দিশেহারা (০৯)
সানা_শেখ
সোহার কাছাকাছি আসতেই জোরে জোরে দরজায় শব্দ হয়। স্থির হয়ে দাঁড়ায় শ্রবণ। সোজা হয়ে থেকেই শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় দরজার দিকে। মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে সোহার দিকে তাকায়। রাগে ফেটে পড়ে হিস হিসিয়ে বলে,
“আমার কাছ থেকে পালাতে চাইছিলি? ভেবেছিস আমি খুঁজে পাবো না?”
সোহা ভয়ে দু’দিকে মাথা নাড়ায়।
“তোর ডাইনি মা তোকে লুকিয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল তাইনা?”
আবারো দু’দিকে মাথা নাড়ায় সোহা।
শ্রবণ এক পা আগাতেই দরজায় জোরে জোরে লাথি দেওয়ার শব্দ হয়। পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে বলে,
“উঠে বিছনায় বস।”
সোহা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিচ থেকে উঠে বিছনায় বসে। হাতে-পায়ে ব্যথা পেয়েছে আজকেও।
শ্রবণ দরজা খুলে দেয়। দরজার সামনে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সিয়াম গর্জন করে বলে,
“আমার বোনের গায়ে একটা টোকা দিলে খবর আছে তোমার।”
“কত বার বলেছি আমার সামনে কন্ঠ নিচু রেখে কথা বলবি? গলার আওয়াজ চিরতরে বন্ধ করতে না চাইলে নিচু স্বরে কথা বলবি এর পর থেকে।”
“তোমাকে ভয় পাই না আমি। আমার বোনকে বের করো।”
শ্রবণ সিয়ামের টুটি চেপে ধরে হিস হিসিয়ে বলে,
“গলার আওয়াজ নিচে রাখবি নয়তো—
ছুঁড়ে ফেলে সিয়ামকে। অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে গর্জন করে বলে,
“আপনার ছেলেকে সামলান নয়তো ওর গলার স্বর আমি সামলে নেবো সবসময়ের জন্য।”
সিয়াম নিচ থেকে উঠে তেড়ে আসতেই অনিমা চৌধুরী ছেলেকে আটকে রেখে ভীত স্বরে বলেন,
“শান্ত হ সিয়াম, এমন করছিস কেন?”
“ও আমার বোনকে টর্চার করছে আর তুমি আমাকে শান্ত হতে বলছ?”
শ্রবণ সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোর বোনকে আমি মে’রে ফেলবো যেভাবে তোর মা আমার বোনকে মে’রে ফেলেছিল।”
শ্রবণের কথা শুনে স্পর্শ, সিয়াম আর সোহা শকড। শ্রবণের বোন? বোন আসলো কোথা থেকে? সবাই তো জানে শামীম রেজা চৌধুরীর দুই ছেলে, তাহলে মেয়ে আসলো কোথা থেকে আবার অনিমা চৌধুরী মা’র’লো কীভাবে?
শ্রবণ সবাইকে শেষ বারের মতো সাবধান করে বলে,
“আরেকবার দরজায় টোকা পড়লে বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবো সবকটাকে ভেতরে বন্দী করে।”
দরজা লাগিয়ে দেয় আবার ভেতর থেকে। সিয়াম মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ভাইয়ারা তো দুই ভাই তাহলে ভাইয়ার বোন আসলো কোথা থেকে?”
অনিমা চৌধুরী কিছু না বলে ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যান। সিয়াম মায়ের পেছন পেছন যেতে যেতে বলে,
“আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোথায় যাচ্ছ? বলো ভাইয়ার বোন আসলো কোথা থেকে?”
স্পর্শ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমরা তো দুই ভাই, আমাদের বোন কোথা থেকে আসলো? আর যদি ছিলই তাহলে তার কী হয়েছে?”
তনিমা চৌধুরী নিজেও পালিয়ে যান ছেলের সামনে থেকে। সবাই যেন কিছু লুকাচ্ছে ওদের কাছ থেকে। শ্রবণ আবার দরজা লাগিয়ে দেওয়ার পরই সামাদ চৌধুরী চলে গেছেন এখান থেকে।
স্পর্শ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে বড়ো ভাইয়ের বন্ধ হওয়া দরজার দিকে। কী চলছে এই বাড়িতে? কী লুকাচ্ছে সবাই? শ্রবণের আচরণ এমন অদ্ভুত কেন? ওর মানসিক সমস্যা কেন হয়েছিল? কেন বাড়ির মানুষকে সহ্য করতে পারে না? যেই সোহার দিকে ভুলেও তাকাতো না সেই সোহাকে বিয়ে করেছে শুধুমাত্র ওর সাথে বিয়ে হচ্ছিল বলে। বড়ো কিছু তো ঘটেছেই এই বাড়িতে যা ওর জানা নেই, কেউ জানাতেও চায় না। ওদের যদি বোন ছিলই তাহলে তার সাথে কী ঘটেছিল? শ্রবণ কেন বললো ওর বোনকে অনিমা চৌধুরী মে’রে’ছে? আসলে চলছেটা কী এই বাড়িতে?
শ্রবণ রুম জুড়ে পায়চারি করছে আর এক হাতে কপালে স্লাইড করছে। গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করছে বোঝা যাচ্ছে। কী ভাবছে এভাবে? ভেবেছিল আজকেও ওকে মা’র’বে কিন্তু তেমন কিছু করছে না আজ।
নিজের হাতের দিকে তাকায়। লাল হয়ে গেছে পড়ে গিয়ে। পায়ে বেশি ব্যথা পেয়েছে।
শ্রবণ দাঁড়িয়ে যায়, ঘাড় কাত করে তাকায় সোহার দিকে। ওর এভাবে তাকানো দেখে ভয় পেয়ে যায় সোহা। শুকনো ঢোঁক গিলে হাতে ভর করে পিছিয়ে যেতে থাকে। শ্রবণ আগায় বিছানার দিকে। সোহা ভয়ে পেছাতে পেছাতে কম্পিত স্বরে বলে,
“আ আমি আর কোথাও যাব না, সবসময় এই রুমেই থাকবো।”
শ্রবণ বিছানা ঘেঁষে দাঁড়ায়। সোহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“তোর মা আমার বোনকে মে’রে’ছিল, সেই হিসেবে আমি যদি এখন তোকে মে’রে ফেলি তাহলে কেমন হয়?”
শ্রবণের গলার স্বর, কথা আর চাহনি দেখে সোহা ভয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারছে না।
“নাকী তোর মায়ের বোনকে মে’রে ফেলবো? তোর মা তো আমার বোনকে মে’রে’ছিল। বল কোনটা করব, তোকে মা’রবো নাকী তোর মায়ের বোনকে?”
সোহা কথা বলছে না। শ্রবণের রাগ বাড়ছে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“কথা বলছিস না কেন? তোর মায়ের বোনকে মা’রা’র চেয়ে তোকে মা’রি, তোকে মা’র’লে তোর মায়ের বেশি কষ্ট হবে।”
সোহা ভয়ে জড়সড়ো হয়ে গেছে। দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
শ্রবণের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই ওকে এখন মে’রে ফেলবে।
শ্রবণ রুম জুড়ে আবার পায়চারি করতে শুরু করে। নতুন প্ল্যান সাজায়। সোহাকে জানে মা’র’বে না। একটু একটু করে মা’র’বে আর তিলে তিলে জ্বা’লা’বে ওই অনিমা চৌধুরীকে। কষ্ট পাবে সোহা কিন্তু কাঁদবে ওই অনিমা চৌধুরী। হ্যাঁ এটাই ফাইনাল।
এই প্ল্যান আগে কেন মাথায় আসেনি? তাহলে তো আরো অনেক আগেই এই সোহা চৌধুরীকে বিয়ে করে নিতো আর এত দিনে ওই অনিমা চৌধুরী অর্ধেক শেষ হয়ে যেত।
রাতের খাবার খেতে সোহাকে নিয়ে নিচে নেমে আসে শ্রবণ। ওদের দু’জনের জন্য রুমে খাবার পাঠানো হয়েছিল কিন্তু শ্রবণ নিচে পাঠিয়ে দিয়েছে।
ডাইনিং রুমে এসে দেখে বাড়ির সবাই খেতে বসে গেছে। খাওয়াও শুরু করে দিয়েছে। সকলের চোখ মুখ গম্ভীর থমথমে। কারো মুখে রা শব্দ নেই। অনেক গুলো বছর হয়ে গেছে শ্রবণ বাড়ির সকলের সাথে এক টেবিলে বসে খাবার খায় না। এই বাড়িতেই খুব একটা খায় না। কখনও খেলে নিজের রুমে খেত। আজকে নিজে থেকেই খেতে এসেছে সকলের সাথে, সবাই অবাকই হয়েছে ওর এমন সিদ্ধান্তে। কী মতলব করে এখানে আসলো সকলের সাথে খাওয়ার জন্য?
শ্রবণ একটা চেয়ার টেনে বসে, ওর পাশে বসে সোহা। সার্ভেন্ট খাবার বেড়ে দিতে উদ্যত হলে শ্রবণ থামিয়ে দেয়। নিজেই বেড়ে নেয় নিজের খাবার সাথে সোহার প্লেটেও বেড়ে দেয়। সোহা নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে সকলের মুখের দিকে তাকায়। সবাই ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে নিজেদের খাওয়া বন্ধ করে।
শ্রবণ এক গ্লাস পানি হাতে নিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
“বিয়ের পর আমাদের রূপ সৌন্দর্য বেড়ে গেছে নাকি?”
সামাদ চৌধুরী বলেন,
“তুমি সোহাকে যা যা খেতে দিয়েছো সেসব তো সোহা খায় না।”
পানি খেয়ে শ্রবণ ভাত মাখতে মাখতে বলে,
“সেজন্যই খেতে দিয়েছি।”
বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে সকলের। খায় না জানার পরেও সেসবই খেতে দিয়েছে! তাও ইচ্ছে করে?!
শ্রবণ ঘাড় কাত করে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“খাচ্ছিস না কেন? খা।”
সামাদ চৌধুরী আবার বলেন,
“দাদু ভাই চিংড়ি মাছে সোহার এলার্জি আছে। চিংড়ি খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
শ্রবণ দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“তোকে খেতে বলেছি আমি।”
সোহা খাওয়া শুরু করে। শামীম রেজা চৌধুরী রেগে গিয়ে বলেন,
“খাবি না সোহা, সামনে থেকে প্লেট সরা। আর তুমি নিজেকে কী ভেবেছ? তুমি যা বলবে সেটা সবাই শুনবে? সোহা খাবে না ওই খাবার। তোমার গিলতে ইচ্ছে করলে তুমি গিলো।”
শ্রবণ বাবার চেয়েও বেশি রেগে তার দিকে তাকায়। রাগে ফেটে পড়ে হিস হিসিয়ে বলে,
“মুখ বন্ধ করে রাখ, তোকে কিছু বলেছি আমি?”
শামীম রেজা চৌধুরী আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই তনিমা চৌধুরী ওনার এক হাত চেপে ধরেন শক্ত করে। দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে কিছু বলতে নিষেধ করেন। বাড়ির সবাই জানে এই ছেলে এক নাম্বারের বেয়াদব, মুখে লাগাম নেই। এর আগে দু’বার তর্কাতর্কির সময় রাগে হুশ জ্ঞান হারিয়ে তেড়ে এসেছিল শামীম রেজা চৌধুরীকে মা’রা’র জন্য। বাবা হয় সেদিকে ওর ভুরুক্ষেপ নেই।
এখনো বেশি রাগারাগি হলে আবারও তেড়ে আসবে মা’রা’র জন্য। এই ছেলে ওনাকে সম্মান তো কখনোই দেয় না উল্টো বার বার সম্মান নিয়ে টানাটানি করে ছোটো বড়ো সকলের সামনে।
সিয়াম গর্জন করতে নেবে তার আগেই ওর মা ওকে থামিয়ে দেন। ছেলের হাবভাব দেখেই বুঝতে পেরেছেন ছেলে কী করতে যাচ্ছে। শান্ত স্বরে বলেন,
“খাক সমস্যা নেই, খাওয়ার পর মেডিসিন খেলেই হবে।”
সিয়াম কটমট করে তাকিয়ে থাকে শ্রবণের দিকে। শ্রবণ একবার ওর দিকে তাকিয়ে খাওয়া শুরু করে।
সোহা অর্ধেক খাবার খেয়ে হাত ধোয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। শ্রবণ খেতে খেতে বলে,
“পুরো খাওয়া শেষ কর।”
সোহা মায়ের মুখের দিকে তাকায়। ওর মা অসহায় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর ভাই রাগে ফোস ফোস করছে। স্পর্শ খাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। ডাইনিং রুমের পরিবেশ আজ অন্য রকম।
সোহা বসে পড়ে আবার। জোর করে প্লেটের সব খাবার খায়। ততক্ষণে শ্রবণের খাওয়াও শেষ।
অনিমা চৌধুরী দ্রুত রুমের দিকে এগিয়ে যান সোহার মেডিসিন নিয়ে আসার জন্য।
শ্রবণ হাত ধুয়ে সোহার হাত ধরে টেনে নিয়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে আসে। অনিমা চৌধুরী মেডিসিন নিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার আগেই শ্রবণ সোহাকে নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয় চাবি দিয়ে।
সোহা অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো শ্রবণের মুখের দিকে। ইতি মধ্যেই সোহার এলার্জি শুরু হয়ে গেছে। চোখ-মুখ ফুলে উঠছে, ঠোঁট ফুলে গেছে। মেডিসিন না খেতে পারলে ওর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে। সোহা ভয়ে ভয়ে কম্পিত স্বরে বলে,
“ভাইয়া একটা মেডিসি—
শ্রবণ থামিয়ে দিয়ে বলে,
“যা গিয়ে ঘুমা।”
“একটা।”
“ঘুমোতে বলেছি আমি।”
সোহা বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে কিনার ঘেঁষে। এলার্জি বেশি হয়ে গেলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্রায় পুরো শরীর ফুলে র্যাশ উঠে যায়। চোখ মুখের খুবই বাজে অবস্থা হয়।
শ্রবণ গিটার হাতে নিয়ে বিছানায় বসে। টুং টাং শব্দ তুলে গান গাইতে শুরু করে,
“আমার ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল
চলবে আর কত কাল
ভাবি শুধু একা বসিয়া
রে দয়াল, এভাবে আর চলবে কতকাল।
তরী কিনারায় ভিরাইয়া
ভাবি শুধু কাদিয়া
কিনারায় ভিরাইয়া
ভাবি শুধু কাদিয়া
যাবে কি এমনি দিন হাল
রে দয়াল,এভাবে চলবে কতকাল।
আমার ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল
চলবে আর কত কাল
ভাবি শুধু একা বসিয়া
রে দয়াল,এভাবে আর চলবে কতকাল।”
এত টুকু গেয়ে থেমে যায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আবার টুং টাং শব্দ তুলতে থাকে। একবার সোহার দিকে তাকিয়ে আবার গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করে,
“মানুষ বড়ই স্বার্থপর রে
বড়ই স্বার্থপর,
বুকের মাঝে জায়গা দিলে
যতন কইরা ভাঙ্গেরে অন্তর।”
শ্রবণের ফোন বেজে ওঠে। গান থামিয়ে গিটার পাশে রেখে ফোন হাতে নেয়। হাসানের কল।
ফোন রিসিভ করে মুখের সামনে ধরে দেখে ফোনের অপর পাশে হাসানের সাথে ওর বাকি বন্ধুরাও আছে।
ফোনের অপর পাশ থেকে শ্রবণের এক বন্ধু বলে,
“কিরে নতুন জামাই কী করস?”
শ্রবণ স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“বাসর করি।”
ওর এমন কথায় অপর পাশের সকলের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শ্রবণ বলছে এই কথা! শ্রবণ চৌধুরী বলছে? স্ট্রেঞ্জ। শ্রবণ চৌধুরী তো এমন কথা বলার মতো মানুষ না, আর না মস্করা করার মতো মানুষ।
“বিয়ে করলি দাওয়াত তো দিলি না।”
“আমার বিয়ে আমি নিজেই তো জানতাম না।”
“ওদের বলেছিস কীভাবে?”
“কল করেছিস কেন সেটা বল।”
“বাইরে আসবি না?”
“না।”
“বউ পেয়ে আমাদের ভুলে গেলি?”
“আমি তো নিজেকেই ভুলে যাই।”
হাসান বলে,
“তোরা চুপ করবি? শ্রবণ তুই ঠিক আছিস?”
“আমার আবার কী হবে?”
“তোর গলার স্বর যেন কেমন শোনাচ্ছে। জ্বর টর হয়েছে নাকী?”
“কিছু হয়নি।”
“আগামী কাল ভার্সিটিতে আসবি না?”
“ইচ্ছে হলে আসবো।”
“বাইরে আয়।”
“না।”
“কিছু হয়েছে?”
“কার?”
“বাড়িতে।”
“না।”
সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ভাইয়া।”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সোহার চোখ মুখ দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ে। পুনরায় ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই ওপাশ থেকে একজন বলে,
“কিরে শ্রবণ তোর বউ তোকে এখনো ভাইয়া বলে ডাকে?”
“পরে কল ব্যাক করছি।”
বলেই লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফোন রেখে সোহার দিকে ঘুরে বসে বলে,
“কিরে তোর চেহারার নকশা দেখছি বদলে গেছে।”
সোহা কান্না করতে করতে বলে,
“একটা মেডিসিন এনে দাও, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
“আমাকে কী তোর চাকর বাকর মনে হয় যে তোর জন্য মেডিসিন নিয়ে আসবো?”
শ্রবণের রাগী স্বর শুনে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থেকে বলে,
“দরজাটা খুলে দাও আমি আমার রুম থেকে নিয়ে আসি।”
“কিচ্ছু করতে পারবো না তোর জন্য।”
সোহা শোয়া থেকে উঠে বিছানা থেকে নেমে আসে। দ্রুত পায়ে আগায় ওয়াশরুমের দিকে।
শ্রবণ ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে পিঠের নিচে বালিশ রেখে ঠেস দিয়ে বসে।
অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সোহা ওয়াশরুম থেকে বের হয় না। ভেতর থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে।
শ্রবণ বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। ওয়াশরুমের দরজা হাত দিয়ে ঠ্যালা দিতেই খুলে যায়। ভেতরে তাকিয়ে দেখে সোহা উল্টো ফিরে শাওয়ারের নিচে বসে আছে।
“এই ডাইনির বাচ্চা ওখানে বসে আছিস কেন?”
সোহা কিছু বলে না। শরীর চুলকাচ্ছে রুমে আসার পর থেকেই। কান্নার কারণে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।
শ্রবণ ভেতরে প্রবেশ করে শাওয়ার অফ করে দেয়। সোহা মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। সোহার ঠোঁট জোড়া অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠেছে। চোখ দুটো ডলতে ডলতে পুরোপুরি লাল বানিয়ে ফেলেছে। ঘষতে ঘষতে গালের অবস্থাও বাজে। গলায়-ঘাড়ে লাল লাল চাকা তৈরি হয়েছে, অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে চামড়া ছুলে গেছে। শ্বাস নিচ্ছে অস্বাভাবিক ভাবে।
এত বাজে অবস্থা হবে ভাবেনি শ্রবণ।
“ওঠ ওখান থেকে। চেঞ্জ করে মেডিসিন খেয়ে আয়।”
সোহা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। শ্রবণ আগে আগে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। দরজা খুলে দিয়ে করিডোরে দাঁড়ায়। সোহা রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে প্রবেশ করে। ওর পেছন পেছন শ্রবণ নিজেও প্রবেশ করে। সোহা মেডিসিন বক্স থেকে মেডিসিন বের করে। শ্রবণ ওর হাত থেকে নিয়ে দুটো বের করে ওর হাতে দেয়, বাকি গুলো নিজের পকেটে ভরে নেয়।
সোহা দুটোই খেয়ে নেয়। কাভার্ড থেকে ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
সোহা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে শ্রবণের পাশে ওর মা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ের অবস্থা দেখে আতকে ওঠেন অনিমা চৌধুরী। সোহা মায়ের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ওঠে আবার। চেহারার এমন অবস্থা হয়েছে যে ও আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজকেই দেখে ভয় পেয়ে যাচ্ছে। চোখ, মুখ, ঠোঁট ফুলে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
অনিমা চৌধুরী দ্রুত মেডিসিন বক্স থেকে মেডিসিন খুঁজতে শুরু করেন। তখন তো এখানেই রেখেছিলেন এখন কোথায় গেল?
শ্রবণ সোহার হাত ধরে টেনে নিয়ে রুম থেকে বের হয়। অনিমা চৌধুরী দ্রুত এসে মেয়ের হাত টেনে ধরেন। মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে গেলে শ্রবণ ওনার হাত সরিয়ে দিয়ে সোহাকে সরিয়ে নেয়। কটমট করে তাকিয়ে বলে,
“চোখে থাডা পড়েছে? অসুস্থ চোখে দেখেন না?”
“ওকে ছাড়ো তুমি, মেডিসিন না খেলে ভালো মন্দ কিছু হয়ে যাবে।”
“মেডিসিন পাবে না ও।”
“তোমার রাগ তো আমার উপর তাহলে আমার মেয়েকে কেন শাস্তি দিচ্ছ?”
“এই যে কষ্ট পাচ্ছে আপনার মেয়ে কিন্তু কাদঁছেন আপনি, এই জন্যই।”
“আম্মু আমি —
শ্রবণ থামিয়ে দিয়ে বলে,
“মা’র’বো কানশা বরাবর একটা। রুমে চল।”
টেনে নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। অনিমা চৌধুরী বাইরে দাঁড়িয়ে ঝরঝর করে চোখের পানি ফেলতে থাকেন। ওনার মেয়েটা তো কোনো দোষ করেনি তাহলে নিরপরাধ মেয়েটাকে কেন কষ্ট দিচ্ছে এভাবে? সারা রাত এভাবে থাকলে কিছু একটা হয়ে যাবে সোহার। একটা মেডিসিন খাওয়াতে পারলে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন।
মেডিসিন খাওয়ার পরেই অনেকটা আরাম পেয়েছে সোহা। এলার্জি অনেক কমেছে, এখন আর আগের মতো চুলকাচ্ছে না। আগে চুলকানোর ফলে এখন জ্ব’ল’ছে শরীরের জায়গায় জায়গায়।
“যা ঘুমা।”
“আম্মুকে মিথ্যে কেন বললে? আম্মু চিন্তা করবে তো।”
“ভালোভাবে বলছি ভালো লাগছে না? তোর মা সারা রাত জেগে চিন্তা করতে করতে মরে যাক, এখন গিয়ে ঘুমা। আরেকটা কথা বললে পেটে যা ঢুকেছে সব বের করে দেব।”
সোহা বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে। মায়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে। ওর মা তখন ওর অবস্থা দেখে কাদলো। সারা রাত যদি কান্না করে? অসুস্থ হয়ে পড়বে তো। এই শ্রবণ চৌধুরীর পেটে আর মাথায় শুধু শ’য়’তা’নি।
শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে এসে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। অন্ধকার রুম, বুকের উপর বালিশ চেপে ধরে আছে প্রতি দিনের ন্যায়। চোখ দুটো খোলা, তাকিয়ে আছে উপরের দিকে। অন্ধকার রুমে উপরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রোজ কী দেখে সেটা শুধুমাত্র ও আর আল্লাহ তা’য়ালা ভালো জানেন।
চলবে……………..
নেক্সট পার্ট আগে আগে পড়তে সানা শেখ পেজ টি ফলো দিয়ে রাখবেন সবাই। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক কমেন্ট করবেন।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৮
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ২৯