দিশেহারা (১২)
সানা_শেখ
শ্রবণকে আবারো শামীম রেজা চৌধুরীর উপর থেকে টেনে সরিয়ে আনা হয়। শ্রবণের রাগ আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেছে। ওকে তিন জন মিলেও আটকে রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। শরীরে দানবীয় শক্তি ভর করেছে। ওর গর্জনেই যেন পুরো বাড়ি কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সোহা রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে শ্রবণের গর্জন শুনে। ড্রয়িং রুমের অবস্থা দেখে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
শ্রবণ বাবার দিকে তাকিয়ে ছোটাছুটি করতে করতে বলে,
“ছাড়ো আমাকে, আমি আজ ওকে খু’ন করে ফেলব। ও আমার আম্মুকে খু’ন করেছে, আমার বোনকে খু’ন করেছে, আমি ওকেও খু’ন করে ফেলব।”
শামীম রেজা চৌধুরী বলেন,
“আমি তোমার আম্মুকে খুন করিনি, ও স্ট্রোক করে মা’রা গেছে।”
“তুই মিথ্যে বলছিস জা’নো’য়া’র।”
“তোমার আম্মু যেদিন স্ট্রোক করে মা’রা গেছে সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম? বাড়িতে না থাকলে ওকে মা’র’লা’ম কীভাবে?”
শ্রবণ নিজেকে শান্ত করে ঘাড় কাত করে অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকায়। ওর তাকানো দেখেই অনিমা চৌধুরীর কলিজা শুকিয়ে কাঠ। শুকনো ঢোঁক গিলে সকলের দিকে নজর বুলায়।
শ্রবণ পুনরায় পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে করতে বলে,
“কু/ত্তা/র বাচ্চা তুই মে’রে’ছিস আমার আম্মুকে নিজের বোনের রাস্তা ক্লিয়ার করার জন্য। ওই দিন তুই বাড়িতেই ছিলি, আম্মুর সাথে ঝগড়াও করেছিলি। আজকে তোকে আমার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তোরা ছাড় আমাকে নয়তো তোদেরও জিন্দা দাফন করব।”
গড়গড় করে কথা গুলো বলে একটু থেমে শ্বাস টেনে নেয়। পুনরায় বলে,
“তুই আমার বোনকেও ইচ্ছে করে মে’রে’ছিস, শুধু মা’র’তে পারিসনি আমাকে।”
বাড়ির সবাই অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছে। অনিমা চৌধুরী নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বলে,
“আমি ভাবীকে খু’ন করিনি, উনি স্ট্রোক করেই মা’রা গেছেন। আমি ইচ্ছে করে তোমার বোন সাফাকে মা’রি’নি, ওটা একটা অ্যাকসিডেন্ট ছিল। ওর গলায় খাবার আটকে শ্বাস নালীতে চলে যাবে আমি বুঝতে পারিনি।”
“কু/ত্তা/র বাচ্চা কেন বুঝতে পারিসনি? দেড় মাসের একটা বাচ্চাকে তুই কী খাওয়াতে গিয়েছিলি যে গলায় আটকে শ্বাস নালীতে চলে গিয়েছিল আর মৃ’ত্যু হলো? খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলি তাইনা? আজকে তোকে বিষ খাওয়াবো আমি।”
তিন জনের কাছ থেকে ছুটে আগ্রাসী ভাবে ছুটে গিয়ে অনিমা চৌধুরীর গলা চেপে ধরে। হাতের চাপ এতই বেশি যে অনিমা চৌধুরীর চোখ দুটো সাথে সাথেই উল্টে গেছে।
বাড়ির কেউ বুঝতে পারছে না এই শ্রবণকে কীভাবে শান্ত করবে। যা শুরু করেছে সত্যি সত্যিই কাউকে না কাউকে খু’ন করেই ফেলবে।
অনিমা চৌধুরীকে শ্রবণের হাত থেকে ছাড়ানোর জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে। গলা থেকে শ্রবণের হাত ছাড়াতে সক্ষম হলেও শ্রবণ পুনরায় থাবা দিয়ে চুল ধরে। এমনভাবে টান দেয় যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে যায়।
শাহীন রেজা চৌধুরী ভয়ংকর রকমের রেগে গিয়ে বলেন,
“শ্রবণ তুমি আমার ওয়াইফের সাথে এমন করছো কেন? অভদ্রতা বন্ধ করো।”
“তুই কাকে অভদ্র বলছিস? অভদ্র তো তোরা, একেকটা নরপশু, জানোয়ার। তোর এই পেয়ারের বউ কী করেছে জানিস? তুই জ্বলজ্যান্ত অবস্থায় থাকতেই আরেক পুরুষের সাথে হোটেলে গিয়েছিল, আমার হাতে ধরা পড়ে কী কী করেছে জিজ্ঞেস কর।”
শ্রবণের কথা শুনে সবাই বিস্ফোরিত হয়ে অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকায়। সিয়ামের হাত আলগা হয়ে গেছে এমন কথা শুনে। শ্রবণকে ছেড়ে দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সকলের চাহনি দেখে অনিমা চৌধুরী বলেন,
“মিথ্যে বলছে শ্রবণ। পাগল হয়ে গেছে সেজন্য যা ইচ্ছে করছে তাই বলছে।”
শ্রবণ তেড়ে যেতে নেয় আবার। স্পর্শ জাপটে ধরে বড়ো ভাইকে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আটকে রাখার জন্য। শ্রবণ অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে হুংকার ছেড়ে বলে,
“কু/ত্তা/র বাচ্চা তোর কত বড়ো কলিজা যে তুই আমাকে পাগল বলিস? নষ্ট মহিলা একটা, হাসব্যান্ড-বাচ্চা থাকতে আরেক পুরুষের সাথে প’র’কী’য়া কন্টিনিউ রেখেছিস তুই, আমার কাছে ধরা পড়ে হাতে-পায়ে ধরে মাফ চেয়েছিলি যেন আমি কাউকে কিছু না বলি। কসম করেছিলি এমন কিছু আর কোনো দিন করবি না। তোদের নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা ছিল না তাই কোনো দিন কিছু বলিনি কাউকে, তোকেও কিছু বলিনি। আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে সোহা আর সিয়াম শাহীন রেজা চৌধুরীর সন্তান নাকী অন্য কারো। ডিএনএ টেস্ট করলে নিশ্চিত ওদের বাবা অন্য কেউ হবে। হোটেলের পুরোনো রেজিস্টার খাতা খুঁজলে এখনো তোর নাম পাওয়া যাবে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে গিয়ে খুঁজে দেখতে পারেন।”
অনিমা চৌধুরীর মুখ চুপসে যায়। বড়ো গলা করে আর কিছু বলতে পারে না। সিয়াম ঘৃণায় মায়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সোহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে আর শ্রবণের দিকে।
শাহীন রেজা চৌধুরী কিছু বলতে পারছেন না, কেন যেন শ্রবণের কথা গুলো ওনার কাছে সত্যি মনে হচ্ছে। সত্যি যদি নাই হবে তাহলে অনিমা চৌধুরী চুপসে গেলো কেন শ্রবণের কথা গুলো শুনে?
শ্রবণ তনিমা চৌধুরীর দিকে তাকায়। ওনার চোখ মুখ পুরো পরিবর্তন হয়ে গেছে।
“এই কু/ত্তা/র বাচ্চা জা’নো’য়া’র শামীম রেজা চৌধুরীর সাথে প’র’কী’য়া’য় জড়ানোর সময় জানতি না ওর বউ-বাচ্চা আছে? কথা বলছিস না কেন? বল।”
তনিমা চৌধুরী মাথা নিচু করে নেন। মায়ের অভিব্যক্তি দেখে স্পর্শ ভেতর থেকে ভেঙে গুড়িয়ে যায়। সব কিছু জানার পরেও ওর মা এমন জঘন্য নীচ কাজ করেছে বুঝতে বাকী নেই।
“তুই সব জেনেও নিজের লোভ লালসা আটকে রাখতে না পেরে আরেক জনের সংসার-স্বামী ছিনিয়ে নিয়েছিস তার কাছ থেকে। তোদের মা-ছেলের রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য তোর বোন আমার আম্মু আর বোনকে মে’রে ফেলেছে। তোরা দুই বোন ডাইনি, রা’ক্ষ’সী, ন’র’পি’চা’শ। তোরা দু’জনে আমার কাছ থেকে আমার সব কেড়ে নিয়েছিস। আমার শৈশব, কৈশোর, ভালো থাকা সব গিলে খেয়েছিস তোরা দুই বোন।”
সকলের মুখ বন্ধ, শ্রবণের কথা গুলো পুরো ড্রয়িং রুম কাঁপিয়ে তুলছে।
“তোদের দুই বোনের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র, শুধু অন্যের জামাইয়ের দিকে নজর যায়, অন্যের জামাই পছন্দ হয়। এই তোদের মারও তো দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, তোদের বাপ তো তোদের মায়ের দ্বিতীয় জামাই। তোদের মাও কী অন্যের জামাইকে বিয়ে করেছিল প’র’কী’য়া’য় জড়িয়ে? তোদেরও কী সেভাবেই জন্ম হয়েছে? একে বারে মায়ের মতোই হয়েছিস দুই বোন।”
শ্রবণের একেকটা কথায় বিস্ফোরণ ঘটছে ড্রয়িং রুমে।
শামীম রেজা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ভয়ংকর রকমের আক্রোশ নিয়ে বলে,
“তুই জানতি না, তুই ছাড়া আমার আম্মুর আর কেউ নেই? এই বাড়ি ছাড়া আমার আম্মুর যাওয়ার জায়গা নেই, জানতি না কিছু? তুই কীভাবে পারলি আমার আম্মুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? তুই কীভাবে ঠকালি আমার আম্মুকে? আমার আম্মুর রূপ সৌন্দর্য কম ছিল? আমার আম্মুর রূপের কাছে এই তনিমা তো কিছুই না, ও আমার আম্মুর নখেরও যোগ্য না। ওই দিন কার সাথে যেন ফোনে কথা বলেছিল আম্মু, তারপর তোকে অনেক বার কল করেছিল কিন্তু তুই রিসিভ করিসনি ফোন। আম্মু আমাকে আর বোনকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল, বার বার জিজ্ঞেস করার পরেও কিছু বলেনি আমাকে। বিকেলে অনিমার সাথে ঝগড়া হয় আর রাতে আমার আম্মু আমাদের দুই ভাই-বোনকে ছেড়ে চলে যায় সারা জীবনের জন্য। আম্মু কী তোর গোপন সংসারের কথা জানতে পেরে গিয়েছিল? তুই ওই রাতে স্পর্শ আর তনিমার কাছে ছিলি তাইনা?”
শামীম রেজা চৌধুরী চুপ করে থাকেন। শ্রবণের কথা গুলো শুনে তিন জন বাদে বাকী সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
বাবাকে নিরুত্তর দেখে শ্রবণের রাগ আরো বেড়ে যায়। স্পর্শের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পুনরায় আক্রমণ করে বসে।
স্পর্শ আর সিয়াম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শ্রবণকে আটকাতে যাচ্ছে না দুই ভাই। সামাদ চৌধুরী আর শাহীন রেজা চৌধুরী দ্রুত এসে শ্রবণকে আলাদা করার চেষ্টা করেন। এই ছেলে আজকে বাপকে মে’রে’ই ফেলবে। শামীম রেজা চৌধুরীর নাক-মুখ দিয়ে র’ক্ত পড়ছে এখন। মাথা ধরে একটা বাড়িও মে’রে’ছে ফ্লোরের উপর। ভয়ে তটস্থ হয়ে গেছেন তনিমা চৌধুরী। অনিমা চৌধুরী বসা থেকে উঠে গিয়ে বড়ো বোনের পাশে দাঁড়ান।
অনেক ধস্তাধস্তির পর শ্রবণকে আবারো সরিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হন দু’জন।
শ্রবণ এখন আবার নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছে। পাগলের মতো আচরণ করছে সাথে চিৎকার করে গালাগালি করছে শামীম রেজা চৌধুরীকে।
কিছুতেই মানতে পারছে না ওর আম্মু এত বাজেভাবে ঠকে গিয়ে বুক ভরা যন্ত্রণা নিয়ে দুনিয়া ছেড়েছে।
এমনিতেই এই বাড়ির মানুষ গুলোকে ছোটো বেলা থেকে সহ্য করতে পারে না, এখন এত বড়ো সত্যি জানার পর আরো পারছে না।
অশান্ত হয়ে থাকা শ্রবণ হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। ঢলে পড়ে নিচের দিকে। শক্ত করে আগলে ধরার আগেই নিচে পড়ে যায় তবে জোরে পড়েনি, ব্যথাও পায়নি।
মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেছে। শাহীন রেজা চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“সিয়াম পানির জগ নিয়ে আয় দ্রুত।”
সিয়াম পানির জগ নিয়ে আসার জন্য আগায় দ্রুত পায়ে। স্পর্শ বাবা-মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে বলে,
“তোমরা এত জঘন্য মানুষ কেন? এত জঘন্য মানুষ আমার বাবা-মা হতেই পারে না। আজকে থেকে তোমরা আমার কেউ হও না। আজকে থেকে জানবে স্পর্শ ম’রে গেছে, স্পর্শ সত্যিই ম’রে গেছে। ভাইয়ার আম্মু মানে বড়ো আম্মুকে তোমরা ঠকিয়েছো না, তোমরা এর প্রতিদান অবশ্যই পাবে, ভয়ংকরভাবে ফিরে পাবে।”
সিয়াম পানি নিয়ে এসেছে। স্পর্শ ওর হাত থেকে জগ নিয়ে শ্রবণের কাছে বসে চোখে-মুখে পানি দিতে দিতে ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাকতে শুরু করে।
অনেক ডাকাডাকির পরেও শ্রবণের জ্ঞান ফেরে না। জগের পুরো পানি ওর চোখে-মুখে আর মাথায় ঢালা হয়েছে তবুও জ্ঞান ফিরছে না।
স্পর্শ দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“দাদা ভাই এভাবে হবে না, হসপিটালে নিতে হবে। সিয়াম ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বল।”
সিয়াম দৌড়ে যায় বাইরের দিকে। শাহীন রেজা চৌধুরী বলেন,
“স্ট্রোক করেছে মনে হচ্ছে। ডক্টর আগের বার বলেছিল ওকে বেশি মানসিক স্ট্রেস না দিতে, পুনরায় এমন হলে স্ট্রোক করবে।”
সামাদ চৌধুরী বড়ো ছেলের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে বলেন,
“শ্রবণের কিছু হলে তোমাদের আমি ছাড়বো না।”
সিয়াম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছে শ্রবণকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
স্পর্শ আর শাহীন রেজা চৌধুরী শ্রবণকে কোনো রকমে উঁচু করে ধরে বাইরের দিকে আগান। যাওয়ার আগে স্ত্রীর দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন,
“তোর ব্যবস্থা ফিরে এসে করছি।”
চলবে……….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
দিশেহারা পর্ব ৩৯
-
দিশেহারা পর্ব ১৬