দিশেহারা (৩৩)
সানা_শেখ
“ঝরের বেসে এলো কেশে
কাজল সে চোখ দুটি
দিল কঠিন কথার,ভিষন্নতার ছুটি…”
শ্রবণের কন্ঠে হঠাৎ গান শুনে পুনরায় পেছন ফিরে তাকায় সোহা। শ্রবণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। শ্রবণের কপাল ভ্রু কুঁচকে যেতেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয় সোহা। এখনই লাগবে এক ধমক, বাজখাঁই গলায় বলবে, “এভাবে তাকিয়ে কী দেখছিস?”
আয়নার দিকে তাকিয়ে চুলগুলো ব্রাশ করতে শুরু করে।
শ্রবণ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে এসে দাঁড়ায় সোহার পেছনে। ওকে পেছনে দেখেই সোহার গলা শুকিয়ে কাঠ। শ্রবণের চাহনি দেখেই বুঝতে পারছে কোনদিকে তাকিয়ে আছে। সোহা শ্রবণের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করতেই শ্রবণ ডান হাতে সোহার কোমর জড়িয়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে নেয়। সোহার হাত থেকে হেয়ার ব্রাশ নিচে পড়ে যায়, চোখ জোড়া খিঁচে বন্ধ করে দুই হাতে নিজের পরনের জামা খামচে ধরে।
শ্রবণ আলগোছে মুখ ডুবায় সোহার ঘাড়ে। ছোটো ছোটো চুমু দিতে দিতে বাইট বসিয়ে দেয় একটা। সোহা ছটফটিয়ে ওঠে। ও এতদিনে বুঝতে পেরে গেছে শ্রবণের দুর্বলতা কোথায়। ওর ঘাড় উন্মুক্ত দেখলেই শ্রবণ মুখ ডুবিয়ে দেয় সময় অসময়ে। কম করে হলেও একটা বাইট দেবেই।
শ্রবণ এখন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে সোহা। দিশেহারা শ্রবণ আরও উন্মাদ হয়ে ওঠার আগেই ওকে হুশে আনার জন্য সোহা আগের চেয়েও বেশি ছটফটিয়ে বলে,
“কী করছ? ছাড়ো।”
শ্রবণ ছাড়ে না। হাতের বাঁধন আরও গাঢ় করে। ঘাড়ে মুখ ঘষে নেশালো গলায় বলে,
“নো ছাড়াছাড়ি।”
সোহা নড়াচড়া আরও বাড়িয়ে দিলে শ্রবণ ঘাড় থেকে মুখ তুলে রাগী গলায় বলে,
“দেবো কানের নিচে একটা? কাজের সময় শুধু ডিস্টার্ব। চুপচাপ থাক, ডিস্টার্ব করবি না আমাকে।”
সোহার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ও কাজের সময় ডিস্টার্ব করছে? নাকী শ্রবণ ওর কাজের সময় এসে ওকে ডিস্টার্ব করছে? ও তো চুল ব্রাশ করছিল, ওকে এখন কে আসতে বলেছে?
শ্রবণ সোহাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়। দুই হাতে মুখ আগলে ধরে কাজল কালো আঁখি দয়ে দৃষ্টি স্থির করে। এলোমেলো খোলা চুলে কাজল কালো আঁখি যুগল, শ্রবণকে আরও ঘোরের মধ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছে। নেশা জাতীয় কিছু খেলে কেমন নেশা হয় শ্রবণের জানা নেই, তবে সোহার কাছাকাছি আসলে শ্রবণ ঘোরের মধ্যে চলে যায়, নেশা ধরে যায়।
চোখের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওষ্ঠ জোড়ায় দৃষ্টি স্থির করে। সোহার গোলাপী অধর জোড়া তিরতির করে কাঁপছে। সোহার গাল থেকে এক হাত চুলের ভাঁজে গলিয়ে দেয় শ্রবণ। সোহার মুখ নিজের দিকে টেনে এনে নিজেও মুখ নামিয়ে নেয় সোহার মুখের দিকে। নিজের অধর জোড়া দিয়ে বন্দী করে সোহার অধর জোড়া। অনুভূতির জোয়ারে ভেসে সোহার দুই হাত আঁকড়ে ধরে শ্রবণকে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেয় শ্রবণ। সোহা ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার আগেই শ্রবণ ওকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে উঁচু করে ধরে বিছানায় চলে আসে।
রাত পেরিয়ে ভোর হয়। সোহার ঘুম ভাঙে। আরমোড়া দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। ভেজা এলোমেলো চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে পড়ে। নিজের আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারে শ্রবণ জিমে চলে গেছে।
মাঝখানে অনেকগুলো দিন পেরিয়ে গেছে কিন্তু দু’জনের মধ্যকার সম্পর্ক এখনও আগের মতোই আছে। না আগের চেয়ে ভালো হয়েছে আর না আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। সেই এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
বিছানা ছেড়ে নেমে বিছানা গুছিয়ে রাখে। সারা শরীর ব্যথা হয়ে গেছে। ঘুম ঘুম ভাব দূর হয়নি এখনও। আরও কয়েক ঘণ্টা ঘুমোতে পারলে ভালো লাগত। ভার্সিটি যেতে হবে তাই ঘুমনোর চিন্তা বাদ দিয়ে ফ্রেশ হতে যায়। মাজেদা আন্টি এসে নাস্তা তৈরি করছে বোধহয়।
এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে খোঁপা করে নেয়। ফ্রেশ হয়ে এসে শুকিয়ে নেবে।
জিম থেকে ফিরে আসে শ্রবণ। টাওয়েল হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সোহার উদ্দেশে গম্ভীর স্বরে বলে,
“আগে দিনে দুইবার গোসল করতাম কিন্তু এখন তোর জন্য আমাকে তিনবার গোসল করতে হয়।”
কথাগুলো বলতে বলতে ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। সোহা ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো হা করে। এসব কী বলে গেল? ওর জন্য তিনবার গোসল করতে হয়? ওর জন্য? বজ্জাত ব্যাটা। সোহা বিড়বিড় করে বকা দেয় শ্রবণকে। শব্দ করে দেওয়ার মতো সাহস তো ওর নেই তাই দুধের সাধ ঘোলে মেটায়।
হিজাব বাঁধতে বাঁধতে সোহার নজর আটকায় নিজের দুই চোখের দিকে। এখনও কাজল লেগে আছে চোখে। গতরাতে শ্রবণের গাওয়া গানের লিরিক্সগুলোও মনে পড়ে। তার পরের ঘটনাও মনে পড়ে। লজ্জায় নিজের দিক থেকে নিজেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
গতরাতে ওর এলোমেলো চুল আর কাজল কালো চোখ জোড়া দেখেই কী শ্রবণ গানের লিরিক্সগুলো খেয়েছিল? সোহা তো এটা ভেবেই দেখেনি। শ্রবণের মুখে গান শুনে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল কারণ শ্রবণ দারুন গান গায় সেজন্যই।
কয়েকদিন আগেই সোহার কিছু স্কিন কেয়ারের প্রোডাক্ট এনে দিয়েছিল শ্রবণ, সেগুলোর সঙ্গে একটা কাজলও এনেছিল। গতকাল হুট করেই কাজল দেওয়ার শখ জেগেছিল চুল ব্রাশ করতে গিয়ে। কোনো কিছু না ভেবেই কাজল পরেও ফেলে দুই চোখে। তার একটু পরেই শ্রবণ স্টাডি রুম থেকে বেড রুমে আসে। আর তারপর যা হওয়ার তাতো হয়েই গেছে।
গোসল সেরে বেরিয়ে আসে শ্রবণ। সোহার দিকে তাকিয়ে রসকষ হীন গলায় বলে,
“এভাবে এখনও সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন রেডি না হয়ে?”
শ্রবণের কথা শুনে দ্রুত হিজাব বাঁধতে শুরু করে সোহা।
শ্রবণ কাভার্ড থেকে প্যান্ট শার্ট বের করে পরতে শুরু করে। সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ওর দিকে। জিম করা পেটা দেহ, মাসেলগুলো ফুলে ফেঁপে আছে। গোসল করার কারণে ফরসা দেহ খানা চকচক করছে আরও। এই শক্ত ভারী শরীর নিয়ে শেষ রাত পর্যন্ত ওর বুকের ওপর ঘুমিয়েছে। এখনও শরীর ব্যথা করছে।
শ্রবণ ফট করে সোহার দিকে তাকায়, সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় সোহা।
“চু’রি করে না দেখে সরাসরি-ই দেখ, তোরই তো জামাই। আরও দেখবি? ড্রেস খুলব? খুললে ভালোভাবে সব দেখতে পারবি।”
সোহা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শ্রবণ গলার স্বর বাড়িয়ে বলে,
“নাস্তা রেডি কর।”
শ্রবণ ফিটফাট হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে। সোহা দুজনের জন্য নাস্তা রেডি করে বসে আছে।
শ্রবণ চেয়ার টেনে বসে, সোহা তাকায় না ওর দিকে।
বিনা বাক্যে নাস্তা করে দু’জন। শ্রবণ চেয়ার ছেড়ে উঠে স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে যায়। সোহা দ্রুত সব গুছিয়ে রেখে স্টাডি রুমে আসে। নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেডরুমে এসে ফোন ব্যাগে ভরে আবার রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
শ্রবণের সঙ্গেই বের হয় ফ্ল্যাট থেকে। লিফটের দিকে আগাতেই সেই ভদ্র মহিলার সঙ্গে দেখা হয়। ওনাকে দেখে শ্রবণ বিরক্তিতে কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে লিফটে প্রবেশ করে সোহাকে নিয়ে। ভদ্র মহিলাও ওনার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করে।
সোহার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“তুমি তো আগে হিজাব পরতে না, কিছুদিন ধরে দেখছি পরো। হিজাব পরো কেন এখন?”
এমন প্রশ্ন শুনে সোহা চুপ থাকে তবে শ্রবণ চুপ থাকে না আজ। ভদ্র মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কাপড় চোপড় ছাড়াই নিয়ে যাই?”
বিব্রত বোধ করেন ভদ্র মহিলা। ওনার চেহারা দেখেই শ্রবণ বুঝতে পারছে ওনার মনের কথা। আগের মতো একই সুরে বলে,
“আপনি তো এমনটাই চাইছেন বোধহয়, তাইনা? হিজাব না পরে কী আপনার মেয়ের মতো প্যান্ট শার্ট পরে ঘুরবে বাইরের ছেলেদের সামনে? এখন হিজাব পরছে আগামীকাল থেকে বোরকাও পরবে। যদি আপনার কাছে ভালো না লাগে তাহলে চোখ বন্ধ করে রাখবেন আমাদের দেখলে।”
লিফট থেকে বেরিয়ে সোহার হাত ধরে পার্কিং জোনের দিকে এগিয়ে যায় শ্রবণ।
পেছন থেকে অপমানিত বোধ করে তাকিয়ে আছেন ভদ্র মহিলা। লিফটে আরও দু’জন নারী পুরুষ ছিলেন, ওনারা ভদ্র মহিলার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থেকে চলে যান নিজ গন্তব্যে। অন্যের ব্যাপারে অহেতুক নাক গলালে এমনই হবে।
সোহাকে বসিয়ে শ্রবণ নিজেও উঠে বসে গাড়িতে। সোহা ভয়ে ভয়ে মিনমিন করে বলে,
“এভাবে না বললেও পারতে।”
শ্রবণ গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে থেমে যায়, কটমট করে তাকায় সোহার দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“মায়া লাগছে ওই অসভ্য মহিলার জন্য? যা, মহিলার গলা ধরে কেঁদে আয় কিছুক্ষণ।”
সোহা চুপ করে থাকে। শ্রবণ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে চরম বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,
“প্রত্যেকটা দিন শুধু শুধু বিরক্ত করে আজাইরা সব প্রশ্ন করে করে। অন্যকে নিয়ে এত মাথা ব্যথা কেন? কু’ত্তা’র বাচ্চা আরেকদিন ওই মহিলার সঙ্গে কথা বললে গলা চেপে তোকে মে’রে ফেলব।”
সোহা এবারেও চুপ করে থাকে। এখন ও যাই বলবে তাতে শ্রবণের রাগ আরও বাড়বে বৈ কমবে না তাই চুপ থাকাই ভালো।
শ্রবণ রাগে গজগজ করতে করতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় ভার্সিটির উদ্যেশ্যে।
সন্ধ্যার পর পরই ফ্ল্যাটে ফেরে শ্রবণ। সোহা বিছানার উপর বসে ছিল। ওকে ফিরে আসতে দেখে দ্রুত ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে নেয় শরীর সহ।
শ্রবণ সোহার কর্মকাণ্ড দেখে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে আর ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সোহা শুকনো ঢোঁক গিলে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। কিছু কী করেছে আজ? না, কিছু ভুল করেনি তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?
পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলে,
“আমাকে দেখে এভাবে যে ডেকে রাখলি তাতে কি আমি আর দেখতে পাবো না? আল্লাহ তা’য়ালা কী আমাকে হাত দেননি? এই বা/লের ওড়না সরাতে আমার কী এমন সময় লাগবে বা পরিশ্রম করতে হবে?”
সোহা কিছু বলতে চাইলেও বলার মতো কিছু খুঁজেই পেলো না। শ্রবণ যে ওর ভাবনা বুঝতে পেরে গেছে এটা তো সোহা নিজেই বুঝতে পারেনি। যেমন রাগী, বদ মেজাজী, খচ্চর তেমন চালাক, চতুর, ধূর্ত।
পকেট থেকে এক জোড়া চুড়ি বের করে সোহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“ওই দুটো খুলে এই দুটো পর।”
সোহা হাত বাড়িয়ে চুড়ি জোড়া হাতে নেয়। আজকের চুড়ি জোড়া গোল্ডেন কালার, ডিজাইন সুন্দর। সোহা খুশি হয়ে শ্রবণের দিকে তাকাতেই শ্রবণ এক জোড়া নূপুর এগিয়ে দেয়। সোহার চেহারা এবার আনন্দে ঝলমলিয়ে ওঠে। আগের চেয়েও শত গুণ খুশি হয়ে নূপুর জোড়া হাতে নেয়।
শ্রবণ শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে সোহার হাস্যোজ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সোহা উল্টে পাল্টে নূপুর আর চুড়ি জোড়া দেখছে। খুশিতে চকচক করছে চোখ জোড়া।
শার্ট খুলে বিছানার উপর রাখে শ্রবণ। হাত বাড়িয়ে সোহার হাত ধরে আগের স্টোনের চুড়ি খুলে আজকের আনা নতুন চুড়ি পরিয়ে দেয়। আগের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি সুন্দর লাগছে হাতটা। ডান হাত থেকে চুড়ি আর নূপুর জোড়া নিয়ে বিছানার উপর রেখে হাতের চুড়িটা খুলে নতুনটা পরিয়ে দেয়।
ফরসা হাতে গোল্ডেন কালার চুড়ি জোড়া জ্বলজ্বল করছে।
ঘুরে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
“নূপুর জোড়া পর।”
সোহা খুশি হয়ে দ্রুত নূপুর জোড়া পায়ে পরে নেয়। ওর তো এখন খুশিতে আর আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে। ঘুরে ফিরে বারবার হাত আর পা দেখছে। পা নাড়ালেই নূপুর থেকে ঝুনঝুন শব্দ ভেসে আসছে। অনেক ভালো লাগছে ওর। সোহা বলতে বাধ্য শ্রবণের পছন্দ অনেক সুন্দর।
শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে এসে ট্রাউজার পরে ভেজা টাওয়েল ছুঁড়ে মা’রে সোহার মুখের ওপর।
সোহা মুখের উপর থেকে টাওয়েল সরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। শ্রবণ চুল ব্রাশ করতে করতে বলে,
“আমার চেহারা না দেখে খাবার বাড়, দুপুরে কিন্তু খাইনি, খিদে পেয়েছে।”
সোহা টাওয়েলটা ব্যালকনিতে মেলে দিয়ে খাবার বাড়ার জন্য এগিয়ে যায়।
ভার্সিটি শেষে সোহাকে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়েই বেরিয়ে গিয়েছিল আবার।
শ্রবণ এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে বসে খাবার খাওয়ার জন্য। সোহা-ও বসে পড়ে খাবার খেতে। শ্রবণ এখন খেয়ে রুমে চলে গেলে আর কোনোভাবেই ডাইনিং টেবিলের কাছে আসবে না, তখন সোহাকে একা একা খেতে হবে। ভূতের ভয়ে তো খেতেই পারবে না। এখনও রাত বেশি হয়নি তাই ভয়টা একটু কমই লাগছে।
খেতে খেতে শ্রবণ বলে,
“খেয়ে রেডি হ।”
“কেন?”
“বের হবো।”
“কোথায় যাব?”
“জাহান্নামে।”
ধমক খেয়ে চমকে ওঠে সোহা। ভুলে প্রশ্ন করে ফেলেছে। অপরাধীর ন্যায় বলে,
“ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না।”
“এক ভুল তোর কত দিন হয়?”
“আর কোনোদিন হবে না।”
“দ্রুত খেয়ে রেডি হ।”
“আচ্ছা।”
সোহা দ্রুত খেতে থাকে। শ্রবণ কোথায় নিয়ে যাবে ওকে? খেতে খেতে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ গম্ভীর হয়ে খাচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে ফ্রেশ হয়ে এসে তৈরি হয়ে নেয় সোহা। শ্রবণ নিজেও তৈরি হয়ে নেয়।
“আয়।”
সোহা শ্রবণের পেছন পেছন রুম থেকে বেরিয়ে আসে। শ্রবণ স্টাডি রুম থেকে দুটো হেলমেট নিয়ে বেরিয়ে আসে। দুটোই সোহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়। দরজা লক করে হেলমেট দুটো নিজের হাতে তুলে নেয়। সোহা ওর পাশে পাশে হেঁটে এগিয়ে যায় লিফটের দিকে।
পার্কিং জোনে এসে শ্রবণ নিজের বাইক বের করে
Kawasaki Ninja ZX-10R সুপারস্পোর্ট বাইক। এটা ইম্পোর্টড করা। দেশের বাইরে থেকে আনিয়েছিল।
শ্রবণের পেছনে এই বাইকে বসতেই সোহার ভয় লাগছে। যতটুকু জানতে পেরেছে, শ্রবণ ঝড়ের বেগে বাইক চালায়। এই ছেলে আজকে ওর ভবলীলা সাঙ্গ করেই ছাড়বে বোধহয়।
সোহা তো ভেবেছিল শ্রবণ ওকে চৌধুরী বাড়িতে নিয়ে যাবে। এখন দেখছে যমের দুয়ারে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করে বসে আছে।
“হেলমেট পর।”
“আমি যাব না।”
“চড় খেয়েছিস?”
“হ্যাঁ।”
“আবার খেতে না চাইলে পেছনে উঠে বোস।”
সোহা ভয়ে ভয়ে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে হেলমেট পরে পেছনে উঠে বসে।
“ধরে বসবি শক্ত করে, পেছন থেকে পড়ে ম’রে থাকিস না রাস্তায়।”
“তুমি আস্তে আস্তে চালাবে, বাইকে বসলে এমনিতেই আমার ভয় লাগে।”
শ্রবণ বাইক নিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। রাস্তায় আগে থেকেই শ্রবণের বন্ধুরা অপেক্ষা করছে বাইক নিয়ে। ওরা ছয় বন্ধু বাইক রাইডে বের হতে চেয়েছিল রাতের রাস্তায় তবে শ্রবণ সোহাকে একা একা ফ্ল্যাটে রেখে মাঝরাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে চায়নি। মাঝরাত পর্যন্ত ও ফ্ল্যাটের বাইরে থাকলে ফিরে গিয়ে দেখবে ওর বউ ভয়ের চোটে ম’রে ভূত হয়ে গেছে।
সব দিক ভেবে সোহাকে সঙ্গে নিয়ে বের হওয়ার প্ল্যান করেছে। তাতে ওর বউও জীবিত থাকবে আর ওরো রাইড করা হবে।
বাইক নিয়ে ছুটে চলে ছয় জন। সোহা শ্রবণকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। আস্তে আস্তে শ্রবণের বাইকের স্প্রিড বাড়তে শুরু করে।
“আস্তে চালাও, ভয় লাগছে আমার।”
“মুখ বন্ধ রেখে শক্ত করে ধরে থাক।”
শ্রবণকে শক্ত করে ধরে রেখে রাতের শহর দেখতে থাকে সোহা।
ছয় জন বাইক নিয়ে শহর থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। প্রকৃতি ঠান্ডা ঠান্ডা, শীতল বাতাসে সোহার শরীর শীতল হয়ে গেছে। ভয়ে ওর জান লাফালাফি করছে, কখন যেন প্রাণ পাখিটা খাঁচাছাড়া হয়ে যায়।
রাত বারোটা বেজে যেতেই বাড়ির পথে রওনা হয় ছয় জন। রাতের বেলা ঘুরতে বেরিয়ে সোহার মন্দ লাগেনি, ভালোই লাগছে তবে একটু একটু ভয়ও করছে অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার ভয়ে।
হঠাৎ শ্রবণের বাইকের স্প্রিড মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। বাতাসের আগে আগে যেন ছুটে চলছে বাইক। সোহা ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করে। শ্রবণকে বারবার বলছে বাইক থামানোর জন্য। পেছন থেকে পাঁচ জন সোহার চিৎকার শুনতে পাচ্ছে স্পষ্ট।
চোখের পলকে পাঁচজনের দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে যায় শ্রবণের বাইক। পেছন থেকে সিফাত চিৎকার করে বলে,
“এই শা/লা নিজেও ম’রবে, বউকেও মা’রবে। ক’দিন আগে অ্যাকসিডেন্ট হলো তবুও শিক্ষা হয়নি। এই
শা/লা স্প্রিড কমা।”
সোহার হাত ফসকে যেতে নেয়। আগের চেয়েও শক্ত করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“বাইক থামাও, হাত ফসকে যাচ্ছে, পড়ে যাব, ম’রে যাব।”
এতক্ষনে এসে বাইকের স্প্রিড কমায় শ্রবণ। আস্তে আস্তে রাস্তার একপাশে দাঁড় করায়। সোহা দ্রুত বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায়। থরথর করে কাঁপছে পুরো শরীর। কান্না করতে করতে নিচে বসে পড়ে। এভাবে কেউ বাইক চালায়? ফাঁকা রাস্তা তো কী হয়েছে? যদি পড়ে যায়? হঠাৎ যদি সামনে থেকে কোনো গাড়ি চলে আসে? আরেকটু হলেই তো হার্ট অ্যাটাক করেই ম’রে যেত।
শ্রবণ বাইক রেখে নেমে দাঁড়ায়। বাজখাঁই গলায় বলে,
“এভাবে ম’রা কান্না করার মতো কী হয়েছে?”
সোহা হেলমেট খুলে ফেলে। হেড লাইটের আলো সামনের দিকে থাকায় শ্রবণ সোহাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না।
এর মধ্যে পেছন থেকে বাকি পাঁচজনের বাইক এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ওদের পেছনে। আলোকিত হয়ে যায় পুরো জায়গাটা।
পাঁচজনেই বাইক থেকে নেমে এগিয়ে আসে ওদের দু’জনের কাছে। সোহা মাথা নিচু করে কাঁদছে আর থরথর করে কাঁপছে। শ্রবণ ওর সামনে বসে আছে হেলমেট খুলে।
সিফাত শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“বউ ফ্ল্যাটে একা একা থাকলে ভয়ে ম’রে যাবে বলে সঙ্গে নিয়ে আসলি এখন নিজেই এমন ভয় দেখালি যে জীবন্ত ফ্ল্যাটে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবি কিনা সন্দেহ হচ্ছে।”
সাকিব ওর পিঠে একটা লাগিয়ে দিয়ে বলে,
“তোর ফালতু কথা বন্ধ কর।”
“আমার কথা তোর কাছে ফালতু মনে হচ্ছে? দেখ ভয়ে কীভাবে কাঁপছে ঠকঠক করে।”
হাসান শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“মেয়েটাকে এভাবে ভয় না দেখালে হতো না? বাচ্চা একটা মেয়ে, কীভাবে কাঁপছে।”
শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“ঊনিশ বছরের একটা মেয়েকে তোর কাছে বাচ্চা মনে হয়?”
“বয়সের দিক দিয়ে বাচ্চা না থাকলেও সাহসের দিক থেকে বাচ্চাই রয়ে গেছে নয়তো তোকে বাঘের মতো ভয় পেতো না।”
শ্রবণ সোহার মুখ তুলে ধরে নিজের মুখের দিকে।
“ওঠ।”
সোহা কাঁদতে কাঁদতে কম্পিত স্বরে বলে,
“আ আমি যাব না বা বাইকে করে।”
“বেশি কথা না বলে ওঠ।”
সোহা দু’দিকে মাথা নাড়ায়।
শ্রবণ উঠে দাঁড়িয়ে সোহাকে জোর করে দাঁড় করায়। ছেড়ে দিতেই সোহা পড়ে যেতে নেয়। এতই ভয় পেয়েছে যে দাঁড়াতে পারছে না নিজের পায়ে।
শ্রবণ দ্রুত ওকে আগলে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়।
রাব্বি বলে,
“তুই কেমন সাহসী তোর বউ তেমন ভীতু। ভয়ে দাঁড়াতেই ভুলে গেছে।”
শ্রবণ রাগী গলায় সোহাকে বলে,
“বাইকে উঠে বোস নয়তো এখানেই ফেলে রেখে চলে যাব।”
“যাও।”
শ্রবণ চিবিয়ে চিবিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
“ওদের সামনে মা’র খেতে না চাইলে উঠে বোস, বেশি কথা বলতে পারবো না।”
শ্রবণ ধরে সোহাকে সামনে বসিয়ে দেয়। নিজে হেলমেট পরে সোহার পেছনে বসে। সোহার দুই হাত নিজের পেছন দিকে দিয়ে বলে,
“এভাবে ধরে রাখ পড়বি না।”
সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে উল্টো ফিরেই শ্রবণকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। শ্রবণ বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলে,
“বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে নাকী এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি সবাই?”
শ্রবণের কথা শুনে সবাই যার যার বাইকে উঠে বসে। শ্রবণ বাইক নিয়ে ছুটে চলে। আগের মতো একই স্প্রিডে শো শো শব্দ তুলে ছুটে চলে বাইক। সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে সর্বশক্তি দিয়ে ওকে আঁকড়ে ধরে থাকে। এযাত্রায় জানে বেঁচে ফিরতে পারলে বাকি জীবনে শ্রবণের বাইকে উঠবে না, কোনোদিন না।
চলবে…………
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ১১
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ১০
-
দিশেহারা পর্ব ১৩
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৭
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ২