Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯৭(প্রথম অংশ)


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৯৭] (প্রথম অংশ)

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

[দ্বিতীয় খন্ড]

বার্সেলোনার সেই গোপন গবেষণাগারজুড়ে তখন নেমে এসেছে মৃ’ত্যুসম স্তব্ধতা।

সাদা আলোয় আলোকিত বিশাল ল্যাবরুমের মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে র’ক্তের ক্ষীণ দাগ। ধাতব গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।মারুফুল হকের নিথর দেহটা পড়ে রয়েছে মেঝের উপর। গ’লদেশ চিরে নিরবধি র’ক্তস্রোত বেয়ে পড়ছে সাদা টাইলসের গায়ে।

সেই দৃশ্যের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মুস্তাক এহসান।

চোখে অবিশ্বাস। মুখে প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই মেহমুনা আহমেদ ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই। বরং অদ্ভুত এক উন্মাদনা।

মুস্তাক কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“আমি কখনো ভাবিনি তুমি এতটা লোভী, মেহমুনা!”

তার গলায় ঘৃণা আর বেদনার মিশ্রণ।

“ভালো হয়েছে তোমার বোন আজ তোমার এই জঘন্য রূপটা দেখেনি! নয়তো সে কোনোদিন বিশ্বাসই করতে পারত না তুমি তার র’ক্তের সম্পর্ক!”

মেহমুনা অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিল শীতল নিষ্ঠুরতা। সে মিস্টার আলবার্টের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলল,

“দেখলেন, মিস্টার আলবার্ট? আমার দুলাভাই কত বড় সৎ মানুষ!”

তার চোখে বিদ্রূপের ঝিলিক।

“আফসোস, আমরা ওনার মতো হতে পারলাম না!”

কথা শেষ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল সে।

ঠিক সেই মুহূর্তে মিস্টার আলবার্ট চোখের ইশারায় নির্দেশ দিল। পরক্ষণেই দুই বলিষ্ঠ লোক মারুফুলের গলায় আরও গভীরভাবে ধারালো ছুরি চালিয়ে দিল।

“নোওওওও!”

মুস্তাক এহসানের গর্জন যেন পুরো ল্যাব কাঁপিয়ে তুলল। তিনি ছটফট করে উঠলেন।

“নো! নো প্লিজ!”

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মারুফুল হকের দেহটা কেঁপে উঠল কয়েকবার।

তারপর সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। একজন পিতার প্রাণ থেমে গেল। একজন অসহায় কন্যা পৃথিবীতে এতিম হয়ে গেল। মুহূর্তেই মেহমুনা ক্ষিপ্তস্বরে বলে উঠল,

“ফাইলটা দিয়ে দিন, দুলাভাই! নয়তো আপনিও বাঁচবেন না!”

মুস্তাকের চোখে তখন শুধুই ঘৃণা। তিনি তাকিয়ে আছেন দুই বিকৃত আত্মার দিকে। একজন মিস্টার আলবার্ট। একসময় তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

যার সঙ্গে অসংখ্য রাত গবেষণায় কাটিয়েছেন।

আর অন্যজন মেহমুনা আহমেদ। নিজের স্ত্রীর ছোট বোন। যাকে তিনি আপন বোনের মতো আগলে রেখেছিলেন। আজ সেই দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার সম্মুখে র’ক্তপিপাসু জানোয়ারের রূপে।

মিস্টার আলবার্ট হিসহিসিয়ে বলল,

“তোমার সময় শেষ, মুস্তাক! বল ফাইলটা কোথায়?”

মুস্তাক নিঃশব্দে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে ছিল তীব্র অবজ্ঞা।

“পাবে না।”

ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন তিনি।

“ওটা কোনোদিনও পাবে না তোমরা অন্তত আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত নয়!”

পরক্ষণেই,

“তাহলে আপনি মরে যান!”

মেহমুনার কণ্ঠ বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ল মুস্তাক স্তব্ধ হয়ে তাকালেন তার দিকে। মেহমুনা ধীরে শাড়ির ভাঁজের নিচ থেকে একটি রিভলভার বের করল। তার চোখে তখন অস্বাভাবিক উন্মত্ততা। কিন্তু মিস্টার আলবার্ট দ্রুত বলে উঠল,

“নো, মেহমুনা! এভাবে নয়।”

সে চারপাশে তাকাল। তারপর ল্যাবের এক কোণে রাখা বিশাল কাঁচের সিসার দিকে দৃষ্টি স্থির হলো।

সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে ভয়ংকর শক্তিশালী এসিড। যার সংস্পর্শে মুহূর্তেই গলে যেতে পারে জীবন্ত মানবদেহ।

আলবার্ট ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেদিকে।

তারপর একটি ধারালো সার্জিক্যাল অস্ত্র তুলে নিল হাতে। সেই মুহূর্তে দু’জন লোক শক্ত করে চেপে ধরল মুস্তাক এহসানকে। মুস্তাক প্রাণপণে ছটফট করছেন।

“আলবার্ট! ভুল করছো তুমি!”

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“বড্ড বড় ভুল করছো!”

কিন্তু আলবার্টের মুখে ফুটে উঠল ভয়ংকর নিষ্ঠুর হাসি। লোভ ইতোমধ্যে মানুষটাকে পশুতে পরিণত করেছে। সে ধীরে মুস্তাকের মুখের কাছে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ইউ শুড হ্যাভ জয়েন্ড আস, মাই ফ্রেন্ড।”

তারপর ধারালো অস্ত্রটা নির্মমভাবে বসিয়ে দিল মুস্তাকের দেহে। আর্তচিৎকারে কেঁপে উঠল ল্যাব।

“আআআআআহহহ!”

মুস্তাকের শরীর যন্ত্রণায় কাঁপছে। র’ক্ত ছিটকে পড়ছে চারদিকে। তিনি মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না। আলবার্ট যেন উন্মাদের মতো হয়ে গেছে।

একের পর এক আঘাত। নিষ্ঠুর। অমানবিক। পৈশাচিক। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল মুস্তাক এহসানের শরীর। কিন্তু শেষ মুহূর্তেও তিনি ফাইলের অবস্থান জানাননি। শেষ নিঃশ্বাসের পূর্বমুহূর্তে তার রক্তাক্ত ঠোঁট কেঁপে উঠল,

“আ,,ফ,,রিদ,,,

নিজের সন্তানের নাম উচ্চারণ করেই নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ!

*************

অন্যদিকে,

“নো ওয়ে! আমি এখনই পাপার কাছে যাবো, মম!”

আফরিদ জেদ ধরে বসেছে। তার নিষ্পাপ চোখদুটো জলে টলমল করছে। মাইমুনা অসহায়ভাবে বললেন,

“কিন্তু বেটা,পাপা এখন ল্যাবে কাজ করছে। ওখানে গেলে পাপা রাগ করবে।”

কিন্তু আফরিদ মানল না।

“নো! আমি যাবোই! প্লিজ, মম!”

শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে হার মানলেন মাইমুনা। তিনি ক্লান্ত কণ্ঠে ড্রাইভারকে বললেন,

“ল্যাবের দিকে গাড়ি নিন।”

গাড়ি ছুটে চলল। বিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল গবেষণাগারের সামনে।

কিন্তু আজ অদ্ভুতভাবে কোথাও কোনো সিকিউরিটি নেই। মাইমুনার বুকের ভেতর কেমন অজানা আতঙ্ক জন্ম নিল। এদিকে আফরিদ উচ্ছ্বাসে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে।

“পাপাআআ!”

ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গেল সে।

কিন্তু ল্যাবের দরজা খোলা। ভেতরে প্রবেশ করতেই সময় যেন থেমে গেল। আফরিদের ছোট্ট দেহটা মুহূর্তেই জমে গেল। তার সামনে র’ক্তে ভেসে পড়ে রয়েছে মুস্তাক এহসানের ছিন্নভিন্ন দেহ!

চারদিকে র’ক্ত। ভাঙা কাঁচ। আর সেই ভয়ংকর দৃশ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মিস্টার আলবার্ট এবং মেহমুনা আহমেদ!

আফরিদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

তার ছোট্ট চোখদুটো বিস্ফারিত।

“পা…পাপা!”

ঠোঁট কাঁপছে। কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।

ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেতরে ঢুকলেন মাইমুনা এহসান। আর দৃশ্যটা দেখামাত্রই তার সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেল।

“মুস্তাআআআআক!”

আর্তচিৎকারে যেন পুরো ল্যাব কেঁপে উঠল। তিনি ছুটে গিয়ে রক্তাক্ত দেহটা জড়িয়ে ধরলেন।

কাঁপতে লাগলেন পুরো শরীর।

“না, না, এটা মিথ্যে!”

তার কান্না ছিল হৃদয়বিদারক।

“মুস্তাক! চোখ খোলো! প্লিজ!”

কিন্তু মুস্তাক আর কোনোদিন চোখ খুললেন না।

আফরিদ স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার ছোট্ট পৃথিবীটা ঠিক সেই মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।

🌼

বার্সেলোনার সেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গবেষণাগারজুড়ে তখন কেবল মৃ’ত্যুর গন্ধ।

জ্বলে যাওয়া রাসায়নিকের তীব্র দমবন্ধ গন্ধে ভারী হয়ে আছে সমগ্র পরিবেশ। দেয়ালের কাঁচ কালচে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে গলিত ধাতব অংশ, র’ক্তের দাগ আর ভাঙাচোরা যন্ত্রপাতি।

ভয়ংকর শক্তিশালী করোসিভ কেমিক্যালের বিক্রিয়ায় ল্যাবের অনেক ধাতব অংশ পর্যন্ত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। সেই রাসায়নিক এতটাই বিধ্বংসী ছিল যে, মানুষের দেহ তো দূরের কথা লোহার পাত পর্যন্ত গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

মুস্তাক এহসানের নিথর দেহের পাশে বসে পাগলের মতো কাঁদছিলেন মাইমুনা এহসান। তার কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে কান্নায়।

“এটা কি করলে তোমরা?! আমার মুস্তাক আমার মুস্তাককে তোমরা এভাবে শেষ করলে?”

তার বুকফাটা আর্তনাদে মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠেছিল পুরো ল্যাব। মেহমুনা আহমেদ কাঁপছিল। এই প্রথম বোধহয় নিজের কৃতকর্মের বিভীষিকা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে সে।

তবুও ভয়ে কিছু বলতে পারছিল না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল মিস্টার আলবার্টের দিকে। অপরদিকে আলবার্টের চোখে তখনও নির্মম হিসাবনিকাশ।

সে ধীরে হিসহিসিয়ে বলল,

“এদের বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজেদের মৃ’ত্যুকে ডেকে আনা।”

কথাটা শুনেই মাইমুনা এহসানের বুক হিম হয়ে গেল।

পরক্ষণেই তিনি হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠলেন,

“আফরিদ! বেটা পালাও! রান বেটা রান!”

ছোট্ট আফরিদ তখনও স্থবির হয়ে তাকিয়ে ছিল নিজের বাবার বিকৃত দেহটার দিকে। তার শিশুমন পুরো ঘটনাটা বুঝে উঠতে পারছে না। খালামণি প্রিয় আলবার্ট আঙ্কেল এরা এমন কেন?

তার বুকের ভেতর আতঙ্ক জমাট বাঁধতে লাগল।

পরক্ষণেই সে দৌড়ে পালাতে শুরু করল।

কিন্তু কয়েক কদম যেতেই আবার পেছনে ফিরে তাকাল বাবার দিকে। আর সেই দৃশ্য

রক্তা’ক্ত, ক্ষ’তবিক্ষত, নিষ্পন্দ মুস্তাক এহসান

শিশুটার মস্তিষ্ক আর সহ্য করতে পারল না।

“পা…পাপা?”

ক্ষীণ স্বর বেরোল তার ঠোঁট থেকে। তারপরই লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। চেতনা হারাল আফরিদ।

“আফরিদদদদ!”

দ্বিতীয়বারের মতো বুকফাটা চিৎকার করে উঠলেন মাইমুনা এহসান।

*******************

কয়েক ঘণ্টা পর,,

ভাঙাচোরা গবেষণাগারের ভেতর পিটপিট করে চোখ খুলল ছোট্ট আফরিদ। তার মাথা প্রচণ্ড ভারী লাগছে।

সমগ্র শরীর কাঁপছে। চেতনায় ফিরতেই অনুভব করল সে একজন নারীর কোলে শুয়ে আছে।

একজন স্প্যানিশ নারী পুলিশ তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মহিলাটি ক্রমাগত কিছু বলছে স্প্যানিশ ভাষায়। কিন্তু আফরিদ কিছুই বুঝতে পারছে না।

হঠাৎ করেই তার স্মৃতিতে ভেসে উঠল পাপার মুখ।

র’ক্তাক্ত, নিশ্চল।

“পাপা?”

হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সে।

“আমার পাপা?”

পুলিশ নারীটি তাকে শক্ত করে ধরে বললেন,

“নিনো… স্টপ! প্লিজ স্টপ!”

কিন্তু আফরিদ থামল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে।

“আমি ভেতরে যাবো! আমার পাপা! আমার মম!”

সে ধস্তাধস্তি করে নারীর হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

***********************

ল্যাবের ভেতরে তখন পুলিশ, ফরেনসিক টিম এবং মেডিক্যাল ইউনিটের ব্যস্ততা। চারপাশে ফ্ল্যাশলাইটের আলো। কিন্তু সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে অনেক অভিজ্ঞ অফিসার পর্যন্ত স্তম্ভিত। মেঝের উপর পড়ে রয়েছে দু’টি বিকৃত, রাসায়নিকদগ্ধ দেহাবশেষ।

ভয়ংকর করোসিভ এসিডের প্রভাবে দেহগুলোর অধিকাংশ অংশ গলে গিয়ে বিকৃত মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। শুধু মাথার কিছু অংশ অক্ষত।

বাকি শরীর যেন ধীরে ধীরে গলিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাসায়নিকের বিক্রিয়ায় চারপাশের টাইলস পর্যন্ত ক্ষয়ে গেছে। ভয়ংকর সেই দৃশ্য দেখেই থমকে গেল আফরিদ। তার ছোট্ট চোখদুটো বিস্ফারিত। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।

“পা…পাপা!”

তার ঠোঁট কাঁপছে। পরক্ষণেই হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠল সে,

“পাপা! পাপা আমার পাপা!”

চারপাশের পুলিশ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল সেই দেহাবশেষগুলোর দিকে। তারপর সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে দুই হাতে সেই গলিত অংশগুলো জড়ো করতে শুরু করল।

কাঁদতে কাঁদতে বলছে,

“আমার পাপা গলে গেছে?! আমার পাপাকে ঠিক করে দাও!”

তার কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে কান্নায়।

“ও পাপা! আমি তোমাকে জোড়া লাগিয়ে দেব!”

একজন অফিসার চোখ মুছল চুপিচুপি। আরেকজন মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ একটা শিশু তার বাবার গলিত দেহ নিজের ছোট্ট হাতে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কি হতে পারে? আফরিদ কাঁদছেই।

“পাপা! উঠো না! প্লিজ উঠো!”

ঠিক তখনই কর্ণকুহরে ভেসে এলো ক্ষীণ, কাঁপা কণ্ঠস্বর।

“আফরিদ!”

শিশুটি থমকে গেল। ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল।

আর পরক্ষণেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“মম?”

র’ক্তাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন মাইমুনা এহসান।

তার শরীর জখমে ভরা। মুখে শুকনো র’ক্তের দাগ।

কিন্তু তিনি জীবিত।

আফরিদ দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

মাইমুনাও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেন নিজের সন্তানকে। মা ছেলে দু’জনই হাউমাউ করে কাঁদছে।

আফরিদ কাঁপতে কাঁপতে বলছে,

“মম, আমার পাপা, আমার পাপা!”

*******************

বর্তমান,,,,

ন্যান্সি শিউরে উঠল। সমগ্র শরীরজুড়ে যেন বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল তার।

চোখের কোণ বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ল অশ্রুবিন্দু।

বিশাল রিসার্চ সেন্টারজুড়ে তখন গাঢ় স্তব্ধতা। নিস্তব্ধ, ভারী, দমবন্ধ করা এক নৈঃশব্দ্য। চারপাশে কেবল মৃদু যন্ত্রের শব্দ। আর সেই শব্দের মাঝখানে ছড়িয়ে রয়েছে বহু বছর আগের এক বিভীষিকাময় ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। সেখানে এখন কেবল দু’জন মানুষ। ন্যান্সি। আর আফরিদ এহসান।

এতক্ষণ যাবত আফরিদের বলা প্রতিটি বাক্য যেন ন্যান্সির মস্তিষ্কের ভেতর তীব্রভাবে আছড়ে পড়ছে।

কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটার কথা বলতে গিয়ে আফরিদের চোখ ভিজে উঠেছিল যাকে “পাপা” বলে চিৎকার করে কেঁদেছিল ছোট্ট একটা শিশু,

সেই মানুষটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠল ভয়ংকর এক মাফিয়া? কিভাবে? কেন? ন্যান্সির মস্তিষ্ক যেন উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। অন্যদিকে আফরিদ তখনও চেয়ারে বসে আছে। মাথাটা সামান্য নিচু। চোখদুটো অস্বাভাবিক রক্তিম। দেখলেই বোঝা যায় ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণাগুলো আজও পচে পচে তাকে শেষ করে দিচ্ছে। কিন্তু সে কাঁদবে না।

না। কান্না নামক দুর্বলতাটা বহু আগেই হত্যা করেছে আফরিদ এহসান। ঠিক বারো বছর আগে। যেদিন সে নিজের বাবার গলিত দেহ হাতে তুলে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিল। ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করল সে। আঙুলের ফাঁকে আটকে লাইটার জ্বা’লাল।

টিক। আ’গুনের ক্ষু’দ্র শিখাটা এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করল তার নিষ্ঠুর মুখচ্ছবি।

অতঃপর সিগারেটটা ঠোঁটে গুঁজে নিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দীর্ঘ টান দিল। ধোঁয়া বেরিয়ে এলো তার ওষ্ঠ ফাঁক দিয়ে। ধূসর ধোঁয়াগুলো যেন তার অতীতের দগদগে স্মৃতির মতো পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।

ন্যান্সি অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

“অ্যাডভোকেট আফরিদ এহসান, মাফিয়া কেন হয়ে গেল। মুস্তাক এহসানই বুঝি তার কারণ?”

মুহূর্তেই থেমে গেল আফরিদের হাত।সিগারেটটা এখনো জ্বলছে। ধোঁয়া পাক খেয়ে উপরে উঠছে। কিন্তু মানুষটা স্থির। অস্বাভাবিক স্থির।

ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল মেঝেতে বসে থাকা ন্যান্সির দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ভয়ংকর তাচ্ছিল্যের হাসি। সেই হাসিতে ছিল শূন্যতা। অভিমান। আর বহু বছরের পুঞ্জীভূত ঘৃণা।

আফরিদ ধোঁয়া ছেড়ে নিচু স্বরে বলল,

“মুস্তাক এহসান!”

কথাটা উচ্চারণ করতেই তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে পুনরায় বলল,

“আফরিদ এহসানের পুরো পৃথিবী ছিলরে বান্দি!”

তার চোখের ভেতর ক্ষণিকের জন্য ঝলসে উঠল ছোট্ট এক শিশুর মুখ। যে প্রতিদিন বাবার আঙুল ধরে স্কুলে যেত। যে বাবার বুকে মাথা রেখে ঘুমাত। যে বিশ্বাস করত তার পাপা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ।

আফরিদ নিঃশব্দে হেসে উঠল।সেই হাসি ছিল ভাঙাচোরা।

“বাবা ভক্ত ছেলে ছিলাম আমি!”

দীর্ঘ টান দিল আবার সিগারেটে। তার কণ্ঠ হঠাৎ কর্কশ হয়ে উঠল।

“কিন্তু ওইদিন? ওইদিন নিজের চোখের সামনে দেখলাম একটা সৎ মানুষ এই পৃথিবীতে কতটা অসহায়।”

চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে আফরিদ এহসানের!

“আমি চিৎকার করেছিলাম, কেঁদেছিলাম, পুলিশের পা জড়িয়ে ধরেছিলাম!”

তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে আরও লাল হয়ে উঠল।

“কিন্তু কেউ আমার পাপাকে বাঁচাতে পারেনি।”

ন্যান্সির বুক কেঁপে উঠল। আফরিদ এবার ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।

“জানিস বান্দি সেদিন আমি একটা জিনিস বুঝেছিলাম।”

অন্ধকার দৃষ্টিতে তাকাল ন্যান্সির দিকে। ন্যান্সি স্থির নেত্রে তার দিকে চেয়ে আছে।

“এই পৃথিবীতে সৎ মানুষরা শুধু মরার জন্য জন্মায়।”

ন্যান্সির শ্বাস আটকে এলো। এ যে চরম সত্যি!”

আফরিদ নিচু স্বরে বলল,

“তাই আমিও বদলে গেছি।”

আফরিদ এহসানের কণ্ঠস্বর এখন বরফশীতল।

“যে দুনিয়া আমার বাবাকে গলিয়ে মেরেছে, আমি সেই দুনিয়াকেই আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে নিজেই এক আ’গ্নেয়গিরির লা’ভা হয়ে নিজেকে গড়ে নিলাম!”

*************************

অতীত….

আইন।মাত্র তিন অক্ষরের একটি শব্দ।কিন্তু এই তিন অক্ষরের শব্দটার উপরই অগাধ বিশ্বাস ছিল ছোট্ট আফরিদ এহসানের।তার বিশ্বাস ছিল অন্যায় যত বড়ই হোক না কেন, একদিন না একদিন আইন তার বিচার করবে।তাই তো সে উকিল হতে চেয়েছিল।

কালো কোট গায়ে চড়িয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে লড়তে চেয়েছিল।

কিন্তু মাত্র বারো বছর বয়সেই তাকে নির্মমভাবে শিখিয়ে দেওয়া হলো বাস্তবতা বইয়ের পাতার মতো সুন্দর নয়।

*****************

মুস্তাক এহসানের মৃত্যুর পর পুরো বার্সেলোনা জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল।

সংবাদমাধ্যম সরব হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এতকিছুর পরেও মিস্টার আলবার্টকে গ্রেফতার করা হলো না। বরং ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো। যারা সেদিন গবেষণাগারের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল, তারা সবাই একে একে আদালতে দাঁড়িয়ে একই বক্তব্য দিল।

“মিস্টার আলবার্ট সেদিন ল্যাবে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি বেরিয়ে যান।”

“আমরা নিজ চোখে তাকে চলে যেতে দেখেছি।”

“এরপর একজন মহিলা আসেন, যিনি নিজেকে মাইমুনা এহসান বলে পরিচয় দেন।”

“আরও কিছুক্ষণ পর আবার মাইমুনা এহসান আসেন।”

একেকটি সাক্ষ্য যেন একেকটি বিষাক্ত তীর হয়ে বিদ্ধ করছিল সত্যকে। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।

ল্যাবের সিসিটিভি ফুটেজ

উধাও। সেই সময়কার প্রতিটি রেকর্ডিং রহস্যজনকভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।

কেউ জানে না কিভাবে। কেউ জানে না কার নির্দেশে।

ফলাফল প্রমাণহীন এক মামলা।আর প্রমাণহীন মামলায় সত্যও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে।

*********************

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাইমুনা এহসান কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,

“সব মিথ্যা! আমি যখন ছেলেকে নিয়ে সেখানে পৌঁছাই, তখন ল্যাবে কেউ ছিল না। সিকিউরিটি গার্ড ছিল না। আমি আত্মরক্ষার জন্য মেহমুনাকে আ’ঘাত করেছি। আমার স্বামীকে আমি ভালোবাসতাম। আমি কেন তাকে হ’ত্যা করব?”

তার কান্নাভেজা কণ্ঠ আদালতজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কিন্তু সন্দেহের কালো মেঘ কিছুতেই সরে যাচ্ছিল না।

*************

আদালতের পেছনের সারিতে বসে ছিল ছোট্ট আফরিদ। তার দুই পা মাটিতে ঠিকমতো পৌঁছায় না।

তবুও সে বসেছিল। নিঃশব্দে। স্থিরভাবে।

সে দেখছিল কিভাবে সত্যকে বিকৃত করা যায়।

কিভাবে মিথ্যাকে প্রমাণে পরিণত করা যায়।

কিভাবে অপরাধীরা হাসিমুখে আদালত ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। আর কিভাবে নির্দোষ মানুষ সন্দেহের ভার নিয়ে বেঁচে থাকে। সেদিনই প্রথমবারের মতো আফরিদের বিশ্বাসে ফাটল ধরেছিল।

****************

মিস্টার আলবার্ট? তিনি মুক্ত। মিখাইলের অর্থ, ক্ষমতা এবং প্রভাবের ছায়ায় নিরাপদ। অপরদিকে মাইমুনা এহসান প্রতিদিন সমাজের প্রশ্ন, সন্দেহ এবং অপমানের ভার বইছেন।

******************

“অভ্র, তুমি তো জানো আমি আমার বোন আর মুস্তাককে কতটা ভালোবাসতাম!”

মাইমুনার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। তার সামনে বসে থাকা অভ্র মাথা নিচু করে ফেলল।

হঠাৎ করেই তার চোখ ভিজে উঠল।

“আপু!”

কথা বলতে গিয়েও গলা আটকে গেল তার।

“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, মেহমুনা এমন কিছু করতে পারে।”

পুরুষ মানুষ হয়েও সে কেঁদে ফেলল। কারণ কখনো কখনো শোক পুরুষ-নারী চেনে না।

শুধু মানুষকে ভেঙে দেয়। অভ্র দুহাতে মুখ ঢেকে বলল,

“আমার ছেলে দুটোর কি হবে এখন? সাব্বির, নীলাদ্রি? ওরা কিভাবে বাঁচবে ওদের মাকে ছাড়া?”

মাইমুনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে অভ্রের কাঁধে হাত রাখলেন।তার কণ্ঠ ক্লান্ত, তবুও দৃঢ়।

“এত চিন্তা করো না। আমি তো আছি। সাব্বির আর নীলাদ্রি শুধু তোমার সন্তান নয়। ওরা আমারও সন্তান।”

অভ্র স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কথা খুঁজে পেল না।

*******************

বাড়ির এক কোণে বসে আছে আফরিদ। চারপাশের কেউ খেয়াল করছে না। ছেলেটা নিঃশব্দে কাঁদছে।

তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর সঙ্গে ভেসে উঠছে মুস্তাক এহসানের মুখ।ফিসফিস করে বলল সে।

“পাপা তুমি তোমার চ্যাম্পকে এভাবে একা রেখে গেলে?”

ছোট্ট ছেলেটা ছোট্ট বুকটা কেঁপে উঠল।

“পাপা, ওই আইনজীবীরা ভালো না। আমি আর কখনো কালো কোট পরব না। কখনো না!”

হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়াল আফরিদ! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো আশেপাশে! দৌড়ে গেল আলমারির দিকে।

সেখানে যত্ন করে রাখা ছিল জন্মদিনে পাওয়া উকিলের পোশাক। যেটা মুস্তাক নিজ হাতে কিনে দিয়েছিলেন। আফরিদ সেটি তুলে নিল।

কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর ক্রো’ধ, শোক আর অসহায়তার উ’ন্মত্ত মিশ্রণে পোশাকটিতে আগু’ন ধরিয়ে দিল।

দাউদাউ করে জ্ব’লে উঠল কালো কোটটি!

আ’গুনের লেলিহান শিখা কক্ষজুড়ে নাচতে লাগল।

ঠিক তখনই ছুটে এলেন মাইমুনা এহসান।

“আফরিদ!”

তিনি দ্রুত আ’গুন নেভানোর চেষ্টা করলেন।

তারপর ছেলেটাকে শক্ত করে বুকে টেনে নিলেন।

“বেটা! আমার বেটা!”

আফরিদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

“আই হেট মিস্টার আলবার্ট, মম! ওরা আমার পাপাকে নিয়ে গেছে! ওরা আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে!”

আফরিদের কণ্ঠ জুড়ে ছিল অসহনীয় যন্ত্রণা।

মাইমুনা ছেলেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

তার নিজের চোখ থেকেও অশ্রু ঝরছে।

কিন্তু তিনি শুধু একটি কথাই বললেন,

“না, বেটা, ঘৃণা মানুষকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দেয়। তোমার পাপা চাইতেন তুমি মানুষ হও। ওনার মতো মাথা উঁচু করে বাঁচো।”

কিন্তু সেই রাতে মায়ের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে থাকা ছোট্ট আফরিদের হৃদয়ে প্রতিশোধ, শোক আর ভাঙা বিশ্বাসের যে বীজ রোপিত হলো সেটাই একদিন তার সমগ্র জীবনকে বদলে দিতে চলেছিল।

********************

ইসাবেলা অস্থির হয়ে ঘরের ভেতর পায়চারি করছে।

তার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কিছুতেই মন স্থির করতে পারছে না সে।

আলবার্ট তার স্বামী সেদিনের পর থেকে আর ফেরেনি। ফোনেও কোনো উত্তর নেই।

রোসা বারবার এসে ডাক দিয়েছে খাওয়ার জন্য, কিন্তু ইসাবেলা একবারও প্লেটের দিকে হাত বাড়ায়নি।

ক্ষুধা নয় তার ভেতরটা ভরিয়ে আছে অজানা আশঙ্কায়।

সবকিছু কেমন এলোমেলো, জটিল, বিভ্রান্তিকর হয়ে যাচ্ছে। মুস্তাক এহসানের সেই পার্টিতে হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো রাগ, তারপর আলবার্টের আচমকা ভুল স্বীকার এরপর ল্যাবের সেই বিভীষিকাময় ঘটনা

মুস্তাক এহসান, মারুফুল হক, আর মেহমুনা আহমেদের মৃ’ত্যু সব মিলিয়ে বাস্তবতা যেন এক জটিল ধাঁধা।

ইসাবেলা মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে।

“কী হচ্ছে এসব!”

ঠিক তখনই দরজায় ক্ষীণ নক পড়ে। ছোট্ট ইভেলিনা ভেতরে ঢুকল।তার কণ্ঠ কোমল,

“মে আই কাম ইন, আন্টি?”

ইসাবেলা এক মুহূর্তের জন্য মৃদু হাসল। এই নিষ্পাপ কণ্ঠই যেন তাকে একটু স্বস্তি দিল।

“এসো ইভেলিনা আন্টির ঘরে ঢুকতে আবার পারমিশন লাগে নাকি, মামুনি?”

ইভেলিনা ধীরে এগিয়ে এসে ইসাবেলার সামনে বসে পড়ল। তার দৃষ্টি স্থির ইসাবেলার পেটের দিকে।

ভিতরে বেড়ে ওঠা নতুন জীবনের দিকে।

সে কৌতূহলী স্বরে বলল,

“আমাদের ছোট্ট ফেয়ারির নাম কী রাখবে, আন্টি?”

ইসাবেলা মৃদু হেসে ইভেলিনার থুতনি ছুঁয়ে দিল।

“উমম, কী রাখা যায় বলো তো?”

ইভেলিনা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হঠাৎ বলে উঠল,

“ইলা!”

ইসাবেলা হেসে ফেলল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য মায়া ঝিলিক দিল।

“আর যদি ছেলে হয়?”

ইভেলিনার মুখটা হালকা ম্লান হয়ে গেল।

এই দিকটা সে ভাবেনি। সে কিছুটা থেমে জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে কী রাখবে আন্টি?”

ইসাবেলা ধীরে ধীরে ভাবতে লাগল। ঘরের নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত পর সে বলল,

“ইলহাম ন্যান্সি।”

তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা।

“মেয়ে হলে ইলহাম ন্যান্সি। আর ছেলে হলে শুধু ইলহাম।”

ইভেলিনার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“ও গ্রেট! দারুণ নাম!”

********************

অন্যদিকে এহসান প্যালেসের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে পুলিশ বাহিনী। নীল আলো, সাইরেন, আর হাই-রেডিও নির্দেশে পুরো এলাকা এক অস্বাভাবিক উত্তেজনায় কাঁপছে। বারান্দায় পড়ে আছে অভ্রের নিথর দেহ।

ফরেনসিক টিম ব্যস্তভাবে কাজ করছে। সাক্ষীদের জেরা চলছে। চারপাশে প্রশ্নের ঝড়। প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহের আঙুল উঠেছে

মাইমুনা এহসান ও তার পরিবারের দিকে।

তারপর থেকেই পুরো পরিবারকে “ফেরারি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আফরিদ, নীলাদ্রি, সাব্বির সবাই নিখোঁজ। খবরটি দ্রুত পৌঁছে যায় মিডিয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার কাছে।

****************

এই খবর যখন আলবার্টের কানে পৌঁছায় সে ধীরে ধীরে হেসে ওঠে। একটি শীতল, হিসেবি হাসি।

তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই। শুধু তৃপ্তি।

সে ধীরে বলে ওঠে।

“তাহলে শুরু হয়ে গেছে! কতদিন পালাবে ওরা? একদিন না একদিন ধরা তো পড়বেই।”

তার কণ্ঠে নির্মম আত্মবিশ্বাস।

“পুলিশ এখন আমার কাজটা সহজ করে দেবে।”

সে চেয়ারে হেলান দেয়। হালকা শ্বাস ফেলে।

তারপর ধীরে যোগ করে,

“আফসোস, কষ্ট আমাকে করতে হলো না।”

কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ কুঁচকে যায়। মুখে আসে অস্বস্তির ছায়া।তার কণ্ঠ নিচু হয়ে আসে।

“ফর্মুলার ফাইল! ওটা এখনো পাওয়া গেল না।”

তার দৃষ্টি দূরে স্থির হয়ে যায়।

ল্যাবের সেই রহস্যময় ফাইল যার জন্য এত র’ক্ত, এত মৃ’ত্যু, এত ষড়যন্ত্র তা এখনো অধরা।

আর সেটাই আলবার্টের ভেতরের অস্থিরতার একমাত্র কারণ হয়ে উঠছে।

চলবে……………।

📌(অনেক বড় গল্প, চেষ্টা করেও এক পর্বে দিতে পারিনি,আরো একটা অংশ আছে।)

📌 আমি আবারো সতর্ক করছি, আপনারা যদি রেসপন্স করতে কার্পন্য করেন তাহলে আমিও সত্যি বলছি গল্পটা অফ করে দেব। তারপর যত ইচ্ছে সমালোচনা করুন।আই ডোন্ট কেয়ার…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply