Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২


ডাকপ্রিয়র_চিঠি

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

০২
সন্ধ্যার আকাশে নেমেছে ঝুম বৃষ্টি। চাঁদবিহীন আকাশে টিপটিপ বৃষ্টি। এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটে চলেছে ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত মানুষগুলো। কেউ বা রেইনকোট গায়ে জড়িয়েছে, আবার কেউ বা বৃষ্টির পানি মেখে নিত্যদিনের বাজার করছে ফুটপাত থেকে। মূলত ঢাকা শহরকে একটি কোলাহলময় যান্ত্রিক শহর কিংবা ব্যস্ত নগরী বলা হয়। এখানে ঝড়-বৃষ্টি যা-ই হোক, মানুষের কর্মব্যস্ততা সর্বদা থাকে। ঘন বসতির সঙ্গে গাড়ির যানজটের ব্যাপারটাও বেশ দেখা যায় এই নগরীকে কেন্দ্র করে। সন্ধ্যার ঝুম বৃষ্টিতে হুড তোলা রিকশা টিং টিং শব্দে করে চলে যাচ্ছে এ-পথ থেকে ও-পথে।

মারিদ এমন এক সন্ধ্যায় বাইক থামাল পুরান ঢাকার চেনা পরিচিত গলিতে। ততক্ষণে বৃষ্টিতে ভিজে দুপুরে পরা আকাশি রঙের শার্টটি পিঠে লেপ্টে গেছে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সে দাঁড়াল ছোটখাটো একটি চায়ের দোকানের ছাউনির নিচে। গায়ের ভেজা শার্টটি হাল্কা ঝেড়ে আশেপাশে বৃষ্টিময় পরিবেশটা দেখে কপাল কুঁচকাল। গরম গরম চা অর্ডার করে দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাল মেঘলা আকাশের দিকে। গুমোর গুমোর শব্দে যেন আকাশের বাঁধভাঙা গর্জন। কবে যে এই বৃষ্টি থামবে কে জানে? মারিদের আজ একটু হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল দাদাভাইকে দেখতে। দুপুরের পর থেকে সে ব্যস্ত থাকায় তার আর হাসপাতালে যাওয়ার সময় হয়নি। এর মধ্যে পরিবারের প্রায় সকলের ফোন এসেছে, সে কখন যাবে সেই নিয়ে। কিন্তু আকাশের যা অবস্থা, মনে হয় না এই বৃষ্টি সকালের আগে থামবে। বৃষ্টি হলে আবার ঢাকার রাস্তায় চলাফেরা মুশকিল। রাস্তায় হাঁটু সমান পানি জমে একাকার অবস্থা। তখন মানুষের যাতায়াত করা শুধু মুশকিল নয়, দুষ্কর হয়ে পড়ে। আল্লাহ জানে, এই দেশটা যে কবে ঠিক হয়।

মারিদ বিরক্তি নিয়ে পকেট থেকে টিস্যু বের করে নিজের ভেজা মুখ মুছতে মুছতে তার পকেটের ফোনটি বেজে উঠল। মারিদ তাড়াহুড়ো করে ফোন বের করল না। সে জানে এই অসময়ে তার পরিবার থেকেই কলটা আসবে, তাই সে ফোন রিসিভ করল না। বরং অবহেলায় কল বাজতে বাজতে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। ততক্ষণে দোকানি লোকটা মারিদের হাতে চায়ের কাপটি এগিয়ে দিতে সে হাত বাড়িয়ে কাপটি হাতে নিল। ঠিক তখন আবারও তার পকেটে ফোনটি বেজে উঠল। পরপর দুবার রিং হতে মারিদ এক হাতে মাটির কাপটি চেপে অপর হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখতে পেল রিফাতের নামটি ভাসছে তার ফোনের স্ক্রিনে। মারিদ ফোনে ব্লুটুথ কানেক্ট করে ফোনটি আবার পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে কল রিসিভ করে বলল…

‘বল।

‘বল মানে? কই তুই?

‘পুরান ঢাকায় আছি।

‘ঐখানে কী করিস?

‘এসেছিলাম একটা কাজে, তুই বল।

‘আমি কী বলব? তোর না হাসপাতালে আসার কথা ছিল, এখনো আসলি না কেন?

‘বৃষ্টিতে আটকা পড়েছি। বৃষ্টি থামলে সরাসরি হাসপাতালেই যাব।’

‘বৃষ্টিতে আটকা পড়েছিস মানে? তোর গাড়ি কই?

‘গাড়ি নিয়ে আসিনি, বাইকে এসেছি।’

‘গাড়ি ছেড়ে হঠাৎ বাইক কেন? মেয়েলি চক্কর নাকি মামা? প্রেমিকা সঙ্গে আছে?’

‘তোর মাথা। ফোন রাখ।’

কানের ব্লুটুথ চেপে রিফাতের কলটি তৎক্ষণাৎ কেটে দিতে কয়েক সেকেন্ড মাঝে পুনরায় ফোনটি একই দমে বেজে ওঠায় মারিদ খানিকটা বিরক্ত হলো। পকেট থেকে ফোন না বের করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কানের ব্লুটুথ চেপে কলটি রিসিভ করল। পুনরায় রিফাত কল করেছে ভেবে মারিদ সেভাবেই বলল…

‘ বল!

‘আসসালামু আলাইকুম।’

মেয়েলি রিনরিনে কণ্ঠের সালাম শুনে মারিদ কপাল কুঁচকাল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সালামের উত্তর দিয়ে বলল…

‘ওয়ালাইকুম সালাম। কে?’

‘এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলেন ব্যবসায়িক সাহেব?’

‘আমি ব্যবসায়িক আপনি কীভাবে জানেন?

‘আবার ভুলে গেলেন? দুপুরে তো আপনি নিজেই বলেছিলেন, আপনি ব্যবসায়িক মানুষ, হিসাবে বেশ পাকা। মনে নেই?

‘ওহ!

মারিদকে উদাস গলায় উত্তর করতে দেখে ফোনের ওপাশের মেয়েটি মারিদকে শুধালো..

‘কী, মন খারাপ?
‘না।’

ফোনে ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ পেয়ে মেয়েটি আবারও মারিদকে প্রশ্ন করে বলল….

‘বৃষ্টি হচ্ছে?’
‘হুম।’
‘বৃষ্টি পছন্দ না?’
‘না।’
‘ কোথায় আছেন?
‘ একটা দোকানের ছাউনির নিচে।
‘ তাহলে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে বিরক্ত হচ্ছেন নিশ্চয়ই?’
‘হুম।

মারিদের সম্মতিতে ফোনের ওপাশের মেয়েটি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল…

‘ আমি জানি বৃষ্টি সবার জন্য রোমান্টিক নয়, তারপরও বলব, ঝুম বৃষ্টিতে ধোঁয়া-ওড়ানো গরম গরম চা হাতে নিন। গরম চায়ের সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি দেখার মজাই আলাদা। আর সঙ্গী হিসেবে যদি আমার মতো একজন কথা-পটু মানুষ পান, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। দুই মিনিটে আপনার মুড ঘুরে যাবে। সবাই আমাকে বলে আমি নাকি দারুণ কথা বলতে পারি। আমাকে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারেন, আমার সঙ্গোয় আপনি কিন্তু বিরক্ত হবেন না।

ফোনের ওপাশের মানুষটি কে, মারিদ জানে না। আর না তার জানার আগ্রহ আছে। কিন্তু মেয়েটির গোছানো কথা আর প্রাণোচ্ছল কণ্ঠে যে কারো মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। প্রথমে মারিদ কথা বলতে বিরক্ত হলেও অদ্ভুতভাবে তারও এখন ভালো লাগছে এই উচ্ছল কণ্ঠের কথাগুলো শুনতে। নিরব সম্মতিতে মারিদ ধোঁয়া-ওড়ানো গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকাল ঝুম বৃষ্টির দিকে। বৃষ্টি প্রতি তার ভালো লাগা, খারাপ লাগা কাজ না করলেও সে এই মূহুর্তে আপাতত বৃষ্টির প্রতি বিরক্তিবোধ করছে না। বরং এই বৃষ্টি মাঝে সেই উচ্ছল কণ্ঠের মেয়েটির সম্পর্কে জানতে চেয়ে বলল…

‘আমরা কি পরিচিত কেউ, মিস?’
‘না।’

‘তাহলে আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?’
‘পেয়েছি একভাবে।’

‘কীভাবে?

‘আপাতত পরিচয় দিতে পারছি না, তার জন্য দুঃখিত। তবে আমাকে বসন্তের অতিথি পাখি ধরে নিন। বসন্ত চলে গেলে আমিও চলে যাব।

মেয়েটির কথা গুলো কেমন অদ্ভুত আর রহস্যময় শোনালো মারিদের নিকট। সে কপাল কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলল…

‘তার মানে, ফাঁদে ফেলতে এসেছেন।

‘পোষ মানাতে পারলে থেকে যেতে পারি।

মারিদ হাসল। অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছেয়ে গেল মনে। কথা বলবে না বলবে না করেও মারিদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ফোনালাপ করল। মেয়েটি সত্যি দারুণ কথা বলতে পারে। তবে মারিদ কথা বলেছে কম, শুনেছে বেশি। মাঝেমধ্যে তার ঠোঁটে কোণে একটুআধটু মিষ্টি হাসির রেখা দেখা গেছে এই যাহ। যে মারিদ আলতাফ অহেতুক কিছু পছন্দ করে না, সেই মারিদ আজ ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে অহেতুক ছয়টা ধোঁয়া-ওড়ানো গরম চা পান করল। বৃষ্টি পছন্দ না, অথচ বারবার অহেতুক বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। এই যে সে এতগুলো অহেতুক কাজ করল, সেটা তার বোধগম্য হলো ফোনালাপের পর।
কল কেটে যেতেই মারিদ চায়ের বিল মিটিয়ে বাইক টানল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। চলন্ত বাইকে তার হঠাৎ ধারণা হলো, সে এতক্ষণ একটা অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে এতো কথা কেন বলল? কী জন্য? একটা মেয়ে কথা বলতে চাইলেই তার বলতে হবে? আশ্চর্য! সে মেয়েটির সঙ্গে কথা না বলে বরং কষে একটা ধমক লাগালেই তো মেয়েটি তাকে আর নেক্সট টাইম কল করার সাহস পেত না। মারিদ নিজের কাজে নিজেই বিরক্ত। চলন্ত বাইক চালিয়ে ভাবল, নেক্সট টাইম মেয়েটি ফোন করলে সে ধরবে না। আর যদি কল রিসিভও করে তাহলে অপরিচিত মেয়েটিকে জোর গলায় ধমক লাগাবে। অহেতুক তাকে ফোন করে ডিস্টার্ব না করতে সেটাও বলবে। মারিদ চিন্তা করল এক, অথচ সে কাজে করল আরেক। দেখা যেত যখনই মেয়েটির কল তার ফোনে আসত, সে না চাইতেও কেমন করে জানি সেই কল রিসিভ করে কথা বলত। মূলত মেয়েটির কথায় অদ্ভুত যাদু আছে যা মূহুর্তে মারিদের মন ভালো করতে সক্ষম। প্রথমে অল্প অল্প ফোনালাপে দুজনে ক্ষান্ত হলেও, মাস গড়াতে দুজনের ফোনালাপের সময় দীর্ঘ হলো। মিনিট পেরিয়ে ঘন্টার ঘন্টা কথা হয়। যে মারিদের ব্যস্ততায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই, সেই মারিদ শত ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে কথা বলতে দেখা গেল। যেন অপরিচিত মেয়েটির কন্ঠে সে দিনদিন আসক্ত হয়ে পরছিল। শুধু যে মারিদ ফোনালাপে আসক্ত হয়ে পরছে বিষয়টা এমন না, অপর পাশের মানুষটির মাঝেও সেইম ব্যকুলতা দেখা গেল দিনকে দিন।
~~

তিনমাস পর
রাত প্রায় দুটো চল্লিশ। অন্ধকার আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। মারিদ বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ফোনালাপে মজে। ঢাকা, গুলশান দুই নাম্বার সেক্টরে তাদের বাড়ি। আবাসিক এলাকা হওয়ায় বেশ শান্ত পরিবেশ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো চোখে পড়ে। এই এলাকায় শৌখিন আর শিল্পপতিদের বসবাস, সেজন্য এখানকার পরিবেশও বেশ শান্ত, ঢাকার অন্যান্য অঞ্চল থেকে। মারিদ নিস্তব্ধ পরিবেশটা দেখতে দেখতে ভেজা চুলে হাত বোলাল। মাত্র গোসল সেরেছে সে। গায়ে কালো ট্রাউজারের সঙ্গে সাদা টি-শার্ট পরেছে। শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ দেহে সাদা টি-শার্টটি যেন শরীর কামড়ে রয়েছে। মারিদের সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বাসায় ফিরেছে রাত একটার পর। এত রাতে না ঘুমিয়ে গোসল সেরে ছাদে উঠেছে ফোনালাপ করতে।
রাত যতই হোক, ফোনালাপ না করলে ঘুম হয় না তার। সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু ফোনালাপ করে ঘুমাতে পারলে যেন শান্তি লাগে। নয়তো মন ছটফটে অস্বস্তিতে সারারাত ঘুম হয় না তার। মারিদ জানে, প্রকাশ না করলেও ফোনের অপর পাশের মানুষটিরও সেইম অবস্থা হয়। সারারার ভর তার একটি কলের অপেক্ষায় বসে থাকে মেয়েটি। নয়তো তার কল করার সাথে সাথে কি কলটি রিসিভ হতো?
মারিদ পকেটে দু’হাত গুঁজে ছাদের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে হাঁটছে ধীরগতিতে। তাকে দেখে যে কেউ বলে দেবে সে বিশেষ ফোনালাপে ব্যস্ত। তক্ষুনি শোনাল মেয়েলি কন্ঠ। মারিদকে কথায় কথায় বলল..

‘আপনি জানেন? মানুষ দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি কিসের মায়ায় পড়ে?’

ফোনের ওপাশের মেয়েটির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে কথাটা শুনে মারিদ সাবলীলভাবে জানতে চেয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বলল…

‘কিসের?
‘কথার।
‘তাই?

‘হুম! মানুষ দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি কথার মায়ায় পড়ে। একটা মানুষকে কথা দিয়ে আপনি সারাক্ষণ ডুবিয়ে রাখতে পারবেন। যার কথায় আমরা যতটা অ্যাট্রাকটিভ ফিল করি, আমরা তার মায়ায় তত সহজেই পড়ে যাই। এজন্য দেখবেন, সম্পর্কের শুরুতে মানুষ দিন-রাত এক করে একে অপরের সঙ্গে সারাক্ষণ কথা বলে। কিন্তু যখন মানুষ কথার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে, তখন সেই মানুষের ব্যস্ততার বাহানা শুরু হয়। আর এমনটা হওয়ার কারণ হচ্ছে, মানুষ ব্যক্তির প্রেমে না পরে তার কথার প্রেমে পরে বলে হয়, এজন্য একটা সময় পর সম্পর্ক গুলোও টক্সিক হয়ে যায়।

মারিদ মনোযোগ সহকারে ফোনের ওপাশের মেয়েলি কণ্ঠের কথাগুলো শুনে ছোট ছোট পা ফেলে ছাদে হাঁটতে হাঁটতে কথায় কথায় মারিদও বলল…

‘ তাহলে আমাদের সম্পর্কটা মনে হয় না কখনো টক্সিক হবে। আপনি-আমি দুজনই ম্যাচিউর। টক্সিক হওয়ার, নো চান্স।

মারিদের কথা শেষ হতে না হতেই তৎক্ষণাৎ শোনা গেল ফোনের ওপাশের মেয়েলি রিনরিনে গলার স্বর…

‘আমরা কি সম্পর্কে আছি, ব্যবসায়িক সাহেব?’

কথায় কথায় মারিদ কী বলতে কী বলে ফেলেছে, সেটা অনুভব হতেই অস্বস্তিতে সে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বিড়বিড় করে আওড়াল, ‘শিট!

তারপর? তারপর দুজনে নিশ্চুপ ভঙ্গিতে কাটাল কিছুক্ষণ। মারিদের তিরিশ বছরের জীবনে যেন এই অচেনা অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলো প্রথম। সে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ করেছিল, যখন তার চৌদ্দ বছর বয়স। বংশের বড়ো ছেলে হওয়ায় বাপ-চাচাদের পারিবারিক ব্যবসায় সহজে জড়িয়ে যায়। তার বাপ-চাচারাও চাইত মারিদ তাদের ব্যবসাটা বুঝুক, শিখুক। পড়াশোনা করে তাদের বংশের কেউ অন্যের অধীনে চাকরি-বাকরি করার মন-মানসিকতা নেই। সৈয়দ বংশের নাম-ডাক সবসময় বজায় থাকুক, এজন্য মারিদের বাপ-চাচারাও মারিদকে ব্যবসায়িক কাজে ছোট থেকে শেখানোর চেষ্টা করত। মারিদ যখন সিক্সে পড়ত, তখন থেকেই মারিদকে নিয়ে তাদের পারিবারিক সব ব্যবসায়িক আড়তে যেত তার বাপ-চাচারা। প্রথমে তাকে দিয়ে ব্যবসায়িক ছোট ছোট হিসাব করাত। তারপর বড়ো বড়ো মোটা অঙ্কের টাকার হিসাবের দায়িত্ব পড়ত মারিদের কাঁধে। ম্যানেজার আগে থেকে হিসাব কষে রাখলেও মারিদের বাপ-চাচারা মারিদকে দিয়ে পুনরায় সেই একই হিসাব করাত, শুধু তাকে ব্যবসায়িক লাইনটা শেখানোর জন্য। এভাবেই মারিদ তাদের পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে তার যখন চৌদ্দ বছর বয়স তখন থেকে।

তারপর কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দ্বিতীয় বছর থেকে সে তাদের পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি নিজের একটা আলাদা ব্যবসা দাঁড় করাল। সেখানেও অবশ্য তার বাপ-চাচারা ব্যাপক সাহায্য করেছিল। ততদিনে মারিদও একজন দক্ষ ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছিল, সেজন্য খুব সহজে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তার ব্যবসাটাও সফলতার সাথে দাঁড় করিয়ে ফেলল। তারপর থেকে মারিদকে কখনো পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক ব্যবসার টাকা দিয়ে আরেকটা ব্যবসা বাড়িয়েছে। বলতে গেলে আজ সে অত্র এলাকার সফল ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন।

তার মতো একজন দক্ষ ব্যবসায়ী হয়ে অচেনা অজানা একটা ফোন কলে আটকে দিন-রাত এক করে যখন তখন কথা বলাটা, সত্যি বোকামি। এই যে সে সারাদিন কত ব্যস্ত ছিল। ক্লান্তিতে তার শরীরটা ছেড়ে দিচ্ছে একটু বিশ্রাম নিতে কিংবা ঘুমানোর জন্য। এত ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও মারিদের ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না, শুধু তার মন আটকে আছে এই অচেনা মানুষটার ফোন কলের জন্য। সত্যি বলতে, মারিদও বিশ্বাস করে, দুনিয়াতে মানুষ সবচেয়ে বেশি কথার মায়ায় জড়ায়। কথা থেকে সবকিছুর শুরু কিংবা শেষ হয়। এই যে মারিদের মতো একজন শক্ত মানসিকতার ছেলেও অচেনা একজনের কথার মায়ায় জড়িয়ে রাতের ঘুম নষ্ট করে রাত জাগা পাখি হয়ে কথা বলছে।

অথচ সকাল সাতটার দিকেই তার কনস্ট্রাকশনের সাইটে যেতে হবে কাজের গতি দেখতে। বছর খানেক সময় হলো সে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেছে। জমি কিনে সেখানে বড় বড় ভবনের প্রজেক্ট তৈরি করছে। ভবন নির্মাণের শেষে সেগুলো ফ্ল্যাট হিসেবে বিক্রি করবে। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে তার কানে খবর এসেছে কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে রড-সিমেন্টের বস্তা চুরি হচ্ছে। আর সেটার তদারকি করতে মারিদের ম্যানেজারসহ পুলিশ নিয়ে যাওয়ার কথা। অথচ মারিদ এত রাত অবধি জেগে আছে যে সকালে ঠিক সময়ে উঠতে পারবে কিনা তাও জানা নেই। আবার ফোনটা কেটে দিতেও ইচ্ছা করছে না তার। মারিদের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার মাঝেই তক্ষুনি শোনা গেল ফোনের ওপাশের মেয়েলি কণ্ঠস্বর। মেয়েটি বেশ দৃঢ়ভাবে বলতে লাগল…

‘আপনি আমার দেখা এক চমৎকার ব্যক্তিত্বের পুরুষ ব্যবসায়িক সাহেব। আমার চোখে সব পুরুষ চমৎকার ব্যক্তিত্বের নয়। কিছু পুরুষকে আমি ভীষণ ঘৃণা করি। তবে আপনার জায়গাটা আমার জীবনে অন্যতম। আপনাকে আমি ভীষণ সম্মান করি। আমার জীবনের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম পুরুষ আপনি।

মেয়েটির কথায় মারিদ কোতুহল নিয়ে জানতে চেয়ে বলল…

‘ আর প্রথমটা কে?’

‘আমার বাবা।

কোনো মেয়ের জীবনে তার বাবার পরের স্থান নেওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। সব মেয়েরাই তার বাবার রাজকন্যা হয়। একজন বাবা তার মেয়েকে যতটা আদর আর সম্মানে রাখে, সেটা হয়তো দ্বিতীয় কোনো পুরুষ পারে না। আর যে পুরুষগুলো সেটা করতে পারে, তখন মারিদের মতো করে তাদেরও হয়তো ঠিক একই আসনে বসানো হয় শ্রেষ্ঠ পুরুষের জায়গায়। মারিদ কথাগুলো শুনে বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে ধীরস্থিরভাবে বলল…

‘এত সম্মান যে দিচ্ছেন, পরে হারিয়ে যাবেন নাতো?’

‘আপনি রেখে দিতে পারলে আমি থেকে যেতে পারি।’

‘আমি কিন্তু খুব জেদি মানুষ। ভেবেচিন্তে উত্তর দিয়েন। আমি রেখে দিলে ছেড়ে যাওয়ার অপশন পাবেন না কিন্তু।’

‘ভয় দেখাচ্ছেন?’

‘উহু! সত্যিটা জানাচ্ছি। আমাকে দেখতে সহজ-সরল দেখালেও আমি কিন্তু হারামি টাইপের মানুষ। আমাকে কেউ এক আঙুল দেখালে আমি তাকে দশ আঙুল দেখাই। আপনি যদি ভাবেন আমাকে পাগল বানিয়ে বসন্তের অতিথি পাখি হয়ে হারিয়ে যাবেন, তাহলে বলব, আপনি ভুল ধারণা নিয়ে আছেন।
আমি তুলসী পাতা নই, তামাক পাতা। আমাকে যত জ্বালাবেন, তত আপনি নিজেও পুড়বেন, মিস।

মারিদের কথায় মেয়েলি কণ্ঠে রিনরিনিয়ে হাসির শব্দ শোনা গেল। মেয়েটি মজার ছলে বলল…

‘আপনাকে জ্বালানোর জন্য হলেও একবার হারিয়ে যেতে হবে দেখছি ।’

মেয়েটির কথাগুলো কেমন পছন্দ হলো না মারিদের। খানিকটা অসন্তুষ্ট হয়ে জেদি গলায় মারিদ বলল…

‘এই কাজ ভুলেও করবেন না, মিস। আমি কিন্তু ভালো মানুষ না।’

মারিদকে রেগে যেতে দেখে মেয়েটি ফের হাসল। মিষ্টি স্বরে বলল…

‘আপনি রাগও করতে পারেন?’

মারিদ হাঁটতে হাঁটতে ছাদের কোণায় দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল…

‘আমি অনেক কিছুই করতে পারি, মিস। সামনে এলে বুঝতে পারবেন। এখন বলেন, আপনি সামনে আসবেন কবে? কবে নিজের পরিচয় দেবেন?’

মারিদ পরিচয় জানতে চাইলে ফোনের ওপাশের মেয়েটি একই ভাবে বলল…

‘ আমি তো আপনাকে চিনি তাহলে আর কি চাই?

মেয়েটির কথায় মারিদ সেইভাবে উত্তর দিয়ে বলল…

‘ আপনার একা চিনলে তো হবে না মিস। আমারও তো আপনাকে চিনতে হবে তাই না? আমরা তিনমাস যাবত কথা বলছি অথচ আমি এখনো আপনার নামটা জানি না। আপনার ফ্যান্টাসি জন্য এইভাবে আর কতদিন অপরিচিত হয়ে থাকব? এবার অন্তত আপনার উচিত আমাকে পরিচয়টা দিয়ে দেওয়ার।

‘ পরিচয় দিয়ে দিলে তো আমরা আর অপরিচিত কেউ থাকব না,পরিচিত হয়ে যাব। তখন আপনার মাঝে আমাকে নিয়ে আর এত ফ্যান্টাসি কাজ করবে না। সেজন্য আমি চাই আপনার অপরিচিত কেউ হয়ে থাকতে। প্লিজ থাকুন না এইভাবে। আমার আপনার সাথে অপরিচিত হয়ে কথা বলতে ভালো লাগে।

মেয়েটির মিষ্টি স্বরের অনুরোধে মারিদ নরম সুরে আবদার জানিয়ে বলল…

‘ তাহলে আপনার আমার জীবনে অপরিচিত হয়ে থাকার সময়সীমা বেঁধে দিন, মিস। আমার ধৈর্য মনে হয় দিন দিন কমে আসছে। আজকাল আমার ভাবনা জুড়ে আপনার বিচরণ হয়। তাই আমি চাচ্ছি আমরা পরিচিত হতে। সম্পর্কে ফ্যান্টাসি কমে গেলেও কিন্তু সম্পর্কের সুন্দর একটা নাম থাকবে, মিস।

মারিদের কথায় মেয়েটিও তৎক্ষনাৎ সম্মতি জানিয়ে বলল…

‘ঠিক আছে! তাহলে খুব শীঘ্রই আমরা পরিচিত হব। শুধু নামের নয়, মানুষটারও সাক্ষাৎ হবে।

‘অপেক্ষায় রইলাম, মিস।

তারপর দুজন নিশ্চুপ। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে মেয়েটি আবার বলল..

‘আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি?’
‘জি।’

মারিদের সম্মতিতে মেয়েটিকে রয়েসয়ে বলতে লাগল…

‘ প্রশ্নটা একটু অদ্ভুত শোনাতে পারে তারপরও ধরুন, আপনার ভাবনা অনুযায়ী আমাকে বাস্তবে মিল পেলেন না। বাস্তবে আমি মানুষটা খুব কুৎসিত এবং কালো, তখন কী করবেন? চেহারা দেখে অবহেলায় ছুড়ে ফেলবেন, নাকি আগলে নেবেন কোনটা?’

ফোনের ওপাশের মেয়েলি কণ্ঠের কথাগুলো বেশ অদ্ভুত লাগল মারিদের কাছে…

‘আপনার কথাগুলো এখন টিনএজারের মতো শোনাচ্ছে, মিস অপরিচিতা।’

মারিদের কথায় ফোনের ওপাশের মেয়েলি কন্ঠে কেমন নমনীয়তা আর উদাসীনতা শোনা গেল। মেয়েটি উদাস গলায় বলল…

‘আমি তো টিনএজারই। এবং খুব কুৎসিত, কালো একটা মেয়ে। কালো বলে আপনিও অবহেলা করবেন না তো পরে?

মারিদ ছাদের রেলিংয়ে কোমর ঠেকিয়ে তাকাল দূর আকাশে। শেষ রাতের স্নিগ্ধ ফুরফুরে বাতাসে শরীর ঠান্ডা হয়ে এসেছে। মারিদ শীতল কণ্ঠে উত্তর দিয়ে বলল…

‘আমি ব্যবসায়িক মানুষ হতে পারি, হয়তো হিসাবে বেশ দক্ষ। তবে আপনাকে নিয়ে কখনো এতটা গভীরে ভাবিনি। ব্যক্তি হিসেবে আমার আপনার সঙ্গ ভালো লাগে, তাই কথা বলি। এবার আপনি মোটা নাকি কালো, বেঁটে নাকি লম্বা, সেটা ভেবে কখনো কথা বলিনি। তাই আমার কাছে ব্যক্তি হিসাবে আপনি ম্যাটার করেন, আপনার বাহ্যিক চাকচিক্য নয়।

মারিদের কথায় ফোনের ওপাশের মেয়েটি মারিদের হাইট জানতে চেয়ে বলল…

‘আচ্ছা, আপনার হাইট কত?’

‘ছয় ফিট এক ইঞ্চি।’
‘আমার পাঁচ ফিট দুই ইঞ্চি।’

মেয়েটির কথায় মারিদ সাবলীল গলায় শুধাল…

‘আপনি মনে হয় আমার বুক বরাবর হবেন, রাইট?’

‘হতে পারি। তবে আপনার থেকে আমাকে হাইটে অনেক ছোট দেখাবে।’

মারিদ কথায় কথায় চট করে বলে ফেলল…

‘ ছোট দেখালে সমস্যা নেই। বরং আমার ছোট বউই পছন্দ। আমার বুকে মাথা পেতে চট করে মনের কথাগুলো পড়তে পারবেন আপনি।’

মারিদের কথায় যেন ফোনের ওপাশের মেয়েটি বেশ অবাক হলো। হতবাক কণ্ঠে মেয়েটি তৎক্ষনাৎ মারিদকে শুধাল…
‘ বউ??

মারিদ বুঝল সে আবারও কথায় কথায় ভুল কিছু বলে ফেলেছে। সম্পর্কে জড়ানোর আগেই মেয়েটিকে তার বউয়ের জায়গায় দিয়ে ফেলেছে বিষয়টি বুঝতে পেরে সে অস্বস্তি বোধ করল। গুমোট পরিবেশে সে আবারও বিড়বিড় করে বলল, ‘শিট! এগেইন।’

এমন নয় যে মারিদ নিজে থেকে এসব বলে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে দুজনের জন্য। বরং মারিদের ধারণা অনুযায়ী, যেখানে অনুভূতি তীব্র হয়, সেখানে এমন টুকটাক ভুল কিছু এমনিতেই নিজ সম্মোধনে বেরিয়ে আসে। ফোনের ওপাশের মানুষটি তাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই তার ভিতরকার সত্তায় উতলা বাতাস বইছে। সেই বাতাসের জোয়ারে সে এসব ভুলভাল বলছে। নয়তো তার ত্রিশ বছর বয়সে এমন ঘটনা বিরল। সে খুবই স্ট্রিক্ট একটা মানুষ। পড়াশোনা আর কর্ম নিয়ে এতটাই ব্যস্ততা ছিল যে তার কখনো মনে হয়নি তার কাউকে প্রয়োজন। নিয়মিত পড়াশোনা সে ঐ এসএসসি পাস পর্যন্ত করেছিল। তারপর সে নিয়মিত ছিল না পড়াশোনায়। বন্ধুদের থেকে নোট সংগ্রহ করে রাতে পড়ত আর দিনে ব্যবসায়িক কাজে দৌড়াদৌড়ি করত বলে সে কখনো কলেজ কিংবা ভার্সিটিতে নিয়মিত ক্লাস করত না। শুধু পরীক্ষার আগে ঐ কয়েদিন ক্লাস করত। যার জন্য মারিদের কখনো তার ক্লাসমেট কিংবা সিনিয়র-জুনিয়র কারও সঙ্গে তার প্রেম-নিবেদন হয়নি। তাই মারিদের জানা নেই প্রেমেময় অনুভূতি কেমন হয়। কিন্তু হঠাৎ এই আগস্তিকের আগমনে মারিদের মনে হুট করেই যেন তার অজান্তে বসন্ত চলে এসেছে। আর সেই বসন্তের তোড়ে সে এখন ভুলভাল বলে বেড়ায়। এটা অবশ্য তার দোষ নয়। দোষী যদি কেউ হয়, তাহলে ফোনের ওপাশের মানুষটা হবে। তাকে এই অবস্থানে দাঁড় করানোর জন্য সে দায়ী। নয়তো মারিদ একজন শুদ্ধতম পুরুষ হিসেবে পরিচিত।

থমথমে পরিবেশে দুজনই নিশ্চুপ রইল কিছুটা সময়। নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠে রিনরিনিয়ে আবদার করে বলল…

‘আচ্ছা, আমি একটা আবদার করলে রাখবেন?
‘ বলুন।

‘ আমি যদি আপনাকে নিয়ে কখনো চিঠি লিখি, তাহলে আপনি আমার চিঠির উত্তর দেবেন?

মারিদ পাল্টা প্রশ্ন করে বলল…
‘হঠাৎ চিঠি কেন? ফোনে আর কথা বলবেন না?

‘ বলব।
‘ তাহলে?

‘ আসলে আমার না নব্বই দশকের কাহিনিগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং লাগে। তখন মানুষের হাতে এত ফোনের প্রচলন ছিল না, আর না তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল। তখন মানুষ যোগাযোগ করতে চিঠি নিবেদন করত। মানুষের চিঠি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছাতে দিন, সপ্তাহ, এমনকি মাসও সময় লাগত। তারপরও তখন মানুষ একটা চিঠির উত্তরের আশায় অধীর আগ্রহে বসে থাকত, কখন তার ডাক-প্রিয়র চিঠি আসবে বলে। আমার আমি বলতে আপনি ছাড়া কেউ নেই, ব্যবসায়িক সাহেব। হোক ক্ষণিকের জন্য, তারপরও আমি চাইব আমার বেনামি সব চিঠিগুলো আপনার নামে লিখতে। এখন আপনি বলুন? হবেন আমার ডাক-প্রিয়র চিঠির মাধ্যম?

মেয়েটির কথায় মারিদও সেইভাবে উত্তর দিয়ে বলল…

‘চিঠির মানুষটা যদি আপনি হন, তাহলে ডাক-প্রিয়র চিঠি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হবে, মিস বসন্তের পাখি।

মারিদের কথায় খুশি হয়ে চট করে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল মেয়েটি…
‘ধন্যবাদ।’
‘কেন?’
‘আমার ডাক-প্রিয়র হওয়ার জন্য।’
‘ সেটা তো অবশ্যই।

হঠাৎ কিছু মনে হওয়ায় তাড়াহুড়ো করে ফোনের ওপাশের মেয়েটি আবারও বলল…

‘ আচ্ছা আরেকটা কথা। আমাদের চিঠির কথাগুলো শুধু চিঠিতে সীমাবদ্ধ রাখবেন কিন্তু। চিঠির কোনো কথা আপনি ফোনে বলতে পারবেন না। যদি বলেন, তাহলে চিঠি লিখে মজা পাব না আমি। তাই চিঠির কথাগুলো শুধু চিঠিতে থাকবে আর ফোনের কথা ফোনে। দুটো বিষয় কখনো একত্রে করবেন না, মনে থাকবে?’

‘জি’ মহারানি, যথা আজ্ঞা।’ তা আপনার চিঠি পাচ্ছি কবে? আমার কোন ঠিকানায় চিঠি পাঠাবেন?

মেয়েটি সুন্দর হেসে বেশ স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে মারিদকে জানাল—

‘পাঠাব! পাঠাব! কোনো একদিন, কোনো একভাবে ঠিক পৌঁছে যাবে চিঠি আপনার কাছে। মিলিয়ে নিয়েন।’

মেয়েটির কথায় মারিদও সেইভাবে দুষ্টু স্বরে বলল—

‘হ্যান্ড রাইটিং সুন্দর না হলে আমি কিন্তু চিঠির উত্তর দেব না, মিস বসন্তের পাখি।’

‘ঘোড়ার ডিম!

তারপর দুজনের হাসির শব্দ শোনা গেল। শেষ রাতের শীতল বাতাসের তোড়ে ভেসে বেড়াল নতুন প্রেমের গন্ধ। সে রাতে মারিদকে আর ঘুমাতে দেখা যায়নি। বরং সারারাত ফোনালাপের পর সকালের দিকে বেরিয়েছিল কনস্ট্রাকশন সাইটে।

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply