দিশেহারা (১১)
সানা_শেখ
হসপিটালে এসে পৌঁছায় দুই ভাই। স্পর্শের চেহারা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। একটু পর পর শুধু বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। শ্রবণকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে।
গাড়ি পার্কিং করে দু’জন ভেতরের দিকে আগায়। স্পর্শের হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে আগের তুলনায়। যত আগাচ্ছে তত অস্থিরতা বাড়ছে, ভয় করছে।
দেখতে দেখতে দুজন ডক্টরের কেবিনে প্রবেশ করে। দু’জন বসে দুই চেহারে। শ্রবণ ডক্টরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“রেজাল্ট কী ডক্টর?”
ডক্টর নিজের চশমা ঠিক করে রিপোর্ট হাতে তুলে নেন। উনি ওদের দু’জনের অপেক্ষাতেই ছিলেন এতক্ষণ।
রিপোর্টের ওপর আরো একবার নজর বুলিয়ে আবার দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“স্যাম্পল ম্যাচ করে গেছে।”
ডক্টরের কথা শুনে শ্রবণ শকড কিন্তু স্পর্শের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
শ্রবণ নিজেকে ধাতস্থ করে বলে,
“ফেক রিপোর্ট বানানোর জন্য কত টাকা খেয়েছেন?”
শ্রবণকে রেগে যেতে দেখে ডক্টর শান্ত কন্ঠে বলেন,
“মিস্টার শ্রবণ আপনি শান্ত হন আগে। এটা কোনো ফেক রিপোর্ট নয়, এটা অরজিনাল। সকালেই ল্যাব থেকে পাঠানো হয়েছে এটা। মিস্টার স্পর্শ আর মিস্টার শামীম রেজা চৌধুরীর ডিএনএ 99.99% মিলে গেছে। আপনার ডিএনএ-ও 99.99% মিলে গেছে মিস্টার শামীম রেজা চৌধুরীর সাথে।”
শ্রবণ শকড হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় তড়িৎ গতিতে। ওর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে, পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেছে। নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। নিশ্চই এই রিপোর্ট মিথ্যে। শামীম রেজা চৌধুরী টাকা খাইয়ে রিপোর্ট চেঞ্জ করিয়েছে, হ্যাঁ এটাই হয়েছে।
স্পর্শ বসা থেকে উঠে এক আকাশ সম খুশি নিয়ে বড়ো ভাইয়ের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। শ্রবণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্পর্শ খুশি মনে বলে,
“দেখলে তো তুমিই আমার ভাই। তোমার ধারণা আজ ভুল প্রমাণ হয়ে গেছে ভাইয়া।”
শ্রবণ ডক্টরের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে ডক্টরকে ভস্ম করে দেবে।
রিপোর্ট নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় ডক্টরের দিকে। ডক্টর রিপোর্ট ওর হাতে দিয়ে দেন। স্পর্শ এখনো ওকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর আনন্দ ধরছে না এখন। চিৎকার করে সারা দুনিয়াকে জানাতে ইচ্ছে করছে শ্রবণ চৌধুরী ওর বড়ো ভাই, সত্যিই ওর বড়ো ভাই।
শ্রবণ নিজেই রিপোর্টের ওপর নজর বুলায়। রেজাল্ট দেখে ওর মাথা ঘুরে যাচ্ছে। রাগে পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। মস্তিষ্কে আগুন ধরে গেছে। পুরো দুনিয়ায় আগুন ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
রোবটিক সুরে বলে,
“স্পর্শ ছাড়ো আমাকে।”
স্পর্শ এতক্ষণ ভাবনায় তলিয়ে ছিল, বড়ো ভাইয়ের কথায় ভাবনায় ছেদ পড়েছে। ছেড়ে দাঁড়াতেই শ্রবণ ওর এক হাত মুঠো করে ধরে ধুপধাপ পা ফেলে কেবিন থেকে বেরিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা শুরু করে। স্পর্শ কিছু বুঝতে না পেরে ভাইয়ের সাথে সাথে আগাচ্ছে। শ্রবণ এমন রেগে আছে কেন?
গাড়িতে উঠে ড্রাইভিং সিটে বসে শ্রবণ, পাশে উঠে বসে স্পর্শ। পার্কিং থেকে গাড়ি বের করে বাড়ির দিকে ছুটে চলে। গতি দেখে স্পর্শ ভয় পেয়ে যায়। বড়ো ভাইকে সাবধান করে বলে,
“ভাইয়া গতি কমাও অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে। ট্র্যাফিক পুলিশ ধরবে।”
শ্রবণ শোনে না কিছু। আগের চেয়ে গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। স্পর্শ ভয়ে ভয়ে বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেলে কী হবে?
অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে শ্রবণের গাড়ি। স্পর্শের মনে হচ্ছে গাড়িতে নয় বুলেট ট্রেনে চড়ে বাড়িতে আসলো। ওর বুকের ভেতর জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে।
শ্রবণ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। এক হাতে রিপোর্ট অন্য হাতে মুঠো করে ধরে স্পর্শের এক হাত। পুনরায় টেনে নিয়ে যেতে থাকে ভেতরের দিকে। ওর আচরণে বিস্ময়ে বিমূঢ় স্পর্শ। শ্রবণ এমন করছে কেন? ও যে শ্রবণের ভাই শ্রবণ কী এটা মানতে পারছে না?
ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই। দুই ভাইকে ফিরে আসতে দেখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সবাই। বড়ো ছেলের চেহারা আর অভিব্যক্তি দেখেই সব বুঝতে পেরে যান শামীম রেজা চৌধুরী, ছেলের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোঁক গিলে নেন। আজ শ্রবণ নিজে ব্লাস্ট হবে নয়তো ওনাকে করবে। তনিমা চৌধুরী আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে আছেন দুই ভাইয়ের দিকে।
শ্রবণ সোজা এসে ওর বাবার সামনে দাঁড়ায়। স্পর্শকে দাঁড় করায় বাবার পাশে। কয়েক পা পিছিয়ে দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে।
রাগে ফেটে পড়ে ভয়ংকর রকমের চিৎকার করে স্পর্শের দিকে আঙুল তুলে বলে,
“ও, জা/র/জ।”
ওর এমন কথায় বাড়ির সবাই শকড। স্পর্শ তো বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে। ওকে জা/র/জ বলছ! ও জা/র/জ?
সামাদ চৌধুরী বিস্মিত হয়ে বলেন,
“এসব তুমি কী বলছো দাদু ভাই?”
শ্রবণ দাদার দিকে তাকিয়ে আগের মতোই চিৎকার করে বলে,
“আমি ঠিকই বলছি, ও জা/র/জ সন্তান। শামীম রেজার সাথে ওর ডিএনএ ম্যাচ করে গেছে। আমার সাথেও ম্যাচ করেছে। দু’জনের মা আলাদা হলেও বাবা এক জন-ই। এই জা/নো/য়া/র আমার আম্মু বেঁচে থাকতেই ওই নষ্ট মহিলার সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়ে স্পর্শকে জন্ম দিয়েছিল। তাহলে এর মানে কী দাঁড়ায়? স্পর্শ নিশ্চই জা/র/জ।”
স্পর্শের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বিস্ফোরণ ঘটলো যেন মস্তিষ্কে। সব খুশি পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছে।
শ্রবণ বাবার দিকে তাকিয়ে আগের মতোই চিৎকার করে বলে,
“তুই নিজের জা/র/জ ছেলেকে বাড়ির সকলের সামনে সৎ ছেলে বলে পরিচয় করিয়েছিস ভেবেছিস কেউ কোনো দিন কিছুই জানতে পারবে না?”
বার বার জা/র/জ শব্দটা শুনে শামীম রেজা চৌধুরী চিৎকার করে বলেন,
“স্পর্শ জা/র/জ নয়, ও অবৈধ নয়। ও আমার ছেলে, আমার বৈধ সন্তান। ওর মাকে আমি অনেক আগেই বিয়ে করেছিলাম।”
সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই শ্রবণ হাতের রিপোর্ট ফেলে ওর বাবার গলা চেপে ধরে ভয়ংকর রকমের আক্রোশ নিয়ে। ওর হঠাৎ আগ্রাসী আক্রমণে শামীম রেজা চৌধুরী কিছুই করতে পারেন না। বাবাকে ফ্লোরে ফেলে বুকের উপর চড়ে বসে গলা চেপে ধরেছে শ্রবণ। আর কতক্ষন এভাবে থাকলে মে/রে/ই ফেলবে।
সিয়াম, স্পর্শ আর শাহীন রেজা চৌধুরী শ্রবণকে টেনে সরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। অনেক টানাটানির পর কোনো রকমে উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে।
শামীম রেজা চৌধুরী নিজের গলা চেপে ধরে খুক খুক করে কাশতে শুরু করেছেন।
শ্রবণ তিন জনের কাছ থেকে ছোটার জন্য ছটফট করছে আর হুংকার ছাড়ছে। বাবার দিকে তাকিয়ে গর্জন করে বলে,
“কু/ত্তা/র বাচ্চা তুই আমার আম্মুকে ঠকিয়েছিস, তোকে আমি খু/ন করে ফেলব। আমার আম্মু স্ট্রোক করে মা/রা যায়নি, তুই খু/ন করেছিস নিজের রাস্তা ক্লিয়ার করার জন্য।”
লাফালাফি করতে করতে তিন জনের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় শ্রবণ। আগ্রাসীভাবে ছুটে গিয়ে বাবার মুখ বরাবর ঘুষি বসিয়ে দেয়। পুনরায় গলা চেপে ধরে বলে,
“আজকে তোকে খু/ন করে আমি ফাঁসিতে ঝুলব।”
চলবে…………
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ১৯
-
দিশেহারা পর্ব ৪০
-
দিশেহারা পর্ব ২৩