নীভৃতেপ্রেমআমার_নীলাঞ্জনা
নাজনীননেছানাবিলা
পর্ব_১২
অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌❌❌❌
ইরফান বসে বসে অতীতের করা কর্ম কান্ডের কথা ভাবছে। যেই ভয়ংকর কাজ সে নিজের অতীতে করে এসেছিল। গোপন রহস্য সে জেনে ফেলেছিল।
অতীত __
ইরফান নিজের বাবার ঘরের সামনে দিয়ে আসছিল। এমন সময় বাবার ঘর থেকে তার চাচার কথা শুনে তার পা জোড়া থেমে গেল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না এইমাত্র সে যা শুনতো। ঘরের ভেতর বসে তার নিলয় চাচা নিজের দুই ভাইকে বলছিল__
মিনু তো আমাদেরই বোন। আর কত এই মান অভিমানের পালা জমিয়ে রাখবো? আমাদেরই উচিত মিনুর সাথে নিজ থেকে কথা বলা।
নিলয় মির্জার পাশে বসা ছিল আকাশ মির্জা। তিনি হতাশার এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বললেন_
আসলেই মিনু কে সেই কত বছর আগে দেখেছিলাম যখন নীলার জন্ম হয়েছিল তখন এসেছিল। সঙ্গে নিজের ছেলেটাকেও নিয়ে এসেছিল। ছেলেটা একদম মিনুর মত দেখতে হয়েছিল ।
কথাটি শুনে ইমরান মির্জার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে বলল__
দেখতে হবে না কাদের ভাগিনা? নাম টাও তো মা শা আল্লাহ,, মিহাল খান। খুব চুপচাপ এবং গম্ভীর টাইপের ছিল ছোটবেলা থেকেই ।এখন হয়তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। ছেলেটিকে যখন দেখেছিলাম তখনই আমার মাথায় একটি কথা এসেছিল।
এতোটুকু বলেই ইমরান মির্জা থেমে গেলেন। ইমরান মির্জা কি বলতে চাচ্ছেন তা শোনার জন্য তার দুই ভাই একটু নড়েচড়ে বসলো। ইরফান ও দরজার বাহিরে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে একদম দরজার কাছে চলে এলো যাতে সে সম্পূর্ণ কথা শুনতে পারে।
ইমরান মির্জা বলতে শুরু করলেন __
ছেলেটা কত সুন্দর নীলাকে তখন কোলে নিয়েছিল। প্যারিস থেকে এসেছিল তারা। ছোট্ট নীলা তো ছেলেটির উপর প্রস্রাব করে দিয়েছিল। অথচ ছেলেটি নীলা কে তবুও কোলে রেখেছিল। এবং খুব যত্ন সহকারে নীলার পরনের তোয়ালা পরিবর্তন করে অন্য একটি তোয়ালা পরিয়ে দিয়েছিল। তখন ছেলেটির বয়স আর কত হবে ১০ কি ১১। আর আমাদের ইরফানের বয়স ছিল ছয় কি সাত বছর। সে যখন নীলাকে করে নিয়েছিল তখন যেইনা তার উপর একটু প্রস্রাব করে দিয়েছিল সে সঙ্গে সঙ্গে নিলাকে বিছানার উপর রেখে দিয়েছিল। নীলা বেশ ব্যথা ও পেয়েছিল।একদম শিশু বাচ্চা ছিল ব্যথাও বড় কিছু হতে পারতো।আমার তো নীলার জন্য মিহাল কে পছন্দ । আমার অপদার্থ ছেলেকে আমার একদম পছন্দ না নীলার জন্য। কিন্তু আফসোস মিনুর সাথে এখন আর কোন যোগাযোগ নেই। প্যারিসে আছে এতোটুকু জানি। মিহাল এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে, আর বাবার ইচ্ছে ছিল আমাদেরই আত্মীয়র ভেতর নীলাকে বিয়ে দিতে। যদি মিনুদের সাথে সম্পর্ক ভালো হয়ে যেত তাহলে নীলার সাথে মিহালের বিয়েটাই দিতাম। আর আমি জানি আমার বোন কখনোই না করতো না। কিন্তু সমস্যা একদিকেই যে মিনুর সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই।
ইমরান মির্জার কথা শুনে তার দুই ভাই চুপ করে বসে রইল। আর ইরফান তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তার ফুফু আছে অথচ সেই বিষয় জানতো না। সেতো জানতো তার বাবা সবার বড় এবং তার বাবার ছোট দুই ভাই আছে। কিন্তু আজকে জানতে পারলো তার বাবার একটি ছোট বোন আছে। এবং সেই বোনের ছেলেও আছে। তার বয়স তখন ৬ বছর ছিল তাই হয়তো তার সেই সব কথা মনে নেই। কিন্তু তার থেকে বেশ অবাক হলো এই কথাটি শুনে যে তার ফুফাতো ভাইয়ের সাথে নাকি তার বাবা তার হবু বউয়ের বিয়ের কথা ভাবছে। খুব রাগ উঠল নিজের বাবার উপর। হয়তো সে অলস, পড়াশোনায় অত ভালো ছিল না। তাই বলে কি তার বাবা তারই হবু বউয়ের সাথে অন্য কারোর বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। তার মনে এক অজানা ঈর্ষা জন্ম নিল নিজের ফুফাতো ভাইয়ের প্রতি। এর জন্যই তো সে প্যারিসে যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। কিন্তু প্যারিসে গিয়ে সে যা করল_
এসব ভাবতে ভাবতেই অতীত থেকে ফিরে এলো ইরফান। শরীরের পশম দাড়িয়ে গেছে। সে নিজের অফিসের কেবিনে বসে ছিল। যথা সম্ভব চেষ্টা করছে কাজে মনোযোগ দিতে কিন্তু তবুও পারছে না। কেবল অতীতের করা কর্মকাণ্ডের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তার জন্য দুই বেস্ট ফ্রেন্ড এর মাঝে ঝামেলা হয়েছিল। এইসব ভাবতেই সে শুকনো ঢোঁক গিলল।
আচ্ছা নীলা কি পরতে পারি ইউনিভার্সিটির ফাংশনে?
ইকরা বইয়ে পাতায় দৃষ্টি রেখে জিজ্ঞেস করল।নীলা ইকরার পায়ের রানে মাথা রেখে শুয়ে ছিল।ইকরা একহাতে দিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।নীলা নিজের হাতে থাকা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল_
শাড়ি।
ইকরার হকচকিয়ে গেল। এই মেয়ে প্যারিসে আসার পর থেকে একের পর এক ধাক্কা দিচ্ছে। প্রথমে বলল প্যারিসে এসে চিতই পিঠার বিজনেস করবে। এখন বলছে অ্যানুয়াল ফাংশনে নাকি শাড়ি পড়ে যাবে।
ইকরা নড়ে চড়ে উঠলো। তারপর জিজ্ঞেস করল_
তোর মাথা ঠিক আছে? শাড়ি পরে যাবি?
নীলা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল __
এতে মাথা খারাপ হওয়ার কি আছে? প্যারিসে এসেছি বলে কি বাংলার ঐতিহ্য ভুলে যাব? বাঙালিরা তো শাড়ি পরে। আমরা যেহেতু বাঙালি তাহলে বাঙ্গালীদের মতোই চলবো। যেখানেই থাকি আর যাই হোক নিজেদের ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়া যাবে না। ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। আমার যেহেতু নীল রং পছন্দ আমি নীল রঙের শাড়ি পরবো। সাথে হিজাব। আর তুই কি সঙ্গে করে কোন শাড়ি এনেছিস?
কথাটি বলেই নীলা ইকরার দিকে তাকালো। ইকরা নাবোধক ইশারা করতেই নীলা আবার বলতে লাগলো_
সমস্যা নেই আমার কাছে লাইট পিংক কালারের আরেকটা শাড়ি আছে। তুই সেটা পড়ে নিস। তোর হয়ে যাবে ব্লাউজ আর পেটিকোট।
কথাটি শুনে ইকরার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। খুশিতে নীলাকে জড়িয়ে ধরল।নীলা এমন আকস্মিক ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তার কিছুটা সময় লাগলো বিষয়টি বুঝতে। তারপর নিজেকে সামলিয়ে সেও ইকরা কে জড়িয়ে ধরল।
এভাবেই তাদের দিন চলতে লাগল। ফাংশনের জন্য ইউনিভার্সিটিতে দুইদিন ক্লাস হয়নি। কারণ দুই দিন পর ফাংশন হবে। সবাই সবার মতো প্রস্তুতি নিতে থাকল।
দুদিন পর। অ্যানুয়াল ফাংশনের দিন।
লিসা আজ কালো রঙের Sequin Dress পরেছে । কারণ সে বেশিরভাগ সময় মিহালকে কালো রংয়ের পোশাক করতে লক্ষ্য করেছে। তাই তার ধারণা মিহালের কালো রং পছন্দ।এবং এর জন্যই সে আজ কালো রঙের পোশাক পরেছে।
আর তাছাড়াও সে খোঁজ নিয়েছে ইউনিভার্সিটিতে বাকি মেয়েদের মধ্যে সবাই Off-shoulder Dress, Mermaid Dress, Cocktail Dress, A-Line Gown,Peplum Dress, Evening Gown এই ধরনের ড্রেস পরবে। এবং সে সবাইকে বলে দিয়েছে সে যেটা করছে সেটা যেন কেউ না পরে।আর ইউনিভার্সিটি তে নতুন সাজ এই মেয়েটার সাথে তার ঝামেলা হয়েছে সে মেয়েটি নিতান্তই ক্ষেত তার মতে। তাই সেই মেয়েটি ইউনিভার্সিটিতে যে কোন ভালো ড্রেস পরবেনা এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। তাই তেমন মাথা ঘামাচ্ছে না। নিজের মত করে তৈরি হতে লাগলো। যেভাবে হোক তাকে তার প্রফেসরকে ইমপ্রেস করতে হবে। এটাই তার লক্ষ্য।
মিহাল তৈরি হয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হলো।পরনে তার ফর্মাল পোশাক। সাদা প্যান্ট, নীল রঙের শার্ট এবং তার ওপর সাদা রঙের কোট। হাতে ব্যান্ডের ঘড়ি। ব্যাস এতেই তাকে একদম সুদর্শন যুবক লাগছে।সে জানে মুনভি তার জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু তার মাথায় এটা ঠেকছে না হঠাৎ মুনভি তার ইউনিভার্সিটি তে যাওয়ার জন্য সব সময় এত রেডি থাকে কেন। সেই দিনের পর থেকে মুনভি সব সময় একই কথা বলে বলে তার কানের পোকা নাড়িয়ে ফেলেছে। বারবার একই কথা বলছে যে_
তোর ইউনিভার্সিটিতে আমার খুব ভালো লেগেছে। আগে এতটা ভালো করে দেখিনি। তাই ভাবছি মাঝেমধ্যেই তোর ইউনিভার্সিটিতে চলে যাব।
মুনভির এমন কথা শুনে মিহাল কিছুটা অবাক হলো। কারণ এমন নয় যে মুনভি এই ইউনিভার্সিটিতে প্রথমবার এসেছে। আর তাছাড়াও এই ইউনিভার্সিটি থেকেও আরো ভালো ভালো জায়গায় মুনভি ঘুরেছে। তাহলে এই ইউনিভার্সিটির জন্য এত কিসের পাগল হাওয়া। নিশ্চয়ই কোন গোলমাল আছে কিন্তু সেটা মিহাল ধরতে পারছে না।। এবং তাকে যে করেই হোক সেটা বের করতে হবে।
পার্কিং হলে গিয়ে দেখল মুনভি গাড়ির ভেতর বসে আছে। পরনে তার নিউট্রাল কালারের প্যান্ট, লাইট পিঙ্ক কালারের শার্ট এবং নিউট্রাল কালারের কোর্ট। তাকেও বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে। মিহাল গাড়িতে উঠে বসলো। ড্রাইভিং সিট তার জন্য এখানে ছিল। গাড়িতে উঠেই গাড়ি চালানো শুরু করলো। উদ্দেশ্য তার ইউনিভার্সিটিতে। টিচার্সদেরকে আগে যেতে হবে। কারণ স্টুডেন্টরা যখন ঢুকবে তখন স্টুডেন্টদেরকে দেখে তাদের ড্রেস আপ কে মার্ক করতে হবে এবং সে মার্কেট ডিপেন্ড করে স্টুডেন্টকে প্রাইজ দেওয়া হবে।
AUP খুব জাঁকজমকভাবে সাজানো হয়েছে। চারপাশে লাইটিং করা হয়েছে। প্যারিসের ইউনিভার্সিটির ফাংশন বলে কথা যেন সেন অনুষ্ঠান তো আর না। সকল শিক্ষকরা চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসছে। নিজেদের মত স্টুডেন্টদেরকে মার্ক করছে। মিহাল আর মুনভি মেন গেটের সামনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিহালের হাতে একটি নোটপ্যাড সেখানে যেসব স্টুডেন্টদের ড্রেস সব থেকে আলাদা থাকবে তাদের সেই ড্রেসের নাম লিখে রাখা হবে। তারপর ফাংশন শেষে এনাউন্সমেন্ট করে সেই স্টুডেন্ট কে সামনে আনা হবে। এবং যেই স্টুডেন্টের পক্ষে যত বেশি শিক্ষকের ভোট থাকবে সেই স্টুডেন্টকে প্রাইজ দেওয়া হবে।
মুনভি একবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার ইউনিভার্সিটি মাঠের দিকে তাকাচ্ছে। তার জানা নেই সে যার জন্যই এসেছে সেই মেয়েটি এখন কোথায়। ইউনিভার্সিটিতেই নাকি এখনো আসেনি। তাইতো দুইবার দুই দিকে তাকাচ্ছে। সে যদি পারত তাহলে এক চোখ চোখ বের করে এক হাতে রেখে গেটের দিকে তাকিয়ে থাকতো আরেক চোখ বের করে আরেক হাতে রেখে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতো। তাহলে হয়তো সে নিজের কাঙ্খিত মানুষটিকে খুঁজে পেত।
মিহাল মুনভির কাণ্ডকারখানা খুব ভালো করেই দেখছে। যত যাই হোক মুনভি তার বেস্ট ফ্রেন্ড। মন থেকে কখনো এরকম অস্বাভাবিক ব্যবহার করতে দেখেনি। এখন তার মনে হচ্ছে তার বন্ধু নিজে ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও তাকে আরেক ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। যেন সেন ডাক্তার নয় পাগলের ডাক্তার।
যেখানে কনসার্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখান থেকে হঠাৎ মাইকের আওয়াজ ভেসে আসলো। সবার দৃষ্টি সেখানে চলে গেল। একজন এসে বলল যে এখন অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। সবাই স্টেজের দিকে যেতে লাগল। মুনভির মুখ ছোট হয়ে গেল। সে যাকে দেখার আসা করেছিল তাকে দেখতেই পেলো।
অন্যদিকে মিহাল ও এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। সে নিজেও জানে না কেন খুঁজছে। কিন্তু যেহেতু মন একবার বলছে কাউকে এক নজর দেখা উচিত সে তাড়োনা তেই এদিক সেদিক নজর বুলাচ্ছে। দুই বন্ধু মিলে হেঁটে গেল স্টেজের দিকে এবং উঠে বলল স্টেজে।
এসব অনুষ্ঠানে টিচাররাও জয়েন করে। বিশেষ করে মিহাল। তার আরেকটি গুণ আছে সেই গিটার বাজাতে পারে। শখের বশে শিখা হয়েছিল আর কি। গিটার বাজাতে যে সে প্রফেশনাল এমনটা নয় কিন্তু যদি একবার গিটার বাজিয়ে গান ধরে তাহলে সবাই তার গান শুনে মুগ্ধ হতে বাধ্য। তাই আজকেও সে এই ফাংশনে গান গাবে। কিন্তু এই ইউনিভার্সিটিতে সবথেকে ভালো নিয়ম এটা এখানে সব কালচারকে সম্মান করা হয়। অন্যান্যদের ভাষা, অন্যান্যদের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাই এখানে যারা ইন্ডিয়ান আছে তারা হিন্দি গান গাইবে, যারা কোরিয়ান তারা কোরিয়ান গান গাইবে, তেমনই মিহাল গাইবে বাংলা গান। কিন্তু মিহাল কোন গান গাইবে তা ঠিক করে আসেনি। দায়িত্ববোধের কারণে ২,৪ লাইন স্টেজে উঠে গাইবে সেটা ভেবেই বাড়ি থেকে এখানে এসেছে। তেমন আহামরি প্রিপারেশন নেই নি সে।
এখন আপাতত ফিমেল টিচার্সরা গান গাইছে আর স্টুডেন্টরা চিয়ার আপ করছে।
হঠাৎ টিচার স্টেজে দাঁড়িয়ে গান গাইতে গাইতে থেমে গেল। তার দৃষ্টি মেন গেটের দিকে। টিচার্স কে থেমে যেতে দেখে উপস্থিত সবাই অবাক হলো এবং টিচারের দৃষ্টি লক্ষ্য করে সবাই পেছনের দিকে তাকালো। গেট দিয়ে কয়েকজন মেয়ে আসছে। সেখানে সামনের দিকে ছিল লিসা এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ। এবং তাদের পিছনে দুইটি মেয়ে আসছে। সবাই যখন পিছনে তাকিয়ে আছে তখন লিসা ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। সে ভাবছে সবাই হয়তো তাকে তার ড্রেসিং সেন্স কে দেখছে।কিন্তু সবার দৃষ্টি কেবল তার পেছনে থাকা দুইটি মেয়ের দিকে। সেই দুইটি মেয়ে শাড়ি পড়ে এসেছে। একজন নীল রঙের শাড়ি, সাথে সাদা রঙের হিজাব। হাতে নীল রঙের পার্টস মুখে মাস্ক। আরেকজন লাইট পিঙ্ক রঙের শাড়ি, নিউট্রাল কালারের হিজাব, মাস্ক এবং পার্স।
মুনভি স্টেজ থেকেই চিনতে পারল একটি মেয়েকে যাকে সে এতক্ষণ যাবৎ পাগলের মত খুঁজছিল। দুজনের ড্রেসের কালার ম্যাচিং হয় তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। সে যদি পারত তাহলে এক্ষুনি এই স্টেজ থেকে নেমে দৌড় দিয়ে মেয়েটির দিকে চলে যেত। কিন্তু মেয়েটির কাছে গেলেই বা কি? সেতো মুখ ফুটে কোন কথাও বলতে পারে না মেয়েটির সামনে। তাই দূর থেকে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে দেখতে লাগল।
অন্যদিকে নীল রঙের শাড়ি পরে আসা মেয়েটিকে দেখে মিহাল চিনতে পারল। মূলত মেয়েটির চোখ দেখেই সে চিনতে পারল এই মেয়েটি সেই মেয়েটি যে ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে তার ওপর কপি ফেলে দিয়েছিল। যে মেয়েটির চোখ সে ভুলতে পারছে না। যে মেয়েটি চোখের স্কেচ সে এঁকেছিল।
সকল টিচার্সরা এ দুইটা মেয়েকে নোটিস করতে লাগলো। শাড়ির সাথে হিজাবের কালের কম্বিনেশন খুব সুন্দর। আবার মুখে তেমন প্রলেপ মাখা না একদম ন্যাচারালি বিউটি। চোখে আইলানা দেওয়া যার ফলে চোখ টানা টানা লাগছে। এতে মাক্স পড়া সত্বেও চোখগুলো খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছে। সবাই নিজেদের মতো মার্ক দিতে লাগলো। মিহাল মার্ক দিতে গিয়েও থেমে গেল নিজের ইগোর কারণে। কারন এই মেয়েটি তার গায়ে কফি ফেলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব থেকে সে পিছু পা হতে পারবে না। সে নিজের কাজের প্রতি লয়েল। তাই দুটি মেয়ে নিজেদের প্রাপ্য মার্ক পেল। কিন্তু নীলা কে সে ১০% মার্ক এক্সট্রা দিল। কারণ এই মেয়েটি তার চেনা প্রথম মেয়ে হবে যে তার চোখে চোখ রেখে কথা বলা সাহস দেখিয়েছে। এই সাহসিকতার ফল হিসেবে সে ১০% মার্ক বেশি দিল।
লিসা ভাবছিল সবাই তাকে দেখেছে। কিন্তু সবার দৃষ্টি লক্ষ্য করে পিছনে তাকাতেই তার মেজাজ বিগড়ে গেল। সেই মেয়েটি তার পিছনে। তাও আবার শাড়ি পরে এসেছে। আর সবাই এই মেয়েটির দিকেই তাকিয়ে আছে এমনকি তার ক্রাশ মিহাল স্যার। কিন্তু যেহেতু সবাই এখন এখানে তাকিয়ে আছে এখন সে কিছুই করতে পারবে না। নিজের গ্রুপের মেয়েদেরকে বলল
ফাংশন শেষে এই মেয়েটির ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবাই তাকিয়ে আছে বলে ইকরা কিছুটা ভরকে গেল। শক্ত করে নীলার হাত চেপে ধরলো।নীলা বুঝতে পারলো ইকরা নার্ভাস ফিল করছে তাই সে ইকরার হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে নিল। এবং সামনের দিকে অগ্রসর হলো। দুজন মিলে গিয়ে বসল সামনের দিকে।
অনুষ্ঠান আবার শুরু হয়ে গেল। সবাই আবার ইনজয় করতে লাগলো। আরো দুইজন ফিমেইল টিচার গান গাওয়ার পর এবার মেইল টিচারদের পালা এলো ।নীলা একবার পুরো ইউনিভার্সিটিতে চোখ বুলিয়ে নিল। স্টেজের দিকে তাকাতেই নিজের প্রফেসরের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। তার ইকোনমি স্যার তার দিকে তাকিয়ে ছিল। দৃষ্টি গভীর যেন তার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব কথা করে ফেলবে। নীলা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল।এই সাগরে মতো গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা তার নেই। কিন্তু একটা জিনিস ভেবে মনে মনে বিরক্ত হলো তার প্রফেসরের সাথে তার ড্রেসের কালার মিলে গেল।
মিহাল কিছুক্ষণ নীল রঙের শাড়ি পরে বসে থাকা মেয়েকে দেখলো। আগে কখনো কোন মেয়ের দিকে এভাবে তাকায় নি সে। কারো সম্পর্কে তার এত জানতে ইচ্ছে করেনি যতটা এই মেয়েটি সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করছে। এই মেয়েটির নাম জানে না সে। এবং মেয়েটির চোখ দেখেছে শুধু ।কিছু না ভেবে গিটার নিয়ে চলে গেল মঞ্চের সামনে। সবার দৃষ্টি এখন তার দিকে কিন্তু তার দৃষ্টি একজনের চোখের দিকে। সবাই চিয়ার আপ করছে।তার গান শোনার জন্য অধির আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। কারণ মিহাল প্রতিবারই একটি বাংলা গান গাওয়ার পর সবাই যে গান চায় সেই গান গায়। বাংলা গান কেউ না বুঝলেও ইংলিশ গান সবাই বুঝে এবং ইংলিশ গানে মিহালের কণ্ঠ,সুর শুনে সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়।তাই মিহালের গান শোনার জন্য এত আগ্রহ সবার।
মিহাল গিটার গলায় ঝুলিয়ে নিল। মনে মনে নীল রঙের শাড়ি পরে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল__
জানিনা কি নাম তোমার, কি নামে ডাকবো তোমায়, কিন্তু তোমার পরিচয় সম্পর্কে জানতে খুব ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে তুমি আমার খুব কাছের।
তারপর গাইতে শুরু করল__
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
আমি যে মাতাল হাওয়ার ই মত হয়ে
যেতে যতে পায়ে পায়ে গেছি জড়িয়ে
আমি যে মাতাল হাওয়ার ই মত হয়ে
যেতে যতে পায়ে পায়ে গেছি জড়িয়ে
কি করি ভেবে যে মরি বলবে কি লোকে
মন্দ করেছে আমাকে ঐ দুটি চোখে
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
পালাতে পারি নি আমি যে দিশাহারা
দুটি চোখ যেন আমায় দিচ্ছে পাহারা
পালাতে পারি নি আমি যে দিশাহারা
দুটি চোখ যেন আমায় দিচ্ছে পাহারা
ধরা পড়ে গেছি আমি নিজেরই কাছে
জানি না তোমার মনেও কি এত প্রেম আছে
ধরা পড়ে গেছি আমি নিজেরই কাছে
জানি না তোমার মনেও কি এত প্রেম আছে
সত্যি যদি হয় বলুক যা বলছে নিন্দুকে
মন্দ করেছে আমাকে ঐ দুটি চোখে
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে
চলবে?
Share On:
TAGS: নাজনীন নেছা নাবিলা, নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৭
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১১
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৮+বোনাস
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা সারপ্রাইজ পর্ব
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৫
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৬(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৬