Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪


প্রেমবসন্ত_২

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

৪.

ঘরের মধ্যে থমথমে নীরবতা নেমে এলো।বেহরুজ বেগম ভীষণ রেগে আছেন এই মুহূর্তে।আতিয়া বেগম অর্ণকে চুপ করে থাকতে দেখে নীচু গলায় বললেন,

“তুমি কবুল করেছ ভাই।মেয়েটা তোমার তিন কবুলের বউ হয়।”

অর্ণর গলাটা শক্ত হয়ে এলো।দাদার চোখে চোখ রাখল।আতিয়া বেগম চুপ করে গেলেন ওর দৃষ্টি দেখে।

“আপনি চেয়েছিলেন লতা চাচির বড় মেয়েকে বিয়ে করিয়ে আমার বউ বানিয়ে রাখতে তাই তো?”

আগজর চৌধুরী মাথা নাড়লেন।অর্ণ বলল,
“তাহলে আমি আজ যদি ওই বিয়ে অস্বীকার করি, তাহলে আপনি কী করবেন?”

আজগর চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হলো।তিনি রেগে গিয়ে বললেন,
“বিয়ে হয়েছে,হয়েছে মানে মানতে হবে।বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ সাক্ষী তুমি ওকে বিয়ে করেছ।কোন মুখে অস্বীকার করছো?”

বেহরুজ বেগম আজ বেয়াদবি করলেন শ্বশুরের সামনে এই প্রথমবার।তিনি কিছুটা চওড়া গলায় বললেন,
“আপনি কী করে এত বড় একটা কথা চেপে গেছেন বাবা?আমি অর্ণর মা,আমিই জানি না আমার ছেলে বিয়ে করেছে।তাও আবার ৭ বছর আগে।”

“আমি মানছি আমার ভুল হয়েছিল তোমাদের মতামত না নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া।”

“এখন যে মেয়েটা এই বাড়ি এসে উপস্থিত হয়েছে,কী করব আমি?সে নিশ্চই জানে,অর্ণর বিয়ে করা বউ সে!”

অর্ণ কপাল কুঁচকে মায়ের দিকে তাকালো।মেয়েটা এই বাড়ি এসেছে মানে?
বেহরুজ বেগম রাগে কেঁদে ফেললেন।শাড়ির আঁচল মুখে চেপে বললেন,
“৭ বছর আগে বিয়ে হয়েছে আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।অর্ণও কেন আমাকে বলল না এই কথা?”

আজগর চৌধুরী বললেন,
“কায়নাতকে অর্ণর বউ বানিয়ে আমি কোনো ভুল করিনি।আজ নাহয় কাল ঠিকই তোমরা বুঝবে।”

অর্ণ বুঝল নীল শাড়ি যে মেয়েটা পরেছিল ওইটাই কায়নাত।অর্থাৎ লতা বেগমের বড় মেয়ে।সে উঠে দাঁড়াল।মায়ের কান্না দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,

“ওটা বিয়ে নয়,পুতুল খেলা ছিল।বাচ্চা একটা মেয়ে কবুল বলেছে মানে বিয়ে হয়ে গেলো?ওই বিয়ের কোনো মানেই হয় না।এই বিষয়ে আমার সাথে কেউ আর কথা বাড়াবে না।”

অর্ণ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ভারী পায়ে।ওর চোখে স্পষ্ট রাগ।বেহরুজ বেগম কান্না সামলাতে পারছেন না।চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
“আমার ছেলে এমন কথা বলবে ভাবিনি বাবা।কেন ওকে এমন অজান্তে ফাঁদে ফেলা হলো?”

আতিয়া বেগম নিচু গলায় বললেন,
“বেহরুজ,অর্ণর সাথে বিয়ে দিয়ে বাচ্চা মেয়েটার ভবিষ্যৎটা নিরাপদ করতে চেয়েছিলেন।”

বেহরুজ বেগম কটমট করে তাকালেন,
“আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে অন্যের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন?এ কেমন বিচার?বাড়িতে তো আরও মেয়ে ছিল,কই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তো আপনি ভাবলেন না?”

ঘরে আবার নীরবতা।বাতাস ভারী হয়ে এলো।আজগর চৌধুরী ধীরে বললেন,
“তোমরা বুঝবে একদিন,আমি যেটা করেছি,সেটা ভালোর জন্যই করেছি।”

“আমাকে একটাবার বলা উচিত ছিল বাবা।বাড়িতে নাজনীনও তো ছিল?আমার ছেলেকেই কেন আপনার চোখে পড়ল?”

“তোমার ছেলেই বারণ করেছিল বিয়ের ব্যাপারটা কাউকে না জানাতে।সময় হলে সে নিজেই জানাবে।অথচ আজ সে বিয়েটাকেই অস্বীকার করছে।”

বেহরুজ বেগম হতবিহ্বল হয়ে গেলেন।ছেলের চোখে যেই একগুঁয়ে জেদ দেখলেন,তাতে বোঝা গেলো এখন ওর সঙ্গে তর্ক মানে ঝড় ডেকে আনা।
তিনি একবার আজগর চৌধুরীর দিকে,আবার আতিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“যে ছেলে নিজের মুখে বলে,বিয়েটা পুতুল খেলা, সে আজ কায়নাতকে কীভাবে গ্রহণ করবে বাবা? মেয়েটার কি দোষ?”

আজগর চৌধুরী চুপ করে রইলেন।মুখে কোনো কথা নেই,শুধু চোখের কোণে ক্লান্তির ছাঁয়া।
দরজার বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে,পর্দাটা নরমভাবে দুলে উঠছে।ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার সামনে একটা ছাঁয়া পড়ল।
বেহরুজ বেগম তাকিয়ে দেখলেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কায়নাত।

তার গায়ে এখনো সেই নীল শাড়িটা,যা অর্ণর চোখে জ্বলন্ত আগুনের মতো লেগেছিল কিছুক্ষণ আগেই।
মেয়েটার হাতে চায়ের কাপ।নিধিই হয়তো পাঠিয়েছে তাকে দিয়ে।মেয়েটাকে সবার সাথে সহজ করার জন্যই হয়তো তাকে বাড়ির কাজেও সাথে রাখছে।

বেহরুজ বেগম একটু থমকে গেলেন।
“তুমি… তুমি কায়নাত?”

কায়নাত নিচু গলায় বলল,
“জি,আমি কায়নাত।”

আতিয়া বেগম ওকে ঘরে আসতে বললেন।কায়নাত চায়ের ছোট ট্রে এগিয়ে দাদা আর মাশফিক চৌধুরীকে চা দিয়ে বলল,
“নিধি আপু চা দিতে বলল।”

বেহরুজ বেগম লম্বা শ্বাস টেনে কায়নাতকে কাছে ডাকলেন।মেয়েটা শান্ত চোখে একবার সবার দিকে তাকিয়ে গুটি গুটি পায়ে বেহরুজ বেগমের কাছে গিয়ে বসল।বেহরুজ বেগম ওর হাত মুঠোয় নিয়ে তাকালেন মেয়েটার শান্ত মুখখানায়।

“শোনো,আমি সোজাসজি কথা বলব।মিথ্যে বলে আমায় বিব্রত করবে না।”

কায়নাত শুষ্ক ঢোক গিলল।আজব ব্যাপার,উনি তার সাথে এভাবে কেন কথা বলছে?মেয়েটা একটু ভীতু হলো।আর যাইহোক সে কাউকে চেনে না।হঠাৎ করে কেও এভাবে কথা বললে অবশ্যই চিন্তিত হবে।সে মাথা নাড়ল।

“আমার ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছিল এটা তুমি জানো?”

কায়নাতের শ্বাস আঁটকে এলো।শুকনো ঢোক গিলে মাথা নত করল।হ্যা,সে জানে তার বিয়ে হয়েছিল চৌধুরী বাড়ির একটা ছেলের সাথেই।মা বলেছিলেন ,তবে লোকটার নাম কী,দেখতে কেমন কিছুই সে জানে না।কায়নাতকে অমন চুপ করে থাকতে দেখে বেহরুজ বেগম বললেন,

“জানো নাকি জানো না?”

কায়নাত ধীর কণ্ঠে বলল সে জানে।বেহরুজ বেগম গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন।কায়নাত বয়সে অর্ণর থেকে অনেকটাই ছোট হবে।সব দিক ভেবে তার মাথা ঘুরছে।কী হবে সামনে?কী করে সামাল দিবে সব কিছু?বিয়েটাকে অস্বীকার করে তো আর মেয়েটাকে ছুড়ে ফেলা যায় না।যতই হোক,চৌধুরী বাড়ির প্রথম বউ কায়নাত।তিন কবুল পড়ে ছেলে বিয়ে করেছে।তিনি থম মেরে বসে রইলেন।কায়নাতের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল-“আমার জামাইটা কে?জামাই জামাই করে তো লোকটার জন্য একটা প্রেমও করতে পারলাম না”। বেচারি মনের কথা মনে চাপা দিয়ে রাখল।যা বুঝল বেহরুজ বেগমই তার শাশুড়ি হয়।তার চার ছেলেই সে দেখেছে।এখন কথা হচ্ছে বিয়েটা কার সাথে হয়েছে?লোকটার কী কায়নাতের জন্য একটুও পরাণ পোড়েনি?এত বছরে একটাবার তো খোঁজ খবরও নিয়ে দেখল না।নিশ্চিত খবিশ’ই হবে।

ঘরে অনেকক্ষণ নীরবতা চলল।শেষে মাশফিক চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ছেলেকে নিয়ে কী করব আমি?ও আমার একটা কথাও শোনে?”

বেহরুজ বেগম বললেন,
“এসব কথা পরে হবে।আমার মাথা ধরেছে এখন।”

কায়নাত ঘরের আবহাওয়া দেখে বুঝল নিশ্চিত খানিকক্ষণ আগে কিছু একটা হয়েছে।তার চঞ্চল মন একবার অচেনা স্বামীটাকে দেখতে চাইল।লোকটা কেমন দেখতে?হাসিখুশি,সুন্দর দেখতে নাকি রাগী গম্ভীর আর বুড়োদের মতো দেখতে?

বেহরুজ বেগম মাশফিক চৌধুরীকে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেলে আতিয়া বেগম কায়নাতের কাছে এসে বসেন।মেয়েটার চিন্তিত মুখ খানা দেখে বললেন,
“তোর শাশুড়ি মা কিন্তু খুব ভালো,সে জানত না তোদের বিয়ের কথা তাই এত রেগে গেছে।ভয় পেয়েছিস?”

কায়নাত বলল,
“উনি আমার শাশুড়ি হয় কী করে?দেখতে তো বুড়ি বুড়ি লাগে না।”

কায়নাতের বাচ্চামো কথায় আজগর চৌধুরী কেঁশে উঠলেন।তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আতিয়া বেগম বললেন,
“উনিই তোর শাশুড়ি।”

আতিয়া বেগম কায়নাতের লাল টুকটুকে মুখ খানার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।কেন যেন ভীষণ টান অনুভব হয় মেয়েটার জন্য।কায়নাতের নাক ফোঁড়ানো দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“নাকে নাকফুল পরিস না?”

কায়নাত কথা চেপে গেলো।এই নাকফুলের পেছনেও বহু কাহিনি লুকিয়ে আছে।সে মাথা নাড়িয়ে বলল সে নাকফুল পড়ে না।আতিয়া বেগম ভাবলেন নাকফুল স্বামীর দেয়া উচিত।তবুও তো খালি রাখা যায় না।তিনি নিজের আলমারি থেকে ছোট দেখে একটা নাকফুল ওকে পরিয়ে দিলেন।সাথে এটাও বললেন যে বালা তাকে দেয়া হয়েছে সেটা যেন সে পড়ে।কায়নাত সম্মতি দিলে তিনি ঘর থেকে বের হন ওকে নিয়ে।

আদাল রেডি হচ্ছে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে।নুসরাত,তার বোন আর বোনের ছেলেকে আনতে যাচ্ছে গুলশান।নুসরাতের কিছু কাজ থাকায় সে সবার সাথে আসতে পারেনি।শেহের আদালকে কিছু বলার জন্য হাঁফফাঁস করছে।শেষে নিজেকে দমাতে না পেরে বলল,

“তুই একা যাবি আদাল?চল,সাথে আমিও যাই।”

আদাল মাথার চুল ঠিক করে পিছু ঘুরে দাঁড়াল।
“সত্যি যাবে?”

“হ্যা।”

“চলো যাই।”

শেহের তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ল আদালের সাথে।ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্বার্থ দোতলার বিশাল বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে ছিল।বিরক্ত লাগছে সব কিছু।বাড়ি ভর্তি মানুষ থাকলেও কোথাও যেন শূন্যতা অনুভব হচ্ছে।নিশা নিধির ঘরে যাওয়ার সময় দেখল স্বার্থ একা একা বসে আছে।সে এগিয়ে গেলে স্বার্থ মাথা তুলে তাকায়।দেখে নিশা হেঁটে হেঁটে তার দিকেই আসছে।

“কিরে নেশার বাচ্চা,সারাদিন টোইটোই করিস কেন?”

নিশা পাশে চেয়ার টেনে বসল।স্বার্থর চোখে চোখ রাখতেই ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার স্বার্থ ভাই?এভাবে একা একা বসে আছো কেন?তোমার বউ কই?”

“প্রেমা গোসল করতে গেছে।”

“এই সময়ে?”

স্বার্থ মাথা নাড়ায়।নিশা নিচে তাকিয়ে দেখে আত্মীয়দের বাচ্চা ছেলে মেয়ে গুলো বাগানে খেলায় ব্যস্ত।নিশা আড়চোখে স্বার্থর দিকে তাকায়।গলার স্বর নিচে নামিয়ে বলে,

“আমি তাহলে যাই।থাকো তুমি।”

স্বার্থ মাথা নাড়ায়।নিশার যেন খুব রাগ হলো।তবুও চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের দিকে রওনা হলো।চোখ থাকতেও যারা কানা তাদের আর কিভাবে বোঝানো যায়?
নিধির ঘরে এসে দেখল নিধি গুনগুন করে গান গাইছে আর চুল ঠিক করছে।নিশা বিছানায় গিয়ে বসল।চোখ দুটো সরু করে বলল,

“মনে রং লেগেছে?”

নিধি মুচকি হাসে।সেই হাসিতে লজ্জায় গালে লাল আভা দেখা যায়।নিশা আশ্চর্য হয় ওকে দেখে।নিধি বলে,
“বল তো কী হয়েছে?”

“কী হয়েছে?”

“কাব্য কল করেছিলেন।”

“তো?”

“তো মানে?তোর আর আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন।”

“কী জিজ্ঞেস করেছেন?”

“ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলেন।”

নিশা ফোঁস করে চাপা নিঃশ্বাস ফেলল।নিধি আর নিশা একই ভার্সিটির একই বর্ষে পড়াশোনা করছে।আজগর চৌধুরী নিধিকে ঢাকায় রাখেন পড়াশোনার জন্য।নিধি মাশফিক চৌধুরীর বাড়িতে থেকেই পড়ছে এসএসসি দেয়ার পর থেকে।

নিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গালে হাত দিলো।উদাস কণ্ঠে বলল,
“প্রেমের ফাঁদে মানুষকে কী করে ফাঁসানো যায়?”

“কাকে ফাঁসাতে চাচ্ছিস?”

“জানিস না?জেনেও ঢঙ করছিস কেন?”

নিধি চিরুনি রেখে নিশার পাশে এসে বসল।
“শোন,যেটা ভাবছিস এটা কী করে সম্ভব?কতবার বুঝিয়েছি তোকে?”

“কী সমস্যা?উনার বয়সটা একটু বেশি এইটুকুই তো?”

“তা নয়।বয়স দেখে কখনো ভালোবাসা হয় না।কিন্তু সে তোর ভাইয়ের বন্ধু।হয়তো ভাইয়া তোকে বোনের চোখেই দেখে।”

“ভাইয়ের বন্ধু মানে মানুষ না? আমি তো ভাবলাম তারা আলাদা কোনো প্রজাতির!”

নিধি কপালে হাত দিয়ে বলল,
“তুই পাগল! ওরা বড় মানুষ।স্বার্থ ভাই,শেহের ভাই এরা সবাই অর্ণ ভাইয়ের ব্যাচ।তুই ওদের সামনে ছোট।ওরা তোকে সিরিয়াসলি নেবে না।”

“ওরা নিক না,আমি তো নিবো।”
নিশা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল।
“উনার চোখের সেই ভাবটা,যেভাবে আকাশ দেখে তুই দেখিসনি নিধি! আমি ঠিক উনার চোখে একা থাকার কষ্ট দেখেছি।”

নিধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ও চোখে তো আমি প্রেম দেখি না,তুই কষ্ট দেখিস। দুজনেরই কল্পনা আলাদা!”

নিশা মুচকি হেসে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল।
“একদিন উনাকে বলব,-‘স্বার্থ ভাই,আপনাকে আমি ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি।’ এরপর দেখি কী হয়।”

“এসব পাগলামি করিস না,চোয়ালে যখন মাঁচ আঙুলের ছাপ বসবে তখন বুঝবি।”

নিশা হাসতে হাসতে চোখ বন্ধ করল।
“তাও চলবে,উনার হাতে মার খাওয়া মানেও তো একরকম ভালোবাসা।”

“ঠিকই আছে।প্রেমে পড়লে ছাগলও পাগল হয়।”

ঢাকার শীতের সন্ধ্যা মানেই এক ধরনের নরম, মায়াময় আবহ।
চারপাশে হালকা কুঁয়াশার আস্তরণ নেমে আসে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো কুঁয়াশার ভিতর দিয়ে ঝাপসা হয়ে ঝুলে থাকে।হকাররা ফুটপাতে বসে গরম চা,ভাজা বাদাম,মোড়ানো মুড়ি বিক্রি করে। চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসে ধোঁয়া মেশানো আদা চায়ের গন্ধ।

লোকজন গায়ে কম্বল বা সোয়েটার জড়িয়ে হাঁটছে, কেউবা হাত ঘষে উষ্ণতা নিচ্ছে।দূরে আযানের ধ্বনি মিশে যায় ঠান্ডা বাতাসে।রিকশার ঘণ্টার টুংটাং শব্দের সঙ্গে ভেসে আসে পিঠার দোকান থেকে নারকেল-গুড়ের মিষ্টি গন্ধ।

আকাশে তখন একচিলতে চাঁদ,পাশে টিমটিমে তারা।শহরের কোলাহলের ভেতরেও সেই মুহূর্তে ঢাকাটা যেন একটু থেমে যায় ,একফোঁটা নিরবতা, একচুমুক শীত,আর একটুকরো উষ্ণ অনুভব।
শেহের চৌধুরী বাড়ি এসেছে আদালের সাথে।নুসরাত ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বের হলো তৈরি হয়ে।আদিত্য,নুসরাতের ছেলে।বয়স ৬ বছর।ভীষণ দুষ্টু একটা বাচ্চা।সে গাল ফুলিয়ে বসে আছে ড্রয়িংরুমের সোফায়।মা আজ ইচ্ছে মতো মেরেছে তাকে।স্কুল থেকে দুইদিন পর পর বাচ্চাটার নামে বিচার আসে।

শেহের আদিকে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখে বলল,
“কী হয়েছে,আদি?”

আদি ঠোঁট উল্টে বলল,
“মা আমাকে আজও মেরেছে জানো?”

“কেন?”

“স্কুল থেকে শুধু শুধু আমার নামে বিচার দেয় স্যাররা।তুমি বিশ্বাস করো,আমি একটুও দুষ্টুমি করি না।”

নুসরাত সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল,
“আদি,একে তো অন্যায় করেছ এখন আবার মিথ্যে কথা বলছো?”

শেহের ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো।কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পড়ে মাথায় কালো রঙের হিজাব বেঁধেছে নুসরাত।শেহেরের ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসির দেখা মিলল।ঠোঁট কামড়ে হেসে মাথা নত করল।কমন ওয়াশরুম থেকে আদাল বের হতেই নুসরাতকে দেখে বলল,

“আপু,বের হো।অলরেডি অনেক লেট হয়ে গেছে।”

ওরা বাড়ি থেকে বের হলো।গাড়িতে উঠে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বাড়ির দারোয়ান হিনানকে বলে গেলো বাড়ির দেখাশোনা করতে।

ওদের খুলনা পৌঁছাতে বেশ রাত হলো।তখন পুরো গ্রাম নিশ্চুপ।বাড়ির কিছু মানুষ জাগ্রত ছিল তাদের জন্যই।আদি প্রেমকে দেখেই দৌঁড়ে মামার কোলে উঠে গেলো।প্রেম ভ্রু কুঁচকে বলল,

“দাঁত কেলিয়ে হাসছিস কেন?স্কুল থেকে আজ কল এসেছিল আমার কাছে।কোন ছেলের পা’ছায় কলম ধরেছিলিস?”

নুসরাত নাক ছিঁটকে মায়ের সাথে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।ছেলেটা স্বার্থদের সাথে থাকতে থাকতে বড্ড ফাজিল হয়ে গেছে।একে হাজার বললেও এখন কাজ হয় না।
স্বার্থ তখন প্রেমের পাশে এসে দাঁড়াল।আদিকে দেখে চোখ টিপ দিতেই আদি সব গুলো দাঁত বের করে বলল,

“স্বার্থ ভাই,হিসু করব।”

স্বার্থ চোখ কপালে উঠিয়ে বলে,
“তোর বাপের বয়সী একজন লোককে ভাই ডাকতে তোর লজ্জা লাগে না?তোর মায়ের ভাই হলে তোর ভাই হই কী করে?”

আদি আড়চোখে শেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যেভাবে শেহের ভাইয়ের বাচ্চার মা হলে।”

শেহের হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।স্বার্থ দাঁত চেপে প্রেমের কোল থেকে আদিকে নামিয়ে বাগানের দিকে হাঁটা ধরল।বাকিরা বাড়ির ভেতর চলে যাওয়ার পর আদি বাগানের এক কোণায় গিয়ে প্যান্ট এর চেইন খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মাথা উঁচিয়ে ঝাঁপসা চোখে স্বার্থর দিকে তাকায়।
স্বার্থ বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে,সামনে বাগানের এক কোণায় আদি প্যান্ট ধরে যুদ্ধ করছে।
“চেইন খুলে না স্বার্থ ভাই।”

আদি ফের ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এইটা নিশ্চই মায়ের বদলা! গতকাল আমি উনার পারফিউমে পানি ঢেলেছিলাম।”

স্বার্থ চোখ কপালে তুলে বলল,
“তুই ছয় বছর বয়সেই শুরু করছিস মায়ের সাথে শত্রুতা? বড় হলে কী করবি তুই!”

আদি কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“তুমি আগে চেইনটা খুলো।আমার পেট ব্যথা করছে।”

স্বার্থ মাথা চুলকালো।
“আমি আবার তোর চেইন খুলব? বাপের বয়সের লোক আমি,আর তুই আমার সামনে এভাবে…”

এই সময় প্রেম সদর দরজার সামনে থেকে চিৎকার করে বলল,
“ওই! স্বার্থ ভাই! বাচ্চাটাকে বাঁচাও,না হলে বাগানটাই ভেসে যাবে।”

আদি দুই চোখে পানি নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আমি আর পারছি না স্বার্থ ভাই,গাছের পেছনে যাচ্ছি।”

সে দৌড়ে গেলো গাছের পেছনে।
দুই মিনিট পর গাছের আড়াল থেকে গর্বিত কণ্ঠে ঘোষণা দিলো।
“হয়ে গেছে!”

স্বার্থ ওকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল।
ড্রয়িংরুমে তখন বাড়ির অনেকেই উপস্থিত হয়েছেন নুসরাতের জন্য।কায়নাতও সেখানে উপস্থিত।সে বারে বারে আড়চোখে প্রেমের দিকে তাকাচ্ছে।
প্রেম সোফায় গিয়ে বসল নুসরাতের পাশে।হঠাৎ চোখ গেলো কায়নাতের দিকে।কায়নাত লাজুক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।প্রেম জোরপূর্বক হেসে শুকনো ঢোক গিলে দৃষ্টি সরালো।মহা জ্বালায় ফেঁসে গেছে বেচারা।এমন করে তাকিয়ে থাকার মানে কী?সেই সকাল থেকে দেখছে কায়নাতের এই লাজুক চাহনি।

(পেইজের রিচ ডাউন।পেইজে গিয়ে রিভিউ দিও সবাই।১০k ফলোয়ার্স হয়ে গেছে পাপীর দল।সবাইকে এত গুলা ভালোবাসা😭🫶)

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply