নবরূপা
পর্ব_৫ (প্রথম অংশ)
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
ইয়াশা আর জ্যোতির অনেক ভালো একটা খাতির হয়ে গেলো। খুব একটা সময় লাগলো না একে অপরের সাথে বন্ধুত্ব করতে। তাই এবারে দুজনে একসাথেই বাকি শপিং এর কাজ করতে শুরু করলো। এদিকে নীহারিকা বসে রয়েছে ফুড এরিয়ার অন্য একটা স্টলে। এই টেবিল থেকে পুরো শপিং মল টা দেখা যায়। কিনারে বলেই হয়তো। কিন্তু আপাতত নীহারিকার কোনো কিছু তে মন নেই৷ তার হাত পা কাঁপছে। একটু আগে ইরফান কবির তাকে অফার করেছে, —” আমার সাথে এক কাপ কফি খাবেন?”
নীহারিকা চাইলেও না করতে পারে নি। এভাবে কি প্রত্যাখ্যান করা যায়? বিষয়টা কেমন দেখায় না! তাই সে মিষ্টি হেসে রাজি হয়েছে। এদিকে জ্যোতির কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ইয়াশার সাথে যে শপিং করতে গেলো, আর কোনো খবরই নেই৷ এখানে নীহারিকা বাঁচলো নাকি মরল তারও তো খবর নিতে পারে নাকি। সেটাও নিচ্ছে না। নীহারিকার সত্যি বলতে অস্বস্তি হচ্ছে নিজের কারনে। কেনো যেন সবসময় মনে হচ্ছে তাকে ইরফান কবির এর পাশে ঠিকঠাক মানায় না। এমনকি স্টলে ঢোকার সময়ে অনেক মেয়ে কেমন যেন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল, যা দেখে খুবই কষ্ট পেয়েছে নীহারিকা। সে তো আগে থেকেই হাসি-ঠাট্টার পাত্র। কিন্তু তার জন্য সে ইরফান কবির এর সম্মান খোয়াতে চায় না।
এসব ভাবতে ভাবতেই ইরফান এসে সামনের চেয়ারে বসে পড়লো। নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলো নীহারিকা। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা। ইরফান নিজে থেকেই বলল,
—” কফি অর্ডার দিয়ে এলাম। আমার জন্য ব্লাক কফি আর আপনার জন্য…
বলতে বলতেই থেমে গেলো ইরফান। একটু সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—” আপনি কোল্ড কফি খান তো?”
নীহারিকা মাথা নেড়ে বলল,
—” জ্বি অবশ্যই। কোনো সমস্যা নেই।”
কিছুক্ষণ পর নীহারিকা আবারো ভাবনায় ডুব দিলো। আবিষ্কার করে ফেলল ইরফানও কফি খেতে পছন্দ করে। ব্লাক কফি অর্ডার করেছে শুনে নীহারিকা বুঝলো লোকটাও চা খায় না। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো তার। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো এবারে কফি বানানো শিখবেই। আজই শিখবে। তার উথাল পাথাল চিন্তার মাঝেই ইরফান জিজ্ঞেস করল,
—” কী ভাবছেন?”
নীহারিকা মলিন হাসলো। বলল,
—” দূর্ভাগ্য আমার। আপনিও কফি খেতে পছন্দ করেন।”
ইরফান প্রথমে অবুঝের মত চেয়ে রইলো। পরে ব্যপার টা বুঝতেই অন্যদিকে তাকিয়ে তপ্ত বলল,
—” সমস্যা নেই। আপনার হাতের বানানো হলে, চা খাওয়ার অভ্যেস করে নেব। সেদিনের চা টা মন্দ ছিল না।”
নীহারিকা মনে মনে খুশি হলো। মনে শীতল হাওয়া বয়ে গেলো। তবুও মিষ্টি হেসে বলল,
—” অভ্যাস পাল্টাতে হবে না। ওটার থেকে আমার কফি বানানো শেখাটা বেশি সহজ। “
একটু থেমে নীহারিকা বেশ সাহস নিয়ে প্রশ্ন করল,
—” ইনায়া কেমন আছে?”
মেয়ের প্রসঙ্গ আসতেই ইরফানের চোখে-মুখে উজ্জ্বলতা বেড়ে গেলো যেন। খুশি খুশি ভাব নিয়ে বলল,
—” আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো আছে। তবে খেতে চায় না। অসুস্থ হয়ে পড়ছে বারবার। ঠান্ডা লেগে যায়।”
চিন্তিত হলো নীহারিকা।
—” বাচ্চারা খেতে চায়না, এটা স্বাভাবিক। জোর করে হলেও খাওয়াতে হবে। কিন্তু ঠান্ডা লাগার বিষয়টায় বিশেষ নজর দিতে হবে। একবার ঠান্ডা ধরলে পরে অনেক কষ্ট হয়। এমনিতেই বাচ্চা মানুষ! এই সিজনে সবসময় দেখে শুনে রাখতে হয়।”
নীহারিকা কথা বলতে বলতে একটু সামনে ঝুঁকে বসল। গলার স্বরটা বদলে গেল। এই স্বরে দায়িত্ব আছে, মমতা আছে। ইরফান খেয়াল করল, ইনায়ার কথা উঠতেই নীহারিকার চোখ অন্যরকম হয়ে গেল। নাহ, কোনোরকম অস্বস্থি ঘিরে ধরেনি।
এর মধ্যে কফি এসে পৌঁছালো তাদের টেবিলে। নীহারিকা জিজ্ঞেস করলো,
—” ইনায়া কি রাতে ঘুমের মধ্যে ঘেমে যায়?”
ইরফান অবাক হয়ে বলল,
—” হ্যাঁ, মাঝেমাঝে।”
—” তাহলে রাতে হালকা কাপড় পরাবেন। আমরা অনেক সময় ভয় পেয়ে বেশি ঢেকে দিই, তাতেই উল্টো ঠান্ডা ধরে। আর গোসলের পর চুল একদম শুকানো খুব জরুরি। বাচ্চাদের মাথা ভেজা থাকলে ঠান্ডা সবচেয়ে আগে সেখানেই ধরে।”
ইরফান চুপচাপ শুনছিল। কফির কাপটা হাতে নিয়েও ভুলে গেছে খেতে। নীহারিকা আবার বলল,
—” খাবারের বেলায় জোর করা যাবে না, কিন্তু বুদ্ধি করে খাওয়াতে হয়। খেলনার মাঝখানে, গল্পের ফাঁকে, কখনো গান গেয়ে। ইনায়া তো কথা বলতে শেখার বয়সে। ওকে খাওয়ানোটা খেলার মতো করে করতে হবে।”
ইরফান হালকা হেসে ফেলল।
—” আপনি তো সব জানেন মনে হচ্ছে।”
নীহারিকা এক মুহুর্তের জন্য থেমে লজ্জা পেল। চোখ নামিয়ে বলল,
—” না, সব জানি না। তবে যতটুকু জানি, তা হয়তো শেখার পথটা সহজ করবে। আমার চাচাতো এক বোনের ছেলের দেখাশোনা করেছিলাম তো। আর, বাচ্চারা তো মনে করেন, মুখে কথা বলে না, অনেক সময় শরীর দিয়েও কথা বলে। কথাটা শুনতে অদ্ভুত হলেও সত্যি। দেখবেন, এই জন্য মায়েরা সবসময় বুঝে যায়!”
এই কথাটুকু ইরফানের বুকে কোথায় যেন লেগে থাকল। শরীর দিয়ে সব বলে দেয়—কথাটা শুধু ইনায়ার জন্য না, নীহারিকার জন্যও খাটে। নীহারিকা আবার বলল,
—” অসুস্থতা প্রতিরোধের আরেকটা চমৎকার পদ্ধতি হলো, বাচ্চাকে রাতে বুকের কাছে রেখে ঘুম পাড়ানো। বাবার শরীরের উষ্ণতা বাচ্চাদের খুব শান্ত করে। ভয় পায় না তখন।”
—” আর মা?”
ইরফান হুট করেই প্রশ্ন করে ফেলায় নীহারিকা বোঝেনি। ইরফান আবারো বলে,
—” আর মায়ের শরীরের উষ্ণতা বাচ্চাদের শান্ত করে না?”
নীহারিকা কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর সূক্ষ্ণ হাসির রেখা টেনে বলল,
—” অবশ্যই। সত্যিই বলতে, মায়ের ক্ষেত্রে একটু বেশিই।”
এইবার ইরফান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তবে বলতেও পারলো না। মনের কথা মুখে এনে বলতে পারলো না, ” তবে ইনায়াকে শান্ত করার দায়িত্ব টা আপনারই রইলো। আমার কাঁধে আবার নতুন দায়িত্ব অর্পণ হচ্ছে তো। একটু ব্যস্ত থাকব বউ নিয়ে!”
তবে বলতে পারলো না। শুধু তাকিয়ে রইলো নীহারিকার দিকে। চোখে মুগ্ধতা স্পষ্ট। এই মেয়েটা কথা বলছে, কিন্তু প্রতিটা কথার ভেতরে দায়িত্বের গন্ধ। আদিখ্যেতা নেই, জাহির করার কিছু নেই। অথচ কতটা গভীর!
মা-রা আসলেই অসাধারণ, মনে মনে বলল ইরফান। আর ঠিক তার পরের ভাবনাটা তাকে নিজেকেই একটু থমকে দিল। নীহারিকা বাস্তবে মা হলে, নিজের সন্তান হলে সে নিশ্চয়ই খুব ভালো মা হবে। এই ভাবনাটা আসার কথা ছিল না। তবুও এলো। স্বাভাবিকভাবেই এলো। নীহারিকা তখনো বলছে,
—” আর সবচেয়ে বড় কথা, ইনায়াকে ভয় দেখানো যাবে না। বাচ্চারা ভয় পেলে শরীরটা আরও দুর্বল হয়ে যায়। এই সময় নিশ্চয়ই একটু আধটু জ্বালায়। আধো আধো কথা বলছে যখন, তখন একটু সায় দিতে হবে।”
ইরফান ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—” আপনি জানেন, আমার মেয়েটা আপনাকে দেখলে হাসে।”
নীহারিকা অবাক হয়ে তাকাল।
—” মানে? কখন দেখলো? “
ইরফান একটু অপ্রস্তুত হলো। তবু্ও সামলে নিয়ে সত্যি টাই বলল,
—” গতকাল মা আপনার একটা ছবি টেবিলে রেখেছিল তো। ইনায়া ওটা হাতে পেয়ে নিয়েছিল। তখন আমি এসে দেখলাম, ছবিটায় হাত বুলোচ্ছে, দেখছে আর হাসছে। ওই হাসি টা আমি তখন দেখি, যখন ও আমায় দেখে।”
অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলো নীহারিকা। এমনও হয়? এটাও হতে পারে? সে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” সত্যি?”
—” হ্যাঁ। খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে এমন করে।”
এই কথায় নীহারিকার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু কফির কাপে আঙুল বুলাতে লাগল। স্টলের কোলাহলের মাঝেও, দু’জনের টেবিলে তখন অদ্ভুত এক শান্তি। ইরফান বুঝে গেল—এই শান্তিটা সে আগে কখনো পায়নি। ইরফানের কফি ঠান্ডা হয়ে আসছিল। কিন্তু দু’জনের ভেতরে কোথাও একটা উষ্ণতা ধীরে ধীরে জমে উঠছিল- নাম না জানা, তবুও গভীর।
নীহারিকা কিছুক্ষণ ভাবনায় ডুব দিয়ে রইলো। তখুনি ব্যাগে থাকা ফোনটা ঝংকার তুলে বেজে উঠলো। নীহারিকা ” এক্সকিউজ মি” বলে ফোন টা বের করে দেখলো জ্যোতি। এই মুহুর্তে সামনে ইরফান কবির না থাকলে কলটা ধরেই গালি দিত নীহারিকা। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে পারলো না। ওদিকে জ্যোতি কল লাউড স্পিকারে দিয়েছে। ইয়াশাও ফোনের উপর মাথা ঝুঁকিয়েছে। জ্যোতি টেনে টেনে বলল
—” দো….স্ত। কী অব…স্থা? বেঁচে আছো..?”
নীহারিকা কথা বলার টোন শুনেই ভড়কালো। সামনে বসে থাকা কফির কাপে চুমুক দেয়া লোকাটাকে এক পলক দেখে ফিসফিস করে বলল,
—” তোর কেনো মনে হলো যে আমি মরে যাব। “
এ পর্যায়ে ইয়াশা কথার মাঝে সাইকেল চালিয়ে বলল,
—” না মানে, হবু ভাবি, আসলে আমার হিটলার ভাইটাকে আমি চিনি তো। খুব একটা ভালো মানুষ তো না ওই বান্দা। তাই আমরা একটু কল দিলাম যে তুমি আদৌও ঠিক আছো, নাকি আবার তোমায় কোথাও পাচার করে দিলো। “
বলেই মুখ চেপে হাসলো ইয়াশা। বেচারি নীহারিকা তব্দা খেয়ে তাকিয়ে রইলো সামনে থাকা মানুষটার দিকে। কি সুন্দর, চমৎকার একটা মানুষকে তার নিজেরই বোন হিটলার বলছে! ভেবেই দুঃখ পেলো নীহারিকা। ইয়াশাকে এতটা ফ্রিলি কথা বলতে দেখে অবশ্য খুশি হলো। আপন আপন মনে হচ্ছে সব কিছু।
জ্যোতি এবারে বলল,
—” ইয়ে মানে, দোস্ত, আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কারনে তোকে কল করলাম।”
নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” কী?”
জ্যোতি এবারে শয়তানি চোখে ইয়াশার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে নিশ্চিত হয়ে বেশ অসহায় কন্ঠে বলল,
—” আসলে হয়েছে কী বলতো, আমার ভ্যাবলাকান্ত বয়ফ্রেন্ড রাদ আমায় আর্জেন্ট ডেকেছে। এদিকে ইয়াশারও আবার পায়ের টেংরি ব্যাথা করছে। তাই আমরা না শপিং মল থেকে কাজ সেড়ে বেরিয়ে পড়েছি। হে হে। আর তোর পার্সটাও আপাতত আমার কাছে, এটা পরে নিয়ে নিস ওকে?”
কথাটা শুনেই চোখ বড় করে তাকালো নীহারিকা। তার পার্স ওই বদমাশের কাছে গেলো কখন? আর কীভাবেই বা গেলো। তড়িঘড়ি করে কানে ফোন চেপে ধরে নীহারিকা দেখলো আসলেই তার ছোট্ট পার্সটা নেই। সে এবারে অসহায় চোখে ইরফানের দিকে তাকিয়ে মেকি হেসে, ” এক্সকিউজ মি!” বলে উঠে দাঁড়ালো, একটু অন্যপাশে গিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
—” তুই আমার পার্স কখন নিলি বেয়াদব। এমন কেনো করছিস বোইন? আমি বাড়ি যাব কীভাবে? আর একটু কেনাকাটাও তো ছিল। টাকা পয়সা তো সব ওখানে। “
ইয়াশা এবারে বলল,
—” নো টেনশন ভাবি। ভাইয়া আছে না? ভাইয়া তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেবে। ওকে? জাস্ট চিল! আমার ভাই পুরো নায়কের মত ড্রাইভ করে।”
এবারে পুরো বিষয়টা মাথায় ঢুকলো নীহারিকার। বিচ্ছুগুলো ইচ্ছে করে এমনটা করেছে সে বুঝতেই হাল ছেড়ে দিলো। কিন্তু মনে মনে কষ্টও পেল। কাল পুরো পরিবারের মধ্যে সে শপিং করতে আসলেও কাঙ্খিত জিনিস টা নিতে পারবে না, যেটা আজ নিতে পারলেই বেশি ভালো হতো। তাই টাকা টাও দরকার ছিল। কিন্তু কী আর করার! উপায় তো নেই।
এরমাঝে ইরফানের ফোনেও টিং করে একটা মেসেজের নোটিফিকেশন এলো। ইরফান সেটা পড়ে দেখলো ইয়াশা পাঠিয়েছে, যেখানে লেখা,
—” ভাইয়া শোনো, হবু ভাবিকে সুন্দর করে বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে আসবে ঠিক আছে? কোনোভাবেই ছাড়বে না। তার কাছে কিন্তু কোনো টাকা নেই, সব হাতিয়ে নিয়ে এসেছি দুজনে। আর আমি জ্যোতির সাথে বাড়ি চলে যাচ্ছি। আমার আবার কাবাবে হাড্ডি হতে ভালো লাগে না। হে হে। বেস্ট অফ লাক! বাকি শপিং কাল বাবা-মায়ের সাথে এসেই করব।”
ইরফান খুশি হলো কিনা, দুঃখ পেলো তা জানা নেই। কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে এসে বসলো নীহারিকা। ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো। কফি খাওয়া শেষ হয়েছে ইতোমধ্যে। ইরফান কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই তার ফোনে ইয়াশা আরেকটা মেসেজ পাঠালো, যাতে লেখা,
—” ও হ্যাঁ, ভাবি কী যেন কেনাকাটার কথা বলছিল। আমরা কেওই জানি না। আর তোমারও তো কী যেন কাজ ছিল। দুজনে নিজেদের কাজ খতম করে আসতে পারো। ভাবির কী লাগবে কিনে দিও।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকালো নীহারিকার দিকে। সে শতভাগ নিশ্চিত তার কাছে নীহারিকা এখন মোটেই কোনোরকম কেনাকাটা করে নেবে না। সূক্ষ্ণ জিনিসটাও নেবে না। তাই এ বিষয়ে কিছু বলল না সে। বরং বলল,
—” আপনার আর কোনো কাজ আছে এখানে?”
অপ্রস্তুত নীহারিকা কী বলবে বুঝতে পারলো না। কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল,
—” না, আজ তবে আসি।”
—” কোথায় যাবেন?’
—” বাড়িতে।”
ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—” আমার একটু কাজ আছে। আপনি কিছু মনে না করলে কিছুক্ষণ থেকে যান আমার সাথে। সহযোগিতা হবে আমার। এর বিনিময়ে আপনাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেব আমি।”
নীহারিকা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—” কেমন সহযোগিতা? “
—” কয়েকটা টি শার্ট, শার্ট এবং ইনায়ার জন্য সোয়েটার কিনতে হবে। আপনার পছন্দ ভীষণ ক্লাসিক আর চমৎকার শুনেছি। তাই…
বাকি কথা বলল না ইরফান। বলার প্রয়োজনও নেই। তবে পছন্দ করার প্রশংসা টা যে ইয়াশা-ই ইরফানকে বলেছে এ সম্পর্কে নিশ্চিত নীহারিকা। টি শার্ট আর শার্ট পছন্দের কথা শুনে একটুখানি লজ্জা পেলেও ইনায়ার জন্য সোয়েটার কিনতে আগ্রহী হলো নীহারিকা।
চলবে…
✨ পাঠকমহল, কলেজে এক্সাম শুরু হচ্ছে কাল থেকে। তাই ছোটখাটো একটা পর্ব দিলাম, মানিয়ে নিন। পরবর্তী পর্ব মনে হয় শৃক্রবার দিব ইনশাআল্লাহ। এক্সাম টানা দুদিন আছে। ফেল ঠেকাতে ব্যস্ত হবো🙂 দোয়া রাখবেন।🫶 কেমন হয়েছে জানাবেন।
নবরূপা
পর্ব_৫ ( বাকি অংশ)
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
সব মেয়েদের পছন্দ সুন্দর, কিন্তু খুব কমসংখ্যক মেয়েদের পছন্দ চমৎকার, অন্যরকম সুন্দর। যেমনটা নীহারিকার ক্ষেত্রে খাটে। ইরফান এবার বুঝলো ইয়াশা কেনো নীহারিকা কে নিয়ে এত প্রশংসা করছিল। সত্যিই চমৎকার পছন্দ মেয়েটার। প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ ঘুরে ঘুরে ইনায়ার জন্য খুব সুন্দর দুটো সোয়েটার পছন্দ করেছে নীহারিকা। ইরফানও পছন্দ করেছে। মানতে বাধ্য যে নীহারিকার পছন্দই আলাদা। কিন্তু বিল দেওয়ার সময় ইরফান যখনই পকেটে হাত দেবে তখনই নীহারিকা একটা ছোট্ট আবদার করে বসলো। ধীর গলায় মিনমিন করে বলল,
—” আপনি যদি কোনো কিছু মনে না করেন, তাহলে ইনায়ার সোয়েটারের বিলটা আমি দিই?”
ইরফান একটু সন্দিহান হয়ে তাকালো নীহারিকার দিকে। নীহারিকা এবারে এক বুক সাহস নিয়ে বলল,
—” না মানে, ও তো আমারও মেয়ে, তাই না?”
আর কিছু বলল না ইরফান। পকেটে দেয়া হাত টা ফিরিয়ে এনে নীহারিকা কে ইশারায় সম্মতি দিলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই ইরফান যখন ভাবলো যে নীহারিকা টাকা পাবে কোথায়, পার্স তো নিয়ে গিয়েছে। তখনি তাকে অবাক করে দিয়ে নীহারিকা নিজের কামিজের বাম সাইডের একটা পকেট থেকে এক হাজারের ৬ টা নোট বের করে পাঁচ হাজার টাকা বিল পেমেন্ট করে দিল। অবাক হয়ে তাকালো ইরফান। টাকা আসার উৎস খুঁজতে চোখ পিটপিট করে লালরঙা কামিজ টার দিকে তাকিয়ে রইলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আপনার কামিজে পকেট আছে?”
নীহারিকা মেকি হাসলো।
—” আসলে সেফটির জন্য রেখেছিলাম। আমার প্রায় সব জামাকাপড়েই এরকম পকেট বানানো থাকে, আর এই কয় টাকা পকেটে দেখেছিলাম যাতে পার্সটা হারিয়ে গেলেও সমস্যা না হয়।”
ইরফান তখনো নীহারিকার দিকে তাকিয়ে আছে। এই অবাক হওয়াটা শুধু পকেটের জন্য না। এই মেয়েটার প্রতিটা প্রস্তুত থাকা, নিজের মতো করে নিরাপদ থাকার অভ্যাসটার জন্য। ইরফান ফিক করে হালকা হেসে বলল,
—” আপনার বুদ্ধি দারুণ। আপনি তো দেখি সব দিক থেকেই প্রস্তুত মানুষ।”
নীহারিকা একটু লজ্জা পেল। চোখ নামিয়ে বলল,
—”অভ্যাস হয়ে গেছে। একা চলতে গেলে একটু বেশি সাবধান হতে হয়।”
এই কথাটায় ইরফানের বুকের ভেতর কোথাও একটা চাপ পড়ল। একাই চলতে হয়েছে বলেই, ভাবল সে। উচ্চস্বরে কিছু বলল না। কেবল বিলের রিসিটটা হাতে নিয়ে বলল,
—”তবুও। যাক, ইনায়ার জন্য আপনার পছন্দ করে কিনে দিলেন, এটা স্পেশাল হলো। ভালো করেছেন।”
নীহারিকা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে তৃপ্তি আছে, দায়িত্বও আছে। সে সোয়েটার দুটো ভাঁজ করে খুব যত্ন করে ব্যাগে তুলল। ইরফানের দেখে মনে হলো শুধু কাপড় না, মেয়েটা ভবিষ্যতের কোনো ছোট্ট অংশ গুছিয়ে রাখছে। দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। শপিং মলের আলো ঝলমলে ভিড়, মানুষের কোলাহল, সবকিছুর মাঝখানে তাদের কথাবার্তা অদ্ভুতভাবে নীরব, শান্ত। ইরফান হঠাৎ থেমে গেল। নীহারিকাও থামল।—”কিছু হলো?” সে জিজ্ঞেস করল।
ইরফান একটু ইতস্তত করল। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” আপনি ইনায়াকে সোয়েটার কিনে দেবেন বলে আবদার করেছেন, আমি কিন্তু তাতে আপনাকে বাঁধা দিইনি। তাই এখন আমি একটা আবদার করবো, যদি আপত্তি না থাকে।”
নীহারিকা অবাক হলো।
—”বলুন।”
ইরফান চারপাশে তাকাল। অস্বস্তি লুকিয়ে নিজের কথাটাকে হালকা করে নিতে চাওয়ার প্রয়াস। তারপর বলল,
—” আপনি যখন ইনায়ার জন্য এত সুন্দর কিছু পছন্দ করলেন…,তখন মনে হলো আমার জন্যও যদি একবার পছন্দ করে দেন? আমি কিন্তু তখনও আপনাকে কথাটা বলেছি, বোধহয় খেয়াল করেন নি।”
নীহারিকা প্রথমে বুঝতেই পারল না। একটু চিন্তায় পড়ল মেয়েটা। কারণ তার কাছে এখন মাত্র এক হাজার টাকা আছে। এই এক হাজার টাকা দিয়ে সে কোনো ভাবেই ইরফানকে কিছু কিনে দিতে পারবেনা। তাই সে আমতা আমতা করা শুরু করলো। ইরফান হালকা হেসে বলল,
—” আপনাকে কিনে দিতে হবে না ম্যডাম। পছন্দ করে দেবেন। আমার ক্ষেত্রে আপনার পছন্দটা জানতে ইচ্ছে করছে।”
এই কথায় নীহারিকার গাল হালকা গরম হয়ে উঠল। এমন আবদার সে আশা করেনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—”আমি তো বিশেষ কিছু জানি না আপনার পছন্দের ব্যাপারে।”
ইরফান কাঁধ ঝাঁকাল।
—” সেটাই তো ইন্টারেস্টিং পার্ট। আজ আপনার চোখ দিয়েই নিজেকে দেখতে চাই।”
নীহারিকা আর না বলতে পারল না। মৃদু মাথা নেড়ে বলল,
—”ঠিক আছে। তবে দোষ দেবেন না যদি পছন্দ না হয়।”
ইরফান হাসল। সেই হাসিটা আজ বারবার বেরিয়ে আসছে।
—”পছন্দ না হওয়ার সুযোগ নেই। আপনি যে চমৎকার পছন্দের মানুষ।”
নীহারিকা সামনে হাঁটতে শুরু করল। ইরফান ঠিক এক কদম পিছনে। এই প্রথমবার, নীহারিকার মনে হলো, সে কাউকে শুধু অনুসরণ করছে না, কাউকে সঙ্গে নিয়েই এগোচ্ছে।
“কবির মহল” এর বসার ঘরটা আজও বরাবরের মত শান্ত, নীরব। কেও নেই উল্লাস করে মাতিয়ে রাখার জন্য। তামান্না সোফায় বসে বসে উলের সোয়েটার বানাতে ব্যস্ত। তার পড়নে কলাপাতা রংয়ের একটা মলিন শাড়ি, চুল গুলো খোপা করে বাঁধা, মুখে ক্লান্তির দাগ স্পষ্ট। মেয়েটার বয়স খুব একটা বেশি নয় বরং এই বয়সে মেয়েদের থাকতে হয় প্রাণ চঞ্চলা হয়ে। অথচ তামান্না কেন যেন মুখে হাসি আনতে পারে না। এটা অবশ্য ইরফানের বিয়ের কথা শুনে ঘটেছে তা নয়। প্রথম থেকেই তার মুখে কোনো হাসি নেই। তবে জীবনে দুটো জিনিসই তার হৃদয়ে হাসির ফোয়ারা এনে দেয়। ইনায়া এবং ইরফান। দুজনকে কম ভালোবাসেনি তামান্না। হৃদয়ের সবটুকু সত্যিকারের ভালোবাসা শুঁষে তাদের বিলিয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। তবে সে এটা মানে ইরফান কে নিজের স্বামীর রূপে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা তার বিলাসিতা ছিল। এজন্য উপরওয়ালা তার ভাগ্যে আজ পর্যন্ত নিজের প্রতি ইরফানের একটুখানি মায়া ও ভালোবাসা রাখেনি। সত্যিটা মানতে কষ্ট হয় তামান্নার। কিন্তু এটা সত্যি যে ইরফান তামান্নাকে খুব একটা পছন্দ করে না। কয়েক বছর আগে যেমন ছোট বোনের মত হলেও আদর স্নেহ করতো, কিন্তু আজকাল সেটাও করে না। এর অবশ্য কারণ আছে। অতীতে একটা মস্ত বড় ভুল করেছিল তামান্না। কিন্তু সেই ভুলের মাশুল যে তাকে এভাবে দিতে হবে, তা সে ভাবেনি। ইরফানের কাছ থেকে অবহেলা পেতে পেতে সে আজ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে সে মানে যে তার ভুল ছিল। এসব কথা ভাবতে ভাবতে হুট করে চমকে উঠলো সে। ইরফানের গাড়ির শব্দ তার বড্ড চেনা। লোকটা বাড়ির গেট পার করলেই টের পায় সে। ইরফান এসেছে বুঝতেই দ্রুত হাতে বানানো সোয়েটার টা সোফায় রেখে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তামান্না। তার কখনো এক সেকেন্ডও দেরি হয়না দরজা খুলতে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তামান্না গভীর শ্বাস নিল। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠছে— এই অনুভূতিটা সে চেনে। প্রত্যাশা আর ভয় মিশ্রিত একটা অস্বস্তি। চাবির শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই দরজা খুলে গেল।
ইরফান ভেতরে ঢুকলো। গম্ভীর মুখ, কাঁধে ক্লান্তির ছাপ। চোখে পড়লো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তামান্নাকে। এক সেকেন্ডের জন্য থামল সে, তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
—” দাঁড়িয়ে আছো কেনো?”
তামান্না হালকা হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসিটা চোখে পৌঁছালো না।
—” দরজা খুলবো বলে। ভেবেছিলাম আপনি দরজা নক করবেন।”
ইরফান আর কিছু বলল না। জুতো খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ড্রয়িংরুমে এসে একবার চারপাশে তাকাল। সবকিছু আগের মতোই আছে, পরিপাটি, নিঃশব্দ। সোফায় রাখা আধা-তৈরি সোয়েটারটার দিকে চোখ পড়তেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার।
—” কার জন্য বানিয়েছো?”
তামান্না একটু থমকে গেল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
—” ইনায়ার জন্য। শীত পড়ছে তো।”
ইরফান মনে মনে ভাবলো কিছু একটা। আর তাকাল না। কেবল মাথা নেড়ে নিল। এই নীরব সম্মতিটুকুই আজকাল তামান্নার প্রাপ্তি। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকল। কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু কী বলবে জানে না। অবশেষে সাহস করে বলল,
—” আপনাকে…ক্লান্ত দেখাচ্ছে ইরফান ভাই। বাইরে অনেকক্ষণ ছিলেন, কাজ ছিল?”
ইরফান কোটটা সোফার এক কোণে রেখে বলল,
—”হ্যাঁ।”
এক শব্দের উত্তর। তামান্না চুপ করে গেল। সে জানে, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করলে এই মানুষটা আরও দূরে সরে যায়। তবুও নিজের অজান্তেই বলে ফেলল,
—”কফি দেবো?”
ইরফান একটু ভেবে বলল,
—”না। দরকার নেই।”
এই ‘দরকার নেই’ শব্দটা তামান্নার কানে এসে ভারী হয়ে বসে। সে মাথা নেড়ে নিল। আর কিছু বলল না। ইরফান হঠাৎ সোফায় বসে পড়ল। কপালে হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। মনে হলো খুব গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে আছে। তামান্না কয়েক কদম এগিয়ে এসে থামল।
—”কিছু হয়েছে ইরফান ভাই?”
কোনো কারণ ছাড়াই সব সময় তামান্না এভাবে ইরফানের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু বারংবার তাকে কষ্ট পেতে হয়, তবুও যেন তার মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে না। লজ্জা লাগে না, একটুখানি অস্বস্তিও হয় না মানুষটার সাথে বারবার কথা বলতে গেলে, না জানি এটা তার কেমন রোগ। তামান্না আবারো জিজ্ঞেস করল ইরফানের কিছু হয়েছে কিনা। গলাটা খুব সাবধানে বেরোল, যেন শব্দটা বেশি জোরে হলে ভেঙে যাবে। ইরফান তাকাল তার দিকে। এই প্রথম একটু সময় নিয়ে। সেই দৃষ্টিতে বিরক্তি নেই, কিন্তু দূরত্ব আছে।
—” না।”
আবার সেই এক শব্দ। তামান্না বুঝে গেল—এর বেশি আর কিছু পাওয়া যাবে না। সে ধীরে ফিরে গিয়ে সোফায় রাখা সোয়েটারটা তুলে নিল। আবার বুনতে শুরু করল। উলের ফাঁকে ফাঁকে তার আঙুল কাঁপছে, কিন্তু সে থামে না। ইরফান চুপচাপ বসে রইল। কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল। নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার আগে শুধু একবার বলল,
—” ইনায়া ঘুমিয়ে পড়েছে তো?”
তামান্নার চোখ ভিজে উঠল, তবু কণ্ঠ ঠিক রেখে বলল,
—” হ্যাঁ ইরফান ভাই, ঘুমিয়ে পড়েছে। আপাতত আমার ঘরে ঘুম পাড়িয়েছি, পরে আপনার ঘরে দিয়ে আসব।”
ইরফান মাথা নেড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা নরম, কিন্তু তামান্নার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে জানে, এই বাড়িটা শান্ত, নীরব। কিন্তু এই নীরবতার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি শব্দ জমে থাকে। সে আবারো নিজের চিন্তায় ডুব দিয়ে বসলো। ঠিক এক সপ্তাহ পর এ বাড়িতে নতুন সদস্যের আগমন ঘটবে, এ বাড়ির একমাত্র বউ পদার্পণ করবে। তামান্না তাহিয়ার সাথে কখনোই ভালো ব্যবহার করতে পারত না। মেয়েটার আচার-আচরণ তার কোন ভাবেই ভালো লাগতো না। প্রথম এক মাস খুব কষ্টে কাটিয়েছে সে এই বাড়িতে। তাহিয়ার আলগা পিরিত এবং অতিরিক্ত নাটকীয় ব্যবহার দেখে সে আর টিকে থাকতে পারে নি। এসব সহ্য করতে না পেরে চলে গিয়েছিল তামান্না। এখন সেই ভয়টা আবারও পাচ্ছে সে। নতুন বউ আসবে বাড়িতে। না জানি কেমন ব্যবহার হবে, তামান্না কে কেমন চোখে দেখবে তাও সে জানেনা। তবে তামান্না এটুকু জানে সে কখনোই এমন কোনো আচরণ করবে না, যাতে ইরফানের সংসারে ক্ষুদ্র প্রভাব পড়ে। নিজেকে দমিয়ে রাখবে সে। এত বছর যখন নিজেকে সামলে রাখতে পেরেছে, এখনো পারবে। তাকে পারতে হবে।
নীহারিকা মনটা ভীষণ খারাপ। সে আজ গিয়েছিল ইরফানের জন্যই কিছু একটা কিনতে। উপহার দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পার্সটা জ্যোতি হাতিয়ে নেয়াতে সে আর নিতে পারলো না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো নীহারিকা। কাল বিয়ের কেনাকাটার মাঝে সে এক ফাঁকে গিয়ে কাঙ্খিত জিনিসটা কিনে নেবে। হুট করেই রেবেকা বানুর ডাক পড়তেই কফি বানানোর চেষ্টা করতে থাকা নীহারিকা দৌঁড়ে গেলো রেবেকা বানুর ঘরে। রেবেকা বানুর ঘরে ঢুকতেই নীহারিকা থমকে গেল। বিছানার উপর সারি সারি জুয়েলার্সের বক্স, কিছু পুরোনো, কিছু নতুন, কিছু এমন যেগুলোর রং সময়ের সাথে একটু মলিন হয়ে গেছে, তবু ঝলমল করছে স্মৃতিতে। রেবেকা বানু বিছানার এক পাশে বসে আছেন। চোখে একরাশ স্নিগ্ধতা, মুখে চাপা উত্তেজনা।
—”এদিকে আয়!” নরম স্বরে ডাকলেন তিনি।
নীহারিকা ধীরে এগিয়ে গেল।
—”এত গয়না কেন মা?”
গলায় বিস্ময় লুকাতে পারল না। রেবেকা বানু একটা একটা করে বক্স খুলতে লাগলেন। শান্তভাবে বললেন,
—”এগুলো আমার ছিল, তবে আর আজ থেকে এগুলো তোর।”
নীহারিকার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
—” মা, না। এগুলো তো তোমার। আমি পরে নেব, তখন!”
রেবেকা বানু কথা কাটলেন না। বরং সোনার একটা মোটা চেইন হাতে তুলে নীহারিকার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
—” আমি তোর বয়সে বিয়ে করে এসেছিলাম একখানা কানের দুল আর দুই জোড়া চুড়ি নিয়ে। বাকিগুলো তোর বাবা আমাকে দিয়েছে। আজ আমি সেগুলো তোকে দিচ্ছি। এটা দান না, দায়িত্ব।”
নীহারিকার চোখ ভিজে উঠল।
—” কিন্তু মা… আমি তো কিছুই চাইনি।”
—”চাওয়ার দরকার নেই। মেয়েরা অনেক কিছু না চেয়েই শিখে যায় সহ্য করতে। কিন্তু কিছু জিনিস মায়েরাই দিয়ে দেয়, যাতে মেয়েরা নিজেকে ফাঁকা মনে না করে।”
তিনি এবার একটা পুরোনো লকেট তুলে ধরলেন। লকেটটার ভেতরে ফিকে হয়ে যাওয়া একটা ছবি।
—” এটা তোর বাবার। বিয়ের সময় আমাকে দিয়েছিল। আমি এটা তোকে দিচ্ছি, যেন কখনো মনে হয়—তুই একা না।”
নীহারিকা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। সে রেবেকা বানুর হাত ধরে বলল,
—”মা, আমি পারব তো?”
রেবেকা বানু হেসে তার কপালে হাত রাখলেন।
—”মেয়েরা না পারার কথা ভাবে না। তারা করে। তুইও করবি।”
একটার পর একটা গয়না নীহারিকার সামনে রাখলেন তিনি। কিন্তু নীহারিকা কিছুই পরল না। সব বক্স আবার যত্ন করে গুছিয়ে বিছানার পাশে রেখে দিল।
—” এগুলো যাওয়ার সময় দিও মা। তোমার কাছেই রাখো আপাতত। এর যে ভার অনেক, আমি সামলাতে পারব না!”
রেবেকা বানু কিছু বললেন না। শুধু বুঝে নেওয়ার হাসি হাসলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরতেই নীহারিকা বিছানার পাশে বসে পড়ল। বুকটা ভারী, কিন্তু অদ্ভুতভাবে শান্ত। ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল নামটা পরিচিত তবে সেভ না করা নাম্বার। নাম্বারের শেষ তিনটা ডিজিট সিক্স টু ফাইভ। যদিও পুরো নাম্বারই নীহারিকার প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। তবুও ফোন স্ক্রিনে নোটিফিকেশনে সেই নাম্বার দেখে এক মুহূর্ত শ্বাস নিতে ভুলে গেল নীহারিকা। মেসেজ খুলল সে।
❝ সোয়েটার দুটো তুলে রেখেছি। চাইছি, আপনি এসে নিজ হাতে ইনায়া কে পড়িয়ে দিবেন। আর, আপনি ঠিক বলেছিলেন, অফ হোয়াইট টি শার্টে আমায় মন্দ লাগবে না!❞
নীহারিকার ঠোঁটে অজান্তেই একটা নরম হাসি ফুটে উঠল। আসলে টি-শার্ট পছন্দ করার একপর্যায়ে নীহারিকা মুখ ফঁসকে বলে ফেলেছিল, আপনাকে অফ হোয়াইট টি শার্টে হয়তো বেশ সুন্দর লাগবে। কথাটা বলে সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইরফান বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিয়ে অফ হোয়াইট টি-শার্টই কিনেছে তিনটা। নীহারিকা বেশ লজ্জা পেয়েছে তখন, নইলে হয়তো এও বলে দিত, আপনাকে সাদা শার্ট আর কালো শার্টেও অনেক সুদর্শন লাগে। মুচকি হাসলো নীহারিকা। কাল বিয়ের কেনাকাটা, আগামী শুক্রবার বিয়ে। না জানি কেমন হবে আগামী সপ্তাহ থেকে তার নতুন জীবন। তবে নীহারিকা প্রস্তুত, নতুন জীবনে নতুন ভাবে নতুন প্রাপ্তির জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। শুধু দরকার একটু সহযোগিতা ও স্নেহ।
চলবে….
🦋 রিচেইক দিইনি। ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর রেসপন্স করবেন। গত পর্বে হাজার রিয়েক্টও ওঠেনি। আজ এক্সাম ছিল না, তাই লিখে দিলাম। কেমন হয়েছে জানাবেন।
🦋
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ১