প্রিয়া_আমার ❤️
পর্ব —৩
দূর্বা_এহসান
“এই মেয়ে উঠছো কেনো?”
ভয় পেয়ে চমকে উঠল মাইমা। চোখ খুলতেই মুখের একদম সামনে আয়াশ। এত কাছে যে তার নিঃশ্বাসের গরম ভাব পর্যন্ত টের পাচ্ছে সে। মুহূর্তেই শরীরটা শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল। অবচেতন মনেই সে বালিশ আঁকড়ে ধরল।
মাইমা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ছিল। শরীর নাড়াতে চেয়েও পারছে না। যেন কেউ সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে। মাথার ভেতর কেমন ঝিমুনি, কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। রাতের স্মৃতিগুলো ছেঁড়া ছবির মতো ভেসে উঠছে।আঁধার ঘর, ভারী নিঃশ্বাস, যন্ত্রণায় চিৎকার, নিজের অসহায় কান্না।
মাইমা ভয়ে গুটিয়ে গেলো। অবচেতন মনেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে হলো আবার বুঝি সব শুরু হবে।
আয়াশ থমকে গেল। মাইমার দিকে তাকিয়েই সে বুঝে গেল সব।
“কিছু করবো না।ভয় পেয়ো না।”
মাইমা বিশ্বাস করতে পারছিল না। কাল রাতের ভাঙাচোরা স্মৃতিগুলো জ্বরের ঘোরে এলোমেলো হয়ে মাথার ভেতর ধাক্কা খাচ্ছিল। সে চোখ সরাল না, আয়াশের প্রতিটি নড়াচড়া সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছিল।
আয়াশের বুকের ভেতর কেমন যেনো একটা অনুভুতি হলো। সে হাত বাড়ালো জ্বর বোঝার উদ্দেশ্যে।কিন্তু মাইমা সেটা বুঝলো না।
চোখের সামনে হঠাৎ করে একটা হাত এগিয়ে আসতেই তার ভেতরের ভয়টা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ল। অবচেতন মন কাল রাতের দৃশ্যকে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলল। মাথার ভেতর হঠাৎ করে একসাথে সব শব্দ, সব যন্ত্রণা ফিরে এলো।
“না… না…!”
গলা দিয়ে ভাঙা শব্দ বেরিয়ে এলো। মাইমা হঠাৎ করে শরীরটা ঝাঁকিয়ে তুলল। শক্তি কোথা থেকে এলো সে নিজেও জানে না। শুধু বাঁচতে চাওয়ার তাগিদ।তার ডান হাতটা আচমকা নড়ে উঠল।পরের মুহূর্তেই একটা তীব্র টান।ক্যানুলা খুলে গেল।
সাদা চাদরের ওপর লাল রক্ত ছিটকে পড়ল।এক ফোঁটা… তারপর আরেক ফোঁটা… তারপর গড়িয়ে পড়তে লাগল।
“আহ!”
মাইমা কেঁপে উঠল। ব্যথা না, তার চেয়েও বড় ছিল আতঙ্ক। নিজের হাত থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত দেখে সে আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল।
” দূরে যান! দূরে!”
ভাঙা গলায় চিৎকার করল সে।আয়াশ স্তব্ধ হয়ে গেল।এক সেকেন্ডের জন্য তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। চোখের সামনে শুধু রক্ত। মাইমার সাদা হাতে লাল দাগ। চাদর ভিজে যাচ্ছে।
“শান্ত হও….”
সে আর কথা শেষ করতে পারল না।মাইমা আরও ভয় পেয়ে গেল।
“আসবেন না!”
সে চেঁচিয়ে উঠল।
“আমাকে মারবেন না… আমি কিছু করিনি…”
আয়াশ দুই পা পিছিয়ে গেল। হাত দুটো শূন্যে তুলে ধরল, যেন নিজেকে নিরস্ত্র প্রমাণ করছে।
“আমি কিছু করবো না।শুনছো? আমি ছুঁবোও না।”
মাইমার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে। চোখ ছলছল করছে। রক্ত বেরোচ্ছে এখনো। কিন্তু সে সেদিকে তাকানোরও সাহস পাচ্ছে না। শুধু এক দৃষ্টিতে আয়াশকে দেখছে।আতঙ্কিত চোখে।
“কি হয়েছে?”
আহিনুর ছুটে ঢুকলেন।ঘরে ঢুকেই দৃশ্যটা দেখে তিনি চমকে উঠলেন। চাদরের রক্ত, মাইমার ফ্যাকাশে মুখ, আয়াশের শক্ত হয়ে থাকা শরীর।
“আয়াশ! সরে দাঁড়া!”
আয়াশ এক মুহূর্ত দেরি করল না। দেয়ালের দিকে সরে গেল। মাথা নিচু।আহিনুর দ্রুত মাইমার কাছে গেলেন। হাতের রক্ত দেখে সঙ্গে সঙ্গে চাপ দিয়ে ধরে ফেললেন।
“ভয় পাস না মা।কিছু হবে না। আমি আছি।”
মাইমা কাঁদছিল।চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট কাঁপছে। তার শরীর আবার নিস্তেজ হয়ে আসছে।
“ও আমাকে… ছুঁতে এসেছিল…”
ভাঙা গলায় বললো সে।এই একটা লাইনই যথেষ্ট ছিল।আয়াশের মনে হলো কেউ তার বুকের ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডটা তুলে নিয়ে চেপে ধরেছে। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাইমার সেবায় নার্স রাখা হয়েছিলো।
নার্স নতুন ক্যানুলা লাগিয়ে কাজ শেষ করল। পরিষ্কার করা হলো র ক্ত। আর নেই, কিন্তু সাদা চাদরে লাল দাগটা থেকে গেছে। মাইমার শরীরটা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এলো। চোখের পাতা কেঁপে কেঁপে বন্ধ হয়ে গেল। আবার সেন্সলেস।
আহিনুর কয়েক সেকেন্ড মাইমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। তারপর খুব ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। হাতের তুলো পাশে রাখলেন।এরপর ঘুরে দাঁড়ালেন।
আয়াশ তখন দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে। এক দৃষ্টিতে মাইমার দিকে তাকিয়ে।আহিনুর এগিয়ে এলেন ওর দিকে।
“তুই আর একবারও ওর পাশে যাবি না।ও নিজে না ডাকলে”
আয়াশ চমকে উঠল।সে মাথা তুলল। অবাক চোখে তাকাল মায়ের দিকে।
আহিনুর কখনো তাকে তুই বলেন না। ছোটবেলায়ও না। রাগ করলেও না। তাঁর মুখে এই সম্বোধনটা এতটাই অপরিচিত যে আয়াশ মুহূর্তের জন্য বুঝতেই পারল না—সে ঠিক শুনেছে কি না।আয়াশ মাথা নাড়ল। বেরিয়ে গেলো সে ঘর থেকে।
আহিনুর মাইমার পাশে বসলেন।মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন উনি।
ড্রইং রুমে এসে বসেছে আয়াশ।তার থেকে একটু দুরে ছোট ভাই #আইজানইনানমির্জা ‘র দুই ছেলে #আনাফমির্জা আর #আজানমির্জা খেলছে।জমজ বাচ্চা।বয়স ৫।তাকে দেখে বাচ্চা দুটো খেলা বন্ধ করে দিলো।প্রচন্ড রকমের ভয় পায় তাকে।শুধু তারা নয় বাড়ির প্রতিটি মানুষই।
আয়াশ সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু চোখের সামনে বারবার মাইমার সেই আতঙ্কিত মুখটা ভেসে উঠছে। নিজের বাড়িতেই সে আজ পরকীয় কোনো অপরাধীর মতো কোণঠাসা বোধ করছে। হঠাৎ ছোট ছোট পায়ের শব্দে তার তন্দ্রা ভাবটা কাটল। চোখ খুলে দেখল আনাফ আর আজান গুটিগুটি পায়ে নিজেদের খেলনা গুছিয়ে ওখান থেকে পালানোর চেষ্টা করছে। যেন আয়াশ কোনো এক ভয়ঙ্কর দানব, যে এখনই তাদের ওপর গর্জে উঠবে।
আয়াশের ইচ্ছে হলো ওদের ডাকতে, একটু কাছে বসাতে। কিন্তু তার গলার স্বর বা ব্যবহারের রুক্ষতা সম্পর্কে সে নিজেই সচেতন। তাই আর কথা বাড়াল না।
একটু পর আয়াশের বাবা #রওনাফ_মির্জা ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। হাতে খবরের কাগজ। ছেলেকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে তিনি থামলেন। গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললেন,
“মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছিল শুনলাম। এখন কেমন আছে ও?”
আয়াশ বাবার দিকে না তাকিয়েই নিচু স্বরে বলল, “আবার সেন্সলেস হয়ে গেছে। মা আছে ওর কাছে।”
রওনাফ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আয়াশের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বললেন,
“মানুষের মন আর শরীর দুটোই খুব অদ্ভুত, আয়াশ। শরীরে আঘাত লাগলে সেটা ওষুধ দিয়ে সারানো যায়। কিন্তু মনে যখন ভয় ঢুকে যায়, সেই ক্ষত শুকাতে অনেকটা সময় লাগে। তুই ওর সামনে না গেলেই বোধহয় ভালো করবি।”
হ্যা সুচক মাথা নাড়ালো আয়াশ।রওনাফ সাহেব সোফায় গা এলিয়ে বসলেন।আদরের ছেলের বউ ছোট একটা মেয়ে এটা তিনি ঠিক মানতে পারেননি।তারউপর আবার গ্রামের মেয়ে। আহিনুর একবারও তার থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে বেরিয়ে এলো #অহনা_মির্জা। আইজানের ওয়াইফ। শ্বশুরকে চা দিয়ে আয়াশকে তার কফি দিলো। এতটুকু সময়ে সে কোনোভাবেই তাকায়নি চোখ তুলে।জানে না কেনো সে ভয় পায় আয়াশকে।দ্রুত চলে গেলো আবার রান্না ঘরের দিকে।
আইজান নামছিল উপর থেকে। আয়াশের পাশে এসে বসলো ভাইয়ের সাথে তার বন্ডিং মারাত্মক রকমের ভালো। বয়সে ২ বছরের ছোট সে। ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে জন্য বেজায় খুশি।তার দুটো ছেলে হয়ে গেছে আর ভাই আইবুড়ো ঘরে ছিল।
“ভাইইই”
অনেকটা সুর টেনে বললো সে। আয়াশ তাকালো না। আইজান যে এখন রসিকতা করবে বুঝে গেছে সে।
“আরে তাকাও আমার দিকে”
তবুও তাকালো না। আইজান নিজে থেকেই বললো,
“বাচ্চা বউ পেয়ে ভাইজান আমাকে ভুলে গেলো?”
এবার তাকালো আয়াশ।বাচ্চা বউ! মেয়েটা সুন্দর। মুখটাও সামান্য গোলগাল।বয়স আন্দাজ করা গেলেও অতটাও যায় না। আয়াশ ধারনা করে নিয়েছিল এখনো ১৮ তে পা দেয়নি।
“বয়স কত ওর?”
প্রশ্ন করলো ভ্রু কুঁচকে। আইজান মজা করে পাল্টা প্রশ্ন করলো,”তোমার নিজের বউ, অথচ তার বয়স তুমি জানো না?”
“না। জানলে আজ এই প্রশ্ন করতাম না। সোজা করে বল, বয়স কত ওর?”
আয়াশের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। আইজান এবার নিচু স্বরে উত্তর দিল,
“১৬।”
কথাটা শোনামাত্র তড়িৎ আইজানের মুখপানে বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো।১৬ বছর! তাই বলে এত কম? আয়াশ নিজে এখন জীবনের মধ্যগগনে, অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ একজন মানুষ।আর এই মেয়েটি? এ তো তার প্রায় হাঁটুর বয়সী!
মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। বাচ্চা একটা মেয়ের সাথে তার বিয়ে দিয়েছে মা? একজন আইনের কর্মকর্তা হয়ে কিভাবে এটা মেনে নিবে?মুহূর্তেই আয়াশের পুরো শরীর রাগে রি রি করে উঠল।
আয়াশ বাংলাদেশের একজন নামকরা উকিল। আইন আদালত পাড়ায় তার ডাকনাম ‘অপরাজেয়’। আজ পর্যন্ত যতগুলো হাই-প্রোফাইল কেস সে লড়েছে, তার একটিতেও হারেনি। বিশেষ করে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধিকে সে প্রচণ্ড রকমের ঘৃণা করে। নিজের ক্যারিয়ারে এমন অসংখ্য কিশোরীকে সে এই অভিশাপ থেকে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে মুক্ত করেছে। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আজ সে নিজেই সেই অপরাধের জালে বন্দি। যে মানুষটি সারা জীবন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করল, আজ তার নিজের ঘরেই! কিভাবে মেনে নিবে সে এটা?
চলবে……
( নোট: ২k রিয়েক্ট উঠলে নেক্সট পার্ট আসবে)
Share On:
TAGS: দূর্বা এহসান, প্রিয়া আমার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ৫
-
প্রিয়া আমার গল্পের লিংক
-
ডার্ক ডিজায়ার গল্পের লিংক
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১৭
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১২
-
প্রিয়া আমার পর্ব ৪
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব – ২
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৮
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ গল্পের লিংক
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৫