তোমারসঙ্গেএক_জনম (০৩)
সানা_শেখ
জাকিরের মা নাজমা মির্জা নাক সিটকে মুখ বাঁকিয়ে এগিয়ে যান রুমের দিকে।
রূপ সৌন্দর্য থাকলেই হলো নাকি? ভাগ্যিস ওনার ছেলেটার সঙ্গে বিয়েটা হয়নি।
শিরিন সুলতানা চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে ভেতরের দিকে এগিয়ে আসছেন।
হিমেল লামহার হাত ধরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে আবার।
শিরিন সুলতানা ডাকলেও আর দাঁড়ায় না হিমেল। অশান্তি আর ভালো লাগছে না, এমনিতেই মাথায় আগুন ধরে আছে।
জাবির মির্জা স্ত্রীকে শান্ত করার জন্য বলেন,
“পাগলের মতো এভাবে চিৎকার চেঁচামেচি করছো কেন? কন্ট্রোল করো নিজেকে।”
“তুমি নিজের ছেলের এত বড়ো সর্বনাশ কীভাবে করলে?”
“কী সর্বনাশ করেছি? ছেলেকে মে’রে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছি?”
“তুমি বুঝতে পারছো না কী করেছ?”
“আমি কি করেছি সেটা খুব ভালো করেই জানি আমি। ওদের দুজনের জন্য খাবার রেডি করতে বলো।”
কথাগুলো বলে আর একমুহুর্ত দাঁড়ান না জাবির মির্জা। গটগট পায়ে হেঁটে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যান ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
শিরিন সুলতানা চেঁচামেচি করতে করতে ওনার পেছন পেছন রুমের দিকে এগিয়ে যান।
জাবির মির্জার মা জোবেদা মির্জা ছোটো নাতির দিকে তাকিয়ে বলেন,
“শিশির, নতুন বউয়ের সবকিছু ওদের রুমে দিয়ে আয়।”
শিশির মাথা নাড়িয়ে স্যুটকেস হাতে বড়ো ভাইয়ের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। কী ভাগ্য ওর ভাইয়ের! গেলো বিয়ে খেতে অথচ নিজেই বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে আসলো।
জোবেদা মির্জা বাকি সকলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“সবাই যার যার মতো গিয়ে শুয়ে পড়ো। হাজেরা, হিমেল আর বউয়ের জন্য খাবার রেডি কর।”
হাজেরা খাতুন মির্জা বাড়ির কাজের মেয়ে। জোবেদা মির্জার হুকুম পেতেই রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
অনেকেই রুমের দিকে এগিয়ে গেলেও অনেকেই আবার এটা ওটা বলছে বিয়েটা নিয়ে।
জোবেদা মির্জা গলার স্বর চড়াও করে বলেন,
“কী বলেছি শুনতে পাওনি তোমরা? যাও, ঘুমাও।”
সবাই চলে যায় শোয়ার জন্য। জোবেদা মির্জা সোফায় বসেন।
লামহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রুমের মাঝখানে। হিমেল রাগে ফোস ফোস করছে আর পায়চারি করছে। দরজা নক হওয়ায় দুজনেই দরজার দিকে তাকায়। শিশির দরজার পেছন থেকে বলে,
“ভাইয়া, আমি। ভাবীর স্যুটকেস দিতে এসেছি।”
“দরজা খোলা আছে।”
শিশির দরজার ঠেলে স্যুটকেসটা ভেতরে দিয়ে পুনরায় দরজা ভিজিয়ে দিতে দিতে বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে,
“ভাইয়া, অল দ্যা বেস্ট।”
হিমেল জ্বলন্ত চাহনি নিক্ষেপ করতেই শিশির দরজা ভিজিয়ে চলে যায়।
হিমেল লামহার দিকে তাকায়। রুক্ষ স্বরে বলে,
“এই, মেয়ে।”
লামহা মুখ তুলে হিমেলের মুখের দিকে তাকায়। হিমেল আগের ভাব বজায় রেখে বলে,
“আমার কাছ থেকে দূরে থাকবে সবসময়, ভুলেও আমার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করবে না। আমার পারমিশন ছাড়া আমার কোনোকিছু ধরবে না, ছুঁবেও না। আমার কোনো বিষয়ে নাক গলাতে আসবে না। আমার সবকিছু থেকে সবসময় দূরত্ব বজায় রেখে চলবে।”
লামহা চুপ করে থাকে।
হিমেল আবার কিছু বলবে এমন সময় দরজায় নক হয়। দরজার ওপাশ থেকে জোবেদা মির্জার গলার স্বর ভেসে আসে। হিমেল ভেতরে আসতে বলতেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন জোবেদা মির্জা। ওনার পেছন পেছন প্রবেশ করে হাজেরা।
খাবারের ট্রে সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে হাজেরা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। জোবেদা মির্জা পানির জগটা রেখে হিমেলের সামনে এসে দাঁড়ান। রাগে লাল হয়ে থাকা নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“শোন, হিমেল, মেয়েটা তোর হাত ধরে এই বাড়িতে এসেছে তাই ওকে আগলে রাখার দায়িত্ব তোর। তোর আব্বু যা করেছে নিশ্চই ভেবে চিন্তেই করেছে।
অনেক রাত হয়ে গেছে, ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিস দুজন। শুভ রাত্রি।”
বেশিকিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যান জোবেদা মির্জা। হিমেল দরজা লাগিয়ে দেয় ভেতর থেকে। আলমারি থেকে প্যান্ট শার্ট বের করে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। আগলে রাখা তো দূর এই মেয়েকে ছোঁবেও না আর।
লামহা এখনো আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে এই বাড়িতে মোটেও ভালো থাকতে পারবে না ও। এই বিয়েতে কোনো মত ছিল না ওর, শুধুমাত্র বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়েছে। এই বাড়িতে কীভাবে টিকে থাকবে এটাই ভাবছে। ও চাইলেও বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারবে না, থাকতে পারলে তো এখন বিয়েই দিতো না।
বাবা-মা আর পরিবার ছেড়ে এসে এমনিতেই কষ্টে বারবার কান্না আসছে, এখন এদের মা-ছেলের আচরণে ওর ম’রে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন একটা জীবন কেন হলো ওর? সাধারণ ঘরের মেয়ে, সাধারণ একটা জীবন কেন হলো না?
ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে হিমেল। হাতের ড্রেস সোফার উপর ছুঁড়ে দিয়ে ফ্যান অন করে। এগিয়ে এসে দাঁড়ায় আলমারির সামনে। ভেতর থেকে ব্যাগ বের করে নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নেয় ব্যাগে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো আঁচড়ে নেয়। ফজরের সময় হয়ে এসেছে। দূরের দুই একটা মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নববধূর দিকে তাকায় একবার। এই মেয়েকে বউ হিসেবে মানে না হিমেল, কোনোদিন মানবেও না।
দরজা খুলে রুম থেকে বের হয়, দরজা ভিজিয়ে দিয়ে সিঁড়ির দিকে আগায়।
লামহা দরজার দিকে একবার তাকিয়ে ফ্লোরের দিকে দৃষ্টি স্থির করে আবার। ওর বাবা-মা ওকে ছাড়া কেমন করছে? তাঁরা কী ঘুমিয়ে পড়েছে?
হেঁটে এসে সোফায় বসে। মায়াবী আঁখিপল্লব থেকে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে পানি। পা-জোড়া উপরে তুলে গুটিয়ে নেয়, হেলান দিয়ে কাত হয়ে বসে।
নিজেকে শান্ত রাখতে চেয়েও পারে না, অনুভূতির কাছে হার মেনে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
সকাল ছয়টা নাগাদ হিমেলের রুমের দরজায় কড়া নাড়ে হিমেলের ফুপাতো বোন কনা।
গলা উঁচিয়ে ভাবী ভাবী বলে ডাকে বার কয়েক।
লামহা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিল প্রায়।
দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কে? ভেতরে আসুন।”
কনা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। লামহাকে এখনো শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে বলে,
“ভাবী, চেঞ্জ করেননি এখনো?”
লামহা চুপ করে থাকে। কনা বিছানার দিকে তাকিয়ে বিছানা পরিপাটি আর ভাইকে না দেখে বলে,
“ভাইয়া, কোথায়?”
“বেরিয়ে গেছে।”
“কখন?”
“ফজরের দিকে।”
“কোথায় গেছে?”
“জানিনা।”
“বলে যায়নি?”
“না।”
“আচ্ছা, আপনি চেঞ্জ করে ফ্রেশ হতে থাকুন আমি একটু আসছি।”
লামহা মাথা নাড়ে, কনা বেরিয়ে আসে রুম থেকে। নিচে ড্রয়িং রুমে এসে ছোটো মামার দিকে তাকিয়ে বলে,
“মামা, ভাইয়া তো রুমে নেই, ফজরের সময় নাকি বেরিয়ে গেছে। কোথায় গেছে ভাবী জানে না।”
কনার কথা শুনে আশেপাশের সবাই ওর দিকে তাকায়। সবাইকে এভাবে তাকাতে দেখে অষ্টাদশী রমণী অস্বস্তিতে পড়ে। মামার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি গেলাম ভাবীকে তৈরি হতে সহয্য করতে।”
শিরিন সুলতানা কনার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“ওই মেয়েকে রেডি করিয়ে নিচে নিয়ে আসবি।”
“আচ্ছা, মামি।”
কনা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। জাবির মির্জা ছোটো ছেলেকে ডেকে বলেন হিমেলের ফোনে কল করার জন্য, ওনার ফোনটা রুমেই রেখে এসেছেন।
শিশির বড়ো ভাইয়ের ফোনে কল করে দেখে ফোন বন্ধ। কয়েকবার চেষ্টা করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আব্বু, ভাইয়ার ফোন তো বন্ধ বলছে।”
“ফোন বন্ধ?”
“হ্যাঁ।”
জাবির মির্জার কপালে কয়েক ভাঁজ পড়ে। ফোন বন্ধ রেখে এই ছেলে কোথায় গেছে নতুন বউকে রুমে একা ফেলে?
হাজেরা চা কফি বানিয়ে নিয়ে আসে। সবাই চা কফির মগ হাতে তুলে নেয়। ওনারা দশ বারোজন বাদে বাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
জাবির মির্জা টানা দুই ঘণ্টা বউকে হাজার কথা বলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করেছেন একটু।
বাবার পাশে বসে থাকা শিশির বাবার কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“আব্বু, ভাইয়া পালায়নি তো?”
“পালাবে কেন?”
“আমার মনে হচ্ছে পালিয়ে গেছে। বিয়েটা তো করতে চায়নি, জোর করে করিয়েছো এই জন্য বোধহয় পালিয়ে গেছে।”
“উল্টাপাল্টা কথা না বলে চুপ করে থাক।”
“উল্টাপাল্টা না, সঠিক কথাই বলেছি তুমি মিলিয়ে নিও।”
জাবির মির্জা কিছু না বলে ভাবনায় মগ্ন হন।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর লামহাকে নিয়ে কয়েকজন মেয়ে নিচে নেমে আসে।
হলুদ রঙের শাড়ি পরনে, লম্বা ঘোমটা টানা। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে মেয়েদের সঙ্গে।
জাবির মির্জা সোফা ছেড়ে উঠে লামহার কাছে এগিয়ে আসেন। উনি এতক্ষণ লামহার অপেক্ষায় বসে ছিলেন।
“লামহা মা।”
লামহা মুখ তুলে শ্বশুরের মুখের দিকে তাকায় ঘোমটার ভেতর থেকে। মৃদু স্বরে বলে,
“জি, আব্বু।”
“আমার সঙ্গে একটু আসো।”
লামহা শ্বশুরের পেছন পেছন তার রুমের দিকে আগায়। দুজনের পেছন পেছন শিরিন সুলতানা-ও আগান রুমের দিকে।
রুমে এসে জাবির মির্জা লামহার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“হিমেল বের হওয়ার সময় সঙ্গে কিছু নিয়েছে?”
“হ্যাঁ, ব্যাগ নিয়ে গেছে।”
জাবির মির্জা কিছু বলার আগেই পেছন থেকে শিশির বলে,
“বলেছিলাম না ভাইয়া পালিয়েছে? দেখলে তো আমার কথাই সত্যি হলো।”
“তুই চুপ থাক, হতচ্ছাড়া।”
“উচিত কথা সরি সত্যি কথা বললেই দোষ।”
“কোথাও পালায়নি, নিশ্চই হলে ফিরে গেছে।”
“না বলে চুপিচুপি গেছে মানে পালিয়েই গেছে, এটাকে পালিয়ে যাওয়াই বলে। মানুষ চু’রি করে পালায় আর তোমার বড়ো ছেলে বিয়ে করে পালিয়েছে। পালিয়েছে ভালো কথা বউটাকে সঙ্গে নিয়ে পালাবে না? অন্যরা বিয়ে করার জন্য অন্যের মেয়ে নিয়ে পালায় আর ভাইয়া বিয়ে করে বউ রেখে পালিয়েছে। বাহ্, কি সুন্দর ঘটনা। সাব্বাস, ভাইয়া, জিন্দাবাদ, জিও।”
জাবির মির্জা শিশিরের দিকে তাকিয়ে চাপা রাগী স্বরে বলেন,
“চুপ করবি নাকি? পাগলের মতো কিসব কথা বলছিস? যা এখান থেকে।”
শিশির রুম থেকে বের হতে হতে বলে,
“উচিত কথা… বললেই দোষ।”
শিরিন সুলতানা স্বামীর দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলেন,
“তোমার জন্য আমার ছেলেটা রেগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, এত দয়ালু হতে বলেছে কে? নিজের ছেলের ক্ষতি করে অন্যের মেয়ের ভালো করার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমার ছেলে যদি বাড়িতে না ফেরে তবে এই মেয়েও এই বাড়িতে থাকবে না।”
জাবির মির্জা রেগে স্ত্রীর দিকে তাকান। লামহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে।
চলবে………….
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৩৯
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৯
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৮
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
দিশেহারা পর্ব ৩১