Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫


প্রেমবসন্ত_২

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

১৫.

অর্ণর গাড়িতে বসে আছে কায়নাত’রা।নিশা খানিক্ষণ আগেই জানিয়েছে অর্ণর সাথেই তারা বের হবে।বেচারির মুখ চুপসে গেছে এহেন সংবাদ শুনে।কায়নাতের পাশে আদি পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসে বসে কায়নাতের দিকে বার বার আড়চোখে তাকাচ্ছে।মাঝে মধ্যে মুচকি মুচকি হাসাও হচ্ছে।কায়নাত বাচ্চাটার হাভ-ভাব ধরতে না পেরে কপাল কুঁচকে বলল,

“এমন করে তাকিয়ে আছো কেন তুমি?”

আদি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“তুমি অনেক সুন্দর।”

ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মেয়েটা।সে অবাক হয়ে বলল,
“মানে?”

আদি আড়চোখে সামনে অর্ণ আর স্বার্থকে দেখে নিচু গলায় বলল,
“তোমার মতো সুন্দরী একটা মেয়ে বন্ধু আছে আমার।”

কায়নাত চোখ কপালে উঠিয়ে বলল,
“তো?”

“ওকে আমি পছন্দ করি।”

বিস্ময়ে কায়নাতের চোয়াল ঝুলে এলো বোধহয়।দু’দিন আগে যার জন্ম হয়েছে সেই ছেলে কিনা মেয়ে পছন্দ করেছে ভাবা যায়?সামনে সবাই আদির কথা শুনেছে।সামনে থেকে স্বার্থ বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলল,
“এই নাহলে অর্ণর মিনি কপি?একদম খাপে খাপে মিলে গেছে।আদি,একটা পছন্দ করেছিস কেন?করলে দশটা একসাথে করবি।”

অর্ণ সামনে থেকে বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুই এক বাঁদর,এখন আদিকেও বানাচ্ছিস আরেক বাঁদর।”

আদি গাল ফুলিয়ে বলল,
“মামু,তুমি বেশি কথা বলো।প্রেম মামু বলেছে আমায় সামনে মাসে বিয়ে করিয়ে দিবে।”

“তুমি বিয়ের কী বুঝো?”

“তুমি কী বুঝো?”

“বউ দিয়ে কী করবে তুমি?”

“বউ দিয়ে তুমি কী করো?”

অর্ণ ফোঁস করে চাপা নিঃশ্বাস ফেলল।কার সাথে তর্ক করছে সে?একটা কথা বললে বাচ্চাটা আরও দশটা কথা শুনিয়ে দেয়।
নিশা আদির কান মুলে দিয়ে স্বার্থকে বলল,
“তোমরা তিন বন্ধু মিলে আমার ছেলেটাকে ফাজিল বানাচ্ছ,স্বার্থ ভাই।কী শেখাও এসব?”

স্বার্থ ঠোঁট কামড়ে ধরল নিশার কথা শুনে।হঠাৎ পিছু ঘুরে নিশার চোখে চোখ রেখে বলল,
“আদি তোর বাচ্চা?”

“বোনের ছেলে মানে তো আমারও ছেলে।সে কথা বাদ।তুমি এসব কী শেখাও ওকে?দিন দিন ভীষণ দুষ্টু হচ্ছে।”

স্বার্থ আদির দিকে তাকাল।ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“স্ট্রং বয়,তোকে আমরা কিছু শিখিয়েছি?”

আদি বলল,
“না।”

“তাহলে তোর খালামনি আমাকে দোষ দিচ্ছে কেন?”

“খালার তো মাথায় সমস্যা মামুর বউয়ের মতো।”

কায়নাত হতবুদ্ধি হয়ে তাকাল।এই বাচ্চা ছেলে তাকে অপমান করছে?কায়নাত চোখ ছোট ছোট করে মুখ ফিরিয়ে নিল।নিধি ওদের কাণ্ড দেখে খিলখিল করে হাসছে।সব গুলোই পাগল।অর্ণরা এসে থামল একটা বড় বাড়ির সামনে।ওরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল।কায়নাত সামনে তাকিয়ে দেখল ইয়া বড় একটা বাড়ি।চৌধুরী বাড়ির মতোই বিশাল বড়।বাড়ির সামনে দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছেন।অর্ণ সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।শেহের সদর দরজার সামনে ফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।অপেক্ষায় ছিল বন্ধুদের।অর্ণদের দেখেই এগিয়ে এলো সে।আদি ছুটে গিয়ে শেহেরের কোলে উঠে এলো।শেহের আদির চঞ্চলতা দেখে শান্ত হয়ে বলল,
“ভেতরে অনেক মানুষ আছে বুঝলি?বেশি ফটর-ফটর করবি না।”

আদি মাথা নাড়ল।শেহের ওদের নিয়ে ভেতরে ঢুকল।আজকে মূলত শেহেরের বাসায় দাওয়াত ছিল ওদের।শেহের তার কাছের বন্ধুদের দাওয়াত দিয়েছে আজ।ড্রয়িংরুমে মেহরাব,প্রেম,আদাল,নুসরাত ওরা সবাই বসেছিল।নুসরাতকে প্রেম নিয়ে এসেছে হসপিটাল থেকে।কায়নাত বাড়ির ভেতরে ঢুকে সবাইকে দেখে চমকালো একটু।মেয়েটা জানতই না তারা আজ শেহেরের বাড়িতে আসবে।শেহেরের মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ব্যস্ত হয়ে।অর্ণর পাশে ছোট-খাটো কালো বোরকা পরা একটা মেয়েকে দেখে তিনি মুচকি হেসে অর্ণকে বললেন,

“এটাই বউ?”

অর্ণ হালকা কেঁশে মাথা নাড়ল।মহিলা এগিয়ে এলেন নিকটে।কায়নাত সালাম করল।তিনি সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
“নতুন বউয়ের মুখ কী দেখতে পারব না?”

কায়নাত দ্বিধায় পড়ে নিকাপ খুলে ফেলল।মহিলা ঠোঁটে দারুণ হাসি টেনে “মাশাআল্লাহ” আওড়ালেন।
“অর্ণর বউ তো পুতুল একটা।কী মিষ্টি মুখ।নাম কী তোমার?”

কায়নাত নিচু স্বরে বলল,
“কায়নাত সুবাহ।”

“বাহ,বেশ সুন্দর নাম।এমন একটা পুতুল বউ শেহেরের জন্য খুঁজে বের করতে পারো না তোমরা?ছেলেটাকে বিয়ের জন্য রাজীই করাতে পারছি না।এদিকে যে আমাদের বয়স হচ্ছে এটা কে বোঝাবে তাকে?”

শেহের বিরক্ত হলো তখন।সব কথায় এই বিয়ে জিনিসটা না টানলেই নয়।সে ওদের তাড়া দিয়ে বসতে বলে মাকে রান্না-ঘরে পাঠাল।কায়নাত অর্ণর পাশে এসে বসেছে।শেহেরের ছোট বোন স্মৃতি এলো উপর থেকে নেমে।সে পড়তে বসেছিল সন্ধ্যায় এক্সাম থাকায়।বাড়িতে যে আজ এত মানুষ এসেছে এটা সে জানত না।নিচে নেমে সবাইকে দেখে অবাক হয়ে এগিয়ে এলো।স্মৃতিকে দেখে প্রেম বলল,

“কী খবর তোমার?আমরা সেই কখন এসেছি আর তুমি মাত্র নিচে নামছ?”

স্মৃতি অবাক হয়ে বলল,
“তোমরা যে আজ আসবে এটা তো আমি জানতামই না।আমার পরীক্ষা চলছে বলে পড়তে বসেছিলাম।”

“পরীক্ষা শুরু হয়েছে?”

“না,সামনে সপ্তা থেকে শুরু হবে।এত চাপ আর নিতে পারছি না।”

স্মৃতি চোখ ঘুরিয়ে স্বার্থর দিকে তাকাল।স্বার্থ নিশার পাশে বসে ফিসফিস করছে।মেয়েটা কপাল কুঁচকে দৃষ্টি সরিয়ে সবার সাথে টুকটাক কথা বলল।কায়নাতের সাথেও পরিচিত হলো।জানতে পারল অর্ণ বিয়ে করেছে।বাড়ির সবাই জানলেও সে জানে না।আশ্চর্য!স্মৃতি অনার্স তৃতীয় বর্ষের স্টুডেন্ট।পড়াশোনা নিয়ে বেশ সিরিয়াস।

রাতে খাবার দেয়া হলো সবাইকে।কায়নাত নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে।ইলিশ মাছ সে খুব কম খায় কাটার জন্য।একবার গলায় কাটা আঁটকে যা-তা অবস্থা হয়েছিল।অর্ণ বসেছে ঠিক তার পাশে।কায়নাতকে খেতে না দেখে কায়নাতের প্লেট থেকে মাছ উঠিয়ে সুন্দর করে বেছে ওর প্লেটে তুলে দিল।মেয়েটা বিস্মিত চোখে অর্ণর কাণ্ড দেখল।লোকটা তাকে মাছের কাটা বেছে দিয়েছে?অর্ণ?আসলেই অর্ণ?বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো তার।যে লোক বউ মানে না সেই লোক কিনা বউকে কাটা বেছে দিচ্ছে।কায়নাতের ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি।সে খাওয়া শুরু করল।খাবার শেষে শেহেরের বাবা-মা দু’জনেই তাদের সাথে বেশ অনেকক্ষণ কথা বললেন।তাদের বেশ রাত হলো শেহেরের বাড়ি থেকে বের হতে।শেহের তার ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললে প্রেম বলল সে তো গাড়ি এনেছেই।সবাই ভালো মতোই যেতে পারবে।বিচ্ছু আদি তখন সেহেরের কোলে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।সবাই গাড়িতে উঠে গেলে নুসরাত শেহেরের সামনে এগিয়ে এলো।

“আদিকে দাও।”

শেহেরর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।নুসরাতের মাঝে মধ্যে মনে হয় এই দৃষ্টি ঝলসে দেয়ার জন্যই।সে শুষ্ক গলা ভিজিয়ে ফের বলল,
“ওকে গাড়িতে উঠিয়ে দাও।কোলে নিলে ঘুম ভেঙে যাবে।”

শেহের মাথা নাড়িয়ে নিচু গলায় বলল,
“কাল একবার বিকেলে আমার অফিসের সামনে আসতে পারবে,রাত?”

“কেন?”

“একটু দরকার আছে।আদিকেও নিয়ে এসো।”

নুসরাত নীরবে সম্মতি দিল।শেহের সাবধানে আদিকে গাড়িতে তুলে দেয়ার পর নুসরাত গাড়িতে উঠে বসল।ওদের গাড়ির চাকা ছুটে গেছে সামনের রাস্তায়।শেহের দাঁড়িয়ে আছে নিজের স্থানে।একা,নিশ্চুপ হয়ে।আশেপাশে কেউ নেই,কোথাও কেউ নেই।বুকের এই মধ্যখানে হালকা ব্যথা হচ্ছে।কেন হচ্ছে?মনের মধ্যে হাজারটা কথা চেপে রেখেছে বলে?কবে প্রকাশ পাবে এসব?সেই দিন কী আদৌ আসবে?শেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলল।পকেট থেকে ফোন বের করে হোয়াটস অ্যাপে নুসরাতের ইনবক্সে গিয়ে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠাল।

“রাতপাখি,ঠিক বিকেল ৫টায় এসো।আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।”

কায়নাতকে মাশফিক চৌধুরী বই কিনে দিয়েছেন।মেয়েটার সামনেই পরীক্ষা।আদালের পরিচিত একজন স্যার আছেন।সে বলেছে সেই স্যারকে বলে দিবে কায়নাতের কথা।সমস্যা হলো তিনি বাড়ি এসে পড়ান না।মাশফিক চৌধুরী বারণ করেছিলেন এই কথা শুনে।তিনি এখনই কায়নাতকে বাইরে চলা-ফেরা করতে দিতে চাচ্ছেন না।মেয়েটা ঢাকায় কোনো কিছু চেনে না।যদি কিছু একটা হয়ে যায়?তাই তিনি বলেছেন টিচারের অভাব নেই।তিনি নিজেই খুঁজে দেখবেন।কায়নাতের এইচএসসি শেষ হলে তিনি ভেবেছেন নিশাদের ভার্সিটিতে ভর্তি করে দিবেন।তখন নিশাদের সাথে চলতে চলতে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

কায়নাত বইগুলোর গন্ধ শুঁকে মন ভরে হাসল।বই মানেই তার ভালোবাসা।মাশফিক চৌধুরী ব্যস্ত মানুষ,তবুও যখন-তখন কায়নাতের ছোট ছোট প্রয়োজনগুলো মনে রাখেন এটা কায়নাতকে ভারী লজ্জায় ফেলে।নিজের বাবাও এভাবে কখনো কিছু কিনে দেননি তাকে।

নিশা পাশ থেকে বলল,
“কাল থেকে পড়া শুরু করে দাও,কায়নাত।স্যার ঠিক হয়ে গেলেই তো আর চাপ থাকবে না।”

কায়নাত মাথা নাড়ল।নিধি তখন হতাশ হয়ে বিছানায় ঠাস করে শুয়ে পড়ল।বলল,
“পড়াশোনা আর ভালো লাগছে না।কবে যে একটা বিয়ে করব।”

নিশা বলল,
“কাব্য ভাইকে বিয়ে করবি?”

“সে কী রাজী হবে?ভার্সিটি গেলে তার গম্ভীর মুখটাই শুধু দেখতে পাই।”

কায়নাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কাব্য আবার কে?”

নিশা বলল,
“আমাদের ভার্সিটির সিনিয়র ভাই।নিধি উনাকে পছন্দ করে।বলতে পারো দিন-রাত নিজের জামাই বানানোর স্বপ্ন দেখে।”

কায়নাত বলল,
“প্রেমের বিয়ে করতে চাইছ?তোমার ভাই,দাদা,মা উনারা কী মানবেন?”

“কেন মানবে না?নিধি তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।যদি কাব্য ভাই বিয়ে করতে রাজী থাকেন তাহলে ফ্যামিলির কাছে এসে হাত চাইবেন।”

“আর যদি না চায়?”

“শোনো কায়নাত,ভালোবাসা কখনোই ধরে-বেঁধে হয় না বুঝলে?কখনো কখনো অপেক্ষা করতে হয়।”

“তাও যদি রাজী না হয়?”

“না হলেই বা কী?আর হলেই বা কী?নাজনীন ভাইকেই দেখো,উনার সাথে একটা মেয়ের বিয়ে ঠিক হলো,সব কিছুই ঠিক ছিল কিন্তু লাস্টে কী হলো?ওই মেয়ের সাথে বিয়ে না হয়ে জয়ার সাথে বিয়ে হলো।আল্লাহ চাইলে সব কিছুই সম্ভব,বুঝলে?”

নিধি সোজা হয়ে বসল বিছানায়।শান্ত স্বরে বলল,
“আমার তাকে পছন্দ কিন্তু তিনি আমার ভালোবাসা নয়।নিশা বেশি বেশি কথা বলে।একজনকে পছন্দ হতেই পারে,ভালো লাগাতেই পারে কিন্তু তাই বলে যে তার সাথে আমার সারাজীবন কাটাতে হবে সেটা নয়।সংসার করতে হলে দু’জনের সম্মতির দরকার হয়,বুঝলে বোকা মেয়ে?”

কায়নাত খানিক্ষণ ঠোঁট চেপে বলল,
“কিন্তু তোমাদের ভাইয়ের তো সম্মতি নেই আমাদের সংসারে।”

নিশা খিলখিল করে হেসে উঠল।কায়নাত আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আমি আমার দুঃখের কথা বলছি আর তুমি হাসছ?”

“হাসব নাতো কী করব?শোনো,ভাইয়া যদি তোমায় কবুলই না করত তাহলে কী তুমি এখন চৌধুরী বাড়ি থাকতে?সবার কাছে অর্ণ চৌধুরীর বউ হিসেবে পরিচিতি পেতে?কখনোই পেতে না।ভাইয়া কিছুটা চাপা স্বভাবের।নিজের মনের কথা কখনো কাউকে বলে না।তোমাদের ব্যপারে আমার কথা বলা উচিত নয়,তবু কিছু কথা বলি কেমন?আমি যতটুকু জানি তোমাদের বিয়ে হয়েছিল অনেক বছর আগে।তুমি তখন খুব ছোট।সবার ভাষ্যমতে তোমাদের এই লম্বা গ্যাপটায় একবারের জন্যও দেখা হয়নি।যাকে তুমি চেনো না,জানো না,কখনো দেখনি তার প্রতি মায়া কিংবা ভালোবাসা কি করে জন্মাবে বলো?মুখে “মেনে নিয়েছি কিংবা ভালোবাসি” বললেই কিন্তু সেটা সত্যি হয়ে যায় না।”

কায়নাত নিস্তব্ধ হয়ে নিশার কথাগুলো শুনল। ভেতরে ভেতরে মনে হলো, হ্যাঁ, সবটাই ঠিক বলেছে নিশা। মুখে বলা আর মন থেকে অনুভব করা আলাদা। সে একবার নিঃশ্বাস টেনে বলল,

“তাহলে সময় দিয়ে বুঝতে হবে?”

নিশা মাথা হেলিয়ে হেসে বলল,
“ঠিক ধরেছ। সময়ই দেবে বোঝার সুযোগ। তুমি তখনই সত্যিকারের অনুভব করবে,যখন নিজের চোখে,নিজের অনুভূতিতে সব কিছু দেখবে। আর তখন শুধুই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই মন খুশি করবে।”

নিধি পাশে বসে ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল,
“আর মনে রাখো,ভালোবাসা কখনো জোর করে আসেনা। কেউ যদি ভালোবাসার জন্য চাপ দেয়, সেটা প্রকৃত ভালোবাসা নয়।ভালোবাসা আসে স্বাভাবিকভাবে,ছোট ছোট কাজ,দৃষ্টি,যত্ন,ভালোবাসার নরম অনুভূতি দিয়ে।”

কায়নাত চোখ উঁচিয়ে বলল,
“ছোট ছোট কাজ?”

নিশা আঙুল উঁচু করে বলল,
“হ্যাঁ! যেমন অর্ণ ভাইয়াকে দেখেছ,কীভাবে তোমার জন্য মাছের কাটা বেছে দিচ্ছিল?বড় বড় কথা নয়, ছোট ছোট যত্নের মধ্যে তার ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।বুঝলে?”

কায়নাত চুপ করে ভাবল কিছুক্ষণ।অর্ণ কি তার যত্ন নিচ্ছিল তখন?অদ্ভুত অনুভূতি হলো মেয়েটার।লজ্জাও পেল একটুখানি।ওদের সাথে কথা শেষ করে ছুটল নিজের ঘরে।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজেকে দেখল মন ভরে।ভালো লাগছে?এই বাড়ি আসার পর থেকে খুব বেশি একটা শাড়ি পরা হয়নি।বেহরুজ বেগম বলেছেন বাড়িতে চাইলে সে শাড়ি পরতে পারে তবু তিনি এত এত জামা-কাপড় কিনে দিয়েছেন তাকে।সে আজ কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে।সুন্দর করে মাথায় ওড়না দেয়া।সে ভাবল অর্ণর সাথে গিয়ে একবার দেখা করে আসবে।কাল যে সেই রাতে শেহেদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে দেখা হয়েছিল,এখন অব্দি লোকটার খবর নেই।তখন আকাশে নাম না জানা পাখি গুলো উড়ে বেড়াচ্ছে।কায়নাত গুটি গুটি পায়ে তিন তলায় উঠে এলো।অর্ণর দরজার সামনে এসে বেশ কয়েকবার নক করল।যখন দেখল কোনো স্বারা শব্দ নেই তখন অনুমতি না নিয়েই ঘরে ঢুকে পড়ল।অর্ণ নেই।পুরো ঘরের কোথাও নেই।অবাক হলো সে।অর্ণ গেছে কোথায়?

মেয়েটা জানেই না তার স্বামী এখন অফিসের কাজে ব্যস্ত।লোকটা যে বাড়িতেই নেই সে খবর সে জানে না।কায়নাত অর্ণর পুরো ঘরটা পর্যবেক্ষণ করল কিছুক্ষণ।বিশাল বড় ঘর।সে বারান্দায় এগিয়ে দাঁড়াল,চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতার এক মিশ্রণ।এই ঘর-বারান্দার বিশালতা আর ঝকঝকে পরিচ্ছন্নতা তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে নিয়ে এসেছে।এখানে বাতাসে মিষ্টি কোনো সুগন্ধ ভেসে আসছে,নিচে সবুজ বাগান আর ছাদে ছোট ছোট ঝর্নাগুলোর কানে পড়া জল ঝরঝর শব্দ কায়নাতকে মুগ্ধ করছে।বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সে বাইরে তাকাল।দেখল,নিচে বাগান আর লাল গোলাপের গাছের সারি যেন তার চোখে চমৎকার এক ছবি এঁকেছে।গাছপালা,সবুজ ঘাস,দূরের পাখির কলরব সব মিলিয়ে যেন প্রাকৃতিক এক সুরেলা পরিবেশ। কায়নাতের মন অবাক হয়ে ভরা আনন্দে নাচতে লাগল।
হঠাৎ সে বারান্দার এক কোণে থাকা ছোট টেবিল আর চেয়ারগুলো লক্ষ্য করল। মনে হলো, বিকেলে হয়তো এখানে বসে চা পান করতে হবে বা বই পড়তে হবে। তার মন কেমন জানি শান্ত হয়ে এলো। ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই সে অনুভব করল, অর্ণর যত্ন এবং এই ঘরের প্রতিটি কোণেও তার অনুপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও যেন তার স্পর্শ লুকিয়ে আছে।আচ্ছা এমন কী কোনোদিন আসবে,যেদিন অর্ণর পাশে এই বারান্দায় বসেই তারা দু’জন মন খুলে গল্প করবে?কিংবা দু’জনে দুই কাপ চা নিয়ে সারারাত আড্ডা দিবে?

কায়নাত বারান্দার পাশ দিয়ে এগিয়ে ঘরের মধ্যে ফিরে এলো। প্রতিটি আসবাবপত্র, ছবি আর আলমারিতে রাখা জিনিসগুলো খুবই পরিপাটি।মেয়েটা অর্ণর আলমারি খুলেও দেখেছে।সে বুঝতে পারল,অর্ণ কত যত্নসহকারে সব কিছু সাজিয়েছেন। তার চোখে একটু লজ্জা আর মধুর হাসি মিলেমিশে গিয়েছে।
মেয়েটি নিজেকে কিছুক্ষণ স্থির করে বারান্দায় ফিরে গিয়ে ঘরের ভেতরে তাকাল।মনে হলো,এখানে সময় কাটানো,অর্ণর স্পর্শ না থাকলেও তার ভালোবাসা এই ঘরের প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে।মেয়েটা হেসে ফেলল।ঠোঁট কামড়ে অর্ণর পুরো ঘরটা দেখে ভাবল একটা সময় সেও এই ঘরে থাকবে।অর্ণর সাথে।তার নিজের স্বামীর সাথে।

দরজা খোলার শব্দে হালকা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল সেদিকে।অর্ণ এসেছে।চমকে উঠল মেয়েটা।অর্ণ ঘরে ঢুকে কায়নাতকে বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখে বিছানার নিকট এগিয়ে এসে গায়ের কোট,হাতের ঘড়ি খুলতে শুরু করল।কায়নাত হতভম্ব হয়ে ঠাঁই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।অর্ণ তাকে কিছু বলল না কেন?লোকটাকে আজ অন্যরকম লাগছে।কায়নাত বুঝল,অর্ণ অফিসে গিয়েছিল।সে গুটি গুটি পায়ে সামনে এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে বলল,

“শুনছেন?”

অর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“শুনছি তো!”

“আপনি বুঝি অফিসে গিয়েছিলেন?”

“হুম।”

“আপনি চাকরি করেন?”

“না।”

“তাহলে?”

“ব্যবসা আছে।”

“ওবাবাহ,আপনি ব্যবসা করেন?তাহলে তো আপনার অনেক টাকা তাই না?”

“আছে কিছু।”

“আমাকে কিছু টাকা দিবেন?”

অর্ণ নিজের কাজে ব্যস্ত থেকেই কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলল,তবু পিছু ফিরে তাকাল না।বলল,
“টাকা দিয়ে কী করবেন,ম্যাডাম?”

“তা তো জানি না।যাকগে,আপনার অফিস কোথায়?”

“গুলশান-২।”

“এটা আবার কোথায়?আমায় আপনি একদিন নিয়ে যাবেন?ধরুন আমি পড়াশোনা করে আপনার অফিসে যদি চাকরি নিতে চাই,তাহলে কী আপনি আমাকে চাকরি দিবেন?”

কায়নাতের বকবক শুনে অর্ণ পিছু ফিরে দাঁড়াল।সে পিছু ফিরতেই কায়নাত ঘাড় উঁচু করে তার দিকে তাকাল।অর্ণ লম্বা একটা শ্বাস টেনে বলল,
“আপনি কী চুপ থাকতে পারেন না?আমি মাত্র অফিস থেকে ফিরেছি আর আসতেই আপনার পকপক শুরু হয়ে গেছে।আমার ঘরে কী করছেন আপনি?বের হন এখনই।”

(এতদিন নাজনীন এবং জয়ার কাহিনি ছিল একটু বেশি।তার মানে এই নয় তাদের সব পর্বে রাখব।যাইহোক,আপনারা যারা আগের সিজনের সাথে এই সিজনের মিল খুঁজে পেয়েছেন তাদের কাছে অনুরোধ করব গল্পটা স্কিপ করুন।আমি নিজে লিখেই যেখানে কোনো মিল পাচ্ছি না সেখানে আপনাদের মিল কিভাবে লাগছে আমি জানি না।যা যা আমি মিল রাখব সেগুলো গল্প শুরু করার আগেই বলে দিয়েছি।এর পরেও যদি আপনাদের সমস্যা হয় তাহলে এই সিজন না পড়ার অনুরোধ রইল।)

চলবে..?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply