#পদ্মপ্রিয়া
#পর্ব_১৬
#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা
এক, দুই, তিন….. টানা দশ সেকেন্ড কাটলো। আজমাঈনের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া নূরের ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদা ওড়না দুই প্যাঁচ দেওয়া মাথার উপরে। ভিজে গেলেও চুলগুলো দৃশ্যমান হলো না রাতে সামান্য আলোতে। এই দশ সেকেন্ড কে এক যুগ মনে হলো আজমাঈনের, সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে তখনো। ভেজা চোখের চাহনি প্রথমে স্বাভাবিক হলেও পরবর্তীতে তা আতঙ্কে রূপ নেয়। ঠোঁট জোড়া কেঁপে উঠলো তৎক্ষণাৎ। তবে নূরের অবস্থান পরিবর্তন হলো। সে দৌড়ে চলে গেল। মেয়েটা চলে যেতেই আজমাঈনের হুঁশ ফিরলো। মেয়েটা কে? নূর! এই পরিবারের সদস্য ব্যতীত আজ আর কেউ নেই বাড়িতে। তাহলে এই মেয়েটা নূর!! দুই আঙ্গুলের মাঝে আঁটকে থাকা সিগারেট পড়ে গেল। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাতে চুলগুলো খামচে ধরলো আজমাঈন। এ কোন অনর্থ ঘটে গেল! মেয়েটা পর্দা করে, অথচ আজ আজমাঈন তাকে দেখে নিলো! এই অপরাধের ক্ষমা কি নূর করতে পারবে? নূরের কথা বাদ, আজমাঈন নিজেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। মেঘের গর্জন, বৃষ্টির শব্দ মুহূর্তেই যেন মিইয়ে গেল। আজমাঈনের কানে কোন শব্দ আসছে না। পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে এমন মনে হচ্ছে। আজমাঈনের খুব খারাপ লাগছে।
ব্যথিত হয়ে সে দ্রুত রুমে ফিরে এলো। দরজা আটকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। খাটের উপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করতেই ঘোরের মাঝে পড়লো সে। নূরের চোখজোড়া দেখেছে, অতটুকু সময়ে দেখেছে। মুখটা এক ঝলক দেখেছে কিন্তু চোখের দিকে বাকি সময়টুকু তাকিয়েছে। শ্বাস আটকে আসছে আজমাঈনের। এ কথা যদি নূর রাশেদ সাহেব কে জানায় তখন তিনি কি ভাববেন? নিশ্চয়ই আজমাঈনকে খারাপ ছেলে হিসেবে আখ্যায়িত করবেন। নূর হয়তো আরো বেশি খারাপ ভাববে।
নিজের মনের এই ভাবনাগুলো আজমাঈনকে ভঙ্গুর করে তুললো। অযাচিত ঘটনা কে কেন্দ্র করে কোন ঝড় বয়ে আসে কে জনে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। চোখ বন্ধ করলেই নূরের চোখ ভেসে উঠছে। এ বাড়িতে আর কিছুক্ষণ থাকলে ও বুঝি পাগল হয়ে যাবে। গাড়ির চাবি আর ফোন হাতে তুলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। রাশেদ সাহেব জানালার ধারে বসে বই পড়ছিলেন, ঝুম বৃষ্টির সময়ে তার বই পড়তে বড়ই ভালো লাগে। আজমাঈনের গাড়িটি যখন শব্দ তুলে বেরিয়ে গেল, তিনি ভাবুক চোখে তাকিয়ে দেখলেন। ছেলেটা এলো কতক্ষন, এখন আবার কোথায় যাচ্ছে?
রাত্রি এগারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট, প্রাণপণে ড্রাইভ করছে আজমাঈন। রাস্তায় পানি উঠে যাওয়ার কারণে গাড়ি এগোচ্ছে না তেমন। তবুও সে যতটা সম্ভব দ্রুত ড্রাইভ করার চেষ্টা করছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে বের হতে হবে ওকে, এই শহরের বিষাক্ত ধোঁয়া নিতে পারছে না। তবে ভাগ্য খারাপ আজ, কিছুদূর যাওয়ার পরেই গাড়ি থেমে গেল। বারবার চাবি ঘুরিয়েও স্টার্ট করতে পারছে না আজমাঈন। অগত্যা হাল ছেড়ে স্টেয়ারিং এ মাথা ঠেকায়। ওয়াইপার সমান তালে গাড়ির সামনের কাচ মুছে যাচ্ছিল এতক্ষণ, সেটা থেমে গেছে এবার। রাস্তায় কোন গাড়ি নেই, শুধু বৃষ্টির শব্দ ভেসে আসছে। আজমাঈন চোখ বন্ধ করলো, চেষ্টা করলো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা ভুলে যাওয়ার।
কিন্তু তার পরিবর্তে সেই ভেজা ভীত সন্ত্রস্ত চোখজোড়া ভেসে উঠলো। আজমাঈন কে দেখে কেমন আঁতকে উঠেছিল। নিজের চেহারা ঢাকতে দ্রুত প্রস্থান করেছিল নূর।
——–
বাইরে প্রচন্ড জোরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, গর্জনে কেঁপে উঠছে ধরনি। ঠিক তেমনি ভাবে নূরের হৃৎপিণ্ড কাঁপছে। একজোড়া তীক্ষ্ণ চাহনি তাকে ভস্ম করে দিয়েছে যেন। চোখের পানি পাল্লা দিয়েছে এই বর্ষনের সাথে, চেয়েও নূরকে তারা হারাতে পারছে না। রুমের দরজাটা বন্ধ। দরজায় হেলান দিয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে নূর। তার শরীর কান্না ও ঠান্ডার দমকে কাঁপছে। নিজেকে সামলে রাখার প্রচেষ্টা করছে তবুও পারছে না। বাম পাশে চোখ পড়তেই দেখলো আজমাঈন হাঁটু হালকা ভাঁজ করে বসা, কালো রঙের শার্ট প্যান্ট পরনে। ভেজা চুলগুলো দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। হাঁটুর উপর রাখা হাত বেয়ে পানি পড়ে মেঝে ভিজে যাচ্ছে। নূরের এই ভেজা শরীর তার উপর সাদা জামা। সে ভীত চোখে তাকায়, এই ছেলে তার জন্য নন মাহরাম। এই পাপ সে ঢাকবে কিভাবে? হঠাৎ করে খুব জোরে বাজ পড়লো, হয়তো আশেপাশে কোথাও পড়েছে। নূর সহসাই তড়িৎ গতিতে কেঁপে উঠলো। এদিক ওদিক ঘাড় ফিরিয়ে আজমাঈনকে খোঁজার চেষ্টা করলো।
চোখের ভ্রম, যাকে বলে হ্যালুসিনেশন। কল্পনার জগতে ভাসতে থাকা নূর এখন আজমাঈনকেও কল্পনা করছে। ভয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারবার। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে ও ক্ষমা চাইছে। হাঁটু মুড়ে জড়সড় হয়ে কাঁপছে। আজ রাতটা ওর জীবনের সবচাইতে দীর্ঘতম রাত। কিছুতেই সময় কাটছে না। নিজেকেও ক্রমাগত দোষ দিয়ে যাচ্ছে। কি দরকার ছিলো রাতের বেলা বৃষ্টি দেখতে যাওয়ার? তবে ঠিক বৃষ্টি নয়, পদ্মফুল গুলো ঢেউয়ের তালে দুলে ওঠে যখন, দেখতে বড়ই ভালো লাগে। এজন্যই গিয়েছিল। তবে ভুলবশত ফোনটা সাথে নেয়নি। বিদ্যুৎ চমকানোর ফলে যে আলো পৃথিবীতে প্রতিফলিত হয় তাতেই নূর মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। এরকম আরো অনেক বার করেছে সে। কিন্তু এই বার এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। আজমাঈনের আসার কথা নূর জানত। কিন্তু ছেলেটা যে এত রাতে ছাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে তা বোঝেনি। অন্যের বাড়িতে এসে এভাবে চলাফেরা করাটা কি উচিত হয়েছে তার? সে জানত যে বাড়িতে নূর আছে, তবুও তার এখানে আসাটা একদম উচিত হয়নি।
কাকে দোষ দিবে নূর? নিজেকে নাকি আজমাঈনকে। দোটানায় পড়েছে, নিজের ভাগ্যকেই দোষ দিবে কিভাবে? আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। তবে আজকের ঘটনায় নূরের ঠিক কতটা ভালো হবে তা সে জানে না।
ও শুধু কাঁদছে, শরীরে লেপ্টে থাকা ভেজা জামাকাপড় থেকে পানি ঝরে ফ্লোর ভিজে একাকার। নূর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। ভেজা পোশাক বদলে নেয়। ফ্লোর মুছে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়ায়। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চায়। রাতটা ওর পার হয় জায়নামাজের উপর শুয়ে থেকে।
পরের দিন কি হবে তা নূর জানে না। ওকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে তাও কেউ বলেনি। বাবা হয়ে মেয়েকে কি জানানো যায়? যতই মেয়ের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাক। এ বিষয়ে মেয়েদের সতর্ক করে তার মা। তবে রেহানার ভেতরে তেমন হেলদোল দেখা গেল না। সে কাজের লোকদের একটার পর একটা হুকুম করে চলেছেন। সকালের নাস্তার টেবিলে সকলে উপস্থিত, নূরের খাবার রুমে পাঠানো হয়েছে। রাশেদ সাহেব ফয়েজ কে বললেন,’কাল রাতে আজমাঈন ওভাবে চলে গেল কেন? বলেও গেলো না কিছু।’
ফয়েজ খানিকক্ষণ চুপ থাকে। কেননা সে নিজেও এই ব্যাপারে পুরোপুরি অবগত নয়। আজমাঈন শুধু জরুরি কাজ আছে এ কথাই বলে গেছে। অগত্যা সেটুকু কথাই তুলল সে,’আমাকে বললো জরুরী কাজ পড়েছে, সম্ভবত ওর বাবার অফিসে কিছু হয়েছে। আঙ্কেল তো আজমাঈন কে ছাড়া এক পা ও নড়তে পারে না।’
‘তাই বলে ওই বৃষ্টির রাতে? বলেও গেলো না, বিপদ আপদ হতে পারত।’
‘আপনি চিন্তা করবেন না দাদু, ও ঠিক আছে। আপনি হয়তো যেতে দিতেন না বা চিন্তা করতেন তাই বলে যায়নি। আমাকে বলেছে জানিয়ে দিতে।’
অনুপমার মুখটা গোমড়া করে রেখেছে। মেয়ে জামাই তার সাথে তেমন কথা বলে না। আসার পর সৌজন্যতার খাতিরে সালাম দিয়েছে শুধু। তার উপর তার বন্ধু, ওই ছেলেটাকেও সুবিধার মনে হয়না। এ বাড়িতে আসলে কেমন যেন করে, এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু খোঁজে। মনে সন্দেহের দানা বাঁধলেও প্রমাণ নেই। এসব বিষয়ে কথা বললে রাশেদ সাহেব রেগে যাবেন। তবুও ইনিয়ে বিনিয়ে বলেই ফেলে,’কি সাহস ছেলের দেখো, ওই রাতে কিভাবে গেল? রাস্তায় তো পানি জমে থাকে। তার উপর ফাঁকা রাস্তায় ডাকাতের দল ওত পেতে থাকে।’
সাহারা বললো,’বাজে চিন্তা করো না মা, উনি ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছে গেছেন। এখন এত কথা বলার দরকার নেই।’
সবাই খাচ্ছে, সাইমন উসখুস করছে। তার ব্যবসার অবস্থা ভয়াবহ। লোন শোধ করতে পারছে না, ব্যাংক দেখে নোটিশ এসেছে। এখন কি করবে বুঝতে পারছে না। ওদিকে বেঁচা কেনা ভালো হচ্ছে না। কিন্তু বোনের ব্যবসা রমরমা। যেখানে হাত দেয় সেখানেই সোনা ফলে। গুরুজনদের কথা না শুনলে যা হয় আরকি। মেয়ে জামাইয়ের সামনে কিছু বলতেও পারছে না। আলাদা করে বললে বাপ তার চিল্লাচিল্লি করবে নিশ্চিত। কেননা রাশেদ সাহেব কয়েক মাস আগেই তাকে বারণ করে দিয়েছেন, ছেলের ব্যবসায় আর একটি টাকাও তিনি খরচ করতে পারবেন না।
আজকাল গলা দিয়ে খাবার নামতে চায় না সাইমনের। হতাশ হয়ে চুপচাপ খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ে, বন্ধুদের থেকে ধার করে টাকা আনতে হবে।
নূরকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে কথাটা এ জানতে পারলো দুপুরে। সাহারাই কথাটা নূরের কানে তুললো। তবে মেয়েটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। চুপচাপ বসে থাকে। গতকাল রাত থেকে মনটা ভীষণ খারাপ। নূরকে এতটা মনমরা হতে দেখেনি সাহারা। ভাবলো পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে শুনে হয়তো মন ভালো নেই। এজন্য আর ঘাটালো না। বিকেল হতেই পাত্রপক্ষ এসে হাজির। তিনজন মহিলা এবং পাত্র স্বয়ং নিজেই এসেছে। ছেলে দেখতে মাশআল্লাহ, গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা, তবে আজমাঈন তা নয়। তবে তাকে ফর্সা বলা চলে।
ছেলে সাদা রঙের জুব্বা পরেছে। হাতে ঘড়ি, গালে লম্বা দাঁড়ি। গায়ে এত আতর মেখেছে যে পুরো ড্রয়িং রুম গন্ধে ম ম করছে। মনে হয় তিন চার রকমের আতর একসাথে মেখেছে। সাথের তিনজন মহিলা হলো মা, খালা এবং অনুপমার ভাবি। যেহেতু তিনি ঘটকালি করছেন তাই সাথে এসেছেন। তারা বসার সাথে সাথে টি টেবিল ভর্তি করে নাস্তা দেওয়া হলো। ফয়েজ এবং রাশেদ সাহেব পাশাপাশি বসেছেন। সবাই টুকটাক খাচ্ছে। ফয়েজ এক ধ্যানে ছেলেকে দেখছে, কোন খুঁত নেই ছেলের। তবে এত আতর মেখেছে যে মাথা ধরে গেছে। এ বিষয়ে হয়তো জ্ঞান নেই ছেলেটার। অনুপমা কাপড় দিয়ে নাক চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তারও মাথা ধরেছে।
রাশেদ সাহেব ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন,’কি নাম তোমার?’
ছেলের পরিবর্তে অনুপমার ভাবি জবাব দিলো, ‘আব্দুর রাজ্জাক।’ মাথা নাড়েন তিনি। তবে আবার বলেন,’পরিবারে কে কে আছে?’
এবারও জবাব টা ভাবি দিলেন,’তিন বোন দুই ভাই আর বাবা মা। বোনেরাও মাদ্রাসায় পড়ে খুব ভালো ছাত্রী।’
ফয়েজ বিরক্তবোধ করলো। জিজ্ঞেস করছে একজনকে আর উত্তর দিচ্ছেন আরেকজন। এবার ফয়েজ জিজ্ঞেস করলো,’আপনি পড়াশোনা কতদূর করেছেন?’
এবারও ভাবি জবাব দিতে চাইলে ফয়েজ বললো, ‘কিছু মনে করবেন না আন্টি, ছেলে কি বোবা?’
‘এমা তা না, বোবা হবে কেন?’ আমতা আমতা শুরু করলেন তিনি।
‘তাহলে ওনাকে জবাব দিতে দিন।’
এবার ছেলে মুখ খুললো,’জি আমি হাফেজ হওয়ার পর মওলানা পাশ করেছি, এখন মাদ্রাসায় চাকুরী করি।’
অনুপমার ভাবি বলেন,’এখন চাকুরী করছে, ওর বাবার ইচ্ছে আছে নিজের টাকায় মাদ্রাসা দিবেন। টাকা পয়সার অভাব নেই কোনো।’
ফয়েজ হেসে বললো,’আমরা তো টাকা পয়সা দেখব না, মেয়ে সুখি হবে কিনা সেটা দেখব।’
‘তা তো ঠিকই, আপনারা দেখুন। তবে কোন খুঁত পাবেন না বলে দিলাম।’ এরপর তিনি বলেন,’এবার যদি মেয়েকে দেখার অনুমতি দেন তো ভালো হয়। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি।’
রাশেদ সাহেব মাথা নাড়েন,’আচ্ছা, ও ঘরে আছে।’ সাহারার দিকে তাকিয়ে ইশারা দিতেই ও মহিলাদের নিয়ে নূরের রুমের দিকে এগোয়। ছেলে আগের ন্যায় বসে আছে। নূর অস্বস্তি নিয়ে রুমে বসে আছে। কালকের ঘটনা মাথা থেকে যাচ্ছে না আবার আজকে আরেক ঝামেলা। দুজন মহিলা কে নিয়ে সাহারাকে আসতে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলের মা এগিয়ে এসে চিবুক ধরে বলে,’বাহ, মেয়ে তো মাশআল্লাহ। যেমন নাম তেমন চেহারা। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
তবে ছেলের খালা আগ বাড়িয়ে এসে হাত ধরেন। উল্টেপাল্টে দেখেন। নূর বুঝতে পারে না মহিলা কেন এমন করছে তবে সাহারা বেশ বুঝতে পারে। যেভাবে হাত পা দেখছে মনে হচ্ছে জীবনে মেয়ে দেখে নি। সাহারা খোঁচা মেরে বলে,’এতো কি দেখছেন? ও কখনো ফর্সা হওয়ার ক্রিম মাখেনি। ওর কাছে ওযুর পানিই ফর্সা হওয়ার প্রাকৃতিক ক্রিম বুঝলেন। আপনার ছেলেকেও ওর কাছে আনলে কালো লাগবে।’
কথাটা খালার পছন্দ হলো না, তবে খালা সমাজ হয়তো একটু বেশি বোঝে। সে পাত্তা না দিয়ে বলে,’তা মা কাছে আসো একটু, তোমার চুলগুলো দেখি। ভয় পেয়ো না এখানে কোন ছেলে নেই। আমরা মহিলা ই তো।’
এবার সাহারার মাথা বিগড়ে গেল। ওকে দেখতে এসে কখনো এভাবে বলেনি কেউ। আজকালকার যুগে এখনও এমন হয় নাকি। ও বলে উঠলো,’বড় হওয়ার পর ওর চুল আমিও দেখিনি আন্টি। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি ওর চুল হাঁটু ছুঁয়েছে। আমার তো কোমড় পর্যন্ত, সে অনুযায়ী আন্দাজ করেই বলছি।’
‘আন্দাজে তো হবে না। আমরা একটু দেখি। দেখলে তো সমস্যা হবে না। ঘোমটা দেওয়া থাকলে চুল কতবড় তা তো বোঝা যাবে না।’
‘আপনার ছেলের মাথায় তো টুপি আছে আন্টি, টুপির নিচে আদৌও চুল আছে নাকি এত বড় টাক কিভাবে জানবো? তাও তো কেউ কিছু বললো না, দেখতেও চাইলো না। আজকাল এসব ম্যাটার করে না।’
ওনারা দুজনেই একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো। এই মেয়ে বহুত ত্যাড়া। এখানে আর বেশি কথা বলা যাবে না। তবে নূর যথেষ্ট ভদ্র মেয়ে, কেমন ভয়ে কাচুমাচু হয়ে রয়েছে। এই মেয়েই ছেলের জন্য নিবেন বলে ঠিক করলেন। বললেন,’আমরা তাহলে যাই, আমাদের ছেলে এসে একটু দেখে যাবে।’
দুজনে বেরিয়ে যেতেই নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে সাহারা। মহিলা দু’জনকে ওর ভালো লাগেনি। যদিও মেয়ে দেখা নরমাল ব্যাপার। তবুও ও চায় নূরের একজন শান্তশিষ্ট শ্বাশুড়ি হোক। ওর মা আর দাদির মতো না হোক। এই খালা তো সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। এজন্য সে নূরকে বললো,’শোন ছেলে আসবে তোকে দেখতে, তুই তো পর্দা করিস সামনে যাবি?’
নূর মাথা নিচু করে বলে,’এক্ষেত্রে জায়েজ আছে শুনেছি।’
‘কচু জানিস তুই, মেয়ে দেখা জায়েজ নেই। এখন ছেলে এসে যদি বলে চুল দেখাও দেখাবি তুই?’
আঁতকে উঠে নূর,’এসব বলবে?’
‘হ্যাঁ বলবে, হাত ধরতে চাইতেও পারে বলা যায় না। নন মাহরাম পুরুষ সে তোর জন্য। এখন ভেবে দেখ যাবি কিনা।’
সাহারা বেরিয়ে গেল। ওদিকে নূর ভয়ে জমে গেল। বিয়ে শাদির ব্যাপারে অনেক হাদিসের বই আছে। তবে সেগুলো কখনোই পড়েনি নূর। টিচাররা বেশিরভাগ আমল করা শেখাত, নামাজ আদায় করতে হয় কিভাবে হাদিসে নামাজ সম্পর্কে কি কি আছে এসব। যদিও ওসব বই গিফট পেতো তবে পড়তো না। বাকিরা পড়তো এবং হাসাহাসি করতো। বিশেষ করে বিয়ের হাদিস নিয়ে। ওদের কল্পনা যল্পনার শেষ নেই। নূর ক্লাসের পড়া ব্যতীত আর কিছুই পড়েনি। তবে আজ সাহারা কি বলে গেল! ভয়ে সিটিয়ে রইল নূর। গতরাতের ঘটনা আরেকবার মনে পড়ে গেল। আর কে পায় তাকে, ওখানে দাঁড়িয়েই কাঁদতে আরম্ভ করলো সে।
ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয়ে সাহারা মিটিমিটি হাসছে, যা ফয়েজের চোখ এড়ায় না। বউ তার কিছু মতলব এঁটেছে। এ ক’দিনে বউকে ভালো করে চেনা হয়ে গেছে ওর। এজন্য সাহারার নাড়ি নক্ষত্র চেনা হয়ে গেছে।
ছেলের সাথে রাশেদ সাহেব যাবেন। ফয়েজ নিজেও যাবে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে। পরিকল্পনা মাফিক ওনারা গেল। রাশেদ সাহেব আগে ভেতরে ঢুকলেন মেয়ের অনুমতি নেওয়ার জন্য। তবে ভেতরে গিয়ে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মেয়ে তার কেঁদে কুল হারিয়েছে। হেঁচকি উঠে গেছে। তড়িঘড়ি করে তিনি নূরকে আগলে ধরেন,’কি হয়েছে মা তোর? এভাবে কাঁদছিস কেন?’
নূর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে,’আমি কাউকে মুখ দেখাব না আব্বু, আমি কারো সামনে যাব না। যেতে বলো না আমাকে।’
রাশেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,’কি হয়েছে বলবি তো আগে। কেঁদে মুখটা কি করেছিস, আয়নায় দেখেছিস?’
নূর হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে বলে,’অতো কিছু দেখতে চাই না, আমি কারো সামনে যাব না ব্যস।’
রাশেদ সাহেব আর কিছু বলতে পারলেন না। অসহায় মুখে বেরিয়ে এসে বলেন,’আসলে ও খুব ভয় পাচ্ছে। আগে কখনো কোন ছেলেকে মুখ দেখায়নি তো।’
আব্দুর রাজ্জাকের মুখটা গোমড়া হয়ে এলো। তবে জোর জবরদস্তি তো করতে পারে না। তাই বলে, ‘আচ্ছা, সমস্যা নেই। উনি সময় নিয়ে নিজেকে ঠিক করুক। আজ থাক।’
ছেলের এমন সুন্দর আচরণে রাশেদ সাহেব মুগ্ধ হলেন। ছেলেটা আসলেই ভালো। তবে আরো খোঁজ খবর নিতে হবে। এক দেখায় তো ভালো তকমা দেওয়া যায় না। ওনারা চলে গেলেন, এবং তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে বলে গেলেন। ফয়েজ সাহারাকে রুমে গিয়ে চেপে ধরে,’কি করেছ তুমি?’
‘আমি আবার কি করলাম?’
‘আমাকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করো না, তোমার মতো অনেক স্টুডেন্ট সাইজ করেছি।’
‘আচ্ছা, তারা কি আমার মতোই ছিলো?’
ফয়েজ মাথা নাড়ে,’কথা ঘুরাবে না।’
সাহারা হেঁসে বলে,’জান্নাত টা বড্ড বোকা, আমি যা বলি তাই বিশ্বাস করে নেয়। ওই মহিলা দুটোকে আমার একদম ভালো লাগেনি। কিসব উদ্ভট কথাবার্তা বলছিল। হাত-পা দেখে আবার চুল দেখতে চায়। এজন্য ওকে একটু ভয় দেখালাম। অমনি কেঁদে কেটে অস্থির। ছেলের সামনেই গেল না।’
সাহারার হাসি থামে না। ফয়েজ হতাশার শ্বাস ফেলে। আচ্ছা পাজি মেয়ে। এটাকে ঠিক করতে বহুত কসরত করতে হবে। সাহারা বললো,’মামিকে খুব ভালো করেই চিনি আমি, উনি ভালো ছেলে আনবে তাও বিশ্বাস করতে হবে? এই বিয়ে হতেই দেব না। ছেলেটাকে অতি ভদ্র লাগছে, এতো ভালো ভালো নয়।’
একটু ভেবে বললো,’আমার মামাতো ভাই সৌদি থাকে, মামার জন্য বেশ কয়েক রকমের আতর পাঠায়। আর আমার মামা সবগুলো আতর একসাথে মিক্স করে গায়ে লাগায়। কি যে বিচ্ছিরি গন্ধ লাগে। এই ছেলেটার অবস্থা ও সেরকম। জান্নাতের আতরের গন্ধে মন জুড়িয়ে যায়। আর এই ছেলের গন্ধ পেলে বমি পায়।’
‘এত কিছু খেয়াল করে ফেলেছ? ইউ আর জিনিয়াস।’
সাহারা মুচকি হেসে বলে,’থ্যাঙ্ক ইউ!’
রাতের খাবার খাওয়া হলো না নূরের, টেবিলে পড়ে আছে প্লেট। উত্তেজনায় কাঁপছে শরীর। ম্যাকবুক হাতে নিয়েছিল কাজ করার জন্য, কিন্তু আজমাঈন শিকদারের কাজ করতে হবে। নামটা মনে পড়তেই ফেলে রাখলো। ফোনে ইয়াসিন সূরা চালু করে বসে রইল। যদি মনটা একটু ভালো হয়। কিন্তু তাও কেমন জানি লাগছে। নোটিফিকেশনের শব্দ আসছে, পরপর আসছেই। থামছে না, এজন্য ম্যাকবুক আবার হাতে নিলো। আজমাঈন শিকদারের আইডি থেকে কমপক্ষে ত্রিশটা মেইল এসেছে। সবগুলো একই মেসেজ। ওপেন করতেই লেখাগুলো ভেসে এলো।
“আপনার ফোন নাম্বার টা দেওয় যাবে? প্রমিস করছি কখনোই কারণ ছাড়া ফোন করব না। আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। প্লিজ, লেট মি এক্সপ্লেইন। আ’ম সরি। গতকালের ঘটনা নিয়ে কিছু বলব এছাড়া আর বিরক্ত করব না।”
নূর আদৌও ওর মেসেজ দেখবে কিনা এজন্য এতগুলো মেইল করেছে, যাতে নোটিফিকেশনের যন্ত্রণায় ওপেন করে। বাকরুদ্ধ হয়ে নূর কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইল। রিপ্লাই করতে পারলো না। তখনই অনুপমার কন্ঠস্বর ভেসে এলো। উচ্চস্বরে চিল্লাচিল্লি করছে। বেরিয়ে আসতেই দেখলো অনুভবকে সমান তালো গালিগালাজ করছে। বলছে, ‘এই দিন দেখার জন্য তোকে মানুষ করেছি? হারামজাদা, তোর চেয়ে তো রাস্তার ছেলেরাও ভালো। অন্তত মায়ের কথা শোনে। এই বয়সে তুই সিগারেট ধরেছিস! ছিঃ ছিঃ ছিঃ।’
অনুভব চেষ্টা করছে মা’কে থামানোর। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ছাদের দরজার পাশে পড়ে থাকা সিগারেটের অংশবিশেষ দেখে বুঝে নিয়েছে এটা তার ছেলের কাজ। কিন্তু নূর দেখেই বুঝে গেছে। গতকাল এই সিগারেট দেখছিল আজমাঈনের হাতে।
চলবে,,,,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১