পিদিমজ্বলারাতে. ১৬ ✍️ #রেহানা_পুতুল
কাজ সেরে তৌসিফের বাড়ি ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। কিন্তু উঠানে পা দিয়েই সে ঘরের যে পরিবর্তিত দৃশ্যপট দেখতে পেল, তার জন্য সে কোনভাবেই প্রস্তুত ছিল না। এবং তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
সে দেখলো তাদের নতুন ঘরের সব কাঠের খুঁটিগুলো স্থানচ্যুত। ঘরের চারপাশ হতে কোদাল দিয়ে মাটি সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। অর্থাৎ ঘর ভিটা ছোট করা হচ্ছে। কাজগুলো তাদের ঘর করা মিস্ত্রিরাই করছে। ঘরের সামনে বিমর্ষ মুখে চেয়ারে বসা রয়েছে তার বাবা। তার মা রাবেয়া ভিখারির বেশে একটি গাছের গুড়িতে বসে আছে। তৌসিফ হাতের জিনিপত্রগুলো উঠানেই রাখল। শশব্যস্ত হয়ে নতুন ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। বাবা,মায়ের দিকে প্রশ্নাতীত চাহনি নিক্ষেপ করল।
রাবেয়া কাতর গলায় বলল,
“সাথির বাপে টেলিফোনে তোর দাদারে কইছে আমাদের ঘর এত বড় হইলে তার ঘর করতে না-কি অসুবিধা হইবো। তাই তোর দাদা এগোরে কইছে সব খুইলা যেন ঘর আরো ছোট করে। সারাদিন এগুলা নিয়া বহুত কথা কাটাকাটি হইছে তোর আব্বা ও আমার লগে। কতো অনুরোধ করছি,উনি শুনলই না।”
তৌসিফ ঘরের দিকে চেয়ে ফুঁসে উঠছে ভয়ানকভাবে। যেন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। পাড় ভেঙ্গে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে যে কোনো সময়। কত শখ ও প্ল্যান করে সে এই ঘরটা তৈরি করছে। সেখানে অন্যায়ভাবে তার শখের জলাঞ্জলী হবে? নাহ। একদম না।
তৌসিফ গর্জন করে উঠে মিস্ত্রীদের নির্দেশ করে বলল,
“এই, আপনারা কাজ বন্ধ করুন বলছি। সরানো মাটি আবার আগের স্থানে নিয়ে যান। খুঁটি আগের জায়গা গেঁড়ে ফেলুন। ঘর আগের অবস্থায় নিয়ে নেন।”
তারা দোনোমোনো করতে করতে বলল,
“আমরা এবার কার কথা শুনুম কন? আপনের দাদায় কইলো ঘর ছোট করতে। আপনে কন করতে না। আমরা তো পড়ছি পুরাই বিপদে।”
তৌসিফ রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ফের নির্দেশ দিয়ে বলল,
“আপনারা আমাদের ঘর করতেছেন। আমাদের কথা শুনবেন। নয়তো একটা টাকাও পাবেন না এই কয়দিনের। ঘর আগের মতো দেখতে চাই।”
মিস্ত্রিরা নিচু মাথায় তৌসিফের নির্দেশ পালনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। ততক্ষণে ঘরের সামনে চলে এল সলিমুল্লা, মর্জিনা,সিমা,মনি। সলিমুল্লা গর্জে উঠলেন। কম্পিত উচ্চকণ্ঠে তৌসিফকে বললেন,
“তোর এতো বড় হিম্মত! আমার আদেশ অমান্য করস! এতো লম্বা লম্বা কথা কোন মুরোদে কস? দুই এক হাত জোড়াইতে পারছস তোরা বাপ, ছেলে? জায়গা আমার। কে কোনভাবে ঘর করব,কি করব তা আমার হুকুমেই হইব। এতো বড় ঘর দিয়া কি করবি? ফুটানি বন্ধ কর। জামাল বড় কইরা পাকা ঘর দিব। আর পাকা ঘর ছোট হইলে দেখতে ভালো দেখায় না। পাকা ঘরের রুম বড় হইতে হয়। তোদের তো কাঁচা মাটির ঘর। টিনের বেড়ার ঘর। রুম ছোট ও ঘর ছোট হইলেও চলে।”
তৌসিফ দাদার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। শানিত গলায় বলল,
“এতোদিন কী অন্ধ ছিলেন আপনি? না আমাদের নতুন ঘর এটা অদৃশ্য ছিল? বাড়ির জায়গা ভাগ,ঘর ভিটার জন্য নিদিষ্ট স্থান এবং আমাদের ঘর লম্বায় কয়হাত,পাশে কয়হাত,উঁচু কতটুকু হবে,সবই তো আপনার সামনে, আপনার সম্মতিতে হলো। তাহলে হঠাৎ এমন বিধ্বংসী কাণ্ড কেন করলেন? পাঞ্জাবীর পকেট আবার ভরে গেল আরবের রিয়ালে? পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েন? তাবলীগ জামাতে যান। ধর্মকর্মের কথা বলেন। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন। এতকিছু জানেন,কিন্তু এটা জানেন না, কারো ঘর ভাঙা আর মসজিদ ভাঙ্গা সমান?মসজিদকে যদি আল্লার ঘরের সঙে তুলনা করা হয়,তাহলে মানুষের থাকার ঘরটাও তো আল্লার ঘর। না-কি ভুল বললাম? জুলুমকারীকে আল্লাহ সহ্য করবেন না। মনে রাখবেন। ঘর আগের মতই হবে ঠিকঠাকভাবে। আর বললেন না জায়গা আপনার। হ্যাঁ অবশ্যই আপনি মালিক। কিন্তু জন্মসূত্রে,ধর্মীয় আইনে,রাষ্ট্রীয় আইনে এইসব জায়গার অংশীদার এখন আপনার সন্তানেরা। তদরূপ পৈত্রিক সূত্রে পরবর্তী বংশধর হিসেবে আমরাও এসব জায়গায় অংশীদার। হকদার। আর কোনভাবে বোঝাতে হবে?”
সলিমুল্লা নাতির যুক্তিপূর্ণ কথার তোড়ে নিজের কথার খেই হারিয়ে ফেললেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এদিক ওদিক চাইলেন। পাশ থেকে সীমা তাতানো স্বরে ঘর নিয়ে কিছু বলতে গেলে তৌসিফ রোষপূর্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল।
সিমার সামনে গিয়ে বলল,
“হায়রে চাচী,স্বার্থে যখন আঘাত লাগল,তখনই সাপের খোলসের ন্যায় রূপ বদলে ফেললেন। স্বাভাবিকভাবে বিষয়টাকে নিতে পারলেন না। অথচ আমার মা আপনাকে বোনের মতো জানতো। জন্ম,মৃত্যু, বিয়ে আল্লাহর হাতে। জোর করে হয়? মন বসে?”
সিমা থমথমে মুখে বসে আছে। তার সারামুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। মর্জিনা মুখে ঝামটি মেরে সিমার পক্ষ নিয়ে বলল,
“তুই যখন ঘর ধরছিলি,তখন আমরা কী অতশত বুঝছি? গত কাইল তোর চাচায় টেলিফোনে ঘরের সুবিধা অসুবিধা বুঝাইয়া কইল তোর চাচীরে। তোর দাদা,আমরা কেউই ইচ্ছা কইরা মানা করিনাই। জামাল এক কথায় বইলা দিছে তোরা ঘর এতবড় কইরা করলে তার দালানের সৌন্দর্য কইমা যাইবো।”
দাদীর মুখের কথা কেড়ে নিল তৌসিফ। আজ যেন তার ভিতরের সমস্ত কথাগুলো, অভিযোগগুলো ঠেলেঠুলে ভিতর হতে বেরিয়ে আসতে চায়। সে পাগলা কুকুকের মতো বিক্ষিপ্ত মেজাজে হড়বড় করে বলতে লাগল,
“যাদের মনে কোনো সৌন্দর্য নেই। তাদের ঘরের সৌন্দর্য থাকা মানায় না। আমাদের মনে সৌন্দর্য আছে,সততা আছে,নৈতিকতা আছে। সুতরাং আমাদের ঘর টিনের হলেও বড় হতে হবে। সুন্দর হতে হতে হবে। আমি অবাক হই দাদী, আমার বাবা,মায়ের প্রতি আপনাদের নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা দেখলে। আমার মা, বাবা, এই সংসারের জন্য কি না করছে? আমার বাবার টাকায় আপনার ছোট পুত্র ডিগ্রি পাশ সার্টিফিকেট হাতে পেয়েছে। সে আজ ভালো ব্যবসা করতেছে। আমার বাবার টাকায় আপনার একমাত্র মেয়েকে ভালো ঘরে পাত্রস্থ করতে পেরেছেন। আমার বাবার স্বল্প বেতনের উপার্জিত টাকায় সবাই তিনবেলা খেতে পেরেছেন। নিজের জন্য আমার বাবা পাঁচটি পয়সাও রাখেনি। হ্যাঁ আমি স্বীকার করছি, এসব পরিবারের বড় ছেলের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু পরিশেষে যখন অকাতরে সব বিলিয়ে দেওয়া সেই মানুষটি তার ন্যায্য পাওনাটুকু পায় না পরিবার থেকে,তখন বড় দুঃখ হয় দাদী।
তখন এমন কথাগুলো এসে যায়। আর আমার মায়ের কায়িক শ্রমের বিনিময়ে সবার পাতে টাইমলি বেলায় বেলায় খাবার উঠেছে। একইভাবে, চা থেকে শুরু করে নাস্তা,পিঠাপুলি সবকিছু। কিন্তু আমার মায়ের পাতে জুটেছে নামেমাত্র। তৈরি করতো সে। আর খেতেন আপনারা। আমি বহুদিন খেয়াল করেছি,মুরগী রান্না করলে আমার মায়ের প্লেটে কোনদিন একপিস মাংস উঠেনি। মুরগীর গলা,হাড় এসব উঠতো। ভাজা মাছ পেতো সবচেয়ে চিকন ছোট পিস। গরুর মাংশ রান্না করলে তিন পিস আলু, এক পিস মাংস,দুই পিস হাড়,এক চামচ ঝোল। এইই। এরপর আর চোখেই দেখত না আমার মা। খালি হাঁড়ি সকালে ধুয়ে ফেলতে হতো। এভাবে আমার মায়ের সংসার জীবনের ইতিকথা বলতে গেলে আস্ত ইতিহাস।”
মর্জিনা বলল,
“সংসারে বড় বউ আগে আসে। তাই তার খাটুনিও বেশি সবার চাইতে। এইসব এমন ঢোল পিটাইয়া কওনের মতন কথা না। লোকে শুনলেও হাসব।”
মুখ বাঁকিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে ব্যঙ্গ করে বলল মর্জিনা।
“আপনার কথায় যুক্তি আছে মানলাম। তাহলে পরে যেই দুজন বউ আসল ঘরে, তারা এমন খাটেনি কেন? তারা কী এই ঘরের বউ নয়? মেয়ে? না এটা তাদের নানার বাড়ি? একজনের স্বামী রিয়াল পাঠায় বলে সেই ভাবসাব নিয়ে থাকে। আরেকজনের স্বামী ব্যবসা করে বলে তার ঠাটবাট। আর আমার বাবা বেকার বলে সেই অজুহাতে আমার মায়েরই খাটতে হবে? আগে খেটেছে বড় বউ বলে। বর্তমানে খাটছে সে বেকার স্বামীর স্ত্রী বলে? আমার মায়ের শরীরের হাড় যতটুকু ক্ষয় হয়েছে,সেই অনুপাতে বাকি দুই জনের হাড় কতটুকু ক্ষয় হয়েছে? বলতে পারবেন? ভোরে উঠে আমার মা দায়িত্ব নিয়ে যতগুলো কাজ করে, সেই একই দায়িত্ব কী এই দুজনের উপর বর্তায় না দাদী? কখনও কী তাদের বলেছেন? মায়ের হয়ে তাদের সাথে প্রতিবাদ করেছেন? তারা দুজন যত জায়গায় গিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছে,সেই হিসেবে আমার মা কোথায় গিয়েছে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে, বলেন? আমার মায়ের কী শখ আহ্লাদ বলে কিছু নাই? না-কি আমার মায়ের শুরু থেকেই এই বয়স ছিল? কিশোরীর বয়স,তরুনীর বয়স,যুবতীর বয়স তার ছিলইনা?
আপনারা সবাই তো ধরে নিয়েছেন আমি বিয়ে করব বলে ভিন্ন হতে চেয়েছি। আমার মা,বাবাও এমনটাই ভেবেছে জানি। কিন্তু নাহ দাদী। আল্লার কসম করে বলছি,ভিন্ন হওয়া,নতুন ঘর করা এই সবই একমাত্র আমার মায়ের জন্য। আমি কাছ থেকে আমার মায়ের নিদারুণ জীবন দেখেছি। পরিবার থেকে ছোট ছোট অবহেলা,উপেক্ষা,অমানবিকতা,
অনাদারগুলো আমি পর্যবেক্ষণ করেছি দীর্ঘদিন ধরে। যার ফলাফল আজকের ভিন্ন হওয়া। আমার মা,বাবার ত্যাগের প্রতিদান তো দিলেনই না আপনারা স্বামী, স্ত্রী। উল্টো অন্যায়ভাবে মেজো ছেলের সাফাই গাইতে আসছেন। আপনারা বড় সুবিধাবাদী দাদী! বড় হারামী!”
হেঁড়ে গলায় কথাগুলো বলে তপ্ত শ্বাস ছাড়ল তৌসিফ। তার ধারালো কথার তোড়ে ভেসে গেল পরিবারের বাকি সবাই। সলিমুল্লা গলায় যথাসম্ভব কাঠিন্যতা ঢেলে বললেন,
“খোঁটা তো সবই দিয়া দিলি। কিছুই বাকি রাখলি না। আইজ থেইকা,এখন থেইকা তোর মায়ের হাতের রান্না আমরা কেউই খামু না। তার আর কোন কাজ করতে হইব না। যা।”
“এখন তো বলবেনই। এখন তো আমার মা,বাবা দুজনেরই সব শেষ। কম তো পাননাই তাদের থেকে। আমার মায়ের উপর দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিলেন,দুই ছেলেরে বিয়ে করালেন। তখন কী খাটুনিই না আমার মা খেটেছে। এবং তাদের বিয়ে উপলক্ষে পরবর্তী সময়গুলোতেও। আপনাদের আজকের আচরণে আমি খুবই মর্মাহত হলাম।”
সুফিয়া বিবি অচেনার মতো শ্লেষ মাখা স্বরে বলল,
“তোর মা,বাপে কিছু না কইলে কী হইবো। তুই তাগো হইয়া যা কইলি আইজ,যেই সকল খোঁটা দিলি চাচীগোরেও,এমনিতেই আমাগো
সকলের মন ভইরা গ্যাছে। তোর মার আরো কোনো কামের দরকার নাই। যা,তুই নয়া ঘর বাইন্ধা তোর মায়েরে পালংকে তুইলা আরাম দিস। বান্দী রাইখা মারে খাওয়াইস।”
“হ্যাঁ। তাতো অবশ্যই। আমি এর আগেও মাকে বলছি ঘরে যেন কোনো কাজ না করে। তবুও আমার ভালো মা,দয়ালু মা সবই করেছে। তবে আজকের পর থেকে আর নয়। ঘরের অতিরিক্ত একটি সুতা সরানোর কাজও আমার মা করতে পারবে না। এটাই আমার লাস্ট এন্ড ফাইনাল কথা মায়ের জন্য।”
বাজখাঁই কণ্ঠে বলল তৌসিফ।
“ঘরে কাজ না করতে পারলে এই ঘরে থাকতেও পারব না। তাদের সব বাইর কইরা দেওয়া হোক ঘর থেইকা।”
তৌসিফ ঘাড় ঘুরিয়ে কথাগুলো বলা ব্যক্তিটির দিকে চাইল। তিন পা এগিয়ে গিয়ে তার গলা টিপে ধরল। ক্রুর হেসে বলল,
চলবে..১৬
বইটই ডাওনলোড করা না থাকলে নিচের লিংকে কাজ হবে না। ই-বুকগুলোর ফ্রি পাতাটুকু পড়ে নিবেন আগে।
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১০
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১