প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_০৯
দুই বছর কেটে গেছে নিঃশব্দে। ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকেনি এক মুহূর্তের জন্যও—সময় তার নিজের নিয়মে, নিজের গতিতে বয়ে গেছে। এই দুই বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে, আবার অনেক কিছু রয়ে গেছে ঠিক আগের মতোই, শুধু অনুভূতিগুলো আরও গভীরে বসে গেছে।
একসময় যে দিনগুলো ছিল অপেক্ষায় ভরা, এখন সেগুলো দায়িত্বে ভারী। মানুষগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজেদের জীবন নিয়ে—কেউ কাজের চাপে, কেউ স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে, কেউ বা সংসারের হিসাব মেলাতে মেলাতে। হাসির সময় কমে গেছে, কথোপকথন ছোট হয়ে এসেছে। আগে যে আড্ডাগুলো রাত পর্যন্ত চলত, সেগুলো এখন “পরে কথা হবে” বলে শেষ হয়ে যায়।
শহরের রাস্তাগুলো আগের মতোই কোলাহলপূর্ণ, কিন্তু সম্পর্কগুলো যেন একটু নীরব। পরিচিত মুখগুলো চোখে পড়ে, তবু থেমে কথা বলার সময় কারও নেই। সবাই যেন নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় দৌড়াচ্ছে। সময় কাউকে অপেক্ষা করায় না—সে শুধু এগিয়ে যায়, পিছনে ফেলে যায় স্মৃতি, না বলা কথা আর অপূর্ণ অনুভূতিগুলো।
এই দুই বছরে জীবন মানুষকে শিখিয়ে দিয়েছে বাস্তবতার কঠিন পাঠ। আবেগগুলো চাপা পড়েছে দায়িত্বের নিচে, স্বপ্নগুলো হয়েছে বাস্তবের সঙ্গে আপস করা। তবু কোথাও না কোথাও, বুকের গভীরে, কিছু অনুভূতি আজও রয়ে গেছে অবিকৃত—সময়ের স্রোতে ভেসে গেলেও মুছে যায়নি। গল্পের ঠিক এখানেই সময় থামে না, বরং নতুন এক অধ্যায়ের জন্য নীরবে প্রস্তুতি নিতে থাকে।
ভোরের আলো জানলার ফাঁক গলে রাফসার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। চোখে আলো পড়তেই চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। মাথাটা ধরে আছে। কপালে বিরক্তির ভাঁজ — জিভ দিয়ে ঠোঁটের অগ্রভাগ ভেজায়। পাশের বালিশের উপর অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নিল। বাটন চেপে সময় দেখতেই চক্ষু চড়কগাছ, অলরেডি ছয়টা বাজে। ভোর চারটার দিকে উঠার কথা। তবে দুঘন্টা পিছিয়ে পড়াতে মেজাজ বিগড়ে গেল। হন্তদন্ত করে বিছানা ছাড়ল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো ।
দেড় মাস আগেই রাফসার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আর তিন দিন পর রেজাল্ট বের হবে। এখন বর্তমানে মেডিকেলের জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে। এসএসসি এ প্লাস এসেছিল রাফসার। সেইদিন বোধহয় সবার অবাক হওয়ার দিন ছিল। কেউ ভাবতেও পারেনি, তেত্রিশ পেয়ে পাশ করা মেয়েটা এতো ভালো রেজাল্ট করবে।
রাফসা নিজেও অবাক হয়েছিল বেশ। নিজেকে এমন করে কখন তৈরি করলো ও? আনন্দে সেদিন অনেক কেঁদেছিল। রাজীব ফরাজী সেদিন পুরো এলাকায়,দলে মিষ্টি বিলিয়েছেন। রোহান উদ্যানকে ফোন দিয়ে এই খুশির খবর জানালেও, সেই মানবের দৃষ্টি একেবারে শান্ত ছিল। বোঝা যায়নি— সে খুশি হয়েছিল কিনা। এতো বছর পার হয়ে গেলেও রাফসার সাথে উদ্যানের কখনো কথা হয়নি। রাফসা নিজেও অনেকটা শক্ত হয়েছে। গুটিয়ে নিয়েছে সব কিছু থেকে। তিলে তিলে গড়ে তুলেছে নিজেকে। চঞ্চলতা নেই একদম। যেন নিজেকে আড়াল করতে চাইছে সবকিছু থেকে।
রাফসা এখন আর আগের মতো নেই। সৌন্দর্য ছাড়িয়ে গেছে। কোমর ছাড়িয়েও অনেকটা নিচে চুলগুলো নেমেছে। গায়ের রং টা বেশ ফর্সা হয়েছে। এই রাফসার পরিবর্তনের পেছনে ছিল অগণিত নির্ঘুম রাত। নিজের সাথে নিজেই লড়াই চালিয়ে গিয়েছে প্রতিনিয়ত। কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। হাজার বার ভেঙ্গে নিজেকে গড়েছে।
রাফসা ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেল। দশ মিনিট পর কফি হাতে ফিরে আসে রুমে। বায়োলজি বইটা নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। দোলনায় বসে একহাতে কফি, অপর হাতে বই। মাঝে মাঝে বারান্দায় আসলে সেইদিন রাতের কথা মনে পড়ে যায়। ওর করা পাগলামির কথা মনে পড়লে খুব হাসি পায়।
সকাল আটটা,,,
রাফসা গোসল সেরে বেরিয়েছে। নয়টা থেকে কোচিং আছে। রাফসা কালো বোরকা হিজাব পরে নেয়। হাতে কালো ঘড়ি। কালো রং টা ওর সবচেয়ে পছন্দের। রেডি হয়ে ব্যাগটা নিয়ে নিচে চলে গেল।
ঊষা রাফসাকে দেখে জিজ্ঞেস করল।”আজ তৈরি হয়ে গেলি কেন এতো তাড়াতাড়ি?”
“আজ নয়টায় কোচিং আছে। আটটা অলরেডি বেজে গেছে, তাই একেবারে রেডি হয়ে নেমেছি।”
ঊষা তাকিয়ে রইল। মেয়েটা কত চেঞ্জ হয়েছে। শুধুমাত্র ওর ভাইয়ের জন্য।নারী চাইলে সব করতে পারে। শখের পুরুষকে যেমন পাগলের মত ভালবাসতে পারে — তেমনি ভুলে যেতে পারে।
ডাইনিং এ রাফসা ঊষা জারা রোহান বসেছে। রাহেলা ফরাজী ওদের নাস্তা দিয়ে গেছে। সবাই রুটি বা পরোটা খেলেও রাফসা তা খাবে না। ওর জন্য আলাদা করে নুডুলস রান্না করতে হয়।
“রাফসা, তোর প্রিপারেশন কতটুকু হলো?”
রোহানের কথায় রাফসা মুখ তুলে তাকাল। মুখের খাবারটুকু চিবোতে চিবোতে বলল।”আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তবে, ফিজিক্সে একটু সমস্যা আছে। সেটা নিয়েই বেশ টেনশন।”
রোহান শুনলো ওর কথা। রাফসার মেডিকেলের চান্স পাওয়া নিয়ে সবাই অনেক এক্সাইটেড। যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে। রোহান কিছু একটা ভেবে বলল।”কোচিং এ তো পড়িস। বাড়িতে একটা টিচার রাখলে কেমন হয়? শুধু ফিজিক্স পড়াবে।”
রাফসা একটু ভাবুক হলো। কোচিং করলেও বাড়িতে কখনো টিচার রাখা হয়নি।”টিচার কোথায় পাবো এখন? টিচার খুঁজতেও সময় লাগবে।”
রোহান ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল।”তুই চিন্তা করিস না। আমার ফ্রেন্ড, জিনিয়া চুয়েটে পড়ছে। তুই চাইলে ওর সাথে কথা বলে দেখতে পারি। ও স্টুডেন্ট পড়ায়।”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে বলে।”আমি বললে হবে না তো। আম্মু কি বলে সেটা দেখতে হবে।”
“কি বলবে কাকি?কাকি জানলে আরো খুশি হবে।”
রাফসা ভেবে দেখলো অফারটা মন্দ নয়। মেয়ে টিউটর। ভালোই হবে। গলা উঁচিয়ে মাকে ডাকে। মেয়ের ডাক শুনে ততক্ষণাৎ কিচেন থেকে ছুটে এলেন ওনি। মেয়েটা প্রচুর পরিশ্রম করছে চান্স পাওয়ার জন্য। মেয়ের চেয়ারের নিকট দাঁড়িয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম কন্ঠে বলল।”কি হয়েছে মা? কিছু লাগবে তোর?”
রাফসা মায়ের এতো কেয়ার দেখে হাসল। ওর থেকে বোধহয় ওর মায়ের টেনশন বেশি। খেতে খেতে বলল।”আম্মু, আমার ফিজিক্সে সমস্যা হচ্ছে। বাড়িতে টিউটর রাখতে চাইছি। তুমি কি বল?”
মেয়ের কথায় নিমিষেই চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল । এটা জিজ্ঞেস করার কি আছে?” তুই আমার থেকে জিজ্ঞেস করছিস কেন? যেটা ভালো মনে হয় সেটাই কর।”
রোহান বলল।”কাকি দেখো, রাফসাকে বলেছি তুমি কিছু বলবে না। তবুও বলছে তোমার থেকে জিজ্ঞেস করে নিবে।”
হুমাইরা ফরাজী হেসে বলল।”আমার লক্ষী মেয়ে। তাই তো জিজ্ঞেস করে নিচ্ছে। কিন্তু এখন টিউটর কোথায় পাবো? ওর বাবা আসুক বাড়ি, ওনাকে বলব টিউটর দেখতে।”
ঊষা মুখে কুলুপ এঁটে এতোক্ষণ বসে ছিল। সব শুনেই গেছে। মাথা তুলে বলল।”কাকি, বাইরে থেকে টিচার আনার কি দরকার? রিশান ভাইয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে অনার্স করেছে। ওনাকেই বলো , রাফসাকে পড়ানোর জন্য।”
রাফসা আঁতকে উঠল। ভাইয়া তো পড়াবে কম মারবে বেশি। আর ভাইয়ের কাছে পড়তে চাইছে না। হুমাইরা ফরাজী উষার কথায় মুখ বাঁকায় ।” সে গুণধর ছেলেকে বলে কয়ে লাভ নেই। ওর পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটিয়ে ব্যবসার পেছনে লেগেছে।”
রাফসা খাবার টুকু খেয়ে উঠে পড়ল। হাতে ব্যাগ নিয়ে রোহানের পানে তাকিয়ে বলল। ” ভাইয়া, তুমি তাহলে কথা বলে রেখো। হাতে সময় খুব কম।”
” চিন্তা করিস না। আমি আজকেই কথা
বলে পড়াতে আসতে বলবো।”
রাফসা নিশ্চিন্ত হয় খানিক। রসায়ন, জীববিজ্ঞান গাইড করতে পারলেও পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। যদিওবা মেডিকেলের জন্য জীববিজ্ঞানে ইফেক্ট দিতে হয় বেশি। ওটা পানি ভাত। রাফসার ফেবারিট সাবজেক্ট সেটা।সবার থেকে বিদায় নিয়ে রাফসা বেরিয়ে পড়লো।
:
:
কোচিং সেন্টারের সামনে এসে রাফসা দেখল ওরা চারজন দাঁড়িয়ে আছে। রাফসাকে দেখে ওরা এগিয়ে আসে। সাতারুল হায় হুতাশ করে বলে। “সাদু, রেজাল্ট এর বেশি দিন নাই। চল একটা ট্যুর দিয়ে আসি। পরীক্ষায় মারা খেলে, বাসা থেকে টাকা দিবে না।”
সায়মাও তাল মিলিয়ে বলল। “ঠিক বলেছে। চল,আমরা নাহয় একটু ঘুরে আসি। রেজাল্টের টেনশনে ভালো লাগছে না।”
ওরা চাইছে রেজাল্ট বের হওয়ার আগে ট্যুর দিয়ে আসতে। যদি খারাপ রেজাল্ট করে তখন তো বাড়ি থেকে টাকা দিবে না। রাফসাও কিছু একটা ভেবে বলল।”তবে চল, কালই যাই।”
সাবিকুন মন খারাপ করে বসে। ওর ফ্যামিলি থেকে ওকে কোথাও যেতে দেয়না। ” আমি বোধহয় যেতে পারব না রে। আমার মা দিবে না। তোরা ঘুরে আয়।”
ওরা এ কথা শুনতেই যেন চেতে উঠল। সবসময় সাবিকুন এমন করে। ওর জন্য একটা না একটা ঝামেলা বাঁধবেই। আশরাফুল কটমট করে তাকিয়ে বলল। “চুপ কর শালি। তোর তাল বাহানা শুনলে মাথায় আগুন ধরে যায়। সবসময় তুই এমন করিস।”
সাবিকুন ও ফুঁসে উঠলো। ও তো যেতে চায়। ফ্যামিলি থেকে পারমিশন না দিলে কি করে যাবে। “তুই চুপ কর শালা, আমি কি স্বাদে যেতে চাই না।”
রাফসা ওদের দুজনের থামাল। নয়তো দুটো এখানেই ঝগড়া লেগে যাবে। “সাবিকুন চেঁচাস না। আমি সায়মা কথা বলব আন্টির সাথে।”
“আচ্ছা বাদ দে। আগে ঠিক কর কোথায় যাবো। কিছু ঠিকঠাক না করেই মারামারি লেগে যাচ্ছে এই গাঁদা গুলো।”
সাতারুলের কথায় ওদের টনক নড়ল। আসলেই কোথায় যাওয়া যায়। সায়মা বলল।”চল,ফয়েস লেক থেকে ঘুরে আসি। ভালোই তো জায়গাটা।”
রাফসা ওর মাথায় গাট্টা মারে। “শালি, একজায়গায় কতবার যাবি। যখনই ঘুরতে যাওয়ার নাম শুনে,ওমনি ফয়েস লেক নিয়ে টানাটানি। চল,আমরা বরং সীতাকুণ্ড থেকে ঘুরে আসি। পাহাড়ি জায়গা ভালো লাগবে। “
রাফসার কথায় সবাই রাজী হলো। কেউ দ্বিমত পোষণ করল না। আসলেই পাহাড়ি এলাকায় সৌন্দর্যটা আকাশ ছোঁয়া। কোচিং এ স্যার আসার অগেই ওরা ঢুকে গেল।
.
.
এপার্টমেন্টটা তখন নিস্তব্ধ।
শহরের কোলাহল জানালার কাচ পেরিয়ে এসে থেমে গেছে। নরম আলোয় ঘরটা যেন ঘুমিয়ে থাকা উদ্যানের শ্বাসের সাথে তাল মিলিয়ে নিঃশব্দে বেঁচে আছে।
উদ্যান ঘুমিয়ে আছে গভীরভাবে। এক হাত বালিশের নিচে, আরেকটা বুকের ওপর আলগা করে রাখা। সারাদিনের ক্লান্তি ওর শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘুমের ভেতরেও ওর কপালে হালকা ভাঁজ—যেন দায়িত্বগুলো স্বপ্নের মধ্যেও ওকে ছাড়তে চায় না। উষ্কখুষ্ক চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালে পড়ে আছে, কিছুটা বালিশে ছড়িয়ে—এই অগোছালো চুলেই ওকে অদ্ভুতভাবে বেশি জীবন্ত লাগে। সার্জনের সেই নিয়ন্ত্রিত, কঠোর মানুষটা এখানে নেই। এখানে শুধু একজন ক্লান্ত মানুষ, যে একটু শান্তি খুঁজছে।
ঘুমের গভীরতা ভাঙে ধীরে ধীরে।
প্রথমে ওর শ্বাসের ছন্দ বদলায়। তারপর চোখের পাতা নড়ে ওঠে। উদ্যান আস্তে করে চোখ মেলে—কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থাকে ছাদের দিকে, যেন বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে এসে ওর চোখে পড়ে। সে চোখ কুঁচকে আবার বন্ধ করে, এক হাত দিয়ে উষ্কখুষ্ক চুলগুলো পেছনে সরায়।
ঘুম থেকে উঠার সেই মুহূর্তে ওর ভঙ্গি বদলে যায়। ধীরে বসে পড়ে বিছানার ধারে। পায়ের পাতায় ঠান্ডা মেঝের স্পর্শ পেয়ে বাস্তবে ফিরে আসে পুরোপুরি। একবার গভীর নিশ্বাস নেয়—যেন নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। এলোমেলো চুল, আধোঘুম চোখ, ক্লান্ত মুখ—সব মিলিয়ে উদ্যান তখন নিখুঁত নয়, কিন্তু সত্য।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় উদ্যান। ভোরের আলো টুকু ওর মুখে লালচে রঙের আভা ফেলছে। উদ্যান তাকিয়ে রইল আকাশ পানে। প্রায় তিন বছর হয়ে আসছে দেশ ছেড়ে আসার। আর কতদিন পরিবার পরিজন ছেড়ে এই দেশে পড়ে থাকতে হয় জানা নেই তার। হসপিটাল থেকে ফিরে এই ছোট বাড়িটাই তার জীবন কাটছে। দেখতে দেখতে সময়গুলো চলে গেল। তবে, উদ্যানের কাছে বোধহয় হাজার বছরের সমান লেগেছে। উদ্যানের ভাবনার মাঝেই জিহাদ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো রুমে। রুমে না পেয়ে বারান্দায় ছুটে আসে। উদ্যানকে বারান্দায় দেখে হাপ ছেড়ে বাঁচে যেন।
“উদ্যান, তাড়াতাড়ি কর ভাই। হসপিটাল থেকে ফোন এসেছে। সিরিয়াস রোগী। হার্ট সার্জারি করাতে হবে।”
জিহাদের কথায় পেছনে ফিরে তাকালো উদ্যান। রোগীর কথা শুনে মাথা থেকে আজাইরা চিন্তা ভাবনা ঝেড়ে ফেলল। একজন ডাক্তারের কাছে রোগীর প্রায়োরিটি বেশি। দ্রুত ফ্রেশ হতে চলে যায়। কোনোরকম শাওয়ার ছেড়ে বেরিয়ে এলো। সাদা শার্ট গায়ে জড়িয়ে উপরে এপ্রোন পড়ে নিল।
উদ্যান
হার্ট সার্জন হিসেবে ওর উপস্থিতিতেই আলাদা একটা ভরকেন্দ্র তৈরি হয়।
সাদা ডাক্তারের কোটটা ওর লম্বা, দৃঢ় গড়নের শরীর ঘিরে থাকে নিখুঁত ভঙ্গিতে। কোটের বুকপকেট থেকে সামান্য বেরিয়ে থাকা কলমটা যেমন দায়িত্বের চিহ্ন, তেমনি ওর পরিচয়ের নীরব ঘোষণা। ভেতরে হালকা নীল স্ক্রাবস, পরিপাটি করে পরা—কোনো ভাঁজ নেই, কোনো এলোমেলো ভাব নেই। প্রতিটা ভাঁজে আছে শৃঙ্খলা, প্রতিটা বোতামে আছে আত্মবিশ্বাস।
গলায় ঝুলে থাকা স্টেথোস্কোপটা যেন শুধু যন্ত্র নয়—
ওটা ওর অস্ত্র, ওর ভাষা, ওর প্রতিজ্ঞা। ঠান্ডা ধাতব বৃত্তটা যখন ওর আঙুলে ছোঁয়া লাগে, মনে হয় অসংখ্য হৃদস্পন্দনের গল্প জমে আছে সেখানে। কত ব্যথা, কত আশা, কত জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ—সবকিছু শুনেছে এই স্টেথোস্কোপ। উদ্যান যখন সেটা গলায় ঝুলিয়ে হাঁটে, হাসপাতালের করিডোর নিজেও যেন একটু নীরব হয়ে যায়।
ওর চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু অবহেলা নেই। দীর্ঘ অপারেশনের পরেও ওর দৃষ্টিতে থাকে অদ্ভুত এক স্থিরতাযেন ভেঙে পড়ার বিলাসিতা ও কখনো নিজের জন্য রাখে না। হাত দুটো দৃঢ়, নির্ভুল—এই হাতেই থেমে যাওয়া হৃদয় নতুন করে চলতে শেখে।
উদ্যান শুধু একজন হার্ট সার্জন নয়,
সে এমন একজন মানুষ—যার হাতে মানুষের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে নাজুক সত্যটা নিরাপদ।
সাদা কোট, গলায় স্টেথোস্কোপ, আর চোখভরা দায়িত্ব—এই তিনেই ওর পুরো পরিচয়।
রেডি হওয়া শেষে ড্রয়ারের উপর থেকে ফোনটা নিল। ওয়ালপেপারের পিকটা দেখে মুচকি হাসল। ফোনের উপর হাত বুলিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে।”আমি যাচ্ছি রুহি। একটা ইমার্জেন্সি অপারেশন আছে। তুমি দোয়া করো,যেন অপারেশন সাকসেসফুল হয়।”
ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে গেল হসপিটালের উদ্দেশ্য।
.
.
রাত নয়টা,,,
রাফসা ওর রুমে বসে পড়ছে। কাল যেহেতু ঘুরতে যাবে,কাল আর পড়া হবে না। তাই পড়াগুলো কভার করে নিচ্ছে। পরশু থেকে রোহানের ঠিক করা টিউটর আসবে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত পড়াবে। বেশি সমস্যা হলে টাইম নিয়ে পড়াবে বলেছে। রাফসা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। ফিজিক্স নিয়ে মোটামুটি চিন্তায় ছিল। এখন একটা চিন্তা নেমে গেল মাথা থেকে। তবে, এইচএসসি রেজাল্টের জন্যও বেশ টেনশন হচ্ছে। এ প্লাস না এলে তো মেডিকেল পরীক্ষা দিতে পারবে না। রাফসার ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা টং করে বেজে উঠল। ফোনের আওয়াজে ধ্যান ভাঙ্গে রাফসার।
গত দুই বছরে প্রায় মেসেজ আসে এই নাম্বার থেকে। রাফসা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কখনো ব্লক মেরে দেয়নি। সবসময় মেসেজ সিন করে রেখে দিলেও আজ রিপ্লাই দিতে ইচ্ছে হলো। ওপাশ থেকে মেসেজ এসেছে।
“হেই মেডাম, কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কে? পরিচয়টা দিলে খুশি হতাম।”
ওপাশ থেকে টাইপিং করছে। রাফসা তাকিয়ে রইল। মুহূর্তেই মেসেজ এলো।
“আমি আপনার মনের মানুষ মেডাম। আপনি তো চিনতে পারছেন না। মন দিয়ে আশে পাশে খুঁজুন। খুঁজে পাবেন।”
” এই যে মিস্টার, ফ্লাট করছেন আমার সাথে? কিন্তু,লাভ নেই। আমি ম্যারিড, বুঝেছেন আপনি?”
রাফসা ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইল। ওপাশ থেকে সিন হয়েছে সাথে সাথেই। হয়তো ওর ইনবক্সেই ঘাপটি মেরে বসে আছে। রাফসার দেওয়া মেসেজটার হাহা রিয়েক্ট দিল। এতে রাফসার চোয়াল ঝুলে যায়।
“কি বলছেন মেডাম? আপনি কি করে জানলেন , আপনি ম্যারিড? অবাক হলাম!”
রাফসা এবার তেতে উঠল। রাগে গজগজ করতে করতে টাইপিং করল।
” তোর অবাকের গুষ্টি কিলাই। সুদানিরফোয়া,আর যদি কথনো ডিস্টার্ব করিস না,তোর ঠ্যাং ভেঙ্গে রেখে দিব। তুই আবাল কখনো আমার সামনে পড়িস,তোর চুল ছিঁড়ে শাক রান্না করে ,তোকেই খাওয়াবো।শালা আবাল মার্কা জাউড়া।”
মেসেজ টা পাঠিয়ে রাফসা সাথে সাথেই ব্লক করে দিল। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। কতক্ষন ফোন দেখে। নিচে চলে যায় ডিনার করতে।
বাড়ির গৃহিণীরা রাতে জন্য খাবার গরম করছে। হুমাইরা ফরাজী তা এনে ডাইনিংএ রাখছে। বাড়ির কর্তারা ছাড়া সকলেই উপস্থিত আছে। রাফসা গিয়ে ওর বরাদ্দকৃত চেয়ারে বসে পড়ে। রিশান সবে এসে দাঁড়িয়েছে। বোনের পাশের চেয়ার খালি দেখে বসে পড়ল। রাফসার মাথায় গাট্টা মেরে বলল। “কিরে,ফকিরা। যেই খাবারের গন্ধ পেয়েছিস,ওমনি পড়া ফেলে দৌড়ে এসছিস। “
রাফসা রাগি চোখে তাকাল ভাইয়ের পানে। রিশান হেসে রাফসাকে আরো ডিস্টার্ব করছে। রাফসা উঠে যেতে নিলেই রিশান হাত ধরে বলে। “হয়েছে আর রাগ করতে হবে না। বস,ভাইয়া তোকে নিজ হাতে খাইয়ে দিব।”
রাফসা সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। রিসান হাসল বোনের কান্ড দেখে। জায়িন টিপ্পনী কেটে বলে।”এই ফকিরা তুই বসে পড়লি ? মাএ একবারই বলেছে। “
রাফসা চোখ গরম করে ভাইয়ের পানে তাকালো। রিশান বোনের দৃষ্টিতে থতমত খেয়ে গেল। মিন মিন করে বলে। “আমি কি বলেছি? জায়িন বলেছে,ওকে ধরে পেটা বোনু।”
রাফসা কানে হাত চেপে চেঁচিয়ে উঠলো। “তুমি আমাকে ফকিরা বলো কেনো ভাইয়া? তোমার থেকে শুনে সবাই এই নামে আমাকে ক্ষেপায়। আর কখনো বললে, তোমার সাথে আড়ি।”
রিশান জিভ কাটে। চোখ গরম করে জায়িনের পানে চায়। জায়িন একটা ভোলাভালা হাসি দিল।রোহান ঊষা জারা ওরা ঠোঁট চেপে হাসছে। রাফসা ওদের হাসতে দেখলে নির্ঘাত খবর আছে।রিশান প্লেটে খাবার নিয়ে বোনকে খাইয়ে দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নিজেও খাচ্ছে। সবাই খাওয়ার মাঝে এটা সেটা বলছে। উদ্যানের কথাও তুলেছছ ওরা।
.
.
সকাল সকাল রাফসা উঠে পড়ে । যদিওবা এটা ওর ডেইলি। রুটিন। তবে অন্য দিনের তুলনায় আজ একটু দেরিতে উঠেছে। কালো টপস পড়ে উপরে কালো কটি জড়িয়ে নিল। ওদের আউটফিট আজ কালো। সবাই কালো পড়বে। রাফসা তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসে। সবাই ঘুমিয়ে কাঁদা। মাকে বলে রাফসা বেরিয়ে পড়লো। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল পাঁচ মিনিট। রাফসাকে এখান থেকে পিক করে নেবে। একটা কালো রঙের গাড়ি এসে থামে রাফসার সামনে। আশরাফুল সাতারুল সামনে চেপে বসেছে। ড্রাইভার সাতারুলের খালাতো ভাই। রাফসা গাড়িতে উঠে বসল। সাবিকুন সায়মা বসে আছে। রাফসা বলল।”তোরা দুজনে সামনে বসেছিস কেনো? পেছনে এতো জায়গা থাকতে?”
আশরাফুল বলল। “আরে শালি পেছনে ঘুরে দেখ।”
রাফসা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো পেছনে। বড় স্পিকার দেখে হতভম্ব হয়ে শুধাল। ” এই কি করেছিস , স্পিকার এনেছিস কেনো?”
সাঁতারুল বলল।”গান না বাজালে মজা আছে নাকি? তাই নিয়ে আসছি।”
রাফসা ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকাল। “তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু পেছনে বসার মতো জায়গা আছে তো।”
আশরাফুল চেঁচিয়ে উঠলো। “এই শালা, আমি সামনে বসতে চাইছি। তুই পেছনে যা।”
“তুই যা শালার ভাই। আমি সামনে বসব।”
আশরাফুল চেতে উঠল। পেছনে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। রাফসার পানে চেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে।” আরেক দুই শালী জানালার পাশে বসার জন্য ঝগড়া করে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। তোরা মাইয়া মানুষ, জানালার পাশে কি পাইছস, বোঝা আমারে।”
রাফসা এতক্ষণে বুঝলো কাহিনী। কেন এই দুই রমনীর মুখ ভার। গাড়ি তার আপন গতিতে চলছে। সাতারুল ওর মোবাইল থেকে গান বাজালো।
বেয়াই আপনি যখন বইসা থাকেন চোখে চশমা লাগাইয়া
ভাবি শুধু আমারে ক্যান লইয়া যান না ভাগাইয়া
আশরাফুল ওর থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে গান বন্ধ করে দিল। নিজেই একটা গান লাগায়।
আমি দেখতে লালে লাল,যেন গোল মরিচের ঝাল।
ওরা গানের তালে তালে হাসছে হাত নাড়াচ্ছে, তালে তাল মেলাতে ব্যস্ত। ওদের মজা করার মাঝেই গাড়িটা ব্রেক কষে। সবাই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল তাতে। সামনে মিছিল হচ্ছে। পাঁচ মিনিট ধরে বসে থাকলেও কমছে না ভিড়। ওরা প্রায় বিরক্ত। তখনই স্পিকারে গান বেজে উঠলো।
এসেছে এসেছে আবার ইলেকশন,জিতবে নৌকা জিতবে জনগণ
ষোলো কোটি মানুষের একটাই ডিসিশন জিতবে নৌকা,নাই কোনো টেনশন (২)
জয় বাংলা জিতবে এবার নৌকা,জয় বাংলা জিতবে এবার নৌকা,,,
হয়তো মিটিং শেষ। ভিড় কমে যাচ্ছে। রাফসা চট করে আশরাফুলের থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। ইউটিউব থেকে একটা গান ছেড়ে দেয়।
জয় বাংলা, ফাঁসি এইবার সামলা
জয় বাংলা শেখ হাসিনার মামলা।
ভিড় সরে যাওয়াতে ড্রাইভার আস্তে আস্তে সামনে যাচ্ছিল। এই গান শুনে জিভ কেটে স্পিড বাড়িয়ে দিল। ছেলে পুলে এই গান শুনে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো গাড়ির পানে। ওরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে গান গাইছে আর হাসছে। রাফসা নিজেও গান গাইছে। তার পর চেঁচিয়ে বলল।” শালা আবাল, তোদের কারণে আমাদের দেরি হয়েছে।”
গাড়িটা ততক্ষনে অনেকটা দূরে চলে গেছে। ছেলেগুলো দৌড়ে যেতে নিবে ওমনি দলের নেতা থামিয়ে দিল।রানা নামের এক ছেলে বলল।”ভাই আপনি শুধু যাইতে দেন। ওই মাইয়ারে শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই ওই ছেলের গালে কষিয়ে এক থাপ্পর মারে। ছেলেরা অবাক হয়ে গেল। রানা গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকালো।
” এই তোর জিভ কেটে দিব। আমার মায়াবীকে নিয়ে কিছু বললে। তোদের ভাবী হয় সে।”
“ক্ষমা করবেন ভাই, আমি বুজতে পারিনি। মেডামের কাছে ক্ষমা চাইব নে।”
আভিয়ান চোখ গরম করে তাকাতেই ওরা সরে যায়। আভিয়ান রাস্তার পানে তাকিয়ে ঠোট কামড়ে হাসে।
” আমার মায়াবী।
চলবে…?
সরি,এওো গুলো সরি। পারিবারিক ঝামেলা, রাইটিং ব্লক সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি। খুব বড় সমস্যা না হলে এতো দেরি হবে না।
এবং এখানে গানগুলো কেউ সিরিয়াস নিবেন না।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১০
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৪
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৭(প্রথমাংশ + দ্বিতীয়াংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৬
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২