Golpo romantic golpo দিশেহারা

দিশেহারা পর্ব ৩৫


দিশেহারা (৩৫)

সানা_শেখ

“আর বলছিলেন দ্রুত বাচ্চা নিতে, পরে নাকি হবে না, সমস্যা হবে।”

“তুই কী বলেছিস?”

“কিছু বলিনি।”

শ্রবণ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“কেন? বাচ্চা নেওয়ার শখ জেগেছে?”

সোহা দ্রুত দু’দিকে মাথা নেড়ে বলে,

“না।”

“কী বলেছিলাম মনে আছে?”

“হ্যাঁ।”

“বল কী বলেছিলাম।”

সোহা নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,

“আ আমাদের কোনোদিনও বাচ্চা হবে না।”

“হ্যাঁ, আমার কথার নড়চড় হলে তোর খবর আছে।”

“হবে না।”

“ওই অসভ্য মহিলা দ্বিতীয়বার যেন এই ফ্ল্যাটে প্রবেশ না করে।”

“আচ্ছা।”

শ্রবণ ধুপধাপ পা ফেলে ভদ্র মহিলাকে যত রকমের গালি আছে সব দিতে দিতে স্টাডি রুমে প্রবেশ করে। কত বড়ো সাহস মহিলার! ওর ফ্ল্যাটে এসে ওর বউকে কু বুদ্ধি দেয় বাচ্চা নেওয়ার জন্য।

সোহা আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। ওর চোখ দুটো টলমল করছে।


বেশ অনেকগুলোদিন পেরিয়ে গেছে।
গত কয়েকদিন ধরে শ্রবণের মন মেজাজ ভীষণ খারাপ। কী হয়েছে কে জানে। সোহার সাহস হয় না জিজ্ঞেস করার। এমনিতেই ওকে গালি আর ধমকের উপর রেখেছে। ঊনিশ/বিশ হলেই মা’রা’র জন্য তেড়ে যায়। কিছু জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে ঠাস করে একটা লাগিয়ে দিয়েছে। ওই শক্ত হাতের চড় আর খেতে চায় না সোহা।

অসময়ে শুয়ে ছিল সোহা। শরীরটা ভালো লাগছে না, কেমন ম্যাজম্যাজ করছে আর মাথা ঘুরছে। খেতেও ইচ্ছে করে না।

শ্রবণ ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। রুমে এসে সোহাকে শুয়ে থাকতে দেখে কিছুটা রাগী স্বরে বলে,

“এই অবেলায় শুয়ে আছিস কেন এভাবে? কফি বানিয়ে নিয়ে আয়।”

সোহা দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসে। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। পুরো দুনিয়া যেন নড়ে উঠল। ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে নেমে কফি বানানোর জন্য রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে এসে বসে বিছানায়। বাইরে ভালো লাগছিল না তাই ফিরে আসলো কিন্তু এখানেও ভালো লাগছে না। শুধু শুধু রাগ হচ্ছে, কী করলে রাগ কমবে নিজেও বুঝতে পারছে না। ইচ্ছে করছে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে।

চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করে।

কফি বানিয়ে নিয়ে আসে সোহা। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

“তোমার কফি।”

শ্রবণ চোখ মেলে তাকায়। ওর চোখ দুটো কিছুটা লাল লাল হয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে কফির মগ হাতে নিয়ে আস্তে ধীরে চুমুক দেয়।
সোহা উল্টো ফিরে এগিয়ে গিয়ে শ্রবণের ছড়িয়ে রাখা শার্ট প্যান্ট বাস্কেটে রেখে দেয়।
বিছানার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চেহারা রাগী রাগী দেখাচ্ছে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করবে কী? না থাক, ধমক খাওয়ার চেয়ে চুপ থাকা ভালো।

প্রকৃতিতে রাত নেমে আসে। চারদিকে কৃত্রিম আলো জ্বলে উঠেছে। আকাশে টিপটিপ করে আলো ছড়াচ্ছে লাখো তারা। হালকা হালকা মেঘও আছে।

ব্যালকনিতে বসে আছে শ্রবণ। সিগারেট খেতে খেতে একবার আকাশ দেখছে আবার নিচের দিকে দেখছে। কি করলে একটু শান্তি পাবে এটাও ভাবছে। অনেকগুলো দিন ধরে ওর এত অশান্তি লাগেনি।

রুম থেকে সোহা ডেকে বলে,

“খাবে না?”

“বাড়, আসছি।”

সোহা ভয়ে ভয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সন্ধ্যার পর একা একা রুম থেকে বের হতে ভয় লাগে।

সিগারেট শেষ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় শ্রবণ। ধীর পায়ে হেঁটে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে। শ্রবণ এসে দাঁড়াতেই সোহার নাকে সিগারেটের গন্ধ এসে ধরা দেয়। গা গুলিয়ে ওঠে সিগারেটের বিশ্রী গন্ধে।

চেয়ার টেনে বসে খাওয়া শুরু করে। সোহার দিকে তাকিয়ে দেখে খাবার খাচ্ছে না সেভাবে, নড়াচড়া করছে এক আঙুল দিয়ে।
শ্রবণ কিছু না বলে নিজের খাওয়া কন্টিনিউ রাখে।

শ্রবণ প্লেটের সব খাবার খেলেও সোহা অল্প খেয়ে বাকি খাবারে পানি ঢেলে রেখে দেয়। বাড়তি খাবার ফ্রিজে তুলে রেখে টেবিল গুছিয়ে রুমে ফিরে আসে।

ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানা রেডি করে শুতে গেলেই শ্রবণ বলে,

“শুচ্ছিস কেন?”

সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। মৃদু স্বরে বলে,

“কী করব?”

“পড়তে বোস গিয়ে।”

সোহা কিছু না বলে বিছানা ছেড়ে নেমে স্টাডি রুমে প্রবেশ করে। শ্রবণ নিজেও আসে স্টাডি রুমে। আর কয়েক মাস পর ওর মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে।

পড়তে বসলেও দু’জনের একজনেরও পড়ায় মন বসছে না। সোহার অসুস্থ বোধ হচ্ছে আর শ্রবণের মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে।

“বেড়াম মুরগির মতো ঝিমাচ্ছিস কেন এভাবে?”

সোহা মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। ওর রাগী রাগী চোখমুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ভালো লাগছে না, ঘুম পাচ্ছে। আজকে ঘুমাই? আগামীকাল পড়তে বসবো।”

“পড়া চোর ফাঁকিবাজ একটা, পড়তে বসলেই ঘুম পায়।”

সোহা চুপ থাকে। শ্রবণ নিজের বই বন্ধ করে রাখে। সোহার হাত থেকে ওর বইটা নিজেও রেখে দেয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

“রুমে আয়।”

সোহা শ্রবণের পেছন পেছন বেডরুমে ফিরে আসে।
মেইন লাইট অফ করে ডিম লাইট অন করে দু’জনেই শুয়ে পড়ে। শ্রবণ সোহার উপরে উঠে আসে। ঘাড়ে মুখ গুঁজতেই সোহা থেমে থেমে বলে,

“আজকের মতো ছেড়ে দাও, শরীর ভালো লাগছে না আমার।”

শ্রবণ হেলদোল করে না সোহার কথায়। সোহা অনুরোধের সুরে বলে,

“প্লীজ আজকে ছেড়ে দাও, সত্যিই শরীর খারাপ লাগছে আমার।”

শ্রবণের মেজাজ খারাপ হয় আরও। রাগে জোরে একটা বাইট বসিয়ে দেয় ঘাড়ে। ব্যথা পেলেও মুখ বন্ধ রাখে সোহা।

শ্রবণ সোহার উপর থেকে সরে যায়। কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে থাকার পর রুম থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়।
সোহা চুপচাপ আগের মতোই শুয়ে রইল। চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই শ্রবণ কবে স্বাভাবিক হবে? কবে পুরোপুরি সুস্থ হবে? যা একটু সুস্থ হয়ে উঠছিল এখন আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রায় সপ্তাহ খানিক ধরে রাতে ঘুমায় না বললেই চলে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমায়, বাকি রাত জেগেই পার করে।
ঘুম না হওয়ার কারণে কী আরও বেশি এমন করছে?


সকালে শ্রবণের বাজখাঁই গলার স্বর শুনে সোহার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে শ্রবণের দিকে তাকাতেই শ্রবণ কর্কশ গলায় বলে,

“এই ডাইনির বাচ্চা, এখনো ম’রা’র মতো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস ভার্সিটি যাবি কখন? আজকে না তোর ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে।”

সোহা শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

“ক’টা বাজে?”

“আটটা বাজতে চলেছে।”

সোহা তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। ওড়নাটা কোনো রকমে গায়ে জড়িয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। এত বেলা হয়ে গেলো আর ও টেরই পেলো না?

শ্রবণ তৈরি হয়ে নেয়।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সোহার ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। দ্রুত হাতমুখ মুছে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। মাজেদা আন্টি কী এসেছেন আজ? নাস্তা তৈরি করেছেন?

টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে টেবিলের উপর নাস্তা দেখতে পায়।
শ্রবণ একটা চেয়ার টেনে বসে। সোহা ওর সামনে নাস্তা এগিয়ে দিয়ে বলে,

“তুমি খেতে থাকো আমি আসছি আর কিছু লাগলে নিও।”

শ্রবণ চুপ থাকে। সোহা সবকিছু ওর সামনে এগিয়ে দিয়ে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায়।

সোহা রেডি হতে হতে শ্রবণ খাওয়া শেষ করে রুমে ফিরে আসে। ওর দিকে একবার তাকিয়ে সোহা আরও দ্রুত রেডি হতে শুরু করে।

ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শ্রবণের সঙ্গে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে। শ্রবণ দরজা লক করে সোহার হাত ধরে লিফটের দিকে আগায়।


সোহাকে ক্লাসে বসিয়ে দিয়ে বন্ধুদের কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় শ্রবণ। হাসান শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“কী হয়েছে তোর বলতো।”

“কী হবে?”

“কিছু তো একটা হয়েছেই।”

“কিছুই হয়নি।”

“চোখমুখ এমন রাগী রাগী কেন?”

শ্রবণ চুপ করে থাকে। হাসান আবার বলে,

“বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি তোর মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে। কোনো সমস্যা হলে বল।”

পাশ থেকে সিফাত বলে,

“ভাবী বোধহয় আদর করে না সেজন্যই এমন রেগে আছে।”

শ্রবণ কটমট করে তাকায় সিফাতের দিকে। সিফাত ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,

“আমি কী মিথ্যে বলেছি?”

“তোর বাজে কথা বন্ধ রাখ।”

“বাজে কথা কখন বললাম? বিবাহিত পুরুষদের এই একটাই স—

শ্রবণ খপ করে চেপে ধরে সিফাতের মুখ। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

“আর একটা কথা বললে তোর মুখ ভেঙে দেব।”

ছেড়ে দিতেই সিফাত আবার বলে,

“উচিত কথা বললেই দোষ।”

“তোর উচিত কথা তোর পেছনে ভরে রাখ, শা/লা।”

“সরি ভাই, আমার কোনো বোন নেই। আর থাকলেও তোর কাছে বিয়ে দিতাম না।”

“তোর বোনকে বিয়ে করতো কে?”

সিফাত আরও কিছু বলতে চাইছিল এর মধ্যে রাব্বি বলে,

“আরে ভাই, চুপ কর তো।”

হাসান শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,

“রাতে ঘুমাসনি নাকি?”

সাকিব বলে,

“বউ থাকতে আবার কীসের ঘুম? আমার যদি বউ থাকতো তাহলে আমি মাসে একদিন ঘুমাতাম না।”

রাব্বি বলে,

“এই জন্যই তোর বউ নেই।”

“বাপরে কেমনে বুঝবো আমার একটা বউ লাগবো?”

“আংকেল যেন জীবনেও না বুঝেন তোর বউ লাগবো।”

“শা/লা, আমাকে অভি’শাপ দিচ্ছিস? তোর কপালে বউ জুটবে না আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে।”

“শকুনের দোয়ায় গরু ম’রে না।”

শ্রবণ আর হাসান দু’জনের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে। হাসান দু’জনকে ধমক দিয়ে বলে,

“এই, তোরা চুপ করবি? একজনকে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি তাঁকে বলতে না দিয়ে নিজেরাই বকবক করে চলেছিস।”

রাব্বি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,

“ভাই শ্রবণ, বলুন আপনি কী বলবেন।”

শ্রবণ চুপ করে থাকে। ইচ্ছে করছে এগুলোকে ধরে পাগলা গারদে ভরে দিয়ে আসতে।
হাসান বলে,

“রাতে তোর ঘুম হয় না?”

শ্রবণ মৃদু স্বরে বলে,

“না। অনেকদিন ধরে ঘুমের সমস্যা হচ্ছে।”

“এই কারণেই মেজাজ এমন খারাপ আর খিটখিটে হয়ে থাকে। ঘুম কম হলে আমারও মেজাজ গরম আর খিটখিটে হয়ে থাকে, কারণে অকারণে রাগ উঠে যায়। তুই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ কর।”

শ্রবণ চুপ করে থাকে। হাসান আবার বলে,

“ঘুম কম হলে অসুস্থ হয়ে পড়বি।”

মাসুম বলে,

“এর আগেও ঘুম কম হওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলি ভুলে যাসনি নিশ্চই।”

শ্রবণ বিরক্তির সুরে বলে,

“চুপ কর তো সবাই, ভাল্লাগছে না।”


শ্রবণ ক্যান্টিনে বসে কপি খাচ্ছিল সেই মুহূর্তে ওর ফোন বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে রিতার ফোন থেকে কল এসেছে। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে রিতার গলার স্বর।

“হ্যালো, ভাইয়া?”

“হ্যাঁ, বলো।”

“দ্রুত ক্লাসে আসুন, সোহা অজ্ঞান হয়ে গেছে।”

শ্রবণ ফট করে উঠে দাঁড়ায়। বিস্মিত হয়ে বলে,

“কীভাবে?”

“বসে ছিল, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে।”

“আমি আসছি এক্ষণই।”

“শ্রবণ, কোথায় যাচ্ছিস? কী হয়েছে?”

হাসানের প্রশ্নে পেছন না ফিরেই বলে,

“সোহা অজ্ঞান হয়ে গেছে।”

বলতে বলতেই দৌড় শুরু করে শ্রবণ। হাসান নিজেও কফি খাওয়া বাদ দিয়ে শ্রবণের পেছন পেছন ছুটে যায়। বাকিরাও খাওয়া বাদ দিয়ে ওদের পেছনে এগিয়ে যায়।

শ্রবণ ক্লাসে এসে দাঁড়ায়। ক্লাসের অনেক স্টুডেন্ট এক জায়গায় জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের ভিড়ে লেকচারারও দাঁড়িয়ে আছেন।

হাসান সকলের উদ্দেশে বলে,

“সামনে থেকে ভিড় কমান সবাই।”

হাসানের গলার স্বর শুনে বেশ কয়েক জন পেছনে তাকায়। হাসান আবার সরে যেতে বলতেই সরে যায় কয়েক জন। শ্রবণ এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। সোহা অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে এখনো। রিতা সহ আরও দু’জন মেয়ে ওর চোখেমুখে পানি দিতে দিতে ডাকছে জ্ঞান ফেরানোর জন্য।

রিতা বাকি দু’জন মেয়েকে সরে যেতে বলতেই তারা সরে যায়। শ্রবণ বসে সোহার পাশে। রিতার কাছ থেকে সোহাকে টেনে এনে নিজের বুকের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসায়। বোতল থেকে পানি নিয়ে সোহার চোখেমুখে দিয়ে গালে মৃদু চাপড় দিতে দিতে ডেকে বলে,

“সোহা, চোখ খোল। এই, কী হয়েছে তোর?”

রিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“কী হয়েছিল?”

“ভালোই তো ছিল। লেকচার শুনছিল, হঠাৎ কাত হয়ে পড়ে যায় নিচে। ডাকাডাকি করছি, চোখেমুখে পানি দিচ্ছি কিন্তু জ্ঞান ফিরছে না।”

শ্রবণ সোহাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,

“সোহার ব্যাগটা নিয়ে আয়।”

শ্রবণ বাইরের দিকে এগিয়ে যায় দ্রুত পায়ে। কী হলো এই ডাইনির বাচ্চার? গতরাতেও বললো শরীর ভালো লাগছে না। সিরিয়াস কিছু হলো নাকি?

হাসান সোহার ব্যাগ হাতে নিয়ে দ্রুত শ্রবণের কাছে এগিয়ে আসে। ওর বাকি বন্ধুরাও ওদের সঙ্গে বাইরের দিকে এগিয়ে যায়।

গাড়ির কাছে এসে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আমার পকেটে গাড়ির চাবি, বের করে গাড়ির দরজা খোল।”

হাসান শ্রবণের পকেট হাতড়ে গাড়ির চাবি বের করে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। শ্রবণ সোহাকে কোলে নিয়েই পেছনে উঠে বসে। হাসানকে বলে ড্রাইভ করার জন্য।

শ্রবণের ব্ল্যাক মার্সিডিজ হসপিটালের উদ্যেশ্যে ছুটে চলে দ্রুত গতিতে।
শ্রবণ সোহাকে আগলে ধরে রেখেছে বুকের সঙ্গে। ওর বুকের ভেতর কিছু একটা হচ্ছে সোহাকে এই অবস্থায় দেখে।
সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে গালে মৃদু চাপড় দিতে দিতে বলে,

“এই, কী হয়েছে তোর? সোহা, ওঠ, তাকা আমার দিকে।”

তাকায় না সোহা। নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে শ্রবণের বুকের সঙ্গে লেপ্টে।

গাড়ি হসপিটালে এসে পৌঁছায়। হাসান বেরিয়ে এসে পেছনের দরজা খুলে দেয়। শ্রবণ সোহাকে কোলে নিয়ে নেমে দাঁড়ায়। হাসান শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তুই ভেতরে যা, আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”

“আচ্ছা, আয়।”

শ্রবণ দ্রুত ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়।
ওকে দেখে ওয়ার্ড বয় স্ট্রেচার নিয়ে এগিয়ে আসে দ্রুত। একজন নার্স-ও এগিয়ে আসে। সোহার পালস রেট চেক করতে করতে বলে,

“কী হয়েছে ওনার?”

“হুট করে অজ্ঞান হয়ে গেছে।”

“কে হয় আপনার?”

“ওয়াইফ।”

“টেনশন করবেন না, আমরা দেখছি কী হয়েছে।”

সোহাকে নিয়ে ইমার্জেন্সির দিকে এগিয়ে যায়। শ্রবণ-ও সঙ্গে সঙ্গে আগায় দ্রুত পায়ে।


সোহার জ্ঞান ফিরেছে। এখন হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। বেডের পাশে টুলের উপর ঝিম ধরে বসে আছে শ্রবণ।
সোহার বিপি আর সুগার লেভেল একদম লো হয়ে গেছে। শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রবণের দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির।

গাইনী বিশেষজ্ঞ আর একজন নার্স ওয়ার্ডের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন।
শ্রবণ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। দু’জনের পেছন পেছন হাসানও ওয়ার্ডের ভেতরে প্রবেশ করে।

ডাক্তারের হাতে সোহার রিপোর্ট। শ্রবণ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,

“কী হয়েছে ওর?”

“কংগ্রাচুলেশন, আপনি বাবা হতে চলেছেন।”

“হোয়াট?”

“এভাবে রিয়েক্ট করছেন কেন?”

“কী বললেন আপনি?”

“আপনার ওয়াইফ, মিসেস সোহা সাত সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট।”

শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণের চেহারা দেখে ভয়ে সোহার অন্তরাত্মা কাঁপতে শুরু করেছে। শ্রবণের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে কম্পিত স্বরে থেমে থেমে বলে,

“ডাক্তার, আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে কিছু।”

“কী ভুল হবে?”

“আ আমি প্রেগন্যান্ট, এটা কীভাবে সম্ভব?”

“কেন সম্ভব নয়?”

“আমি তো পিল খাচ্ছিলাম, এর মধ্যে কীভাবে?”

“আল্লাহ তা’য়ালা চাইলে সব কিছুর মধ্যেই সম্ভব। হয়তো মাঝখানে গ্যাপ গিয়েছিল আবার অনেক সময় পিল ঠিকঠাক মতো কাজ করে না। আপনি নিজের প্রতি যত্নশীল হবেন। মিস্টার চৌধুরী।”

ডাক্তার শ্রবণের দিকে তাকান। শ্রবণের চোখমুখ আগের মতোই গম্ভীর হয়ে আছে। গম্ভীর স্বরেই বলে,

“বলুন।”

“আপনার ওয়াইফের দিকে খেয়াল রাখবেন। মা সুস্থ থাকলেই বাচ্চা সুস্থ থাকবে। আপনার ওয়াইফের শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওনার খাবারের প্রতি নজর রাখবেন। নিয়মিত পুষ্টিকর শাক, সবজি, খাবার নিশ্চিত করবেন। কিছু ঔষুধ লিখে দিচ্ছি এগুলো খাওয়াবেন।”

শ্রবণ চুপ করে থাকে। ডাক্তার একটা পেপারে খস খস করে কিছু লিখে শ্রবণের দিকে এগিয়ে দেন।

“এই ঔষুধগুলো খাওয়াবেন, মা আর বাচ্চা সুস্থ সবল থাকবে। খাবার আর শরীরের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখবেন। শীত মৌসুম চলে আসছে, শীতের মধ্যে ঠান্ডা পানি কম ধরবেন। বেলা বারোটার মধ্যেই গোসল সেরে ফেলবেন। ঘুম, খাওয়া-দাওয়া আর নিজের প্রতি যত্ন কোনোটাতেই যেন অনিয়ম না হয়।”

ডাক্তার রিপোর্টগুলো শ্রবণের হাতে দিয়ে বেরিয়ে যান। নার্স দাঁড়িয়ে রইলেন স্যালাইন শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।

সোহা ভয়ে আর শ্রবণের দিকে তাকাচ্ছে না। আজকে শ্রবণ ওকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে নয়তো পিস পিস করে কে’টে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।

হাসান শ্রবণের পাশে দাঁড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরে খুশি হয়ে বলে,

“কংগ্রাচুলেশন ভাই।”

শ্রবণ চুপ, হাসানের দিকে তাকায়ও না। হাসান শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী হয়েছে এই ছেলের?


হসপিটালের বিল পরিশোধ করে সোহাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে শ্রবণ।
গাড়িতে উঠে বসতে গেলে হাসান বলে,

“ঔষুধগুলো নিয়ে যা একেবারে, এখানেই তো দোকান আছে।”

“কীসের ঔষুধ?”

“কীসের ঔষুধ মানে? তোর বউ-বাচ্চাকে সুস্থ রাখার ঔষুধ। ডাক্তার কি বললেন শুনিসনি?”

“কীসের বাচ্চা? কোনো বাচ্চা থাকবে না, হবে না কোনো বাচ্চা।”

“কী সব বলছিস? খুশির চোটে পাগল হয়ে গেলি নাকি?”

“ঠিকই আছি আমি।”

সোহার দিকে তাকিয়ে রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“এই কু’ত্তা’র বাচ্চা, কী বলেছিলাম ভুলে গেছিস? পেটে বাচ্চা আসলো কীভাবে?”

সোহা কেঁদে ফেলেছে প্রায়। জড়ানো গলায় থেমে থেমে বলে,

“আ আমি বুঝতে পা… পারছি কিছুই।”

“এই শ’য়’তা’নের বাচ্চা, তুই বুঝতে না পারলে কে বুঝতে পারবে?”

“এই শ্রবণ, কী হয়েছে তোর? বাবা হচ্ছিস, খুশি হবি তা-না করে উল্টো ওর সঙ্গে এমন করছিস আর বকছিস কেন এভাবে?”

“বাবা হতে চেয়েছে কে? আমি বলেছি আমি বাবা হবো?”

একটু চুপ করে বলে,

“এই হসপিটালে অ্যাবর্শন করায় না?”

শ্রবণের কথা শুনে চমকে ওঠে হাসান। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে।
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সোহা।
হাসান শ্রবণের বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলে,

“এই শ্রবণ, তুই ঠিক আছিস তো নাকি? এসব কী বলছিস?”

শ্রবণ হাসানের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,

“আমি ঠিক আছি আর ঠিকই বলছি।”

“না, তুই ঠিক নেই। খুশির চোটে পাগল হয়ে উল্টাপাল্টা বকছিস। গাড়িতে বোস, আমি তোদের পৌঁছে দিয়ে আসছি।”

“কোনো প্রয়োজন নেই, আমি ড্রাইভ করতে পারবো। তুই ফিরে যা।”

শ্রবণ ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে। সোহা আগে থেকেই ফ্রন্ট সিটে বসে আছে। কাতর চোখে তাকায় হাসানের দিকে। সোহার চেহারা দেখে হাসানের ভীষণ মায়া হচ্ছে। শ্রবণের কি হয়েছে এটাই বুঝতে পারছে না। এই ছেলে এমন করছে কেন?

হাসানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সোহার দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। হাসান শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,

“এই শ্রবণ, উল্টাপাল্টা কিছু করবি না কিন্তু। ভাবীকে কিছু বলবি না, করবিও না।”

সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,

“ভয় পেও না, আমি দেখছি।”

শ্রবণ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে যায়। সোহা ভয়ে ভয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। শ্রবণ সামনের দিকে দৃষ্টি রেখেই হিস হিসিয়ে বলে,

“আমার কথা তোর চামড়া দিয়ে ঢোকেনি তাইনা? আমি এতবার বলার পরেও তুই আমার কথা অমান্য করার সাহস দেখিয়েছিস।”

সোহা শব্দ করে কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“সত্যি বলছি, আমি ইচ্ছে করে করিনি কিছু। তোমার এনে দেওয়া সবগুলো পিল-ই খেয়েছি। বুঝতে পারছি না তার পরেও কীভাবে বাবু পেটে আসলো।”

“যেভাবেই আসুক, কীভাবে বের করতে হবে এটা বোঝা হয়ে গেছে আমার।”

শ্রবণের কথা শুনে ভয়ে আতঙ্কে আবারও কেঁপে ওঠে সোহা। আপনাআপনি ডান হাতটা নিজের পেটের উপর চলে আসে। ওদের সঙ্গে কী করবে শ্রবণ?

চলবে………….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply