#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১৯)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
কয়েক মুহুর্ত অতিক্রম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাজের রুমের আলো নিভে গেল। নৌমি ক্ষীণ হেসে দ্রুত ছুটল নিচে। ধীরে সুস্থে বাড়ির মেইন দরজা খুলে পা টিপে টিপে বের হলো। হাতে বাটন ফোনের ক্ষুদ্র আলো। তাতেই যেন সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
নৌমি চুপিচুপি তাজদের বাসার সামনে এসেছে। এখনও বের হয় নি শুভ্র। বাড়ির সামনে মস্ত বড় বাল্ব জ্বলছে। সেই আলোতে নিজের ছায়াটাও ভূতের মতো লাগছে। দিশাবিশা না পেয়ে নৌমি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে। চুপচাপ শুভ্রর জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হওয়ার নয়৷ ২ মিনিট, ৩ মিনিট করে সময় অতিক্রম হতে চলেছে। কিন্তু শুভ্র আসার কোনো নামই নেই। নৌমি দাঁতে দাঁত খিঁচে বিড়বিড় করল,
” কোন ভুলে রাতে বের হওয়ার ভূত চেপেছিল মাথায়! দূর! রাগ ভাঙানোর চেষ্টায় আমার শান্তির ঘুমটা নষ্ট হলো।”
হঠাৎ দরজায় শব্দ হতেই নৌমি নিজের মুখ চেপে ধরল। কেউ এমনভাবে দরজা খুলছে, মনে হচ্ছে বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। শুভ্রর চালচলন কখনোই এমন না। ভয়ে
নৌমির অন্তরাত্মা পর্যন্ত শুকিয়ে যাচ্ছে। শুভ্রর বদলে অন্য কেউ আসছে না তো!
আতঙ্কে ওড়না টেনে গলা পর্যন্ত নামিয়ে নিয়েছে। নৌমি হাতে হাত চেপে দু’চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে৷ অকস্মাৎ মাথায় গাট্টা পরতেই চমকাল নৌমি। হকচকিয়ে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। স্বয়ং তাজ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। চোখে- মুখে তীব্র আক্রোশ। গুরুগম্ভীর চেহারা। নৌমি বিহ্বল চোখে চেয়ে আছে। হাসবে নাকি উল্টো দিকে পালাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না৷ তাজের ভ্রু কুঁচকানো। চেহারায় বিরক্তির ভাব টেনে গোমড়া মুখে প্রশ্ন করল,
” কয়টা বাজে?”
হতবিহ্বল নৌমি এখনও নিশ্চুপ। নিঃশ্বাস আঁটকে রেখেছে ভেতরে। তাজের অগ্নি চোখের চাউনি এড়িয়ে ফোনের দিকেও তাকাতে পারছে না। তাজ নিজের ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখে থমথমে গলায় বলল,
” ২ টা বাজতে আর মাত্র ৬ মিনিট বাকি। এত রাতে এখানে কি?”
নৌমি বুকের ভেতর ভয় আর আতঙ্ক তোলপাড় চালাচ্ছে। প্রশ্নেরা মাথার ভেতর প্রতিনিয়ত চক্কর চালাচ্ছে। কি উত্তর দিবে! দিনের বেলা হলেও কিছু একটা বলা যেত! এত রাতে কি অজুহাত দিবে!
হঠাৎ নৌমির মাথায় কিছু এলো। আনমনে নিজেকে প্রশ্ন করল,
” শুভ্র ভাইয়ার ফোন কি তামজিদ ভাইয়ার কাছে ছিল? সব কথা কি তামজিদ ভাইয়া শুনেছে?”
নৌমি নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। শরীর ঘামতে শুরু করেছে। বহু কষ্টে নিজেকে ধাতস্থ করে শান্ত গলায় বলল,
” আমি এখন যাই। “
” যাওয়ার কথা বলেছি তোকে ?”
” অনেক রাত হয়েছে। ঘুমাতে যাই আমি।”
” ঘুমানোর কথা আগে মনে ছিল না? শুভ্রকে অফার করছিলি ঘুরার জন্য। এখন কি হলো? ঘুরার শখ মিটে গেছে?”
“শুভ্র ভাইয়া রাগ করেছিল তারজন্য বলেছিলাম। আর কিছুই না।”
তাজ রাগে কটমট করে বলল,
” তার মানে যে কেউ তোর সাথে রাগ করলে তাকে নিয়েই মাঝরাতে বেরিয়ে পড়বি?”
নৌমি কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ ফেলে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” মেজাজ খারাপ করো না। যাচ্ছি আমি।”
নৌমি এক পা বাড়াতেই তাজ শক্ত হাতে নৌমির হাত চেপে ধরল। এক টানে নৌমিকে নিজের সামনে দাঁড় করাল। নৌমি কিছু বলার পূর্বেই তাজ বলে উঠল,
” আমার সাথে চোখ রাঙিয়ে কথা বলার সাহস কে দিয়েছে তোকে?”
” প্লিজ ভাইয়া, ছাড়ো।”
তাজের ভাবাবেগ অপরিবর্তিত। রাগান্বিত কণ্ঠে হুঙ্কার দিল,
” সবকিছুতে বাড়াবাড়ি ঠিক না, নৌমি। তুই এখন আর ছোট্ট নৌমি নেই। যাকে তাকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করাটা বন্ধ কর, প্লিজ। তোর উড়নচণ্ডী স্বভাব যেন গুরুতর কোনো ক্ষতির কারণ না হয়। “
তাজের রাগী কণ্ঠস্বর করুণ হয়ে আসে। কণ্ঠে কোমলতা মিশিয়ে ফের বলে,
” তোর জন্য আমার বড্ড চিন্তা হয়,নৌমি।”
নৌমির দুচোখ তাজের অভিমুখে। অসহায়ের মতো চেয়ে আছে দু’জনেই। ভালোবেসে ডাকা মুসকান নাম নৌমিতে এসে ঠেকেছে সে খেয়াল করে নি কেউই। নৌমি নিজের অজান্তেই প্রশ্ন করে,
” আমার জন্য চিন্তা করার সময় আছে তোমার?”
তাজের মুখ মণ্ডল মলিন। আলগোছে নিজের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে শীতল কণ্ঠে বলল,
” তোর সাদামাটা মনটার জন্য ভয় হয়! আমি চাই না হুট করে কেউ তোর জীবনে এসে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যাক।”
নৌমি মৃদু হেসে বলল,
” চিন্তা করো না, এসব কিছুই হবে না। তুমি ঘুমাতে যাও। আর হ্যাঁ এত রাতে শুভ্র ভাইয়াকে কল দেওয়ার জন্য সরি। আর কখনও এত রাতে কল দিব না। তুমি এই ব্যাপারে বাসায় কাউকে কিছু বলো না, প্লিজ।”
” সেসব পরে ভাবা যাবে। এখন বাসায় যেতে হবে না। চল আমার সঙ্গে।”
” কোথায় যাবে?”
” মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় ঘুরার শখ হয়েছে তোর। সামান্য একটা শখ যদি আমি পূরণ করতে না পারি, শুভ্রর সামনে আমার মান সম্মান থাকবে?”
নৌমি কোনো কথা বলল না। তাজের দিকে চেয়ে মুচকি হাসল কেবল। এতক্ষণে ভয় অনেকটায় কেটেছে। তাজকে অনুসরণ করে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল। নির্জন পথে পাশাপাশি হাঁটছে দু’জন। নৌমি যেতে যেতে হঠাৎ বলল,
” ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
” হুমম, বল।”
” নিলু আপুর সাথে কি যোগাযোগ নেই তোমার?”
” আছে। তবে না থাকার মতোই। কেনো?”
” কিছু মনে করো না ভাইয়া। আমার মনে হয় আমি কোনো ভাবে তোমাদের দু’জনের মাঝখানে ঢুকে যাচ্ছি। জানি না আমার ভাবনা ঠিক কি না ভুল। কিন্তু মনে হচ্ছে।”
” হঠাৎ এসব ভাবনা মাথায় আসলো কেনো?”
” বেশ কিছুদিন যাবৎ দেখছি নীলু আপুর আচরণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে তোমার ফোনে কল আসলে আমি রিসিভ করলে কত কথা বলত আমার সাথে। কিন্তু এখন আমি রিসিভ করলে মনে হয় খুব বিরক্ত হোন। তোমাকে কতবার বলেছি, আব্বুকে বলো আমাকে একটা ফোন কিনে দিতে তাহলে তোমার ফোন একটুও ধরব না আমি৷ তুমি সেটাও করছো না। “
তাজ চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলল,
” তুই কি নীলুর অযুহাত দিয়ে ফোন কেনার ধান্দা করছিস?”
” না না। কখনোই না। ফোন কেনার জন্য নীলু আপুর অযুহাত দিতে হবে না আমার।”
” তাহলে ওর কথা কেন উঠছে?”
” তুমি নীলু আপুকে বিয়ে করে নিয়ে আসো, প্লিজ।”
” হঠাৎ এই কথা!”
নৌমি আমতা আমতা করে বলতে শুরু করল,
” আমার বান্ধবী আছে না? রাহা। “
“হুম। কি হয়েছে?”
” রাহা’র বড় আপুর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। এই মাসের ২৬ তারিখ৷ আপুদেরও পছন্দের বিয়ে৷ ৬ বছরের সম্পর্ক। বিয়ের শপিং ও প্রায় শেষ। হুট করে তাদের বিয়ে ভেঙে গেছে। সেই নিয়ে রাহা আর ওর বোনের খুব মন খারাপ। বাড়ির সবাই আপসেট। রাহা ৩ দিন ধরে কলেজে আসে না৷ আজ কল দেয়ার পর এগুলো বলেছে আমাকে৷ সেই থেকে চিন্তা হচ্ছে আমার! তুমি যেভাবেই হোক বিয়েটা করে ফেলো প্লিজ।”
তাজ নৌমির কথায় খুব একটা গুরুত্ব দিলো না। বরং ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
” এসব নিয়ে ভাবিস না তুই।”
” তুমি হাসছো? রাহা জানতে পারলে খেয়ে ফেলবে আমাকে। “
” ওমা কেন?”
” ও বার বার বলেছে আমি যেন কাউকে কিছু না বলি। আমি তোমার ভালোর জন্য বললাম আর তুমি কি না আমার কথাটা পাত্তায় দিলে না! হেসে উড়িয়ে দিলে!”
” ঠিক আছে৷ দিলাম পাত্তা। হয়েছে?”
” বিয়ে কবে করতেছো এটা বলো আগে।”
” আব্বুকে বলি আগে। দেখি বাসার পরিস্থিতি কি হয়!”
” কাল বলবে?”
” না। শুভ্ররা যাওয়ার পর বলব।”
নৌমি মন মরা হয়ে বলল,
” যা করার তাড়াতাড়ি করবে। আমার আর ভালো লাগে না। তুমি বিয়ে করার পরপরই আমি ফোন কেনার বায়না ধরব।”
তাজ বক্রদৃষ্টিতে তাকাতেই নৌমি মিষ্টি হেসে বলল,
” এমনি বললাম। মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছি।”
★
ফজরের আগে আগে রুমে ঢুকেছে তাজ। ফোনটা টেবিলের উপর রাখতেই শুভ্র প্রশ্ন করল,
” সারারাত কোথায় ছিলে?”
” বাইরে।”
“কেনো?”
” এমনি বেরিয়েছিলাম।”
তাজ রুমের আলো জ্বালিয়ে চাপা স্বরে প্রশ্ন করল,
” তুই সজাগ হয়েছিস কখন?”
” অনেকক্ষণ।”
” ওহ।”
শুভ্র আগপাছ না ভেবে জানতে চাইল, ” রাতে নৌমি কল দিয়েছিল?”
“হ্যাঁ।”
” ডাকো নি কেনো আমাকে?”
“সকালে বিয়েতে যাবি বললি তাই ডাকি নি।”
“তাই বলে এত রাতে নৌমিকে নিয়ে একা ঘুরতে বের হবে?”
তাজ কিছুটা চমকাল। কিন্তু শুভ্রকে বুঝতে দিলো না। শুভ্র কয়েক মুহুর্ত তাজের অভিমুখে তাকিয়ে থেকে হুট করে বলে উঠল,
” আমি নৌমিকে ভালোবাসি, ভাই।”
চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৯