাকে বলো? মুনযির কোথায়?

আমার উচ্চ স্বর শুনে ভীড় ঠেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মুনযির এসে সামনে দাঁড়ালো। আমি তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালাম। তার চোখেমুখে অজানা শঙ্কা। অসম্ভব মলিন মুখে সে অপরাধীর মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে!

আমার পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছে। কী প্রশ্ন করবো তাও ভুলে গেছি। বিস্ফারিত চোখে আমি ওর দিকে দৃষ্টি আটকে রাখলাম।

সে বললো, ‘বলেছিলাম না একটা গণ্ডগোল করবেই? ও এখনো জানেনা আমি এখানে।’
‘আমাকে খুলে বলুন সবটা।’
‘পুলিশ আগে বাসায় গিয়েছিলো। বাসায় কাউকে না পেয়ে এরপর অফিসে। ঠিক বিয়ের দিনেই, এই ভরদুপুরে বাসায় পুলিশ কেন যায় এখনো বুঝতে পারছো না মীরা?’
‘আমি বুঝলে তো হবেনা। এই মানুষ গুলোর বুঝতে হবে। আপনার নামে কিসের ওয়ারেন্ট আছে আমাকে সেটা স্পষ্ট করে বলুন?’
‘আমি জানিনা এখনো।’
‘জানেন না নাকি জানাতে চাচ্ছেন না?’
‘তুমি আমাকে সন্দেহ করছো মীরা?’

আমার পুরো পৃথিবী যেন হঠাৎ দুলে উঠল। সন্দেহ! আমি তাকে সন্দেহ করবো কী করে? আমি তাকে এই জগতে সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করি, সবচেয়ে পছন্দ করি, সবচেয়ে বেশি নির্ভর করি তার ওপর। আমি তাকে কীভাবে সন্দেহ করতে পারি? সে কি বুঝতে পারছে না আমার ভেতর কী বয়ে যাচ্ছে!

আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বললো, ‘যদি একজন মানুষও আমার পক্ষে থাকা উচিত সেটা তুমি মীরা। তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করতে না পারো তাহলে এইসব আয়োজন সব বৃথা।’

কথাটা বলেই সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভীড়ের বাইরে চলে গেলো। আমি থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। সবার কানাঘুষা আমাকে অতিষ্ঠ করে তুললো। ভেবেছিলাম তনয় যাইই করার চেষ্টা করুক, এখানকার সবাই সেটাকে সামলে নিবে। কিন্তু পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়ে উঠবে আমি কল্পনাও করিনি।

এক ছুটে ঘরে ঢুকেই আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? আমার জীবনে কেন এই অদ্ভুত নাটক! কেন এই ভয়ংকর খেলার নায়িকা কেবল আমিই? কেন আমার সঙ্গে এমন হলো?

কান্না ধরে রাখতে পারছি না। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে এই টকটকে লাল পেড়ে কমলা রঙের শাড়িটা দেখে আমার উপহাসের মতো লাগছে। আমি তাকে মোটেও সন্দেহ করিনি। সে আমাকে ভুল বুঝলো! আমি তো শুধু সত্যিটা জানতে চেয়েছিলাম।

.

কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম আমি। এমন সময় দরজার ওপাশে মায়ের গলা শোনা গেলো। আমি যন্ত্রের মতো এসে দরজা খুললাম। মা আমাকে দেখেই বুকে জাপটে ধরে বললেন, ‘কাঁদিস না। আয় আমার সঙ্গে। তোর বাবা কথা বলবে।’

আমি কোনোদিকে খেয়াল করলাম না। যন্ত্রের মতো মাকে অনুসরণ করলাম। আশেপাশে সবাই ভীড় করে আমাকে দেখছে জানি!

বড় চাচার ঘরে আলোচনায় বসেছে সবাই। সবার ভেতর মুনযিরও আছে। ওর বড় ভাই কথা বলছিলেন, ‘আমার ভাইকে আমরা চিনি। আমার ভাই কোনো অন্যায় করে নাই। থানায় চলেন, যত টাকার মামলা হোক আমি আমার জান দিয়ে লড়বো।’

আমি কয়েক সেকেন্ড বাবরি চুলওয়ালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে একবারও আমার দিকে তাকালো না! বুকটা অসার হয়ে আসলো আমার। সে কি রাগ করেছে?

বাবা আমাকে কাছে নিয়ে বসালেন। আমি শান্ত শিশুর মতো চুপ করে আছি। কেউই কোনো কথা বলছে না। পরিবেশটা কেমন থমথমে! জানিনা কী শুনবো আমি। তবে, মনেপ্রাণে চাইছি, একটা ভালো খবর যেন শুনতে পাই।

বাবা বললেন, ‘মা মীরা। আমরা সন্দেহ করছি তনয় মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে চেষ্টা করছে। মুনযির চাচ্ছে এখনই ওর মুখোমুখি গিয়ে কথা বলতে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’

বাবার প্রথম কথাটা শুনে আমার বুকে খানিকটা স্বস্তির বাতাস এসে লাগলো। বাবা যদি বিশ্বাস করে মুনযির নির্দোষ, তাহলে আমার জন্য সবকিছু সহজ। আমি চোখ বন্ধ করে বাবার ওপর ভরসা করতে পারি।

মুনযির বললো, ‘তনয় আমাকে থ্রেট করেছে বিয়ে ভাংবেই। আমি ব্যাপারটা নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম না। মীরা বলেছে আপনাদের সবার সাহায্য দরকার আমাদের। আসলেই তাই। তনয়ের সঙ্গে দেখা করা ছাড়া আমার নিজেকে প্রমাণ করার কোনো সুযোগ আপাতত দেখছি না।’

বাবা বললেন, ‘তোমার নিজেকে প্রমাণ করা লাগবে না বাবা। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। তোমার হাত দিয়ে আমি লাখ লাখ টাকা লেনদেন করেছি। তোমার মতো নিষ্ঠাবান ছেলে এই এলাকায় খুঁজলে একটাও পাওয়া যাবে না। আমি তোমাকে নিশ্চিন্তে ভরসা করি।’

সে উত্তরে বললো, ‘লোকজন তো নানান কথা বলবে আংকেল। আমার নিজেকে নিয়ে চিন্তা নেই। আমার পরিবার আর আপনার পরিবারের সম্মান এখানে জড়িত।’

হঠাৎ মুনযিরের বড় ভাই বলে উঠলেন, ‘বিয়ে স্থগিত। এই অবস্থায় বিয়ে হওয়া সম্ভব না। আগে আমি মুনযিরকে নির্দোষ প্রমাণ করে এই ঝামেলার ইতি টানবো। তারপর বিয়ের প্রসঙ্গ।’

আমি হতাশ হলাম তার এই কথায়। বিয়েটা নির্বিঘ্নে হবার জন্যই তো দাদাবাড়িতে আসা! অথচ হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত, আমি ঠিক মেনে নিতে পারলাম না। আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করার প্রয়োজন মনে করলো না কেউ!

আমি পাথরের মতো জমে যাচ্ছি। বাবা আমাকে বললেন, ‘মীরা মা, তুই কি বলিস?’

আমি নিথর হয়ে রইলাম। আমার পৃথিবীটা ভেঙে পড়েছে। ভাবতে পারছি না কিছুই।

মেজো চাচা বললেন, ‘এইমুহুর্তে মুনযির এখানে থাকলে যেকোনো মুহুর্তে পুলিশ এসে হাজির হবে। আর আমরা কিছুই করতে পারব না। পুলিশের ডায়ালগ তো সবাই জানেনই- যা কথা বলার কোর্টে বলবেন। মুনযিরকে ধরে নিয়ে যাবে ওরা। সবচেয়ে ভালো হয়, ওকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিলে। আর আমরা এদিকে তনয়ের বাবার সঙ্গে আলোচনায় বসি?’

আমার ভেতরটা ডুকরে কেঁদে উঠলো। কোথাও পাঠিয়ে দেবে মানে! আজ আমাদের বিয়ে হবার কথা। আমাকে ফেলে সে কোথায় যাবে? আমি কী করে তার দেখা পাবো? আমার কেমন যেন দিশেহারা লাগছে।

মুনযিরের বড় ভাই বললেন, ‘আমি কোনো আলোচনা বুঝিনা তালই সাব। আমি ওই ছেলেকে দেখে নিবো। আমাদের একটা মান ইজ্জত আছে। এভাবে বিয়ের দিন আমাদেরকে হেনস্থা করার ফল ওকে অবশ্যই পাইতে হবে।’

বাবা ওনাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন, ‘আমি আছি তো বাবা। আমি দেখতেছি বিষয়টা। আপাতত আপনারা সিদ্ধান্ত নেন মুনযিরকে কোথায় পাঠাবেন। আমি থানা পুলিশ, কোর্ট কাচারি সব দেখতেছি।’

আমার জগতটা ধীরেধীরে শুন্য হতে শুরু করেছে। বারবার তাকে হারানোর যন্ত্রণা সইতে সইতে আমি ক্লান্ত। আমি এবার তাকে কোনোভাবেই হারাতে পারবো না।

আমি মুনযিরের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনার সঙ্গে একটু আলাদা কথা বলতে চাই।’

ওর বড় ভাই বললেন, ‘কী কথা বলবা জানিনা বোন। অন্তত আজকে বিয়ে করতে বইলো না। আমাদের মান সম্মানের ব্যাপার জড়িত এখানে। তুমি হয়তো আবেগ দিয়ে বলবা আমার ভাইকে বিশ্বাস করো। কিন্তু বাকিরা সবাই মনেমনে ভাবতেছে আমার ভাই কোনো অপরাধ করছে। সুতরাং এই ঝামেলার সমাধান না হইলে বিয়ের আলাপ তুইলো না।’

আমি চুপ হয়ে গেলাম। আশ্চর্য হচ্ছি বাবরি চুলওয়ালাকে চুপ থাকতে দেখে। বড়রা কথা বলছে বলেই কি তার কিছুই বলার নেই? আজকে বিয়েটা না হলে আবার কখন কবে, কবে হবে তা পুরোপুরি অনিশ্চিত!

চাচা আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন কি থানায় যাবি নাকি ওই পোলার বাসায়?’
বাবা মৃদু স্বরে বললেন, ‘ভাবতেছি।’

আমার প্রচণ্ড দিশেহারা লাগছে। সবকিছু ঘোলাটে দেখছি। চোখের সামনে সব কেমন যেন বদলে যাচ্ছে ধীরেধীরে। এই বুঝি সবাই উঠে পড়বে, আলোচনা শেষ হবে এখানেই। তারপর বিয়ের সমস্ত আয়োজন খুলে ফেলা হবে। বাবরি চুলওয়ালা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে পালিয়ে যাবে দূরে কোথাও। আমি কাঁদবো, মা কাঁদবে। বাকিরা আমাদেরকে স্বান্তনা দেবে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবার…

না। আমি এসব হতে দিতে পারবো না। আজ আমার বিয়ে, আমার প্রাণের বাবরি চুলওয়ালার সঙ্গে। তনয়ের ষড়যন্ত্র যত শক্তিশালীই হোক, আমার ভালোবাসার চাইতে বেশি শক্তিশালী হতে পারেনা। আমি আজকেই বিয়ে করবো। আমি আমার প্রিয় মানুষটাকে আড়াল হতে দিতে পারবো না। কিছুতেই না..

বুকে সাহস জমিয়ে ঘরভর্তি গুরুজনদের সম্মুখে বলেই ফেললাম, ‘পুলিশ আসলে আসুক। আমি কোনোকিছুকে পরোয়া করি না। আমি চাই বিয়েটা আজই হোক, এখনই হোক। বিয়ের পর ওনাকে যেখানে খুশি পাঠান। আমি আপত্তি করবো না। কিন্তু আমাকে বিয়ে করতে চাওয়ার অপরাধে উনি পালিয়ে বেড়াবে এটা আমি কিছুতেই মানতে পারবো না।’

সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। ভাইয়া কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। বাবা ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বল মা। কি বলছিলি?’

আমি আরও সাহস পেয়ে বললাম, ‘বিয়ে আজকেই হবে। কে ওনাকে অপরাধী ভাবলো তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। বিয়ের দিন এরকম একটা ঘটনা দেখে সবারই বোঝার কথা এটা একটা ষড়যন্ত্র। তাও যদি কেউ ওনাকে অপরাধী ভাবে, আমার কিছু করার নেই। অবশ্য উনি যদি অপরাধী হয়েও থাকে, আমার তাতেও কোনো অভিযোগ নেই কোনো। আমি এই অপরাধীকেই বিয়ে করতে রাজি। আর বিয়েটা আজই হবে, এখনই হবে। আজকে বিয়ে ভেঙে দিলে তনয় জিতে যাবে। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটা তনয়ের কারণে আমি এভাবে নষ্ট হতে দিবোনা।’

সবাই চুপ। ভাইয়া মানলেন না, ইনিয়ে বিনিয়ে বিয়ে পেছানোর কথা বলতে লাগলেন। বাবা ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মীরা ঠিক বলেছে। আজকে বিয়ে ভেঙে দিলে পুরো গ্রামে একটা মিথ্যা ছড়িয়ে পড়বে। এতে করে সম্মান রক্ষার চাইতে সম্মান নষ্ট হবে বেশি। ছেলের নামে ওয়ারেন্ট আছে, ছেলেকে পুলিশ খুঁজছে তাই বিয়ে ভেঙে গেছে, এটা বলবে সবাই। আমি আমার মেয়েকে এই অবস্থায় বিয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চাই মুনযির নির্দোষ।’

হঠাৎ মুনযির উঠে এসে বাবাকে জাপটে ধরে বললো, ‘ থ্যাঙ্কিউ আংকেল। আপনি আমাকে কত বড় সম্মান দিলেন আপনি নিজেও হয়তো জানেন না। এই বিশ্বাসের মর্যাদা সারাজীবন আমি রাখবো।’

বাবাকে ছেড়ে দিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ থ্যাঙ্কিউ মীরা।’

আমার বুকে খানিকটা আশার প্রদীপ জ্বলে উঠলো। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আমি পাশে আছি।

আলোচনা সমাপ্ত হলো। একমত হয়েছে সবাই। আগে বিয়ে হবে, তারপর বাকি সব। আমি চলে এলাম অন্য রুমে। জানিনা আমাকে নিয়ে কে কী ভাবছে! আমি কেবল আমার বাবরি চুলওয়ালার সম্মানটা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছি।

.

একলা ঘরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে এলোমেলো পায়চারি করছি আমি। গতরাত পর্যন্ত দুশ্চিন্তা ছিলো বিয়েটা ঠিকঠাক হবে কী না! বিয়েটা যতক্ষণ না হচ্ছে, ততক্ষণ স্বস্তি পাবো না। কিন্তু এইমুহুর্তে নতুন আরেক দুশ্চিন্তা দানা বেঁধেছে। সে কি আমাকে এখানে ফেলে কোথাও চলে যাবে!

সাউন্ডবক্স আর বাজলো না, কারো মুখে ফুটলো না আনন্দের হাসি। কিন্তু খানিকক্ষণ পরেই কাজী সাহেব চলে আসলেন। মেকআপ আর্টিস্ট এসে বসে আছে। এই পরিস্থিতিতে বউ সাজা হলোনা আমার। নিতান্তই সাধাসিধা এক কমলা রঙের শাড়ি পরে আমি ‘কবুল’ বললাম।

বিয়েটা হয়ে গেলো ঘোরের মধ্যেই। কাঁপা কাঁপা হাতে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করলাম। অজানা আশংকায় আমি দিশেহারা। বিছানায় শুয়ে শুয়ে এই ঘোরলাগা কবুল বলার মুহুর্তটা স্মরণ করার চেষ্টা করছিলাম।

থমথমে পরিবেশের মধ্যেই অল্প অল্প করে সবাইকে খাবার খাইয়ে দেয়া হলো। অনেক্ষণ বাবরি চুলওয়ালাকে দেখছি না আশেপাশে কোথাও। ফোনে একবার কল দিয়ে দেখি ফোনটাও বন্ধ। আমি চাইলেই এক পলক তাকে দেখতে পারছি না। অদৃশ্য সব দেয়াল ভেদ করে তার কাছে ছুটে যেতে পারছি না। সবকিছু কেমন যেন ঘোরলাগা, দুঃস্বপ্ন কিংবা সুখস্বপ্নের মতো।

আমার ফুফাতো বোন এসে জানালো, বড়রা সবাই তনয়ের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগে এক দফা ওর বাবার মুখোমুখি লড়াই হবে, তারপর আইনী পদক্ষেপ। সিদ্ধান্তটা আমার কাছে স্বস্তির হলেও আমি অদ্ভুতভাবে বিষন্নতায় ভুগছি। এরমধ্যে পুলিশ বাসায় না এলেই হয়!

পুরোটা বিকেল কেমন যেন অস্বস্তি নিয়ে কেটে গেলো। আমার বিয়ে হয়ে গেছে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমার! বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সবাই মিলে শহরে গেছে। বাড়িটা সুনসান। আমি এক বুক শুন্যতা নিয়ে ঘর অন্ধকার করে বসে আছি। অন্তত বিয়েটা হয়ে গেছে, এই ভেবে নিজেকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করছি আমি।

সন্ধ্যার পর মা এলেন এক প্লেট ভাত নিয়ে। খুব জোরাজোরি করলেন খেয়ে নিতে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘উনি খেয়েছে?’

মা ছোট করে উত্তর দিলেন, ‘হুম। তুই কিছু খেয়ে নে সোনা মা।’
‘আমার ভালো লাগছে না আম্মু। এখনো কোনো খবর পেলে?’
‘না। তোর বাবা ফ্রি হলে কল দিবে বলেছে।’
‘সবকিছু এরকম হয়ে গেলো কেন আম্মু!’
‘সব ঠিক হয়ে যাবে রে মা। টেনশন করিস না। দুইটা ভাত খা। আমি খাইয়ে দেই?’
‘একটু পরে খাবো।’

মা খানিকক্ষণ পাশে বসে থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার রুমে চাচাতো বোনেরা বসে আছে আমাকে ঘিরে। ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোদের ভাইয়া কোন রুমে?’
কেউই কোনো উত্তর দিতে পারলো না। ফোনে না পেয়ে ছোট্ট একটা চিরকুট লিখে অনেক্ষণ ধরে ঘুরছি। মাধ্যম পাচ্ছিনা দেয়ার মতো। হঠাৎ রোহানকে দেখে বললাম, ‘এই কাগজটা ওনাকে একটু দিয়ে আসবি? ও কথা বলতে চাইলে তোর ফোন থেকে একটা কল দিস প্লিজ।’

রোহান ঠোঁট উলটে বললো, ‘ভাইয়া কোথায় আছে জানিনা তো আপু।’

আমার বুকটা হাহাকার করে উঠলো। কেউই জানেনা! তারমানে কি উনি বাড়িতে নেই? আব্বু চাচাদের সঙ্গে উনিও কি শহরে গেছে? নাকি…

আমার চারপাশে শুন্যতা এসে ভর করলো। চোখ ভরে গেলো অশ্রুতে। কতক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে আমার মেজো আপুকে জেঁকে ধরলাম, ‘আপু বল না উনি কোথায়? সত্যি করে বল?’
‘বাসায় নাই। চলে গেছে।’
‘কোথায়!’
‘জানিনা। এটা শুধু আব্বু জানে। বাড়ির আর কেউই জানেনা ওনাকে কোথায় পাঠানো হইছে।’

আমি নিথর হয়ে পড়লাম। ভাবনাগুলোও খেই হারালো। সেদিন বলেছিলো ‘আমার বিয়ে করা বউকে বাসায় ফেলে চলে যাবো ভেবেছো?’ অথচ আজ সত্যিই চলে গেলো। যাওয়ার আগে একবার বলেও গেলো না! বললে কি আমি সঙ্গে যাওয়ার জন্য জেদ ধরতাম? নাকি তাকে আটকাতে চাইতাম? কিছুই তো করতাম না। একবার অন্তত দেখা করতে পারতো!

এই বাড়ি ভরা মানুষজন, ছেলেমেয়েদের হই হুল্লোড়ের ভীড়েও নিজেকে বড্ড একলা মনে হতে লাগলো আমার। এ কেমন বিরহ! এ কেমন দহন? ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে আমাকে একা ফেলে সে কোথায় চলে গেলো! তাকে এক নজর দেখার জন্য কলিজাটা ছিঁড়ে যায় আমার। ঠিক কতদিন পরে তার দেখা পাবো!

চলবে..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply