দিশেহারা (২৩)
সানা_শেখ
সোহা ভয়ে ভয়ে চারদিকে নজর বুলিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে। একটা চেয়ারে বসে চুপচাপ। প্লেট সামনে নিয়ে ভাত মাখতে শুরু করে। খাবার কী এখন গলা দিয়ে নামবে? ভয়ে তো গলাই বন্ধ হয়ে গেছে।
পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে ভাত খেতে শুরু করে। কোনোদিকে তাকায় না, দৃষ্টি স্থির প্লেটের দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে। সবকিছু কোনরকমে ঢেকে রেখে এক প্রকার দৌড়ে রুমে চলে আসে।
রুমে এসেই জোরে জোরে শ্বাস নেয়। দরজা ভিজিয়ে রেখে বিছানায় উঠে বসে। জানালার দিকে চোখ যেতেই দেখে জানালা আর ব্যালকনির দরজা খোলা।
দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। জানালা দরজা লাগিয়ে আবার দ্রুত বিছানায় উঠে বসে। আর নামবে না বিছানা থেকে যত যাই হয়ে যাক।
শ্রবণ ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেছে। ফ্ল্যাটের দরজা লাগিয়ে বেডরুমের দিকে এগিয়ে আসে। আজকে আর সোহা ওকে কল করেনি ভয় পাওয়ার জন্য।
রুমে এসে দেখে সোহা আগা গোড়া ঢেকে শুয়ে আছে। পকেট থেকে ছোটো একটা প্যাকেট বের করে সোহার শিয়রে ছুঁড়ে দেয়। ফোন নিজের বালিশের পাশে রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। চাবি আর ওয়ালেট রেখে শার্ট প্যান্ট চেঞ্জ করে নেয়। ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় বসতে বসতে সোহার নাম ধরে ডাকে। সাড়া শব্দ করছে না দেখে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে সরিয়ে নেয় উপর থেকে। ঘুমিয়ে গেছে আগা গোড়া ঢেকে রেখে। গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে,
“এই সোহা, ওঠ।”
ধাক্কা খেয়ে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় সোহা। শ্রবণকে সামনে বসে থাকতে দেখেই লাফিয়ে উঠে বসে দ্রুত। দুই হাতে চোখমুখ ডলে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,
“কখন এসেছ?”
“একটু আগেই, যা ফ্রেশ হয়ে আয়।”
সোহা বিছানা ছেড়ে নেমে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। তাড়াহুড়োয় ঘুম থেকে উঠে মাথা ধরে গেছে।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই শ্রবণ ওর হাতে দুটো ট্যাবলেট ধরিয়ে দিয়ে বলে,
“খা।”
কোনো প্রশ্ন ছাড়াই খেয়ে নেয় সোহা। শ্রবণ বুকের উপর বালিশ চেপে শুয়ে পড়ে।
“খাবে না?”
শ্রবণ চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
“না। তুই খেলে খেয়ে আয়।”
সোহারও তেমন খিদে পায়নি, খেতেও ইচ্ছে করছে না এখন। লাইট অফ করে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে শ্রবণের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে।
কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। শ্রবণ বুকের উপর থেকে বালিশ সরিয়ে কাত হয়ে শোয়। হাত বাড়িয়ে সোহাকে টেনে আনে নিজের কাছে। নিজের দিকে ফিরিয়ে সোহার বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে।
সোহার হার্টবিট বেড়ে গেছে।
শ্রবণের কাছ থেকে ছোটার জন্য ছটফট করতে শুরু করেছে। শ্রবণ বিরক্ত হয়ে বলে,
“সমস্যা কী তোর? এমন করছিস কেন?”
“ছাড়ো।”
“কেন?”
“অস্বস্তি হচ্ছে।”
শ্রবণ দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“আমার ছোঁয়ায় অস্বস্তি হচ্ছে আর অন্যের ছোঁয়ায় স্বস্তি লাগে তাইনা?”
“কী বলছো এসব?”
“তুই যা বলছিস তাই তো বললাম।”
“তুমি ছাড়া কেউ ছুঁয়েছে আমাকে?”
“ছোঁয়নি?”
“না।”
“ছোঁয়নি? তুই আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে বলছিস?”
সোহা একটু দমে যায়। মৃদু স্বরে বলে,
“না ছোঁয়নি, স্পর্শ ভাইয়া ছুঁয়েছিল; শুধু হাত। তোমার মতো করে গভীরভাবে কেউ ছোঁয়নি তুমি ব্যতীত।”
“কোনোদিন কেউ যেন ছুঁতেও না পারে।”
“হুম।”
শ্রবণ আর কথা বাড়ায় না। সোহার এক হাত তুলে নিজের মাথায় রাখে। আয়েশ মতো বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে নিশ্চুপ হয়ে থাকে।
সোহা আলতো হাতে শ্রবণের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করে।
সকালে সোহার ঘুম ভাঙার পর শ্রবণকে রুমে পায় না, বুঝতে পারে জিমে চলে গেছে। অসুস্থতার জন্য এই কয়েকদিন যায়নি।
শোয়া থেকে উঠে বিছানা গুছিয়ে ফ্রেশ হতে যায়। বিয়ের পর গতরাতের ঘুমটা ভালো হয়েছে। এর আগের রাতগুলো তো শ্রবণের যন্ত্রণায় ঠিকমতো ঘুমোতেই পারেনি। শ্রবণ গতরাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সারারাত আর ঘুম থেকে ওঠেনি। সোহার ফজরের আগে আগে ঘুম হালকা হয়ে এসেছিল, তখনও শ্রবণ ওর বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিল। রাতে নড়াচড়াও করেনি বোধহয়। দু’জনেরই ঘুম ভালো হয়েছে গতরাতে।
ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে শ্রবণ ফিরে এসেছে। সোহা বের হতেই শ্রবণ ভেতরে প্রবেশ করে।
হাত-মুখ মুছে মশ্চরাইজার মেখে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে দেখে শ্রবণ নাস্তা কিনে নিয়ে এসেছে। সোহা স্বস্তির শ্বাস নেয়, এখন নাস্তা তৈরি করতে গেলে দেরি হয়ে যেত আরও, এমনিতেই বেলা হয়ে গেছে। রাতে না খাওয়ার কারণে এখন খিদেও পেয়েছে।
রান্না ঘরে এসে দু’জনের জন্য চারটা ডিম সিদ্ধ করতে চুলায় বসিয়ে দেয়।
সিদ্ধ ডিম আর দুধ গরম করে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসতেই দেখে শ্রবণ তৈরি হয়ে এগিয়ে আসছে।
শ্রবণ চেয়ার টেনে বসতেই সোহা শ্রবণের নাস্তা ওর সামনে দেয়। নিজের জন্য রেডি করে নিয়ে নিজেও বসে খাওয়ার জন্য।
শ্রবণ সিদ্ধ ডিম খেতে খেতে গম্ভীর স্বরে বলে,
“ভার্সিটি যাবি?”
সোহা মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ আবার বলে,
“বলেছি ভার্সিটি যাবি নাকী।”
“তুমি যেতে দিলে যাব।”
“আমার সঙ্গে যাবি আবার আমার সঙ্গেই ফিরে আসবি। কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলা তো অনেক দূর তাকালেও তোর চোখ উপড়ে ফেলতে এক সেকেন্ড ভাববো না আমি।”
“তাকাবো না।”
“মনে থাকে যেন।”
“আমার বই খাতা সব তো ওই বাড়িতে রয়েছে।”
“নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব আমি।”
সোহা মাথা নেড়ে খাওয়ায় মনোযোগী হয়। মনে মনে খুশিও হয়েছে। চোখ তুলে আবার শ্রবণের দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ প্লেটের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে খাচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে স্টাডি রুমে চলে যায় শ্রবণ। সোহা নিজের খাওয়া শেষ করে টেবিল গুছিয়ে রেখে প্লেট ধুয়ে রাখে। শ্রবণ ব্যাগ কাঁধে আর হাতে হেলমেট নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে থেকে দরজা লক করে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে দাদার ফোনে কল করে।
“শ্রবণ, কেমন আছো?”
“ভালো, তুমি কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“কোথায় তুমি?”
“বাড়িতেই আছি।”
“সিয়াম কোথায়?”
“মাত্র ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে গেল।”
“বিকেলে সোহার বই খাতা সহ যাবতীয় সব পেপার্স সিয়ামকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবে।”
“আচ্ছা।”
“রাখছি, ভালো থেকো।”
“আচ্ছা, তুমিও ভালো থেকো।”
শ্রবণ কল কে’টে লিফটের ভেতর প্রবেশ করে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্র মহিলা ওর দিকে তাকিয়ে আছে চোখ কোনা করে। শ্রবণ বিরক্তিতে কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয়। এই মহিলার সঙ্গে দেখা হলেই ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে তো প্রশ্ন করে করে বিরক্ত বানিয়ে দেয়। গায়ে পড়া মহিলা একটা।
শ্রবণ ফ্ল্যাটে ফেরে ঠিক চারটায়।
সোহা রুমগুলো ঝাড়ু দিয়ে এখন ড্রয়িং রুম ঝাড়ু দিচ্ছে। শ্রবণকে ফিরে আসতে দেখে মনে সাহস বাড়ে। এতক্ষণ ভয় ভয় লাগছিল। একা একটা ফ্ল্যাটে থাকতে ভয় তো লাগেই সাথে দম বন্ধ হয়ে আসে।
শ্রবণ সোজা স্টাডি রুমে প্রবেশ করে। ব্যাগ আর হেলমেট রেখে বেডরুমে ফিরে আসে। ক্লান্ত লাগছে, খিদেও পেয়েছে। কেন যেন আজ বাইরে খেতে ইচ্ছে করেনি। হাসান অনেক টানাটানি করেছিল খাওয়ার জন্য কিন্তু শ্রবণ খায়নি। যা করতে মন টানে না, ইচ্ছে করে না সেটা শ্রবণ কোনোদিন করে না। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনকিছু করতে পারে না শ্রবণ চৌধুরী।
শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হতেই কলিং বেল বেজে ওঠে। সোহা সোফায় বসে ছিল, কলিং বেলের শব্দে সেদিকে তাকায়। তারপর ঘুরে তাকাতেই দেখে শ্রবণ এগিয়ে আসছে।
শ্রবণ সোজা দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। দরজা খুলে দেখে সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। বাম হাতে স্যুটকেস ধরে রাখা।
সিয়াম স্যুটকেসটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
“ভাইয়া, এই যে এটার ভেতর সবকিছু আছে।”
শ্রবণ হাত বাড়িয়ে স্যুটকেসটা ধরে। সিয়াম ভেতরে উঁকি দেয় একবার। সোহাকে দেখতে পায় সোফায় বসে আছে। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“ভেতরে আয়।”
সিয়াম দাঁড়ায়।
“বোনকে না দেখেই চলে যাবি?”
সিয়াম ঘুরে দাঁড়ায়। শ্রবণ পথ ছেড়ে দেয়। সিয়াম ভেতরে প্রবেশ করতেই দরজা লাগিয়ে দিয়ে শ্রবণ স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
এতদিন পর ভাইকে দেখে সোহার চোখে পানি জমেছে। সোফা ছেড়ে উঠে এগিয়ে আসে ভাইয়ের কাছে, দাঁড়ায় ভাইয়ের সামনে।
সিয়াম কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে বোনের মুখের দিকে। সবসময় হাস্যোজ্বল থাকা চেহারা মলিন হয়ে আছে। চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর, পলক ফেললেই পানি গড়িয়ে পড়বে।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে সোহার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সিয়াম বোনকে টেনে জড়িয়ে ধরে। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে জড়ানো গলায় বলে,
“কেমন আছিস?”
সোহা কেঁদে ফেলে। কান্না জড়ানো গলায় বলে,
“ভালো, তুমি কেমন আছো?”
“এইতো আছি কোনরকম। বাড়িতে তুই নেই, ভাইয়া নেই, ভালো লাগে না আমার। কাঁদিস না।”
সোহা কান্না বন্ধ করতে চেয়েও পারে না।
সিয়াম বোনের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ফ্ল্যাটের চারদিকে নজর বুলায়। এর আগে এই ফ্ল্যাটে ওর আসা হয়নি কোনোদিন। শ্রবণ স্টাডি রুমের দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে।
সিয়াম আবারও বলে,
“কাঁদিস না।”
সোহা ভাইয়ের বুক থেকে মুখ তুলে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়। সিয়াম বোনের চোখের পানি মুছিয়ে দেয় কিন্তু তখনই আবার পানি গড়িয়ে পড়ে গাল দুটো ভিজে যায়।
সিয়ামের টুইটুম্বর চোখ জোড়া থেকে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ে সোহার মুখের ওপর। সিয়াম দ্রুত নিজের চোখের পানি মুছে নেয়। সোহাকে ছেড়ে দিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
“আমি আসছি, তুই ভালো থাকিস।”
শ্রবণ বলে,
“চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে লাঞ্চ করিসনি, লাঞ্চ করে যা তোর বোন রান্না করেছে।”
বোন রান্না করেছে শুনে সিয়াম দাঁড়িয়ে যায় আবার। ঘুরে দাঁড়ায় বোনের দিকে। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। সোহা রান্না করতে পারে? । সোহা তো কোনোদিন রান্না ঘরেই প্রবেশ করেনি। ও রান্না করা শিখল কবে?
শ্রবণ এগিয়ে এসে বলে,
“চল লাঞ্চ করি, যদিও এখন লাঞ্চ করার টাইম না।”
সোহা চোখের পানি মুছে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
“ভাইয়া, আসো।”
“আয়।”
সিয়াম শ্রবণের সঙ্গে পা বাড়ায় ডাইনিং টেবিলের দিকে।
সোহা ওদের দু’জনের জন্য খাবার বেড়ে দেয়।
সিয়াম বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসে চেয়ারে বসে।
ভাত মেখে মুখে পুরে তো সিয়াম অবাক। রান্না অনেক ভালো হয়েছে। মনে হচ্ছে প্রোফেশনাল কেউ রান্না করেছে। কাঁচা হাতের রান্না মনেই হচ্ছে না। শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ তৃপ্তি নিয়েই খাচ্ছে।
সিয়াম বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুই রান্না করেছিস এসব!”
“হ্যাঁ।”
“তুই তো জীবনে রান্না ঘরেও যাসনি, এত ভালো রান্না কোথায় শিখলি?”
“ইউটিউব থেকে।”
সিয়াম খাওয়া বন্ধ করে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পলকহীন। ওর অবুঝ বোকাসোকা বোনটা সংসারী হয়ে গেছে মনে হয়।
“দুপুরে খেয়েছিস?”
“হ্যাঁ, তুমি খাও।”
সিয়াম খাওয়া শুরু করে আবার। চোখ দুটো বেয়ে পানি বেরিয়ে আসছে আবার। টিস্যু পেপার হাতে নিয়ে চোখ মুছে নেয়। বোনের হাতের রান্না খেয়ে এবার আনন্দেই ওর চোখ দুটো বেয়ে পানি বেরিয়ে আসছে।
নাস্তা সেরে দ্রুত তৈরি হয়ে নেয় সোহা। শ্রবণ ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে বিরক্তির সুরে বলে,
“সারাদিন ধরে কী এখন রেডিই হবি? বের হ শ’য়’তা’নের বাচ্চা নয়তো রেখেই চলে যাব।”
“হয়ে গেছে, আসছি।”
দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে সোহা। শ্রবণ দরজার দিকে এগিয়ে বলে,
“স্টাডি রুম থেকে তোর ব্যাগ নিয়ে আয়।”
সোহা আবার দ্রুত পায়ে স্টাডি রুমে প্রবেশ করে। ব্যাগ হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
শ্রবণ ফ্ল্যাটের দরজা লক করছে, ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সোহা, কাঁধে ব্যাগ।
সেই ভদ্র মহিলাটা শ্রবণের পাশে মেয়ে মানুষ দেখে বেশ অবাক হয়েই তাকিয়ে আছেন। কৌতূহল দমাতে না পেরে এগিয়ে আসেন দু’জনের কাছে।
ততক্ষণে শ্রবণ দরজা লক করে সোহার হাত ধরে লিফটের দিকে আগাচ্ছে। মহিলা দ্রুত দু’জনের পাশে এসে হাঁটতে হাঁটতে বলেন,
“কেমন আছো তোমরা?”
শ্রবণ কিছু বলে না, স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে ওর চোখেমুখে। ভদ্রতা বজায় রাখতে সোহা মৃদু স্বরে বলে,
“ভালো।”
“শ্রবণ, তোমার কী হয়?”
সোহা ভদ্র মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। লিফটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। লিফট নিচে রয়েছে।
“বললে না যে, তোমরা কী হও সম্পর্কে?”
শ্রবণ তাকায় ভদ্র মহিলার মুখের দিকে। কিছুটা রুক্ষ স্বরে বলে,
“হাজব্যান্ড ওয়াইফ।”
“ও তোমার বউ?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি বিয়ে করে নিয়েছ?”
“আপনি কী চাইছিলেন আমি যেন বিয়ে না করে সারা জীবন সিঙ্গেল থাকি?”
“না না, তা চাইবো কেন? বিয়ে করেছো ভালো হয়েছে। বিয়ের বয়স তো আরও আগেই হয়েছিল।”
ভদ্র মহিলা একটু দম নিয়ে আবার বলেন,
“কোথায় বিয়ে করেছ?”
“বাড়িতে।”
“বাড়িতে বিয়ে করেছো সেটা তো বুঝলাম, আমি জিজ্ঞেস করেছি তোমার বউয়ের বাবার বাড়ি কোথায়।”
“আমিও সেটাই বলেছি, আমার বাড়িতে।”
শ্রবণের কথা শুনে ভদ্র মহিলার কপাল ভ্রু কুঁচকে গেছে। ওর কথার আগা গোড়া কিছুই ওনার মাথায় ঢুকছে না। শ্রবণের মেজাজ ভীষণ গরম হয়ে গেছে। লিফট চলে আসায় সোহাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ভদ্র মহিলা নিজেও দ্রুত প্রবেশ করেন ভেতরে।
নিজেকে আবারও দমাতে না পেরে আর সবটা জানার আগ্রহে আবার বলেন,
“একটু ক্লিয়ার করে বলোতো আমাকে, তোমার বাড়িতেই তোমার বউয়ের বাবার বাড়ি কীভাবে হয়? আর তোমার যদি বাড়ি থেকেই থাকে তাহলে তুমি এতগুলো বছর ধরে এখানে একা একা থাকো কেন?”
শ্রবণ কিছু বলে না। ওর চোখমুখ দেখে সোহা কিছু বলার সাহস করছে না। মহিলা বেশি কথা বলে বুঝতে পারছে।
লিফট নিচে পৌঁছাতেই শ্রবণ সোহাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। ভদ্র মহিলা পিছু ডেকে বলেন,
“ক্লিয়ার করে বলে তো যাও পুরোটা।”
শ্রবণ সোহাকে টেনে নিয়ে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যায়। সোহা পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে আবার সামনের দিকে তাকায়। শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর মুখ লাল হয়ে গেছে রাগে। মনে মনে ভদ্র মহিলাকে কি কি বলে গালী দিচ্ছে কে জানে!
পার্কিং-এ এসে সোহাকে বসিয়ে নিজে বসে ড্রাইভিং সিটে। পার্কিং থেকে বেরিয়ে আসতেই ভদ্র মহিলা সামনে পড়ে। শ্রবণ গাড়ির স্প্রিড বাড়িয়ে চলে যায় দৃষ্টি সীমানার বাইরে।
মহিলা পেছন থেকে বিড়বিড় করে বলেন,
“বেয়াদব ছেলেমেয়ে, আদব কায়দা কিছু শেখেনি নাকী? কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে হয় এত টুকুও জ্ঞান নেই। এখনকার ছেলেমেয়েরা যে কী মনে করে নিজেকে? সবকটা অসভ্য তৈরি হচ্ছে, সব বাবা-মায়ের দোষ।”
বিড়বিড় করতে করতে ভদ্র মহিলা চলে যান নিজ গন্তব্যে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল তিনটার উপর বেজে গেছে।
শ্রবণের আরও একটা ক্লাস আছে তবে এখনও অনেক দেরি ক্লাস শুরু হতে। এখন বন্ধুদের সঙ্গে বসে আছে ক্যাম্পাসে। ওর হাতে গিটার, গান গেয়ে মাত্রই থেমেছে। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে টাইম দেখে নেয়। এতক্ষনে তো সোহার ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এখনও আসছে না কেন? ওকে তো বলে দিয়েছিল ক্লাস শেষে যেন এখানেই আসে।
বন্ধুদের কথায় পুনরায় গিটারে সুর তুলতেই নজর আটকায় কিছুটা দূরে। ওখানে ছেলেমেয়েদের জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। শ্রবণ কপাল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। মুহূর্তেই চোখমুখের রঙ পরিবর্তন হয়। গিটার রেখে উঠে দাঁড়ায়। বড়ো বড়ো কদমে আগায় ভিড়ের দিকে। ওকে এভাবে ওদিকে এগিয়ে যেতে দেখে ওর বন্ধুরাও আগায় পেছন পেছন।
ভিড়ের মধ্যে এসে দাঁড়ায় শ্রবণ। রাগী স্বরে বলে,
“কী হচ্ছে এখানে?”
শ্রবণের গলার স্বর শুনে পেছনে তাকায় সোহা। শ্রবণকে নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত ওর দিকে ঘুরে কিছুটা এগিয়ে দাঁড়ায় আরও কাছাকাছি। শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকায়। রাগে পায়ের রক্ত ছলকে মাথায় উঠে যায়।
পেছন থেকে একটা ছেলে সোহার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
“ওদিকে গেলি কেন? এদিকে আয়।”
সোহা ভয়ে শ্রবণের বুকের সঙ্গে মিশে যায় দ্রুত। ও জানে এই বুক থেকে আজরাঈল ব্যতীত অন্য কেউ ওকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। ওর জন্য এই জায়গাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
দু’জনের মাঝখানে চুল পরিমাণ ফাঁকা নেই।
শ্রবণের শার্ট খা’ম’চে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে ওর বুকে মুখ গুঁজে।
ছেলেটা হাত গুটিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সোহার দিকে তাকিয়ে। শ্রবণ এক হাতে সোহাকে আগলে রেখে বলে,
“কী হয়েছে?”
সোহা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“ওরা মে’রে’ছে আমাকে। আমার ফোন আর ব্যাগ কেড়ে নিয়েছে।”
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা বলে,
“কার কাছে বিচার দিচ্ছিস রে? উনি নিজেই তো র্যাগিং করে। যদি এতই ভয় লাগে তাহলে আমার কাছেই আসতি, আমি আমার বুকেই তোকে আশ্রয় দিতাম।বড়ো ভাই আপনি যান এখান থেকে—”
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে সোহার দিকে আবার হাত বাড়ায় ওকে ধরার জন্য। বাকি কথা শেষ করার আগেই শ্রবণ ছেলেটার হাত খপ করে ধরে মোচড় দেয়। “আআআ” করে চিল্লিয়ে ওঠে ছেলেটা। শ্রবণ নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে একটা চড় বসায় কানশা বরাবর। ভয় পেয়ে সোহা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শ্রবণকে।
ছেলেটার হাত ছেড়ে দিয়ে আরও একটা চড় বসিয়ে দেয়। টাল সামলাতে না পেরে ধপাস করে পড়ে যায় নিচে। ছেলেটার ঠোঁটের কোণ ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে।
শ্রবণ নিজের বুক থেকে সোহার মুখ তুলে মুখের দিকে তাকায়। বাম গালটা লাল হয়ে গেছে চড় খেয়ে, চার আঙুলের ছাপ পড়ে আছে। গাল দেখে ওর মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটছে। ডান হাতে মুখ আগলে ধরে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে গালে মৃদুভাবে স্লাইড করতে করতে বলে,
“কে মে’রে’ছে তোকে?”
সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়, পুনরায় শ্রবণের বুকে মুখ লুকায়। একটা মেয়ের দিকে আঙুল তুলে বলে,
“ওই কালো প্যান্ট আর টিশার্ট পরা মেয়েটা।”
শ্রবণ মেয়েটার দিকে তাকায়। ওর তাকানো দেখেই মেয়েটা শুকনো ঢোঁক গিলে পিছিয়ে যেতে শুরু করে।
শ্রবণ সোহাকে বুক থেকে সরাতে সরাতে বলে,
“এখানে দাঁড়িয়ে থাক চুপচাপ।”
সোহা শ্রবণকে ছেড়ে দাঁড়ায়।
শ্রবণ হিংস্র বাঘের ন্যায় এগিয়ে গিয়ে থাবা বসায় মেয়েটার কানশা বরাবর।
মেয়েটা নিচে পড়েই অজ্ঞান হয়ে গেছে। এত জোরে চড় বসিয়েছে যে মেয়েটার মাথা ভো ভো করছিল। আরেকটু জোরে হলে বোধহয় কানের পর্দা ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে আসতো।
নিচে পড়ে থাকা ছেলেটা উঠে দাঁড়ায়। শ্রবণকে গালী দিয়ে বলে,
“কু/ত্তা/র বাচ্চা তোর এত জ্বলছে কেন ওর জন্য? তুই নিজে যখন র্যাগিং করিস আমরা কিছু বলতে করতে যাই? তাহলে তুই আমাদের মধ্যে নাক গলাতে এসেছিস কেন?”
শ্রবণ আগের চেয়েও বেশি রেগে তেড়ে এসে ছেলেটার গলা চেপে ধরে। হিস হিসিয়ে বলে,
“শু/য়ো/রের বাচ্চা, ও আমার ওয়াইফ। আমার ওয়াইফকে কিছু বলা আর করা তো অনেক দূরের কথা ওর দিকে চোখ তুলে তাকালেও তোর চোখ উপড়ে নেব। ওই কু/ত্তা/র বাচ্চার কত বড়ো কলিজা ও আমার ওয়াইফের গায়ে হাত তুলেছে! দ্বিতীয়বার তোদেরকে আমার ওয়াইফের আশেপাশে দেখলে খুব শীগ্রই আজরাঈলের সাক্ষাৎ পাবি।”
কথাগুলো বলেই ছেলেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দূরে। হুংকার ছেড়ে বলে,
“কোন কু/ত্তা/র বাচ্চার কাছে ফোন আর ব্যাগ দ্রুত দে।”
একটা মেয়ে ফোন আর ব্যাগ নিয়ে এসে সোহার হাতে দিয়ে দ্রুত চলে যায়।
নিচে পড়ে থাকা ছেলেটা গর্জন করে বলে,
“কু/ত্তা/র বাচ্চা তোকে দেখে নেবো আমি।”
“শু/য়ো/রের বাচ্চা আর কত দেখবি দেখে নে মন ভরে। তোর কোন কোন বাপকে দেখাতে চাস তাদেরও নিয়ে আসিস। এই দুনিয়ায় এখনও এমন কারও জন্ম হয়নি যাকে এই শ্রবণ চৌধুরী ভয় পায়।”
চলবে…………
অনেক বড়ো পর্ব দিয়েছি। কেমন হয়েছে অবশ্যই মতামত জানাবেন সবাই।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১০
-
দিশেহারা পর্ব ১৪
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ২২
-
দিশেহারা পর্ব ৭