ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৪৫
অবন্তিকা_তৃপ্তি
দুপুর ১: ৩০, সিদ্দিক মহল, কাব্যদের ফ্ল্যাট।
আজ সিদ্দিক মহলে সম্ভবত বিশাল এক ঝড় বয়ে গেছে একটু আগে— কাব্য সেটা দরজা পেরিয়েই বুঝে গেছে ইতিমধ্যে। কাব্যদের ফ্ল্যাটের ভেতরে চারপাশ আজ ভীষণ নিস্তব্ধ, এমনকি একটা মাছি উড়লেও শোনা যাচ্ছে তীব্র শব্দ। ঘরের কর্তী শামিমা, বিচারকের আসনের মতো করে সোফার উপর মাথাটা নিচু করে চুপটি করে বসে আছেন; পাশেই স্নিগ্ধ শামিমার আঁচল ধরে বসে আছে।
স্নিগ্ধের চোখ-মুখ সে কি করুন অবস্থা; বারবার শামিমাকে মানিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছিল— আর বারবারই শামিমা ওর হাত ছুড়ে ফেলছেন নিজের গায়ের ওপর থেকে।
স্নিগ্ধও নাছোড়বান্দার ন্যায় তবুও শামিমাকে জড়িয়ে ধরেই যাচ্ছে বারবার। ওদের ঠিক সামনে অপরাধীর ন্যায় কায়া বসে আছে, মাথাটা নিচু করে। হাত কোলের ওপর এনে বারবার মুচড়ে যাচ্ছে, শরীর ঘাম ছেড়ে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। বেচারি কান্না আটকে ফুপাচ্ছে সম্ভবত, শরীর কাপছে একটু পর পর।
কাব্য-কুহু দরজা পেরিয়ে ঢুকতেই কাজের মহিলা শামিমার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলে উঠল———‘খালা, বড়ভাইয়া ভাবী নিয়ে আইসা গেসেন।’
শামিমা নাটের গুরু কাব্য এসেছে শুনেই মাথাটা তুলে তাকালেন। ভীষণ তীক্ষ্ণ নজরে দরজার দিকে তাকাতেই কাব্য একটা শুকনো ঢোক গিললো। কি হয়েছে: কেসটা কি?শামিমার নজর তো কড়া, খুন করে ফেলবে ধরনের। ও যা ভাবছে তাই কি?
সাথেসাথে কাব্য সন্দেহের চোখে স্নিগ্ধকে দেখলো সবার প্রথমে। স্নিগ্ধ এবার কাব্যকে দেখে রীতিমত লাফিয়ে দৌড়ে-দৌড়ে এলো। কাব্য লাগেজটা কাজের লোকের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল——‘কেইসটা কি? কায়া এ ফ্ল্যাটে কেন? কি ব্লান্ডার করেছিস তুই?’
স্নিগ্ধও উত্তরে অত্যন্ত করুন চোখে তাকালো কাব্যের মুখের দিকে। কাব্য ওর চোখের এই করুন দৃষ্টি দেখলো ভালো করে। স্নিগ্ধ ফিসফিস করে কাব্যকে এবার জানিয়ে দিল———‘আম্মু জেনে গেছে সব।’
কাব্য হতবম্ব, সাথে সাথেই স্নিগ্ধের দিকে ফিরলো———‘কি? কিভাবে? কী করেছিলি তুই?’
স্নিগ্ধের এই উত্তর শোনামাত্রই কুহু বড়বড় চোখে তাকিয়েছে স্নিগ্ধের দিকে। পরপর দৌড়ে গিয়ে বসেছে কায়ার পাশে। দুহাতে আগলে নিয়েছে ততক্ষণে নিজের বন্ধুর মতো পাশে থাকা মামাতো বোনকে। কায়া কুহুকে পেয়ে ওর গায়ের ওপরই ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঢলে ফুপিয়ে উঠলো, ঠিক এতক্ষণে বোধহয় নিজের কাউকে পেল কায়া।
কাব্য কুহু-কায়াকে দেখলো। তারপর স্নিগ্ধের দিকে তাকালো———‘আম্মু কিভাবে জানলো? কি ঘটনা ঘইয়েছিস, ছাগল?’
কাব্য রেগে যাচ্ছে ক্রমশ। স্নিগ্ধ কাব্যের দিকে চেয়ে ভীষণ কাচুমাচু করে জবাব দিল———‘কায়া… ও গতকাল আমার রুমে ঘু. . ঘুমিয়েছে। অ্যান্ড আম্মু দেখে ফেলেছে আমাদের।’
কাব্য উত্তরটা শুনে চোখ বড়-বড় করে তাকাল স্নিগ্ধের দিকে। বেচারা বড় ভাই হয়ে এসব শুনে তাজ্জব; অপ্রস্তুতও হয়েছে। এসবও শুনতে হিচ্ছে এখন— কি দিন আসলো। কাব্যের ওই তাকানো দেখে স্নিগ্ধ ভীষণ লজ্জা পেয়ে সাথেসাথেই বলল———‘ঘুমিয়েছে, শুধু ঘুমিয়েছেই। কিন্তু আম্মু অন্য কিছু ভাবছে। বিয়ের ব্যাপারটা আমি তাই ডিসক্লোজ করে দিয়েছি। এখন রিঅ্যাক্ট করে যাচ্ছে।’
কাব্য সব শুনে স্নিগ্ধের মাথাতে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত দাঁত পিষে বলল———‘এত কিসের…!’
পরপর থেমে গেল। ছোট ভাই-ভাইয়ের স্ত্রী নিয়ে তো আর রাজের মাথায় এসব বলা যায় না— আর কাব্য ভদ্রলোক।
কাব্য নিজের রাগ সামলে, ফিসফিস করে দাঁত পিসে বললো————‘এক রুমে থাকবি যখন; সাবধানে থাকলি না কেন? এখন এই ধামাল কে সামলাবে? বলেছিলাম দু বছর লুকিয়ে রাখ বিয়েটা: তারপর কাহিনি করে স্যাটেল করা যাবে কোনভাবে। এখন তো আম্মুর চেহারা দেখেই তো আমার ভয় লাগছে। ডাফার একটা তুই। তোকে কায়ার বিয়েই করা উচিত হয়নি।’
কাব্য রেগে স্নিগ্ধকে সমানে বকে যাচ্ছে। স্নিগ্ধ পাশে মাথাটা নামিয়ে বকাগুলি গিলে গেল একবাক্যে।
কাব্য শুকনো মুখে শামিমাকে একবার দেখে নিল; শামিমা তখন কাব্যের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবার মাথাটা নিচু করে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছেন: আর সমানে এক পা নাড়িয়ে যাচ্ছেন— ভীষণ ভয়ংকর দেখাচ্ছে তাকে এইমুহূর্তে। যেন এই বুঝি দুই ভাইকেই বউসহই ত্যাজ্য করে দেবেন।
স্নিগ্ধ শামিমার এই নীরব রাগকে দেখে, শুকনো ঢোক গিলে বলল———‘কিছু তো করো ভাইয়া। মারা পড়বো না হলে, তুমি আমি দুজনেই।’
কাব্য সাথেসাথেই ভ্রু কুচকে বলল———‘আমি কেন মারা পড়ব? বিয়ে তো তুই লুকিয়ে করলি।’
স্নিগ্ধ বাকা হাসলো; কাব্যের ভ্রু সাথেসাথেই কুচকে এলো ওই হাসি দেখে। ও সন্দিহান চোখে বললো——-‘বলে দিয়েছিস, না?’
স্নিগ্ধ হাসার চেষ্টা করে বলল———‘আমি বলে দিয়েছি— বিয়ের সাক্ষী তুমি আর ভাবী ছিলে।’
‘কি?’ — কাব্যের মনে হলো স্নিগ্ধের মাথায় লাঠি ভাঙতে:
এতটা ছাগল, গাধা, হাদারাম কে হয়? কেউ না হলেও: কাব্যার ভাই হয়, স্নিগ্ধ অবশ্যই হয় — গাধা, হাদারাম: ছাগল, ডাফার!
কাব্য দাতে দাঁত পিষে বললো——‘কেন বললি?’
স্নিগ্ধ সাফাই গাওয়ার উদ্দেশ্যে বলল———‘আরে… আম্মু বারবার বলছিল বিয়েটা অবৈধ; অভিভাবক ছাড়া বিয়ে ভ্যালিড না। তাই বলা লেগেছে। সরি!’
স্নিগ্ধ মিনমিন গলায় ‘সরি’ বলল। কাব্য এবার জোর করে নিজেকে সামলে স্নিগ্ধের দিকে রাগী চাউনি নিক্ষেপ করে ওকে ঠেলে এগিয়ে গেল নিজের মায়ের দিকে।
ওদিকে শামিমার রাগ দেখে ঘেমে গেছে ও নিজেও; আলগোছে সোফায় বসতে বসতে জ্যাকেটটা খুলে রাখল আরেক সোফার ওপর।
কায়াকে ইশারায় সোফায় বসে বলল———‘কায়া, আমাদের রুমে যাও। আমি কথা বলছি আম্মুর সাথে।’
কুহু তাকিয়ে রইল কাব্যের দিকে। কাব্য ওকে এভাবে তাকাতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল———‘ভেতরে নিয়ে যা ওকে, আমার রুমে।’
কুহু কাব্যের গম্ভীর মুখের দিকে একপল তাকিয়ে চুপচাপ কায়াকে নিয়ে নিজেদের রুমে চলে গেল। এইবার স্নিগ্ধ এসে বসল শামিমার ঠিক মুখোমুখি সোফাটায়!
কাব্যও এইবার ভয় পাচ্ছে ভীষণ। শামিমার সবচেয়ে ভদ্র ছেলে: যাকে শামিমা চোখ বন্ধ করে ভরসা করেন সবসময়— সে কিনা এমন একটা অন্যায় কাজে ছোট ভাইকে লাই দিয়েছে; প্রশ্রয় দিয়েছে। পুরো ব্যাপারটায় উনার স্নিগ্ধের থেকে কাব্যের উপর রাগ হচ্ছে বেশি।
আর কাব্য নিজেও সেটা বুঝে। তাই সম্ভবয় ও শামিমাকে ফেইস করতে ভয় পাচ্ছে ভীষণ। কাব্য এবার শুকনো কন্ঠে, আস্তে করে ডাকলো মধু লাগানো স্বরে—‘আম্মু… ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো… রাগ করে এখন কী লাভ। বিয়েটা তো হয়েই গেছে অলরেডি।’
শামিমা শুনেই তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, খ্যাকিয়ে উঠে বললেন ——‘চুপ থাক তুই। ছোট ভাইকে ভালো পথ দেখানোর বদলে এসব শেখাচ্ছিলি? আমাকে বললে আমি দিতাম না বিয়ে এই কুলাঙ্গারকে? তোকে দেইনি কুহুর সাথে বিয়ে, বল? লুকিয়ে করবে কেন? আমি কবে তোদের কোন কাজে বাধা দিয়েছি? তারপরেও লুকিয়ে করতে হবে কেন বিয়ে? আমার এই কুলাঙ্গার ছেলের দরকার নেই আমার, তোকেও দরকার নেই।’
বলে শামিমা রাগে মুখ ফিরিয়ে নিলেন দুই-ভাই থেকেই। কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ওদিকে বেচারা স্নিগ্ধ মা-কে পটানোর জন্যে শামিমার হাত ধরতে চাইলেই উনি সাথেসাথেই ছাড়িয়ে দিয়ে নিলেন———‘ছুঁবি না আমাকে: নষ্ট ছেলে।’
স্নিগ্ধ হাত সরিয়ে এবার বড্ড বেচারার ন্যায় তাকিয়ে রইল কাব্যের দিকে। এই তামাম দুনিয়ার যতপ্রকারের গা-লি আছে; আজ সাহবীর সিদ্দিক স্নিগ্ধের সবটুকু গা-লিই খাওয়া শেষ। পেটে আজ নির্ঘাত বদহজম হবে। স্নিগ্ধের করুন মুখটা দেখে কাব্যের ভীষন মায়া হলো।
কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল, একটু এগিয়ে এসে মায়ের গা ঘেঁষে বসে শামিমার দুহাত নিজের হাতের মধ্যে পুড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে শামিমা হাত সরিয়ে নিতে তেজ দেখিয়ে বললেন——‘আলগা পিরিতির দরকার নেই আমার। তোদের আর মায়ের দরকার নেই! আমি চলে যাব; যেদিকে দুচোখ চোখে যায় চলে যাব। তারপর তোরা থাকিস তোদের বউ নিয়ে।’
বলতে বলতে শামিমার চোখ ভিজে এলো: রাগ এবার কান্না হয়ে বেরুচ্ছে বোধহয়। কাব্য ছোট একটা শ্বাস ফেলে দুহাতে শামিমার চোখ মুছে দিল। তারপর তার দুহাত নিজের হাতেতে সুন্দর করে শক্ত করে মুঠোতে পুড়ে নিয়ে নরম কণ্ঠে বলল—————‘দেখো আম্মু. . . স্নিগ্ধ-আমার ব্যাপারটা পুরো আলাদা। আমি যে পরিস্থিতিতে ছিলাম সেখানে তোমাদের জানিয়ে পারিবারিকভাবে বিয়েটা করতে পেরেছি। হয়তো স্নিগ্ধ ওই পরিস্থিতিতে ছিল না— তাই লুকিয়ে করেছো। আর জানিয়ে দিলে কি তোমরা এখন বিয়েটা দিতে? পারতে না। কারণ কায়ার ফ্যামিলি নাটক করত— চেনো তো ওদের তুমি।’
কাব্য একটু থেমে বলল———‘আর এসবে কে কষ্ট পেতো? তোমার ছেলেই।’
স্নিগ্ধ ভাইয়ের কথা বলার ভঙ্গিমা শুনে ভীষণ কৃতজ্ঞতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে কাব্যের দিকে। কাব্য একসময় একহাতে শামিমার হাত ধরে রেখে ,অপরহাতে চোখ মুছে দিয়ে গালে হাত রেখে বললো———-‘স্নিগ্ধ-কায়া; দে লাভ ইচ আদার। আমি. . আমি পারিনি ওদেরকে আলাদা করে দিতে। হয়তো এইজন্যে বড় ভাই হিসেবে আমি তোমার কাছে খারাপ হয়ে গেছি। কিন্তু আম্মু. . ভাবো একবার। একটা হারাম প্রেমের সম্পর্কে থাকার চেয়ে হালাল বিয়ে করে থাকা কি বেটার না আম্মু?’
শামিমার রাগ সম্ভবত কিছুটা নেমেছে, উনি নাক টেনে আবার অভিযোগ তুলে বললেন———‘তাই বলে আমাকে একবার জানালো না। বউ নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দরজার আটকে ঘুমাচ্ছে? ছি!’
স্নিগ্ধ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো এবার। আসলে এরা বারবার ঘুমাচ্ছে বলতে নেগেটিভ ভেবে নিচ্ছে— স্নিগ্ধের নিজেরই লজ্জা লাগছে এতে। ওরা তো স্রেফ ঘুমিয়েছে: স্নিগ্ধ এখনও পিওর ভার্জিন। অথচ এদের কথা বলার স্টাইল দেখে মনে হচ্ছে— স্নিগ্ধের অনেক তাড়া, ওসব করার। ছি; কি বিধঘুটে শোনাচ্ছে।
ওদিকে বেচারা কাব্য নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে তারপর বলল———‘যা হয়েছে ভুলে যাও। স্নিগ্ধের পড়াশোনা তো শেষের দিকে। চলো— পুরনো রেজিস্ট্রি বিয়ে ভুলে যাই। আমরা কায়ার বাড়িতে নতুন করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাব, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ বানিয়ে আবার স্নিগ্ধ-কায়ার বিয়ে দিয়ে দেব। কায়া তো এমনিতেই কুহুদের ঘরেই থেকেছে এতদিন। এখন থেকে এখানে থাকবে আমাদের ফ্ল্যাটে। স্নিগ্ধ তো হোস্টেলেই থাকে, আসবে তো বছরে দুই-তিনবার।’
শামিমা চুপ করে থাকলেন। রাগের পারদ আস্তে আস্তে নামছে। তবুও একবার অভিমান নিয়ে স্নিগ্ধকে দেখেই সাথে সাথেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। স্নিগ্ধ এবার হেসে উঠে দ্রুত উঠে এসে মা-কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো দুই হাতে। শামিমার গালে মমতা নিয়ে চুমু খেয়ে বাচ্চাদের মতো বলল———‘সরি আম্মু, ভেরি ভেরি সরি।’
শামিমা কান্নাভেজা চোখে হেসে উঠে বললেন———‘হয়েছে আর বাচ্চা সাজা লাগবে না। লুকিয়ে বিয়ে করে এখন আমার সামনে নাটক? বলতে পারতি একবার আমাকে। বলিসনি কেন?’
স্নিগ্ধ হেসে উঠে দুহাতে শামিমাকে জড়িয়ে ধরে বললো———‘আজ, এখন তো বললাম। এবার সত্যি-সত্যি বিয়েটা করিয়ে দাও প্লিজ।’
স্নিগ্ধের অসভ্য বায়না দেখে শামিমা চোখ রাঙিয়ে তাকালেন———‘অসভ্য; লজ্জা করে না, বিয়ের কথা এভাবে বলিস?’
স্নিগ্ধ সাথে সাথেই চুপ করে গেল; মায়ের সাথে হয়তবা বেশি মশকরা করে ফেলেছে। স্নিগ্ধের এমন চুপ হয়ে যাওয়াতে শামিমা হেসে উঠে বললেন———‘তোর বাবা আসুক; কথা বলব।’
স্নিগ্ধ তো খুশিতে লাফিয়ে উঠে শামিমাকে জড়িয়ে ধরলো। ছেলের পাগলামি দেখে: সামলে— এবার শামিমা কাব্যের দিকে তাকালেন, সামান্য হেসে বললেন———‘কুহুকে বল কায়াকে নিচে দিয়ে আসতে। আমার একটা শর্ত আছে। বিয়ের আগে ওদের দুজনের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ। হালাল হলেও বন্ধ মানে বন্ধ। এখানে কেউ কারসাজি করলে বিয়ে সোজা ক্যানসেল করে দেব একদম।’
কাব্য স্নিগ্ধের দিকে তাকাল ওর কি মত এতে। স্নিগ্ধ তো সাথেসাথেই রাজি হয়ে বলল———‘আমি রাজি, তুমি যা বলবে।’
শামিমা আশ্বস্ত হয়ে এবার গলা উঁচিয়ে কুহুকে ডাকলেন———‘কুহু… তোর দেবরের বউকে নিয়ে আয়।’
কুহু দরজার সামনেই এতক্ষণ লুকিয়ে-লুকিয়ে ওদের কথাই শুনছিল। শামিমার ডাকে কাব্য ওদিকে তাকাতেই বেচারি ধরা পড়ে গেল। অথচ কাব্য কিছুই বলল না; শুধু চোখটা ঘুরিয়ে নিলো, আর তাকালো না অব্দি। ওদিকে কুহু ভ্রু কুঁচকে ফেলেছে, কাব্য রেগে আছে এটা ও জানে। তাই কাব্যের এই আচরণে ওর খুব একটা এলো-গেলো না।
একটু পর— কুহু কায়াকে নিয়ে এলো ড্রইংরুমে। কায়াকে শামিমা ডেকে এনে বসালেন নিজের পাশটায়। কায়া তো রীতিমত কেঁদে কেঁদে চোখ-মুখ পুরো ফুলিয়ে ফেলেছে। শামিমা ওর চোখ মুছে দিয়ে হেসে বললেন———‘এত কাঁদার কী আছে; হু? তুই তো কুহুর মতোই, আমার নিজের। তোকে আমার ছেলে দিতে আমার একটুও আফসোস হবে না।’
কায়া সাথেসাথেই অবাক চোখে তাকাল শামিমার দিকে।ওর এমন তাকানো দেখে শামিমা হেসে ওর থুতনি চেপে মুখটা উঁচু করে হেসে বললেন———‘বিয়ের পর আমাদের বাড়িতে স্বর্ণ দিয়ে নতুন বউয়ের মুখ দেখার নিয়ম আছে। এই স্বর্ণের নিয়মটা তোদের বাড়িতে গিয়েই পালন করব, হু? তোর বাবার নম্বর দিস আমাকে। কেমন?’
শামিমার এত সুন্দর, মায়া-মায়া কথাতে কায়ার বোধ হলো— ওর বুকের উপর থেকে যেন কেজিকয়েক বোঝাই কমে গেছে। কায়া হেসে উঠেছে কান্নাভেজা মুখে, সাথে সাথেই জড়িয়ে ধরল শামিমাকে। পাশ থেকে স্নিগ্ধও জড়িয়ে ধরল একইসাথে, শামিমা হেসে দুটোকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন———‘সুখে থাক দুটো।’
কুহু পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে এসব দেখছিলো। ওর জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে কায়া। কুহুর জীবনের প্রতিটা আপ-ডাউন কায়া নিজের চোখে দেখা, কায়া প্রতিটা কদমে কুহুর পাশে ছায়ার মতো ছিল। কুহুর ডিপ্রেশন থেকে শুরু করে, ওর যত মেন্টাল সাপোর্ট দরকার ছিলো সেসময়— সবটাতেই কায়া ছিলো। এই মানুষটা আজ নিজের ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে যাবে— ইস! কী সুখ! কুহুর কান্না পেয়ে গেল হঠাৎ। ও আলগোছে চোখের জল মুছে নিলো সাথেসাথে।
কুহু ওভাবেই কেন যেন কাব্যের দিকে তাকিয়ে রইলো। কাব্য ওদের পূর্ণতা দেখে ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। স্নিগ্ধ-কায়া ভালবেসেছে; একে অন্যকে পেয়েও গেছে আজ।
আর কাব্য? ও তো পেয়েও কিছুই পেল না। কুহু ওর সামনে থেকেও থাকল না। দুজন এতটা কাছাকাছি এসেও মুহূর্তেই হাজার মাইলের দূরত্বে চলে গেল। কাছে থেকেই কত-কত দূরত্ব ওদের। কাব্যের ভেতরটা পুড়তে লাগল। চুপচাপ ও সোফা থেকে উঠতে উঠতে চোখ গেল কুহুর দিকে। কুহু ওর দিকে তখনও একইভাবে তাকিয়ে আছে। কুহুকে দেখে কাব্যের মলিন চোখ হয়ে গেল; প্রখর তীক্ষ-রাগী। ও ওভাবেই তীক্ষ্ণ চোখে কুহুকে দেখে পরপর জ্যাকেটটা হাতে তুলে নিজেদের রুমে চলে গেল। কুহুও এবার গেল ওর পেছনে— নিজেদের রুমে।
কাব্য রুমে ঢুকে জ্যাকেটটা বিছানার ওপর ফেলে দিয়ে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল। কুহু রুমে ঢুকে দরজা সামান্য আটকে দিয়ে কাব্যের পাশে এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ উসখুস করে হঠাৎ নিভু কণ্ঠে বলল———‘থ্যাংক ইউ।’
কাব্য কাবার্ড হাতড়াচ্ছিল; কুহুর কথাতে একটু থামলো ও। পরপর কোনোরূপ জবাব দিল না; হাতরাতে কাবার্ড— যেন ওর পাশে কেউই নেই: কুহুর কোনো অস্তিত্বই নেই।
ওদিকে কুহু নিজের মতো বলে গেল———‘কায়ার এতটা সাপোর্ট দেওয়ার জন্যে, ধন্যবাদ। আপনি ওভাবে না বোঝালে বড়মা অনেক ভুল বুঝতেন ওদের। আপনি খুব সেন্সিটিভলি ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করেছেন। দ্যাটস ইমপ্রেসিভ।’
কুহুর কথা বলার মধ্যেই হঠাৎ ঠাস করে কাবার্ডের দরজা আটকে দিল কাব্য। কুহু তো রীতমত চমকে উঠল ওই শব্দে। হতবম্ব চোখে কাবার্ডের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে অবাক চোখে আবার তাকাল কাব্যের দিকে। কাব্য কুহুর দিকে তাকাল না, টাওয়ালটা হাতে তুলে অন্যদিকে চেয়ে ভয়ংকর গম্ভীর স্বরে বলল———‘আমি যা করেছি শুধুমাত্র আমার ভাই আর ভাইয়ের খুশির জন্যে করেছি। আর কারোর জন্যে না।’
বলেই সোজা বাথরুমে চলে গেল। বাথরুমের দরজাটাও বেশ শব্দ তুলেই আটকালো। কুহু স্রেফ ফ্যালফাল চোখে তাকিয়ে রইল কাব্যের যাওয়ার দিকে। কাব্য ওর সাথে কথা বলছে না— আজ প্রায় দুদিন! কেন যেন হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো কুহুর বুক চিরে। হঠাৎ কেন যেন মনে হলো—- কাব্য আবার আগের মতো হয়ে যাক। ওর পেছনে ঘুরুক। কাব্যের রাগ কেন যেন কুহুর ভালো লাগল না একটুও। তবুও কুহু নিজের ইগোকে ছোট করলো না। কাব্যের রাগ ভাঙালো না, চুপচাপ বেরিয়ে এলো রুম থেকে।
বেশঅনেকক্ষণ পর—-
কাব্য বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখে কাজের মহিলা অর্থাৎ সুরমা মেয়েটা কাব্যের রুমে ওর ড্রয়ারে কিছু খুঁজছে। কাব্য খালি গায়েই বেড়িয়েছল। ওকে দেখেই সাথেসাথে আবার বাথরুমে ঢুকে টি-শার্ট পরে এসে বেরিয়ে বলল———‘তুমি এই রুমে কী করছো?’
সুরমা কাব্যের কথায় রীতিমতো ভূত দেখার মতো চমকে উঠে দাঁড়াল। কাব্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আঁটসাঁট হয়ে গেল ওর কণ্ঠ; কোনোরকমে বলল———‘আব. . আব স্নিগ্ধ ভাইয়া চার্জার নিতে পাঠাইছে।’
কাব্য শুনলো। সুরমার আচরণ কেন যেন ওর কাছে ভালো ঠেকলো না। এত কাপছে কেন এই মেয়ে, যেন চুরি করতে গিয়েই ধরা খেয়েছে?
কাব্য গম্বীর স্বরে; কঠিনভাবে বলল———‘আমি একা থাকলে কখনো এ রুমে আসবে না। কুহু বা আম্মু রুমে থাকলেই আসবে। যাও এখন।’
সুরমা বলার সাথে সাথেই প্রাণ বাঁচিয়ে রীতিমতো পালিয়ে এলো কাব্যের রুমটা থেকে। কাব্যের ওর আচরণটা খুব একটা সুবিধার লাগল না।তবুও ও সেটা পাত্তা না দিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। টাওয়াল ভেজা ছিল; চুল মুছতে মুছতে হঠাৎ নিচে একটা কিছু খেয়াল করল। একটা চার্জার, ড্রেসিং টেবিলের নিচে ঢুকিয়ে রাখা। একটা অদ্ভুত টাইপের চার্জার, সকেটে ঢোকানো। মনে হলো— মাত্রই কিছু একটা চার্জ করা হচ্ছিল এখানে।
কাব্য চার্জারটা দেখল, তারপর সকেট থেকে সেটা খুলে এনে রীতিমত হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। এটা অবশ্যই কোনো মোবাইল বা ল্যাপটপের চার্জার নয়। এটা অন্য কিছুর চার্জার. . কেমন যেন… অদ্ভুত একটা চার্জার।
দেখে তো মনে হচ্ছে… কিছু একটা চিন্তা করে কাব্য মোবাইল হাতে তুলে গুগল করল। তারপর? কাব্যের ভ্রু কুচকে এলো। অর্থাৎ. . . এটা. . . ওর পিঠ-পিছে এসব চলছিলো ওর রুমে?
চলবে
ঘটনা কি হতে পারে গাইজ? সামনের পর্বগুলোতে- বহুদিন পর একটা বিয়ে খেতে যাচ্ছি আমরা। প্রপার-প্রোপার বিয়ে হবে স্নিগ্ধ-কায়ার! বিয়ে হবে ওদের; রোমান্স চলবে কাব্য-কুহুর। কিভাবে? লেটস সি!
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৪
-
ডেনিম_জ্যাকেট পর্ব ৩৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪২