দিশেহারা (২৮)
সানা_শেখ
হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে শ্রবণ। হাতে স্যালাইন চলছে। উদাম গায়ে ক্ষত চিহ্নগুলো জ্বলজ্বল করছে। হেলমেট থাকায় মুখে বা মাথায় আঘাত লাগেনি।
ডান পাশের পিঠ, হাত, পা ছিলে গেছে অনেক খানি করে।
লড়ির নিচে ঢুকে গেলেও জানে বেঁচে গেছে এবার, সেরকম বড়ো কোনো ক্ষতি হয়নি। চাকার নিচে পড়লে খবর ছিল আজ। ভয়ে তো হাসানের শরীর কাঁপছিল।
লড়ির নিচে মাঝখানে পড়েছিল তাই এখনও আস্ত আছে।
পেছনের বাইকের ছেলের হাত ভেঙে গেছে একটা। দু’জনের বাইকের-ই ক্ষতি হয়েছে।
রাত দশটা বেজে গেছে। শ্রবণের স্যালাইন শেষ হতে আরও পাঁচ সাত মিনিট লাগবে।
পর পর দু’বার রিং বেজে কল কে টে যায়।
ফোনে আবার রিং বেজে উঠতেই চোখ মেলে তাকায় শ্রবণ। হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কে কল করছে?”
হাসান ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে বলে,
“ডাইনির দুই নাম্বার বাচ্চা।”
হাসানের কথা শুনে বাকি চারজন হো হো করে হেসে ওঠে। হাসান ওদের ধমক দিয়ে বলে,
“চুপ কর, এটা হসপিটাল।”
চারজন চুপ হয়ে যায়। শ্রবণ হাত বাড়ায় ফোন হাতে নেওয়ার জন্য। হাসান ফোন দেয় শ্রবণের হাতে। কল রিসিভ করে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে সোহার কান্না মিশ্রিত গলার স্বর।
“কোথায় তুমি? এখনও আসছো না কেন?”
“কী হয়েছে?”
“ভয় করছে আমার, তুমি দ্রুত আসো, ফ্ল্যাটে যেন কী আছে।”
আগের চেয়েও বেশি কান্না করে দিয়েছে সোহা। শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“আসছি।”
“একটু তাড়াতাড়ি আসো।”
“হুম।”
শ্রবণ কল কে টে দেয়। স্যালাইনের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকায়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজটা তুলে সুই খুলে ফেলে হাত থেকে। হাসান তাড়াহুড়ো করে বলে,
“আরে কী করছিস? স্যালাইন শেষ হয়নি এখনও।”
শ্রবণ উঠে বসতে বসতে বলে,
“শার্ট কই আমার?”
“ওটা আর পরার মতো অবস্থায় নেই।”
“দে তুই।”
“পরা যাবে না, ভাই। ক্ষতস্থানে নোংরা লাগবে।”
“এখন কী এই খালি গায়ে ফ্ল্যাটে ফিরব? দে তুই, যা হবে দেখা যাবে।”
হাসান নিজের গায়ের শার্ট খুলে দেয়। ওর শার্টের ভেতর শর্ট স্লিভ টিশার্ট আছে।
“এটা পর।”
শ্রবণ কথা না বাড়িয়ে শার্ট নিয়ে পরে। হাসান নিজেই সু জোড়া পরিয়ে দেয়। ফোন ওয়ালেট পকেটে ভরে কেবিন থেকে বের হয়। হাঁটতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
হসপিটালের বিল পরিশোধ করে ঔষুধ, মলম আর অয়েটমেন্ট কিনে নেয়।
শ্রবণের বাইক ওর ফ্ল্যাটের পার্কিং-এ আগেই রেখে আসা হয়েছে। ওটা ঠিক না করে চালানো যাবে না।
চারজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উবাড়ে উঠে বসে দু’জন। হাসান শ্রবণকে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে।
বহুতল ভবনের সামনে এসে দাঁড়ায় উবাড়। ভাড়া পরিশোধ করে দু’জন ভেতরের দিকে আগায়। হাসান বলে,
“এখন তুই একা না, নিজের সঙ্গে একজনকে জরিয়েছিস। নিজের কথা না ভাবলেও তার কথা ভাবিস।”
শ্রবণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“কী ভাববো?”
“তোর কিছু হলে মেয়েটার কী হবে?”
শ্রবণ কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। হাসান আবার বলে,
“আজকে যেভাবে লড়ির নিচে পড়েছিলি যদি কিছু হয়ে যেত?”
“হয়নি তো।”
“হয়নি, হতে কতক্ষন? এত স্প্রিডে কেন চালাতে হবে? একটু আস্তে চালালে কী গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না?”
“বাহ্! স্প্রিডে বোধহয় আমি একাই চালাই আর তুই পিঁপড়ার গতিতে চালাস তাইনা? দোষ আমার ছিল না সেটা তুই জানিসই।”
হাসান চুপ করে থাকে। এই ছেলেকে বুঝিয়ে লাভ নেই।
ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ায় দু’জন। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে শ্রবণ। হাসানকে ভেতরে আসতে বললে আসে না। ঔষুধের প্যাকেট শ্রবণের হাতে দিয়ে বলে,
“ভেতরে যাব না, ভালো থাকিস, আগামীকাল দেখা হচ্ছে।”
“সাবধানে যাস।”
হাসান উল্টো ঘুরে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। শ্রবণ দরজা লাগিয়ে রুমের দিকে এগিয়ে আসে। রুমে এসে দেখে রোজকার মতন সোহা ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে আগা গোড়া ঢেকে বসে আছে। শ্রবণের উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ তুলে তাকায় সোহা। শ্রবণকে দেখে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায় দ্রুত। শ্রবণের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কান্না আর ভয় জড়ানো গলায় বলে,
“আজকে এত রাত পর্যন্ত বাইরে ছিলে কেন? আমি কত ভয় পাচ্ছিলাম।”
“কী হয়েছে?”
“ডাইনিং টেবিলের ওখানে যেন কি আছে।”
“কী আছে?”
সোহা কাঁদতে কাঁদতে দু’দিকে মাথা নেড়ে বলে,
“জানিনা আমি।”
শ্রবণ হাতে থাকা ঔষুধের প্যাকেট বিছানার উপর রেখে বলে,
“আয় দেখি কী আছে। কোন বাঘ ভাল্লুক তোকে খেতে এসেছে।”
“না, আমি যাব না ওখানে।”
“কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ আয়।”
সোহার হাত ধরে টেনে নিয়ে রুম থেকে বের হয় শ্রবণ। সোহা ভয়ে একদম শ্রবণের গা ঘেঁষে হাঁটতে থাকে সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে। হেঁচকি তুলে কাদঁছে এখনও। শ্রবণ সোহার দিকে তাকায় একবার, একটা মানুষ এত ভয় কীভাবে পায়?
ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় দু’জন। শ্রবণ আশেপাশে নজর বুলিয়ে বলে,
“কোথায় কী? এখানে তো কিছুই নেই।”
“ছিল। আমি কাঁচ ভাঙার আওয়াজ শুনেছিলাম।”
শ্রবণ ফ্লোরে দৃষ্টি বুলায়। টেবিলের পাশেই একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙে পড়ে আছে। সোহার নজরেও পড়ে ভাঙা গ্লাসটা।
“দেখছো, গ্লাস ভেঙে পড়ে আছে। কিছু ছিল এখানে।”
বিড়াল টিরাল হতে পারে।”
“বিড়াল আসবে কীভাবে? জানালা দরজা তো সব লাগানোই ছিল।”
শ্রবণ চিন্তায় পড়ে। আসলেই তো বিড়াল আসার মতো কোনো রাস্তা নেই। গ্লাসটা ভাঙলো কীভাবে? ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে,
“রুমে চল।”
শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গেই রুমে চলে আসে সোহা। শ্রবণ ল্যাপটপ ওপেন করে। সোহার নজর পড়ে শ্রবণের ডান হাতের দিকে। এতক্ষণ তো খেয়ালই করেনি।
ব্যান্ডেজ করা হাতটা উঁচু করে ধরে আতঙ্কিত হয়ে বলে,
“তোমার হাতে কী হয়েছে?”
শ্রবণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকায়।
“অ্যাকসিডেন্ট করেছিলাম।”
“কীভাবে?”
“লড়ির নিচে ঢুকে গিয়েছিলাম বাইক থেকে পড়ে।”
সোহার বুক কেঁপে ওঠে শ্রবণের কথা শুনে। লড়ির নিচে ঢুকে গিয়েছিল, মানে কী?
শ্রবণ আবার বলে,
“আজকে একটুর জন্য বিধবা হোসনি। আমি আজকে ম’রে গেলে আমার কাছ থেকে তো আজকে মুক্তি পেয়ে যেতি, তোর শ্বশুর আর মা-খালাও বেঁচে যেত। এবারের দোয়া কাজে লাগেনি, নেক্সট টাইম দোয়া করলে ভালোভাবে করবি।”
শ্রবণের কথা শুনে সোহার চোখ জোড়া পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে।
“গ্লাস ভাঙার আওয়াজ কখন পেয়েছিলি?”
সোহা চোখের পানি মুছে ধরা গলায় বলে,
“তোমাকে কল করার কিছুক্ষণ আগেই।”
শ্রবণ ক্যামেরার ভিডিও রেকর্ড বের করে বলে,
“এই দেখ, ওটা ইঁদুর ছিল।”
সোহা ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকায়। বড়ো একটা ইঁদুরের ধাক্কায় গ্লাসটা পড়ে গেছে। যেহেতু গ্লাসটা কর্নারে ছিল তাই একটু ধাক্কা লাগতেই পড়ে গেছে।
শ্রবণ ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয়।
ডান হাতে ব্যান্ডেজ থাকলেও বাম হাত ঠিক আছে। গায়ের শার্ট খুলতেই সোহার চোখ জোড়া বড়ো বড়ো হয়ে যায়। মুহূর্তেই চোখ জোড়া আবারও পানিতে টুইটুম্বর হয়ে যায়। শ্রবণের ফরসা পিঠের ডান পাশের চামড়া ছিলে বিভৎস দেখাচ্ছে। শিউরে ওঠে সোহার পুরো শরীর, ডুকরে কেঁদে ওঠে পিঠের দিকে তাকিয়ে থেকে।
শ্রবণ ঘুরে দাঁড়ায়। সোহার মুখের দিকে তাকায়। সোহা মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। মেদুর দু-গাল বেয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ঝাপসা চোখে ঝাপসা দেখছে শ্রবণের চেহারা।
শ্রবণ বিরক্তির সুরে বলে,
“আবার কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?”
সোহা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“তোমার পিঠ কেমন হয়ে গেছে!”
“তো তোর কী? তোর তো হয়নি।”
“অনেক ব্যথা করছে?”
“না। যা টাওয়েল ভিজিয়ে নিয়ে আয়।”
সোহা কিছুক্ষণ শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে টাওয়েল ভিজিয়ে নিয়ে আসার জন্য।
শ্রবণ হাতের শার্টটা রেখে কাভার্ড থেকে টু কোয়ার্টার প্যান্ট বের করে। শুকনো একটা টাওয়েলও বের করে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পিঠের দিকে তাকায়। দেখে মনে হচ্ছে চুইয়ে চুইয়ে র’ক্ত পড়ছে। কেমন লাল লাল সাদা সাদা হয়ে আছে। বিশ্রী দেখাচ্ছে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে সরে এসে বিছানার সামনে দাঁড়ায়। হাতের টাওয়েল আর টু কোয়ার্টার প্যান্ট বিছানার ওপর রেখে পরনের প্যান্টের বেল্ট খুলে ফেলে। প্যান্ট খুলতে গেলে পড়ে ঝামেলায়। নিচু হতে পারছে না, পিঠে ব্যথা পাচ্ছে। ডান পায়ের ছুলে যাওয়া জায়গায়ও ব্যথা লাগছে।
সোহা টাওয়েল ভিজিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে।
“টাওয়েল টুলের ওপর রেখে এখানে আয়।”
টাওয়েল রেখে শ্রবণের কাছে এগিয়ে আসে সোহা। শ্রবণ কোমরে টাওয়েল পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“প্যান্ট খুলে দে।”
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। এত বড়ো একটা ছেলের প্যান্ট খুলে দেবে ও?
“কথা কানে যাচ্ছে না? কানের নিচে দিতে হবে নাকী একটা?”
“আ আ আমি প্যান্ট খুলে দেব?”
“হ্যাঁ। আমি একা খুলতে পারছি না। ডান পা ছুলে গেছে, এটা সাবধানে খুলবি।”
কথাগুলো বলে বিছানায় বসে। একা একা কিছুটা খুলে ফেলেছিল বাকিটা সোহা খুলে দেয় সাবধানে। ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে বাজে অবস্থা।
সোহার দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে আবার।
এত ব্যথা পেয়েও এই ছেলে এত স্বাভাবিক আছে কীভাবে? ওর আঘাত দেখে তো সোহার-ই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
“প্যান্টটা পরিয়ে দে।”
সোহা মুখ তুলে তাকায়। শ্রবণ প্যান্টটা সোহার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
সোহা চোখের পানি মুছে প্যান্ট হাঁটুর উপর তুলে দেয় বাকিটা শ্রবণ নিজেই পরে নেয়।
কোমরের শুকনো টাওয়েল খুলে এগিয়ে গিয়ে ভেজা টাওয়েলটা হাতে তুলে নেয়।
ভেজা টাওয়েল দিয়ে মুখ, গলা, বুক আর পেট মুছে টাওয়েল সোহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,
“পিঠ মুছে দে, যেখানে যেখানে র’ক্ত শুকিয়ে গেছে ওগুলো তুলে দিবি।”
সোহা সাবধানে ধীরে ধীরে পিঠ মুছে দেয়।
শ্রবণ বাম পা দেখিয়ে দেয় মোছার জন্য।
টাওয়েল ধুয়ে মেলে দিয়ে শ্রবণের সামনে এসে দাঁড়ায় আবার। সোহার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে ব্যথা শ্রবণ পায়নি, সোহা নিজেই পেয়েছে। চোখ জোড়া থেকে এখনও টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“খাবে না?”
“হ্যাঁ।”
“এখানে নিয়ে আসবো?”
“না।”
শ্রবণ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ওর পেছন পেছন সোহা-ও বেরিয়ে আসে। শ্রবণের জন্য খাবার বেড়ে দিয়ে নিজেও খেতে বসে।
শ্রবণ বাম হাতে চামচ তুলে নেয়, ডান হাত দিয়ে খাওয়ার উপায় নেই, পুরো হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা।
চামচের সাহায্যে কোনো রকমে খায় অল্প। খেতে ইচ্ছে করছে না। শরীর গরম হয়ে উঠছে। জ্বর আসবে বোধহয়।
বসা থেকে উঠে রুমের দিকে আগায়। সোহা ভয়ে ভয়ে বলে,
“একটু দাঁড়াও।”
“কলিজার মধ্যে এত কীসের ভয়? এখানে বাঘ ভাল্লুক নেই যে তোকে ধরে খাবে।”
“ভূত তো আছে।”
“তোর মতো ডাইনির সামনে কোনো ভূতের খাওয়া আছে?”
সোহা বলে না কিছু। ওকে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ডাইনির মতো লাগে?
খাওয়া শেষ করে দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে ফ্রিজে তুলে রেখে শ্রবণের সঙ্গে রুমে প্রবেশ করে।
শ্রবণ শুয়ে পড়ে বাম কাত হয়ে। কদিন বাম কাত আর উপুর হয়েই ঘুমোতে হবে। ছাপড়ি কোথাকার। দেখেছেই সামনে লড়ি। স্প্রিড কমাবে না? স্প্রিড তো কমায়ইনি উল্টো আরেক জনের পেছনে মে’রে দিয়েছে। ওকে তো আহত করেছেই সঙ্গে ওর সাধের বাইকের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে তো করছে গিয়ে বাকি তিন হাত পা ভেঙে দিয়ে আসতে।
সোহা শ্রবণের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে পড়ে।
“এদিকে আয়।”
সোহা এগিয়ে আসে।
“আরও আয়, আমার কাছে আয়।”
সোহা একদম শ্রবণের কাছে চলে আসে।
“এদিকে ফের।”
শ্রবণের দিকে ঘুরে শোয়। শ্রবণ সোহার গায়ের উপর ডান হাত পা তুলে দেয়। সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে ওর সঙ্গে মিশে গেছে। শ্রবণ বলে,
“ব্যথা দিলে খবর আছে তোর।”
সোহা বুক থেকে মুখ তুলে তাকায়। ডিম লাইটের নীল আলোয় স্পষ্ট শ্রবণের চেহারা। মিনমিন করে বলে,
“ঘুমের মধ্যে ব্যথা লেগে যেতে পারে, আমি তো ঘুমের মধ্যে অনেক নড়াচড়া করি। আমাকে ছাড়ো, আমি দূরে ঘুমাই।”
“তুই এখানেই ঘুমাবি, আমার কাছে। রাতে ব্যথা দিলে সকালে তোর মাজায় ব্যান্ডেজ থাকবে।”
নিজেই জোর করে নিজের কাছে রাখছে আবার থ্রেডও দিচ্ছে ব্যথা দেবে বলে। অদ্ভুত মানুষ। একটা মানুষ এত অদ্ভুত কীভাবে হয়?
পুনরায় শ্রবণের উন্মুক্ত বুকে মুখ গুঁজে দেয় সোহা। শ্রবণের পরনে শুধু টু কোয়ার্টার প্যান্ট, টিশার্ট পরেনি পিঠের ক্ষতের জন্য।
ভোরে শ্রবণের ডাকে সোহার ঘুম ভাঙে। শুয়ে থেকেই চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করে বলে,
“বলো।”
“ওঠ, লাইট অন কর।”
সোহা শ্রবণের হাত পা সাবধানে সরিয়ে দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। ঘুমে চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। আরও কিছুক্ষণ ঘুমোতে পারলে ভালো লাগতো।
বিছানা ছেড়ে নেমে লাইট অন করে। শ্রবণের দিকে তাকাতেই শ্রবণ বলে,
“ঔষুধের প্যাকেটটা নিয়ে আয়।”
সোহা প্যাকেটটা নিয়ে আসে।
শ্রবণ খুলে ভেতর থেকে একটা অয়েটমেন্ট বের করে। সোহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“ছিলে যাওয়া জায়গাগুলোতে দিয়ে দে।”
সোহা শ্রবণের পাশে উঠে বসে বিছানায়। শ্রবণ উপুর হয়ে শোয়। ক্ষত স্থান শুকিয়ে টান লাগছে এখন। নড়াচড়া করলেই বোধহয় চামড়া ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে আসবে এমন মনে হচ্ছে। ব্যথাও করছে ভীষণ। রাতে ঔষুধের প্রভাবে সেরকম কিছু অনুভব না হলেও এখন নড়তেও ইচ্ছে করছে না। ব্যথায় টনটন করছে পুরো শরীর।
মনে মনে বাইকার ছেলেটাকে গালি দেয় কতক্ষন।
পিঠ, হাত-পায়ের সব ক্ষত স্থানে অয়েটমেন্ট লাগিয়ে দেয় সোহা। অয়েটমেন্ট লাগানোর পর এখন টান লাগছে কম।
শোয়া থেকে উঠে বসে। নিচে দাঁড়াতেই পায়ের ব্যথা ভালোভাবেই অনুভব করতে পারে। ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়।
নাস্তা করতে শ্রবণকে সাহায্য করেছে সোহা। সাহায্য করেছে বলতে সোহা নিজের হাতেই খাইয়ে দিয়েছে ওকে। বাম হাতে খেতে পারছিল না শ্রবণ। চামচ দিয়ে তো আর পরোটা ছিঁড়তে পারবে না।
নাস্তা সেরে ঔষুধ খেয়ে বিছানায় উঠে বসে জানালার দিকে মুখ করে।
সোহা শ্রবণের ইউজ করা ড্রেসগুলো ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে ধুয়ে নেয়।
রুমে ফিরে এসে দেখে শ্রবণ উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। পিঠের ক্ষত দগদগে হয়ে আছে। যতবার ক্ষতগুলোর দিকে নজর পড়ে ততবার সোহার শরীর শিউরে ওঠে। কত বাজেভাবেই না আঘাত পেয়েছে।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে সোহার মনে হয় শ্রবণ কাদঁছে নিঃশব্দে। চোখের পানি মুছলো এমনটাই তো দেখল।
আগাবে না আগাবে না করেও আগায় সোহা। এসে দাঁড়ায় শ্রবণের পাশে। ভয়ে ভয়ে কম্পিত স্বরে বলে,
“কী হয়েছে তোমার?”
শ্রবণ প্রশ্ন করা পছন্দ করে না এটা সোহা জানে। ওকে কোনো প্রশ্ন করার আগে কয়েকবার ভাবতে হয় সোহার।
শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“বিরক্ত না করে যা এখান থেকে।”
“কী হয়েছে তোমার?”
“যেতে বলেছি।”
“কাদঁছো কেন, তুমি?”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সোহার দিকে। সোহা ভয় পেয়ে কিছুটা পিছিয়ে যায়। শ্রবণ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সোহার দিকে এগিয়ে বলে,
“আজকের দিনে তোর মা আমার বোনকে খু’ন করেছিল।”
শ্রবণের গলার স্বর আর চেহারা দেখে ভয়ে সোহার গলা শুকিয়ে যায়। কেমন আগ্রাসী হয়ে উঠছে। চোখমুখ কেমন হিংস্র হয়ে উঠেছে। কেন আগ বাড়িতে জিজ্ঞেস করতে আসলো? ওকে ওর মতো থাকতে দিলেই তো হতো। এখন কী হবে ওর? শ্রবণ কী করবে ওর সঙ্গে?
চলবে………….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ২৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৬