তোমারসঙ্গেএক_জনম (০২)
সানা_শেখ
শেষ পর্যন্ত লামহার বিয়ে জাবির মির্জার বড়ো ছেলে হিমেল মির্জার সঙ্গেই হয়েছে। বাবার জেদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি হিমেল।
লাবিব ইসলাম আর রোমান ইসলাম সহ লামহার বাড়ির অনেকেই রাজি হচ্ছিল না এই বিয়েতে। যেখানে লামহার মির্জা বাড়ির বড়ো ছেলের বউ হওয়ার কথা ছিল সেখানে এখন মেজ ছেলের বউ হোক, এটা কেউ চাইছিল না। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই রাজি হতে হয়েছে সকলের। এখন এই বিয়েটা না হলে লামহার জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
রাত অনেক হয়ে গেছে। জাকারিয়া মির্জার সঙ্গেই বরপক্ষের অর্ধেকের বেশি মানুষ বেরিয়ে গেছে। যারা এখনো আছে তারা হতভম্ভ হয়ে গেছে জাবির মির্জার কাজে। আত্মীয়দের মধ্যে থেকে অনেকেই নিষেধ করেছিলেন এই বিয়েটা না দেওয়ার জন্য কিন্তু জাবির মির্জা কারো সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা করেননি। নিজে যা ভালো বুঝেছেন তাই করেছেন। পুরো বিয়ে বাড়ি এখন থমথমে।
এখন বিদায়ের পালা। বর বউকে স্টেজ থেকে নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। দুই পরিবারের সবাই জড়ো হয়েছে এক জায়গায়।
হিমেলের চেহারা থমথমে গম্ভীর হয়ে আছে। ওর ভেতরে কি হচ্ছে সেটা একমাত্র ও নিজেই জানে।
লাবিব ইসলাম হিমেলের ডান হাত ধরে ওর হাতের উপর মেয়ের হাত রাখেন। দু’জনের হাত দুই হাতে ধরে রেখে হিমেলের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় থেমে থেমে বলেন,
“লামহা আমার একমাত্র সন্তান, ওকে আমি অনেক আদর যত্নে বড়ো করেছি। কোনোদিন ওকে কাছ ছাড়া করিনি, ওর গায়ে ফুলের টোকা লাগতে দেইনি, সবসময় ওকে আগলে রেখেছি নিজের সর্বস্ব দিয়ে। আজকে আমি আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিলাম, বাবা। আমি আশা রাখছি তুমি ওকে আগলে রাখবে, আদর যত্নে রাখবে। আমার মেয়েটা বড্ড সহজ সরল আর বোকা। বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে ওর ধারণা অনেক কম। আমি ওকে এত দ্রুত আর দূরে কখনোই বিয়ে দিতে চাইনি তবে পরিস্থিতির চাপে পড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। আমার মেয়েটাকে কোনোদিন কষ্ট দিও না, বাবা।”
শ্বশুরের সব কথা শুনলেও একদম চুপ থাকে হিমেল। জাবির মির্জা বলেন,
“কোনো টেনশন করবেন না, বেয়াই। আপনার মেয়ে আমাদের কাছে আদর যত্নেই থাকবে। আপনি একদম চিন্তামুক্ত থাকুন।”
লাবিব ইসলাম মেয়ের মুখের দিকে তাকান। লামহা নিচের দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে হেঁচকি তুলে কাঁদছে।
লাবিব ইসলাম মেয়ের মাথায় হাত রাখেন। লামহা মুখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকায়। কান্নার বেগ বাড়ে। হিমেলের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আব্বু, আমি যাবো না তোমাদের ছেড়ে। আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না।”
লাবিব ইসলাম চোখের পানি মুছে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“সব মেয়েদের বাবার বাড়ি ছাড়তে হয়, মা। বাবারা চাইলেও মেয়েদেরকে সারাজীবন নিজের কাছে রাখতে পারে না, এটাই যে নিয়ম। তুমি ভালো থাকবে ওই বাড়িতে। আমাদের দোয়া আর ভালোবাসা সবসময় তোমার সঙ্গে আছে।”
তানহা বেগম স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ান। লামহা বাবাকে ছেড়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে।
জাবির মির্জা বলেন,
“বেয়াই, রাত বেড়ে যাচ্ছে, এখন বিদায় দিন আমাদের।”
তানহা বেগম মেয়েকে আদর দিয়ে ছেড়ে দেন। লাবিব ইসলাম মেয়ের হাত হিমেলের হাতে তুলে দেন আবার। হিমেলের মনে হচ্ছে ওর হাতে কোনো মেয়ের হাত নয় এক মুঠো শিমুল তুলা গুঁজে দেওয়া হয়েছে। কোনো মেয়ের হাত এত নরম হয়? পুরো তুলোর মতো নরম।
সবাই গাড়ির দিকে আগায়। হিমেল লামহার হাত ধরে ধীর পায়ে হাঁটছে। লামহা কাঁদতে কাঁদতে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে বাবার বাড়ি ছেড়ে।
গাড়ির কাছাকাছি এসে আরও বেশি কান্নায় ভেঙে পড়ে লামহা। রওশন বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“কাঁদিস না, আগামীকালই তো আবার দেখা হবে আমাদের।”
“ভাইয়া।”
“কাঁদিস না, এত কাঁদলে অসুস্থ হয়ে পড়বি।”
জাবির মির্জা বলেন,
“হিমেল, লামহাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বোস।”
হিমেল আগে উঠে বসে তারপর বসে লামহা। হিমেলের ডান পাশে বসে হিমেলের ছোটো ভাই শিশির মির্জা। হিমেল লামহার হাত ছেড়ে দিয়ে ওর কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করে বসে আছে।
জাবির মির্জা লামহার বাবা কাকার সঙ্গে কথা বলে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসেন। লামহা পরিবারের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
ওর কান্নায় গাড়ির ভেতরটা ভারি হয়ে ওঠে। হিমেল সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রয়েছে। বিরক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাগে মাথার ভেতর দপদপ করছে।
শিশির সামনের দিকে ঝুঁকে লামহার দিকে তাকিয়ে আছে। একদম পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটাকে। আহারে কীভাবে কাঁদছে মেয়েটা।
বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়। বউয়ের কান্না শুনেও পাষাণের মতো কীভাবে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ রয়েছে বজ্জাত ছেলেটা! পুতুলের মতো বউ, এই বউয়ের কান্না শুনে একটুও কী মায়া লাগছে না?
জাবির মির্জা সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে ড্রাইভিং করতে করতে লামহাকে উদ্দেশ করে বলেন,
“লামহা, আর কান্না কোরো না। আগামীকালই তো আবার আসবে।”
লামহা গাড়ির জানালার সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে গুমরে গুমরে কেঁদে যায়। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। আজ পর্যন্ত একদিনও বাবা মাকে ছেড়ে দূরে থাকেনি। আজ কত দূরে চলে যাচ্ছে বাবা, মা, নিজের পরিবার আর জন্মস্থান ছেড়ে।
জাবির মির্জা বড়ো ছেলেকে উদ্দেশ করে বলেন,
“হিমেল, চুপচাপ বসে না থেকে মেয়েটাকে সামলা।”
হিমেল চোখ মেলে তাকায়। কটমট করে বলে,
“পারবো না।”
“হিমেল।”
“কী হয়েছে? বেশি দরদ উথলে পড়লে তুমি এখানে এসে ওকে সামলাও আমি ড্রাইভিং করছি।”
“বেশি বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু।”
“একটুও না, বাড়াবাড়ি তো তুমি করেছো আমার সঙ্গে।”
“লামহা আছে এখানে।”
“আই ডোন্ট কেয়ার।”
মির্জা বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে গাড়ি।
বাড়ির উঠোনেই বাড়ির অর্ধেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে।
শিশির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতেই হিমেল-ও নেমে দাঁড়ায়। সবাই এসে ঘেরাও করে দাঁড়িয়েছে গাড়ির চারপাশে। হিমেল ভিড় ঠেলে বেরিয়ে যেতে চাইলে জাবির মির্জা আদেশের সুরে বলেন,
“হিমেল, লামহাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ওর হাত ধরে ভেতরে যা, বেশি কথা বলতে পারবো না তোর সঙ্গে।”
হিমেল দাঁড়িয়ে যায়। কিছু বলবে তার আগেই হিমেলের মা মিসেস শিরিন সুলতানা রাগে ফেটে পড়ে বলেন,
“এই মেয়ে আমার বাড়ির ভেতর প্রবেশ করবে না, ওকে আমি আমার ছেলের বউ হিসেবে মানি না। ওকে যেখান থেকে নিয়ে এসেছো সেখানে ফিরিয়ে দিয়ে আসো। ওর পা-ও যেন এই বাড়ির জমির ওপর না পড়ে।”
গাড়ির ভেতরে বধূ বেশে বসে থাকা লামহা ফ্যালফ্যাল করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওনার কথা শুনেই বুঝতে পেরেছে ইনিই হিমেলের মা।
কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ আগেই ডেকে তুলেছে শিশির।
জাবির মির্জা বড়ো ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“লামহাকে নামা গাড়ি থেকে।”
শিরিন সুলতানা বলেন,
“এই মেয়ে নামবে না গাড়ি থেকে। ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আসো। ওকে আমি জীবনেও আমার ছেলের বউ হিসেবে মানবো না। ও এই বাড়িতে প্রবেশ করবে না।”
“কী সমস্যা ওকে ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে?”
“একটা ধ—
“চুপ করো, শিরিন। আর কত মিথ্যে অপবাদ দেবে মেয়েটাকে? সত্যতা যাচাই করেছ? তুমি সত্যিটা জানো? বাইরের মানুষের কথা শুনে এত নাচানাচি করার কি হয়েছে?”
“তুমি এই মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে কি-না?”
“না।”
“হয় ও এই বাড়িতে থাকবে নয়তো আমি থাকব। কোনটা চাও তুমি?”
“পাগলের মতো কথা কেন বলছ? লামহাকে তুমিই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছিলে অথচ এখন একটা কথা শুনে এমন আচরণ করছ?”
“আমি অতকিছু বলতে বা শুনতে চাই না, এই মেয়ে এই বাড়িতে ঢুকবে না এটাই আমার শেষ কথা।”
“লামহা এই বাড়িতেই থাকবে এটা আমার শেষ কথা। নিজের এই আচরণের জন্য একদিন নিজেই আফসোস করবে, মিলিয়ে নিও আমার এই কথা। হিমেল, লামহাকে ভেতরে নিয়ে চল।”
“হিমেল, এই মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়ে আয়।”
হিমেলের মাথা এমনিতেই গরম হয়ে আছে, এখন বাবা মায়ের এই তর্কাতর্কি মাথায় আরও আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
গাড়ির দরজা খুলে লামহার হাত ধরে টেনে বের করে ভেতর থেকে। সামনের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলে,
“পথ ছাড়ুন সবাই।”
সবাই পথ ছেড়ে সরে যায়। হিমেল লামহার হাত ধরে এক প্রকার টেনে নিয়ে আগায় ভেতরের দিকে। ওর সঙ্গে হেঁটে কুলিয়ে উঠছে না লামহা। পায়ের সঙ্গে শাড়ি বেধে যাচ্ছে বারবার। বাম হাত দিয়ে কোনো মতে শাড়ি ধরে উচুঁ করে।
পেছন থেকে সবাই তাকিয়ে আছে দু’জনের যাওয়ার পথে।
ড্রয়িং রুমে আসতেই জাকারিয়া মির্জা আর জাকির মির্জার সঙ্গে দেখা হয় দু’জনের। লামহা এক নজর তাকিয়েই দৃষ্টি নামিয়ে নেয়।
জাকারিয়া মির্জা ঘৃণায় নাক সিটকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“জাকির, গিয়ে শুয়ে পড়।”
কথাগুলো বলেই জাকারিয়া মির্জা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যান। জাকির দু’জনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় ধীর পায়ে। লামহাকে ওর ভীষণ পছন্দ হয়েছিল প্রথম দেখেই। কথা ছিল লামহা ওর বউ হবে কিন্তু হয়ে গেলো ওর ছোটো ভাইয়ের বউ আর ও হয়ে গেলো ভাসুর।
চলবে………….
ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক কমেন্ট করবেন। পরবর্তী পার্ট আগে আগে পড়তে সানা শেখ পেজটি ফলো দিয়ে রাখবেন সবাই, ধন্যবাদ।
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
দিশেহারা পর্ব ৭
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
দিশেহারা পর্ব ১৪
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১