দিশেহারা (২৯)
সানা_শেখ
সোহা ভয়ে ভয়ে কম্পিত স্বরে বলে,
“আ আমার ভুল হয়ে গেছে, আর কোনো প্রশ্ন করব না, বিরক্ত করব না তোমাকে।”
শ্রবণ সোহার সামনে দাঁড়ায়, দু’জনের মাঝখানে অল্প একটু দুরত্ব।
বাম হাতে সোহার চোয়াল চেপে ধরে বলে,
“আগে মনে ছিল না? বারবার নিষেধ করার পরেও একই কাজ কেন করিস?”
“আর করব না।”
“যা আমার সামনে থেকে নয়তো জানে মে রে ফেলব।”
ছেড়ে দিতেই সোহা দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে আসে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। হাতে মা’রতে হবে না, যেভাবে ভয় দেখায়, ভয় দেখিয়েই মে রে ফেলবে।
নিজের চোয়ালে হাত বুলায়, এত শক্ত হাত! যেখানে ধরে মাংস পঁচিয়ে দেয়। হাত তো নয় যেন হ্যামার।
শ্রবণ রুম থেকে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। সোনালী রোদ এসে ছুঁয়ে দেয় উদাম গা। রোদে চকচক করছে ফরসা শরীর। গরমের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। রোদেলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ জোড়া ঘোলা হয়ে গেছে। আশেপাশে তাকিয়ে সব ঘোলা দেখছে।
রুমে ফিরে এসে গলা ছেড়ে সোহাকে ডাকে। ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিল, বজ্জাত মেয়েটা এখন মেজাজ খিটখিটে করে দিয়েছে।
সোহা রান্না ঘরে ছিল মাজেদা আন্টির পাশে দাঁড়িয়ে। শ্রবণের ডাক শুনে দ্রুত বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে। রুমে এসে দেখে শ্রবণ রুমের মাঝখানে সটান দাঁড়িয়ে আছে।
“বলো।”
“বসে থাক এখানে।”
সোহা তাকিয়ে থাকে শ্রবণের মুখের দিকে।
“বুঝতে পারিসনি আমার কথা?”
“তুমিই তো চলে যেতে বলেছিলে।”
“এখন থাকতে বলেছি, থাক চুপচাপ।”
সোহা চুপচাপ বিছানায় উঠে বসে থাকে। মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকী আবার? কি বলে আর করে নিজেও বোধহয় বুঝতে পারে না। অদ্ভুত মানব।
সোহা শ্রবণের দিকে তাকিয়ে থাকে। উদাম গা, টু কোয়ার্টার প্যান্ট, কাটাছেঁড়া শরীর। এলোমেলো চুল, চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে শ্রবণকে।
শ্রবণ সোহার দিকে তাকাতেই সোহা মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে।
শ্রবণ এগিয়ে এসে বিছানায় বসে সোহার পাশে। সোহা কিছুটা সরে যায় শ্রবণের কাছ থেকে। শ্রবণ চোয়াল শক্ত করে তাকায় সোহার দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“গু লেগে আছে আমার গায়ে?”
সোহা দ্রুত দু’দিকে মাথা নাড়ায়।
“কথা বলতে মুখ ব্যথা করে?”
রাম ধমক খেয়ে কেঁপে ওঠে সোহা। মুখ ফুটে বলে,
“না, গু লেগে থাকবে কেন?”
“তাহলে আমি বসার পর দূরে সরলি কেন?”
সোহা শুকনো ঢোঁক গিলে বলে,
“ভু ভুল করে তোমার আঘাতে ছোঁয়া লাগলে ব্যথা পাবে সেজন্য।”
“আমাকে তোর ফিডার খাওয়া ছয় মাসের বাচ্চা মনে হয়? তুই মিথ্যে বলবি আর আমি ধরতে পারবো না? কু’ত্তা’র বাচ্চা মিথ্যে বলছিস কেন?”
শ্রবণের ধমক খেয়ে ভয় পেয়ে আরও একটু পিছিয়ে যায় সোহা। শ্রবণ এমনভাবে তাকিয়ে আছে যে মনে হচ্ছে এখনই কাঁচা চিবিয়ে খাবে সোহাকে।
সোহা ডর ভয় বুকের ভেতর জমা করে রেখে শ্রবণের দিকে এগিয়ে আসে। তখন শ্রবণকে বসতে দেখে ভয় পেয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। এখন তো তার থেকেও বেশি ভয় দেখাচ্ছে তবুও ওর গা ঘেঁষে বসতে হচ্ছে।
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ঘাড় ব্যথা করছে, ম্যাসাজ করে দে।”
সোহা পা তুলে উঠে বসে শ্রবণের পেছনে।
সাবধানে আলতো হাতে ম্যাসাজ করতে শুরু করে সোহা। ডান কাঁধেও ছিলে দগদগে হয়ে আছে।
“হ্যাঁ, গলা টিপে মে’রে ফেল শান্তিতে থাকতে পারবি।”
দ্রুত গলা থেকে হাত সরিয়ে নেয় সোহা। ও তো ভেবেছিল গলাও ম্যাসাজ করতে হবে সেজন্যই তো গলা টিপে দিচ্ছিল।
মাঝখানে দু’দিন পেরিয়ে গেছে।
শ্রবণ আজকে গেছে হসপিটালে, ডাক্তার দেখাবে আর হাতের ব্যান্ডেজ খুলবে।
শ্রবণের সঙ্গে হাসানও গেছে হসপিটালে।
চৌধুরী বাড়ির কেউ এখনও জানেই না শ্রবণ অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। সামাদ চৌধুরীর সঙ্গে রোজ কথা হয় ফোনে তবে গত কয়েক দিন দেখা করেনি শ্রবণ। সামাদ চৌধুরী তো ফ্ল্যাটে আসেন না, শ্রবণকে দেখার ইচ্ছে হলে কল করতেন শ্রবণ নিজেই চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে দেখা করে আসতো কিন্তু বিয়ের পর থেকে শ্রবণ চৌধুরী বাড়িতে আর যায়না।
এমনিতেও রোজ ভিডিও কলে তো কথা হয়-ই দাদার সঙ্গে।
ডাক্তার দেখিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে যায় শ্রবণের। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দেরি হয়ে গেল।
রুমে এসে দেখে সোহা ওদের দু’জনের কাপড়-চোপড় ভাঁজ করে কাভার্ডে তুলে রাখছে।
বিছানায় বসে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে শ্রবণ।
সোহা কাপড়-চোপড় সব ভাঁজ করে রেখে এগিয়ে আসে শ্রবণের কাছে। শ্রবণের ডান হাতের দিকে তাকিয়ে ওর গায়ে কাঁ’টা দিয়ে ওঠে। শরীর ঝাঁকি দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। মনে হচ্ছে হাতের একপাশে থেকে চামড়া আর মাংস উঠে গেছে। আবার চোখ মেলে তাকিয়ে পুনরায় শিউরে ওঠে। ওর হাত এমন হলে ও-তো কাঁদতে কাঁদতেই ম’রে যেত।
“ডাক্তার কী বলেছে?”
শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকায়। রসকষহীন গলায় বলে,
“বলেছে তুই খুব শীগ্রই বিধবা হয়ে যাবি তারপর নতুন জামাই পাবি।”
শ্রবণের কথা শুনে মুখ কালো করে ওর সামনে থেকে সরে যায় সোহা। মনে মনে বেশ কয়েকটা বকা দেয় শ্রবণকে। বজ্জাত ছেলে, মুখ দিয়ে কখনও ভালো কথা বের হয় না।
“ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আয়।”
দুই মিনিটের মধ্যেই লেবুর শরবত নিয়ে আসে সোহা।
শ্রবণ পুরো দুই গ্লাস শরবত পান করে। বসা থেকে উঠে কাভার্ড এলোমেলো করে টু কোয়ার্টার প্যান্ট বের করে একটা। সোহা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে ওর কাজ কারবার। একটা মানুষ কতটা খচ্চর হলে এভাবে ইচ্ছে করে কাপড় এলোমেলো করে সোহার জানা নেই। হসপিটালে যাওয়ার আগে একবার এলোমেলো করে রেখে গিয়েছিল এখন আবার এসে করল।
প্যান্ট চেঞ্জ করে ফ্লোরে ছড়িয়ে রাখে সব। বেল্ট এক জায়গায়, প্যান্ট আরেক জায়গায় আর টাওয়েল আরেক জায়গায়।
সোহা সব তুলে জায়গা মতো রেখে দেয়। শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“খাবে না?”
“শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছিলাম, পেট ভরে খাইয়ে দিয়েছে, আরও খেতে হবে?”
“খাবার বাড়ছি, আসো।”
সোহা বেরিয়ে যায় রুম থেকে। শ্রবণ শিস বাজাতে বাজাতে ওর পেছন পেছন বের হয় রুম থেকে।
সোহা খাবার বেড়ে দিয়ে নিজেও খেতে বসে। শ্রবণ খেতে খেতে নাক মুখ কুঁচকে বলে,
“এই বা/ল ছাল রাতে খেতে পারবো না আমি। রাতে অন্য কিছু রান্না করবি।”
“আমি রান্না করব?”
“না ম্যাডাম, আমি রান্না করে আপনাকে খাওয়াব।”
সোহা মুখ কাচুমাচু করে বলে,
“কী খাবে?”
“বিরিয়ানি।”
“বিরিয়ানি!”
“হ্যাঁ।”
সন্ধ্যার পর বিরিয়ানি রান্নার সব উপকরণ গুছিয়ে নেয় সোহা। রান্না ভালো না হলে যে শ্রবণ ওকেই খাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। গত কয়েকদিন ধরে ফ্ল্যাটে থেকে এই ছেলের মেজাজ আরও খিটখিটে হয়ে গেছে।
পান থেকে চুন খসতে দেরি কিন্তু এই ছেলের তর্জন গর্জন করতে দেরি হয় না।
“সোহা, কফি দিয়ে যা।”
“নিয়ে আসছি।”
কফি বানানোর জন্য পানি গরম হতে দিয়ে কফির মগ, চিনি আর কফির কৌটা নিয়ে আসে।
কফি বানিয়ে শ্রবণকে দিয়ে এসে বিরিয়ানি রান্না করার জন্য চুলায় হাঁড়ি বসিয়ে দেয়।
মাংস কষানোর জন্য হাঁড়িতে তেল দিয়ে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ কুচি, আদা রসুন বাটা দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। হঠাৎই হাঁড়ি থেকে একটা মরিচের বিচি ছিটকে এসে সোহার চোখের মধ্যে ঢুকে যায়। বিকট শব্দে চিৎকার করে ওঠে সোহা। কফির মগ রেখে সোফা ছেড়ে উঠে দৌড়ে রান্নাঘরে আসে শ্রবণ। আতঙ্কিত হয়ে বলে,
“কী হয়েছে? চিৎকার করছিস কেন এভাবে?”
সোহা দুই হাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করছে এখনও। শ্রবণ বাম হাত দিয়ে সোহার এক হাত সরানোর চেষ্টা করে বলে,
“শ’য়’তা’নের বাচ্চা বলবি তো কী হয়েছে। এমন করছিস কেন?”
“মরিচের বিচি ঢুকে গেছে চোখের ভেতরে।”
“কীভাবে ঢুকল?”
“হাঁড়ি থেকে ছিটকে এসে চোখের মধ্যে ঢুকে গেছে।”
“দেখি হাত সরা।”
“চুলা বন্ধ করো, পুড়ে গেল সব।”
শ্রবণ চুলা বন্ধ করতে গিয়ে বলে,
“এটা কীভাবে বন্ধ করে?”
“হাঁড়ি নামাও তাহলে।”
শ্রবণ চুলা থেকে হাঁড়ি নামিয়ে রাখে। চুলা কীভাবে বন্ধ করে চালু করে এটাই জানে না এখনও।
জোর করে সোহার হাত সরিয়ে দেয় মুখের সামনে থেকে।
“চুপ করে দাঁড়া, এভাবে ডললে বের হবে?”
“জ্বলছে।”
“বের করতে দে, তাকা আমার দিকে।”
চোখের ভেতর মরিচের বিচি ঢুকে আছে, কীভাবে তাকাবে চোখ মেলে?
শ্রবণ সোহার মুখ তুলে ধরে নিজের মুখের দিকে। সোহা ভুল করে শ্রবণের ডান হাত চেপে ধরে। শ্রবণ চেঁচিয়ে উঠে বলে,
“আহ, কু/ত্তা/র বাচ্চা হাত সরা।”
সোহা দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। শ্রবণ নিজের হাতের দিকে তাকায়, ম’রা চামড়া ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে।
“স্থির হয়ে দাঁড়া আর তাকা আমার দিকে।”
অনেক চেষ্টার পর মরিচের বিচি বের করতে সক্ষম হয় শ্রবণ।
“চোখে পানি দে বেশি করে।”
সোহা চোখ ডলতে ডলতে সিংকের কাছে এসে দাঁড়ায়। দুই হাতে পানি নিয়ে চোখেমুখে পানি দিতে শুরু করে। গরম তেল থেকে মরিচের বিচি এসে ঢুকে গেছে, এত সহজেই জ্বালা কমবে নাকী?
শ্রবণ হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
“সামান্য রান্না, তাও করতে পারে না চোখের মধ্যে মরিচের বিচি ঢুকিয়ে নিয়ে লাফায়।”
সোহার বলতে ইচ্ছে করল, “তুমি তো সামান্য চুলাও বন্ধ করতে পারো না আবার এসেছো আরেকজনের দোষ ধরতে?” কিন্তু বলার মতো সাহস সোহার নেই তাই মনের কথা মনের মধ্যেই রেখে দেয়।
“রান্না করতে হবে না, এসব গুছিয়ে রাখ, অনলাইনে অর্ডার দিচ্ছি।”
সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“রান্না করতে পারবো আমি, অর্ডার করতে হবে না।”
শ্রবণ আর কিছু না বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। দৌড়ে এসে এখন ব্যথা পাচ্ছে পায়ের আর পিঠের আঘাতে।
চোখের জ্বালা কমলে চুলার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। এগিয়ে এসে ড্রয়িং রুমে উঁকি দেয়। শ্রবণ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। কপাল ভ্রু কুঁচকে রেখেছে।
বিরিয়ানি খেয়ে ঔষুধ খেয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে শ্রবণ। সোহাকে বলে মলম লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। সোহা ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে মলম নিয়ে আসে, বসে শ্রবণের পাশে।
মলম মালিশ করতেই চেঁচিয়ে ওঠে শ্রবণ। গালি দিয়ে বলে,
“ডাইনির বাচ্চা, মলমের বদলে মরিচ বাটা লাগিয়ে দিচ্ছিস নাকী? জ্বলছে কেন এত?”
“মলমই তো লাগাচ্ছি।”
বলতে বলতে মলমের দিকে তাকায় সোহা। মুহূর্তেই চোখ জোড়া অস্বাভাবিক বড়ো বড়ো হয়ে যায়। শুকনো ঢোঁক গিলে জিব কা’ম’ড় দেয়। মলমের বদলে টুথপেস্ট লাগিয়ে দিয়েছে।
“মলম হলে এত জ্বলছে কেন? দেখি কোন মলম লাগাচ্ছিস।”
মাথা তুলে সোহার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায়। সোহা শ্রবণের হাতে মলম দেয় না, দেবে কোথা থেকে? ওটা তো মলমই না, টুথপেস্ট।
“কী হলো? দে মলম। নিশ্চই তুই মলমের সঙ্গে মরিচ বাটা মিশিয়েছিস নাহলে এত জ্বলতো না।”
ভয়ে ভয়ে টুথপেস্ট শ্রবণের হাতে দেয় সোহা। শ্রবণ মলমের নাম দেখে আর মলমের সাইজ দেখে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় সোহার দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“এটা মলম?”
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
দিশেহারা পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ৪০
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ১০
-
দিশেহারা পর্ব ৩