নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৬১ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
৭ দিন পর,,,
আরশি এখন মোটামুটি সুস্থ তবে অতটাও স্বাভাবিক হয়নি। এতদিন শিহাব অফিসও সামলিয়েছে আর আরশিরও যত্ন নিয়েছে। একজন পুরুষ হয়ে নারীর যতটুকু যত্ন নেওয়া দরকার, শিহাব যেন তার থেকেও বেশি করেছে। এখন শিহাব আর আরশির ভালোবাসা অনেক গভীর, দুজন দুজনের চোখে সারাক্ষণ হারায়। শিহাব যখন অফিসে থাকে, আরশি খুব মিস করে আবার শিহাবও অফিসে থেকে আরশিকে বারবার কল দেয়, দুজনে অনেকক্ষণ কথা বলে। এক কথায় কেউ কাউকে ছাড়া এখন এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।
আজ আরশিকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হবে। যদিও ডাক্তাররা আরও কয়েক দিন রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শিহাব জেদ ধরেছে বাড়িতেই নার্স রেখে দেবে। তার কাছে হাসপাতাল আর ভালো লাগছে না, নিজের আপন পরিবেশে আরশি দ্রুত সেরে উঠবে বলেই তার বিশ্বাস। শিহাবের জেদের কাছে ডাক্তাররাও শেষমেশ রাজি হলেন।
[সকাল ১০:০০টা]
শিহাব খুব সাবধানে ধরে ধরে বেড থেকে আরশিকে নামাল। আরশির শরীরের দুর্বলতা এখনো কাটেনি। শিহাব আরশির একটা হাত নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিল এবং কোমরে হাত দিয়ে তাকে ধরে হাঁটতে লাগল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই আরশি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পড়ে যেতে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে শিহাব বিদ্যুৎগতিতে আরশির কোমর জাপটে ধরে ফেলল। শিহাব ভয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে অস্থির হয়ে বলল।
“আরশি! তুমি ঠিক আছো? লেগেছে কোথাও?”
আরশি ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে আশ্বস্ত করল।
“হুম, ঠিক আছি।”
শিহাব অতি সাবধানে আরশিকে আবার সোজা করে দাঁড় করাল। আরশির কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো সে পরম মমতায় আলতো করে কানের পাশে গুঁজে দিতে লাগল। আরশি অপলক দৃষ্টিতে শিহাবের মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে এখন শিহাবের জন্য এক সমুদ্র মুগ্ধতা।শিহাব আরশিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু দুষ্টুমিভরা হাসিতে বলল।
“আমি আপনারই গো মহারানী! এইভাবে তাকিয়ে আমাকে নজর দিয়েন না। নাহলে পরে নিজেকেই দোষারোপ করবেন যে আহারে, আমার এত সুন্দর জামাইটাকে নজর লাগায় দিলাম।”
শিহাবের কথায় আরশি লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আরশির এই লজ্জা মাখা ফ্যাকাশে মুখটা যখন হালকা লালচে বর্ণ ধারণ করল, তখন শিহাবের মাথায় যেন দুষ্টুমি আরও বেশি চড়ে বসল। সে আরশিকে আরও একটু নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরল। আরশির কানের লতি ছুঁয়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“আরশি, জানো এখন তোমার এই লজ্জা মাখা মুখটা দেখলে আমার অন্য কিছু করতে মন চায়? আর কোনটা করতে মন চায়, সেটা কি তুমি জানো?”
আরশি শিহাবের বাহুবন্ধনে থেকে আরও আড়ষ্ট হয়ে গেল, তার গাল দুটো লজ্জায় লাল টকটকে হয়ে উঠতে লাগল। শিহাব এবার আরশির কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে, গভীর আবেগে বলল।
“সেদিন তোমাদের বাড়িতে তোমাকে প্রায় প্রেগন্যান্ট করতে চেয়ে যে কাজটা করতে নিয়েছিলাম, সেই কাজটা তো অর্ধেকটাই বাকি ছিল। এখন শুধু ওই কাজটাই সম্পূর্ণ করতে ইচ্ছে করে।”
শিহাবের এমন খোলামেলা আর সাহসী কথা শুনে আরশি যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বড় বড় চোখ করে শিহাবের দিকে তাকাল। শিহাবের চোখে তখন চিকচিক করছে দুষ্টুমির হাসি আর একরাশ প্রেম। আরশি কোনোমতে শিহাবের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল।
“ছিঃ! শিহাব! কি বলছেন এসব? হাসপাতালের মধ্যে অন্তত একটু লজ্জা করেন।”
শিহাব আরও একটু কাছে ঝুঁকে এসে আরশির নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে দিয়ে বলল।
“বউয়ের কাছে আবার কিসের লজ্জা? আমার মহারানীটা শুধু একবার সুস্থ হোক তারপর তো আসল পাওনা বুঝে নেব।”
আরশি লজ্জায় শিহাবের বুকে মুখ লুকাল। হাসপাতালের সেই গুমোট কেবিনটা এখন কেবল যন্ত্রণার স্মৃতি নয়, বরং দুজনের খুনসুটি আর রোমান্টিক এক আবহে ভরে উঠেছে।
[খান বাড়ি]
বিকাল বেলা আরফা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে, হালকা বাতাসে তার অবাধ্য চুলগুলো উড়ছে।আরফা ম্লান আকাশের দিকে তাকিয়ে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার চারপাশের জোড়া জোড়া মানুষের ভিড় দেখে নিজের একাকীত্বটা আজ যেন একটু বেশিই গায়ে লাগছে। মনের অজান্তেই একরাশ হাহাকার নিয়ে সে বলে উঠল।
“হে আল্লাহ! আর কতকাল এই বিষণ্ণ সিঙ্গেল লাইফ কাটাতে হবে? একঘেয়েমি আর সইছে না, এবার অন্তত মনের মতো কাউকে পাঠাও!
কথাটা বলার সাথে সাথেই হঠাৎ গেটের সামনে টায়ারের ঘর্ষণে গাড়ির শব্দ শোনা গেল৷ সেই শব্দ শোনা যেতেই আরফা চমকে ওঠে বাড়ির গেটের দিকে তাকাল। দেখল একটা ঝকঝকে নতুন গাড়ি বাড়িতে ঢুকছে। আরফা ভ্রু কুঁচকে গাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ি থেকে একে একে বের হয়ে এলো নেহাল, সৃজনী এবং তার বাবা-মা। নেহালের গায়ে কুচকুচে কালো কোট, কালো প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস আর বাঁ হাতে দামী স্মার্ট ওয়াচ ঠিক যেন কোনো সিনেমার নায়ক। আরফা এক মুহূর্তে নেহালকে দেখে থমকে গেল। সে এর আগে আরও দুইবার নেহালকে দেখেছে, কিন্তু আজ যেন নেহালকে একটু বেশিই অন্যরকম লাগছে। আরফা নিজের মনের ভেতর টের পাচ্ছে, এই ছেলেটার ওপর তার অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
হঠাৎ নেহাল চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে সরাসরি ছাদের দিকে তাকাল। ছাদে আরফাকে দেখে সে এমন এক মায়াবী মুচকি হাসি দিল যা আরফার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন এক নিমেষে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। আরফা লজ্জায় দ্রুত চোখ নামিয়ে অন্যদিকে তাকাল, তার ফর্সা গাল দুটো যেন লাল হয়ে উঠল। নেহালরা ভেতরে প্রবেশ করল। আরিফুল খান সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে নেহালদের দেখে তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেন।
“আরে আরে নেহাল বাবা যে আমাদের বাড়িতে ভাবতেও পারিনি।”
নেহাল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সালাম দিল।
“আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। আজকে একদম সপরিবারে হাজির হয়েছি আপনাদের বিরক্ত করতে।”
আরিফুল খান অট্টহাসি দিয়ে বললেন।
“খুব ভালো করেছো বাবা, খুব ভালো করেছো একদম ।”
আরিফুল খান নেহালের বাবার সাথে কুশল বিনিময় করে সবাইকে ড্রয়িং রুমে বসতে বললেন। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির সবাই এক এক করে ড্রয়িং রুমে হাজির হলেন। নেহালদের দেখে সবাই মহা খুশি। রৌশনি খান তো নেহালের পছন্দসই খাবার রান্না করতে রান্নাঘরে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছেন। সবাই ড্রয়িং রুমে বসে হাসি খুশি আড্ডা দিতে লাগল। কিন্তু সৃজনীর চোখ চাতক পাখির মতো শুধু একজনকে খুঁজছে আর সেই মানুষটাই হলো আব্রাহাম খান রৌদ্র। ঠিক সেই মুহূর্তে রৌদ্র আর আয়ান অফিস থেকে ফিরল। দুজনেই বেশ ক্লান্ত। রৌদ্র সোফায় বসে শার্টের বোতাম আলগা করছিল, ঠিক তখনই তুরা পাশ থেকে এসে কোনো কথা না বলে রৌদ্রের হাত থেকে কোটটা নিয়ে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল। বিষয়টা সৃজনীর কাছে বড্ড অদ্ভুত লাগল রৌদ্রের জিনিস এই মেয়েটা এত অধিকার নিয়ে নিল কেন? পর মুহূর্তে সে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলল, ভাবল হয়তো ছোট বোন হিসেবে ভাইয়ের যত্ন করছে।
সবার আড্ডার মাঝেই হঠাৎ নেহালের বাবা পরিবেশটা একটু গম্ভীর করে সবার উদ্দেশ্যে বললেন।
“অনেক তো গল্প হলো। যে কারণে আজ আসা, সেই আসল কথাটাই তো বলা হলো না।”
আনোয়ার খান উৎসুক হয়ে বললেন।
“হ্যাঁ ভাইসাব, বলেন কী বলবেন?।”
নেহালের বাবা নেহালের কাঁধে হাত রেখে সগর্বে বললেন।
“আসলে আমার ছেলেটা আপনাদের বাড়ির একটা মেয়েকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করতে চায়। যদি আপনাদের কোনো আপত্তি না থাকে, তবে আরিফুল ভাইসাহেবের ছোট মেয়ে আরফার সাথে আমার নেহালের বিয়ে দিতে চাই।”
কথাটা শোনামাত্র ড্রয়িং রুমে যেন আনন্দের বিদ্যুৎ খেলে গেল। আরিফুল খান খুশিতে সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন।
“আপত্তি কেন থাকবে! নেহালের মতো হীরের টুকরো ছেলের হাতে আমার মেয়েকে দিতে পারবো, এটা তো আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার।”
আরিফুল খান এবার আনোয়ার খান আর আশিক খানের দিকে তাকিয়ে সম্মতির আশায় বললেন।
“তোমরা কী বলো ভাইয়ারা? তোমাদের অমত নেই তো কোনো?”
আনোয়ার খান হাসতে হাসতে সম্মতি দিয়ে বললেন।
“আরে আপত্তি কেন থাকবে! নেহালকে তো আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। নেহালের মতো যোগ্য আর মার্জিত ছেলের হাতে আমাদের আরফার বিয়ে হলে মেয়েটার জীবনটা একদম সার্থক হবে। এর চেয়ে খুশির খবর আর কী হতে পারে!”
আশিক খানও মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন।
“ঠিক বলেছ ভাইজান আমাদেরও কোনো অমত নেই।”
এরপর আনোয়ার খান তনুজা খান আর হিমি খানের দিকে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বললেন।
“এই যে ছোট বোনরা, তোমরা দুজন দেরি না করে জলদি ছাদে যাও আর আমাদের আরফাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে ড্রয়িং রুমে নিয়ে এসো।”
বড়দের কথার মাঝেই তিথি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠে এল। দেখল আরফা তখনো গ্রিল ধরে আনমনে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে নিজের সিঙ্গেল ভবিষ্যৎ ভাবনায় সে বিভোর। তিথি দুষ্টুমি করে নিজের চুলের বেণুনীটা স্টাইল করে ঘোরাতে ঘোরাতে গাইতে শুরু করল।
“মনটা আমার উড়ু উড়ু, বুকটা ফেটে তরু তরু! আহা, আমার আপুর বিয়ের লগন এল রেএএএ! আমার আপুর বিয়ের লগন এল রেএএএ।”
তিথির এমন আজব আর সুর করে গান গাওয়া দেখে আরফা হকচকিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে বলল।
“কী হয়েছে রে তোর? পাগল হয়ে গেছিস নাকি? কিসের বিয়ের লগন?”
তিথি একগাল হাসি দিয়ে আরফার দুই হাত ধরে নাচতে নাচতে বলল।
“পাগল আমি হইনি আপু, পাগল হয়েছে ওই যে নিচে বসে থাকা নেহাল ভাইয়া! উনি উনার বাবা-মাকে নিয়ে এসেছেন তোমাকে নিজের বউ করে নিয়ে যেতে। নিচে বিয়ের কথা পাকা হচ্ছে। চলো জলদি, আম্মুরা তোমাকে নিতে আসছে।”
তিথির কথা শুনে আরফার মনে হলো তার মাথায় যেন হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়ল! নেহাল তাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করতে এসেছে এবং নিচে রীতিমতো বিয়ের পাকা কথা চলছে এটা যেন তার কল্পনারও বাইরে ছিল। আরফা মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই তনুজা খান আর হিমি খান ছাদে এসে হাজির হলেন। হিমি খান হাসিমুখে আরফার দিকে তাকিয়ে বললেন।
“আরফা, নিচে চল মা। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”
আরফার বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছিল। তিথি পাশে দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসছে আর ভ্রু নাচিয়ে ওকে ক্ষ্যাপাচ্ছে। তনুজা খান আর হিমি খান মিলে পরম যত্নে আরফাকে একটা সুন্দর শাড়ি পরিয়ে দিলেন। আরফা নিজেও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা একটু সাজিয়ে নিল নিজেকে। সত্যি বলতে, তার মনটা কিন্তু খুব একটা খারাপ লাগছে না। কারণ নেহালকে তারও বেশ ভালো লাগে। কিন্তু হুট করে এভাবে বিয়ে হয়ে যাবে ভাবতেই তার মনে হচ্ছিল সিঙ্গেল লাইফটাই বুঝি বেশি ভালো ছিল!
সাজগোজ শেষে আরফাকে নিচে ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসা হলো। আরফা অত্যন্ত জড়সড় হয়ে মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল এবং উপস্থিত সবাইকে নিচু স্বরে সালাম দিল। সবাই খুশি মনে সালামের উত্তর নিয়ে তাকে বসতে বললেন। আরফা আনোয়ার খানের পাশের সোফাটায় মাথা নিচু করে চুপচাপ বসল।
এদিকে নেহাল কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও আরফার ওপর থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছে না। সে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে এই মায়াবী মেয়েটির দিকে। নেহালের মনে পড়ে গেল আরশির বিয়ের সেই ‘বউ ভাত’ অনুষ্ঠানের দিনটির কথা। নীল শাড়িতে আরফাকে যখন সে প্রথম দেখেছিল, সেই দিনই সে মেয়েটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। সে তখনই মনে মনে ঠিক করেছিল এবং নিজের বাবা-মাকেও জানিয়ে রেখেছিল ছুটি পেলেই সে আরিফুল খানের ছোট মেয়ে আরফাকে নিজের করে নেবে। এখন নেহালের হাতে অনেক দিনের ছুটি, আর এই সুযোগটাই সে হাতছাড়া করতে চায় না।
অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, এই নেহাল আসলে কে? যারা ‘নির্লজ্জ ভালোবাসা’ গল্পটি শুরু থেকে পড়েছেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে নেহাল আগে এই গল্পে ছিল। নেহাল পেশায় একজন পাইলট। সেই নেহাল, যে তুরাকে রৌদ্রের কাছে যেতে সাহায্য করেছিল। তবে আজ সে কোনো সাহায্যর গল্প নয়, বরং আরফাকে আজীবনের জন্য নিজের করে নেওয়ার গল্প লিখতে এসেছে।
নেহালের বাবা আরিফুল খানের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন।
“ভাই সাহেব, মেয়ে তো সামনেই আছে। এখন যদি আপনারা অনুমতি দেন, তবে আমরা বিয়ের তারিখটা নিয়ে একটু আলাপ করতাম।”
আনোয়ার খান মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে বললেন।
“অবশ্যই! শুভ কাজে দেরি করার কোনো মানেই হয় না।”
বড়দের সম্মতিতে এবং সবার হাসিমুখের উপস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যেই আরফার বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়ে গেল। ঠিক করা হলো, সামনের জানুয়ারির ৭ তারিখ, অর্থাৎ আগামী শুক্রবার হবে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান এবং তার আগের দিন বৃহস্পতিবার ঘটা করে হবে আরফার গায়ে হলুদ।
ড্রয়িং রুমে তখন আনন্দের হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে। তনুজা খান আর হিমি খান একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন, হিমি খান তো খুশিতে চোখে পানিই নিয়ে এলেন। আরফা তখনো মাথা নিচু করে বসে আছে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে এখন লাজুক এক চিলতে হাসি। নেহাল নিজের জয়ের আনন্দে একবার আরফার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যাকে পাওয়ার জন্য সে মনে মনে এতকাল অপেক্ষা করেছে, আজ সে তার হতে যাচ্ছে।
অবশেষে আমাদের শান্ত-শিষ্ট আরফার বিয়ে ঠিক হলো। সিঙ্গেল লাইফের রঙিন দিনগুলো পেছনে ফেলে বেচারি এবার মিঙ্গেল হতে যাচ্ছে! এক নতুন জীবনের পথে পা বাড়াতে যাওয়া এই জুটির জন্য তাহলে চলুন আমরা সকল পাঠক মিলে একস্বরে বলি আলহামদুলিল্লাহ।
খান বাড়িতে এখন উৎসবের আমেজ। আরশির সুস্থতা আর আরফার বিয়ের খবর সব মিলিয়ে বিষাদের মেঘ কেটে গিয়ে এখন কেবলই খুশির রোদ্দুর।নেহালরা অবশেষে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। ড্রয়িং রুমের সেই শোরগোল থামতেই রৌদ্র তার ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। রুমে ঢুকে সে দেখল তুরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হন্যে হয়ে কী যেন খুঁজছে। রৌদ্র নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে তুরাকে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা তুরার কাঁধে ডুবিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল।
“বউ, আমার না ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। একটু আদর করবা?”
বলা হয়নি, রৌদ্র এখন তুরাকে ‘তুমি’ করে ডাকে। নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে ‘তুই’ করে ডাকাটা এখন তার কাছে বড্ড বেমানান আর অসহ্য লাগে। তাই সে এখন তুরাকে ‘তুমি’ বলেই আপন করে নেয়।
রৌদ্রের বাহুবন্ধন আর এমন আচমকা আবদার শুনে তুরা ছটফট করে তার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করল। মুখ ঝামটা দিয়ে সে বলল।
“অসভ্য! মাথা ব্যথা করছে তো টিপে দিতে বলবেন, তা না আদর করমু! সবসময় শুধু অসভ্যতামি করার ধান্দা। এই নির্লজ্জ পুরুষ, ছাড়ুন বলছি! যান, এখনই গিয়ে গোসল করেন। শরীর থেকে ঘামের উৎকট গন্ধ আসছে।”
রৌদ্র তবুও ছাড়ল না, বরং তুরার ঘাড়ের কাছে নাক ডুবিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে মুচকি হেসে বলল।
“ঘামের গন্ধ না ছাই! আমার বউয়ের কাছে তো এটাকেও পারফিউম মনে হওয়ার কথা। আর মাথা ব্যথা তো কপালে একটা চুমু খেলেই সেরে যাবে, টিপতে হবে কেন?”
তুরা এবার একটু জোর করেই রৌদ্রকে সরিয়ে দিল। আয়নায় নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করতে করতে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রৌদ্রের দিকে। রৌদ্রের চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও তুরার প্রতি তার সেই চিরচেনা দুষ্টুমি আর ভালোবাসার দৃষ্টিটা আগের মতোই প্রখর। তুরা গটগট করে আলমারি থেকে রৌদ্রের তোয়ালে বের করে তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল।
“চুপচাপ গিয়ে শাওয়ার নিন তো নইলে আজ রাতে কিন্তু আপনার এই ‘আদুরে বউ’ আপনাকে বিছানায় শুতে দেবে না,সোফায় গিয়ে রাত কাটাতে হবে।”
রৌদ্র তোয়ালেটা লুফে নিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। তুরার এই মেকি রাগ আর ধমক তাকে এখন যন্ত্রণার চেয়ে বেশি প্রশান্তি দেয়। সে বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বিড়বিড় করে বলল,
“দেখি কদ্দুর তেজ দেখানো যায় মিসেস আব্রাহাম খান রৌদ্র, দিনশেষে তো আমার বুকের মাঝেই আসতে হবে।”
তুরা নিজের মাথার চুলগুলো উঁচু করে ঝুটি বাঁধতে বাঁধতে বিড়বিড় করে বলল।
“অসভ্য!”
ঠিক সেই মুহূর্তে রৌদ্র ওয়াশরুমের দরজার ওপার থেকে আবার উঁকি দিল। তুরার কথাটি তার কানে যেতেই সে বাঁকা হেসে বলল।
“সব পুরুষই তার বউয়ের কাছে অসভ্য, নির্লজ্জ আর না জানি কত কী! তোমাদের অভিধানে আমাদের জন্য এই গালিগুলোই তো সবচেয়ে বড় ডাকনাম, বুঝেছ আমার শেহজাদী বেগম?”
বলেই রৌদ্র বিজয়ীর হাসি হেসে শিষ বাজাতে বাজাতে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। তুরা দরজার দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। রৌদ্রের এই নির্লজ্জ ভালোবাসা সামলানো যে কারোর সাধ্যের অতীত!
অন্যদিকে, আয়ানও ক্লান্ত শরীরে নিজের রুমে ফিরল। রুমে ঢুকেই দেখল সোফাই বসে তিথি পায়ের ওপর পা তুলে নকে আয়েশ করে নেলপলিশ দিচ্ছে। আয়ান নিজের ঘামে ভেজা কোটটা খুলে সরাসরি তিথির গায়ের ওপর ছুঁড়ে মারল এবং বেশ অধিকার নিয়েই হুকুমের সুরে বলল।
“এই তিথি! যা তো, আমার এই কোটটা ভালো করে ধুয়ে দে।”
বলেই নিজের পা থেকে মোজা জোড়াও খুলে তিথির দিকে ছুঁড়ে মেরে পুনরায় বলল।
“এই মোজা জোড়াও ধুয়ে দিস।”
তিথি তো নেলপলিশ দিচ্ছিল, হঠাৎ গায়ের ওপর এমন দুর্গন্ধযুক্ত কোট আর মোজা পড়ায় সে চমকে উঠল। কোট থেকে নাকে আসা গন্ধে সে নাক-মুখ কুঁচকে বমির মতো ভঙ্গি করে চিৎকার করে উঠল।
“ওয়াক থু! কী বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে! এই আয়ান ভাই, তোমার এইগুলা পোশাক নাকি ডাস্টবিনের আবর্জনা? তুমি কি নর্দমায় গোসল করে আসছ নাকি?।”
তিথি নিজের নাক চেপে ধরে এক হাত দূরে সরে গেল। আয়ান ততক্ষণে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। সে হাসতে হাসতে বলল।
“অফিসের খাটুনি কী জিনিস সেটা তুই বুঝবি না রেএএ রাক্ষসী! এখন বেশি বকবক না করে কাপড়গুলো নিয়ে ভাগ এখান থেকে।”
কথাটা বলেই আয়ান শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে তিথির দিকে আড়চোখে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই বাঁকা হাসিটা দেখে তিথির গা জ্বলে যাচ্ছিল। আয়ান শার্টটা পুরোপুরি খুলে একটা ঝাপটা দিয়ে তিথির গায়ের ওপর ছুঁড়ে মারল।
“যা পেত্নি এই শার্ট টাও ভালো করে ধুয়ে দিস।”
তিথি শার্টটা কোনোমতে দুহাতে ধরে নিজের নাক কুঁচকে ধরল। ঘামের গন্ধে তার দম বন্ধ হওয়ার যোগাড়। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কোমরে হাত দিয়ে বলল।
“সব তো দিয়েই দিছো, তাহলে প্যান্ট কেন বাদ রাখছো? প্যান্টটাও খুলে দিয়ে দাও না এটাও ধুয়ে দেই।”
তিথি ভেবেছিল এই কথা শুনে আয়ান হয়তো লজ্জিত হবে, কিন্তু আয়ান তো আয়ানই! সে একটুও বিচলিত না হয়ে বরং সোফা থেকে ওঠে এক পা এগিয়ে এল। নিজের প্যান্টের বেল্টে হাত রেখে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল।
“তুই যখন এতই রিকোয়েস্ট করছিস, তাহলে প্যান্টটাও খুলে দিতে পারি। দাঁড়া,দিতাছি।”
বলেই আয়ান খট করে প্যান্টের বেল্টটা আলগা করতে শুরু করল, তিথির চোখ যেন কপালে উঠল! সে কল্পনাও করতে পারেনি আয়ান এত বেশি নির্লজ্জ হতে পারে। তিথি সাথে সাথে দুই হাত দিয়ে নিজের চোখ শক্ত করে চেপে ধরল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
“অসভ্য! বেহায়া! নির্লজ্জ পুরুষ! আমি জীবনে তোমার মতো এমন পুরুষ একটাও দেখিনি। একটুও কি লজ্জা নেই তোমার?।”
আয়ানের ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে তিথির এই লাল হয়ে যাওয়া মুখটা খুব উপভোগ করছে। সে তিথির আরও একটু কাছে গিয়ে নিচু স্বরে শাসিয়ে বলল।
“শোন তিথি, তুই কি এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো এই কাপড়গুলো নিয়ে ধুতে যাবি, নাকি আমি সত্যি সত্যি প্যান্ট খুলে দেখাব? মনে রাখিস, একবার যদি প্যান্ট খুলে ফেলি, তখন কিন্তু আমার অন্য মুড চলে আসবে। তখন কিন্তু কাপড় ধোয়ার কথা আর মনে থাকবে না, তখন কী করে বসব তুই কিন্তু ভালো করেই জানিস।”
আয়ানের এই সোজাসাপ্টা আর সাহসী হুমকিতে তিথির কানে-মুখে যেন আগুন ধরে গেল। লজ্জায় সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সে দ্রুত আয়ানের সেই শার্ট আর কোটগুলো এক হাতে আঁকড়ে ধরল।রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিথি বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। সে মনে মনে হাজারটা গালি দিচ্ছে আয়ানকে। আর এদিকে আয়ান আবারো সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে তিথির যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি দিল। নিজের কপাল মুছে সে মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল।
“পাগলি একটা! তোকে শায়েস্তা করার এই মোক্ষম ওষুধটা আমার বেশ জানাই আছে।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৪