অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
#পর্ব ৫৭
পুরো রুমে যেন আনন্দের হাট বসেছে। কোমরে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে গুঁজে নিয়ে ছোট্ট একটা সাউন্ড বক্সে গান ছেড়ে দিয়ে আপন মনে নাচছে রিদি। তার দুচোখে খুশির ঝিলিক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সে তার হৃদয়ে যত্নে রাখা সেই মানুষটিকে চিরতরে পেতে যাচ্ছে। এই পরম প্রাপ্তির খুশিতে মানুষ তো পাগল হবেই। বক্সে তখন উচ্চস্বরে বাজছে।
“ঈশ খোঁপা কইরা চুল নাকে পইরা দুল”
“সাজবো আমি বউগো সাজবো আমি বউ”
শুভ্র রুমের দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য ফাঁক করে ভেতরে তাকিয়ে রিদির এমন চঞ্চলতা দেখে তার চোখ কপালে উঠল। পরক্ষণেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল শুভ্রের ঠোঁটে। সে পা টিপে টিপে অত্যন্ত সন্তর্পণে রুমে প্রবেশ করল। রিদি তখনও নাচের তালে মগ্ন। শুভ্র নিঃশব্দে গিয়ে একদম তার পেছনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বেচারা রিদি টেরও পেল না যে তার ঠিক পেছনেই কেউ আছে। নাচতে নাচতে সে পেছনের দিকে আসতেই শুভ্রের চওড়া বুকে সজোরে ধাক্কা খেল। চমকে গিয়ে দ্রুত ঘুরে তাকাতেই শুভ্রকে সামনে দেখে রিদি থমকে গেল। মুহূর্তেই লজ্জায় তার ফর্সা মুখটা টকটকে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠল। সে আড়ষ্ট হয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল।
“আপনি? আপনি কখন এলেন?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিদির মায়াবী মুখটার দিকে। তার চোখের তৃষ্ণা যেন কিছুতেই মিটছে না। শুভ্রের এমন নেশাভরা চোখে তাকিয়ে থাকা দেখে রিদি আরও বেশি লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে লাগল। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে বলল।
“এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? মনে হচ্ছে আমাকে কোনোদিন দেখেননি?”
শুভ্র তবুও নির্বাক। তার ঠোঁটে কোনো কথা নেই। রিদি এবার একটু বিরক্ত হলো। মানুষটা এমন পাথরের মতো হয়ে আছে কেন। সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল।
“বোবা হয়ে গেলেন নাকি? কথা বলছেন না কেন?”
তবুও চারপাশ নিস্তব্ধ। শুভ্রের দিক থেকে কোনো শব্দ নেই। আছে শুধু হাহাকার মেশানো এক গভীর দৃষ্টি। রিদি এবার ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল।
“পাগল একটা।”
বলেই রিদি যখন পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল ঠিক তখনই শুভ্র বিদ্যুতের গতিতে ওর হাতটা ধরে এক টানে নিজের বুকের খুব কাছে নিয়ে এল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র তাকে পাজাখোলা করে জড়িয়ে ধরল। সে রিদির ঘাড়ের ভাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে গভীর এক নিশ্বাস নিল। শুভ্রের এই বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে রিদি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে অনুভব করল শুভ্রের উত্তপ্ত নিশ্বাস তার কাঁধে আছড়ে পড়ছে। যেন এই একটা আলিঙ্গনেই শুভ্র তার জীবনের সব অপরাধবোধ আর রিদির সহ্য করা সব যন্ত্রণার প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। রিদি শুভ্রের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পেল যা আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত আর অস্থির। যেন তার হৃদস্পন্দনগুলো আর্তনাদ করে বলছে যে রিদি ছাড়া শুভ্র কতটা অপূর্ণ। কিছুক্ষণ এইভাবেই গভীর নীরবতায় কাটল। রুমের ভেতর তখন কেবল দুজনের তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ। শুভ্র রিদির ঘাড়ের ভাঁজ থেকে মুখ না সরিয়েই খুব আবেশ মাখা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল।
“তুই এমন কেন রিদি। তোরে এত কেন ভালো লাগে আমার। কেন মনে হয় তুই ছাড়া আমার গোটা পৃথিবীটা নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। তুই পাশে না থাকলে মনে হয় আমি শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছি। কেন তুই আমার এমন এক নেশা হয়ে গেলি যেই নেশা ছাড়তে হলে আমার প্রাণটা দিয়ে দিতে হবে।”
রিদি কোনো উত্তর দিল না। সে নিথর হয়ে শুভ্রের বুকের ওপর মিশে রইল। শুভ্র এবার রিদির আলিঙ্গন সামান্য শিথিল করে ওর মায়াবী মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে আগলে ধরল। সে রিদির চোখের দিকে গভীর আর অপরাধী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল।
“আই এম সরি রিদি। আই রিয়েলি সরি। আমাকে তুই মাফ করে দে। আমি আজ তোর কাছে কোনো অধিকার নিয়ে ভালোবাসা চাইতে আসিনি। আমি শুধু একটা সুযোগ ভিক্ষা চাইছি। একটা সুযোগ পেলে এক সমুদ্র ভালোবাসা দিয়ে আমি আমার করা সব ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করব।”
রিদি একদম অবাক হয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে কিন্তু গলা দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। শুভ্র এবার রিদির দুই হাত নিজের শক্ত মুঠোর ভেতর নিল। সে পরম মমতায় রিদির দুই হাতের তালুতে ঠোঁট ছোঁয়াল। শুভ্রের এই স্পর্শে রিদি শিউরে উঠল। শুভ্র এবার অত্যন্ত আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল।
“একটা সুযোগ দিবি আমায়?”
রিদি আচমকা শুভ্রের হাত থেকে নিজের হাত দুটো ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল। শুভ্রের কপাল সাথে সাথে কুঁচকে গেল। ভয়ার্ত চোখে সে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু তার আগেই রিদি দুই হাতে শুভ্রের গলা জড়িয়ে ধরল। সে দুষ্টুমি মাখা চোখে তাকিয়ে বলল।
“যদি না দেই তাহলে?”
শুভ্র এবার প্রাণ খুলে ঠোঁট কামড়ে হাসল। তার দুশ্চিন্তার মেঘ নিমেষেই কেটে গেল। সে বাম হাত দিয়ে রিদির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলল। রিদির কপালে লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুলগুলো খুব যত্ন করে কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে শুভ্র পরম আবেশে বলল।
“যদি সুযোগ না দিস তবে তোকে আমি চুরি করে নিয়ে যাবো রিদি। এমন এক জায়গায় তোকে বন্দি করে রাখবো যেখানে আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। তোর ওই এক সমুদ্র অভিমান আমি আমার এক আকাশ ভালোবাসা দিয়ে কেড়ে নেবো। তুই সুযোগ না দিলেও আমি সুযোগ তৈরি করে নিতে জানি কারণ আমি তোকে ভালোবাসার পাশাপাশি জয় করতেও জানি। এই শুভ্র একবার যাকে নিজের করে নিয়েছে তাকে ছাড়ার ক্ষমতা স্বয়ং আজরাইলেরও নেই।”
রিদি মনে মনে হাসল। কিন্তু বাইরে একটা কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে শুভ্রকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে তার তর্জনী উঁচিয়ে শাসনের সুরে বলল।
“এখন আসছেন ভালোবাসা দেখাতে। খবরদার। আপনি একদম আমার কাছেও আসবেন না। যদি নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চান তবে এটাই আপনার জন্য উপযুক্ত শাস্তি।”
শুভ্রর ঠোঁটে তখন এক বাঁকা হাসি। সে শিকারি বাঘের মতো ধীর পায়ে রিদির দিকে এগোতে লাগল। তার চোখের দৃষ্টিতে রিদি যেন ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। শুভ্র খুব নিচু আর গম্ভীর স্বরে বলল।
“আমি যদি কাছে না আসি তবে আপনি থাকতে পারবেন তো মিসেস শুভ্র চৌধুরী?”
রিদি পিছু হটতে হটতে ঘরের দেয়ালের সাথে লেগে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে কিন্তু মুখে দম্ভ ধরে রেখে বলল।
“আলবাত পারব। পারব না কেন?”
শুভ্র তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে একদম রিদির গায়ের ওপর ঝুঁকে এল। সে রিদির দুই পাশে দেয়ালের ওপর হাত রেখে তাকে একরকম বন্দি করে ফেলল। তাদের মাঝে এখন সুতোর ব্যবধানও নেই। শুভ্র রিদির চোখের গভীরে নিজের দৃষ্টি গেঁথে দিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“আর ইউ শিওর?”
রিদির গলার স্বর আটকে গেল। শুভ্র তার মুখটা রিদির কানের খুব কাছে নিয়ে এল। তার গরম নিঃশ্বাস রিদির ঘাড়ে আছড়ে পড়ায় রিদি শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। শুভ্র খুব ধীর আর নেশাতুর গলায় বলতে লাগল।
“তুই কি আসলেই পারবি রিদি। আমার এই গায়ের ঘ্রাণ ছাড়া তোর ঘুম আসবে তো। মধ্যরাতে যখন খুব একা লাগবে তখন কি আমাকে খুঁজবি না। তুই দূরে থাকতে চাইলেই কি আমি থাকতে দেবো। এই যে তোর হৃদপিণ্ডটা এখন ড্রামের মতো বাজছে। এটা কি মিথ্যে বলছে। তুই চাইলেও আমার মায়া থেকে বের হতে পারবি না রিদি। কারণ আমি তোর রক্তে মিশে গেছি।”
শুভ্র রিদির কপাল দিয়ে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। পুরো ঘরে তখন কেবল দুজনের ভারী নিশ্বাসের শব্দ আর এক অদ্ভুত প্রেমময় নিস্তব্ধতা। রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে শুভ্রের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। যেন এখনই না ধরলে সে পড়ে যাবে। শুভ্র মৃদু হেসে রিদির নাকে নিজের নাক ঘষে দিয়ে বলল।
“শাস্তি দিতে চাইলে দে। কিন্তু দূরে যাওয়ার কথা ভুলেও মুখে আনিস না। তাহলে আমি নিজেকেও শেষ করে দেবো।”
রিদি চোখমুখ শক্ত করে বলল।
“আপনি আসলেই একটা খারাপ পুরুষ। পৃথিবীতে এত পুরুষ থাকতে কেন যে আপনার ওপরই আটকে গে”
বাকিটুকু শেষ করতে পারল না। তার আগেই রিদির পাতলা ঠোঁট জোড়া শুভ্র নিজের ওষ্ঠে দখল করে নিল। মুহূর্তের মধ্যে যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল এক নিমিষেই থেমে গেল। রিদির শরীরটা হঠাৎ শিথিল হয়ে এল। প্রথমে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে চাইল। তার দুহাত শুভ্রের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। কিন্তু শুভ্র আজ অদম্য। সে আরও শক্ত করে রিদির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সুঠাম বুকের সাথে পিষে ফেলল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। রিদি ধীরে ধীরে অনুভব করল শুভ্র অত্যন্ত মমতা আর তৃণা নিয়ে তার ঠোঁট দুটো আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে। কী যে হয়ে গেল রিদির সে নিজেও জানল না। তার সমস্ত রাগ আর অভিমান যেন মোমের মতো গলে জল হয়ে গেল। সে এক অজানা ঘোরের রাজ্যে তলিয়ে যেতে লাগল। এক পর্যায়ে রিদি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সেও শুভ্রের সাথে রেসপন্স করতে শুরু করল। শুভ্রের দুই হাত এখন রিদির পিঠ আর চুলের ভাঁজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। দুজনেই যেন অতল কোনো প্রেমের সাগরে ভাসছে। কেউ কাউকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে না। যেন এই কয়েক মিনিটের প্রাপ্তি তাদের গত কয়েক মাসের সমস্ত বিরহ আর হাহাকারকে এক নিমেষে মুছে দিচ্ছে। পুরো ঘরে তখন কেবল দুজনের ঘন আর অস্থির নিশ্বাসের শব্দ। আজ তারা একে অপরের মাঝে হারিয়ে গিয়ে যেন খুঁজে পেল তাদের কাঙ্ক্ষিত সেই স্বর্গ। তারা জানলও না কখন তাদের চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলগুলো একে অপরের ঠোঁটের স্পর্শে এক হয়ে মিশে গেছে। পাক্কা দশ মিনিট লড়াই করে শুভ্র রিদির ঠোঁট ছাড়ল। দুজনেই মারাত্মক গতিতে হাঁপাতে লাগল। দুজনের নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। শুভ্র হাঁপাতে হাঁপাতে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসল। সে ভাঙা গলায় বলল।
“কী মিসেস। বলছিলাম না আমি ছুঁলে নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন না। মিলে গেল তো?”
রিদি চোখ পাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে অস্ফুটে বলল।
“অসভ্য।”
শুভ্র এবার রিদির ঘাড়ের খাঁজে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। এই প্রথম শুভ্র রিদির এতটা কাছে এসেছে। রিদির শরীরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে অবশ হয়ে এল। একজন প্রেমিকা যখন তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের এত নিবিড় সান্নিধ্য পায় তখন তার শরীরের প্রতিটি কোষে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। রিদির বেলায়ও তাই হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে কোনো এক মায়াবী কুয়াশার মাঝে তলিয়ে যাচ্ছে। শুভ্রের গায়ের সেই চেনা পুরুষালি ঘ্রাণ আর তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়ায় তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। রিদি অনুভব করল তার পা দুটো কাঁপছে আর বুকের ভেতরটা যেন এক নাম না জানা ঝড়ে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। শুভ্র রিদির ঘাড়ের নরম চামড়ায় আলতো করে একটা চুমু খেল। তার ঠোঁটের উষ্ণতায় রিদি চোখ বন্ধ করে শুভ্রের শার্টটা খামচে ধরল। শুভ্র নেশালো কণ্ঠে শুধাল।
“তুই পাগল করে ছাড়বি। তোর কাছে আসা মানে আমার জন্য মহাবিপদ। নিজেকে সামলাতে বড্ড কষ্ট হয় রে।”
বলেই শুভ্র রিদির থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। সে বুক ভরে বড় বড় শ্বাস টেনে নিজের ভেতরের উত্তাল উন্মাদনাকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর নিজেকে কিছুটা শান্ত করে রিদির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
“তোর কি সবুজ শাড়ি আছে?”
রিদি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল।
“সবুজ শাড়ি কেন?”
শুভ্র একটু গম্ভীর হয়ে বলল।
“জাস্ট টেল মি। আছে কি না সেটা বল?”
“না নেই। সবুজ রঙ আমার একদম পছন্দ না।”
শুভ্র এবার ধীর পায়ে আবার রিদির একদম কাছে চলে আসল। ওর চোখের মণির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল।
“বাট ডু ইউ নো হোয়াট। তোকে সবুজ রঙে সব থেকে বেশি বিউটিফুল লাগে। তোর গায়ের রঙে এই রঙটা যেন একদম মিশে যায়।”
রিদি এবার যারপরনাই অবাক হয়ে বলল।
“কীভাবে। আমি তো আগে কখনো এই রঙের কাপড় পরি নাই। তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন?”
শুভ্র রহস্যময় এক হাসি দিল। তার সেই হাসিতে যেন হাজার বছরের গোপন কোনো ভালোলাগা লুকিয়ে আছে। সে মৃদু হেসে বলল।
“আই হ্যাভ সিন ইট। দেখেছি বলেই তো বলছি। তবে কবে দেখেছি আর কোথায় দেখেছি সেটা সিক্রেট। ওটা তোকে পরে বলব। আই’ম কামিং। জাস্ট ওয়েট আ মিনিট ফর মি।”
শুভ্র রহস্যময় হাসিটা দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সাথে ঈশানও যেন হাওয়া। রিদি কিছুক্ষণ ওভাবেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথায় একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। সবুজ রঙ। সে তো কোনোদিন এই রঙের ত্রিসীমানায় যায়নি। তবে শুভ্র কবে দেখল। লোকটা কি দিনদুপুরেও স্বপ্ন দেখে। ক্লান্তি আর শরীরের এক অদ্ভুত দুর্বলতায় রিদি আর ভাবনার জাল না বুনে ফ্রেশ হয়ে শাড়িটা বদলে নিল। একটা আরামদায়ক হলুদ কামিজ পরে যখন ওয়াশরুম থেকে বের হলো। দেখল শুভ্রা বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। রিদিকে দেখেই সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে প্রশ্ন করল।
“আচ্ছা রিভা। সত্যি করে বল তো ভালোবাসার অনুভূতি ঠিক কেমন হয় রে?”
রিদি চুল মুছতে মুছতে অবাক হয়ে তাকাল।
“হঠাৎ এই প্রশ্ন। তা জেনে তুই কী করবি?”
শুভ্রা বিছানায় বসে একটা বালিশ হাঁটুর ভাঁজে রেখে তার ওপর ভর দিয়ে উদাস গলায় বলল।
“না মানে। আমার মনের ভেতর ইদানীং কিছু অদ্ভুত হচ্ছে। জাস্ট আমার অনুভূতির সাথে একটু মিলিয়ে দেখতে চাইছি।”
রিদি তোয়ালে ফেলে দ্রুত শুভ্রার পাশে গিয়ে বসল। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলল।
“সিরিয়াসলি। তুই আবার কারো প্রেমে পড়লি নাকি?”
শুভ্রা রিদির মাথায় একটা হালকা চাপড় দিয়ে মুখ ঝামটা দিল।
“আরে গাধা। প্রেমে পড়েছি কি না সেটা কনফার্ম হওয়ার জন্যই তো তোর কাছে জানতে চাইছি। বল না। ভাইয়াকে দেখলে তোর ঠিক কেমন লাগে?”
রিদি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে শুভ্রের সেই নেশালো চাহনি আর ঘাড়ের কাছে তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়াটা ভেসে উঠল। সে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে খুব আবেশ মাখা স্বরে বলতে লাগল।
“শুভ্র ভাই যখন আমার সামনে আসে না। তখন মনে হয় বুকের ভেতরটা কোনো এক অজানা ঝড়ে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। হার্টবিটটা আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। রীতিমতো ড্রামের মতো বাজতে শুরু করে। মনে হয় আশেপাশে যারা আছে। তারাও বোধহয় সেই ধকধকানি শুনতে পাচ্ছে।”
রিদি জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল।
“ওকে দেখলে এক অদ্ভুত ভয় কাজ করে। আবার সেই ভয়ের আড়ালেই এক গভীর প্রশান্তি লুকিয়ে থাকে। মনে হয় পৃথিবীর সব কোলাহল এক নিমিষেই থেমে গেছে আর পুরো দুনিয়াতে শুধু আমরা দুজন আছি। ওর গায়ের সেই চেনা তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণটা যখন নাকে আসে। তখন নেশার মতো লাগে। মনে হয় সব অভিযোগ। সব অভিমান ওই এক নিশ্বাসেই কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।”
শুভ্রা সব কিছু মনোযোগ দিয়ে শুনলো। রিদির প্রতিটা কথা যেন তার হৃদপিণ্ডে গিয়ে তীরের মতো বিঁধছিল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর আর দ্বিধা মেশানো গলায় বলল।
“আচ্ছা রিদি। যখন ভাইয়াকে অন্য কোনো মেয়ের পাশে দেখিস তখন তোর ঠিক কেমন লাগে?”
রিদি কিছুক্ষণ থমকে রইল। জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলতে লাগল।
“তখন মনে হয় আমার ভেতরটা কেউ জ্যান্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে। যখন দেখি অন্য কোনো মেয়ে ওর খুব কাছে দাঁড়িয়ে হাসছে কিংবা ওর সাথে কথা বলছে। তখন বুকের ভেতর এক অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় পৃথিবীটা ওখানেই থমকে গেছে। খুব ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে মেয়েটার হাত থেকে ওকে ছিনিয়ে নিয়ে আসি আর চিৎকার করে বলি ‘ও শুধু আমার। ওর ওপর আর কারো কোনো অধিকার নেই’।”
রিদি নিজের অজান্তেই ওড়নার আঁচলটা হাত দিয়ে মুচড়াতে লাগল। তার কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী হয়ে এল।
“ভীষণ হিংসে হয় রে। এক ধরনের জেদ আর রাগ মাথার রগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মনে হয় ওই মানুষটা কেন বুঝতে পারছে না যে ওর পাশে অন্য কাউকে দেখা আমার জন্য কতটা কষ্টের। তখন নিজেকে খুব একা আর অসহায় মনে হয়। মনে হয় আমার সাজানো বাগানটা কেউ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আসলে ভালোবাসা মানে শুধু ভালো লাগা নয়। ভালোবাসা মানে এক আকাশ সমান অধিকারবোধ। আর সেই অধিকারে যখন অন্য কেউ ভাগ বসাতে আসে। তখন মনে হয় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। মনে হয় ওর প্রতিটা হাসি। প্রতিটা চাহনি কেবল আমারই প্রাপ্য।”
শুভ্রা এক দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে ছিল। রিদির কথাগুলোর মাঝে সে যেন নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিল। ঈশানকে দেখলে রিদির বলা সব অনুভূতিই যেন শুভ্রার সাথে হুবহু মিলে যায়। ঈশান সামনে আসলেই ওর ভেতর এক অজানা ভয় কাজ করে। আবার ঠিক তার পরক্ষণেই এক অদ্ভুত ভালো লাগা এসে মনটাকে শান্ত করে দেয়। রিদির বলা সেই বুকের ভেতর ধকধকানি। সেই শরীরের ভেতর বিদ্যুতের শিহরণ। সবই তো শুভ্রা অনুভব করে ঈশানের জন্য। যখন কোনো মেয়েকে ঈশানের পাশে দেখে। তখন ওরও বুকের ভেতরটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে। প্রচণ্ড রাগ লাগে। ওরও বলতে ইচ্ছে করে ‘ঈশান শুধু আমার। ও অন্য কারো হতে পারে না’। ভাবতেই শুভ্রার কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। বিছানার চাদরটা সে খামচে ধরল। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল। তবে কি আমি সত্যিই ঈশানকে ভালোবেসে ফেললাম। পরক্ষণেই এক রূঢ় বাস্তবতা এসে ওর সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেল। এটা কীভাবে সম্ভব। ঈশান হিন্দু আর সে মুসলিম। দুজনের ধর্ম আলাদা। সমাজ আলাদা। এই অনুভূতির কথা যদি একবার সোহান চৌধুরীর কানে যায়। তবে তিনি তাকে মেরেই ফেলবেন। চৌধুরী বংশের মান-সম্মান আর আভিজাত্যের কাছে তার এই প্রেম যে এক চরম অপরাধ। কিন্তু অন্য দিকে শুভ্রার মনটা বড় অবুঝ। সে হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে বোঝাতে পারছে না। এই পৃথিবীতে ঈশানকে ছাড়া আর কোনো পুরুষের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আসে না। কোনো ভালো লাগা কাজ করে না। ঈশানের সেই শান্ত চাহনি আর গভীর ব্যক্তিত্বের কাছে সে যেন বারবার হার মেনে যায়। শুভ্রা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে না তার এই অনুভূতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে। বা এর শেষ কোথায়। ভালো লাগা আর এই কঠিন বাস্তবতার মাঝে পড়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা ভেবেই ওর ভেতরটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। ও কি পারবে নিজের ধর্ম আর পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে এই ভালো লাগাকে টিকিয়ে রাখতে। নাকি এই অঙ্কুরেই ঝরে যাবে ওর প্রথম প্রেম। শুভ্রার চোখ দুটো অজান্তেই ভিজে এল।
রানিং.
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৭
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব সারপ্রাইজ
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৫