পিদিমজ্বলারাতে. ৫ ✍️ #রেহানা_পুতুল
লুকানো চোখে তৌসিফ সারাঘরে চোখ বুলিয়ে নিল। চুপিচুপি উঠে গিয়ে সাথীর রুমে গেল। খালি পায়ে নিঃশব্দে! ড্রেসিং টেবিলের নিচ থেকে খুঁজে একটি পাঞ্চ ক্লিপ নিয়ে নিল পকেটে। এটা কাজে লাগতে পারে অপরাধীকে শনাক্ত করতে।
রাতে সবাই সবার মতো ঘুমিয়ে পড়ল। তখন তৌসিফ তার মা বাবার রুমে গেল। তার বাবার মেডিসিনগুলো, প্রেসক্রিপশন দেখল ভালো করে। গ্লুকোমিটার দিয়ে সুগার চেক করল। প্রেশার চেক করলো। দেখল সব ঠিক আছে। এবং জেনে নিল, মেডিসিনগুলো সবসময় তার মা ই তার বাবাকে নিয়ে দেয়। মা ব্যস্ত থাকলে বা অসুস্থ থাকলে জাহেদ নিজেই নিয়ে খেয়ে নেয়।
তৌসিফের মনে জিইয়ে থাকা কৌতুহল দ্বিগুণ হলো সেই ট্যাবলেটের পাতাটা নিয়ে। তাহলে সেই নিষিদ্ধ ট্যাবলেটের পাতা কেন তাদের ঘরে এলো? কিসের জন্য? তবে তার বাবা,মায়ের মনে কোনো কৌতুহল কাজ করল না ছেলে এসব চেক করল বলে। তাদের সরল মন বুঝে নিল,ছেলে দূরে থাকে সবসময়। তাই এখন কাছে আসাতে পিতার সবকিছু মনিটরিং করছে।
জাহেদ ছেলেকে নরম গলায় বলল,
“বাবা,তুই অযথা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কাউকে কিছু বলিস না। এসব কোনটাই বড় সমস্যা নয়। তোর মা তো ভালই আছে। তাকে জিজ্ঞেস কর নইলে।”
তৌসিফ বুক ভর্তি অভিমান নিয়ে অভিযোগের আঙুল তুলল পিতার দিকে। বলল,
“বাবা,আপনি কোনো কথাই বলবেন না আর। আপনার মুখে কিছু বলা এখন আর শোভা পায় না। নিজের মা,বাবা,ভাই বোনকে কখনো তাদের ভুলের জন্য,অনুচিতের জন্য কিছু বলেন নি। ধরে নিলাম বলতে চেয়েও পারেন নি। তাই এতটা বছর যেভাবে চুপ ছিলেন, এখনও আমি যা করব, বলব আপনি চুপ থাকবেন। এটা সন্তান হিসেবে আপনার কাছে আমার একান্ত অনুরোধ বাবা।”
পাশ হতে রাবেয়া স্বামীর কথার গুরুত্ব দিয়ে বলল,
“আমি কতবার মানা করছি,তাও আপনার ছেলে শুনব না।”
তৌসিফ মায়ের মায়ায় ভরা মুখখানার দিকে সজল চোখে চাইল। এবং চিন্তা করতে করতে নিজের রুমে চলে গেল।
পরেরদিন পাখি ডাকা ভোরে সবাই উঠে গেল। তৌসিফ ও জাবেদ বড় কাঁচা বাজারে চলে গেল। অভ্রকে সে অনেক স্নেহ করে। তাই বাধ সাধল না যেতে। হাসি হাসি মুখেই চাচা ভাতিজা বাজারে গেল। যাওয়ার আগে দেখল তার মা রান্নাঘরে দুহাত খুলে কাজ করছে। আজ আর সে মাকে বা অন্যদের কিছু বলবে না। কারণ সে মাকে নিয়ে সেদিন দুপুরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। হাকিম নড়বে হুকুম নড়বে না।
রিকশা ভর্তি বাজার চলে এলো। ডেকোরেশনের লোকজনও চলে এল খাওয়ার প্যান্ডেল সাজাতে। চেয়ার টেবিল, বড় ডেকচি,প্লেট,গ্লাস সবই চলে এলো উঠানে। জাবেদের একমাত্র ছেলে অভ্র। তাই তার সাধ্যের ভিতরে বড় আয়োজন করবে সে। তানভির বাড়ি চলে এল দুপুর না হতেই। ফ্রেস হয়ে সেও অন্যদের সাথে কাজে হাত লাগাল।
পরে সে সুযোগমতে তৌসিফকে ডেকে নিল একপাশে। বিজ্ঞের মতো ভাইকে জিজ্ঞেস করলো,
“ভাইয়া সেদিন তুমি আম্মাকে নিয়ে যেই কথাগুলো বললে,সেগুলো সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। আমি তো কখনো তেমন কোনো সমস্যা দেখিনি।”
“দেখবি কীভাবে তুই? মায়ের সমস্যা,দুঃখ, বেদনা অনুভব করতে হলে আমার মতো পরিবারের বড় ছেলে হতে হয়।”
তানভিরের পিঠ চাপড়ে বাঁকা হেসে বলল তৌসিফ।
“বাহ! ছোট ছেলে হলে বুঝি এসব বোঝা যায় না?”
“মনে হয় না। নয়তো আমার থেকে জানতে চাস কেন? আমি কী মায়ের বিষয়ে তোর থেকে জানতে চেয়েছি কিছু?”
তানভির আর দাঁড়ালো না বড় ভাইয়ের সামনে। পরাজিত সৈনিকের মতো নিচু মাথায় অন্যদিকে চলে গেল। তৌসিফ স্থির চোখে ভাইয়ের চলে যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।
পরের দিন দুপুরে অনুষ্ঠান শুরু হলো। সলিমুল্লা চেয়েছেন ঘরে মিলাদ ও কোরান খতম হোক। তাই মসজিদ থেকে পাঁচজন হুজুর এলো দাওয়াত পেয়ে। ছোট বড় সবাই নতুন পোশাক পরেছে। তবে রাবেয়া বেশি ভালো শাড়ি পরেনি নষ্ট হতে পারে বলে। সে ঘরের বড় বউ। দায়িত্ব বেশি। কাজ বেশি।ঘরের সব পুরুষেরা পাঞ্জাবি পরেছে। অভ্র পিতার কিনে দেওয়া পাঞ্জাবী না পরে তৌসিফের দেওয়া পাঞ্জাবী পরলো। এতে তার মা মনি একটু বিরক্ত হলো ছেলের উপরে। কিন্তু ঘরভর্তি অতিথি বলে কিছু বলল না অভ্রকে। মিলাদ শেষে ভোজন পর্ব শুরু হলো। তা শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো। ঘরের অতিথি ছাড়া আশেপাশের বাড়ির সবাই চলে গেল। অভ্র অনেক উপহার পেল। সবাই সেগুলো দেখলো খুশি খুশি মনে।
আনন্দমুখর পরিবেশে অভ্রের সুন্নাতে খাৎনার অনুষ্ঠান শেষ হলো৷ তানভিরসহ সব কাজিনেরা হাসিঠাট্টায় মেতে উঠলো। কাকে কী রকম সুন্দর লাগছে তা একে অপরকে বলছে। তার মাঝেই হুট করে সাথির নানী তৌসিফকে শুনিয়ে বলে উঠলো,
“তৌসিফরে দুলা দুলা লাগছে। খালি বিবির অভাব।”
তানভির এগিয়ে গিয়ে উদ্যম হাসি ছড়িয়ে বলল,
“অভাব কেন? তুমি আছ না নানী?”
“ওই, তোর বুড়া পাত্রী নজরে পড়ে ক্যান? ঘরে তো জোয়ান পাত্রীও আছে।”
“কে?”
চমক খাওয়া সুরে জিজ্ঞেস করলো তানভির।
“কেন,আমাগো সাথী। তৌসিফের লগে সাথিরে খুব মানায়।”
পাশ থেকে সাথির মা সিমা শুনে ফেলল মায়ের কথা। ত্রস্ত পায়ে মায়ের সামনে এল। রা * গ ঝাড়ল মায়ের উপরে। দাঁত চিবিয়ে বলল,
“আহহা রে মা! আর পারি না। আপনার মুখের লাগাম নাই ক্যান? যৎবিচার তৎসময়। মুখে কুলুপ আঁটেন আল্লারওয়াস্তে।”
তৌসিফ ও সাথীর কানেও গেল বাক্যটি। সাথী লজ্জা লজ্জা মুখে তৌসিফের আড়াল হয়ে গেল। তানভির ভাইয়ের দিকে চেয়ে চোখের পাতা উল্টিয়ে মত জানতে চাইল। তৌসিফ না বোঝার ভান করলো।
মনে মনে সামান্য হোঁচট খেলেও সে কোনো পাত্তা দিল না বুড়ো নানির কথাকে। নানীরা অমন তামাসা করেই থাকে ঘরে উপযুক্ত ছেলে মেয়ে থাকলে।
তৌসিফ স্থান পরিবর্তন করে অন্য সাইডে গিয়ে বসল একটি চেয়ার টেনে। সারাদিন বেশ কাজের ধকল গিয়েছে তার উপরেও। সে আড়চোখে খুকীর দিকে তাকাচ্ছে বারবার। তার মায়ের বিয়ের কাতান শাড়িটি খুকীর পরনে। খুকী যখন শাড়িটি পরে হাঁটাহাঁটি করছিল তখনই তৌসিফের চোখে পড়েছিল। এই শাড়িতে,এই দৃশ্যে সে তার মাকে কল্পনা করছে। মা পরলে মনে হয় আরো বেশি সুন্দর লাগতো। ভেবেই সে মনে মনে ক্রুদ্ধ। তার মায়ের এতো সুন্দর বিয়ের শাড়ি খুকী নিয়ে নিবে? নো। তা হতে পারে না। যে করেই হোক মায়ের শাড়ি মায়ের কাছেই থাকতে হবে। তৌসিফের মাথা খেলে যায়। সে সবাইকে শুনিয়ে উচ্চগলায় তার মাকে ডাকল।
“মা,এই মা কই তুমি?”
রাবেয়া ছেলের দরাজ কণ্ঠের ডাক শুনে পা চালিয়ে ছুটে এল।
“কিরে, কি হইলো?”
“মা,ফুফুর পরনে এটা কী তোমার শাড়ি?”
“হ্যাঁ। কী হইছে এখন?”
“মা,শাড়িটা তো চমৎকার। আমাদের ঘরের প্রথম বউ বরণ হবে তোমার এই শাড়িটি দিয়ে। মানে তোমার বিয়ের শাড়ি হবে তোমার বউয়ের বিয়ের শাড়ি। এই শাড়ি পরেই সে আমাদের ঘরে আসবে।”
পুরু গলায় অধিকার প্রয়োগ করে বলল তৌসিফ।
পাশের রুম থেকে শুনতে পেল সাথী। সে নিজে নিজে লাজুক হাসছে মিটমিটিয়ে। তানভির তা দেখল। সাথির সামনে গিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“কিরে,খুব খুশী মনে হচ্ছে তোকে? ভাইয়াকে পছন্দ করিস? না আমাকে?”
“তুই তো আমার ক্লাসমেট।”
” তো কি প্রবলেম? মুখ মিলিয়ে নে। হাসি বন্ধ কর। মাছি ঢুকবে।
রাবেয়া ইতস্ততবোধ করতে লাগলো। ইতিউতি চেয়ে জোরেই ছেলের কথার জবাব দিল।
“তোর আব্বার কেনা শাড়ি কেন তোর বউ পরবে? তোর টাকার কেনা শাড়ি দিয়েই আমরা বউ বরণ করব। এটা তোর ফুফুর পছন্দ হয়েছে বলে নিয়ে নিয়েছে।”
তৌসিফ হতভম্ব গলায় করে বলল,
“আশ্চর্য! এটা কেমন কথা মা? তোমার বিয়ের শাড়ি কেন ফুফু নিয়ে নিবে? একটা মেয়ের কত আবেগ,অনুভূতি, মধুর স্মৃতি জড়ানো থাকে বিয়ের শাড়িতে। আর সেসব স্মৃতি বিলীন হয়ে যাবে? তুমি কী মানুষ মা? তুমি তো দেখি আস্ত একটা রোবট।”
রাবেয়া অসহায়ের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে দেয়াল ঘেঁষে। জাহেদ ছেলেকে থামাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। জোরে বলাতে কথাগুলো সবাই শুনতে পেল। খুকি ছোট ভাইয়ের রুমে গিয়ে শাড়িটি চেঞ্জ করে ফেলল। নিজের একটা শাড়ি পরে নিল। রাবেয়ার শাড়িটি ভাঁজ না করেই তৌসিফের সামনে ছুঁড়ে মারল।
রুক্ষ স্বরে বলল,
“নে ধর। তোর মায়ের শাড়ি। হারামির হারামি একটা। কতো মায়া করছি ল্যাদাকালে। সব ছাঁই। বেহুদা!”
বলেই খুকী রাবেয়ার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। তিরিক্ষি গলায় উপহাস করে বলল,
“এমন নাদান সাইজা খাড়ায়া আছেন,মনে হয় ভাজা মাছটাও খুঁইটা খাইতে পারেন না আপনে। এইটা যে আপনার কারসাজি, তা ভালো করেই ধরতে পারছি।”
রাবেয়া মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তৌসিফও চুপ হয়ে আছে। মনে মনে বেশ খুশি মায়ের শাড়িটি নিয়ে নিতে পারল বলে। উৎসবমুখর দিনে খুকির মন খারাপ হয়ে গেল, শাড়িটা নিজের দখলে নিতে পারল না বলে।
জাবেদ বাড়ির বাইরে ছিল বলে শাড়ির বিষয় জানতে পারেনি। ঘরে ফেরা মাত্রই স্ত্রীর কাছে সব শুনল। সে মনে মনে কিছু একটা বলল তৌসিফকে নিয়ে।
পরক্ষণেই মনিকে বলল,
“চুপ আছো,চুপ থাকো। দরকার না পড়লে হস্তক্ষেপ করার দরকার নেই।”
খুকী অভিমান করে বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইল সেদিনই। তানভির তাকে জড়িয়ে ধরে থামাল। তানভির একমাত্র ফুফুকে অনেক ভালোবাসে। খুকীও বড় ভাইয়ের ছোট ছেলেকে যথেষ্ট স্নেহ করে। খুকী ভাতিজার কাছে প্রশ্রয় পেয়ে নাকি কান্না শুরু করে দিল। পরোক্ষভাবে তৌসিফ ও রাবেয়ার প্রসঙ্গ টেনে নানানকথা বলে তানভিরের কান ভারি করে দিল। তাতে তানভির, মা ও ভাইয়ের উপর একটু মনঃক্ষুণ্ন হলো। তানভির তারমতো করে খুকিকে বুঝিয়ে ঘরের ভিতর নিয়ে নিল। মর্জিনাও ছোট নাতির কাছে বড় নাতির বিরুদ্ধে নালিশ দিল। তানভির একই কায়দায় দাদীকেও বুঝিয়ে নিল।
জাবেদ চলে যাবে। খুকিও শ্বশুরবাড়ি চলে। তৌসিফ নিজেও চলে যাবে ছুটি শেষ হলে। সুতরাং দেরী করা যাবে না। তাই পরেরদিন মাগরিবের নামাজের পর তৌসিফ সবাইকে অনুরোধ করে সলিমুল্লার রুমে ডেকে নিল। যৌথ পরিবারের বড় ছেলে তৌসিফ। তার কথা অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই কারো হাতে। একে একে সবাই গেল। যার যার মতো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল। সলিমুল্লা, মর্জিনা,জাহেদ, রাবেয়া, তৌসিফ, তানভির,জামালের স্ত্রী সিমা, তার মেয়ে সাথি,জাবেদ,মনি ও খুকী উপস্থিত রয়েছে। ছোট বাচ্চারা অন্যরুমে তাদের মতো করে খেলাধূলায়,গল্পগুলো মশগুল রয়েছে।
তৌসিফ কী বলবে তা কেউই জানে না। তবে যেটা বলবে সেটা যে কারো জন্য সুখকর কিছু নয়,এতটুকু তারা সবাই বুঝতে পেরেছে। তাই সবাই ভার মুখে অপেক্ষারত। তৌসিফের মুখশ্রী বিবর্ণ! চাহনি অবিচল! সে লম্বা করে আক্ষেপের শ্বাস ছাড়ল।
গম্ভীর গলায় বলল,
“দাদা,দাদী,আমি, আমার বাবা,মা,ভাইকে নিয়ে ভিন্ন হয়ে যেতে চাই। যৌথভাবে আমরা আর থাকব না।”
আকস্মিক তৌসিফের এমন আক্রমণাত্মক কথায় সবাই বজ্রাহত হলো যেন। কারো মুখ দিয়েই কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সবাই স্তম্ভিত! বাকরুদ্ধ! সবার অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য চাহনি তৌসিফের দিকে তাক হয়ে আছে চেনা মানুষের মতন।
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬