ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
১৪
দু’হাতে মাথা চেপে বেঞ্চে বসে মারিদ। বর্তমানে তাদের অবস্থান দোকানদার রহিম মিয়া দোকানে। হাসিব রাস্তা আর দোকানের মাঝের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে। রিফাত থেকে থেকে চঞ্চল পায়ে পায়চারি করছে অস্থির মনে। আর মারিদ তখন থেকেই শান্ত ভঙ্গিতে বসে তখনকার মেয়েটিকে ঘিরে। অপরিচিত মেয়েটি ধুমকেতুর মতো আসল আবার ধমকা হাওয়ায় হারিয়েও গেল। রিফাত চেয়েছিল মেয়েটির পিছনে যেতে কিন্তু মারিদের জন্য সে তা পারেনি। মারিদ মেয়েটি অদৃশ্য হওয়া দেখল, তারপরও টুঁ-শব্দটিও করল না। কেমন বোবার মতো নিশ্চুপ সে। আর এতে চিন্তাগ্রস্ত রিফাত। মেয়েটি আসলে কে, সেটা এখনো জানা হলো না আর না হাসান মেম্বারের বাড়িতে যাওয়া হলো। যদি মারিদ অপরিচিতার খোঁজই না করবে, তাহলে ঢাকা থেকে এতদূরে থানচিতে আসল কেন? বোবা হয়ে বসে থাকতে? উফফ! এবার তো মারিদের থেকে রিফাতেরই বেশি অস্থির অস্বস্তি লাগছে তখনকার মেয়েটিকে জানার জন্য।
‘কিরে ভাই, তুই উঠবি? মরার মতোন শক্ত হয়ে বসে আছিস কেন? বা’ল তোর জন্য আমার অস্থির পাগল পাগল লাগছে। আয় না ভাই, চল না মেয়েটার খোঁজ করি।
মারিদের হেলদোল না দেখে রিফাত ফের বলে উঠল…
‘দেখ মারিদ, আমি আগেই বলে রাখছি, মেয়েটা যদি তোর অপরিচিতা না হয়, তাহলে সে কিন্তু আমার, বুঝলি? তাঁকে কবুল করে বউ বানিয়েই বাড়ি ফিরব, তার আগে না। আম্মারে একটা ফোন দেই। বলি, তার ছেলে বউ পেয়ে গেছে। আহা! আমার কত শান্তি লাগছে ভাই। জীবনের প্রথম আর শেষ ক্রাশ খাইছি থানচিতে এসে। বিয়ে তো আমি এই গ্রামের মেয়েকেই করব, কনফার্ম।
কথা শেষে রিফাত চট করে পকেট থেকে ফোন বের করল। অস্থির মতো নিজের মাকে কল মিলাতে চাইলে সেখানে শোনা গেল কোনো পুরুষালি কণ্ঠ। দোকানী রহিম মিয়া আগত লোকটার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বসল তক্ষুনি…
‘আসসালামু আলাইকুম, মেম্বার সাব।
‘ওয়ালাইকুম সালাম! রহিম, এই পোলাডারে কিছু খাওন দে তো।
‘জি, মেম্বার সাব। এহনই দিতাছি।
শীতের সকাল হওয়ায় গ্রাম্য রাস্তায় তখনো মানুষের আনাগোনা কম। দোকানী রহিম মিয়া সঙ্গে আগন্তুকের কথোপকথনে রিফাত, হাসিব, দুজনই তাকায় সেদিকে। মারিদ তখনো মাথা নুইয়ে বসে। কে এসেছে সেটা দেখল না। রিফাত এক পলক আগন্তুক হৃষ্টপুষ্ট পালোয়ান টাইপের লোকটাকে দেখে সে আবার ফোনে মনোযোগ দিল নিজের মাকে কল করতে। এর মাঝে মারিদের পাশাপাশি একটা পনেরো-ষোলো বছরের হতদরিদ্র পাগল টাইপের ছেলে বসল খাবার খাওয়াতে লোকটা। আগন্তুক লোকটার সাথে আরও একটা বিশ-একুশ বছরের ছেলে ব্যাগভর্তি দু’হাতে কাঁচাবাজার নিয়ে দাঁড়িয়ে। দোকানী রহিম মিয়া দ্রুত চায়ের কেটলি থেকে চা কাপে ঢেলে দেওয়ার মাঝে মোটাতাজা লোকটা রুটি কলা ছিঁড়ে পাগল ছেলেটার হাতে তুলে দেওয়ার সময় দোকানদার রহিম মিয়া রঙ চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল…
‘মেম্বার সাব, এই তিনজন ভাইজানেরা শহর থেইক্কা আইছে আপনার লগে দেখা করতে। ওনারা কইল, আমাগো গেরামে নাকি হাসপাতাল বানাইতে চায়। এ লাইগা আপনের লগে পরামর্শ করবার চায়।
‘আমাগো লগে কারা পরামর্শ করবার চায় রহিম?
‘ঐ যে আপনের পিছনের তিনজন ভাইজান আছে ওনারা।
অন্যমনস্ক তিনজনই ভিন্ন চিন্তায় বিভোর। রিফাত নিজের মাকে ফোন লাগাতে ব্যস্ত। মারিদ পাথরের মতো বসে। আর হাসিব দ্বিধাগ্রস্ত। সে তখন মারিদ-রিফাতের দৌড়ে যাওয়া মেয়েটিকে দেখেনি। তাই মারিদের মন্থর মনোভাব আর রিফাতের অস্থির হওয়ার কারণটা জানে না। সেজন্য রহিম মিয়ার কথায় মনোযোগ হাসিবও রাখতে পারল না। হাসান মেম্বার ঘুরে তাকাল তিনজন তাগড়া যুবকের দিকে। পোশাকে-আশাকে তিনজনকে শহুরে মানুষ দেখে মনে হলো ওনার। রিফাত-হাসিব ওনার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকায় স্বাভাবিক ভাবে ওনার দৃষ্টি যায় নুইয়ে থাকা মন্থর মারিদের দিকে। গায়ের কালো হুডিতে মাথা ঢাকা থাকায় তিনি মারিদের উদ্দেশ্যে গলা খাঁকরিয়ে বললেন…
‘আমি এই গেরামের মেম্বার। আমার নাম হাসান সিকদার। আপনেরা কি আমারে খুঁজতাছেন?
হাসান নামটা কানে যেতেই মারিদ, রিফাত, হাসিব তিনজনই তৎক্ষণাৎ তাকাল হাসান মেম্বারের দিকে। মারিদ মাথা উঁচু করে কয়েক পলক হাসান মেম্বারকে দেখে উঠে দাঁড়াল মাথার হুডিটা পিছনে ফেলে। থমথমে পরিবেশে হাসান মেম্বার মারিদকে আরও কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যান মারিদের মুখের দিকে তাকিয়ে। মনে করার চেষ্টা করেন তিনি এই মুখটা কোথায় দেখেছেন? মারিদ, হাসিবের ক্ষেত্রেও তাই। থানচি জেলায় এসে হাসান মেম্বারকে তাদের হঠাৎ পরিচিত মনে হলো কেন? কোথায় দেখেছে তারা? এর মাঝে হঠাৎ হাসান মেম্বার মারিদের দু’হাত টেনে মুঠোয় চেপে মারিদের মুখের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্লতায় বলতে লাগলেন…
‘আপনে আমারে চিনছেন বাজান? আমি হেই লোক, যার মাইয়্যারে আপনে আর আপনার বইন একবছর আগে বাঁচাইছিলেন। আমারে এহন চিনবার পারছেন বাজান?
মারিদ দীর্ঘক্ষণের মন্থরতা ত্যাগ করে ছোট গলায় জানতে চেয়ে শুধালো…
‘আপনি হাসান মেম্বার?
‘হ, বাজান। আমার সৌভাগ্য আপনে আমার গেরামে আইছেন। চলেন বাজান, আমার বাইতে চলেন। আমার আম্মা আপনারে দেখলে মেলা খুশি হইব।
শুধু মারিদ একা চমকিত, হতবিহ্বল, হতবুদ্ধ হয়নি। সাথে রিফাত-হাসিবও হয়েছে। তাদের গন্তব্য যে পায়ে হেঁটে তাদের কাছে চলে আসবে, সেটা কে জানতো? মারিদ তো, এই মূহুর্তে বাকহারা। এক বছর আগে সুখ কাকে না কাকে বাঁচাতে গিয়ে গুন্ডাদের হাতে পড়েছিল বলে সে গিয়েছিল বোনকে বাঁচাতে। কিন্তু ভাগ্যের চক্রে যে হাসান মেম্বার আর তার মেয়ের দুয়ারে এসে দাঁড়াবে সে, সেটা বুঝতে পারেনি। আচ্ছা, সুখ যে বলেছিল অ্যাম্বুলেন্সের মেয়েটা অসুস্থ ছিল, তাহলে কি সেদিন ঐ অ্যাম্বুলেন্সে মারিদের অপরিচিতা ছিল? নাকি অন্য কেউ? সেদিন কি মারিদ তার অপরিচিতাকে বাঁচিয়েছিল সুখের সূত্র ধরে? হাসান মেম্বারের কোন মেয়ে মারিদের অপরিচিতা? বড় মেয়ে নাকি ছোট মেয়ে? তানিয়া মেয়েটিও ঠিক করে বলেনি হাসান মেম্বারের কোন মেয়ে মারিদের অপরিচিতা। সে শুধু কাগজ লিখে ছিল, হাসান মেম্বার মেয়ে মারিদের অপরিচিতা। এবার বড় মেয়ে নাকি ছোট মেয়ে সেটা উল্লেখ্য করেনি। আর একটু আগে যে মেয়েটিকে দেখেছিল মারিদ যাকে বৃদ্ধা মহিলাটি হাসান মেম্বারের মেয়ে নূরজাহান বলে ডাকছিল? সেতো মারিদকে চিনতে পারেনি৷ মারিদের অপরিচিতা হলে ঠিক চিনতো। অস্বীকার করতো না। ওদের দুজনের ফোন আলাপে অপরিচিতা বেশ কয়েকবার বলেছিল সে মারিদকে চেনে, ফোন করেছে, সেজন্য মারিদ অপেক্ষা করুক অপরিচিতা নিজ থেকে পরিচয় দেওয়ার। তাহলে আজ যদি নূরজাহান অপরিচিতা হতো তাহলে তাঁকে ঠিক চিনতো। হয়তো হাসান মেম্বারের দ্বিতীয় মেয়েই মারিদের অপরিচিতা হবে। মারিদ ঘোলাটে চোখে শুধু হাসান মেম্বারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হাসান মেম্বার মারিদের হাত টেনে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে যেতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ-একুশ বছরের ছেলেটিকে উদ্দেশ্যে করে বলল..
‘মান্না, তুই রহিমের দোকানে টাহাটা দিয়া জলদি আয়। আইজ বাইত মেমান আইছে। জলদি আয়।
‘অইল মেম্বার সাব আইতাছি।
বিশ-একুশ বছর বয়সী মান্না সম্মতি দিতেই হাসান মেম্বার মারিদের হাত টেনে রিফাত-হাসিবের উদ্দেশ্যে বললেন…
‘ বাজান, আপনেরাও আমার লগে আইয়েন। আইজ আপনাগো আমাদের বাইতে দাওয়াত। সকালের খাওনের আয়োজনের কথা কমুনে। আয়েন, আয়েন।
রিফাত-হাসিব মারিদের দিকে তাকাতে মারিদ চোখের ইশারা করল যেতে। যেহেতু তাদের গন্তব্য প্রথম থেকেই হাসান মেম্বারের বাড়ি ছিল, তাই এখন তাদের কাজটা আরও সহজ হয়ে গেল। মারিদ হাসান মেম্বারের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। মাথায় তার নানান চিন্তা। অপরিচিতার সঙ্গে ফোনে কথা হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতকিছু মারিদ বয়ে বেড়িয়েছে সেসব কিছু যেন এক ঝলক মনে পুনরাবৃত্তি হতে লাগল মারিদের। হাসিব-রিফাতের মাঝেও একই কৌতূহল। শীতের উষ্ণ কুয়াশা ভেদ করে মারিদ গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে প্রথমে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বটগাছটা পেরিয়ে এগোল সোজা পশ্চিমে রাস্তায়। মাত্র বিশ-পঁচিশ কদম এগোতেই উঠল একটি শান্ত বাড়ির উঠানে। বিশাল বিস্তৃত উঠোনকে ঘিরে আছে কাঠ আর টিনের বাঁধা করা তিনটি ভিটা-মাটির ঘর। সাথে আলাদা করে বারান্দা আর তাতে রাখা বেতের মোড়া। মারিদ এক পলক চোখ ফেলল বাড়ির পেছনের দিকটায়। একদিকে বাঁশগাছের ঘন গাছি এবং তার উল্টো দিকে বড় কড়ই গাছের ছায়ায় বেড়ে ওঠা দুটো আমগাছ, যার ডালপালা সস্নেহে টিনের চালে নুইয়ে আছে। বিশাল বড় বাড়িটা দেখে মারিদের মনে হলো হাসান মেম্বার এই গ্রামের অর্থসম্পদশালী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। বাড়ির এক পাশে একজন মহিলাকে দেখা গেল হাঁস-মুরগিকে খাবার দিতে। হয়তো সে কাজের মহিলা হবে। পোশাক-আশাকে তো মারিদের তাই মনে হলো। বাড়ির মধ্যের যে ঘরটা আছে তার বারান্দায় বসে থাকতে দেখা গেল তখনকার রাস্তায় পাওয়া বৃদ্ধা মহিলাটির সঙ্গে আরও একজন বয়স্ক বৃদ্ধা মহিলাকে। হাসান মেম্বার মারিদকে নিয়ে সেই মধ্যের ঘরটার দিকে এগোতে এগোতে হাঁক ছেড়ে বললেন…
‘আম্মা! দেইখো, কা’রে নিয়া আইছি! ওনারা ঢাকা থেইক্যা আইছেন। তোমারে যে কইছিলাম না—আমাগো নূরজাহানের জান বাঁচাইছিল দুজন ভাই-বইন মিল্লা? আইজ আমি ওগোরে নিয়া আইছি, আম্মা! ওরা আমাগো বাড়ির মেহমান।
হাসান মেম্বারের মা তারানূর বেগম। বয়স সত্তরের ঊর্ধ্বে। গায়ের রঙ মাথার পাকা সাদা চুলের মতোই টকটকে ফর্সা। এক ঝলক বয়স্ক তাঁরানূরকে দেখলে যে কেউ বলবে যুবতী কালে না জানি কত সুন্দরী ছিলেন এই মহিলা। বারান্দায় বসে বয়স্ক তারানূর সখী ফুলবানুকে নিয়ে পান চিবোতে চিবোতে শুনছিল তখনকার সাহায্য করা তিন যুবকের কথা। এর মাঝে হাসান ডাকলে তিনি মারিদের উপস্থিতি বুঝে মাথায় কাপড় টানতে টানতে পানের বাটাটি সরিয়ে রাখলেন পাশে। খোলা বারান্দায় মারিদের বসার জায়গা করে দিতে দিতে আন্তরিকতায় বলল…
‘ আসো ভাই। বসো। তোমাগোরে দেখাবার মেলা ইচ্ছা আছিল আমার। তুমি আমার পোলা আর নাতনীর জীবনডা বাঁচাইছো। আমি চিরঋণী থাহোম তোমাগো কাছে।
মারিদ বেতের মোড়ায় বসার আগে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল বয়স্ক তারানূরের। পাশাপাশি তখনকার ফুলবানুকেও সালাম করল। মারিদের সালাম করা দেখে রিফাত হাসিব আশ্চর্যের মতো বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকাল। মারিদ জীবনে কখনো নিজের মা-বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছে কিনা সন্দেহ, অথচ এই বাড়িতে এসে সবার সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যেন কতশত বছরের পরিচিত তাঁরা মারিদের। অথচ মারিদের সাথে এই মানুষ গুলোর পরিচিত বিশ মিনিটও হয়নি। এর মাঝে মারিদ সারা রাস্তায় হাসান মেম্বারের সঙ্গে খোশ মেজাজে কথা বলতে বলতে এসেছে। এতক্ষণ যে বোবা আর পাথর বনে বসে ছিল মারিদ এখন তার ছিটেফোঁটাও আর মারিদের মাঝে নেই। বরং মারিদের মতিগতি নিয়ে এখন সন্দেহ হতে লাগল রিফাতের। মারিদ আসলে কি চায়? সে তো অপরিচিতার খোঁজে এসেছে এই গ্রামে, যেটা এখন সহজ ভাবেই মারিদ খোঁজ নিয়ে চলে যেতে পারে। অথচ মারিদ তার কিছু না করে উল্টো খোশ মেজাজে হাসান মেম্বারের সাথে এমনভাবে আন্তরিকতা দেখাচ্ছে যেন সে আত্মীয়তা করার লক্ষ্যে এসেছে এখানে। আসলেই কি তাই? মারিদের মতো ছেলে হুট করে কারও সাথে জড়িয়ে যাওয়ার মানুষ না, নিশ্চয়ই এর পিছনে কোনো কারণ আছে। আর তাছাড়া তখনকার আগুন সুন্দরী মেয়েটিই বা কই? যদি আর একটা বার দেখা যেত মেয়েটিকে? আহা, কি অপরূপ ছিল সে। চোখ ফেরানো দায়। রিফাত মন ছটফটে ব্যাকুল হয়ে বসল মেয়েটিকে আর একটি বার দেখার আশায়। যদি মেয়েটি মারিদের অপরিচিতা না হয়, তাহলে সে একটা চান্স নিবে বিয়ে করার।
এর মাঝে হাসান মেম্বার তোড়জোড় করে সকলকে নিয়ে সকালের নাস্তার টেবিলে বসল। মারিদ ঘরে প্রবেশ করতে করতে চারপাশে তাকাল। লম্বাটে ঘরে দুপাশে দুটো রুম আর মাঝে বসার ঘর। বসার ঘরে আগেকার জমিদারী আসবাবপত্র রাখা। সোফার সেট, আলনা, সুকেশ, কর্ণার টেবিল, ডাইনিং টেবিল, কি নেই এই টিন সিটের ঘরে সাজানো? এই সুন্দর পরিপাটি ঘরে সবই সাজানো গোছানো করে রাখা।
হাসান মেম্বার মারিদেরকে নিয়ে ডাইনিংয়ে বসতে তখনকার মান্না পাকঘর থেকে এটা-সেটা এগিয়ে দিতে লাগল হাতে হাতে। তারানূর বেগম নিজের সখী ফুলবানুকে নিয়ে সকলের সাথে ডাইনিংয়ে বসতে হাসান মেম্বার নিজ হাতে সকলের প্লেটে শীতের পিঠা তুলে দেন। শীতের লোভনীয় পিঠা পেয়েই রিফাত-হাসিব এদিক- ওদিক তাকাল না আর। বরং খাওয়ায় মনোযোগী হলো। যেহেতু ওরা সারারাত জার্নি করে না খেয়ে ছিল, তাই হাসান মেম্বারের বাড়ির লোভনীয় পিঠা পেয়ে তাঁরা পেট ভরতে লাগল। অথচ মারিদের পেটে ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তেমন একটা খেতে দেখা গেল না। বরং সে খুবই সূক্ষ্ম ভাবে হাসান মেম্বারের বাড়িতে নজর বুলাতে লাগল। যেন সে এই শান্তশিষ্ট বাড়িটির রহস্য উন্মোচন করতে চাই। মারিদের মনে হচ্ছে এই বাড়িটি দেখতে যতটা শান্ত আর শীতল মনে হচ্ছে, তার রহস্য যেন ততই গভীর আর কোণঠাসা। কিছুতো আছে এই বাড়িকে ঘিরে যা মারিদের মনে তীব্র দ্বিধা সৃষ্টি করছে। কিন্তু সেটা কি?
মারিদ এই বাড়িতে এসে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় হয়েছে, অথচ হাসান মেম্বার আর তার মাকে ছাড়া এই বাড়ির সদস্যের মধ্যে তেমন কাউকে দেখা যায়নি দুয়েকটা কাজের লোক আর বৃদ্ধা ফুলবানুকে ছাড়া। আবার কানে বাচ্চাদের হৈচৈ কান্না শব্দও শোনা যাচ্ছে ভিতর ঘর হতে। সেই বাচ্চার কান্না থামাতে মেয়েলি কন্ঠও পাওয়া যাচ্ছে। পুরুষ বলতে শুধু হাসান মেম্বার আর কাজের ছেলে মান্নাকে চোখে পড়েছে মারিদের। অথচ ফুলবানু বৃদ্ধা মহিলাটি বলেছিল হাসান মেম্বারের তিন ছেলে দুই মেয়ে। মেয়ে একটা তখনকার নূরজাহান আর একটার নাম জানে না, তাহলে হাসান মেম্বারের তিন ছেলে কই এই মুহূর্তে? সকলের খাওয়ার মাঝে হঠাৎ হাসান মেম্বার নিজের মাকে বলল…
‘আম্মা, নূরজাহান আর আশনূর কই?
‘তোর বৌয়ের লগে পাক ঘরে আছে।
হাসান মেম্বার ফের বলল..
‘ আম্মা, আশনূরের মাইরে কইয়া দিয়েন আইজ দুপুরে খানদী আয়োজন করতে। আমার মেহমান আইসে ঢাহা(ঢাকা) থেইক্কা। ওনারা দুইদিন আমাগো বাইত্তে থাকব।
‘তোর বৌরে কওন লাগব না হাসান। হেয় আগের থেইক্কায় আয়োজনে বইসা গেছে, তোর চিন্তা করণ লাগব না।
হাসান মেম্বারের কথায় মারিদ আপত্তি জানাতে চেয়ে বলতে চাইল…
‘আমরা হুট করেই থানচি এসেছি আঙ্কেল। আমাদের থাকা সম্ভব…
মারিদের কথা শেষ হওয়ার পূর্বে বাহির থেকে ডাক আসল কারও…
‘হাসান! অ হাসান! বাইত আছিস? হাসান!
শান্ত পরিবেশ হঠাৎ ভয়ঙ্কর দেখাল কারও মিষ্টি সুরের ডাকে। এতক্ষণের পরিচিত হাসান মেম্বারকে হঠাৎ অপরিচিত ঠেকল। একই ক্রোধের হিংস্রতা দেখা গেল সত্তরের ঊর্ধ্বে বয়সী তাঁরানূরের মাঝেও। চোখের পলকে মা-ছেলে দুজন ছুটল দুদিকে। হাসান মেম্বার দরজা পিছন থেকে আর তারানূর বেগম সোফার নিচ হতে লম্বাটে রনদা অস্ত্র হাতে তুলে দুজন বেরুল ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে। যেন যুদ্ধ যাওয়ার প্রস্তুতি তাদের। মারিদ, হাসিব, রিফাত হতভম্ব হওয়ার সুযোগটাই পেল না যখন দেখল কাজের লোক মান্নাসহ বৃদ্ধা ফুলবানুও দা হাতে ছুটছে বাহিরে। রিফাতের আয়েস করে খাওয়ার ভঙ্গিমা পাল্টে গেল মূহুর্তে। ভয়ে কেমন কলিজা চেপে মারিদের উদ্দেশ্যে আতঙ্কিত গলায় আওড়াতে লাগল…
‘লা হাউলা ওয়ালাকুয়াতা ইল্লাবিল্লা। ভাই, তুই আমারে কই নিইয়া আইছিস হ্যাঁ? সবাই এতো দাউ-ছুরি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে কেন? এরা মানুষ নাকি কসাই? এই, আমাদের খাবারের বিষ-টিস মিশিয়ে দেয়নি তো আবার? আল্লাহ মাফ করো। আর আসব না থানচিতে।
মারিদ নিজেই হতভম্ব, হতবুদ্ধ। আচানক কেন সবাই ক্রোধে দাউ-ছুরি নিয়ে দৌড়াচ্ছে সেটা জানতে মারিদও তৎক্ষণাৎ সকলের পিছন পিছন ছুটল, দরজা পেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে শুনতে পেল হাসান মেম্বারের তেজস্বী স্বর…
‘আপনারে না কইছি আমার বাইত না আইতে? ক্যান আইছেন, চেয়ারম্যান সাব? বাড়াবাড়ি কইরেন না, তাইলে কিন্তু কল্লা কাইটা এহানেই রাইখা দিমো।
মারিদ বারান্দার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল। কুঞ্চিত কপাল আর সূক্ষ্ম নজরে তাকাল উঠোনের তিনটে বিপরীত পক্ষের মানুষের দিকে। ফর্সা চেহারায় শুকনা পাট-কলের মতো বেটে লোকটার গায়ে সাদা ফতুয়া সাদা লুঙ্গি জড়িয়ে কেমন বিদঘুটে হাসল নিজের মুখের কাঁচাপাকা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে। শীতের সকালের কুয়াশা ছাঁকিয়ে উষ্ণ রোদের ছটা পরিবেশে জুড়ে। সেই অল্প তাপের মাঝেও একজন সহচর লোক সেই বেটে লোকটার মাথায় ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশেরজন পানের বাটা হাতে। দুজনের মধ্যের লোকটা এ এলাকার চেয়ারম্যান। ডাক নাম মোল্লা সদাগর। তিনি ঠাট্টা স্বরে হাসান মেম্বারকে লেলিয়ে বললেন…
‘আহা হাসান, তুই হুদাই আমারে বদনাম করছিস। সম্পর্কে তুই আমার বেয়াই, হুঁশ। তোর খোঁজ লওয়া আমার ফরজ কাম। এলাইগা আইছিলাম বুঝলি?হুন হাসান, এহন চিল্লাচিল্লি না কইরা একটা বওন দে আমারে, জিরাই লই। আমার পোলার বৌডারেও ডাক দে। দেইখা যায়।
‘চেয়ারম্যান, মুখ সামলাইয়া কথা কও। নইলে আমার দাউ তোমার কল্লাই উঠা যাইব কিন্তু।
তারানূর বেগমের চিৎকারে মোল্লা চেয়ারম্যানের ভাবমূর্তি তখনো ইতিবাচক রইল। তিনি মুখের পান চিবোতে চিবোতে রসিয়ে বললেন…
‘আমার পোলাডা দেশে নাই। এ লাইগা হেই আমারে দায়িত্ব দিইয়া গেছিল পোলার বৌডারে দেইখা রাখবার। বাবার খাতিরে এইকটুক খেয়াল তো রাখবার পারি ছেলের বৌয়ের খালাম্মা। তয় আইজ গেরামের বাজারে থেইক্কা খবর আইলো, তিনজন ছেলে নাকি হাসানের খোঁজ করসে। আবার আপনের পোলা হাসান নাকি তাগোরে নিজের বাইতও আইছে। আপনে জানেনই তো খালাম্মা, আমার পোলাডার যে মাথা গরম। এহন হের কানে যদি এই খবরটা যায়, তয় কার কল্লা থাকব আর কার কল্লা কাট, হেইডা আপনে আমার থেইক্কা ভালা বুঝবেন। আপনের পোলা হাসানে যে শহুরে পোলাগোরে বাইত আইনা ভুল করছে, সেটা আপনেও জানেন। বাকি আমি তো আপনাগো শুভাকাঙ্ক্ষী হইয়া আছিলাম। যাকগে! এহন ডাকেন দেখি আপনাগো শহুরে পোলাগুলারে একবার দেইখা যায়। কওন তো আর যায় না, কখন কার কি হইয়া যায়।
‘চেয়ারম্যান!
মারিদের পিছনে ততক্ষণে হাসিব-রিফাত দুজনই এসে দাঁড়িয়েছে। হাসান মেম্বারের চিৎকার করতে মারিদ বারান্দার চৌকাঠ মাড়িয়ে নিচে নামতে মোল্লা সদাগর মারিদকে দেখে তারানূর ও হাসানের মধ্যস্থে ঢুকে এগিয়ে আসল মারিদকে দিকে। মারিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মারিদকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে কপাল কুঁচকাল চেয়ারম্যান। লম্বায় মোল্লা সদাগর মারিদের বুক বরাবর হওয়ায় তিনি মুখ উঠিয়ে মারিদকে দেখে বেশ রসিয়ে পান চিবোতে চিবোতে বললেন…
‘শহুরে পোলা, তুমি ইস্মার্ট (স্মার্ট) বয়। নিজের খেয়াল রাইখো। তুমি হাসানের মেহমান, মানে আমাগোও মেহমান। দেইখা-শুইনা রাস্তাঘাটে চইলো। আমাগো গেরামের রাস্তা কিন্তু বিপদজনক। ইংরেজিতে কি জানি কয়? হ! ভেরি ডেঞ্জারাস রাস্তা।
‘চেয়ারম্যান, এহন আপনে বাড়াবাড়ি করতাছেন। আমি আমার বাইত কারে রাখমু কারে না রাখমু, হেইটা আমি বুঝমু। আপনে এহন আমার বাইত থেইক্কা বাইর হন, নইলে এইবার সত্যি সত্যি আমার দা উঠা যাইব কিন্তু।
মোল্লা সদাগরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মোট নয়জন। তার মধ্যে হাসান মেম্বার, তার মা তারানূর, ফুলবানু, মান্না বাদেও আরও পাঁচজন লাঠিয়াল লোক আছে হাসান মেম্বারের পক্ষ নিয়ে। এই মানুষগুলোকে মারিদ সকালে ঢোকার সময় দেখেনি। তবে এরা যে হাসান মেম্বারের বাড়ির পাহারাদার লাঠিয়াল হবে, সেটা মারিদ দেখেই বুঝে গেল। অথচ মোল্লা সদাগর এতগুলো মানুষের ভিড়ে থেকেও ভয় পেল না আর না কারও পরোয়ানা করল। মারিদ দু’পক্ষের রেষারেষির মাঝে তক্ষুনো চুপ। মূলত মারিদ পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না। হাসান মেম্বারের পক্ষ নিয়ে আপাতত কথা বলাটাও তার ঠিক হবে না। কারণ হাসান মেম্বারকেও মারিদ ঠিকঠাক চিনে না। আর না মারিদ জানে দুই দলের মাঝে কি নিয়ে দ্বন্দ্ব। মারিদ শুধু এতটুকু বুঝতে পারল, হাসান মেম্বারের দুই মেয়ের মধ্যে কোনো এক মেয়ে এই চেয়ারম্যান লোকটার ছেলের বউ। যে এই মুহূর্তে দেশের বাহিরে আছে।
আর মারিদের তথ্য মতে হাসান মেম্বারের ছোট মেয়ে নূরজাহান যার কথা ফুলবানু বলেছিল। আর বড় মেয়ে হয়তো আশনূর যেটা হাসান মেম্বার ডাইনিং খেতে নাম বলেছিলেন। বড় মেয়েকে রেখে কোনো বাবা ছোট মেয়েকে বিয়ে দিবে না। তাহলে হাসান মেম্বারের বড় মেয়ে আশনূর বিবাহিত। নূরজাহান মারিদকে চিনতে পারেনি। বাকি রইল আশনূর। তানিয়ার দেওয়া তথ্য মতে হাসান মেম্বারের কোনো একটা মেয়ে যদি মারিদের অপরিচিতা হয়। তাহলে কি অপরিচিতা বিবাহিত? মারিদের হঠাৎ বুক মুচড়ে উঠল। বুকে হাহাকার ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল তার অপরিচিতাকে বিবাহিত মনে করতে। মারিদের মনে হলে তার অপরিচিতা আর যা-ই হোক কেন? সে মারিদকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করবে না অন্তত।
‘তোর মনে হয় হাসান, তোর এই ছোট্ট ছোট্ট হুমকি-ধমকিতে মোল্লা সদাগর ভয় পাইব? তুই এহনো ছোটই অয় রইলি হাসান। আর বড় হইলি না। ইতিহাস মনে কর হাসান। কলিজা ছোট রাখ। আমারে ভয় কর। নইলে পাড় পারবি না।
মারিদের মুখোমুখি থেকে ঘুরে পিছনে তাকিয়ে হাসান মেম্বারের উদ্দেশ্যে মোল্লা চেয়ারম্যান কথাগুলো বলতেই তেতে উঠল তারানূর। হাতে দাউটা উঠিয়ে তৎক্ষনাৎ মোল্লা সদাগরের গলায় ধরে বলল…
‘তুই এহন আমার বাইত থেইক্কা বাইর হ চেয়ারম্যান। নইলে আমি তোর কল্লা কাইটা জেলে যামু। বুইড়া বয়সে আমার যে মরণের ভয় নাই, হেইডা তুইও জানিস মোল্লা। আমি তো মরুম, সাথে তোগোর মতোন পাপিষ্ঠ গুলারে লইয়াই মরুম।
বয়স্ক তেজি তারানূরের রক্তিম চেহারা দেখে মোল্লা সদাগর বললেন…
‘ এই বয়সে এতো তেজ ভালা না খালাম্মা। আপনের এহন কবরে যাওনের সময় হইছে। এহন আল্লাহ বিল্লাহ করুন, হুদাই আমাগো এই জঞ্জালে মইধ্যে আপনে ক্যান যে মাথা দেন! তয় আইজ আসি। আল্লাহ আপনের মঙ্গল করলে করুক খালাম্মা, না করলে আমারে করুক। আসসালামু আলাইকুম।
মোল্লা চেয়ারম্যান বেরিয়ে যেতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো। লাঠিয়াল লোকগুলো যার যার মতো করে বেরিয়ে গেল। ওরা কোথায় গেল মারিদ জানে না। তবে এর মাঝে হাসান মেম্বার ও তার মাকে দেখা গেল পূর্বের হাসিমুখে মারিদের দিকে এগিয়ে আসতে। হাসান মেম্বার হাতের দা-টা মান্নার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মারিদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন…
‘ তয় বাজান, তুমি জানি কিতা কইতাছিল তহন? শোনো বাজান, তুমি যা-ই কও না ক্যান? আমি কিন্তু শুনমু না। তোমার আমাগো বাইতে বেড়াতে হইব।
‘ জি আঙ্কেল থাকব।
মারিদ সম্মতিতে হাসান মেম্বার খুশিতে ফের বলল…
‘চলো বাবাজান। আমাগো খাওন জোড়া যাইতেছে, তাড়াতাড়ি খাইয়া লই। চলো চলো।
হাসান মেম্বারের তাড়ায় মারিদ তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রশ্ন বলল…
‘লোকগুলো কারা আঙ্কেল?
মারিদের সরাসরি প্রশ্নে হাসান মেম্বারও ভনিতা না করে বলল…
‘ কয়ডা দুষ্টু নেকড়ে ওরা বাজান। যারা হররোজ আইয়ে শিকার করনের ধান্দায়। বাদ দেও! তুমি দাঁড়াও বাজান। আমি হাত ধুইয়া আইতেছি। আম্মা তুমি ঘরে যাও। আমরা আইতাছি।
কথা শেষে হাসান মেম্বার বামে কল পাড়ের দিকে এগোলেন। হাসান মেম্বারকে সাহায্য করতে কর্মচারী মান্নাও পিছনে গেল। তারানূর বেগম হাতের দা নিয়ে সোজা ঘরে ঢুকতে চাইতেই মারিদ পিছনে ঘুরে তাকাতে দেখল কেউ একজন পর্দার আড়াল হতে দা হাতে দ্রুত সরে যেতে। মারিদ মেয়েলি দুটো ফর্সা পা আর লম্বাটে একটা দা দেখল শুধু পর্দার আড়াল হতে। তারমানে শুধু মারিদের দেখা হাসান মেম্বার ও তার মা তারানূর-ই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ছিল না, পর্দার আড়ালে এই বাড়ির মেয়েরাও একই প্রস্তুতিতে দাঁড়িয়ে ছিল। মারিদ কেমন দ্বিধাগ্রস্ত পরিস্থিতিতে পড়ে তাকাল বারান্দার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় রিফাত ও হাসিবের মুখের দিকে। মারিদ প্রথম চেয়েছিল সে আজ চলে যাবে তবে কয়েকদিন বাদে পুনরায় আসবে অপরিচিতার খোঁজে। কিন্তু এখন মারিদ হঠাৎ মত বদল করল। মারিদের মনে হলো তার আরও কিছুদিন এই বাড়িতে থাকা দরকার। এই বাড়ির প্রতিটি সদস্য থেকে শুরু করে এই বাড়ির চৌকাঠও মারিদের কাছে রহস্যময় লাগল। তাছাড়া হাসান মেম্বারের কোন মেয়ে মারিদের অপরিচিতা সেটাও জানা জরুরি।
~~
তেজি তারানূর বেগম ঘরে ঢুকতে নূরজাহানকে দেখল দক্ষিণের জানালার কাছে বসে বারবার চোখে পানি মুছতে। তিনি হাতের দা-টা ঘরের পড়ার টেবিলের ওপর রাখলেন। সেখানে আরও একটি দা রাখা ছিল। সেটি নূরজাহানের। তারানূর বেগম হাতের দা-টা রেখে ঘরের পালঙ্কের উপর পা উঠিয়ে বসতে বসতে বললেন…
‘কাদবি না নূরজাহান। তোরে না কতবার কইছি, না কান্দার লাইগা। কান্দে দুর্বলরা। আর মানুষ দুর্বল মানুষের উপরেই আঘাত করে বেশি। শোন নূরজাহান, কান্দা ততক্ষণ শোভাপায় যতক্ষণ কেউ তার মর্ম বোঝে, তোর সেই দুর্বলতাকে আশ্রয় দিবো। নইলে দুর্বলতা সুযোগ সবাই নেয়।
তারানূর কথায় নূরজাহান ডাগর ডাগর চোখে তাকাল শক্তপোক্ত তারানূরের দিকে। ভেজা গলায় বলল…
‘আমি তোমাদের জন্য মসিবত দাদী। আমার জন্য কেউ শান্তিতে নাই। তুমি সত্যি বলো, আমি আসলেই অলক্ষুণে অপয়া।
‘তোর জম্মের সময় আমি তোর বাপের কইছিলাম তোরে গলা চিপ্পা মাইরা দিতে। তুই জম্ম লওয়ার দিন আমার জামাইডা মরল। তোরে আমি অলক্ষুণী বইয়া ডাকতাম। তয় সবাই কয় তুই আমার লাহান দেখতে। হেইডা আমি জানি কিন্তু মানতে চাই নাই কখনো। আমার পোলা যখন তোরে আম্মাজান ডাহে। হেইডাও আমার পছন্দ হই না, ছেলে জম্ম দিসি আমি, হেই তোরে ক্যান আম্মা ডাকব? তোর জম্মের পর থেইক্কা আমরা কেউ ভালা নাই নূরজাহান। এ লাইগা আমি চাইতাম তুই মইরা যা, তুই অভিশপ্ত। কিন্তু তোরে যখন কেউ কিছু কয়, তখন আমার নিজের মাথায় ঠিক থাহে না। রক্ত টগবগ কইরা উঠে। ইচ্ছা করে সকলেরে শ্মশানঘাটে পাঠায় দেই। তুই আমার সবচেয়ে অপছন্দের দূর্বলতা নূরজাহান। যেইডা আমি না চাইতেও আমার বহন করা লাগে।
নূরজাহান ফের ফুপায়। এবার মুখে কাপড় গুজে যেন বাহিরের শব্দ না যায়। তারানূর বেগম নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে ফের বললেন…
‘ তোরে আমি সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি যাতে তুই শক্ত হস। ভালোবাসায় মানুষরে নরম বানায় নূরজাহান। আর পরিস্থিতি মানুষরে শক্ত বানাই। তোর একহাতে আমরা কলম , অপর হাতে অস্ত্র তইলা দিসি। নিজের হেফাজত সবসময় নিজে করবি। আমার একটা কথা সবসময় মনে রাখিস নূরজাহান, হয় জিতবি নয়তো শিখবি। এরপরও কোনো কিছুতে হাইরা বইসা থাকবি না।
চলিত….
[ বানান ভুল ম্যানশন করবেন কমেন্টে]
আমার আইডির লিংক..
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬