ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৪১
অবন্তিকা_তৃপ্তি
‘আরে এটা কি?’ —- কাব্য বাকিটা শোনার আগেই নিচে ঝুঁকলো।
পরপর লাল রঙের ফিনফিনে নাইটিটা হাতে তুলে চোখের সামনে মেলে ধরতেই কুহুর নিজের চোখই যেন কোটর থেকে বাইরে আসার উপক্রম। ইয়া খোদা—-এটা. . এটা কোত্থেকে এলো? ওদিকে কাব্য একটা শুকনো ঢোক গিলে কাপড়টার দিকে একবার চেয়ে আবার আহাম্মক হয়ে কুহুর দিকে তাকালো।
কুহু নিজেকে সামলে, লাফিয়ে লাফিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসলো, একদম দৌড়ে দৌড়ে। হাঁটার পথে মেঝেতে পরে থাকা লাগেজে একবার পা বেজে পড়তে নিলেই কাব্য হাত উঠিয়ে থামাতে চাইলেও— কুহু একলাফে এসে কাব্যের হাত থেকে নাইটিটা কেড়ে নিয়ে আলমারী খুলে ছুড়ে সেটা সেখানে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে ফেলল।
কাব্য বেচারা তো আহাম্মক রীতিমত, হা করে কুহুর এই কাজ দেখলো এতক্ষণ। কুহু হাপাতে হাপাতে কাব্যের দিকে আর লজ্জায়-অস্বস্তিতে চোখদুটো মেলাতেই পারলোনা, ওভাবেই আমতা আমতা করে বলতে থাকে——‘ম. . মনে হয় কায়া! কায়া. . এনেছে।’
কুহু হাপাচ্ছে হরদম, লজ্জায় মরেই যাচ্ছে বেচারি। কাব্য হা করে কিছুক্ষণ কুহুর দিকে তাকিয়ে; পরপর মৃদু হাসলো। আলতো পায়ে কুহুর দিকে এগিয়ে আসতেই; কুহু দম আটকে আড়চোখে ওর দিকে তাকালো— কাব্য এগুচ্ছে কেন? আর ঠোঁটের হাসিটা দুষ্টু কেন?
কাব্য এগিয়ে আসে ধীর পায়ে; যেভাবে একজন প্রেমিক আসে, প্রেমিকার দিকে। সেভাবে এসে ধীর হাতের ছোয়ায় কুহুর চুল ঘাড়ের উপর থেকে সরাতেই; কুহু শাড়ীর আচল খামচে ধরে হাপিয়ে উঠে———-‘কি . . কি করছেন?’
শুনেই না কাব্য। ও নিজের মতো কুহুর গোলগাল ঘর্মাক্ত; হাপাতে থাকা মুখটুকুর দিকে চেয়ে থেকেই ওর ঘাড়ের উপর পড়ে থাকা কিছু চুল আঙুলের ঘষায় সরিয়ে দিতেই— কুহু চোখ খিছে পাশ ফিরে একবার তাকালো কাব্যের দিকে। কাব্য তখনো মগ্ন; মোহিত! ও কুহুর গলায় দু-আঙুল ম্যাসাজ করতে করতে নিজের মুখটা বেচারির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল——-‘চুমুটা এত্ত ভালো লেগেছে, হু? যার জন্যে আমার ইগোওয়ালি বউ হানিমুনে এতদূর ভেবে নিয়েছে? ইন্টারেস্টিং, ভেরি ভেরি ইন্টারেস্টিং!’
কাব্য কথাটা বলে কুহুর কানের উপর ফু দিল, মৃদু হেসে কমুক নয়নে চেয়ে। সাথেসাথেই বিদ্যুৎবেগে কুহু ছিটকে সরে আসে। কাব্য এবার পকেটে হাত গুঁজে, দেয়ালে হেলান দিয়ে বাকা হেসে ওর দিকে চেয়ে আছে, দেখছে কুহুর একেকটা এক্সপ্রেশন।
কুহু আর কাব্যের দিকে তাকালোই না, ইতি-ওতি চেয়ে দেখে দেখে আমতা আমতা করে সাফাই গাওয়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠল——-‘মো. . মোটেও না। এসব অদ্ভুত ফ্যান্টাসি আমার নেই, বুঝেছেন?’
বলেই কুহু লাগেজের চেইন আটকে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। কাব্য তখনো দেয়ালে হেলান দিয়ে হাসছে ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে। পরপর কি বুঝে দুষ্টু হেসে— আলমারি খুলে নাইটি বের করে লাগেজে প্যাকেট করে ঢুকিয়ে রাখল।
হানিমুনে যাচ্ছে ওরা—- কুহুর এই অযথা, হতচ্ছাড়া রাগকে কি করে ছুড়ে ফেলে দিতে হয় কাব্য এবার সেটাই দেখাবে।
————————————
সিলেট. .
বলা হয় শাহজালাল-শাহপরাণের জমিন এটা। এখানে এলে নাকি এখানকার পবিত্রতা: স্নিগ্ধতা মৃত মানুষকেও জাগিয়ে তুলে।
শাহজালাল এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই কাব্যোর একটা ফ্রেন্ড এগিয়ে আসলো দুটো ফুলের তোড়া নিয়ে। কাব্য ওকে দেখে সানগ্লাস খুলে এগিয়ে এলো———‘হাই. কি অবস্থা আবির?’’
বলেই দুজন দুজনকে ম্যানলি হাগ করল। কুহু পাশে দাড়িয়ে হাসার চেষ্টা করে আছে, শীতের দুপুরে ওর গায়ে স্রেফ একটা হুয়াইট কুরতি-জিন্স, এবং কালারফুল রেইনবো দোপাট্টা গলায় ক্রস করে রাখা ঝুলিয়ে রাখা।
আবির কাব্যকে ছেড়ে কুহুর দিকে চেয়ে হেসে বলল——-‘হ্যালো কু. . সরি ভাবি. !’
বলেই দাঁত কেলিয়ে হাসলো আবির, লজ্জা পেয়ে হেসে বলল——-‘আসলে কি বলো তো, কাব্য তোমাকে বিয়ে করে আমাদের বন্ধুমহলকে কনফিউশনে ফেলে দিয়েছে একদম। যাকে সারাজীবন কাব্যের বোন হিসেবে কুহু বলে ডেকে এসেছি— তাকে ভাবি ডাকছি এখন।’
কুহু হাসার চেষ্টা করে কাব্যের দিকে আড়চোখে তাকায়; কাব্য আবিরের ঘাড়ে থাপ্পড় বসিয়ে বললো———‘বোন কি হ্যাঁ? বন্ধুর বউকে ভাবি ডাকতে শেখ।’
কুহু কাব্যের এই হাস্যরত রসিকতা দেখে চোখ-মুখ কুচকালো। পরপর আবিরের দিকে চেয়ে মৃদু হাসার ভান করে বলল——-‘আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী ডাকুন ভাইয়া: প্রবলেম নাই।’
কুহুর এমন একটা জবাবে কাব্য ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, বলতে ইচ্ছে হলো— কুহুকে ভাবি না ডাকাতে কুহুর প্রবলেম না থাকলেও; কাব্যের আছে—- অবশ্যই আছে।
কিন্তু বললো না।
ওদিকে আবির কুহুর কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে হাতের একটা ফুলের তোড়া কুহুর দিকে বাড়িয়ে দিল—— ‘আপনার জন্য। কাব্য বলল গোলাপ নাকি পছন্দ করেন।’
কুহু ফুলের তোড়াটা হাতে নিলো,——-‘থ্যাংক ইউ ভাইয়।’
এবার কাব্যকে আবির একটা সানফ্লাওয়ার বুকে এগিয়ে দিয়ে বলল—— ‘ধর; প্রথমবার সিলেট এলি। শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার আগে খেয়ে নিবি নাকি কিছু?’
কাব্য আশপাশ দেখে বলল—— ‘একেবারে রিসোর্টে গিয়েও খাব। খেয়ে এসেছি ঢাকা থেকে। কুহু, তুই কিছু খাবি?’
কুহু মাথা নাড়ল— অর্থাৎ না।
কাব্যের এমন ‘তুই-তোকারি’ দেখে আবির সলভবত অবাক হয়েছে, বলল—— ‘তুই বলে বলিস এখনো?’
কাব্য কুহুর দিকে তাকালো, কুহু মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চেয়েছে তখন। কাব্য এইবার চোখে সানগ্লাস একহাতে পরে নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে জবাব দিল—— ‘ওকে বউ বউ লাগবে যেদিন থেকে সেদিন তুমি করে বলব, আপাতত তুই-ই ঠিক আছে।’
আবির বুঝলো না কাব্যের কথার অর্থ, অথচ কুহু ঠিকই বুঝেছে। ও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো কাব্যের দিকে, অথচ কাব্যের মুখ ভীষন স্বাভাবিক, সাদা-সিধে!
———
শ্রীমঙ্গল;পাঙ্গন রিসোর্ট।
আশপাশটা ভীষণ শান্ত, গ্রিনিশ-সবুজ চারপাশ। কুহু-কাব্যকে রুম দেখিয়ে দিয়ে আবির চলে গেল খাবারের দিকটা দেখতে।
কুহু রুমে ঢুকে বারান্দা, জানালার দরজা খুলে দিল, মুহূর্তেই ফুরফুর করে ঠান্ডা বাতাস হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকতে লাগল। কাব্য জ্যাকেট খুলে রেখেছিল সবে বেডে; বাতাস এভাবে ঢুকতে দেখে সাথেসাথেই আবার জ্যাকেট পরে বলল—-— ‘বাতাস ঢুকছে কুহু।’
কুহু কাব্যের দিকে তাকালো পেছন ঘুরে। পরপর জেদ দেখিয়ে জানালাটা আরও মেলে দিয়ে পুরোপুরি খুলে দিল এইবার। কাব্য চোখ কুঁচকে তাকাল। পরপর এগিয়ে এসে কুহুর পাশে দাঁড়িয়ে জানালার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বলল—— ‘আমি জানালা বন্ধ করতে বলেছিলাম।’
‘আমি শুনতে বাধ্য নই।’ — কুহুরও ত্যাড়া জবাব।
প্রকৃতির রিভেঞ্জ বলে একটা ব্যাপার আছে না? এই কথাটা bবলতে বলতেই কুহু দুবার পরপর হাঁচি দিয়ে বসলো। কাব্য কুহুর হাচি দেখে আচমকা হেসে ফেললো মাথায় নামিয়। হাসতে হাসতে চোখ ডলে আবার কুহুর দিকে তাকালো।
কুহু নাক ফুলিয়ে রুমাল দিয়ে নাক মুছতে মুছতে কাব্যের দিকে তাকাল। কাব্য হেসে কুহুকে এড়িয়ে জানালার খিল লাগাতে লাগাতে বলল—— ‘স্বামীর কথা না শুনলে ঠিক এইভাবেই আল্লাহ শাস্তি দেন, ওয়াইফদের এভাবে শাস্তি পেয়ে হাঁচি দিতে হয়।’
কুহু রুমাল দিয়ে নাক মুছতে মুছতে কঠিন কণ্ঠে বলল—— ‘এটা একটা কইনসিডেন্স।’
বেচারি কুহু, বলতে বলতেই পরপর আরো দুবার হাঁচি দিল। কাব্য আবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল,কুহু তো পারে না- নিজের নাককে ধরে কেটে ফেলতে। কাব্যের সামনে এভাবে হাচি না দিলে ওর চলছিল না?
কাব্য ওদিকে হাসতে হাসতে জানালার খিল লাগিয়ে ঠোঁট চেপে হাসি আটকে জবাব দিল—— ‘হুঁ, আই নো! প্রুফ দেখছি তো।’
কুহু নাক ফুলিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। কাব্য ও যেতেই লাগেজগুলো সুন্দর করে একপাশে রাখল। কুহুর ফেলে রাখা জ্যাকেট তুলে রাখলো। নিজের আর ওর ফোন চার্জে দিল। তারপর বেডে বসে অপেক্ষা করতে লাগল কুহুর বেরোনোর।
কুহু ফ্রেশ হয়ে বেরুতেই কাব্য তাড়া দিল—— ‘কুহু… কুইক, খাবারের জন্যে ফোন করছে বারবার।’
কুহু মুখ মুছে ক্রিম দিয়েই ওড়না পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো।
—
খাবার খেয়ে সন্ধার পর মিয়া-বিবি বেরিয়েছেন শ্রীমঙ্গলে হওয়া মেলা দেখতে। শ্রীমঙ্গলের শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে হওয়া মেলাতে দেশি-বিদেশি বেশ কিছু বিক্রেতাও এসেছেন। কাব্য-কুহু পাশা-পাশি হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখছিল মেলাটা।
কাব্য দোকান ঘুরে ঘুরে কুহুর জন্যে জিনিস দেখছিল, সাথে বাসার সবার জন্যে। কুহু পাশে দাড়িয়ে অন্যকিছু দেখছে। হঠাৎ একপাশে ফুচকার স্টল দেখেই; কুহু ওদিকে এগোল। কাব্য ওকে এগোতে দেখেও শপিং রেখে নিজেও পিছু পিছু গেল, এই মেয়েকে একা রাখা সেইফ না একদমই। কখন কোথায় কি কান্ড ঘটিয়ে ফেলে— খোদা জানে।কারণ উপন্যাসের কুহু চলতি-ফিরতি ক্লামজি মেয়ে একটা।
কুহু ফুচকাওয়ালার দিকে চেয়ে বলল——— ‘মামা এক প্লেট ফুচকার দাম কত?’
‘চল্লিশ ভাগ্নি।’ —— ফুচকাওয়ালা কুহুর ঢাকার কথাবার্তা শুনেই বেশ আমোদে জবাব দিল।
কুহু হেসে ফেলল ওনার উত্তর শুনে, বলল—— ‘তিন প্লেট ফুচকা দিন।’
ফুচকাওয়ালা হেসে হেসে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ফুচকা বানাচ্ছে। কুহু গান শুনে আগ্রহ নিয়ে বলল——-‘মামা কি গান গাইছেন?’
ফুচকাওয়ালা লজ্জা পেয়ে হেসে বলল——-‘বাংলা ছায়াছবির গান ভাগ্নি।’
‘জোরে গান তো: আমি ভিডিও করি।’ —- বলে কুহু ফোন বের করল।
কাব্য পাশ থেকে তাকিয়ে আছে: একদৃষ্টিতে কুহুর দিকে। কুহুকে অনেক দিন পর এতটা ফুরফুরে দেখাচ্ছে।
কুহু ভিডিও করছে, ফুচকাওয়ালা মামা গান গাইতে গাইতে ফুচকা বানাচ্ছেন———
‘সাদা সাদা কালা কালা,
রং জমেছে সাদা কালা
হয়েছি আমি মন পাগলা
বসন্ত কালে. .
তুমি বন্ধু কালা পাখি, — আমি যেন কি
বসন্ত কালে তোমায় বলতে পারিনি. .!’
কুহু হেসে হেসে , মহা ফূর্তিতে ভিডিও করছে— বারবার চিয়ার্স আপ করছে উনাকে,——-‘আহা . . কি সুর. . কি গলা। আরোও মামা, ওয়াও।’
কুহু চেচাচ্ছে খুশিতে; হাসছে দাঁত দেখিয়ে। কাব্য হা করে কুহুর ওই হাসিটা দেখছে। কত মাস হবে কাব্য কুহুর এই বাচ্ছামো হাসিটা দেখেনি? হয়তো প্রায় এক বছর পর— সেই আগের বাচ্চা কুহুকে কাব্য দেখছে । কাব্য অপলক তাকিয়ে আছে, ওর বুকটা কাঁপছে কেন ওভাবে, কুহু হাসছে বলে?
কাব্য ফুচকাওয়ালার দিকে হঠাৎ তাকাল, ফুচকাওয়ালার দিকে ইশারা করতেই উনি তাকালেন কাব্যের দিকে। কাব্য কুহুর অগোচরে ফুচকাওয়ালার দিকে এক হাজার টাকার নোট বাড়িয়ে দিতেই উনি অবাক হয়ে কাব্যের মুখের দিকে তাকালেন। কাব্য চোখ-মুখে তখন কৃতজ্ঞতা , ফুচকাওয়ালা কিছুটা অবাকই হয়েছেনা বটে। কাব্যের অবাক চলহে দিকে চেয়ে টাকাটা নিয়ে রাখলেন।
কুহু ভিডিও করা শেষ। ফুচকা খেতে খেতে কাব্যের দিকে তাকলো একবার। দেখলো কাব্য ওর দিকে একটা অদ্ভুত, অন্যরকম চোখে তাকিয়ে আছে। কুহু সেটা বুঝে পেছন ফিরে ফুচকা খেতে লাগলো।
কাব্যের ধ্যান ভেঙ্গে গেল; ও সাথেসাথেই ব্রু কুচকালো———‘এদিকে ফির।’
কুহু ফুচকা মুখে ঢুকাতে ঢুকাতে জবাব দিল——‘আমার ইচ্ছে নেই। আপনি অন্য মেয়েদের দেখুন।’
কাব্য ভ্রু কুচকে, পরপর হতাশ মুখ নিয়ে দাড়িয়ে রইলো।
ফুচকা খাওয়া শেষ হতেই, কাব্য বিল দিতে গেলেই- ওকে আটকে দিল কুহু। থমথমে কণ্ঠে বলল——‘আমার টাকা আছে; ওতো পুরুষ সাজার দরকার নেই আপনার।’
কাব্য বোকার মতো বলল——‘পুরুষ আবার সাজব কেন? আমি তো পুরুষই।’
কুহু বিরক্ত হয়ে, বিল মিটিয়ে দিয়ে আগে আগে চলে গেল। কুহু হাঁটছে; কাব্য ওর পিছু পিছু হাঁটছে। কুহু চুড়ির দোকানে ঢুকে, কাব্যও ঢুকলো।
কুহু বেচে বেচে কয়েক ডজন চুড়ি কিনতেই; কাব্য সাথেসাথে কুহু দেখার আগে এইবার আগেআগেই টাকা অনলাইনে পে করে দিল। কুহু কেনাকাটা শেষ করে এবার টাকা বের করতেই দোকানি দাত কেলিয়ে বলল——‘আফনার হাজবেন্ডে টাকা দিলাইসইন বইন।’
কুহু অবাক হলো; কাব্যের দিকে তাকাতেই কাব্য বলল——‘আমি টাকা পে করে দিয়েছি। আর কিছু কিনবি? ইয়ারিং দেখবি?’
কুহু কঠিন কণ্ঠে বলল——‘আমার কাছে টাকা ছিলো।’
‘তো? আমি কখন বললাম তোর কাছে টাকা নেই?’ —- কাব্য ভীষণ স্বাভাবিক হয়ে বলে।
কুহ উত্তর দিল না।কাব্যকে ফেলে আগে আগেই হাটা ধরল।
কিছুদূর যেতেই, হঠাৎ চিরচেনা ক্লামজি হাটতে হাটতে আচমকা কুহুর পরনের হিল জুতো মুছড়ে গেল।
আচমকা প্রচণ্ড ব্যথায় ‘আহ!’ আর্তন্দার করে কুহু ব্যথা পেয়ে নিচে বসে পড়ল। আর্তনাদ করে হাটু গেড়ে নিচে বসতেই; কাব্য সাথেসাথেই এগিয়ে এলো——‘কি হয়েছে? হু? কি হয়েছে? ব্যথা পেয়েছিস? দেখি।’
কুহু পায়ের একপাশে মালিশ করতে করতে একপ্রকার কাঁদো-কাঁদো হয়ে গিয়ে বলল———‘পা টা মচকে গেছে সম্ভবত।’
‘দেখে হাটবি না। এখানে আসার পর থেকেই সবসময় নাচছিস।’—- কাব্য শপিং ব্যাগগুলো একপাশে রেখে কুহুর পা চেপে ধরল দুইহাতে; ভীষণ আলগোছে—হয়তো ধরলেই ব্যথা পাবে।
কুহু ব্যথায় চোখ খিছে কাব্যের কাঁধের শার্ট খামচে ধরল। কাব্য কুহুর পায়ে মালিশ করতে করতে বলল——‘ব্যথা কোথায়? এখানে?’
‘এখানে. .!’ ——কুহু চোখ-মুখ খিছে দেখিয়ে দিল!
কাব্য মালিশ করতে করতে ফু দিচ্ছে, কুহু ব্যথায় যখন চোখ খিচড়ে আছে।
তখন স্বামী কাব্য মালিশ করতে ব্যস্ত, ভীষণ ব্যস্ত। ঠিক তখন স্ত্রী কুহু ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। একদৃষ্টিতে স্বামী কাব্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কাব্য ভীষণ ব্যথাতুর চোখে কুহুর পা মালিশ করে দিচ্ছিল।
কুহু কেন যেন তাকিয়ে রইল এইবার, অপলক। কাব্যের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল— যেন ব্যথাটা ওই পেয়েছে। কুহু কাব্যের শার্টের দিকে তাকাল; যে পাশটা কুহু চেপে রেখেছে নিজের আঙুলের ভাজে।
পরপর আবার কাব্যের দিকে তাকালো। কাব্য ফু দিচ্ছে; আর মালিশ করছে পা। একটুও ইগো দেখায়নি, ভাব দেখায়নি, ঘেন্না দেখায়নি কুহুর ময়লা পা ছুঁতে। কেন দেখায়নি? ভালোবাসে বলে? যে ভালোবাসার কথা কাব্য বলে হরহামেশা— সেটা সত্যিকার ভালোবাসা ছিলো? কাব্য এর ওই কথাগুলো, আবেগি আচরণ আজকাল কুহুকে ভীষণ প্রভাবিত করছে।
খুব সম্ববত— কুহু নিজের রাগ বেশিদিন ধরে রাখতে পারবে না। আচ্ছা? কাব্য কি ম্যাজিক জানেন? কুহুর ছয়মাসের যন্ত্রণা এত সহজে ভুলিয়ে দিলেন? কুহু তো চায়নি সেটা? তাহলে?
কুহুর এসব আজগুবি ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ কাব্য আচমকা কুহুর পা মচকে দিল। বেচারি কুহু আচমকা আক্রমণে আতকে উঠে কাব্যের কাঁধের শার্ট খামচে ধরে দিল এক চিৎকার—। সাথেসাথেই কাব্য মাথা তুলে তালাল——-‘সরি; সরি। ব্যাথা বেশি লেগেছে?’
কুহু ব্যথাতুর চোখ খুলে তাকাল, পরপর কাব্যের থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বলল——‘হু।’
কুহু উঠে দাঁড়াতেই কাব্য কুহুর জুতো নিজের দু আঙুলের ফাকে ঝুলিয়ে নিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল——‘হিল পরেছিস কেন এখানে? এটা পাহাড়ি এরিয়া: মাটি ভেজা থাকে বারো মাস। হাটতে পারবি এটাতে? ফ্যাশন সব জায়গায় চলে না কুহু, সবসময় তোর বাচ্চামো।’
কুহু শুনে গেল স্রেফ কাব্যের বকবকানি। ওর কেন যেন হঠাৎ, একদম আচমকা ভীষণ ভালো লাগলো কাব্যের এই ব্যাপারগুলো। কাব্য চোখ-মুখ রীতিমত কুচকে; একহাতে কুহুর একজোড়া হিল ধরে রেখে বিরক্ত ভঙ্গিতে বকে যাচ্ছে, আর কুহু হা করে কাব্যকে দেখেই চলেছে। শীতল পাহাড়ি বাতাসে কুহুর এলোমেলো চুল উড়ছে, কুহু প্রেমিকার ন্যায় বহুদিন পর কাব্যের দিকে চেয়ে আছে মুগ্ধ এইচ য়ে, আস্বাদন করছে প্রেমিকের সৌন্দর্য! যেমন করে করত— সাতটা মাস আগে।
কাব্য কিছুদূর গিয়ে একটা টুল দেখিয়ে কুহুকে বলল——‘এটাতে বস, আমি নরমাল ফ্ল্যাট জুতো কিনে আনি। যাবি না কোথাও, খবরদার।’
কুহু টুলে বসে, স্বভাবগত ভঙ্গিতে মুখ বাকিয়ে নিলো——‘আমি আপনার কথা মানতে বাধ্য নই।’
অথচ মনেমনে কাব্যকে কুহু একদমই এই কথাটা বলেনি; বলেছে উলটোটা। কাব্য ভ্রু কুচকে তাকালো; পরপরকুহুর মাথায় একটা চাপড় মেরে আবার সাবধান করে চলে গেল জুতো কিনতে।
কাব্য ভীষন দেরি করছে, ওদিকে বসেবসে ভালো লাগছে না কুহুর। ও আশপাশ দেখছে। হঠাৎ দেখতে পেল— একটা স্টল। কিছু এইটা পানীয় বিক্রি করছে একটা বিদেশী লোক।
কুহু আশপাশ দেখল—- কাব্য আসেনি এখনো। পিপাসাও পেয়েছে তখন। তাই ও এগিয়ে গিয়ে কিনল তিন গ্লাস পানীয়। খেতে খেতে শুনতে পেল পাশ থেকে একজন বলছে——‘ভাংটা বেশ মজা।’
কুহুর ওসব কানেও ঢুকলেই; মগজে ঢুকেনি। ও আরাম করে খেতে একটা ঢেকুর তুলে গ্লাসটা এগিয়ে দিল বিক্রেতার কাছে। টাকা মেটানোর আগেই কাব্য ওর পাশে এসে দাড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বলছে——‘টুল থেকে উঠলি কেন? মানা করেছিলাম না?’
কুহু শুকনো মুখে তাকালো। পানীয়ের দিওয়ে ইশারা করতেই কাব্য বিল মেটানোর জন্যে মানিব্যাগ বের করল। বিল মেটাতে গিয়ে দেখ মেনুতে লেখা ——‘bhang- ১০০ টাকা।’
কাব্যের ভ্রু সাথেসাথেই কুচকে গেল, কুহুর দিকে চেয়ে ভীষন সন্দেহ নিয়ে বলল——‘তুই. . . তুই এটা খেয়েছিস? হ্যাঁ?’
কুহু জবাব দিল——-‘হ্যাঁ। তো?’
কাব্য মন চাইল— মাথা টুকতে দেয়ালে। পরপর জিজ্ঞেস ভীষণ ভয় নিয়েই জিজ্ঞেস করল——‘আচ্ছা? তা কয়গ্লাস গিলেছেন ম্যাডাম?’
কুহু আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—-‘মাত্র তিন গ্লাস।’
‘কি? তিনগ্লাস? ইয়া খোদা।’—- কাব্য রীতিমত হকচকিয়ে গেল।
পরপর মাথা নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল——‘গ্যাছে, এই মেয়ে তো আজ রাতে একদমই গেছে।’
কুহু শুনতে পায়নি কাব্যের বিড়বিড় করে বলা কথাটা,মাথাটা এগিয়ে এনে বলল——‘কি বকছেন ওভাবে?’
কাব্য ওর দিকে তাকল। রাগী মুখে হাসার চেষ্টা করে বলল——‘কি বকব? বকার আগেই তো ঘটনা যা ঘটার ঘটিয়ে ফেলেছেন। চলেন এখন, রিসোর্টে ফিরি আপনার মাতাল হয়ে সিনক্রিয়েট করার আগে।’
বলে কুহুকে নিজে থেকে জুতো পরিয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো রিসোর্টে।
কিছুসময়ের মধ্যেই ভাং এর একশন শুরু হয়ে গেল। কুহু একটা সময় আর স্বাভাবিক থাকল না, হেলেদুলে কাব্যের সাথে হাঁটতে লাগল।
কয়েকবার টাল সামলাতে না পেরে পরে যেতে নিলে সাথেসাথেই কাব্য ওকে সোজা করে ধরে ফেলে——‘সামলে কুহু।’
কুহু হেসে উঠে, হাসতে হাসতে কাব্যের গায়ের সাথে মিশে ওর বাহু চেপে ধরে। কাব্য ওর হাটা দেখে আবার ওর দিকে তাকালো, কঠিন কণ্ঠে বলল——‘এসব কেন খেলি? একটা থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করছে। দিলে তো আবার কাব্য ভাই ভালো না। উঠ; সোজা হয়ে হাট, প্লিজ।’
বলে কুহুকে টেনে সোজা করতে গেলেই, কুহু মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে কাব্যের গলার কাছে কুখ এনে বড্ড বাচ্চা-বাচ্চা গলায় বায়না করল——‘একটু কোলে করে নিয়ে গেলে কি হয়?’
কাব্য হা করে তাকাল কুহুর দিকে। পরপর সন্দিহান হয়ে গল্লি——‘তোর চড়ে গেছে কুহু। বি সিরিয়াস।’
কুহু শার্টের উপর দিয়েই কাব্যের বুকে নাক-মুখ ঘষতে ঘষতে বলল——‘একটু কোলে নিলে কি হয়? আনরোমান্টিক হাজবেন্ড একটা।’’
কাব্য ভ্রু কুচকে চেয়ে পরপর আকাশের দিকে চেয়ে বিচার দিল——-
‘আল্লাহ, আজকের রাতে এই মেয়েকে একটু হুসে রেখ। আমার পাপের পাল্লা আর এর কাছে ভারি করিও না।’
বলে কাব্য হতাশ হয়ে কুহুর দিকে তাকাল——‘জু হুকুম ম্যাডাম।’
বলেই কাব্য একহাতে শপিং ব্যাগ; আর কুহুকে আরেকটা হাতে অনায়াসে পাজোকোলে তুলে নিলো;কুহু তো হেসে উঠেছে খুশিতে কাব্যের এভাবে একহাতে কোলে নেওয়াতে।
ও হেসে উঠে কাব্যর গলা জড়িয়ে ধরলে কাব্য ওর দিকে চেয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো——-‘আমি নিজে থেজে কোলে নেইনি কিন্তু; আপনি চেয়েছেন বলেই নিয়েছি:সকালে উঠে আমার ঘাড়ে দোষ চাপলে খবর আছে আপনার।’
বলেই হাটা ধরল সামনে। কুহু ওর গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ঝুলে গেল একপ্রকার, হেসে হেসে বলল——-‘সব দোষ আপনার; আমাকে পাগল করেছেন কেন? হু?’
কাব্য সামনে তাকিয়ে হাটতে হাঁটতে জবাব দিল—‘আমি করেছি পাগল? পাগলকে আবার পাগল করতে হয় নাকি?’
কুহু মুখ ফুলিয়ে বললো—-‘আমি পাগল না।’
কাব্য থামল; কুহুর গোলগাল ভাং খেয়ে বাচ্চা-বাচ্চা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে পরপর নাকের উপর ছোট চুমু খেয়ে বলল——-‘আপনি পাগল; শুধু আমার পাগল, এই কাব্যের পাগল, আপনার হাজবেন্ডের পাগল।’
চলবে
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৫