কাজরী
সাবিকুননাহারনিপা
পর্ব-৮+৯
কাজরী আল্পনাকে দেখলো খুটিয়ে খুটিয়ে। একটু প্রানবন্ত লাগছে অন্যান্য সময়ের চেয়ে। শাড়ি পরেছে সঙ্গে হালকা সাজ। ও’কে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি ভালো আছ?”
“তোমরা সবাই মিলে আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছো?”
আল্পনা স্মিত হেসে বলল,
“তোমাকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছি না?”
“হ্যাঁ। “
“কী আর করা যাবে। আমাকে আরও কেয়ারফুল হতে হবে। “
“তুমি মিথ্যে কেন বললে?”
আল্পনা অবাক গলায় বলল,
“আমি মিথ্যে না বললে তুমি তো আরও বেশী সমস্যায় পড়ে যেতে।”
“ঠিক আছে৷ এখন আমাকে সত্যিটা বলো। “
“কোন সত্যি? “
কাজরীর মনে হলো আল্পনাকে ও যেমন জানতো সেটা ভুল জানা ছিলো। খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে কথা বলছে এখন ও।
“তুমি ওই রাতে কোথায় ছিলে? কার সঙ্গে ছিলে?”
আল্পনা চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
“তুমি তো জানো কাজরী। “
কাজরী অধৈর্য হয়ে চিৎকার করে বলল,
“আমি জানলে তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম না। “
“উনি তোমার বন্ধু নন?”
“কে উনি?”
আল্পনা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। কাজরী বুঝতে পারছে না, ও কী সত্যিই বিস্মিত হয়েছে নাকি ভান করছে। কাজরী ধাতস্থ হয়ে বলল,
“আমাকে সব সত্যি বলো আল্পনা। তুমি ইশান কে যে মহিলার বর্ননা দিয়েছ সে ওর রিলেটিভ। ইশান ভাবছে এইসব আমার প্ল্যান, অথচ আমি ভাবতেও পারি না যে তুমি এভাবে গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারো।
আল্পনা হঠাৎ অন্যরকম গলায় বলল,
“আমি তোমাকে কিছু বলব না কাজরী। আর গুছিয়ে মিথ্যে বলে তোমার কোনো ক্ষতি তো আমি করিনি। কথার মারপ্যাঁচ আমি তোমার থেকে শিখছি। তুমিও কিন্তু সেই গল্পটা আমাকে পুরোপুরি বলো নি। “
কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।
“কোন গল্প?”
“ডাকাতের কবলে যে পড়েছিল সে কে? এই গল্পের সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক? “
কাজরী স্থির চোখে তাকিয়ে আছে আল্পনার দিকে।
“আম্মা এখন কেমন আছেন? “
মন্যুজান খাতুন সুপুরি কাটছেন। ওনার প্রিয় কাজ এটা। এই কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করান না। উনি শিরিনের কথার জবাব না দিয়ে ফিক করে হেসে বললেন,
“দিশেহারা হইয়া আমার কাছেই আসলা?”
“না দিশেহারা হই নি। আপনি আমার নামে যে মিথ্যে অপবাদ গুলো দিচ্ছেন সেগুলো নিয়ে কথা বলতে আসছি। “
মন্যুজান খাতুন হাসছেন। তিনি শিরিনের এই রুপ দেখে মজা পাচ্ছেন। অন্দরের সব খবর তার কানে আসে। শিরিন কে বললেন,
“তোমার লজ্জা হয় না? স্বামীরে পোষ মানাইতে পারলা না? অবশ্য পোষ কিভাবে মানাবা? সে তো তোমার সাথে ঘুমায় না, হিহিহি৷ “
শিরিন শান্ত চোখে শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে আছেন। এই মহিলার কাছে তিনি ভদ্র কথাবার্তা আশা করেন না। বললেন,
“আপনি কোমল কে নিয়ে আর আজেবাজে কথা বলবেন না। “
মাহমুদা খাতুন শাসানো গলায় বললেন,
“বললে কী করবা?”
“কিছু করব না। কিন্তু আপনি এরপর যা খুশি বলবেন না। যেগুলো আমি করিনি সেগুলো আমার উপর চাপিয়ে দিবেন না।”
মন্যুজান খাতুন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসলেন। তিনি খুব আনন্দ পাচ্ছেন। বললেন,
“তোমার দিন শ্যাষ শিরিন। তোমার দিন শ্যাষ। “
শিরিন মৃদু হেসে বললেন,
“না। আমার দিন শেষ হবে কেন? আমার ছেলে যদি চৌধুরী প্যালেসের উত্তরাধিকার হয় তাহলে আমার দিন তো নতুন করে শুরু আম্মা।
মন্যুজান খাতুনের হাসি চওড়া হলো। তিনি বললেন,
“আসলেই তুমি এইবার শ্যাষ। যে পাপ করছ, এইবার তার শাস্তি পাইবা। নিজের পোলার কাছ থেকে পাইবা। “
শিরিন কে বিচলিত লাগছে না। তিনিও স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“যেমন পেয়েছেন আপনি আপনার ছেলের কাছ থেকে? “
মুহুর্তেই বৃদ্ধার হাসিমুখে ঘন কালো মেঘের ছায়া নেমে এলো। অপ্রিয় সত্যি শুনতে ভারী কষ্ট হয়। তার চেহারায় সেই কষ্টভাব প্রবল দেখে শিরিনের অন্তরের জ্বালা কিছুটা হলেও নিভলো। শিরিন বললেন,
“আপনি যা খুশি তাই বলেন। কোমল কে নিয়ে যা মন চায় বলতে থাকুন, আমি তাকে ঘর ছাড়া করিনি। সে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে গেছে আপনাদের মতো জা*নোয়ার দের সঙ্গে থাকবে না বলে। আপনি যত পারেন মনগড়া গল্প বলে যান, আমার কিছু যায় আসবে না। “
মমন্যুজান খাতুন হাতের কাছে রাখা ফুলদানিটা ছুড়ে মারলেন শিরিনের দিকে। তার অব্যর্থ নিশানায় শিরিন আঘাত পেলেও বিচলিত হলেন না। এই বৃদ্ধার মুখ বন্ধ করাতে পেরে খুশি।
কাজরী নিশানের সঙ্গে ফিরে এলো। ফেরার পথে নিশান খেয়াল করলো কাজরীকে অন্যমনস্ক লাগছে। নিশান প্রশ্ন করবে না ভেবেও করে ফেলল,
“এভ্রিথিং ইজ ওকে? এখন তো তোমাকে ডিস্টার্বড লাগছে। “
কাজরী স্বাভাবিক গলায় বলল,
“নাথিং সিরিয়াস। একটু স্ট্রেসে আছি। “
নিশানের শুনতে ইচ্ছে করছে কাজরীর স্ট্রেসের কারণ কী! কিন্তু ইশানের সতর্কবানী কানে বেজে উঠছে বারবার। বিয়ে মানছে কী মানে নি, কিন্তু আমার বউ আমার বউ করে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কাজরী ওর ব্যক্তিগত প্রোপার্টি।
“বলছিলাম….
কাজরী থামিয়ে দিয়ে বলল,
“নিশান, তুমি আমাকে নাম ধরে ডেকো। ইশান তোমাকে মিসেস চৌধুরী বলতে বললেও আমি সেটা শুনতে তেমন ইচ্ছুক নই। আমাকে নাম ধরে ডাকলেই খুশি হবো। এমনিতেও মিসেস চৌধুরী হওয়া আমার জন্য তেমন গৌরবের কিছু নয়। “
নিশান তাকালো কাজরীর দিকে। ভারী অবাক করা বিষয়। চৌধুরী প্যালেসের বউ হবার জন্য কতো মেয়ে মুখিয়ে থাকে। নামের পাশে ওই পদবী টা বহন করার জন্য কতজনের আগ্রহ! অথচ কাজরীর কাছে তা তুচ্ছ! নিশান আপনমনে হাসে। তার ছোট ভাইয়ের বউভাগ্য খারাপ না মনে হচ্ছে। কিন্তু বউ আসলেই তার ভাগ্যে থাকে কী না সেটা দেখার বিষয়।
চৌধুরী প্যালেসে কাজরীর অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সেটা অবশ্য ইশানের জন্য। ইশানের অবস্থান পরিবর্তন এর কারণে কাজরীকে সমীহ করা হচ্ছে। শিরিন ভেবেছিলেন কাজরীকে বিয়ে করা ইশানের একটা খামখেয়ালি কাজ। বাবার প্রিয়দর্শন হয়ে ওঠাই একমাত্র উদ্দেশ্য। ইশান ঘরে বউ রেখে নাইট ক্লাব, পার্টি, মদ, গার্লফ্রেন্ড সবকিছু ঠিক রাখবে আগের মতো। ত্বরিতাকে জাস্ট ছুড়ে ফেলে দিলো। শিরিন ভেবেছিলেন ত্বরিতাকে দিয়ে কাজের কাজ কিছু হবে। কিন্তু ওদের সম্পর্কটাই ছিলো লাগামছাড়া। আজকালকার ছেলেমেয়েদের কাছে ফিজিক্যাল ইন্টেমেসি ডালভাতের মতো। অথচ ইশানের সঙ্গে ত্বরিতার তেমন কোনো মুহুর্তই নাকি তৈরী হয় নি। ইশানের সোশ্যাল ইমেজে যতই কন্ট্রোভার্সি থাকুক, চারিত্রিক ত্রুটি নেই। ইশান বাবার দেয়া দায়িত্বও মাথা পেতে নিয়েছে। এখন দেখা যাক এটাকে কেন্দ্র করে কতটুকু কী করতে পারে।
মমন্যুজান খাতুনের আঘাত শিরিন মাথা পেতে নিয়েছিলেন, ক্ষতটাও বেশ গভীর। কাজরী এই সময়ে শাশুড়ীর খোঁজ নিলো নিয়মিত। শিরিন অবশ্য একটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন, কাজরী একবেলার জন্য বাবার বাসায় গিয়ে ফিরে আসার পর থেকে একটু শান্ত আছে। শিরিন খোঁজ খবর নিচ্ছেন। ব্যাপার টা কাজরীকে যে ভাবাচ্ছে না সেটা নয়। তবে ও বুঝতে পারছে না যে তার এই পরিবর্তন এর হঠাৎ কী কারণ। তবে একটা বিষয় ভালো হলো। শিরিনের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ ওর ভালো লাগছিলো না। কিন্তু এতো ভালো হওয়া কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস কী না সেটাও ভাববার বিষয়।
এদিকে নিশান কে তাল মিলাতে হচ্ছে ইশানের ইচ্ছের কাছে। ইশান ইচ্ছে করেই বিজনেসের দূর্বল দিক টা নিশানের হাতে গছিয়ে দিয়েছে। নিশান আপত্তি করেন নি। ওয়াজেদ চৌধুরীর বহু পুরোনো লোক কে কাজ বদলে দেয়া হয়েছে। ঠিক তেমনি নতুন লোক কে নেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদে। এই ব্যাপারে নিশান কথা বলতে গেলে ইশান বিজ্ঞের মতো জবাব দিলো,
“পুরোনো লোকেরা নতুন কাউকে মনিব মানতে চায় না। তাই তাদের অবস্থানের পরিবর্তন করা হলো। “
এই স্টেটমেন্টের মাধ্যমে বোধহয় নিশানকেও বুঝিয়ে দেয়া যে আমাকে মানতে হবে। নাহলে তোমার অবস্থাও এদের মতন হবে। নিশান যতই উপরে ঠিক থাকার ভান করুক, হতাশা, রাগে দু’চোখে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখছে না।
এই হতাশা আর রাগ থেকেই ইশান ওর শত্রু হয়ে যায় কী না! নিশান যতই ঠান্ডা থাকার ভান করুক, ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ আরও বাড়তে থাকবে। তাছাড়া কথায় আছে, ভিলেন কেউ একদিনে হয় না। ভিলেন তৈরী হবার ক্ষেত্রে পরিবেশ, পরিস্থিতি অনেকাংশে দায়ী। নিশান যদি ভিলেনে পরিবর্তিত হয় সেক্ষেত্রে ভুল কিছু হবে না, কারণ পরিস্থিতি টা তৈরী করেই দেয়া হয়েছে তেমন ভাবে।
ইশানের সঙ্গে বেশ কয়েকদিন কাজরীর দেখা হলো না। ইশান সকালে বেরিয়ে যেত, ফিরতো রাত করে। তখন কাজরী জেগে থাকলেও ঘুমের ভান করে থাকতো। ইশান ঘরে ঢুকে কাজরীকে পর্যবেক্ষণ করে বেরিয়ে যেত। কাজরী স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছে তাতে। ইশানের সঙ্গে ওর যত কম দেখা হয় ততোই ভালো। কারণ আল্পনার ঘটনা নিয়ে ইশান যদি ও’কে কোনো প্রশ্ন করে ও তো কোনো জবাব দিতে পারবে না। কাজরী অনেক চেষ্টা করেও আল্পনার মুখ থেকে কিছু বলাতে পারে নি। বিষয় টা নিয়ে কাজরী ভীষণ চিন্তায় আছে। ওর জানা দরকার যে ওর অগোচরে কে এরকম পরিকল্পনা করছে! স্বয়ং ওয়াজেদ চৌধুরী নয় তো।
দরজা খোলার মৃদু শব্দ হলো। ইশান ঘরে ঢুকেছে। কাজরী চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করলো। ইশান অন্যান্য দিন লাইট অন করে না, আজ করলো। ডেনিম জ্যাকেট টা ছুড়ে মারলো সোফার দিকে। ফোন টা শব্দ করে রাখলো বেডসাইডের টেবিলটায়। কাজরী সব শুনলো। ওর ভারী নি:শ্বাসে বোঝার উপায় নেই যে জেগে আছে। ইশান ওর পাশে বসেছে। পারফিউমের গন্ধটা তীব্র! তার মানে খুব কাছেই। ইশান আরেকটু কাছে এগিয়ে আসলো। ওর কপালে একটা আঙুল ছোঁয়ালো। আঙুল টা চলে এলো ঠোঁটের কাছে। কাজরীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে ঘুমের অভিনয় বেশীক্ষন করা যাবে না, ইশান লিমিট ক্রস করে ফেলছে। কাজরী চোখ খুলে তাকালো। ইশান হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,
“হ্যালো সুইটহার্ট। “
কাজরী উঠে বসলো। রাগে ওর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। নাক, কপাল ঘেমে একাকার। ইশান কৌতুক স্বরে বলল,
“স্বামীর জন্য অপেক্ষা না করে ঘুমিয়ে যাওয়া ঠিক না। ব্যাড ওয়াইফ তুমি। “
“আচ্ছা! তুমি এক্সপেক্ট করো আমি তোমার জন্য জেগে থাকব?”
“সেটাই উচিত। কিন্তু তুমি করো উল্টোটা। এই বাড়িতে ঘুমানো ছাড়া তোমার আর কাজ নেই?”
“ইশান তোমার কিছু বলার আছে? নাহলে আমি ঘুমাব। বিরক্ত করবে না। “
ইশান কাজরীর কোমড় শক্ত করে চেপে ধরে নিজের কাছে এনে বলল,
“আমার সঙ্গে ফোস ফোস করবে না। আর এমন আদেশের সুরেও কথা বলবে না সুইটহার্ট। “
কাজরী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“আমি কোনো সুরেই তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না, তুমিই এসে গায়ে পড়ো। “
ইশান হাসলো। হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো। বলল,
“এটা আমার বাড়ি। এখানে আমি যা ইচ্ছে হয় তাই করব। “
কাজরী হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বলল,
“আচ্ছা বুঝলাম। এখন আমাকে ছাড়ো। “
ইশান ছাড়লো না। ওর চোয়াল শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে ইশান বলল,
“আমাকে কেন বিয়ে করেছ তুমি? সম্পত্তির জন্য? “
কাজরী ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইশান একটু আগেও ভালো ম্যুডে ছিলো, এখন বেশ রাগী ম্যুডে আছে। কাজরী বলল,
“তুমি আমাকে কেন বিয়ে করেছ?”
“আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও। “
কাজরী অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হ্যাঁ সম্পত্তির জন্য। এবার খুশি?”
ইশান হঠাৎ কাজরীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। কাজরী সামলে নিয়ে রাগী গলায় বলল,
“আজ ই শেষদিন ইশান। ভবিষ্যতে কখনো এই ধরনের আচরণ আমার সঙ্গে করবে না। “
“ভবিষ্যতে এর চেয়েও খারাপ কিছু তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। নাউ গেট লস্ট। “
কাজরী বেরিয়ে এলো। দোতলার এক সাইডে সুইমিং পুল আছে। রাতে সেখানে লাল, নীল বাতি জ্বলে। কাজরী সেখানে গিয়ে বসলো। ইশানের একটু আগের আচরণ টা স্পষ্ট অপমান ছিলো। কাজরীর উচিত ছিলো শক্ত জবাব দেয়া। নাক বরাবর একটা ঘুষি দিলেও পারতো, ইশান কুপোকাত হতো না ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয়বার এমন অসভ্য আচরণ করা থেকে বিরত থাকতো। কাজরীর মন টা দূর্বল হয়ে আছে এক জায়গায়। আল্পনা! কাজরী কারো কাছে কিছু আশা করে না। মায়ের কাছেও ওর কোনো প্রত্যাশা ছিলো না। এখন বাবার কাছেও নেই, আল্পনার কাছেও নেই। তবুও আল্পনার হঠাৎ এমন রুপ ও’কে ভাবায়।
শিরিন দূর থেকে কাজরীকে দেখছেন। তিনি আজ ইশানের জন্য জেগে ছিলেন। ইশান ঘরে ঢুকতেই ও’কে মনেও করিয়ে দিয়েছিলেন যে ইশান এখন বিবাহিত। তার স্ত্রী তো শুধু সেজেগুজে প্যালেসে ঘুরে বেড়াবে না। ইশানের টেক কেয়ারও তো করবে। একজন স্ত্রীকে তুমি নিজের বশে আনতে পারো না, সেখানে চৌধুরী গ্রুপ কিভাবে সামলাবে। তার কথায় কাজ দিয়েছে। ইশান বউকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, কাজরী চিন্তিত মুখে বসে আছে পুল সাইডে।
অনেক বছর আগে চৌধুরী নিবাসে একজন রুপবতী নববধূ এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল। মনের মতো বর, ঘর সব পাবে। সেই স্বপ্ন অধরা থেকে গিয়েছিল। ঘর, বর কিচ্ছু পায় নি সে। লাঞ্চিত হয়ে চৌধুরী নিবাস ছেড়েছিল। তখন এই বাড়ি প্যালেস ছিলো না। লাঞ্চিত বধূ অপমান ছাড়াও আরও কিছু নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। যেটা রেখে যাবার সাধ্য তার ছিলো না, কারণ সেই জিনিস তো তার নিজের মধ্যে ধারণ করেছিল।
কাজরীর চোখ, চাহনী হুবহু একইরকম। শান্ত, নিরিহ ভীত হরিনীর মতো নয়, বরং জলন্ত অগ্নিশিখা বয়ে বেড়ানো সেই চোখ! তবুও এতো মিল!
শিরিন নিজের ঘরে ফিরে যাবার সময় দেখলেন ইশান কাজরীর কাছে। দুজনের কথাবার্তা দূর থেকে শুনতে না পেলেও ইশান যে বউয়ের হাত ধরে জোর করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে সেই দৃশ্যটা দেখলেন।
ইশানের সামনে এই মুহুর্তে যে মেয়েটা বসে আছে তার নাম দর্শনা। দর্শনাকে নেয়া হচ্ছে ওর ম্যানেজার হিসেবে। যথেষ্ট ইম্প্রেসিভ প্রোফাইল, সেই সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। বাবা বলেছিলেন ইরফান তোমাকে সাহায্য করবে ইশান। ইশান বাবাকে সরাসরি নেতিবাচক কিছু না বললেও ইশান নিজের চারপাশের লোকজন কে ঠিকই খুঁজে নিয়েছে। ইশান পেপারওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“দর্শনা তুমি কী বুঝতে পারছ তোমার কাজ কী?”
“জি স্যার। “
“কী বুঝেছ?”
“আপনার সমস্ত কাজের আপডেট আমাকে দেখতে হবে। “
ইশানের ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি দেখা গেল। বলল,
“তুমি কিন্তু আমার পার্সোনাল সেক্রেটারি নও। তোমাকে ম্যানেজার পদ টা দেয়া হয়েছে। “
“থ্যাংক ইউ স্যার। “
ইশান ভ্রু নাচিয়ে কৌতুক স্বরে বলল,
“এই পদের ভার টা কিন্তু একটু বেশী। “
দর্শনাকে আরও একটু বেশী আত্মবিশ্বাসী দেখা গেল। ইশান সামনের দিকে ওর অ্যাপেল ব্র্যান্ডের ট্যাব টা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বিশেষ করে তোমাকে এই দায়িত্ব টা আরও একটু বেশী পালন করতে হবে। “
দর্শনা বড় স্ক্রিনের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। রুপবতী বিয়ের সাজে দেখা মেয়েটি তার অচেনা নয়। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলো ইশানের দিকে। ইশান একটু গম্ভীর গলায় বলল,
“ধরে নাও এটা একটা সিক্রেট প্রোজেক্ট। একটু কেয়ারফুলি হ্যান্ডেল করতে হবে। গট ইট। “
দর্শনা মাথা নাড়লো অনেক কিছু না বুঝেই। একদিনে এতোকিছু বুঝতে চাইলে ইশান চৌধুরী বিরক্ত হবে। তারচেয়ে ইশান ও’কে বুঝিয়ে দিক, আর ও আস্তেধীরে সব টা বুঝে নিক।
দর্শনাকে চৌধুরী প্যালেসে দেখে অনেকেই বিস্মিত হলো। ইশানের ম্যানেজার হিসেবে পুরুষ কাউকে আশা করেছিল। এমন মেয়েরা সাধারণত পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসেবে ভালো মানায়। চৌধুরী প্যালেসের একটা দিক স্টাফদের জন্য বরাদ্ধ। সেখানে সব থেকে সুন্দর আর চমৎকার ঘরটা দর্শনা পেল।
তবে শিরিন একটু রোমাঞ্চিত বোধ করলেন। ইশানের মেয়েঘটিত স্ক্যান্ডাল নেই যেমন তেমনি কখনো সে সিঙ্গেলও থাকে না। পার্টিতে তাকে বেশীরভাগ সময় গার্লফ্রেন্ডদের সাথেই দেখা যায়। দর্শনাকে সম্ভবত সেরকম কিছুই ভাবলেন। শিরিন কাজরীর সঙ্গে আরও একটু বেশী নরম হবেন এখন থেকে। গরমে যে পোষ মানে না সে ঠান্ডাতে ঠিকই পোষ মানবে।
দর্শনাকে আর দশ জন স্টাফের মতোই দেখলো কাজরী। বাড়তি টেনশন হিসেবে নিলো না। তবে ওর মনে সন্দেহের বীজ বপনের দায়িত্বটুকু শিরিন অতি যত্নের সাথে করলো। কাজরীর ঘরে সে তেমন একটা যায় না। যদি প্রয়োজন হয় তবে নিজের ঘরে ডেকে নেয়। এই বিষয়টায় আলাদা একটা আনন্দ আছে। আজ এলেন। কাজরী পছন্দের সিরিজ দেখছিল। শিরিন কে দেখে টিভি অফ করে দিলো। শিরিন বললেন,
“তোমাকে বিরক্ত করলাম নাকি?”
কাজরী স্মিত হেসে বলল,
“আপনার আগমনে আমি বিরক্ত হবো! একদম নয়। “
শিরিনও স্মিত হাসলেন। দুজনেই জানে যে এই হাসিটুকু মোটেও আন্তরিকতা থেকে নয়। সহজ ভাবে কথা চালিয়ে যাবার ভান শুধু।
“বিয়ের এতোদিন হলো অথচ হানিমুন প্ল্যান করছ না তোমরা?”
কাজরীর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। শিরিন সেটা খেয়াল করলেন না। তার হাতে একটা জুয়েলারির বক্স। সেটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে বললেন,
“ইশান নতুন দায়িত্ব পেয়ে তো সব ভুলে গেল! তুমি তো একটু মনে করিয়ে দিতে পারতে।”
কাজরী চুপ করে রইলো। এই বিষয় টা নিয়ে ও ভেবেছে, তবে সেটা অন্যভাবে। ব্যাপার টা কিভাবে এড়ানো যায় সেটা নিয়ে ভেবেছিল। এতোদিনেও কেউ মনে করে নি দেখে স্বস্তি পেয়েছিল।
“তোমাদের হানিমুন ট্রিপ টা আমি স্পন্সর করলাম। আরও অনেকে করতে চেয়েছিল তবে আমি রাজি হইনি। চেয়েছি এই সুইট জেশ্চার টুকু আমি ইশানকে দেই। “
কাজরীর সামনে একটা এনভেলাপ এগিয়ে দিলো। অনিচ্ছ্বাস্বত্তেও কাজরীকে সেটা নিতে হলো সেই সঙ্গে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখতে হলো সৌজন্য হাসি। শিরিন আবারও বললেন,
“সুইজারল্যান্ড ইশানের পছন্দের জায়গা। ঘুরেফিরে আনন্দ করে আসো। চৌধুরী সাহেব ছেলেটাকে দায়িত্বের চাপে এখনই ফেললেন! অন্তত একটা বছর যেত বিয়ের! এখন তোমাদের আনন্দ করার সময়…
“আমি ইশান কে বলব আন্টি। যদিও ইশান রাজি হয় কী না!”
শিরিন অতি বিস্ময়ের ভান করে বললেন,
“ইশান রাজী হবে না? তোমাদের মধ্যে সব ঠিকঠাক আছে তো কাজরী? এখন তো তোমাদের গোল্ডেন পিরিয়ড চলছে। প্রতিটি মুহুর্ত একজন আরেকজনের সঙ্গে স্পেন্ড করার জন্য পাগল থাকার কথা! “
কাজরী শাশুড়ীর এই কথায় লজ্জা পাবার বদলে খানিকটা বিরক্ত হলো বটে। উনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন ওদের মধ্যে তেমন অন্তরঙ্গ মুহুর্ত তৈরী হয় নি। সেটা বুঝেই এই বিষয়ে কথা বাড়াচ্ছেন।
“তোমার চুপ থাকা, ইশানের ব্যস্ততা আমাকে কিন্তু খুব চিন্তায় ফেলছে কাজরী। এভ্রিথিং ইজ ওকে?”
কাজরী হাসলো। এই হাসিটা লাজুক হাসি ছিলো। শিরিন মনে মনে একটা বিশ্রী গালি দিলেন। তিনি জানেন যে এদের মধ্যে এখনো পর্যন্ত কিছু হয় নি। এটা জানার জন্য তাকে ঘরে আড়ি পাততে হয় নি। বিবাহিত দম্পত্তিদের দেখলেই বোঝা যায়। ইশান এই মেয়েটাকে বিয়ে করেছে চৌধুরী গ্রুপের কলকাঠি নাড়ানোর জন্য। ঠিক যেমন বিজনেস ডিল পেতে হলে ক্লায়েন্ট রিকোয়েরমেন্ট ফুলফিল করতে হয় তেমনই চৌধুরী সাহেব ফাঁসিয়েছে ব্যাপারটায়। আর চৌধুরী সাহেব এর হিসাবও ক্লিয়ার। আসন্ন নির্বাচনে তার প্রতিপক্ষ বেশ শক্ত। আখতারউজ্জামান এর সাথে সখ্যতা থাকলে এই নির্বাচনে তার জেতা কেউ আটকাতে পারবে না। শিরিন সব বুঝতে পেরেছেন। এখন শুধু সার্কাস দেখবে। এই বেপরোয়া ঘোড়াকে কিভাবে লাগাম দিয়ে আটকানো হয় সেটাও দেখবেন।
“আপনি কী আমাকে নিয়ে কিছু ভাবছেন? “
শিরিনের ধ্যান ভাঙলো হঠাৎ। কাজরীর কৌতুহলী দৃষ্টিতে অপ্রস্তুত হলেন যেন একটু।
“হ্যাঁ… তোমাদের নিয়েই ভাবছি। সম্পর্কের সুতোটা আলগা রেখো না কাজরী। শক্ত হয়ে বাঁধো। চৌধুরীদের রক্তে কিন্তু অনেক ইতিহাস আছে। “
কাজরী হেসে ফেলল। শিরিনের গা জ্বলে গেল। তিনিও যেন শোধ নেবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। বললেন,
“ইশানের ম্যানেজার কে দেখেছ? দর্শনা নাম মেয়েটার। মেয়েটা কিন্তু সুন্দরী। “
কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। শিরিন উপভোগ করলেন ওর ফ্যাকাসে হওয়া মুখটাকে। তবে কাজরীর মনে অন্য কথা এসেছে। এই ভদ্রমহিলা ও’কে ডাউন করার জন্য ইনডাইরেক্টলি ইশান কে ছোট করছেন। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো। নাহলে হয়তো প্রশ্ন করে ফেলতো, ইশান কে নিয়ে এতো শঙ্কা। মিস্টার চৌধুরীর পাস্ট রেকর্ড কী খারাপ ছিলো।
চলবে…..
(বেশী করে লাইক, কমেন্ট করুন।)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ৪
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ৩
-
কাজরী পর্ব ১
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ৭