প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
১৩.
শীতের কনকনে ঠাণ্ডায় নাজেহাল অবস্থা আদির।বাচ্চাটার জ্বর-ঠান্ডা একসাথে লেগেছে।শেহের সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল বাচ্চাটা ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছে তার বুকের কাছে গুটিয়ে এসে।শেহের মোটা সোয়েটার পরিয়ে দিলো তাকে।মাথার চুল হাত দিয়ে ঠিক করে বুকে জড়িয়ে ধরল।খানিকক্ষণ বসে থেকে সময় নষ্ট না করে বাচ্চাটাকে ফ্রেশ করিয়ে নিজেও ফ্রেশ হয়ে নিল।ততক্ষণে বাড়ির প্রত্যেকে নিচে নাস্তা করার জন্য হাজির হয়েছেন।শেহের আদিকে কোলে নিয়ে নিচে নামল।নুসরাত মায়ের সাথে কাজ করছিল ডাইনিং টেবিলে।শেহেরের কোলে আদিকে অমন করে শুয়ে থাকতে দেখে সে ভ্রু-কুঁচকে ফেলল।ডাইনিং টেবিলে তখন সবাই বসেছে খেতে।শেহের আদিকে নিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে তাকে নিজেরের ঊরুর উপর বসাল।নুসরাত নিকটে এগিয়ে এসে ছেলের কপালে হাত রেখে ঠোঁট কামড়ে ধরল চিন্তায়।
“আদির তো জ্বর কমছে না।কী করব?হসপিটালে নিয়ে যাব?”
মাশফিক চৌধুরী চিন্তিত হয়ে বললেন,
“নানু ভাই,আমার কাছে আসো তো?”
আদি ঠোঁট উল্টে শেহেরের কাঁধে মাথা রেখে মিনমিন করে বলল,
“যাব না।শরীর এত ব্যথা!”
কায়নাত হঠাৎ দৃষ্টি উঁচিয়ে বলল,
“এখন ঔষধ দেয়ার পর বাইরে রোদ উঠলে ওকে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে একটু ঘুম পাড়িয়ে দাও আপু।ইনশাআল্লাহ জ্বর কমে যাবে।”
প্রেম মাথা নাড়ল।সকালে খাওয়া দাওয়া শেষে আদিকে ঔষধ খাইয়ে দেয়া হলো।শেহেররা তৈরি হয়েছে নিজেদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য।নিশা নিধিকে নিয়ে বাইরে গেছে দরকারে,সেখান থেকে যাবে ভার্সিটি।প্রেম গেছে হসপিটালে।সকাল ১১টার দিকে অর্ণ তার বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।বাড়ির বড় বাগানে হালকা রোদে আদাল আর আয়মান বসে ছিল কফি হাতে নিয়ে।কায়নাত পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করতে করতে সদর দরজা দিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো।বাগানে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।কী ফুল নেই এখানে?এত ধরনের ফুল গাছ সে কখনোই দেখেনি।সামনে থেকে আদাল,আয়মান কায়নাতের মুগ্ধ নয়ন দেখে ঠোঁট টিপে হাসল।আদাল গলা উঁচু করে বলল,
“ভাবি,এদিকে আসেন!”
কায়নাত দেবরের ডাকে হকচকিয়ে গেল।মাথার কাপড় টেনে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো।আদাল উঠে এসে বেতের চেয়ার ঠিক করে দিয়ে বলল,
“বসুন না?”
কায়নাত বসল।আদাল বলল,
“আমাদের বাড়ি আপনার পছন্দ হয়েছে ভাবি?”
কায়নাত মুচকি হেসে বলল,
“আপনাদের বাড়িটা ভীষণ সুন্দর।বিশেষ করে এই বাগানটা।”
আদাল খুশি হয়ে বলল,
“আপনার ফুল পছন্দ?”
“খুব।”
“আমার ভার্সিটির পাশেই একটা নার্সারি আছে।সেখানে কিছু নতুন গাছ এসেছে।”
“তাহলে আনছেন না কেন?”
“বড় ভাইয়া বকবে।বাগানে জায়গা নেই।পুরো বাড়ি ভর্তি গাছ দিয়ে ভরে ফেলেছি।”
কায়নাত কপাল কুঁচকে খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“তাহলে আমি আমার ঘরের বারান্দায় রাখব।সেখানে অনেক জায়গা আছে।”
আদাল মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।তিন দেবর ভাবি মিলে বেহরুজ বেগমের থেকে অনুমতি নিয়ে বের হলো বাড়ি থেকে।আয়মান চুপচাপ বসে আছে পেছনে।গাড়ির সামনে কায়নাত আর আদাল বসেছে।গাড়িতে ওঠার পর থেকেই কায়নাত আর আদালের বকবক শুরু হয়েছে।বাড়ির রাস্তা পেরিয়ে মেইন রোডে গাড়ি ঘুরতেই আদাল লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“একটা কথা বলি ভাবি?”
কায়নাত মাথা নাড়লে সে বলে,
“কাউকে বলবেন নাতো?”
“না।”
“আয়মান খুব ভালো গান গায় আপনি জানেন?”
কায়নাত আশ্চর্য হয়ে বলল,
“জানি না।”
“আজকে রাতে ওর একটা কনসার্ট আছে।সেখানে যেতে চাইছে।”
“ভালো তো,যাক না?বারণ করেছে কেউ?”
“আব্বু-আম্মু এসব পছন্দ করে না।”
“তাহলে উপায়?”
“আপনি।”
“আমি?”
পেছন থেকে আয়মান উৎফুল্ল হয়ে উঠে বসল।হালকা গলা কেঁশে বলল,
“আপনি’ই একমাত্র বাবা-মাকে রাজী করাতে পারবেন ভাবি।”
“আমি কিভাবে করব?”
“আম্মু আপনার কথা ফেলতে পারবে না আমি শিওর।আপনি প্লিজ আম্মুকে একটু বলবেন?”
কায়নাত ঠোঁট কামড়ে বুকে হাত গুঁজে গাম্ভীর্য ধারণ করল।আয়মান ভাবল কায়নাত রাজী হবে না,কিন্তু সে খানিকক্ষণ পেরোনোর পর বলল,
“রাজী করাতে পারি,কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
আদাল বলল,
“কী শর্ত ভাবি?”
কায়নাত দুই দেবরের সাথে কিছুক্ষণ ফুঁসুরফুঁসুর করল।এদের দেখে কে বলবে এরা দেবর ভাবি?দেখে মনে হচ্ছে যুগ-যুগ আগের থেকে এদের পরিচয়।
নার্সারির সামনে গাড়ি থামতেই কায়নাতের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।দূর থেকে যতটা সাধারণ মনে হচ্ছিল,ভেতরে ঢুকতেই যেন স্বপ্নের বাগান! রঙে রঙে ভরা,সুগন্ধে মাতাল করা এক জগৎ।
আদাল দ্রুত দরজা খুলে কায়নাতকে নামতে সাহায্য করল।আয়মান পেছনেই নেমে মুচকি হেসে বলল,
“ভাবি,এখানে ঢুকলে মানুষ হারিয়ে যায়।সতর্ক থাকবেন।”
কায়নাত হেসে দিল,
“হারিয়ে গেলে তো আপনারাই খুঁজে আনবেন।”
নার্সারির ভেতরে ঢোকামাত্রই ফুলের দোকানদার ছুটে এলো।
“ওহো! আদাল সাহেব! আজ এত সকাল সকাল?”
আদাল হেসে বলল,
“ভাবির জন্য গাছ কিনতে এসেছি আজ।”
“আরে বাহ! ভাবিকে সালাম জানাই। কোন ফুল পছন্দ ভাবির?”
কায়নাত ধীরে ধীরে এগিয়ে একটা সাদা গোলাপের চারার কাছে দাঁড়াল।পাপড়ির রঙ যেন দুধের মতো,ছুঁলে ভেঙে যাবে এমন নরম।
“এটা খুব সুন্দর।” কায়নাত ফিসফিস করল।
আদাল সঙ্গে সঙ্গে দোকানদারকে বলল,
“এইটা নিন।আর ওই লাল অর্কিডটা নিন।ওই মানিপ্ল্যান্টও দিন।আর..”
আয়মান হাঁ করে তাকিয়ে বলল,
“আরে দাঁড়াও! এত গাছ নেবে নাকি?”
আদাল হেসে বলল,
“ভাবি বলেছেন উনার বারান্দায় জায়গা আছে। তাই পুরো বারান্দা ভর্তি করে দেব।”
কায়নাত লজ্জা পেয়ে বলল,
“এত গাছ কেন?এক-দু’টো নিলেই হতো।”
আদাল গম্ভীর মুখে বলল,
“তাহলে শর্তটা পূরণ হবে কীভাবে?”
আয়মান তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকাল,
“হ্যাঁ ভাবি! শর্ত দিয়েছেন আপনি।এখন তো দেবরেরা মানবে।”
কায়নাত বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা,নিন।তবে বেশি নয়,ঠিক আছে?”
কিন্তু আদাল ততক্ষণে দোকানদারকে লিস্ট ধরিয়ে দিচ্ছে।দোকানদার হাত ঘষে বলল,
“বিশটা গাছ প্যাক করে দিচ্ছি!”
কায়নাত চোখ কপালে তুলে বলল,
“বিশটা?”
আদাল ভ্রু নাচিয়ে দুষ্টুমি করে বলল,
“ভাবি,আপনি তো শর্ত দুইটা দিলেন।একটা হচ্ছে আপনি আম্মুকে রাজী করাবেন,আর আমরা আপনাকে অনেক গাছ দেব।আমি তো শর্তটা সিরিয়াসলি নিয়েছি।”
আয়মান হাসতে হাসতে বলল,
“আর আমি সিরিয়াসলি আশা করছি আজ রাতে কনসার্টে যেতে পারব।”
কায়নাত মাথা নাড়ল।
“দুটোই হবে,কিন্তু গাছ দশটার বেশি নয়!”
আদাল মুচকি হেসে বলল,
“কথা পাকা?”
“কথা পাকা।”
এরপর তারা তিনজন নার্সারির ঝলমলে সব গাছ ঘুরে ঘুরে বাছাই করতে লাগল।কায়নাত কখনো সাদা গোলাপ,কখনো সুগন্ধী রজনীগন্ধার কাছে থামছিল।আদাল প্রতিটা পছন্দের গাছ ঝটপট প্যাক করাচ্ছে।
আয়মান মাঝে মাঝে কায়নাতের কানে কানে বলছে,
“ভাবি,গান শুনলে অবাক হবেন।একবারই শুধু সাহায্য করুন।”
কায়নাত হেসে বলল,
“চিন্তা করবেন না।রাজী করিয়ে দেব।”
নার্সারির লোকেরা শেষে ২৫টা গাছ নিয়ে গাড়িতে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো।গাড়ি ভর্তি ফুলের ঘ্রাণে বাতাস অন্যরকম হয়ে উঠল।কায়নাত ১০টা গাছের কথা বললেও দুই ভাই তার কথা শুনল না।
গাড়িতে ওঠার সময় আদাল বলল,
“ভাবি,শর্তের অর্ধেক পূরণ হয়েছে।এখন আপনার পালা।”
ওরা বাড়ি যাওয়ার আগে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল।আদাল হালকা খাবার অর্ডার দেয়ার পর কায়নাত বলল,
“নিশা আপুরা থাকলে কত ভালো হতো না?”
আদাল বলল,
“নিশা আর নিধিকে তো আপনি পাবেনই না ভাবি।ওই দুই চুন্নিকে বাড়িতে পাওয়া যায় না।”
“ওমাহ!কেন?”
“সে অনেক কাহিনী।যাক বাদ দেই।এবার একটা কাজ করতে হবে।”
“কী?”
“আমি বড় ভাইয়াকে এখানে আসতে বলেছি।”
কায়নাত চোখ বড় বড় করে বলল,
“কেন?উনি আবার এখানে কেন আসবে?”
“আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন?”
কায়নাত শুকনো ঢোক গিলল।অর্ণর ধমক খেতে খেতে নাড়ি-ভুড়ি গুলিয়ে গেছে তার।লোকটা এত গম্ভীর,মাঝে মধ্যে মনে হয় তুলে এক আছাড় মারতে।সে কী করে ওই দাঁমড়া লোককে উঁচু করবে?সে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।মিনিট দশেক পর রেস্টুরেন্টের দরজা ঠেলে প্রবেশ করল অর্ণ এবং স্বার্থ।আদাল সেদিকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকিয়ে নাক ছিঁটকে বলল,
“স্বার্থ ভাইও এসেছে।উফ!”
ওরা ওদের নিকটে এগিয়ে আসতে আসতে স্বার্থ দাঁত চেপে বলল,
“আমাকে দেখলেই তোর মুখ বিলাইয়ের পুক্কির মতো হয়ে যায় কেন?জুতা চিনিস?সোজা গিয়ে তোর নরম গালে পড়বে।”
আদাল মুখ কালো করে একটু চেপে বসল।অর্ণ টেবিলের সামনে প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে বুক টানটান করে কপাল কুঁচকে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে আছে।কায়নাত শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে হালকা কেঁশে উঠল।স্বার্থ কায়নাতকে এতক্ষণ খেয়াল না করলেও যখন নজরে এলো তখন হায়হায় করে বলল,
“ভাবি?আয়হায়,অর্ণর বউ দেখি অর্ণর জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল।”
কায়নাত বলল,
“আমি কারোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম না।আমি তো উনার ভাইয়েদের সাথে বের হয়েছিলাম।”
অর্ণ গাম্ভীর্য বজায় রেখে কায়নাতের পাশে এসে বসল।কায়নাত গুটিয়ে আর একটু চেপে গেল পাশে।অর্ণ ধমক দিয়ে বলল,
“ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের মতো এমন সেজে গুজে বাইরে বের হয়েছ কেন?ইডিয়ট!”
কায়নাত চোখ তুলে তাকাল।অর্ণ আজ প্রথম তাকে “তুমি” সম্বোধন করেছে।কী অদ্ভুত লাগল তার কাছে ডাকটা।মেয়েটা লজ্জা পেল একটু।লজ্জায় গালও লাল হয়ে এলো।অর্ণ আশ্চর্য হয়ে বলল,
“লজ্জার কিছু বলেছি আমি?”
কায়নাত বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি কী চুপ থাকতে পারেন না?একটা মানুষ কিভাবে সারাদিন ধমকের উপরে রাখতে পারে বলুন তো?”
“শাট আপ।কাকে বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছ তুমি?”
“আম্মুকে বলে।”
আদাল সামনে থেকে বলল,
“আমি নিয়ে এসেছি ভাইয়া।ভাবিকে নিয়ে ফুলের গাছ কিনতে গিয়েছিলাম।”
অর্ণ আদালের দিকে চোখ ঘোরালো।আদাল ভাইয়ের দৃষ্টি দেখে খুঁকখুঁক করে কেঁশে উঠল।স্বার্থ পাশ থেকে বলল,
“বন্ধু তো বউরে সময়’ই দেয় না।তাও ভালো তোরা বাকি দুই ভাই মানুষ হয়েছিস।”
আড়াল বলল,
“বাকি দুই ভাই কী দোষ করল?”
“একটা তোর বড় ভাই,অর্থাৎ অর্ণ।সে তো মানুষের কাতারেই পড়ে না।অন্যজন হচ্ছে ডাক্তার সাহেব,তিনি আমার সুখ সহ্য করতে পারেন না।যখন তখন হামলে পড়ে।”
আদাল আর স্বার্থর ঝগড়া চলতেই থাকল।এরা এক জায়গায় হলে জীবনেও স্থির হয়ে থাকতে পারে না।বিশেষ করে স্বার্থ অর্ণর তিনটা ভাইকেই ভীষণ জ্বালায়।ওদের ঝগড়ার মাঝে খাবার চলে এলো,তবু তাদের ঝগড়া থামল না।আয়মান বিরক্ত হয়ে খাওয়া শুরু করল।
পাশেই কায়নাত দুই দেবরের ঝগড়া দেখে হতভম্ব।দুইজনই সমান।কেউ কারোর থেকে কম নয়।মেয়েটা চোখ ফিরিয়ে মাথা উঁচিয়ে পাশে তাকাল।অর্ণ চোখ পাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে।কায়নাত হকচকিয়ে দৃষ্টি নত করল।আশ্চর্য!লোকটা রেগে আছে কেন?
ওরা রেস্টুরেস্ট থেকে বের হলো বেশ কিছুক্ষণ পর।অর্ণ স্বার্থর সাথে স্বার্থর বাইক দিয়ে এসেছিল।স্বার্থ কিছু দরকারের কথা বলে সেখান থেকে চলে গেল।অর্ণ আদালের গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ভেতরে বসে পড়ল।ওরা বাকি তিনজন গাড়ির কাছে আসতেই আদাল কায়নাতকে ফিসফিস করে বলল,
“ভাবি,আপনি পেছনে বসুন।”
কায়নাত মাথা নাড়িয়ে পেছনে অর্ণর পাশে বসল।গম্ভীর লোকটা চোখ বন্ধ করে সিটে হ্যালান দিয়ে বসে আছে।কায়নাত আড়চোখে তার গম্ভীর মুখ দেখে মুখ বাঁকাল।লোকটা তার সাথে একটুও ভালো করে কথা বলে না।গাড়ি রওনা হতেই ভেতরের বাতাসটা যেন থমথমে হয়ে গেল।আদাল আর আয়মান সামনের সিটে নিজেদের মতো গল্প করছে, কিন্তু পেছনের সিটে কায়নাত আর অর্ণের মাঝে যেন অদৃশ্য দেয়াল টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কায়নাত জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে—রোদ ফিকে, রাস্তার ধুলো উড়ছে, মাঝে মাঝে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে গায়ে লাগছে।আর পাশেই অর্ণ চোখ বন্ধ করে এমনভাবে বসে আছে যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে নাড়াতে পারবে না।
হঠাৎ অর্ণ নিচু গলায় বলল,
“ বাইরে বেরোনোর খুব দরকার ছিল?”
কায়নাত চমকে তাকাল।
“আমি তো কিছু বলিনি।এরা নিজেরাই আমাকে নিয়ে গেছে।”
“আর তুমি না করতে পারোনি?”
কায়নাত ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত স্বরে বলল,
“আমার দেবরদের সাথে আমি বের হয়েছি তাতে সমস্যা কোথায়?আপনি তো আমার জামাই হয়েও কোথাও নিয়ে যান না।বলি পকেটে কী টাকা পয়সার এতই টান পড়েছে যে বউকে নিয়ে একটু বাইরে বের হওয়া যায় না?”
অর্ণ চোখ খুলে দাঁত কটমট করে তাকাল।কায়নাত তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি রাখল।লোকটাকে বেশি রাগালে তুলে আছাড়ও মারতে পারে।এত বড় বড় দেবরদের সামনে মার খেতে তার শরম লাগবে ভীষণ।তার চেয়ে বরং চুপ থাকাই শ্রেয়।
•
খুলনায় চৌধুরী বাড়ি দুপুরের খাবার শেষ হয়েছে একটু আগে।সকালে জয়া নাজনীনের হাতে কয়েক’ঘা থাপ্পড়ও খেয়েছে তার সাথে বেয়াদবি করার জন্য।বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে লোকটা তাকে যখন তখন অপমান করে।মেয়েটা মুখ কালো করে শাশুড়ি আর দাদির পাশে বসে আছে।রেখা বেগম মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“রাগ করিস না।তুই তো জানিস নাজনীন কেমন।তাহলে কেমন যাস ওকে জ্বালাতে?”
জয়া অবাক হয়ে বলল,
“তোমার ছেলেকে আমি জ্বালাই?এত বড় মিথ্যে কথা তুমি আমায় বলতে পারলে বড় আম্মা?”
“তা নয়তো কী?তুই ওকে না বিরক্ত করলে ও ওকে শুধু শুধু মারে?”
“শুধু শুধুই মারে।তুমি জানো,আজ ওই লোক কী করেছে?”
“কী করেছে?”
“আমি কলেজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে যখন বের হলাম তখন উনি মোড়ের সামনে ট্রাকে ফলের কার্টন হিসেব করছিলেন।আমার সাথে লিমা চাচির ছেলে ছিল।ওই মোড় ভর্তি মানুষের সামনে উনি ওই ছেলেকে লাঠি নিয়ে দৌঁড়ানি দিয়েছেন।তুমি’ই বলো,উনি এমন করলে আমি কলেজে যাব কী করে?আমি কী এখন কারোর সাথে মিশতেও পারব না?”
রেখা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন।
“দেখ জয়া,নাজনীন একটু রাগী স্বভাবের,সবাই জানে।ওর সামনে বেশি বাড়াবাড়ি কিংবা বাড়তি কথা বলিস না।”
জয়া রাগে গলা শক্ত করে বলল,
“আমি বাড়তি কথা বলেছি? আমি শুধু বলেছি উনি আমার সামনে এমন করবেন না! কলেজে যেতে হবে।তাই বলে লাঠি নিয়ে মানুষ মারতে হবে? আমার সহপাঠীর সামনে আমাকে অপমান করার কি দরকার?”
দাদির পাশ থেকে মাহি চাপা গলায় বলল,
“ছেলে মানুষের সাথে তুই চলিস কেন?সেটা দেখেই হয়তো ভাই রাগ ক…”
“চুপ!” জয়া কড়া চোখে তাকাল।মাহির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“আমার কাছে কারো চরিত্রের সার্টিফিকেট দেওয়ার দরকার নেই।আমি পরিষ্কার জানি আমি কী করি, কী করি না।”
রেখা বেগম অসহায় মুখে বললেন,
“তুই একটু ধৈর্য ধর মা।নাজনীন একটু সহ্যশক্তি কম।ব্যবসার চাপ,বাড়ির চাপ—”
জয়া তক্ষুনি বাঁধা দিলো,
“ব্যবসার চাপ মানে কি আমাকে গালি দেয়ার লাইসেন্স? মানুষকে পেটানোর লাইসেন্স? বড় আম্মা,তোমার ছোট ছেলে মানুষ হলে কথা ছিল।ও তো বন্য জন্তু’র মতো আচরণ করে!”
এই কথা শুনে দাদি একটু রেগেই গেলেন।বললেন,
“ওরে বেটি,কী কস তুই? স্বামীর নামে এমন কথা মুখে আনিস না। মান-সম্মান বলে একটা কথা আছে।”
রেখা বেগম পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করার জন্য জয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে ফের বললেন,
“থাক,হয়েছে এবার থাম।নাজনীন এলে আমি ওকে বলে দিব।”
“তুমি কিছু বললে সেই মার তো আমাকেই খেতে হবে।ফাজিল লোক একটা।”
ঠিক তখনই নাজনীনের গলা ভেসে এলো।ফা’টা বাঁশের মতো চিৎকার করে জয়াকে ডাকছে।মেয়েটা ভয়ে লাফিয়ে উঠল।শাড়ির কুঁচি ধরে দৌঁড়ে বের হলো তৎক্ষণাৎ।ঘরে রেখা বেগম হতভম্ভ হয়ে বললেন,
“মাত্রই না কত বদনাম করে গেল আম্মা?যাই বলুন,নাজনীনকে তো জয়া বাঘের মতো ভয় পায়।”
আতিয়া বেগম বললেন,
“ওর তেজ কমানোর জন্য নাজনীনকেই দরকার।একটু মার-টার খেয়ে যদি ফাজিলটা মানুষ হয়।”
জয়া দৌঁড়ে এলো নাজনীনের ঘরের সামনে।নাজনীন ঘরের মধ্যখানে শুধু ট্রাউজার পরে দাঁড়িয়ে আছে।গরমে বোধহয় গায়ের গেঞ্জি ভিজে গেছে।মেয়েটা বোকার মতো দো’তলার বিশাল বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকাল।বাইরে বেশ কড়া রোদ উঠেছে।সে শুকনো ঢোক গিলে ঘরে পা রাখতেই নাজনীন পিছু ফিরে তাকাল।জয়া হকচকিয়ে কিছু বলার আগেই সে ধমক দিয়ে বলল,
“এত ঘরের বাইরে পা যায় কেন?একজায়গায় চুপচাপ স্থির হয়ে থাকা যায় না?”
জয়া দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে তেজী গলায় বলল,
“বাড়িতেই তো ছিলাম।”
“বাড়িতে,আমার ঘরে তো নয়।”
“এখন কী সারাদিন আপনার ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে হবে?বাজে কথা রেখে ডেকেছেন কেন সেটা বলুন?গরুর মতো অমন চিৎকার করছিলেন কেন?”
নাজনীন বিছানায় গিয়ে পা টানটান করে হ্যালান দিয়ে বসল।ঘরে ফুল পাওয়ারে ফ্যান ছেড়ে দেয়া।জয়ার শীতে শরীর শিরশির করছে।নাজনীন কাছে ডাকল তাকে।জয়া এগিয়ে আসতে গেলে সে ধমক দিয়ে বলল,
“দরজা বন্ধ করে কাছে আয়।”
জয়া দরজা বন্ধ করল প্রচুণ্ড শব্দ করে।কাছে এগিয়ে এসে বিছানায় উঠে ভাঁজ করা কম্বল খুলে শরীরে মুড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে নাজনীনের দিকে তাকাল।নাজনীন বিরক্ত চোখে ছোট্ট বউয়ের কাণ্ড দেখছিল।জয়া বলল,
“আমি রেগে আছি অনেক।”
“কেন?”
“কাল আপনি কী করেছেন?”
“কী করেছি?জুতা নিয়ে দৌঁড়ানি দিয়েছি।”
জয়া মুখ কালো করে বলল,
“তাই বলে বিয়ের পরেরদিন’ই জুতা নিয়ে দৌঁড়ানি দিবেন নতুন বউকে?”
নাজনীন বিরক্ত হয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“কীসের নতুন বউ?তোর তো ভাগ্য ভালো শুধু জুতা নিয়ে দৌঁড়ানি দিয়েছি।আমার তো উচিত ছিল তোকে তুলে আছাড় মারা।”
“আপনি কিন্তু আমায় অপমান করছেন।”
নাজনীন আরাম করে পা দু’টো মেলে দিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে বলে,
“এখন যদি পা দু’টো টিপে দিস তাহলে আর অপমান করব না।”
“অসভ্য লোক,আপনার কী গলা ব্যথা করে না?তাহলে গলা’টাও টিপে দেই?”
নাজনীন ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল,
“তোর শরীর থেকে পঁচা গন্ধ বের হচ্ছে।আজ গোসল করিসনি এখনো?”
“না।”
“কেন?”
“করব না।”
“কারণ?”
“অনেক ঠান্ডা পানি।”
নাজনীন চোখ ছোট ছোট করে মেয়েটার মুখখানা ভালো করে দেখে নিচু গলায় বলল,
“এখন ভদ্র মেয়ের মতো গোসলে না ঢুকলে আজ তোকে ৭বার ঠান্ডা পানি দিয়ে নিজ ইচ্ছায় গোসল করিয়ে ছাড়ব।যাবি নাকি আমি ব্যবস্থা করব?”
জয়া বিস্ময়ে চোখ বড় করে বলল,
“৭বার?”
“হু,ফরজ গোসল!”
•
নোট,
(রানিং গল্প পড়তে ইচ্ছা না করলে পড়বেন না।যখন জানেন’ই রানিং গল্প পড়তে অনেক ধৈর্য লাগে তাহলে রানিং গল্প কেন পড়েন বলুন তো?আমি বলেছি #প্রেমবসন্ত নিয়ে আমি একটু কাজ করছি এবং সেখানে আমার একটু বেশি’ই সময় দিতে হচ্ছে।আবার সামনে পরীক্ষা।তবু আবার বলছি,#প্রেমবসন্ত গল্পের কাজ শেষ হলে আমি আগের মতো নিয়মিত হব।ততদিন একটু কষ্ট করুণ সবাই🙂)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৭
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২০