পদ্মপ্রিয়া
#পর্ব_১৯
#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা
পরিবেশ টা কোলাহল মুক্ত, পুরোপুরি বলা চলে না। বাইরে থেকে গাড়ির হর্ন ক্রমাগত ভেসে আসছে। উষ্ণতা অনুভব করছে সবাই। গরম কাটিয়ে বর্ষাকাল আসতে চাইছে কিন্তু পারছে না। আকাশে মেঘের আভাস দেখা দিলে গরম বাড়ে। সবাই কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। এই যে ড্রয়িং রুমের ফ্যান ঘুরছে দ্রুত গতিতে। অথচ আজমাঈনের পরনের শার্টটা ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে সমান তালে। নিজের প্রতি খেয়াল নেই ওর। ভীষণ নার্ভাস থাকলে এত কিছু খেয়াল থাকে না। আজ সে পালিয়ে এসেছে, একদম বাঘের মুখ থেকে। ওর মা তাহমিনা আজ মেয়ে দেখতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তবে আইশা এসে খবর দিলো মেয়েকে একেবারে আংটি পরিয়ে দিয়ে আসবে। একথা শুনে আজমল শিকদারও ক্ষেপলো। ওনার ধারনা তাহমিনার সাথে বিয়ে হয়ে লাইফটা রসাতলে গেছে। তাহমিনা ওনার মতো মিতব্যয়ী নন। তার বান্ধবীর মেয়েও তাই হবে নিশ্চয়ই, তারপর দু’জনে মিলে টাকা পয়সা উড়াবে। ভাবতেই মাথাটা কেমন ঝিম ধরে আসছে। তাই ছেলেকে সাথে নিয়েই পালিয়ে এসেছেন। আজমাঈন এই সুযোগটাই লুফে নিলো। রাশেদ সাহেব ওকে দেখা করতে বলেছে, বাবাকে নিয়ে গেলে মন্দ হয়না। তার উপর সারাটা রাস্তা নূরের গুণগান গাইতে গাইতে এসেছে। মেয়েটা পর্দাশীল, ব্যবসায়ী এবং হিসাবি। তাছাড়া বোনদের মতো এতো স্ক্রিন কেয়ারের প্রোডাক্ট কিনে টাকা অপচয় করে না। অনলাইন থেকে গাদা গাদা অর্ডার করে না। শান্তশিষ্ট ভদ্র মেয়ে নূর, যদিও আজমল শিকদার নূরকে কম সময়ের জন্য দেখেছে। ছেলের কথায় খুশিতে গদগদ হয়ে গেছেন আজমল শিকদার, মুখে না বললেও মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ওদিকে বাপকে ধাপ্পা দিতে পেরে আজমাঈনের ও খুব ভালো লাগছে। ব্যাটাকে পটাতে সময় লাগে না।
এমন ভাবে ব্রেইন ওয়াশ করেছে যে, রাশেদ সাহেবের মন গলাতে যা খুশি তাই বলতে পারেন।
এই যে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে রাশেদ সাহেবের শরীরের খবর নিচ্ছেন। কি সুন্দর ভাবে গুছিয়ে কথা বলছেন। বড় ভালো লাগছে আজমাঈনের। কিন্তু তবুও বুকের ভেতরটা ধড়াম ধড়াম করছে। পাশের সোফায় ফয়েজ বসে কান চুলকাচ্ছে। সাহারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বসে আছে। দাদুর ভাবগতিক বুঝতে অক্ষম সে।
ফয়েজ আজমাঈনের দিকে একটিবারও তাকায়নি। এজন্য মেজাজ খারাপ হচ্ছে আজমাঈনের। কোথায় একটু শান্তনা দিবে তা না করে হেবলার মতো বসে আছে। অসভ্য ছেলে।
আজমল শিকদার বলেন,’আমাদের বাড়ির ইন্টেরিয়র ডিজাইন গুলো খুবই সুন্দর হয়েছে। আপনাকে যেতে বলেছিলাম, সেবার ঢাকায় গিয়েও গেলেন না। এবার কিন্তু আর না শুনব না। সময় করে চলে আসবেন। আপনাদের বাড়ির সবকিছু দেখলাম। এবার আমার বাড়িতে আসুন।’
রাশেদ সাহেব হেসে বলেন,’অবশ্যই একদিন যাব, তবে আজ সে কারণে এসেছেন সেগুলো শেষ করে নিই?’
আজমল সাহেব নড়েচড়ে বসেন,’তা বৈকি!! আপনি আপনার ইচ্ছা বলুন।’
রাশেদ সাহেব এবার সরাসরি আজমাঈনকে প্রশ্ন করলো,’তুমি নামাজ পড়ো? পাঁচ ওয়াক্ত?’ মাথা নিচু থাকলেও আজমাঈন একথা শুনে মাথা তোলে। তবে জবাব দিতে পারে না। রাশেদ সাহেব আবারও বলেন, ‘কোরআন পড়তে পারো? নামাজ পড়তে জানো? সকল মুসলিমদের নামাজ পড়া ও কোরআন পড়া বাধ্যতামূলক। বাকি সবকিছু নাহয় সাইডে রাখলাম। তুমি কি তা করো?’
আজমাঈন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। মাথা নিচু করে বলে,’আমি নামাজ পড়তে পারি না আঙ্কেল, জামাতের সাথে জুমার নামাজ পড়ি এটুকুই। কোরআন পড়া ভুলে গেছি, যদিও অল্প শিখেছিলাম। সব সূরাও ঠিকঠাক মনে নেই।’
রাশেদ সাহেব মোটেও অপমানজনক কথাবার্তায় গেলেন না। তিনি সোজাসুজি বলেন,’আমার মেয়ের সকাল শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে, সে ফজরের নামাজ আদায় করে কোরআন তেলাওয়াত করে। দোয়া দূরুদ পাঠ করে, সে পর্দা শীল। জ্ঞান হওয়ার পর কোন নন মাহরাম পুরুষ কে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের চেহারা দেখায়নি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে সে। ধর্মীয় জ্ঞান তোমার চেয়ে দশগুণ বেশি তার। এবার তুমি বলো আমার জায়গায় থাকলে কি করতে? আমি মোটেও তোমাকে খারাপ বলছি না। শুধু একটা প্রশ্ন করেছি মাত্র।’
ভীষণ কঠিন প্রশ্ন, এর উত্তর সহজ নয়। তবে গত মাসখানেক ধরে যে ভীত চোখের চাহনি তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না একথা রাশেদ সাহেব কে কি করে বলবে সে। সাধারণ মেয়েদের কাজল দেওয়া চোখ সুন্দর লাগে। তবে মেয়েদের বৃষ্টি ভেজা চোখের পাপড়ি এবং চোখের চারদিকে বিন্দু বিন্দু পানি জমে থাকলে তার চেয়েও বেশি সুন্দর লাগে। যা আজমাঈনের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। দ্বিতীয়বার চোখজোড়া দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে আজমাঈন। এর জন্য ও সবকিছু করতে পারবে।
‘আ’ম উইলিং টু ডু এনিথিং! আপনি যা বলবেন।’
এ কথায় ফয়েজ চমকে উঠলো। চেয়ে দেখলো রাশেদ সাহেব এবং আজমল শিকদার ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আজমাঈন যে এমন একটা কথা বলবে তারা ভাবেনি। তাদের বিষ্ময় কাটতে সময় লাগছে। তবে সাহারা মৃদু হেসে ফয়েজ কে খোঁচা দিলো,’দেখছেন কি বললো? আপনার বন্ধু আর আপনার মধ্যে কত তফাত? আসছে আই লাভ ইউর ওজন করতে। আপনার ভালোবাসা মানে এক গাদা ছাই। মাছ কাটতে ভালো কাজে লাগবে।’
দ্বিতীয়বার বিষ্মিত হলো ফয়েজ, মেয়েটা এমন চেটাং চেটাং কথা বলে কেন? মুখে মধু নেই খই ফোটে। আজ বাড়ি গিয়ে এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।
আজমাঈন নিজেই কেমন অবাক হয়ে গেল এমন কথায়। এত বড় একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেললো! অবিশ্বাস্য, এখন যদি পূরণ না করতে পারে তাহলে? ঘামের পরিমাণ বাড়ছে যেন ওর। আজমল শিকদার ছেলের সাপোর্ট টেনে বলেন,’আমার ছেলে কখনো ফাঁকা বুলি আওড়ায় না। ও যখন বলেছেন তখন করেই ছাড়বে।’ কন্ঠে কেমন আত্মবিশ্বাস তার। এবার কিছুটা শিথিল গলায় বলেন,’এখানে আমার ছেলের কোন ভুল নেই ভাই সাহেব। আমাদের ই দোষ। আমারা মা বাবারা আছি যারা ছেলে মেয়েদের ঠিকমতো ধর্মীয় শিক্ষা দেই না। ছোট বেলা থেকেই ওদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া উচিৎ ছিলো। অন্তত নামাজ ও কোরআন পড়া। এজন্য আমার ছেলেকে দোষ দিবেন না। সব দোষ আমি বাবা হয়ে মাথা পেতে নিচ্ছি। আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই গড়ে উঠবে আমার ছেলে, দরকার পড়লে কাল থেকেই টিচার রেখে দিব। ও আপনার মেয়ের যোগ্য হয়েই আসবে। আমি ততদিনের জন্য সময় চেয়ে নিচ্ছি। দয়া করে এটুকু সময় দিন।’
রাশেদ সাহেব বিপাকে পড়লেন, এখন কি জবাব দিবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ভেবেছিলেন এসব বললে বাবা ছেলে দমে যাবেন। কিন্তু একি হচ্ছে! দু’জনেই দুদিক থেকে নতুন চারা গাছের ন্যায় গজিয়ে উঠছে। ছেলে হিসাবে আজমাঈন খারাপ নয়, একদিক থেকে পিছিয়ে শুধু। নূরকে তিনি কথা দিয়েছেন যোগ্য পাত্রের হাতেই ওকে তুলে দিবেন। এখন দুকুলে ঠাই পাচ্ছেন না।
এই প্রথম কেউ তাকে নাজেহাল করে দিলো তা এরা বাপ ছেলে মিলে। তিনি অত্যন্ত শক্ত গলায় বলেন,’বড় কঠিন চ্যালেঞ্জ নিচ্ছো, পারবে তো?’
আজমাঈন কনফিডেন্স নিয়ে বলে,’এটা কোন কঠিন চ্যালেঞ্জ নয়। আসলে আমরা সহজ কাজকে কখনোই গুরুত্ব দেই না। ধর্মীয় রিতি নীতি অনুসরণ করা কঠিন কাজ নয়। সহজ কাজ বলেই তা আমরা হেলা ফেলা করি। আপনাদের সাথে পরিচয় হওয়ার পর আমি আমার ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছি। এজন্য আপনাকে আর আপনার মেয়েকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
ছেলেটার দৃঢ় বিশ্বাস দেখে মুগ্ধ হলেন রাশেদ সাহেব। ভাবলেন যদি নূরের সাথে আজমাঈনের বিয়ে হয় তাহলে নূরকে বুঝবে। নূরের ভেতরে যে ভয় ভীতি কাজ করে তা একমাত্র আজমাঈন বুঝি দূর করতে পারবে। আবার ভুল মনে হয়, যদি আজমাঈন বদলে যায়? বিয়ে হওয়ার পর তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়! এসব বিষয় ও ভাবতে হবে। রাশেদ সাহেব বলেন,’আমাকে ভাবতে একটু সময় দাও, আমি ভাবিনি তুমি এমন কিছু বলবে। যেহেতু আমার মেয়ের বিষয়ের কথা, ভাবতে তো হবেই।’
আজমল শিকদার বলে উঠলেন,’অবশ্যই অবশ্যই। আপনার আদরের মেয়ে, যত সময় লাগে ভাবুন। তবে আবার বলছি ভাই সাহেব, আমার ছেলে কথা দিয়ে কথা রাখে। এইযে কথা দিলো, নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সে কথা রাখবে।’
ফয়েজের মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে। বাপ ছেলেকে বোঝা দায়, হুট হাট করে সবাইকে কেমন তাক লাগিয়ে দেয়। তবে আজ যা দিলো তা দেখার মতো ছিলো।
—————
বিমর্ষ হয়ে ক্লাসে বসে আছে নূর, বেঞ্চের এক কোণে গুটিসুটি মেরে চুপচাপ বসে আছে। তবে ক্লাসের মেয়েরা সবাই মাঠে বসে গল্প করছে। টিফিন পিরিয়ড চলছে, খাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই ওর। মনের ভেতর হাজার চিন্তা ভাবনা। তার চিন্তার সবটা জুড়ে আজমাঈন শিকদার বিরাজমান। ছেলেটাকে দেখলেই ওর কেমন হাঁসফাঁস লাগে, অস্থির লাগে সবকিছু। বিষয়টা এতোটাই তীব্র হয়েছে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর। অনুভবের কথা শুনে নূর সেদিন বাবার কাছে যাচ্ছিল। তবে পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিলেন রেহানা বেগম। তিনি সন্দেহ বাতিক মহিলা। মেয়েকে সবসময় সন্দেহের তালিকায় রাখেন। দোষ অন্যের হলেও মেয়ের উপর দায়ভার চাপিয়ে দেন।
আগে গাঁয়ে হাত তুলতেন কম বেশি, এখন তা কমে এসেছে। নূর নিজেই নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নিয়েছে। রেহানা বেগম জিজ্ঞেস করেছিলেন,’তোমার সাথে ওই ছেলেটার কি কোন সম্পর্ক আছে?’
মাথা নেড়ে না বোঝায় নূর। তিনি আবার বলেন,’এত দিন ওর হোটেলের কাজ করে এলে তখন তো এমন কিছু হতেই পারে তাই না? সত্যি বলো, তাহলে সবাই সব মেনে নিবে। শুধু তোমার ভাবিকে কিছু বলার দরকার নেই। এমনিতেই তোমার জন্য ও আমাকে অনেক কথা শোনায়। এসব যদি সত্যি হয় তাহলে গোপন রাখাই শ্রেয়।’
‘তুমি আমায় বিশ্বাস করো না আম্মু?’ একটি কথাতেই আটকে গেলেন রেহানা। মেয়েকে বিশ্বাস করেন একথা নিজে মানলেও সামনাসামনি অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন না। তিনি বলেন,’ছেলেটা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, তোমার বাবা ভাবছেন। হয়তো না করে দিবেন। তবে আমার মনে হয়না ছেলেটা খারাপ। দেখি তোমার বাবাকে বুঝিয়ে। ভালো হলে তো বিয়ে দেওয়াই যায়।’
নূর হতভম্ব মায়ের কথা শুনে। তবে মুখে কিছু বলেনি।
এসব কথা শোনার পর বাবার কাছে যাওয়ার সাহস হলোনা নূরের। তবে মায়ের মনের কথা ধরতেও পারেনি। রেহানা ভেবেছেন যে নূর যদি বিয়ে করে ঢাকায় চলে যায় তাহলে এখানে আসা যাওয়া করে ব্যবসা করতে পারবে না। ব্যবসা নূরের নামে হয়েছে তো কি হয়েছে? সাইমন সামলাবে, এতে তো সমস্যা হবে না। ছেলের এমন ভরাডুবি তিনি সহ্য করতে পারছেন না। ইতিমধ্যে বাপের বাড়ি থেকে কিছু টাকা কর্জ এনে ছেলেকে দিয়েছেন লোন শোধ করতে যা রাশেদ সাহেব জানেন না। এখন ছেলেটা পথে আসলেই হলো।
নূরের খুব অসহায় লাগছে নিজেকে। কোন বন্ধু নেই ওর, তাই মনের কথা শেয়ার করতে পারে না। একটি মেয়ে এসে ক্লাসে উঁকি দিয়ে বলে উঠলো,’রেহনুমা! তোমাকে উস্তাজা ডাকছেন।’
নূরের ক্লাস টিচার ডাকছে, তাকে সকলে উস্তাজা বলে ডাকে। আর বাকি ম্যাডামদের আপা বা আন্টি বলে ডাকে। নূর উঠে দাঁড়ায়, নেকাব নামিয়ে গুটি গুটি পায়ে ক্লাস টিচারের কক্ষে এগিয়ে যায়। উস্তাজার বয়স পঁয়তাল্লিশ ছাড়িয়েছে। তিনি চমৎকার মহিলা, তার পড়ানোর ধরন খুবই ভালো লাগে। কি সুন্দর করে বুঝায়। নূর কক্ষের দরজা হালকা ফাঁকা করে বলে,’উস্তাজা আসব?’
কালো বোরকা এবং নেকাব পরা উস্তাজা মাথা তুলে বলেন,’কমন রুমে বসো, একটু পর ডেকে পাঠাব।’
চোখ নামিয়ে চলে গেল নূর। রাশেদ সাহেব কে খেয়াল করেনি সে। এতোটাই অন্যমনস্ক ছিলো। উস্তাজা বলেন,’দেখছেন? আপনার মেয়ে ঠিক কতটা উদাসীন? কখনো আমাদের কারো দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। চোখটা নিচু থাকে সবসময়। আমরা তো বাইরের পুরুষ মানুষ নই।’
নূরের এমন হাবভাব কখনোই খেয়াল করেনি রাশেদ সাহেব। একজন বাবা কখনোই মেয়ের এমন দিক পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। রাশেদ সাহেব চিন্তিত মুখে বলেন,’এর উপায়? আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।’
উস্তাজা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা শুরু করলেন,’আমরা ইসলাম মেনে চলি, খুব সম্মান করি। আমরা মানি যে মেয়েরা বিয়ের জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই তাদের বিয়ে দেওয়া উচিৎ। কিন্তু আজকাল ধার্মিক ছেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নামধারী ধার্মিক অনেক পাবেন, তারাও মাদ্রাসায় পড়েছে। ডিগ্রী অর্জন করেছে কিন্তু মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। মানুষ চেনা বড় কঠিন। সেখানে একটা ছেলে যদি আপনার মেয়ের উসিলায় নিজেকে পরিবর্তন করে, ধর্মের পথে ফিরে আসে তাহলে এটা বিরাট ব্যাপার। আমি অবশ্যই ছেলেটার পক্ষ নিব। এভাবে ক’জন পরিবর্তন হয় বলুন? অনেক ধার্মিক ছেলেরা বউকে অত্যাচার করে, কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। স্ত্রীর হক পূরণ করে না। তার ব্যক্তি স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এতকিছুর ভিড়ে যদি এমন ভালো ছেলে পান তাহলে আমার মতে হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। ছেলেটার ব্যাখ্যা যতটুকু দিয়েছেন আমার মনে হচ্ছে সে অত্যন্ত দায়িত্ববান ছেলে। সে যদি নিজেকে পরিবর্তন করে তাহলে আপনার রাজি হয়ে যাওয়া উচিৎ।’
রাশেদ সাহেব গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলেন, ভাবলেন। উস্তাজার কথাগুলোতে ভুল কিছু দেখছেন না। গতকাল সারারাত ভেবেছেন তিনি। পরে এই বিষয়ে উস্তাজার সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি হয়তো ভালো সমাধান দিতে পারবেন। এজন্যই এখানে আসা। উস্তাজা আবারো বলেন,’কিন্তু এখানে আরো সমস্যা আছে।’
রাশেদ সাহেব কৌতুহল চোখে তাকান। উস্তাজা বলেন,’আপনার মেয়ের সমস্যা খুবই জটিল। ক্লাসের কোন মেয়ের সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই। পড়াশোনার বিষয়ে টুকটাক কথা ব্যতীত চুপচাপ বসে থাকে। ওকে ক্লাসের সবাই ঠিকঠাক চিনেও না। তার উপর আপনি বলছেন ওকে একাই মানুষ করেছেন। এখানেই প্রধান সমস্যা। একটা মেয়ের বয়সের সাথে সাথে মানসিক বিকাশ ঘটে। তবে এমনি এমনি নয়, তাকে বুঝিয়ে দিতে হয় সবকিছু। রেহনুমা তো সেসব কিছুই জানে না। আমরা তো ক্লাসে স্বামী সংসার নিয়ে আলোচনা করি না। এসব তো মায়েদের থেকে শেখে মেয়েরা। আপনার মেয়ের মধ্যে তেমন কিছু দেখি নি। আপনি ব্যতীত বোধহয় অন্য পুরুষ কে দেখলে আতঙ্কে থাকে সে। দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করে খুব। এই বিষয়ে ওকে না বোঝালে পরে দেখা যাবে স্বামীর বাড়িতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে। তখন সবার সামনে বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।’
নূরের সম্পর্কে এতসব শুনে সত্যিই হতাশ হলেন রাশেদ সাহেব। তিনি মেয়ের শখ আহ্লাদ পূরণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এসব ব্যাপারে বাবা হয়ে কিভাবে বোঝাবেন মেয়েকে? রেহানা তো আরো পারবেন না। মেয়ের সাথে ওনার দূরত্ব অনেক। শেষে রইল নূরের জীবনসঙ্গী। যে নূরের স্বামী হবে তাকেই মানিয়ে গুছিয়ে এবং বুঝিয়ে নিতে হবে। তবে এতসব স্যাক্রিফাইস কে করবে? ভরসা পাচ্ছেন না তিনি। তবে একবার আজমাঈনকে বলে দেখতে পারেন। যেহেতু ছেলেটা ওনার সকল শর্ত মেনে নিতে চেয়েছে তাহলে শেষ শর্তটা দেওয়াই যায়। যদি মানে তাহলে ভালো আর না মানলে নাই।
মেয়ের বাপ হয়েছেন, জামাই খুঁজতে এতটুকু কষ্ট তো করাই লাগবে। ফোন হাতে নিয়ে আজমাঈনকে কল করতে করতে বেরিয়ে গেলেন। তখন উস্তাজা নূরকে ভেতরে ডাকলেন। তিনি ঠিক করেছেন মেয়েটাকে এই বিষয়ে কিছু বোঝাবেন। যদিও নূর বুঝবে আশা রাখেননি, তবুও চেষ্টা করতে ক্ষতি কি!
চলবে,,,,,
রিচেক দেইনি, বানান ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন সবাই।
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৭