এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ৩৬+৩৭
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ৩৬
রাত বাজে দশটা সবাই খাবার টেবিলে একত্রে বসেছে ।শহিদুল খান বারবার আড় চোখে তাকাচ্ছেন ছেলের দিকে ।কিছুক্ষণ আগেই উকিল ফোন দিয়েছিল এবং জানিয়েছে উকিল শ্রাবণ কি বলেছে।
শহিদুল খান বুঝতে পারছে না শ্রাবণের মনে কি চলছে ?আমেরিকার মতো জায়গায় থেকেছে ।কিছু কিছু সময় ফোন করে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছে দুই একজন পরিচিত লোকের কাছে পার্টটাইম জব করে শ্রাবণ ।কিন্তু উনি লেখাপড়ার সমস্ত খরচ বহন করেছে।
শ্রাবণের কাছে ১০ লক্ষ টাকা নেই মানতে পারছে না তবুও তর্কের খাতিরে ধরে নিলো নেই ।যে কোন মুহূর্তে টাকা নিয়েই ছেড়ে দিতে পারে ।এই সয় সম্পদ সব তো ওই ছেলে হিসেবে উত্তরাধিকারী।
শ্রাবণ আড় চোখে বারবার তাকাচ্ছে মেঘলার দিকে ।মেঘলা মাছের কাঁটা এমন ভাবে বেঁছে খাচ্ছে যেন ক্লাস টুয়ে পড়া কোন বাচ্চা হাত-পা নষ্ট করে ছড়িয়ে ছিটে যেরকম খায় মেঘলা ও সেরকম প্লেট টা পুরো নষ্ট করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাচ্ছে।
শ্রাবণের যেন আশপাশ আর কোন কিছুই খেয়াল নেই ।কে আছে কে নেই কোন কিছুই খেয়াল নেই ঠাস করে বলে উঠলো শ্রাবণ ,”এভাবে কেউ মাছের কাটা বেঁছে খায় বাচ্চা মেয়েদের মত ?দে আমাকে বেছে দেই।”
মেঘলা সাথে সাথে তাকালো শ্রাবণের দিকে ।অবাক হলো ।উনি মাছের কা*টা বেছে দিবে ?কিন্তু অবাক হলো আরো ছয় জোড়া চোখ ।সাজ্জাদ খান এবং শহিদুল খান তারা ভাত খাবে খাবে কি অবাকের রেশ ধরে হাতে লোকমা মুখে না দিয়েই তাকিয়ে রইলেন শ্রাবণের দিকে।কিন্তু শ্রাবণের তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ।
বলেই সাথে সাথে প্লেটটা নিয়ে কাটা বেছে দিতে লাগলো ।শ্রাবণের সত্যি আর খেয়াল নেই কে আছে না আছে ।ও শুধু মাছের কাঁ*টা বেছে দিতে ব্যস্ত।
অবাক হয়েছেন সাবিহা সুলতানা এবং আসমা বেগম ও।
মাছের কাঁটা বেছে দেওয়ার সাথে সাথেই যেন টনক নড়লো শ্রাবণের ।হঠাৎ খেয়াল করল আশেপাশে চোখগুলো সব ওর দিকেই দেখছে ।শ্রাবণ কোন কিছু না বলে চুপচাপ প্লেট এগিয়ে দিল মেঘলার দিকে ।মেঘলা বললো,” ধন্যবাদ ভাইয়া ।”
সাথে সাথে শ্রাবণের আবার মেজাজটা চড়ে গেল ।এই মেয়েকে কিছুক্ষণ আগে বলেছিল ভাইয়া যেন না বলে। বারবার বলে দিয়েছে শ্রাবণ ভাই বলতে কিন্তু এই মেয়ে বারবার ভাইয়া বলে ওকে বিরক্ত করে ফেলছে।
শ্রাবণ এই মুহূর্তে কারো সামনে বকাঝকা করতে চায় না ।তাই চুপচাপ নিজের খাওয়া শেষ করে প্লেট রেখে উঠে গেল শ্রাবণ ।এমনি ও সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল তাই এখানে আর বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছা হলো না।
শহিদুল খান তাকালেন আসমা বেগমের দিকে ।একজন আরেকজনের চোখ চাওয়া চাওয়ি করছে ।কেউ যেন বুঝে উঠতে পারছে না শ্রাবনে মনে কি চলছে।
সিয়ামের সামনে খাবার সময় ছাড়া লামিয়া আর আসে না।সিয়াম আড় চোখে দেখে লামিয়া কে। কিন্তু কিছু বলতে কোথায় যেনো বাধে।
এদিকে কে সাবিহা সুলতানা ভাবছে শ্রাবণ কে বলে দিয়েছে মেঘলা থেকে দূরে থাকতে কিন্তু এই ছেলেটা মেঘলার সবকিছুতেই এতটা অধিকার খাটাচ্ছে কেন বুঝতে পারছে না।
রাত সাড়ে ১১ টা ।হঠাৎ শ্রাবণ ছাদে যাবে সি*গারেট খাওয়ার জন্য ।মেঘলা রুমের পাশ দিয়ে যেতেই শব্দ শুনতে পেল মেঘলার পড়ার শব্দ ।গুণগুণ করে পড়ছে মেঘলা। দরজায় পা জোড়া থমকে গেল ।শ্রাবণ মিনিট দুয়েক দাড়িয়ে ওর পড়া শুনলো ।হঠাৎ করে শ্রাবণের মনে পরল মেঘলাকে তো কখনো কোনো কোচিং সেন্টারে যেতে দেখেনা ।সামনে এসএসসি পরীক্ষা ।তাহলে কি শুধু বাসায় পড়ে মেঘলা ?কোন টিচার কেউ তো আসতে দেখেনা।
শ্রাবণ ভাবলো হয়তো নতুন এসেছে তাই এখানে কিছু চিনে না তাই ভর্তি হয়নি ।মনে মনে প্ল্যান করে ফেলল আগামীকালকে নিয়েই কোন কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিবে ।এইভাবে পড়লে ভালো রেজাল্ট করতে পারবে না ।অবশ্যই একটু ভালো গাইড দরকার।
শ্রাবণের এক বন্ধু ছিল এখানে এখন খুব প্রতিষ্ঠিত একটি কোচিং সেন্টারের মালিক ।শ্রাবণ সাথে সাথে ছাদে যেতে যেতে ফোন দিল সেই বন্ধুকে ।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বলে উঠল ,”আমি কি ভুল কিছু শুনছি ?ফোনটা কি তুই করেছিস ?৬ বছর পর ?ও মাই গড কেমন আছিস?”
শ্রাবণ বললো,”কথা তো বলতে দিবি ।একটা মানুষ ফোন করেছে হ্যালোটা পর্যন্ত বলতে পারেনি ।তুই বলেই যাচ্ছিস বলেই যাচ্ছিস ।থাম আমি বলি।কেমন আছিস শরীফ?”
শরিফ মুচকি হাসলো ।হেসে বললো,” অনেকদিন পর ফোন দিয়েছিস ।একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম ।তা হঠাৎ আমাকে কিভাবে মনে পড়ল? চলনা কাল দেখা করি ।”
শ্রাবণ বললো অবশ্যই কাল দেখা হবে ।এজন্যই ফোন দিয়েছি ।আমার একটা কাজিন ওকে তোর কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিব ।একদম নিজের বোনের মত মনে করে লেখাপড়া করাবি।”
শরীফ সাথে সাথে দুষ্টুমি করে বললো,” তোর কাজিন আবার আমার বোন হয় কি করে ?আমারও কাজিন সিস্টার হবে।”
শ্রাবণ বললো,” এজন্যই বলেছিলাম একদম নিজের আপন মায়ের পেটের র*ক্তের বোনের মত করে পরাবি। না হলে তো জানিস ঢাকা শহরে কোচিং সেন্টারে অভাব নেই।”
শরীফ বললো,”ঠিক আছে ঠিক আছে ।আর ব্ল্যাকমেইল করতে হবে না ।চলে আয় আগামীকাল ।সামনাসামনি কথা হবে ।অনেক আড্ডা দিব সময় নিয়ে আসিস ।”
শ্রাবণ বললো ,”আচ্ছা ঠিক আছে ।”
ছাদে দাঁড়িয়ে সি*গারেট ধরিয়েই কথা বলা শেষ করে ফোনটি রাখল পকেটে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সি*গারেট খেলো এবং ভাবতে লাগলো সারাদিন যা যা হয়েছে ।এমন কেন হচ্ছে শ্রাবণের সাথে শ্রাবণ বুঝতে পারছে না ।কি করবে কি করা উচিত কোন কিছুই বুঝতে পারছে না শ্রাবণ। মনে হয় যাই করে ফেলছে সবকিছুই ওর মনের অজান্তেই করে ফেলছে ।বা চাইলেও ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারছে না। সবচাইতে বড় কথা হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের কাছে বারবার এভাবে হেনস্থা হচ্ছে অপদস্ত হচ্ছে।
পরদিন নাস্তা খাওয়া শেষে সবাই ড্রয়িং রুমে বসেছে চা কফি আড্ডা চলছে ।শুক্রবার আজকে কারো অফিস নেই।
ঠিক এমন সময় শ্রাবণ শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বললো,” মেঘলা?”
মেঘলা বললো ,”জি ভাইয়া?”
শ্রাবণ আবারো বিরক্ত হলো ।চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে বললো,” যা উপরে যেয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিচে নাম ।”
মেঘলা অবাক হয়ে বললো,” রেডি হয়ে নামবো কেন ?কোথায় যাব?”
শ্রাবণ বললো,” এদিকে খুব ভালো একটা কোচিং সেন্টার আছে সামনে তোর পরীক্ষা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিব।”
মেঘলা কিছুই বলল না ।তবে সাজ্জাদ খান সাথে সাথে বলে উঠলেন ,”না না তার প্রয়োজন নেই ।মেঘলা এমনিও খুব ভালো স্টুডেন্ট বাসায় একটু দেখিয়ে দিলেই হবে ।আর তাছাড়া আনা নেওয়ায় সমস্যা হয়ে যাবে ।আমিও চাকরি করি খুব ভোরবেলা যেতে হয় সিয়ামের ও কলেজ থাকে।
শুধু বাসায় একটু ওকে টেক কেয়ার করলেই হবে ।সিয়াম এসে ওকে সময় মতো দেখিয়ে দিবে।”
শ্রাবণ সাথে সাথে বলে উঠলো ,”আমি নিয়ে যাব ।আমি নিয়ে আসবো ।সমস্যা নেই।”
সাজ্জাদ খান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শ্রাবণের দিকে।কি ছিল এই কথাটার মধ্যে ?”ও নিয়ে যাবে ও নিয়ে আসবে ” এতটা অধিকার বোধ করে কথাটা বলল যেন পারমিশন চাচ্ছে না শুধু জানিয়ে দিল ওকে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করাতে নিয়ে যাবে।
লামিয়া সিয়াম সবাই সামনে আছে তাই এই নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাইলো না সাজ্জাদ খান ।কারণ বারবার না করার পিছনে যুক্তি থাকতে হবে ।যেখানে চাচাতো ভাই হিসেবে বলছে নিয়ে যাবে নিয়ে আসবে সে ক্ষেত্রে না করার তো কোনো কারণ থাকতে পারে না ।তাই চুপ করে রইলেন সাজ্জাদ খান ।শহিদুল খান আর চোখে একবার তাকালেন সাজ্জাদ খানের দিকে।
তাকিয়েই চোখ ঘুরিয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে ।শ্রাবণের কোন হেলদুল নেই ।শ্রাবণ বলে উঠলো ,”কি হলো যাচ্ছিস না কেন ?একটা কথা কতবার বলতে হয় তোকে?”
মেঘলা সাথে সাথে ধমক শুনে বলে উঠল ,”হ্যাঁ যাচ্ছি ।”
বলেই ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে লাগল ।ঠিক দশ মিনিটের মাথায় কাপড়চোপড় চেঞ্জ করে পিছনে স্কুল ব্যাগ নিয়ে রেডি হয়ে নামলো।শ্রাবণ হা হয়ে তাকিয়ে রইল মেঘলার দিকে ।দুই বেনি করে নেমেছে আর পিছনে স্কুল ব্যাগ।
ওড়নাটা গলায় ঝুলিয়ে রাখল দুই পাশে ।মনে হচ্ছে ১২-১৩ বছরের একটা মেয়ে ফিডার মুখে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে।
চোখ ঘুরিয়েই আর চোখে তাকালো শহিদুল খানের দিকে ।তাকিয়ে মনে মনে ভাবল ,”কি মনে করে ছয় বছর আগে এই বাচ্চাটার সাথে বিয়ে দিয়েছিল বাবা যাকে এখনো দেখে মনে হচ্ছে ১২-১৩ বছরের একটা মেয়ে। অথচ শ্রাবণ ধীরে ধীরে বয়স হয়ে যাচ্ছে আটাশে বছরে পড়বে কিছুদিন পর সংসার কি জিনিস এখনো বুঝতেই পারলো না ।এদিকে এই মেয়ে বয়সের চাইতেও বেশি ছোট হয়ে নেমেছে।”
একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শ্রাবণ ।তারপর চুপচাপ বাইরে বের হয়ে গেল তবে যাওয়ার আগে বলে গেল ,”আমি গাড়ি বের করছি ,তাড়াতাড়ি বাইরে আয় ।”
মেঘলা ও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দুই বেনি দুহাতে দোলাতে দোলাতে বাইরে চলে এলো।
বাইরে এসেই দেখল শ্রাবণ ভাই মাত্রই গাড়ি বের করেছে ।মেঘলা সাথে সাথে গাড়ির সামনে ডোর খুলে সামনে সিটে বসে পড়ল।
শ্রাবণ আড় চোখে একবার তাকালো মেঘলার দিকে ।তাকিয়ে আবার একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ।তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বললো,” ললিপপ খাবি?”
মেঘলার খুশি হয়ে সাথে সাথে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” আপনি ললিপপ নিয়ে ঘুরেন ?”
শ্রাবণ আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ।ছেড়ে বললো,” না তবে ঘুরতে হবে।তোর গেটাপ দেখে মনে হচ্ছে একটা ললিপপ হলে বেশ হয়।”
এবং আবারও তাকালো মেঘনার দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো সেদিন পেয়ারা গাছের কথাগুলো পেয়ারা গাছে বসে মেঘলা বলেছিল একটি ছেলে ওকে ভালোবাসে।
সাথে সাথে শ্রাবণ জিজ্ঞেস করল ,”তোকে স্কুলে কেউ পছন্দ করে রে?”
মেঘলা সাথে সাথে কেশে উঠলো ।কাশতে কাশতে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” আপনি কি করে জানলেন ?”
শ্রাবণ বললো,” আমি বুঝতে পারি এই বয়সে মেয়েরা প্রেমে পড়বেই ।”
মেঘলা সাথে সাথে বলে উঠলো ,”কক্ষনো না ।আমি কখনো কারো প্রেমে পড়িনি ।আমাকে একটা ছেলে পছন্দ করে।”
শ্রাবণ বললো,” তাহলে তোর কেমন ছেলে পছন্দ ?”
মেঘলা সাথে সাথে লজ্জা পাওয়ার অভিনয় করে বললো,” আমার তো সিদ্ধার্থ মালহোত্রা মতো ছেলে পছন্দ।”
শ্রাবণ ভেবেছিল চুপচাপ থাকবে লুকিয়ে যাবে ।কিন্তু না এই মেয়ে এতটাই বোল্ড যে বয়সে এত বড় একটি চাচাতো ভাইয়ের কাছে বলছে ওর কেমন ছেলে পছন্দ !
শ্রাবণ সাথে সাথে বললো,” একবারে চাপকে দাঁতগুলো সব ফেলে দেবো । দুধদাঁত পড়েছে তোর ?তুই এখন এত বড় একটা ভাইয়ের সামনে বসে বলছিস তোর এরকম ছেলে পছন্দ সেরকম ছেলে পছন্দ! বে*য়াদব মেয়ে সামনে তাকা।”
মেঘলা থতমতো খেয়ে গেল ।মনে মনে ভাবল ,”এই যা ।আমার কি দোষ ! উনিই তো জানতে চাইলেন ।বুঝি না এরকম কেন করে ?মাথায় কোন ডিস্টার্ব আছে কিনা!”
এভাবে চুপচাপ কিছুক্ষণ বাদে চলে এলো কোচিং সেন্টারে সামনে ।শ্রাবণ মেঘলাকে নামতে বলে গাড়িটি একটু সাইডে নিয়ে পার্ক করে চুপচাপ দুজন কোচিং সেন্টারে ভিতর ঢুকলো।
অফিসে ঢোকার সাথে সাথে শরীফের চোখ পড়ল শ্রাবণের দিকে ।শরীফ সাথে সাথে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে এসে শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরলো। ধরে বললো,” কেমন আছিস শালা।”
শ্রাবণ বললো ,”ছাড়।কিসের শালা? আমার বড় বোন নাই।”
চলবে_
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ৩৭
শ্রাবণ বললো,”কেমন আছিস? সত্যি অনেক দিন পর দেখা।শরিফ বললো,”এই তো আছি আলহামদুলিল্লাহ।তুই কেমন আছিস?ও কে?
শ্রাবণ বললো,”মেঘলা?”
মেঘলা বললো,”হুম ভাইয়া?
শ্রাবণ বললো,”কাছে আয়।এ হচ্ছে শরিফ।আমার ছোট বেলার বন্ধু।আর শরিফ ও মেঘলা আমার……শেষ করতে পারলো না শ্রাবণ।তার আগেই শরিফ বসে উঠলো ,”বোন।বুঝতে পারছি।”
মেঘলা বললো বললো,”আসসালামুয়ালাইকুম শরিফ ভাই।”
শরিফ বললো,”ওয়ালাইকুম আসসালাম।কেমন আছো?”
শ্রাবণ মনে মনে বললো,”আমাকে দিন ভর ভাইয়া ভাইয়া ।বলেও য় বাদ দিতে পারিনি।আর ওকে কি সুন্দর শরিফ ভাই বলে ডাকছে। বহুরূপী নারী।সরি শিশু।”
দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে শরিফের দিকে তাকিয়ে বললো,” মুখ টা বন্ধ কর ।এবার কাজের কথা শোন ।সামনে ওর এসএসসি পরীক্ষা ।বাড়িতে কোন টিউটর রাখা হয়নি ।গ্রামের স্কুলে পড়তো এখানে হঠাৎ ছোট আব্বুর পোস্টিং এর জন্য চলে আসতে হয়েছে তাই পড়ালেখা যেন কোন সমস্যা না হয় কোচিং এ ভর্তি করিয়ে দিচ্ছি ।নিজের একদম মায়ের পেটের আপন ছোট বোন মনে করে পড়াবি।”
শরিফ সাথে সাথে বলে উঠলো ,”আপন মায়ের পেটের বোন হলে তোর হতে পারে আমার না ।আমার তো বন্ধুর কাজিন।অনেক দুরের তাই র*ক্তের বোন ভাবতে পারছি না।আমি তো কাজিন সিস্টার মনে করবো তুই মনে মনে আপন মায়ের পেটের বোন ভাবতে পারিস।”
বলেই মেঘলার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো শরিফ।
দুজনের কথা শুনে মেঘলা সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলল।
আজ আর ক্লাস করবে না ।চা কফি খেয়ে দুজন আবার ব্যাক করল ।আগামীকাল বিকাল থেকে মেঘলাকে প্রতিদিন কোচিংয়ে আসতে হবে ।পড়ালেখায় যেহেতু অনেকখানি পিছিয়ে গিয়েছে তাই পরীক্ষার আগে কভার করার জন্য এই এক মাসের মধ্যে সব পড়াই কমপ্লিট করতে হবে।
গাড়িতে বসে মেঘলার দিকে আর চোখে তাকিয়ে শ্রাবণ বললো ,”কোচিং এ চুপচাপ মাথা নিচু করে যাবি চুপচাপ মাথা নিচু করে আসবি ।কেউ যদি কথা বলতে আসে কথা বলবি না ।কেউ যদি নাম্বার চায় নাম্বার দিবি না ।সরি তোর তো নাম্বারই নাই ।কেউ যদি নাম জিজ্ঞেস করে নামও বলবি না ।চুপচাপ শুধু বোবার মত পড়ালেখা করবি।”
মেঘলা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” বোবার মত মানে ?আমি কি বোবা নাকি ?আর বোবা হয়ে থাকলে লেখাপড়া কিভাবে করব?”
শ্রাবণ মেঘলা দিকে বিরক্ত চোখে তাকালো ।তাকিয়ে বললো,” তুই মুখে মুখে এত তর্ক করিস কেন ?আর তোকে আমি যখন বললাম আমাকে শ্রাবণ ভাইয়া বলবি না অন্তস্থ বাদ দিয়ে বল তখন তোকে দিয়ে বলাতে পারি না ।কোচিং এর শরীফকে তো ঠিকই প্রথম দেখায় শরীফ ভাই শরীফ ভাই বললি।
যেখানে মুখটা চালাতে বলি সেখানে তো চালাতে পারিস না যেখানে মুখটা বন্ধ রাখা দরকার সেখানে খুব মুখ চলে তোর।”
মেঘলা বিরক্ত হলো ।এই লোকের সাথে আরেকটি কথাও বলবে না মেঘলা ।তাই সামনের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল ।তবে মনে মনে ভাবতে লাগলো ,”প্রত্যেকদিন এই লোকের সাথেই কোচিংয়ে আসতে হবে ।এই লোকের সাথে যেতে হবে ।কিভাবে কাটবে সামনের দিনগুলো যেখানে আজকেই বনিবনা হচ্ছে না।”
এদিকে শ্রাবণ গাড়ি চালাচ্ছে আর ভাবছে এই মেয়ে এখনই এরকম ছয় বছর আগে কি চিন্তা করে শহীদুল খান তার সাথে এই মেয়ের বিয়ে করিয়ে দিয়েছিল ?জবাব চাইবে শহিদুল খানের কাছে।
বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেল ।যেহেতু শুক্রবার ছিল খানাপিনা বেশ ভালো আয়োজন হয়েছে ।আজ সবাই দুপুরে একসাথে খাওয়ার জন্য বসেছে এমন সময় ওরা ভিতরে আসতেই সবাই বললো,” ১০ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে আয় একসাথে সবাই আজকে খাব।”
মেঘলা চুপচাপ বেনি দুলিয়ে দুলিয়ে উপরে চলে গেল ।শ্রাবণ যাবে ঠিক এমন সময় শহিদুল খান জিজ্ঞেস করলেন ,”কোচিং কেমন ?কি অবস্থা ?কালকে থেকে ক্লাস করবে তাহলে রেগুলার?”
বাবার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হলো শ্রাবণ ।মনে পড়ে গেল ছয় বছর আগে কি মনে করে এ ফিডার খাওয়া শিশু বাচ্চার সাথে বিয়ে করিয়ে দিয়েছিল শ্রাবণকে ?এই মেয়েকে তো এখনো কোলে বসে বসে ফিডার খাওয়াতে হবে। আর এই বয়সী ওর মতো একটা ছেলের সাথে এরকম একটা তেজী স্বভাবের মেয়েরই কেন বিয়ে হতো হলো?শান্ত শিষ্টা একটা মেয়ের বিয়ে হতে পারতো ।শ্রাবণ যতই চিৎকার চেঁচামেচি করতো মেয়েটা চুপচাপ থাকতো কিন্তু না এই মেয়ে তো চার লাইন বাড়িয়ে বলে।
আর এইরকম একটা বেয়াদব মেয়েকে ছাড়তে নাকি ওর কষ্টে অর্জিত দশ লক্ষ টাকা দিয়ে তারপরে ছাড়তে হবে ।ভাবা যায় ?তাই বললো,” তোমার এত কিছু জানতে হবে না তুমি তো আর কোচিং এ পড়বে না ।যে পড়বে সে জেনে এসেছে।”
শহিদুল খান শ্রাবণের প্রশ্নের উত্তর শুনে হা হয়ে গেল ।কি প্রশ্নের কি জবাব দিয়ে গেল ছেলেটা ?আর এরকম জবাবটাই বা কেন দিল ?কি হয়েছে? যাওয়ার সময় তো ঠিকঠাক ছিল আসার সময় এরকম অদ্ভুত আচরণ কেন করল ছেলেটি ?উনি কোন কিছুই ভেবে উঠতে পারছেন না ।আজকাল ছেলের আচরণে খুব অবাক হচ্ছেন।
১০ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে সবাই খাবার টেবিলে একসাথে বসলো ।বিশাল খাওয়া দাওয়া আয়োজন করা হয়েছে ।শ্রাবণ আসার পরে আজ এই প্রথম আবার এত সুন্দর আয়োজন করা হয়েছে ।সব খাবার শ্রাবণ এবং বাড়ির প্রত্যেকটি মেম্বারের পছন্দ অনুযায়ী খাবার রান্না করা হয়েছে।
সবাই খাচ্ছে আর টুকটাক আলোচনা চলছে ।সাজ্জাদ খান শ্রাবনের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”ধন্যবাদ ওকে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েছিস এজন্য। কত টাকা লেগেছে বল আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি তোর একাউন্টে ।”
সাথে সাথে শ্রাবণ চোখ তুলে তাকাল ।টাকা পাঠিয়ে দিবে মানে ?শ্রাবন কি টাকা খরচ করতে পারে না ?তাই আমতা আমতা করে বললো,” লাগবে না যা লেগেছে আমি দিয়ে এসেছি।”
সাথে সাথে সাজ্জাদ খান বললেন ,”নানা লাগবে না কেন ?তুই কি এখন চাকরি-বাকরি করিস নাকি ?মাত্রই তো বিদেশ থেকে এলি।হাত খরচা টাকা থেকে তোর মেঘলার কোচিং এর জন্য ফি দিতে হবে না ।ঢাকা শহরে কোচিংয়ের টাকা কত হতে পারে আমার ধারণা আছে বল আমি দিয়ে দিচ্ছি।”
শ্রাবণ এবার চোখ তুলে তাকাল সাজ্জাদ খানের দিকে ।যেন কত অজানা কথা বলতে চাচ্ছে কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলছে না ।শুধু কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে বললো,” বলেছি তো আব্বু আমি দিয়ে দিয়েছি ।আমি কি দিয়ে দিতে পারি না ?”
এই একটা প্রশ্নে থমকে গেলেন সাজ্জাদ খান ।চুপ করে রইলেন।
শ্রাবণ চোখ নিচে নামিয়ে চুপচাপ খেলো ।খেয়ে আর কারো সাথে কোন কথা বলল না ।চুপচাপ হাত ধুয়ে উপরে উঠে গেল ।বাকি সবাই খাবার খেলো।টেবিলে পিন পতন নীরবতা ।সিয়াম মনে মনে ভাবছে দুদিন ধরে শ্রাবণ ভাই মেঘলার সবকিছুতে অধিকার কেন খাটাচ্ছে ?এদিকে তানিয়া আপু কেউ বিয়ে করল না ।শ্রাবণ ভাই কি তবে মেঘলাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে?
চলবে_
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৪৫+১৪৬+১৪৭
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১০৪+১০৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৬২
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে ১০+১১
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১০১+১০২
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪২
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ১২+১৩+১৪
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৩+১৪
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২৫+২৬
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২