ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকা:রিক্তাইসলাম মায়া
২০
থানচি জেলায় গ্যাস নেই। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষগুলোর রান্না-বান্না হয় মাটির চুলায়। পাহাড়ি গাছ কেটে জ্বালানি বানানো হয়। সেই জ্বালানির রান্না। শাহানা বেগম চুলার পাড়ে বসে ভাপা পিঠা বানাচ্ছেন। আশনূর মাকে সাহায্য করছে; বড় বোলে চালের গুঁড়িগুলো ছোট ছোট বাটিতে সাজিয়ে রাখছে। শাহানা বেগম সেগুলো গরম পানির হাঁড়িতে দিয়ে ভাপ দিচ্ছেন। শেফালী ঘরের থালাবাসন পুকুর ঘাটে নিয়ে গেছে ধুতে। নুহাশ তারানূর বেগমের সঙ্গে বসে ভাপা পিঠা খেজুর রসে ডুবিয়ে খাচ্ছে। এই খেজুর রস হাসান সিকদার নিজেদের গাছ থেকে নিয়ে এসেছেন সবার জন্য। মারিদরা সকলেই ঘুমে। বাড়ির মেয়ে-বউরা শীতের পিঠার আয়োজনে ব্যস্ত। থানচি জেলার অন্যান্য সংস্কৃতির মধ্যে শীতের পিঠাও একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। শীতকালে এই গ্রামের বাড়ি বাড়ি পিঠা উৎসব দেখা যায়। গ্রামের মানুষ অধীর আগ্রহে বসে থাকে শীতকালীন নানান পিঠার স্বাদ নিতে। শাহানা বেগম প্রায় বেশ কয়েক রকম পিঠার আয়োজন করেছে—দুধফুলি, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা, এবং ঝাল পিঠা।
সকালে আজানের সঙ্গে সঙ্গেই উঠেছে বাড়ির সকলে। কাজ প্রায় শেষ দিকে, অবশিষ্ট কিছু ভাপা পিঠা বানাচ্ছেন শাহানা বেগম। মাজিদের বউ নদী শিলপাটায় শুঁটকির ভর্তা বাটছে চিতই পিঠার সঙ্গে খাওয়ার জন্য। নূরজাহান পিঠাগুলো হটপটে তুলে রাখছে যেন মেহমানরা ঘুম থেকে উঠে গরম খাবার খেতে পারে। হাসান সিকদার ফজরের নামাজ পড়ে ধানক্ষেত দেখতে গিয়েছিলেন। মাজিদ বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেছিল বলে এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। ছোট ছেলে তুতুল সেও বাবার সঙ্গে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। হাসান সিকদার যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন সকাল ৭:৫৬। চারপাশ ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। আশেপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে চারদিকে কুয়াশার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। হাসান গায়ে ক্রিম কালারের চাদর মুড়িয়ে নাকে, মুখে ও গলায় মাফলার পেঁচিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে নূরজাহানকে ডেকে বললেন…
‘ আম্মা, আম্মা, আমারে এক গেলাস কুসুম গরম পানি দিয়েন। তৃষ্ণা পাইছে ভিষণ।
বাবার গলা পেয়ে নূরজাহান টেবিলের ওপর থাকা ফ্লাস্ক থেকে গ্লাসে গরম পানি ঢেলে নিল। গরম পানির সঙ্গে কিছুটা ঠান্ডা পানি মিশিয়ে নিল। নুহাশ তারানূর বেগমের সঙ্গে ভাতঘরের পালঙ্কে বসে খাচ্ছিল। হাসান সিকদারের ডাক শুনে সে তারানূর বেগমকে প্রশ্ন করে বলল…
“বড়আম্মা, দাদাভাই পরী ফুফুকে আম্মা ডাকে কেন? দাদাভাই কি পরী ফুফির সন্তান, তোমার না?
নুহাশ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। তাকে শুদ্ধ ভাষা শেখানো হয়েছে। নুহাশের কথাটা শাহানা, আশনূর, নদী, হাসান, তারানূর, নূরজাহান সকলেই শুনেছে। হাসান ভাতঘরে ঢুকে নুহাশের কথায় হেসে ফেললেন। আশনূর বাটিতে চালের গুঁড়ি তুলতে তুলতে নুহাশের প্রশ্নের উত্তরে বলল…
“তোমার দাদাভাই ভালোবেসে তোমার পরী ফুফিকে আম্মা বলে ডাকে। তুমি যেমন তোমার আম্মুকে ভালোবেসে আম্মু ডাকো, তোমার দাদাভাইও ঠিক তেমন ভালোবেসে তোমার পরী ফুফিকে আম্মা ডাকে, বুঝেছ?
ছোট নুহাশ মাথা কাত করে সম্মতি দিল। যার অর্থ সে বুঝেছে। তবে আরও একটি প্রশ্ন করে বলল..
“দাদাভাই বড়আম্মাকে আম্মা ডাকে, পরী ফুফিকেও আম্মা ডাকে; তাহলে তোমাকে আম্মা ডাকে না কেন ফুফি? তোমাকে কি দাদাভাই ভালোবাসে না?
ছোট নুহাশ প্রশ্ন গুলো নিজের কৌতুহল মেটাতে করেছিল। ছোট মানুষ এতো কিছু হিসাব করে কথা বলে না। কিন্তু আশনূর হঠাৎ চুপ করে গেল। শাহানা বেগম বেশ শক্ত গলায় ধমকে উঠলেন নুহাশকে…
“খাইতে বইসা এতো কথা কিসের তোর? চড়াইয়া গাল ফাটায় দিব ছাগল। যাহ এইখান থেইক্কা!
দাদির ধমকে নুহাশের চোখে পানি চলে এল। সে অপমানে খাওয়া ছেড়ে উঠে যেতে চাইলে আশনূর তৎক্ষণাৎ নুহাশকে নিজের কাছে ডাকল…
“নুহাশ বাবা, এদিকে এসো ফুফির কাছে। দাদির কথায় রাগ করতে নেই। এসো ফুফি আদর করে দিচ্ছি। দাদি আর বকবে না তোমায়।
শাহানা বেগম বেশ গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। তাঁকে কেউ সহজে কিছু বলে না। আশনূর মাকে কিছু বলল না, পাছে যদি শাহানা বেগম আরও রেগে যান তাই। হাসান, তারানূর, নদী—তাঁরাও শাহানা বেগমকে কখনো কিছু বলে না। হাসান ঘরে ঢুকতেই নূরজাহান পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল। হাসান মেয়ের অসুবিধাটুকু বুঝে পায়ের দিকে তাকাতেই দেখলেন নূরজাহানের পা কাপড় দিয়ে বাঁধা। তিনি পানির গ্লাসটা হাতে না নিয়ে অস্থির ভঙ্গিতে বললেন…
“আম্মা, আপনের পায়ে কি হইছে? কাপড় বাঁধা ক্যান? আপনে এমনে হাটতাছেন ক্যান? ব্যথা পাইছেন?
এতো শীতেও নূরজাহানের গায়ে শীতবস্ত্র নেই। সাদামাটা থ্রি-পিস পরা। গায়ের ওড়নাটা দিয়ে মাথায় গোল করে পেঁচিয়ে রেখেছে। পা-টা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা ফুলে আছে দেখে হাসান আরও অস্থির ও উত্তেজিত হলেন। নূরজাহান সালোয়ার টেনে পা ঢাকতে চেয়ে বলল…
“কিছু হয়নি আব্বা। রাতে কারেন্ট না থাকায় অন্ধকারে ঘরে যেতে গিয়ে দরজার কোণায় পা বাড়ি খেয়েছিলাম, সেজন্য পা-টা একটু ফুলে গেছে। আমি ঠিক আছি। আপনি পানিটা নেন।
নূরজাহান যেন আগে থেকেই কথাগুলো গুছিয়ে রেখেছিল হাসানকে বলার জন্য। গুছানো কথাগুলো বলতে নূরজাহানের অসুবিধা হয়নি, কিন্তু হাসান তৃষ্ণার্ত থাকার পরও পানিটা নিলেন না। বরং আহাজারি করে নূরজাহানের গায়ে নিজের চাদরটা খুলে জড়িয়ে দিতে দিতে বললেন…
“আপনের না কতবার কইছি আম্মা, শীতের কাপড় ছাড়া ঘর থেইক্কা বাইর হইবেন না। দেখি, আপনের পাওটা দেখান আমারে।
কথা বলে হাসান নূরজাহানের পায়ের সামনে বসে যেতেই নূরজাহান বাধা দিয়ে বলল…
“আব্বা আমি ঠিক আছি, আপনি চিন্তিত হবেন না।
হাসান শুনলেন না। নূরজাহান খালি পায়ে ফ্লোরে দাঁড়িয়ে। পা দুটো হাড়হিম ঠান্ডায়। হাসান কাপড় মোড়ানো নূরজাহানের পা-টাতে হাত দিতেই নূরজাহান ব্যথায় দাঁতে দাঁত পিষল। হাতের গ্লাসটা কেঁপে উঠলে নূরজাহান সেটা টেবিলের ওপর রাখল। সে আড়চোখে রান্নাঘরের দিকে একবার তাকাল। শাহানা বেগমের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। তিনি আগের মতোই মনোযোগ সহকারে ভাপা পিঠা হাঁড়িতে দিচ্ছেন। নদী শিলপাটা বাটা বন্ধ রেখে একপলক নূরজাহানের দিকে তাকায়। নূরজাহান তাকাতেই নদী নিজের কাজে মনোযোগী হয়। শাশুড়ির সামনে কাজ ফেলে উঠে যাওয়ার সাহস নদীর নেই। শাশুড়িকে ভীষণ ভয় পায় সে। তবে আশনূর হাতের কাজ ফেলে আস্তে করে উঠে এল। নূরজাহানকে সকাল থেকেই খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেছিল সে, কিন্তু বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল হয়তো হালকা আঘাত পেয়েছে কোথাও।
হাসান যখন নূরজাহানের পায়ে পেঁচিয়ে রাখা রক্তমাখা কাপড়টা খুললেন, তিনি আঁতকে উঠলেন। কাপড় সরিয়ে তিনি চিৎকার করে বললেন…
“আম্মা এইডা কি করছেন? আপনের পা এমনে কাটলেন কেমনে? আল্লাহ গো! ওই মান্না? মান্নারে? তাড়াতাড়ি রশিদরে খবর দে গাড়ি লইয়া আইতে ক। আমার আম্মারে হাসপাতালে লইয়া যাইতে হইব। ও মান্না? মান্নারে?
হাসান সিকদারের হৈচৈ আর কান্নায় মান্না উঠান থেকে দৌড়ে এল। মাজিদ ঘুমিয়ে ছিল, সেও বাবার চিৎকারে ধড়ফড়িয়ে উঠে এল। আশনূর, তারানূর নূরজাহানের পা দেখে হতভম্ব। নদী রান্নাঘর থেকে উঁকি মারছে, কিন্তু শাশুড়ির ভয়ে আসতে পারছে না। শাহানা বেগমের মধ্যে তখনো কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। তিনি আগের মতোই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যেন সবকিছু স্বাভাবিক, অথবা তিনি হাসান সিকদারের চিৎকার শোনেননি। নূরজাহান ফের রান্নাঘরের দিকে একপলক দেখে হাসানকে বলল…
“আব্বা আমি ঠিক আছি। আপনি অযথা ব্যস্ত হবেন না।
মাজিদ ঘুম থেকে উঠে এসে কোমরে লুঙ্গির গিঁট দিতে দিতে নূরজাহানের পা দেখে উত্তেজিত গলায় বলল…
“হায় হায়! পা-টা এতোটা কীভাবে কাটলি পরী? সন্ধ্যাতেও তো তোকে ঠিক দেখলাম?
“কারেন্ট না থাকায় অন্ধকারে ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে দরজার কোণায় লেগে কেটেছে ভাই।
মাজিদ নূরজাহানের কথার বিদ্রুপ করে বলল…
“দরজার কোণায় লেগে এতোটা কীভাবে কাটল? আর যখন কাটল তখন কাউকে ডাকলি না কেন? এই পা নিয়ে সারারাত কীভাবে ছিলি? ব্যথা হয় নাই?
মান্নার পেছন পেছন রাদিল ও মারিদ এসে বসার ঘরে দাঁড়াল। মেহমান হয়ে ভাতঘরে যাওয়াটা দৃষ্টিকটু দেখাবে বলে ওরা দুজন বসার ঘরেই দাঁড়িয়ে রইল। ওরা আর কিছুক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে ছিল। হাসান সিকদারের চিৎকারে ওরা দৌড়ে আসে। মান্না ভাতঘরে ঢুকতেই মাজিদ বলল…
“মান্না, রশিদ ভাইকে বল ওনার অটোরিকশাটা নিয়ে আসতে। পরীকে হাসপাতালে নিতে হবে…
মাজিদের কথা শেষ হওয়ার আগে মান্না বাধা দিয়ে বলল…
“আমাগো বাড়িতে যে ডাক্তার সাব আছেন, হেগোরে দেখাইলে হইব না মাজিদ ভাই?
মারিদের কথা কারো মনে ছিল না। রাদিল যে ডাক্তার, তা সবাই জানত। পরিচয় হয়েছিল আগে। কিন্তু মাজিদের সঙ্গে মারিদের এখনো পরিচয় হয়নি, কারণ সে অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিল। মাজিদ বলল…
“ওনারা ঘুম থেকে উঠেছেন?
“জে ভাইজান। সামনের ঘরে দাঁড়াইয়া আছেন। নূরজাহান বুবুরে ঐখানে লইয়া গেলেই হইব।
হাসান ও আশনূর নূরজাহানকে ধরে বসার ঘরে নিয়ে গেল। এর মধ্যে নূরজাহান কয়েকবার বলেছে যে তাকে ডাক্তার দেখাতে হবে না, সে এমনি ঠিক হয়ে যাবে। রাদিল রিফাতের মুখে নূরজাহানের রূপের বর্ণনা বেশ কয়েকবার শুনেছিল। আজ সরাসরি দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল এবং অস্ফুট স্বরে ‘মাশাআল্লাহ’ বলল। মারিদ সেটা শুনেছে, তবে মারিদের দৃষ্টি নূরজাহানের কাটা পায়ের ওপর। নূরজাহান যে রাতে মারিদের দেওয়া ফার্স্ট এইড বক্স নেয়নি, সেটা সে সকালে নূরজাহানের ঘরের দরজার সামনে বক্সটা পড়ে থাকতে দেখে বুঝেছিল। নূরজাহানের অহংকার নাকি অন্য কিছু—মারিদকে এড়িয়ে যাওয়াটা, তা মারিদ জানে না। তবে নূরজাহানের এই উপেক্ষা মারিদের মনে অস্বস্তি জাগাচ্ছে। একটা সোফায় নূরজাহানকে বসানো হলো। হাসান সিকদার মারিদের হাত ধরে বললেন…
“বাজান, আমার মাইয়াটার পাওটা একটু দেখেন। কেমনে কাটল এতোটা আল্লায় জানে।
“আমি দেখছি আঙ্কেল।
মারিদ রাদিলকে ইশারা করতেই রাদিল নূরজাহানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বসল। নূরজাহানের বাঁ পা-টা রক্তাক্ত অবস্থায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। সাদা পা-টা রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে গেছে। রাদিল ক্ষতস্থান দেখে বলল…
“পা এতোটা কাটল কীভাবে?
নূরজাহান সবাইকে যা বলেছিল, রাদিলকেও তাই বলল…
“অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে দরজায় পা লেগে কেটে গেছে।
“দরজাটা কি লোহার ছিল?
“না, কাঠের।
“কিন্তু আপনার ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে আঘাতটা আপনি কাঁচ জাতীয় কিছু দিয়ে পেয়েছেন।
নূরজাহান চুপ। রাদিলের হাতে নূরজাহানের বাঁ পা-টা অনবরত কাঁপছে। হাসান অস্থিরভাবে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। মাজিদ, আশনূর, তারানূর, নুহাশ সবাই রাদিলের ডানপাশে দাঁড়িয়ে। বাঁ পাশে শুধু মারিদ একা। রাদিল বলল…
“আমাকে একটা পাত্রে কুসুম গরম পানি দিন কেউ। ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করতে হবে, ভেতরে কাঁচ থাকতে পারে। মান্না, আপনি আমাদের ঘর থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে আসুন। হাসিবকে বললে ও বের করে দিবে আপনাকে।
মান্না বক্স নিয়ে এল। আশনূর গরম পানি আনল। রাদিল দক্ষতার সঙ্গে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে লাগল। নূরজাহানের জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে যন্ত্রণায় চিৎকার করত, অথচ নূরজাহান শান্ত। অসহ্য ব্যথায় সে কখন চাদরের নিচ থেকে মারিদের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে, তা ওহ নিজেও খেয়াল করেনি। মারিদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না; পাছে যদি অন্যেরা কিছু মনে করে তাই। নূরজাহানের হুশ ফিরতেই সে চট করে হাতটা সরিয়ে নিল। ড্রেসিং শেষে আশনূর তাকে ঘরে নিয়ে গেল। মারিদ নূরজাহানের যাওয়ার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল। রাদিল উঠে দাঁড়ালে মাজিদ হাত বাড়িয়ে মারিদ ও রাদিলের সঙ্গে করমর্দন করে বলল…
“আপনাদের কথা বাবার কাছে অনেক শুনেছি। আজ দেখা হয়ে ভালো লাগল। বাবার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল গ্রামে একটা হাসপাতাল বানাবে। আজ আপনাদের হাত ধরে সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে বলে আমরা চির কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে।
~~
চৌরাস্তার মাথায় একটা জমির ওপর দাঁড়িয়ে মারিদ, রাদিল, হাসিব, মাজিদ আর হাসান সিকদার। ওরা এই নিয়ে মোট ছয়টি জমি দেখেছে, এটি ষষ্ঠ। এই জমিটি মারিদের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে। মারিদ ব্যবসায়িক মানুষ, সে জমিজমার ব্যাপারে সুবিধা-অসুবিধা বোঝে ভালো। মারিদের পরনে ফরমাল সেটআপ—সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট ইন করে পরা। চোখে রোদচশমা। রাদিল ও হাসিবও তাই পরেছে, তবে রংটা ভিন্ন। রাদিল মেরুন শার্ট ও কালো প্যান্ট। হাসিব মিষ্টি রঙের শার্ট ও কালো প্যান্ট পরেছে। রোদচশমা শুধু রাদিল ও মারিদ পরেছে। হাসান সিকদার সাদা লুঙ্গি ও ফতুয়া পরেছেন। মাজিদ একটা চেক শার্ট পরেছে, পায়ে চামড়ার জুতো। ছয়টি জমি মারিদের অনুপস্থিতিতে হাসান সিকদার দেখে যাচাই করে রেখেছিলেন মারিদ থানচিতে আসলে দেখাবেন বলে। সকলের জমি দেখার মাঝে হাসান সিকদার মারিদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বললেন…
”মারিদ সাব, আপনেরে একখান কথা কইতাম যদি কিচ্ছু মনে না করেন।
মারিদ আশেপাশে জমি দেখায় মনোযোগ দিয়ে বলল…
”জি আঙ্কেল, বলুন শুনছি আমি।
হাসান নির্দ্বিধায় বললেন…
”আমার মাইয়া নূরজাহান কইছে বাকি সব জমির থেইক্কা এই জমিটা ভালো হইব হাসপাতাল বানানের লাইগা। আমার মাইয়া নূরজাহান কইছে আপনাগোরে এই জমিটা ভালো কইরা দেখাইয়া কইতে; এই জমি চারডা রাস্তার মাঝে আছে। তিনডা রাস্তা তিন গেরামে গেছে আর চার নাম্বার রাস্তাডা শহরে গেছে। চার রাস্তার মোড়ে এই জমিটা হওনের লাইগা তিন গেরামের মানুষ সহজেই এই হাসপাতালে আওন-যাওন করতে পারব। হেরপর কোনো ইমার্জেন্সি কারণে শহরেও যাওন যাইব সহজে। এতে আমাগো গেরামের মানুষের লগে আরও পাঁচ গেরামের মানুষও সুযোগ-সুবিধা পাইব হাসপাতাল থেইক্কা, যদি এই জমিতে হাসপাতাল বানানো হয় তাইলে।
মারিদ এতক্ষণ এই জমিটা সম্পর্কে তাই বিশ্লেষণ করছিল। চৌরাস্তার মোড়ে জমিটা হওয়ায় আশেপাশের গ্রামের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষজনও সুবিধা পাবে। মূলত এই বিষয়টাই সে এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল। হাসান সিকদারের মুখে নূরজাহানের নাম শুনে মারিদের মনোযোগ হাসানের দিকে গেল। মারিদ জানে না নূরজাহান নামটার মাঝে কী আছে। যাই থাকুক, এমন কিছু তো আছে যা মারিদকে টানে। মাজিদ এগিয়ে এসে বাবার কথায় সায় দিয়ে বলল…
”আমাদের নূরজাহান যখন বলেছে, তারমানে আপনারা এই জমিটা দেখতে পারেন মারিদ সাহেব। আমার বোনের কথাগুলো কিন্তু অযৌক্তিক নয়।
মারিদ চশমার আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল হাসান সিকদারের দিকে। বলল…
”এই জমিগুলো কি আপনি সিলেক্ট করেছেন আঙ্কেল?
”না বাজান। আমি এই জমিজমার এত সুযোগ-সুবিধা কিচ্ছু বুঝি না। আমার নূরজাহানই আমার লইয়া আপনাগোর লাইগা সবগুলো জমি দেইখা রাখছিল। হের মধ্যে এই একখান জমির কথা নূরজাহান আপনেগোরে বুঝাইয়া কইতে কইছিল।আমার নূরজাহান অনেক বুদ্ধিমতী। আশাকরি ঠকবেন না।
নূরজাহান, নূরজাহান, নূরজাহান—এই নামের সঙ্গে একটা অদ্ভুত টান, অদৃশ্য বেড়াজাল, অসংখ্য কল্পনা-জল্পনা আর এক আকাশ কৌতূহল ধীরে ধীরে মারিদকে গ্রাস করে নিচ্ছে। মারিদ ভারী নিশ্বাসের সঙ্গে বলল…
”এই জমির মালিকের সঙ্গে বসার আয়োজন করুন আঙ্কেল। আমরা এই মাসের শেষে হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজ শুরু করে দিতে চাই।
স্বপ্ন পূরণের উচ্ছ্বাসে হাসান সিকদার ভারী শরীর দুলিয়ে হেসে বললেন…
”ইনশাআল্লাহ তাই হইব বাজান।
~~
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সময় ৪:১১। নূরজাহান পড়ার টেবিলে বসে প্রিয় ডায়েরি লিখছে। এই ডায়েরিটা নূরজাহানের খুব শখের। তার মায়ের দেওয়া উপহার এটি। তাই নূরজাহান সবসময় যত্ন নিয়ে এই ডায়েরিতে সুখ-দুঃখের কথা লেখে। নূরজাহানের কোনো বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রেমিক পুরুষ নেই। গোটা পৃথিবীতে ঘনিষ্ঠ বলতে বাবা আছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। হাসান সিকদারের পর নূরজাহানের জীবনে এক অচেনা অজানা বসন্ত এসে হাজির হয়েছিল। যাকে নূরজাহান ‘ব্যবসায়ী সাহেব’ বলে চিনত। কতো বাধা-বিপত্তি ঝড়-ঝাপটার মাঝেও নূরজাহান ব্যবসায়ী সাহেবের সঙ্গে ভালো ছিল। ক্ষণের জন্য হলেও রঙিন স্বপ্ন হয়ে সে বাস্তবে এসেছিল নূরজাহানের জীবনে। তারপর নূরজাহান কেমন করে যেন সেই ব্যবসায়ী সাহেবকে হারিয়ে ফেলল, আর খুঁজে পায়নি। সে ফিরেও আসেনি। নূরজাহানের সাহসে কুলাল না ব্যবসায়ী সাহেবকে খোঁজার কিংবা তাকে বাস্তবে দেখার। নূরজাহান জানে না ওর ব্যবসায়ী সাহেব দেখতে কেমন বা কী তার পরিচয়। হঠাৎ বসন্তের মতো যেমন নূরজাহান একদিন ব্যবসায়ী সাহেবের নম্বরটা পেল, তেমন হঠাৎ তান্ডবে হারিয়েও ফেলল। নূরজাহান টেবিলে মাথা ফেলে অলস ভঙ্গিতে ডায়েরির পাতায় কলম ঘোরাচ্ছে। চোখে অবাধ্য জল। হালকা নাক টানার শব্দ…
~ ক্লান্ত মন, অসহ্য বুক ব্যথা, মাথার ভেতর কিলবিল করছে অবাধ্য চিন্তা। তোমায় ভেবেই সকাল, সন্ধ্যা, রাত; এই বুক ব্যথার কি কোনো নিবারণ নেই?
~ তুমি এসেছিলে অমাবস্যার কালো রাত্রে, ঘোলাটে অন্ধকারে। তোমাকে দেখার ইচ্ছায় আমি রাতভর জেগে ছিলাম। অথচ তুমি হারিয়ে গেলে, আমার হয়েও তুমি হওনি। আমার যেটুকু ভালো হওয়ার ছিল, সেটুকু তোমার হোক।
নূরজাহানের কলম থামল। তারপর দুফোঁটা চোখের জল ফেলে লেখল…
~ আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি ব্যবসায়ী সাহেব। আপনাকে হারিয়ে ফেলার মতো মৃত্যুযন্ত্রণা পাচ্ছি।
”আম্মা, আপনি ঘরে আছেন?
দরজার বাইরে থেকে হাসান সিকদারের ডাকে নূরজাহান ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। দুই হাতে দ্রুত চোখ মুছে ডায়েরিটা বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে ফেলে বলল…
”জি আব্বা, ঘরে আসুন।
হাসান সিকদার ঘরে এলেন। সহযত্নে নূরজাহানের আহত পায়ের কাছে মাটিতে বসে পায়ে হাত দিতেই নূরজাহান আঁতকে উঠল। হাসান সিকদারকে বাধা দিয়ে বলল…
”আব্বা কি করছেন? পায়ে হাত দিবেন না, আমার পাপ হবে। আপনি উঠে বসুন।
হাসান সিকদার শুনলেন না। জোরপূর্বক নূরজাহানের পা-টা নিজের হাতে নিয়ে ব্যান্ডেজ দেখে অশ্রুভরা চোখে বললেন…
”আপনে আমার অনেক যত্নে বেড়ে ওঠা এক সুন্দর চাঁদ আম্মা। আপনার অযত্ন আমার কলিজায় বিঁধে।
নূরজাহান বাবার অশ্রুভরা চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, ওর দুচোখও জলে টইটম্বুর হয়ে উঠল। তক্ষুনি ঘরে আশনূর ঢুকল হাসান সিকদারের জন্য চা নিয়ে। হাসান ঘরে ঢুকেই নূরজাহানের কাছে চা চেয়েছিলেন তখন। কিন্তু মনে ছিল না নূরজাহানের অসুস্থতার কথা। হঠাৎ নূরজাহানের অসুস্থতার কথা মনে হওয়ায় দৌড়ে তার ঘরে চলে আসেন। আর সেজন্য নূরজাহানের জায়গায় আশনূর চা করে আনে। হাসানকে মেঝেতে বসে নূরজাহানের পায়ে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে আশনূর পড়ার টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা রেখে বলল…
”আপনার চা আব্বা। পরে খেয়ে নিয়েন।
কথাটা বলে আশনূর চলে যেতে চাইলে হাসান তাকে থামিয়ে পালঙ্কে বসতে বলেন। আশনূর বসলে হাসান বললেন…
”আম্মা, আপনার জন্য একখানা বিয়ার সম্বন্ধ আইছে। আপনার ভাই মাজিদ বিয়াটা হাতে নিছে। আপনি যদি কন তাইলে…
হাসানের কথা শেষ হওয়ার আগে আশনূর সম্মতি দিয়ে বলল…
”আমার কোনো কিছুতে আপত্তি নেই আব্বা। আপনাদের যেটা ভালো মনে হয় সেটা করুন। বাপ-ভাইয়ের পছন্দই আমার পছন্দ।
কথাটা আশনূর কেমন উদাসীনতায় বলে উঠে গেল। নূরজাহান আশনূরের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আশনূরের কোনো পছন্দ আছে কি না, নূরজাহান সঠিক বলতে পারছে না। তার সঙ্গে নূরজাহান ফ্রি নয়, যার জন্য আশনূর তাকে কিছু বলতে চায় না। তবে নূরজাহানের কেন জানি মনে হচ্ছে, মারিদ সাহেবের বিয়ের প্রস্তাবটা হয়তো আশনূরের জন্যই এসেছে। কাল সন্ধ্যায় কলপাড়ে মারিদকে সে আশনূরের দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখেছিল। হাসান সিকদার আশনূরের জবাবে অন্তত খুশিতে উচ্ছ্বসিত হলেন।
চলিত…
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০