নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀
পর্ব_২৩
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
সূর্যটা যখন পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ছে, তখন তার রক্তিম আভা মহলের কারুকার্যখচিত স্তম্ভগুলোতে এক দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। সেই ছায়া যেন কোনো এক অশুভ দানবের ন্যায় গ্রাস করতে চাইছে পুরো অন্দরমহলকে। বাঈজী মহলের বাতায়নে আজ আর কোনো গানের কলি গুঞ্জরিত হচ্ছে না। সেখানে বিরাজ করছে এক গুমোট নিস্তব্ধতা।
বিলকিস বানু তার কক্ষে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিলেন না। তার চিত্ত আজ বড়ই ব্যাকুল। হেমাঙ্গিনীর সেই বিষণ্ণ মুখচ্ছবি আর পালকির সেই মন্থর প্রস্থান তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে। জমিদার সিকান্দার গজনবীর এই আকস্মিক আজ্ঞা কোনো শুভ লক্ষণ নয়, তা তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা বারবার তাকে সতর্ক করছে। তিনি জানালার শিকগুলো শক্ত করে ধরে বাইরের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে তিনি নিজের বিশ্বস্ত প্রহরী বদরুদ্দীনকে ইশারায় কাছে ডাকলেন।
বদরুদ্দীন কাছে আসতেই বিলকিস বানু তার স্বরে এক গোপন ব্যাকুলতা মিশিয়ে বললেন,
- শোনো বদরুদ্দীন, এই লহমায় তোমাকে অন্দরমহলে যেতে হবে। অতি সাবধানে, কারো দৃষ্টিগোচর না হয়ে নবাব তাইমুর গজনবীর প্রধান খিদমতগার শোবহান মির্জাকে একটি সংবাদ পৌঁছে দাও। তাকে বলো, বাঈজী হেমাঙ্গিনীকে এক নিগূঢ় সন্ধির উপঢৌকন হিসেবে মনসুর আলীর কুঠিতে পাঠানো হয়েছে। আমার অন্তর বলছে, সেখানে কোনো ভয়ানক ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে। বাঈজীর সম্মান আর জীবন আজ বিপন্ন। শোবহান মির্জা যেন এই সংবাদ অবিলম্বে জমিদারপুত্রের কর্ণে পৌঁছে দেন।
বদরুদ্দীন মাথা নত করে কুর্নিশ জানিয়ে দ্রুতপদে প্রস্থান করল। বিলকিস বানু পুনরায় জায়নামাজে বসে দুহাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। তার ঠোঁট কাঁপছিল এক অব্যক্ত আর্তনাদে।
নবাব তাইমুর গজনবী তখন তার ব্যক্তিগত পাঠাগারে এক প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পাঠে নিমগ্ন ছিলেন। কক্ষের সুগন্ধি মোমবাতির শিখা হালকা বাতাসে দুলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে শোবহান মির্জা অত্যন্ত সাবধানে কক্ষে প্রবেশ করলেন। তার মুখাবয়বে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট।
শোবহান মির্জা কুর্নিশ জানিয়ে ধীরকণ্ঠে আরজ করল,
- হুজুর, একটি অতি জরুরি এবং উদ্বেগজনক সংবাদ রয়েছে।
তাইমুর পাণ্ডুলিপি থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই শান্ত স্বরে বললেন,
- বলো, মির্জা। কী এমন ঘটল যে তোমার কণ্ঠে আজ এতটা অস্থিরতা?
শোবহান মির্জা গলা পরিষ্কার করে বলল,
- বিলকিস বানুর প্রেরিত সংবাদ অনুযায়ী, বাঈজী হেমাঙ্গিনীকে আজ অপরাহ্নে জমিদার সাহেবের আজ্ঞায় মনসুর আলীর কুঠিতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে এক বিশেষ জলসার আয়োজন করা হয়েছে। বিলকিস বানু আশঙ্কা করছেন, এই সফরের আড়ালে কোনো বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। মনসুর আলীর চরিত্র সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সন্দিহান।
তাইমুর এবার ধীরলয়ে মস্তক উত্তোলন করলেন। তার সেই ভাসা ভাসা গভীর নেত্রযুগলে কোনো চাঞ্চল্য দেখা গেল না। বরং এক অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক নির্লিপ্ততা খেলে গেল। তিনি কেবল জিজ্ঞাসা করলেন,
- সে কি আজই গিয়েছে? ঠিক কখন?
- জি হুজুর, জোহরের ওয়াক্তের কিছুক্ষণ পরেই পালকি গজনবী তোরণ অতিক্রম করেছে।
তাইমুর পুনরায় তার পাণ্ডুলিপির দিকে মনোনিবেশ করলেন। যেন এই সংবাদটি তার দৈনন্দিন কর্মতালিকার অতি সাধারণ একটি অংশ মাত্র। শোবহান মির্জা বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন তাইমুর হয়তো ক্রুদ্ধ হবেন অথবা তখনি অশ্বারোহণে ছুটে যাবেন। কিন্তু তাইমুরের এই শীতলতা তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিল।
তাইমুর কলমটি কালির দোয়াতে ডুবিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
- শোনো শোবহান, সুলতানা আজ আমার জন্য নিজ হাতে মিষ্টান্ন ও জাফরান মিশ্রিত ফিরনি প্রস্তুত করেছেন। তার এই শ্রম ও সৌজন্যের প্রতিদান দেওয়া আবশ্যক। আমার ভাণ্ডার থেকে সেই নতুন পারস্যের রেশমী থান আর বহুমূল্য মুক্তার হারটি বের করো। এখনই তা সুলতানার মহলে উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দাও। তাকে বলো, আমি তার এই পরিশীলিত আচরণের জন্য অত্যন্ত প্রীত হয়েছি।
শোবহান মির্জা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
- কিন্তু হুজুর… হেমাঙ্গিনী সাহেবা?
তাইমুর এবার কঠোর দৃষ্টিতে শোবহান মির্জার দিকে তাকালেন। তার কণ্ঠে রাজকীয় কাঠিন্য ঝরে পড়ল,
- আমি যা বলেছি তা পালন কর। বাঈজীদের জীবন তো এমনই, এক মহল থেকে অন্য মহলে পদার্পণ করাই তাদের নিয়তি। এর জন্য এত অস্থির হওয়ার প্রয়োজন দেখি না। তুমি এখন আসতে পারো।
শোবহান মির্জা ভগ্ন হৃদয়ে কক্ষ ত্যাগ করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন না, যে তাইমুর হেমাঙ্গিনীর জন্য প্রাণ দিতে পারতেন, তার চরিত্রে আজ এই পাথুরে কাঠিন্য এল কোত্থেকে।
মনসুর আলীর বিশাল কুঠিটি আজ যেন এক আলোকসজ্জার নরক। সূর্যাস্তের রক্তিম আভা তখন দিগন্তে বিলীন হয়ে এক গাঢ় কৃষ্ণছায়া নেমে এসেছে ধরণীতে। মনসুর আলীর সেই প্রাসাদোপম কুঠির প্রধান তোরণে মশালে মশালে কৃত্রিম দিনের সৃষ্টি করা হয়েছে। ফটকের দুপাশে সুসজ্জিত প্রহরী দল দণ্ডায়মান। যখনই গজনবী এস্টেটের রাজকীয় চিহ্নবাহী পালকিটি ফটক দিয়ে প্রবেশ করল, সানাইয়ের এক তীক্ষ্ণ অথচ সুরহীন লহরিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠল।
পালকিটি কুঠির মধ্যবর্তী প্রশস্ত চত্বরে নামিয়ে রাখা হলো। মনসুর আলী স্বয়ং তার পেয়ারের খিদমতগারদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত। পালকির যবনিকা অপসারিত হতেই হেমাঙ্গিনী যখন পাদস্পর্শ করল মৃত্তিকায়, তখন চারদিকের মশালগুলো যেন এক পৈশাচিক খুশিতে নেচে উঠল। মনসুর আলী তার কুটিল নয়নে হেমাঙ্গিনীকে আপাদমস্তক অবলোকন করলেন। তার ওষ্ঠাধরে এক ঘৃণ্য হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হলো।
- স্বাগতম, গজনবী মহলের জান! বাঈজী সাহেবা, আপনার আগমনে আজ এই নগণ্য তুলা ব্যবসায়ীর কুঠি ধন্য হলো।
মনসুর আলীর এই কৃত্রিম বিনয়ের আড়ালে যে লালসার বিষ লুক্কায়িত ছিল, তা হেমাঙ্গিনীর বুঝতে বাকি রইল না। সে কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল মস্তক ঈষৎ অবনত করল।
মনসুর আলী তার এক দাসীর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
-বাঈজী সাহেবাকে অন্দরের সেই বিশেষ প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাও। সেখানে তার স্নান ও প্রসাধনের যাবতীয় রাজকীয় ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করো। মনে রেখো, আজকের জলসা কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি গজনবী বংশের সহিত আমার সৌহার্দ্যের প্রতীক। বাঈজীর সজ্জায় যেন কোনো ত্রুটি না থাকে।
হেমাঙ্গিনীকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অলিন্দ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। কক্ষটিতে প্রবেশ করতেই আতর আর চন্দনের এক উগ্র গন্ধ তাকে গ্রাস করল। চারজন দাসী সেখানে প্রস্তুত ছিল। তারা অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে হেমাঙ্গিনীর অলঙ্কার উন্মোচন করতে শুরু করল। তাদের স্পর্শে কোনো মমতা নেই, ছিল কেবল আজ্ঞা পালনের জড়তা।
স্নানের নিমিত্ত প্রস্তুত করা হলো উষ্ণ জাফরান জল। দাসীরা যখন তাকে স্নান করাচ্ছিল, হেমাঙ্গিনীর মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো বলির পশুর ন্যায় প্রস্তুত হচ্ছে। স্নান শেষে তাকে পরিধান করতে দেওয়া হলো এক অদ্ভুত বর্ণালীর লাহোরি পেশোয়াজ। লালচে খয়েরি রঙের সেই মসলিনের ওপর স্বর্ণালী জরি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জটিল সব নকশা। তার হাতে পরিয়ে দেওয়া হলো রত্নখচিত বালা, আর ললাটে এঁকে দেওয়া হলো গাঢ় রক্তবর্ণের টিপ।
একজন বৃদ্ধা দাসী যখন হেমাঙ্গিনীর কেশবিন্যাস করছিল, সে ফিসফিস করে বলল,
- আজ তোর নসিব বড় কঠিন। মনসুর সাহেবের নজর আজ তোর ওপর স্থির হয়েছে। জলসাঘরে যাওয়ার আগে খোদার কাছে পানাহ চেয়ে নে।
হেমাঙ্গিনীর হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে আয়নায় নিজের পাণ্ডুর প্রতিচ্ছবি দেখে শিউরে উঠল। তার এই সজ্জা কি কেবল নাচের জন্য, নাকি নিজের বিসর্জনের জন্য?
অবশেষে সেই মুহূর্ত সমাগত। মনসুর আলীর বিশাল জলসাঘরটি আজ ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় উদ্ভাসিত। মেঝেতে বিছানো হয়েছে বহুমূল্য পারস্য গালিচা। আসরের মাঝখানে সুগন্ধি তামাক আর মদিরার পেয়ালার ছড়াছড়ি। এই অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা গোল হয়ে বসে আছেন। তাদের মত্ত দৃষ্টি বারবার প্রবেশদ্বারের দিকে উঁকি দিচ্ছে।
মনসুর আলী তার মখমলের গদিতে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন। তার হাতে হীরের আংটিগুলো আলোর ছটায় ঝলসে উঠছে। তিনি তার খাস মুন্সিকে বললেন,
- মুন্সি সাহেব, সিকান্দার গজনবী কথা রেখেছেন। আজ রাতে এই নর্তকী কেবল আমার আসর আলো করবে না, বরং আমার একাকীত্বের সাথি হবে।
ঠিক তখনি তবলার চাঁটি আর সারেঙ্গীর আর্তনাদপূর্ণ সুরে জলসাঘর কেঁপে উঠল। দ্বার উন্মোচিত হতেই হেমাঙ্গিনী ধীরপদে প্রবেশ করল। তার পায়ে লম্বিত রুপোলি নূপুরের শব্দ যেন কোনো এক আসন্ন বিপদের সংকেত দিচ্ছিল।
মনসুর আলী উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন।
- আহা! বাঈজী সাহেবা! আজ আপনার পায়ের প্রতিটি ঝংকারে যেন আমার হৃদয়ের তন্ত্রীগুলো কেঁপে ওঠে। শুরু করুন আপনার জাদু!
হেমাঙ্গিনী আসরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল। তার চোখের সম্মুখে তাইমুরের সেই শান্ত চাহনি ভেসে উঠল। সে কি জানতেন, তার প্রিয় হেমাঙ্গিনীকে আজ এই নেকড়েদের আসরে বলি দেওয়া হবে?
তালের লহরি শুরু হলো। হেমাঙ্গিনী তার হাত দুটি প্রসারিত করে প্রথম মুদ্রাটি তুলল। সে নাচতে শুরু করল, কিন্তু তার প্রতিটি ঘূর্ণনে ছিল এক অসহ্য যন্ত্রণা। সে অনুভব করছিল, আসরে বসা পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টি তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে যেন কামড়ের ন্যায় বিঁধছে।
মনসুর আলী তার মদের পেয়ালাটি তুলে নিয়ে অট্টহাসি হেসে বললেন,
- সাবাস! আরও দ্রুত বাঈজী! আজ রাত কেবল নৃত্যের নয়, আজ রাত হবে তৃপ্তির। এই তুলা ব্যবসায়ী যখন কোনো রত্ন কেনে, তখন তার শেষ তলানিটুকু পর্যন্ত সে আস্বাদ করতে জানে।
হেমাঙ্গিনীর নূপুরগুলো তখন কান্নার সুরে বাজছিল। সে ঘুরপাক খেতে খেতে দেখল মনসুর আলী তার আসন ছেড়ে টলমলে পায়ে আসরের মধ্যস্থলে উঠে আসছেন। তার কুৎসিত লালসাভরা দৃষ্টি দেখে হেমাঙ্গিনীর অন্তরাত্মা হিম হয়ে এল।
বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। অন্ধকারের গগণের বুকে বিজলী চমকাচ্ছে বারবার। গজনবী মহলের সেই সুরক্ষিত দেয়ালের বাইরে হেমাঙ্গিনী তখন এক নরক যন্ত্রণার মুখোমুখি। সে কি পারবে এই পৈশাচিক জাল ছিন্ন করে ফিরতে? নাকি গজনবী এস্টেটের ইতিহাস আজ এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সাক্ষী হবে?
সকলকে Happy New Year এর শুভেচ্ছা❤️ ৪০০০ লাইক আর ৫০০ কমেন্টস দুটো পূরণ হলেই আগামীকাল সন্ধ্যা ৫:৩০ এ আসবে। এখন থেকে সমস্যা না হলে রেগুলার গল্প দিব প্রমিজ 🥺🤌
নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀
আতিয়া_আদিবা
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, নিষিদ্ধ রংমহল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২০
-
নিষিদ্ধ রংমহল গল্পের লিংক
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৫
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৬
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৫
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯