ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকা:রিক্তাইসলাম মায়া
২২
থানচি গ্রামটা মূলত পাহাড়ি অঞ্চল। আর পাহাড়ি অঞ্চলে শীতে প্রকোপ বেশি। ঘন কুয়াশার চাদরে রাস্তাঘাট, গাছগাছালি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ঘন কুয়াশার শিশির বিন্দুর বৃষ্টি হচ্ছে। রাত তখন সাতটা পনেরো। চারদিকে এশার আযান শোনা যাচ্ছে। সিকদার বাড়ির পদ্মা, মেঘনা, যমুনা আর কাঠগোলাপ চারটে ঘরের বারান্দায় চারটে লাইট, মাঝ উঠোনে একটা আর কলপাড়ে একটা বৈদ্যুতিক লাইট জ্বালিয়েও ঘন কুয়াশায় ঝাপসা দেখা যাচ্ছে চারপাশ।
মারিদরা থাকছে সিকদার বাড়ির পূর্বদিকে থাকা কাঠগোলাপের ঘরটায়। টিনশেডের ঘরটায় লম্বায় তিনটা রুম। সামনে একটা খোলা বারান্দা। মারিদ মাঝের রুমটায় থাকে। মারিদের দুপাশে দুটো রুমে রাদিল আর হাসিব থাকছে। এর আগের বার মারিদ যখন সিকদার বাড়িতে এসেছিল তখন রিফাতের জন্য তিনজনকে একত্রে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু এবার মারিদ হাসান সিকদারের পরিবারের সঙ্গে বেশ অনেকটা মিশে গেছে। সিকদার বাড়ির পরিবেশটাও ঠিকঠাক বুঝে উঠতে একটু সময় নিচ্ছে, তবে খুব দ্রুত মারিদ সিকদার বাড়ির সব জটিলতাও বুঝে যাবে।
মারিদ এই শীতেও গোসল করে এসেছে। মাথার চুল হালকা ভেজা। গায়ে মেরুন রঙের একটা মোটা হুডি পরেছে। হাতে ফোন, কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। থানচিতে একটাই সমস্যা—সহজে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। মারিদ হাতের ফোনটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়াল। টিনের ঘর হওয়ায় শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। মারিদ যে ঘরটায় থাকে সে রুমে একটা খাট, ড্রেসিং টেবিল, কাপড়ের আলনা, আর দুজন বসা যায় এমন একটা সোফা রাখা আছে। পড়ার একটা টেবিলও আছে। সেই টেবিলের উপর বই না থাকলেও সেটা আপাতত মারিদ, রাদিল আর হাসিব তিনজনের কাপড়ের ব্যাগ রাখার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। মারিদ নিজের কাপড়ের ব্যাগটা খুলে সেখান থেকে একটা পেইন কিলার ঔষধ বের করে মুখে নিল। পাশে থাকা পানির জগ থেকে পানি ঢেলে পান করতেই রাদিল ঘরে ঢুকল হাসিবকে নিয়ে। রাদিল এতক্ষণ হাসান আর মাজিদের ব্যান্ডেজ করে এসেছে। মারিদের মাথা ব্যথা করছিল বলে সে বাড়িতে ফিরে গোসল করে রুমে বসে ছিল। রাদিল ঘরে ঢুকে মারিদকে ঔষধ খেতে দেখে প্রশ্ন করল—
‘তোর মাথা ব্যথা কমেছে?
‘না।
‘তুই কি কিছু নিয়ে চিন্তিত মারিদ?
মারিদের হঠাৎ মাথা ব্যথার উৎস খুঁজতে রাদিল প্রশ্নটা করল। মারিদ অসুস্থ সেটা রাদিল সকালেই লক্ষ করেছিল। হয়তো এখানকার আবহাওয়া কিংবা পানি মারিদকে স্যুট করছে না বলেই জ্বর আর মাথা ব্যথা করছে। কিন্তু রাদিলের মনে হচ্ছে মারিদ অসুস্থতার বাইরেও কোনো কিছু নিয়ে বেশ চিন্তিত। মারিদ সংক্ষিপ্তে উত্তর দিল—
‘না।
‘তাহলে বিকালে যে লোকটা হাসান সাহেব ও উনার ছেলেকে মারল, তোর শার্টের কলার ধরে শাসাল—তুই কিছু বললি না কেন? তুই তো এতো শান্ত ছেলে নোস। তুই চাইলেই অনেক কিছু করতে পারতি, তোর সেই ক্ষমতা ছিল। তাহলে চুপ করে ছিলি কেন?
মারিদ ঔষধটা খেয়ে পুনরায় বিছানায় গিয়ে বসল। হাসিবকে বলল—
‘দরজাটা লাগিয়ে দে হাসিব। ঠান্ডা হাওয়া আসছে।
হাসিব দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে সোফায় বসল। সেও রাদিলের মতো করে জানতে চায় কেন মারিদ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যের হাতে মার খেতে প্রস্তুত হয়ে গেল। মারিদ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল—
‘বাসায় কথা হয়েছে তোর? সবাই ভালো আছে?
মারিদকে প্রসঙ্গ পাল্টাতে দেখে রাদিল মারিদের বিছানার পাশে গিয়ে বসল। একটা বালিশ কোলে নিয়ে বলল—
‘ বাড়ির সবার সাথে কথা হয়েছে। বড় মামি তোর জন্য টেনশন করছিল, তবে আমি বলে দিয়েছি আমরা ভালো আছি। তোর জন্য চিন্তা না করতে। আমরা আর এক-দুই দিনের মধ্যে ঢাকায় ফিরে যাব বলেছি।
‘রিফাত তোকে কল দিয়েছিল?
‘ দিয়েছিল, তবে আমাদের খোঁজ নিতে না। হাসান সাহেবের ছোট মেয়ে নূরজাহানের খোঁজ নিতে। আমার মনে হয় কি জানিস মারিদ? তুই থানচিতে বিয়ে করতে না পারলেও রিফাতের বিয়ে কিন্তু কনফার্ম নূরজাহানের সাথে।
রাদিল কথাটা রসিকতা করে বলেছে। রিফাতের মন হুটহাট প্রেমে পড়ে যায়। সে প্রেমিক পুরুষ। তবে নূরজাহানের প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতোই মেয়ে। কিন্তু নূরজাহান মেয়েটা কেমন শান্ত আর গভীর। নূরজাহানকে হঠাৎ দেখে বর্ণনা করা যাবে না সে কতটা গভীর। রাদিল ফের বলল—
‘আচ্ছা মারিদ, তোর কাছে হাসান সাহেবের ছোট মেয়ে নূরজাহানকে অদ্ভুত লাগে না? নূরজাহান দেখতে শান্তশিষ্ট কিন্তু নূরজাহানের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় এই মেয়ে সাগরের চেয়েও গভীর আর রহস্যময়ী। বিষয়টা তুই লক্ষ করেছিস?
মারিদ ফের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে বলল….
‘ করেছি।
রাদিল ফের বলল…
‘ আজকে আমাদের ওপর আক্রমণ করা মানিক সওদাগর লোকটা নাকি নূরজাহানের জন্য পাগল। এজন্য বিকালে এতো তামাশা করেছিল সাইকোদের মতো। আচ্ছা ধর মারিদ, যদি আশনূরের জায়গায় নূরজাহান তোর অপরিচিতা হতো, তাহলে তুই কী করতি নূরজাহানের জন্য?
‘ মানিক সওদাগর পাখনা কেটে খাঁচায় বন্দী করে রাখতাম।
‘তাহলে বিকালে চুপ ছিলি কেন?
মারিদ পিঠের পিছনে একটা বালিশ রেখে আরাম করে বসে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল—
‘ আমি এখানে কেন এসেছি আমি সেটা ভুলিনি রাদিল। আমার ছোট একটা ভুলও আমাকে আমার অপরিচিতা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। আজ আমি যদি রক্ত গরম করে হাসান সিকদারের সামনে মানিক সওদাগরের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তাম, তাহলে তখন হয়তো হাসান সিকদার আমার পক্ষে কথা বলতেন, কিন্তু বাড়ি ফিরেই তিনি আমাকে বলতেন থানচি জেলা ছেড়ে চলে যেতে। মানিক সওদাগর ভালো লোক না, আমাকে মেরে ফেলতে পারে কিংবা আরও কোনো অজুহাত দেখাতেন হাসান সাহেব। কিন্তু আমি তখন চুপ থাকায় হাসান সাহেব মনে করছেন মানিক সওদাগর লোকটা উনাদের সঙ্গে পারিবারিক রেষারেষির জন্য হাসপাতালে প্রজেক্টে বাধা দিচ্ছে, এখানে আমি নিষ্পাপ। আর আমি উনার চোখে নিষ্পাপ বলেই আমি বারবার থানচি জেলায় হাসান সাহেবের বাড়িতে আসার সুযোগটা পাব। এই মুহূর্তে আমি যদি কারো হাতে মার খেয়েও অপরিচিতাকে হাসিল করতে পারি, তাহলে আমি জীবনে অনেক সময় পাব এমন মানিক সওদাগরকে ঠিকানায় লাগানোর। যেকোনো মূল্যে আমার অপরিচিতাকে চাই রাদিল। অপরিচিতাকে না পাওয়া অবধি আমি কারও সাথে ঝামেলায় জড়াব না। অনেকটা অপেক্ষার পর আজকের এই জায়গায় আমি পৌঁছেছি রাদিল, বোকামি করে হারাতে চাই না।
মারিদের কথায় রাদিল যুক্তি খুঁজে পেল। কত চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজি পর অবশেষে অপরিচিতার খোঁজ মারিদ এখানে এসে পেল। হাসান সিকদার মারিদকে সৎ ও নিষ্পাপ ছেলে মনে করেন। এখন কোনো কারণে যদি মারিদ মানিকের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে যায় তাহলে অবশ্যই হাসান সাহেবের চিন্তাভাবনা মারিদের ওপর বদলাবে। এবার এটা ভালো হতে পারে আবার খারাপও। সেজন্য মূলত মারিদ রিস্ক নিতে চাচ্ছে না। রাদিল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলল…
‘ আমার মনে হয় মানিক সওদাগর লোকটা গ্রামবাসীকে হাসান সাহেবের পরিবারের বিরুদ্ধে বিষিয়ে রেখেছে। নয়তো অকারণে গ্রামের মানুষজন কেন হাসান সাহেবের পরিবারকে অপছন্দ করবে। আমি তো কারণ দেখছি না অপছন্দ করার মতো। বরং আমার যতটুকু মনে হচ্ছে হাসান সাহেবের পরিবারের মানুষগুলো বেশ আন্তরিক। হাসান সাহেবও সৎ লোক। গ্রামবাসীর উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করেন।
মারিদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। রাদিলের কথায় তাল মিলিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল…
‘ আমার মনে হয়, এই বাড়ির মানুষগুলো কোথাও একটা আটকে আছে। হয়তো কারো চক্রে নয়তো ষড়যন্ত্রে। বেরোনোর পথ পাচ্ছে না তারা।
মারিদের কথায় রাদিলেরও তাই মনে হলো। পরিস্থিতি তো তাই মনে হচ্ছে। রাদিল আর কথা বাড়াল না। নয়টার দিকে মান্না এসে বলল সবাইকে ওই ঘরে খেতে যেতে। ডাইনিং টেবিলে মারিদ, রাদিল, হাসিব, হাসান, মাজিদ, নুহাশ, তারানূর বেগমসহ সাতজন গোল করে বসল। শাহান দুবার এসে সবার খাওয়ার সবকিছু আছে কি না তিনি তদারকি করে গেছেন। মান্নাকেও ডাইনিংয়ের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কারো কিছু প্রয়োজন হয় কি না দেখতে। নদী, শেফালী রান্নাঘরে; আলেহা নূরজাহানের ঘরে। আশনূর ভাতঘরে তুতলকে ভাত খাওয়াচ্ছে। নীরবতা ভেঙে মারিদ বলল—
‘আজকের লোকগুলো কারা ছিল আঙ্কেল?
হাসান, মাজিদ, তারানূর বেগমের মুখে মানিক সওদাগর সম্পর্কে বেশ কিছু শুনেছে মারিদ। সন্ধ্যায় যখন রক্তারক্তি অবস্থায় হাসান-মাজিদ বাড়িতে ফিরেছিলেন, তখন আহাজারি করে তারানূর বেগম মানিক সওদাগর ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে অভিশাপ দিচ্ছিল। তখন মারিদ কিছু বলেনি কারণ সে সময় নিয়ে এই ব্যাপারে হাসান সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। সুযোগ পেয়ে মারিদ এখন আবার কথাটা তুলল। হাসান সাহেব খাওয়ার মাঝেই ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে বলতে
লাগল—
‘ আমাগো গেরামে চেয়ারম্যানের বড়ো পোলা মানিক সওদাগর। এই গেরামে জমিদারি বংশ হেগোর। হেরলাইগা আদিকাল থেইক্কাই এই গেরামের উপর হেরাগোর মাতব্বরি চলে। এলাইগা জোর খাটাইয়া আপনাগোর হাসপাতাল বানানোর কামে বাঁধা দিতাছে।
‘এটা ২০১৫ সাল আঙ্কেল। এখন যুগ বদলেছে। মানুষ একত্ববাদী শাসনে আটকে নেই। এই গ্রামের চেয়ারম্যান জমিদার বংশের হলেও অন্যায়ভাবে জুলুম এখন চলে না। দেশে আইন আছে। আর আইনে অন্যায়কারীর সর্বোচ্চ বিচার হয়।
দেশের আইন ব্যবস্থা কথা শোনে হাসান দ্বিগুণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল…
‘দেশের আইন-আদালতের বিচার ইডিসব এই গেরামের বাইরে চলে ভিতরে তো মানিক সওদাগরের হুকুম চলে। এই গেরামে থাকতে হইলে চেয়ারম্যান হকুম মতেই চলতে হইব হুগলের। আমি আইজকের থেইক্কা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধতা করতাছি না বাজান, হেই জন্মের পর থেইক্কাই করতাছি কিন্তু কিচ্ছুই করবার পারি নাই। আইন-আদালত কোর্ট-কাচারি কিচ্ছুই চেয়ারম্যানের শাসন ঠেকাতে পারে নাই। এই গেরাম চেয়ারম্যানের দখলে, এইখানে কিচ্ছুই চেয়ারম্যানের অমতে হয় না। আমার ঘরের মানুষ এমনেই হাতে অস্ত্র নিয়া ঘুরে না বাজান। আমাগোর পিঠ দেয়ালে ঠেইকা যাওনের কারণে আমরা বাধ্য হইয়া হাতে অস্ত্র নিছি।
মারিদ খাওয়া ছেড়ে কপাল কুঁচকে তাকাল। সামান্য মানিক সওদাগরকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না বিষয়টা আশ্চর্য লাগল মারিদের। মারিদ বলল…
‘ আপনারা থানা পুলিশের সাহায্য নিচ্ছেন না কেন আঙ্কেল? চেয়ারম্যান পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করলে পুলিশ আপনাদের সাহায্য করবে। দেশের আইন এখন উন্নত হয়েছে। অপরাধীর ক্ষমতা যত বড়ই হোক না কেন আইন কাউকে ছাড় দেয়না।
থানচি জেলার কোনো থানায় সওদাগর পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা নেয় না। গ্রামবাসী যারা মামলা করতে যায় তাদের নামে উল্টো তিন চারটে মিথ্যা মামলা বানিয়ে ভয় দেখানো হয়। গ্রামের মানুষ সওদাগর পরিবারের ভয়ে চুপ করে সবকিছু সহ্য করে নেয়। মারিদ, রাদিল, হাসিব এই গ্রামে নতুন হওয়ায় তারা ব্যাপারটা জানে না। হাসান তাচ্ছিল্যভরে বলল—
‘মামলা? আর থানা পুলিশ? ইডিসব তো আমাগোর লাইগা না বাজান। কত শত মামলা লইয়া গেছি থানায়, সাহায্য চাইছি, পুলিশের পায়ে ধরছি—কেউ আমাগোর মামলা নেয় নাই চেয়ারম্যান পরিবারের বিরুদ্ধে। উল্টো থানায় গেলে আমাগোর নামে চার-পাঁচটা মিথ্যা মামলা জড়িয়ে দেয় থানার ঘুষখোর পুলিশরা। থানচি জেলার পুলিশ সুপার, পুলিশ কমিশনার, জেলার মন্ত্রী—সবই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, জমিদার বংশের। এলাইগা থানার পুলিশরা কেউ চেয়ারম্যান পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো মামলা লই না। গেরামে কোনো মানুষ যদি থানায় মামলা লইয়া যাইও তাইলে প্রথমে পুলিশ সুপার, হেরপর পুলিশ কমিশনার সবশেষে জেলার মন্ত্রীর একটা কইরা ফোন আসে থানায়, হেরপর দেহোন যাই সব মামলা ঘুইরা আমাগোর মতো সাধারণ মানুষের উপরে চইলা আসে। এলাইগা গেরামের মানুষ নিজের জীবন বাঁচাইতে সব সহ্য কইরা লই। কিচ্ছু করার নাই।
সব শোনে মারিদ বলল…
‘আমাকে বিশ্বাস করেন আঙ্কেল?
‘করি বল্লাইয়াই তো তোমারে আমি নিজের বাইত্তে জাগা দিছি। তয় চেয়ারম্যানের বড় পোলা মানিক ভালা মানুষ না বাজান, হেই একডা কুত্তার জাত। হেই তোমাগোরে এই গেরামের হাসপাতাল বানাইতে দিব না। চিন্তায় আছি তোমাগোর উপরে আবার হামলা কইরা না বসে।
‘আপনি যদি চান তাহলে আমি চেয়ারম্যান পরিবারের বিষয়টা পারসোনালি দেখতে পারি আঙ্কেল। আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন, খুব ভালোভাবেই চেয়ারম্যানের পরিবারকে দেখব, নিরাশ হবেন না।
হাসান মারিদের কথাটা গুরুত্ব দিলেন না। সে ভাবল মারিদ সরকারি লোক, তার ক্ষমতা যতটুকুই থাকুক অন্তত মানিক সওদাগরকে টেক্কা দেওয়ার মতো ক্ষমতা মারিদের নেই। যেখানে জেলার মন্ত্রী মানিক সওদাগরের আপন মামা হয়, সেখানে দুই-চারটে মারিদের মতো সরকারি লোককে এমনিই চাকরিচ্যুত করে দিতে পারে। তিনি চান না উনাদের জন্য মারিদ চাকরিচ্যুত হোক। মারিদ ছেলেটাকে উনার বেশ ভালো লাগে—সভ্য, শান্ত আর ভদ্র। অযথা উনাদের জন্য ঝামেলায় জড়িয়ে নিজেকে বিপদে ফেলবে। তাছাড়া মারিদ আর তার বোন একবার নূরজাহানের জীবন বাঁচিয়েছিল, তিনি সেই ব্যাপারটায় অনেক ঋণী। ছেলেটাকে মানিক সওদাগরের বিরুদ্ধে উসকে বিপদে ফেলতে চান না। হাসান সিকদার ভারি নিশ্বাসে বললেন—
‘আল্লাহ আমাগোর একদিন সহায় হইব বাজান। তুই এই ঝামেলায় পইড়ো না। মানিক পোলাটা ভালা না। হের মানুষ খুন করার মতো বদনাম আছে। হেই নিজের স্বার্থের লাইগা নিজের বউ আর দুই বছরের পোলারে জেন্দা মাটি দিসে—হের লগে তুমি পারবা না বাজান। যার নিজের বউ আর পোলা লাইগা মায়া নাই, হের অন্য কারো জীবনের মায়া নাই। মানিক সওদাগর মানুষ না, অভিশাপ। তুমি বাজান এই অভিশাপ থেইক্কা দূরে থাকনই ভালা।
মারিদের তখনকার কথাটা মনে পড়ল রাদিলের। হাসান সাহেব মারিদকে নিষ্পাপ ভাবছেন; মারিদ যতদিন হাসান সিকদারের চোখে নিষ্পাপ থাকবে ততদিন সে অপরিচিতার খোঁজে হাসান সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় পাবে। মারিদ আর আগ বাড়িয়ে হাসানকে প্রশ্ন করল না—মানিক সওদাগর কি তাহলে নূরজাহানকে বিয়ে করার জন্যই নিজের স্ত্রী-সন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছিল আঙ্কেল? মারিদ প্রশ্নটা মনে চেপেই রাখল।
~~
নূরজাহানের বর্তমান বয়স বিশ বছর চার মাস। নূরজাহানের জন্ম হয়েছিল ১৯৯৫ সালের ২ নভেম্বর। নূরজাহানের মা আয়েশার একমাত্র সন্তানই ছিল নূরজাহান। নূরে জাহান নামটা আয়েশা রেখেছিলেন খুব শখ করে। নূরজাহানের জন্ম হয় শেষরাতে আর সেদিন সকাল এগারো কি বারোটার দিকে হাসানের বাবা ফজল সিকদার দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় বিদায় নিয়ে পরপারে চলে যান। মানুষ মৃত ফজলকে দেখতে এসে নবজাতক নূরজাহানকেও আশ্চর্য হয়ে দেখে যেত। কেউ কেউ তো বলত হাসানের দ্বিতীয় বউয়ের ঘরে আল্লাহ আসমানের পরী পাঠাইছেন। সাক্ষাত পরী। দেখতে ঠিক তারানূর বেগমের লাহান সুন্দরী আর মায়াবতী।
একদিকে ফজল সিকদারের মৃত্যু শোক, অন্যদিকে নূরজাহানের জন্মে এলাকাবাসী ভেঙে পড়ে সিকদার বাড়ির আঙিনায়। ফজল সিকদারের মৃতদেহের সঙ্গে নূরজাহানকেও দেখে যেত মানুষ একঝলক। সেই ভিড়ে মানুষগুলোর মাঝে কে বা কারা বলাবলি করল আয়েশার পরীর লাহান সুন্দর মাইয়াডা অপয়া, অলক্ষুণে হইছে; আয়েশার মাইয়া জন্ম হইতে না হইতেই ফজল সিকদারের মৃত্যু হইল। ছোট নবজাতক শিশুর জন্মদিনেই বদনাম রটে গেল অপয়া-অলক্ষুণে হিসেবে। যেন জন্ম থেকেই আয়েশার সদ্য নবজাতক শিশুর কপালে বদনাম লিখে এনেছে। তারানূর বেগম স্বামীর মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়ে চিৎকার করে হাসানকে বলেছিলেন আয়েশার নবজাতক শিশুটি অপয়া-অলক্ষুণে, শিশুটিকে যেন গলা টিপে হাসান মেরে ফেলে। সেদিন তৃতীয়বারের মতো আয়েশা রামদা হাতে আঁতুরঘর থেকে বেরিয়েছিলেন দুর্বল শরীরে। আয়েশার ঘরটা ছিল বর্তমানের কাঠগোলাপের ঘরটা। হাসানের দ্বিতীয় বউ হিসেবে আয়েশার সেখানে জায়গা হয়েছিল। ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আয়েশা রামদা হাতে এলাকাবাসী, হাসানের আত্মীয়স্বজন, তারানূর সকলকে একত্রে শাসিয়ে বলেছিল—
‘যদি আর কেউ আমার নবজাতক শিশুকে মেরে ফেলার কথা বলে, তাহলে তাদের সামনে আমি আয়েশা সিদ্দিক দাঁড়িয়ে আছি। আজ এই বাড়িতে একটা নয়, একাধিক লাশের বন্যা বয়ে যাবে। আল্লাহর কসম আমি কাউকে ছাড় দেব না।
আয়েশার হুংকারে সেদিন সবাই ভয় পেয়েছিল। আয়েশা সদ্য জন্মানো শিশুকে নিয়ে আর কেউ টু শব্দ করতে পারেনি। নূরজাহানের মা আয়েশা সিদ্দিক ছিল অত্যন্ত সাহসী একটা মেয়ে। আয়েশার মা সালমা বেগম আয়েশার জন্মের কয়েক বছর পর অন্য এক লোকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। আয়েশা আর তার বাবা রজিম উদ্দিন একা হয়ে যায়। বউয়ের বেইমানির পরও রজিম উদ্দিন কখনো বিয়ে করেননি। নিঃসন্দেহে রজিম উদ্দিন বউকে ভীষণ ভালোবাসতেন। রজিম উদ্দিনের আত্মীয়স্বজনরা অনেক চেয়েছিলেন রজিম উদ্দিনকে দ্বিতীয় বিয়ে করাতে, কিন্তু রজিম উদ্দিন করেননি। সংসারে দ্বিতীয় বউ আসলে মা-হারা এতিম আয়েশার অনাদর, অবহেলা হবে বলেই রজিম কখনো বিয়ে করেননি। আয়েশা ও আলেহা একই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করার পর আলেহার বিয়ে হয়ে যায় ইব্রাহিমের সঙ্গে। আর আয়েশা থানচি জেলার সদর কলেজ থেকে ইন্টার পাস করে তখনকার সময়ে ঢাকা চলে যায় উচ্চ শিক্ষার তাগিদে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করে যখন আয়েশা গ্রামে ফেরেন, তখন আলেহার ছেলে রাসেলের বয়স সাত বছর। হাসান শাহানার বারো বছরের সংসারের মাজিদের বয়স দশ বছর, সাজিদের আট বছর, আর আশনূর-আহাদ তখন যমজ সন্তান ছিল শাহানার কোলে ছয়মাসের।
আয়েশা উচ্চশিক্ষিত হয়েও গ্রামের হাইস্কুলে হেডমাস্টার পদে নিয়োগ হয়। তখনকার সময়ে চাইলেই আয়েশা ঢাকায় কোথাও বড় পদে চাকরি নিয়ে সেটেল্ড হতে পারতো, কিন্তু সে গ্রামের দুর্গতি ও মানুষের শিক্ষা লাভের জন্য আয়েশা গ্রামে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। অথচ এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে আয়েশার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। হাসানের সঙ্গেও আয়েশার বিয়েটা পরিস্থিতির শিকারের হয়। হাসানের সততা আর আয়েশার প্রতি হাসানের অসীম ভালোবাসা দেখে আয়েশা একটা সময় হাসানকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিল। নয়তো আয়েশা ঠিক করেছিলেন সে শাহানার সংসারে সতীন হয়ে হাসানের সংসার করবেন না। এই নিয়ে কত ঝড়ঝাপটা যায় তাদের জীবনে।
নূরজাহান আয়েশা আর হাসানের ভালোবাসায় অনেক যত্নে গড়ে ওঠা এক রঙিন ফুল। সেই ফুল প্রথম কলঙ্কিত হয় জন্মের পর ফজল সিকদারের মৃত্যুতে, তারপর দ্বিতীয়বার আয়েশার মৃত্যুতে। এরপর আর থামাথামি নেই—অসংখ্যবার অসংখ্য কারণে নূরজাহান হুটহাট করেই বদনাম হয়ে যায়। আজও তাই হচ্ছে। কবে যে নূরজাহানের জীবনটা স্বাভাবিক হবে আল্লাহ জানে। নূরজাহানের বিয়ের জন্য প্রথম প্রথম অনেক ঘটক আসত সিকদার বাড়িতে। নূরজাহানের সৌন্দর্যের চর্চা থানচি গ্রাম পেরিয়ে আশেপাশের গ্রামেও শোনা যেত। সেই নিয়ে নূরজাহানের বিয়ের জন্য হাসানকে পাগল বানিয়ে রাখত মানুষ। আশনূর নূরজাহানের তিন বছরের বড়, অথচ নূরজাহানের জন্য কেউ আশনূরের বিয়ের প্রস্তাব আনত না সিকদার বাড়িতে।
নূরজাহান যখন ক্লাস এইট পাস করে নাইনে উঠল, তখন প্রথমবার মানিক সওদাগরের দৃষ্টিতে পড়ে নূরজাহান। নূরজাহানকে কখনো হাসান একা স্কুলে পাঠাতেন না। হাসান সব কাজ ফেলে হলেও নূরজাহানকে নিয়ে স্কুলে যেত, আবার স্কুলের বারান্দায় বসে থাকতেন; নূরজাহানের ক্লাস শেষে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন, কখনো নূরজাহানকে ছাড়তেন না ভয়ে। নূরজাহান সুন্দর হওয়ায় মানুষের দৃষ্টি নূরজাহানের ওপর থাকত সবসময়। অকারণে নূরজাহানকে ছুঁতে চাইতো। বাবা হিসেবে হাসান সবসময় মেয়ের ছায়া হয়ে চলতেন। আবার কে বা কারা যেন আয়েশার মৃত্যুর পর থেকেই নূরজাহানকে মারতে চাইত। ছোট নূরজাহানকে কে মারতে চায় হাসান তা আজও জানে না। কিন্তু হাসান সেই ভয়ে সর্তক হয়ে সবসময় নূরজাহানকে চোখে চোখে রাখতেন। আর এতে শাহানার চোখে খুব সহজে নূরজাহান বিষ হয়ে যায়। আশনূর নূরজাহান দুজন বোন হওয়ার শর্তেও হাসান সবসময় নূরজাহানের প্রতি দূর্বল প্রকাশ করেছেন এবং নূরজাহানকে আগলেও রেখেছে। আশনূরের প্রতি হাসানের উদাসীনতা শাহানার মনে নূরজাহানের প্রতি বিষিয়ে তুলেছে। শাহানার ধারণা হাসানের জীবনে শাহানার মতোই আশনূরও মূল্যহীন। হাসানের সকল ভালোবাসা শুধু নূরজাহান ও তার মার প্রতি।
হাসান গ্রামের মেম্বার আর মোল্লা সওদাগর চেয়ারম্যান হওয়ায় মানিক গ্রামে সরকারি চালের কার্ড গরিবদের মাঝে বিতরণে জন্য হাসানের কাছে কাজে এসেছিল। সরকারি কার্ডের চালের বস্তা এসেছিল পাঁচশ। এখান থেকে চারশো বস্তা মোল্লা সওদাগর আগেই সরিয়ে নিয়েছে সেটা নিয়ে যেন হাসান ঝামেলা না করে এই বিষয় হুমকি ধামকি দিতে সেদিন মানিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল হাসানের সঙ্গে দেখা করতে। হাসান নূরজাহানকে নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে মানিক সওদাগর ও তার দলবলের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়। হাসানের সঙ্গে অপরূপ মায়াবতী নূরজাহানকে দেখে মানিক সেদিন নিজের হুমকির কথা ভুলে শুধু নূরজাহানের দিকে থমকে তাকিয়ে ছিল। হাসান মানিকের দৃষ্টি দেখে নূরজাহানকে নিয়ে চলে যায়। মানিকের কাজের কথা হাসানের সঙ্গে সেদিন কেন, আর কোনোদিনই বলা হলো না। তারপরই মানিক বাড়ি ফিরে মোল্লা সওদাগরকে দিয়ে নূরজাহানের বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। মানিকের বউ-বাচ্চা আছে, নূরজাহানও ছোট—তাই হাসান মোল্লা সওদাগরকে সেদিন ফিরিয়ে দেয় মানিকের বিয়ের প্রস্তাবে। হাসান সেদিন মোল্লা সওদাগরকে বলেছিলেন—
‘ আপনের পোলা মানিক বিয়াত্তা, হের বউ-বাচ্চা আছে, হের লগে আমার ছোট মাইয়ার বিয়া দিমু ক্যান চেয়ারম্যান? আমার মাইয়ারে তোমার বিয়াত্তা পোলার লগে বিয়া দিমু না। সতিনের ঘর করার লাইগা আমি মাইয়া জন্ম দেই নাই। মাইয়া কাইটা গাঙে ভাসাই দিমু, হেরপরও আপনের পোলার লগে আমার মাইয়া বিয়া দিমু না চেয়ারম্যান। আপনে চইলা যান। আমি এই বিয়া প্রত্যাখ্যান করতাছি।
সেদিন বেশ ঝামেলা করেই মোল্লা সওদাগর সিকদার বাড়ি ছেড়েছিলেন। হুমকি-ধমকি দিয়ে গেছিলেন তিনি হাসানকে নূরজাহানের জন্য। তবে তার কয়েকদিন পরই শোনা যায় মানিক সওদাগরের বউ তার বাচ্চাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে কোনো এক ছেলের হাত ধরে। অথচ সওদাগর বাড়ির এক কাজের মহিলার মুখে শোনা যায় হাসানের মেয়ে নূরজাহানকে বিয়ে করার জন্য মানিক তার নিজের বউ-বাচ্চাকে মেরে জীবন্ত কবর দিয়েছে। সেই খবর গ্রামে রটে যেতেই শোনা যায় সেই কাজের মহিলাও একটা সময় পর নিখোঁজ। হয়তো মানিক সওদাগরই কাজের মহিলাকে সরিয়ে ফেলেছে কিংবা মেরে ফেলেছে। তারপর থেকেই ধীরে ধীরে কেউ আর সিকদার বাড়িতে নূরজাহানের জন্য কোনো ঘটক বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারে না মানিকের ভয়ে। তার আগেই মানিক সওদাগর হুমকি-ধমকি কিংবা সশরীরে হামলা করে বসে নূরজাহানের জন্য আনা সেই সকল ছেলে পাত্রের বাড়িতে। মানুষ মানিক সওদাগরের ভয়ে সিকদার বাড়ির আঙিনায় আসে না।
মানিকের জন্য নূরজাহানের জীবনটাও হঠাৎ বিষিয়ে ওঠে। গ্রামে নূরজাহানের নামে একের পর এক বদনাম রটে যে নূরজাহানের সঙ্গে মানিক প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে সে নিজের বউ-বাচ্চাকে কবর দিয়েছে। নূরজাহান মানিকের সংসার ভেঙে দিয়েছে। নূরজাহানের সঙ্গে মানিকের প্রেমজনিত সম্পর্ক আছে— সেটা মানিকই গ্রামে রটিয়েছে যাতে কোনো ছেলে নূরজাহানের দিকে চোখ তুলে না তাকায়। নূরজাহানকে কেউ ঘরের বউ বানাতে বিয়ের প্রস্তাব না দেয়। মানিকের জন্য নূরজাহানের জীবনটা বিষিয়ে উঠেছিল। হাসান খুব কষ্টে নূরজাহানকে মেট্রিক পাস করান। কলেজে ভর্তির পরপরই নূরজাহানের ওপর অজানা হামলা হতে শুরু করে। কে বা কারা বারবার নূরজাহানকে মারা চেষ্টা করতে থাকে। আল্লাহ সহায় থাকায় প্রতিবারই নূরজাহান জানে বেঁচে যেত। হাসান দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে পড়ে নূরজাহানের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন এবং আলেহার ছেলে রাসেলের সঙ্গে ফোনে গোপনীয় ভাবে বিয়ে দিয়ে দেন। নূরজাহানের বিয়ের দিন মানিক আলেহার স্বামীকে ঘরে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলায় আলেহার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যায়। স্বামী, সংসার, ঘরবাড়ি সবই হারিয়ে কাঙাল হয়ে গেল আলেহা। মানিক রাসেলকেও ফোন করে আলেহাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। সেজন্য রাসেল ভয়ে অপরুপ সুন্দরী লাল টুকটুকে বউ নূরজাহানকেও সেই রাতেই ফোনে মৌখিক তালাক দিয়ে দেয়। সন্ধ্যায় বিয়ে হলো আর মধ্যরাতে নূরজাহান মৌখিক তালাকনামা পেয়ে গেল রাসেলের থেকে। যেহেতু নূরজাহানের বিয়ের কোনো রেজিস্ট্রি পেপার কিংবা কাবিননামা হয়নি, তাই ডিভোর্স পেপারও প্রয়োজন পড়েনি।
মানিক লোকবল নিয়ে নূরজাহানের বিয়ের রাতে নূরজাহানকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিকদার বাড়িতে হামলা করে বসে। হাসান লোকবল নিয়ে কোনোমতে মানিককে সেরাতে ঠেকাতে পেরেছিল কিন্তু পরদিন সবার অগোচরে হাসান নূরজাহানকে নিয়ে পালিয়ে গেল থানচি গ্রাম হতে। তারপর থেকে নূরজাহানের পালিয়ে বেড়ানো জীবন শুরু হলো। প্রথমে সিলেট, তারপর রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ মোট এগারোটা জায়গায় হাসান নূরজাহানকে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিলেন। সবশেষে নূরজাহানকে যশোরে হাসানের এক দূরসম্পর্কের বোন ফাতেমার বাসায় রেখে আসেন নিরাপত্তার জন্য। ফাতেমার এক ছেলে এক মেয়ে ছিল, স্বামী হাসানুজ্জামান মারুফ একজন ব্যাংকার ছিলেন। মেয়েটির নাম ছিল তানিয়া, সে নূরজাহানের দুই বছরের ছোট ছিল।
যশোরে ফাতেমার ভাড়া বাসায় যখন নূরজাহান থাকত, তখন হাসান প্রায় মেয়েকে দেখতে যেত। যশোরে ফাতেমার বাসায় নূরজাহান টানা চামাসে মতো ছিল। কিন্তু একদিন কীভাবে যেন মানিক নূরজাহানের খোঁজ পেয়ে যায়, তারপর সেখানে লোকবল নিয়ে হামলা করে বসে নূরজাহানকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। খবর পেয়ে হাসান, মাজিদ ও আলেহাও থানচি থেকে ছুটে যায় যশোরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখল নূরজাহান নিখোঁজ। নূরজাহানের খোঁজে কারা যেন রাস্তার দোকানপাট ভাঙচুর করে এক দোকানদারকে পিটিয়েছে। ফাতেমা ও তার স্বামীর বাসায়ও ভাঙচুর করে তাদেরও পিটিয়েছে। আর নূরজাহানকে রাতের আঁধারে জান বাঁচিয়ে পালাতে সাহায্য করেছিল তানিয়া ও ফাতেমা।
একদিকে মানিকের লোক, অন্যদিকে হাসান-মাজিদ-আলেহা পাগলের মতো নূরজাহানের খোঁজ করে চলেছিল সারা এলাকা জুড়ে। অথচ নূরজাহানের খোঁজ পাওয়া যায় যশোর জেলার মণিরামপুর থানায়, খানপুর গ্রামের বাজারের আশেপাশে। হাসানরা মনে করেছিলেন মানিকের লোকজন নূরজাহানকে ধরে নিয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন মানিকের লোক নয় বরং তৃতীয় পক্ষের কারা যেন নূরজাহানের ওপর হামলা করে এবং গুলিও করে। নূরজাহানের কানে একটা ফোন ছিল, হয়তো কারো কাছে বাঁচার আকুতি করছিল নূরজাহান। দূর থেকে আলেহা নূরজাহানকে ফোন কানে দৌড়াতে দেখেছিল। তারপরই নূরজাহান গুলিবিদ্ধ হয়। পরে হাসান, মাজিদ ও আলেহা নূরজাহানের গুলিবিদ্ধ শরীরটা উদ্ধার করে। হাসান-মাজিদ-আলেহার উপস্থিতিতে হামলাকারী নূরজাহানকে একটা গুলিই করতে পেরেছিল, তারপর আর করার সুযোগ পায়নি; সেখানে গ্রামবাসীও জড়ো হয়ে যাওয়ায় গুলিবিদ্ধ নূরজাহানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় হাসান। সেদিন গুলিটা নূরজাহানের কাঁধের একটু নিচে লাগায় সেই যাত্রায় নূরজাহানকে প্রাণে বাঁচাতে পেরেছিলেন হাসান। গুলিটা নূরজাহানের পিঠ ছিঁড়ে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। আজও নূরজাহানের কাঁধে নিচে গুলির দাগটা রয়েছে।
টানা তিন মাস নূরজাহান গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিল। একদিকে মানিকের লোক নূরজাহানকে অপহরণ করতে চায়, অন্যদিকে কারা যেন নূরজাহানকে প্রাণে মেরে ফেলতে চায়—সব মিলিয়ে হাসান দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিলেন শখের মেয়ের জীবন বাঁচাতে। হাসান খাওয়া-দাওয়া, ঘুম বাদে নূরজাহানের দেহটা অ্যাম্বুলেন্সে করে পালিয়ে বেড়াতো এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য। হাসানের সঙ্গে আলেহাও থাকতে পারতো না, স্বামীর মৃত্যুতে সেও একা হয়ে গিয়েছিল। আগুনে পুড়া বাড়িটা মেরামত করার প্রয়োজন ছিল। আর মাজিদকে শাহানা নিজের কসম দিয়েছিলেন যেন নূরজাহানকে বাঁচাতে সে নিজের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে। সাজিদ এমনিতেই নূরজাহানকে সৎ বোন হিসেবে মেনে নিতে পারত না বলে সে কখনো নূরজাহানের কোনো কিছুতে নিজেকে জড়াত না। আহাদ ও আশনূর চাইলেও নূরজাহানের জন্য কিছু করতে পারত না শাহানার ভয়ে। তারানূর বেগম বয়স্ক মানুষ, তিনি নূরজাহানের জন্য দোয়া ছাড়া বাড়ির বাইরে গিয়ে কিছু করার মতোন অবস্থান উনার ছিল না। হাসান নিজে একাই লড়াই করে গেছেন নূরজাহানকে বাঁচিয়ে রাখতে।
একদিন হামলাকারী লোকগুলো কিভাবে যেন নূরজাহানের চিকিৎসা চলা হাসপাতালের ঠিকানা পেয়ে যায়। কয়েকজন লোককে হাসান চিনতো। হাসপাতালের করিডোরে সেই লোকগুলোকে ছদ্মবেশে দেখে হাসান নূরজাহানের অজ্ঞান অবস্থায় বেডসহ টেনে বেরিয়ে যায় হাসপাতালের পিছনের রাস্তায়। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ছিল রশিদের বড় ভাই জামাল। জামালের সাহায্যে নূরজাহানকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে পালাতে গিয়ে কয়েকজন নার্স হাসানকে বাধা দেয়—অসুস্থ রোগী নিয়ে কেন পালাচ্ছে সেই নিয়ে তুমুলঝগড়া বাঁধায়। নার্সদের হাঙ্গামায় সেখানে মূহুর্তে মানুষের ভিড় জমে যায়। হাসান ধরা পড়ে যায় হামলাকারী মানুষগুলোর সামনে। তারপর একপর্যায়ে হাসান জামালকে নিয়ে জোর করে নার্সদের থেকে ছুটে অ্যাম্বুলেন্সে করে নূরজাহানকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছু পথ যাওয়ার পর নূরজাহানের অ্যাম্বুলেন্স আটকে হাসান ও জামালের ওপর হামলা করে নূরজাহানকে মেরে ফেলার জন্য। ভাগ্যক্রমে সেদিন মারিদের বোন হাসানের হয়ে হামলাকারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ছোট মানুষ হয়েও মেয়েটি হাসানদের বাঁচানোর জন্য সাহস দেখায়। তারপরই মারিদ আর হাসিব আশার আলো হয়ে আসে হাসানের জন্য। মারিদ সেদিন নিজের ছোট বোনের জীবন বাঁচাতে লোকগুলোকে পেটালেও আসলে সেদিন সে নূরজাহানের জন্য রক্ষাকারী দূত হয়ে এসেছিল। মারিদ নূরজাহানের জীবন বাঁচানোর কৃতজ্ঞতায় আজ হাসান মারিদকে নিজের বাড়িতে ঠাঁই দিয়েছে, আপ্যায়ন করছে। তারপর হাসান গোপনে আরও একমাস নূরজাহানের চিকিৎসা করান। যখন নূরজাহানের জ্ঞান ফেরে এবং সে একটু সুস্থ হয়, তখন নূরজাহানকে নিয়ে বাড়িতে ওঠেন দীর্ঘ দুই বছর পালিয়ে বেড়ানোর পর। এরপর থেকে মানিক সওদাগরের লোক কিংবা অন্য যে কেউ হোক না কেন, যে বা যারা নূরজাহানের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে, হাসান সেই সকল মানুষের বিরুদ্ধে রামদা হাতে ধাওয়া করেছে। আজ সিকদার বাড়ির সবাই অনিশ্চিত নিরাপত্তায় দা হাতে ঘোরে। সিকদার বাড়ির সবাই বুঝে গেছে—বাঁচতে হলে অস্ত্র হাতে নিতেই হবে। আলেহা এক ঝলক স্মৃতিচারণ করল ঘটে যাওয়া অতীত নিয়ে।
নূরজাহান আলেহার সামনে বসে। আলেহা এতো রাতেও নূরজাহানের মাথায় তেল দিচ্ছে। প্যারাসুটের তেল শীতে জমে মোম হয়ে আছে। আলেহা গরম পানিতে প্যারাসুটের তেল গলিয়ে নূরজাহানের লম্বা চুলে তেল দিচ্ছে। নূরজাহানের চুল নূরজাহানের উচ্চতার চেয়েও লম্বা। এতো চুলের যত্ন নূরজাহান ঠিকমতো করতে পারে না বলে হাসান মেয়ের চুলের যত্ন নেন। নূরজাহানের মাথায় তেল দিয়ে দেয়, চুলে বেণি করে দেয়। নূরজাহানের মাথার চুল হাসানের খুব শখের জিনিস। নূরজাহান চুল পেয়েছে আলেহার মতো আর রূপ পেয়েছে তারানূরের মতো, গুণবতী ও সাহসী হয়েছে মায়ের মতো। সকলের সংমিশ্রণে উপরওয়ালা যেন নূরজাহানকে বিশেষ কোনো কারণে বানিয়েছেন। নূরজাহান রূপবতী, গুণবতী, মায়াবতী—যেই যা বলুক, নূরজাহান ভাগ্যবতী হতে পারেনি। ভাগ্য নূরজাহানের বেলায় বড়ই নিষ্ঠুর। এতো সুন্দরী মেয়েটার ভাগ্য এতো নিষ্ঠুর কেন দিলো আল্লাহ? একটু রূপ কমিয়ে কি মেয়েটাকে ভাগ্যবতী করে দেওয়া যেত না? আলেহা উঁচু মোড়ায় বসে মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় নূরজাহানের মাথায় তেল দিচ্ছে। নূরজাহান ঠান্ডা ফ্লোরে বসে নীরবতা ভেঙে বলল—
‘ফুপি, তুমি কেন আমাকে এতো ভালোবাসো? মানুষ বলে আমার জন্য ফুপার মৃত্যু হয়েছে। আমি ফুপার মৃত্যুতে দায়ী, তাহলে তুমি কেন আমাকে দায়ী করো না?
নূরজাহানের বিয়ের পর আলেহা আর বাপের বাড়ি আসেননি স্বামীর মৃত্যুর শোকে। তিন বছর পর আজ আসলেন। আলেহা প্যারাসুট তেল ছোট বাটিতে ঢেলেছেন। সেই বাটি থেকে কুসুম গরম তেল নিয়ে নূরজাহানের মাথায় ঘষে বললেন—
‘আমিও তো তোকে বদনাম করেছি। তোর জীবনটা গোছাতে গিয়ে আরও এলোমেলো করে দিয়েছি। বিয়ের নামে উল্টো তালাকের তকমায় কলঙ্কিত করলাম। এতো বদনামের পরও কীভাবে তোকে আমার স্বামীর মৃত্যুর দায়ী করি বল? আল্লাহ সইবে?
‘কলঙ্ক আমার আর গায়ে লাগে না। বদনাম হতে হতে শরীরে সয়ে গেছে। বদনামে ভয় আর লাগে না ফুপি।
নূরজাহানের কথাটা তিরের মতো বুকে লাগল আলেহার। হাহাকার বুকে আলেহা নূরজাহানকে উপদেশ দিয়ে বলল—
‘জীবন মানেই যুদ্ধ। তোকে জীবনযুদ্ধে লড়াই করেই বাঁচতে হবে নূরজাহান। কোনো কিছুতে ভেঙে পড়িস না। মনে রাখিস বিনয়ী হলে সবাই ঘাড়ে চড়ে বসে। যে তোর সাথে যেমন, তার সাথে তেমন হবি। এই জগতে ভালো মানুষের ঠাঁই নাই।
আলেহার তেল দেওয়ার মাঝেই নূরজাহান ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল আলেহার দিকে। চোখ ভরা আশা নিয়ে হঠাৎ বলল—
‘ জীবনযুদ্ধে জয়ী হইলে আমি সুখ পাব ফুপি? সুখ আমার হবে?
কেমন অদ্ভুত আর অসহায় ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করল নূরজাহান। আলেহার বুক মুচড়ে উঠল নূরজাহানের কথায়। রূপে-গুণে নূরজাহান জয়ী হলেও সে ভাগ্যের বেলায় বড়ই নিষ্ঠুর। আট বছর বয়সে নূরজাহান মাকে হারায়। সৎ মায়ের সংসারে ঠাঁই পেয়েও একটা অনিশ্চিত জীবন শুরু করল। যেখানে তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর পদে পদে বদনামের দাগ। গোটা দুনিয়ায় নূরজাহানের ভালোবাসার মানুষ বলতে হাসান আর আলেহা আছে। বাকি সবাই নামে সম্পর্ক। আলেহা নূরজাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল—
‘দেখবি একদিন সব সুখ তোর নামের ভাগ্যে এসে জড়ো হবে। তখন তোকে আর কোনো বদনাম ছুঁতে পারবে না।
নূরজাহান কয়েক সেকেন্ড আলেহার মমতায়ী মুখটার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল—
‘আমি কোথাও একটা শুনেছিলাম ফুপি, নারীজাতি ভাগ্য নিয়ে না জন্মালে তাদের সারাজীবন যায় সুখ খুঁজতে খুঁজতে। আমার বেলায় কিন্তু তাই হচ্ছে। সুখের সন্ধান করতে গিয়ে প্রতিবার দুঃখের সাগরে ভেসে যাই।
আলেহা নূরজাহানের উদাস মুখটা দুহাতে আগলে কপালে চুমু খেয়ে বলল—
‘ তুই তোর মার মতোন সাহসী হয়েছিস নূরজাহান। তোর ধৈর্য ক্ষমতা তোর মার মতোই প্রখর। তোর মা আয়েশা দুর্দান্ত সাহসী ছিল। তখনকার সময়ে তোর মাকে মোল্লা চেয়ারম্যানও ভয় পেত। তোর মার আস্থা ছিল তুই তার মতোই হবি। সেজন্য সে তোর বাপ আর আমাকেও বিশ্বাস করে তার শেষ আমানতটুকু রেখে যায়নি। তুই ছোট, মাত্র আট বছর বয়স ছিল তোর, তারপরও তোকে বিশ্বাস করে নিজের শেষ আমানতটুকু গুছিয়ে দিয়ে গেছে। তোর মা মৃত্যুর আগে তোকে কী দিয়ে গেছে, সেটা আমি আর তোর বাপ আজও জানি না। তুইও কখনো বলিস না এই বিষয়ে। তবে এতোটা জানি তোর মা আয়েশা যাই দিয়ে যাক, সে খুব ভয়ংকর কিছুই দিয়ে গেছে তোকে, যার জন্য তোর জীবনটা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। তোর মা আয়েশা আর আমি বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম, অথচ সে মৃত্যুর আগে তার শেষ চাওয়া আমাকে আর তোর বাপকে বলে যায়নি। তোকে বিশ্বাস করে বলে গেছে, হয়তো মনে করেছে ওর রক্ত ওর সাথে কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করবে না তাই।
নূরজাহান আলেহার রানের ওপর মাথা রেখে
বলল—
‘আমি আম্মার মতো এতো সাহসী নই ফুপি। আমি ভীষণ দুর্বল, লোভী আর স্বার্থপর একটা মেয়ে। আমি আজও ভালোবাসার কাঙাল হয়ে বারবার সুখ পাওয়ার লোভ করি। আম্মা আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না ফুপি। তুমি আমাকে আর ভালোবেসো না, তাহলে আমার ভাগ্যে তুমিও বদনাম হয়ে যাবে।
আলেহা নূরজাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে টিনের খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। কুয়াশার ঘোলাটে অন্ধকারে তাকিয়ে বললেন—
‘তোকে আমি ভালোবাসি আর যাই করি না কেন, তুই আমার ভাই আর সখীর শেষ চিহ্ন নূরজাহান। তোকে আমি কোনোদিন অবহেলা করব না। তোর কাহিনীর শেষ পর্যন্ত আমাকে পাবি। তোর শেষ ঠিকানা না করা অবধি আমি মরব না। মনে রাখিস নূরজাহান, এটা তোর গল্প, আর তোর গল্পে তুই বাদে সবাই দ্বিতীয় পক্ষ। নিজেকে সবসময় শক্ত রাখবি। কোনো কিছুতে ভেঙে পড়বি না। কারণ বাস্তবতা কখনো আমাদের মনের মতো হয় না, তারপরও আমাদের মেনে নিতে হয়।
‘তোমার মতো করে দাদীও আমাকে বলে ফুপি—নূরজাহান, হয় জিতবি নয়তো শিখবি, তারপরও হার মানবি না।
নূরজাহানের মাথায় তেল দেওয়া প্রায় শেষ। অথচ নূরজাহান আলেহার রানে মাথা রেখে শুয়ে। আলেহা উঁচু মোড়ায় বসেছেন আর নূরজাহান খালি ফ্লোরে। আলেহা বাইরে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল—
‘আম্মা মানুষটা ওপর দিয়ে তোর জন্য শক্ত দেখান, কিন্তু সত্যিকারে তিনি তোকে সবার থেকে বেশি ভালোবাসেন। নয়তো দেখিস না, তোর বাবার সাথে এতো শীতের মাঝেও রামদা নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন শুধুমাত্র তোকে পাহারা আর নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য।
আলেহার কথাটা শেষ হতে না হতেই নূরজাহান চট করে বলল—
‘আজ মানিক সওদাগর আসবে না ফুপি। আব্বা আর দাদীকে বলো ঘরে চলে আসতে।
নূরজাহানের কথায় আলেহা কপাল কুঁচকে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল—
‘তুই কীভাবে জানলি আজ মানিক সওদাগর আসবে না?
নূরজাহান উঠে বসল। খানিকটা জড়সড় হয়ে বসে বলল—
‘জানি না ফুপি। তবে আমার মন বলছে আজ মানিক সওদাগর আমাদের বাড়িতে আসবে না, বরং অন্য কিছু একটা করবে।
‘অন্য কিছু কী করবে?
‘বলতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে আজ আমাদের বাড়িতে আসবে না।
~~
শেষ রাতে ঘুমে বারান্দায় বসে ঝিমাচ্ছেন হাসান। পাশে তারানূর বেগম পিঠে বালিশ রেখে গায়ে মোটা কম্বল জড়িয়ে বসে থেকে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ডান হাতের মুঠোয় বড় রামদাটি ঘুমের ঘোরেও চেপে ধরে আছেন। মাঝের ঘরটা মেঘনা। সেই ঘরের খোলা বারান্দায় পাটি বিছিয়ে সারারাত বাড়ি পাহারায় বসেছিলেন হাসান ও তারানূর বেগম। বিকালে হঠাৎ মানিকের আক্রমণ দেখে মনে হয়েছে আজ রাতেও মানিক হাসানের বাড়িতে আক্রমণ করতে পারে, সেই চিন্তায় হাসান সারারাত না ঘুমিয়ে রামদা নিয়ে বারান্দায় বিছানা করে বসেছিল। বাকিরা সবাই যার যার ঘরে শুয়ে, কিন্তু আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে সবাই ঘুমিয়েছে সঙ্গে করে লাঠি আর দা নিয়ে। নূরজাহান কাটা পা নিয়ে কিছুক্ষণ পর পর বাবা-দাদীকে দেখে যাচ্ছে, আবার মাঝেমধ্যে রঙ চা করে দিয়ে যাচ্ছে তাদের। মান্না হাসানের পায়ের কাছে কম্বল মুড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে পাহারা দিতে দিতে একটা সময় পর মান্না ঘুমিয়ে পরেছে। হাতের দা-টা মাথার নিচে। হাসান সারারাত পাহারা দিতে দিতে কিছুক্ষণ আগে চোখটা লেগে এসেছে ঘুমে। এখন রাত ৩:৩৫। কিছুক্ষণ পর আজান হবে।
নূরজাহান সারারাত ঘুমায়নি। হাসান-আলেহা এতো করে বলার পরও সে ঘুমায়নি। হাসান নূরজাহানের জন্য না ঘুমিয়ে পাহারায় বসে আছে আর নূরজাহান মেয়ে হয়ে ঘুমাবে? অসম্ভব। নূরজাহান গায়ে কালো চাদর জড়িয়ে নিজের ঘর থেকে বসার ঘর পেরিয়ে বারান্দায় আসল। দেখল তারানূর, হাসান ও মান্না—তিনজনই শুয়ে-বসে ঘুমিয়ে। হাসানের গায়ের কম্বলটা সরে গেছে। ঘন কুয়াশায় হাসানের ঠান্ডা লাগছে। নূরজাহান হাসানের গায়ের কম্বলটা ঠিক করে দিল। মান্না চিত হয়ে শুয়ে আছে, পা বেরিয়ে গেছে কম্বল হতে। নূরজাহান মান্নার পা ঢেকে দিল কম্বলে। তারানূরের পাশে আরও একটি বালিশ দিল যেন ঘুমের ঘোরে তারানূর বেগম বাঁকা হয়ে পড়ে গেলেও যেন বালিশের ওপর পড়ে। নূরজাহান ঘরে না গিয়ে খোলা বারান্দায় বসল মান্নার মাথার পাশে। বাকি রাতটুকু নূরজাহান পাহারা দেবে। অন্যমনস্ক নূরজাহান ঘন কুয়াশা ঢাকা ঝাপসা আকাশের দিকে তাকাল। শূন্যে তাকিয়েও আকাশের দেখা পেল না। সবকিছু অন্ধকার আর ঝাপসা। হঠাৎ কিছু শব্দে নূরজাহান সচকিত হলো। কান খাড়া করে মান্নার মাথার নিচ থেকে রামদা-টা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে বাড়ির দক্ষিণ দিকে কলপাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। নূরজাহান বরাবরই সাহসী। ওর ভয়ডর খুব কম। যার জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে সংঘর্ষ করে বাঁচতে হয়, তার মৃত্যুর ভয় নেই।
মারিদ চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল কালো চাদরে মুড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ এক সুন্দরী নারী। যার ডান হাতের মুঠোয় রামদা চেপে ধরে আছে। নূরজাহানকে দেখে মারিদের মনে হলো ঘন কুয়াশার মাঝে আকাশ থেকে একটা পরী দা হাতে নেমে এসেছে মারিদকে মারতে। নূরজাহান মেয়েটির ডাক নাম তো পরী। যে বা যিনি নূরজাহানের নাম পরী রেখেছেন, সে নিশ্চয়ই নূরজাহানের রূপের বর্ণনায় পরী নামটা মিলিয়েই রেখেছেন। প্রথম দেখায় যেকোনো নারী-পুরুষের চোখ আটকে যাওয়ার মতো কঠিন সুন্দরী নূরজাহান। মারিদের মনে হলো সে নূরজাহানকে সুন্দরী না বলে ‘মায়াবতী’ উপাধিটা দিলে হয়তো বেশি মানাবে। নূরজাহানের মুখে ভয়ংকর মায়া আছে যা মুহূর্তে মানুষকে ঘায়েল করতে সক্ষম। সৌন্দর্যের মোহ কাটানো যায়, কিন্তু মায়ার মোহ কখনো কাটানো যায় না। মানিক সওদাগর নিশ্চয়ই নূরজাহানের এই ভয়ংকর মায়ায় জড়িয়েই নিজের স্ত্রী-সন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছিল।
‘আপনি এখানে কী করছেন?
নূরজাহানের গলার স্বর শক্ত শোনাল। মারিদ উত্তরে বলল…
‘বাথরুম গিয়েছিলাম। অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে পায়ে কিছুর সঙ্গে হোঁচট খেয়েছি। আমি বাইরের বাথরুমে অভ্যস্ত নই। সেজন্য একটু অসুবিধা হচ্ছে রাতে চলাচলের জন্য।
মারিদের কথায় নূরজাহান কথা না বাড়িয়ে ছোট উত্তরে বলল…
‘ আপনি ঘরে যান।
নূরজাহান চলে যেতে নিলে মারিদ বাঁধা দিয়ে বলল..
‘আপনি সবসময় লুকিয়ে বেড়ান কেন?
‘আমার ইচ্ছা।
ত্যাড়া উত্তর করে নূরজাহান ঘুরে গেল চলে যাওয়ার জন্য। মারিদ পিছন থেকে বলল…
‘আমি আপনার ওপর ইন্টারেস্টেড নই মিস। আপনি চাইলে আমার সাথে কথা বলতে পারেন। আমার সবার উপর মন আসে না।
নূরজাহান ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল মারিদের দিকে। মারিদের কথাটা কেমন অবিশ্বাস্য শোনাল নূরজাহানের কাছে। এই প্রথম কোনো ছেলে নূরজাহানকে দেখার পরও বলছে সে নূরজাহানের ওপর ইন্টারেস্টেড নয়। সত্যি কি তাই? নাকি মারিদ এসব বলে নূরজাহানের অ্যাটেনশন পেতে চাচ্ছে? মারিদ ফের বলল—
‘আমি কিন্তু সত্যি আপনার ওপর ইন্টারেস্টেড নই মিস নূরজাহান। চাইলে বাজিয়ে দেখতে পারেন। আমি ব্যবসায়িক মানুষ, হিসেবে বেশ পাক্কা, ভুল করার চান্স নেই।
নূরজাহানের হঠাৎ বুক মুচড়ে উঠল মারিদের কথাবার্তায়। নূরজাহানের হঠাৎ তার ‘ব্যবসায়িক সাহেব’-এর কথা মনে পড়ল। মারিদের কথায় যেন নূরজাহান তার ব্যবসায়িক সাহেবের ঝলক দেখতে পেল। নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেবও ঠিক এভাবেই ওদের প্রথম ফোনকলে বলেছিল নূরজাহানকে—’ আমি আপনার ওপর ইন্টারেস্টেড নই মিস অপরিচিতা, আমাকে ফোন করে লাভ নেই।
অথচ তারপরও দুজনের সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো। না চাইতেও দুজন দুজনের ভিষণ ইন্টারেস্টের জায়গায় চলে আসল। নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেব সবসময় বলতো—’ আমি একজন ব্যবসায়িক মানুষ মিস অপরিচিতা, হিসেবে বেশ পাক্কা। চাইলে বাজিয়ে দেখতে পারেন। ফেল হবো না কিন্তু।
নূরজাহান তার ব্যবসায়িক সাহেবকে কখনোই চিনত না, সে তো রং নাম্বারে ব্যবসায়িক সাহেবকে কল করত সবসময় নিজের পরিচয় গোপন করে। নূরজাহান ব্যবসায়িক সাহেবের নামটা পর্যন্ত জানে না; ফোনের লোকটা কে, কী তার পরিচয়, দেখতে কেমন—কিচ্ছু জানে না নূরজাহান। শুধু জানে লোকটা ঢাকায় থাকে এবং কোনো কিছুর ব্যবসা করে। নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেব ব্যবসা করেন সেটাও নূরজাহান লোকটার মুখেই বেশ কয়েকবার শুনেছিল বলে সে এমনিই লোকটাকে ‘ব্যবসায়িক সাহেব’ বলে ডাকত। অথচ রং নাম্বারের ব্যবসায়িক সাহেব মনে করতেন নূরজাহান তাঁকে চিনে ফোন করতো নিজের পরিচয় লুকিয়ে। কিন্তু সত্যিটা ছিল নূরজাহান কিংবা ব্যবসায়িক সাহেব—কেউ কাউকে কখনোই চিনত না। ব্যবসায়িক সাহেব কতো সহজেই না বোকা হয়ে গেলেন নূরজাহানের কাছে।
নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেবের কথা মনে আসতেই হঠাৎ ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির ঝলক দেখা গেল। মারিদ ঝাপসা কুয়াশার মাঝেও নূরজাহানের সেই অল্প হাসিটুকু মুগ্ধ চোখে দেখল। মারিদ কখনো নূরজাহানকে হাসতে দেখেনি। দেখেছে গম্ভীর, শীতল আর শান্ত একটা মুখ। অপরূপ সুন্দর মায়াবতীর মুখে হাসি থাকবে না—ব্যাপারটা কেমন যেন বেমানান লাগে। এই মায়াবতী এখন হাসছে, সেটা মানানসই লাগছে। হঠাৎ ধূমকেতুর মতো নূরজাহানের জীবন থেকে ব্যবসায়িক সাহেবকে হারিয়ে ফেলার সত্যটা মনে পড়তেই নূরজাহানের মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে গেল তীব্র বুক ব্যথার অতলে। মুখটা গম্ভীর করে নূরজাহান বলল—
‘আপনি ডাক্তার না?
‘না। আমি একজন ব্যবসায়ী মানুষ। আমার সাথে রাদিল ও রিফাত নামক যে দুজন ছেলেকে দেখেছেন ওরা দুজন ডাক্তার। আমি না।
‘তাহলে আপনি আমাদের গ্রামে হাসপাতাল বানাচ্ছেন কেন? এটা কি সরকারি প্রজেক্ট নাকি মালিকানা? আমার আব্বা তো বলল এটা নাকি সরকারি হাসপাতাল, তাহলে?
মারিদের কাছে নূরজাহানের এসব প্রশ্নের উত্তর আগেই গুছিয়ে রাখা ছিল। সেই উত্তরে মারিদ বলল…
‘হাসপাতাল প্রজেক্টের সকল খরচ আমার কোম্পানি বহন করবে। তবে সরকারিভাবে সকল ফরমালিটিজ পূরণ করা হচ্ছে এই হাসপাতাল বানানোর পিছনে।
প্রসঙ্গে পাল্টে নূরজাহান হঠাৎ প্রশ্ন করে বলল..
‘ আচ্ছা আপনার কোম্পানি কি ঢাকায়?
‘জি।
‘আচ্ছা, আপনি এমন কোনো ব্যবসায়ীকে চেনেন? যে দেখতে ফর্সা হবে, লম্বায় ছয় ফিট এক বা দুই হবে?
নূরজাহান তার রং নাম্বারের ব্যবসায়িক সাহেবের নাম-পরিচয় জানে না। একদিন ব্যবসায়িক সাহেব কথায় কথায় নূরজাহানকে বলেছিল সে দেখতে ফর্সা এবং উচ্চতায় ছয় ফুট দুই ইঞ্চি। নূরজাহান সেই বর্ণনায় এখন মারিদকে এইসব বলল সে এমন কোনো ব্যবসায়ীকে চেনে কি না। মারিদ নূরজাহানের বর্ণনায় কপাল কুঁচকাল। ঢাকা শহরের হাজারো ব্যবসায়ীর মাঝে ছয় ফিট এক বা দুই ইঞ্চি লম্বা ছেলেকে সে কীভাবে খুঁজবে যার গায়ের রঙ ফর্সা? শুধু এই দুটো বর্ণনায় মানুষ খোঁজা যায় নাকি? আজব! খুঁজতে গেলে তো মারিদও নূরজাহানের বর্ণনায় পড়ে। সে-ও তো ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা ছেলে, গায়ের রঙ ফর্সা, সাথে ব্যবসায়ীকও। এখন নিশ্চয়ই নূরজাহান মারিদকে সামনে রেখে খুঁজতে যাবে না। মারিদ কপাল কুঁচকে বলল—
‘ঢাকা শহরের হাজারো ব্যবসায়ীর মাঝে আপনার বলা ওই একটু বর্ণনায় একটা মানুষকে কীভাবে খুঁজব মিস নূরজাহান? আপনাকে আরও বিবরণসহ ডিটেইলসে বলতে হবে যাতে আমি বুঝতে পারি আসলে আপনি কাকে খুঁজছেন। হতেও পারে আমি আপনার খোঁজা মানুষকে চিনি, আবার নাও হতে পারে—কারণ ঢাকা শহরে এক-দুজন ব্যবসায়ীক মানুষ বসবাস করে না, সেখানে হাজারো লাখো কোটি ব্যবসায়ীকের কেন্দ্রস্থান ঢাকা শহর। এখানে এক-দুইটা বর্ণনা দিয়ে মানুষ খোঁজা অসম্ভব। ওইভাবে দেখতে গেলে আমিও কিন্তু আপনার বর্ণনার মধ্যে পড়ি। আমি ছয় ফুট দুই ইঞ্চির লম্বা ছেলে, গায়ের রঙ ফর্সা, পাশাপাশি ব্যবসায়ীক। এখন আপনি নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজছেন না?
নূরজাহান ঘোলাটে দৃষ্টিতে মারিদের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল—
‘ঘরে যান। গিয়ে শুয়ে পড়ুন। এই ঠান্ডায় বাইরে থাকবেন না।
‘তাহলে আপনি বাইরে কী করছেন?
‘এটা আমার বাড়ি। এই বাড়িতে রাতে কিংবা দিনে চলাচল করতে আমার কাউকে কৈফিয়ত দিতে হয় না মারিদ সাহেব। এতটুকু স্বাধীনতা তো আমার আছে।
মারিদ সবে ঘরে গিয়ে শুয়েছিল, ঘুমায়নি। বিছানায় কম্বলের নিচে এপাশ-ওপাশ করছে। নূরজাহানের কথায় মারিদের মনে হলো নূরজাহান মারিদকেই খুঁজছে। আবার মনে হলো না। নূরজাহান মারিদকে খোঁজছে না। নূরজাহান যদি মারিদের অপরিচিতা হতো, তাহলে মারিদকে প্রথম দিন দেখেই চিনে ফেলার কথা। কারণ অপরিচিতা বলেছিল সে মারিদকে চিনে কল করত, তাহলে সামনাসামনি আসার পর নূরজাহান মূহুর্তে মারিদকে চিনে ফেলতো এতো সময় নিতো না। এতে মারিদের মনে হয় নূরজাহান মারিদের অপরিচিতা নয়। আবার আশনূরকেও মারিদ অপরিচিতা বলতে পারছে না কারণ আশনূরও মারিদকে ব্যবসায়ীক সাহেব হিসাবে চিনতে পারছে না। নাকি মারিদ আবার কোথাও ভুল করছে? এমনটা তো হওয়ার কথা না। অপরিচিতার ডায়েরি আর ওইদিনের ফোনকলে মারিদ অন্তত এতোটা নিশ্চিত হয়েছে যে হাসান সিকদারের দুই মেয়ের কোনো এক মেয়েই হবে মারিদের অপরিচিতা। তানিয়া মেয়েটাও তো ‘নূ’ উচ্চারণ করেছিল। ‘নূ’-তে নূরজাহানও হবে, আবার আশনূরের পিছনেও ‘নূর’ আছে। তানিয়া আসলে নূরজাহানকে সেদিন মেনশন করেছিল তাহলে? কিন্তু অপরিচিতা তো মারিদকে ফোনে বলেছিল সে কালো। কিন্তু বাস্তবে নূরজাহান অন্তত রূপবতী মেয়ে। হৃদপিণ্ড থমকে যাওয়ার মতো সে সুন্দরী। আশনূর শ্যামবর্ণের। বর্ণনায় আশনূর ফিট বসে। মারিদ কাকে বিশ্বাস করবে? অপরিচিতা কি মারিদকে কোনোভাবে মিথ্যা বলেছিল ফোনে নিজের সম্পর্কে?
কাঁচা ঘুমে যখন মারিদের চোখ লেগে আসছিল, তক্ষুনি বাইরে থেকে হাসান-মাজিদসহ বেশ অনেকগুলো মানুষের চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ছুটে যায় মারিদের। সে বিছানা থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে দরজা খুলে দৌড়ায় বাইরে। একটু আগেই সে নূরজাহানের সঙ্গে সুস্থ-সবল কথা বলে এসেছে। আবার নূরজাহানের কোনো বিপদ হলো কি না, সেই ভেবে মারিদ মনে মনে আঁতকে উঠল। মারিদের পিছনে রাদিল ও হাসিবও নিজেদের ঘর হতে দৌড়ে বের হলো উঠানে। দেখল হাসান, মান্না, তারানূর, আশনূর, আলেহা, মাজিদ—সবাই ঘুম থেকে উঠে দা হাতে দৌড়ে বের হচ্ছে, পরনের লুঙ্গি কোমরে গিট দিতে দিতে মাজিদ ঘর থেকে বেরিয়ে উঠুনে দৌড়াচ্ছে।
হতভম্ব মারিদ, রাদিল ও হাসিব সবার পিছনে দৌড়ে টিনের বেড়ার গেট হতে বের হতেই দেখল— গেইটের বাইরে সাইড করে দাঁড় করিয়ে রাখা মারিদের দামি গাড়িটা আগুনে দাউদাউ করে পুড়ছে। আর সেই আগুন নেভাতে সিকদার বাড়ির আটজন পাহারাদার পরনের লুঙ্গি কোমরে লেংটি বেঁধে জগ, বালতি, বোল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে পুকুর থেকে পানি তুলে গাড়িতে ঢালছে। গাড়িটা আগুনে পুরো ছাই হয়ে যাচ্ছে দেখে মারিদ ও রাদিল অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। হাসিব দৌড়ে সবার সঙ্গে গাড়িতে পানি ঢালায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মারিদ নূরজাহানকেও দেখল, সে সবাইকে পুকুরঘাট থেকে পানি তোলায় সাহায্য করছে। হাসান সাহেবের পরিবারের ছেলে-মেয়ে, জোয়ান-বুড়া, কাজের লোক, পাহারাদার—সকলে মিলে দৌড়াদৌড়ি করে আহাজারি আর চিৎকারে গাড়িতে পানি ঢেলে আগুন নেভাচ্ছে।
অথচ মারিদ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটু আগেই তো এই আগুনটা ছিল না। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, তাহলে শেষ রাতে কে আগুন ধরাল মারিদের গাড়িতে? কে এসেছিল সিকদার বাড়িতে?
চলবে….
[ বিশাল বড়ো পার্ট দিলাম। আপনারা যারা #ডাকপ্রিয়র_চিঠি উপন্যাসটা পছন্দ করেন, সময় নিয়ে পড়েন তাদের কাছে অনুরোধ রইল অবশ্যই এই উপন্যাসটা রিভিউ দিবেন এবং এই গল্পটার ভালো প্রচার করবেন আশা করছি। আর যারা রিদ-মায়াকে ভালোবাসেন তাঁরা রিদ-মায়ার পাশাপাশি এই গল্পটাকেও ভালোবাসবেন অনুরোধ রইল। ]
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭