Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৩৫)

সোফিয়া_সাফা

​বিশাল আকৃতির ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চারকোল ব্ল্যাক টার্টলনেকের ওপর স্ট্রাকচার্ড ব্লেজারটা গায়ে চাপাল উদ্যান। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, হাতে লেদার স্ট্র্যাপের ঘড়ি ঠিক করতে করতে চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিল।
​আজ সকাল সকাল কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিছানা ছেড়েছে সে। তখনই ঘরের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে অ্যালেক্স বলে উঠল, “এ পার্সন হ্যাজ বিন স্ট্যান্ডিং অ্যাট দ্য ডোর ফর অ্যাপ্রক্সিমেটলি ফিফটিন মিনিটস, মাস্টার।”

​উদ্যান ভ্রুক্ষেপহীন গলায় বলল, “হু?”

​অ্যালেক্স সময় নিয়ে বলল, “ইট ইজ দ্য ইন্ডিভিজুয়াল ইউ রেফার টু অ্যাজ ‘পেটাল’। শ্যাল আই ওপেন দ্য ডোর?”

উদ্যান ঘাড় বাঁকিয়ে দরজার পানে চাইল। জিভের অগ্রভাগ দ্বারা গালের অভ্যন্তরীণ ত্বক স্পর্শ করল। তারপর এক পা দু পা করে দরজার দিকে এগোতে লাগল।
​দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সমানে হাত কচলাচ্ছে ফুল। গত তিনদিন ধরে সে উদ্যানের মুখোমুখি হয়নি। সেদিন টেরেস থেকে একপ্রকার দৌড়ে পালিয়ে আসার পর, নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলেছিল। উদ্যানও তার সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধা জানিয়ে আগ বাড়িয়ে কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেনি। ওয়েট, ‘শ্রদ্ধা’? উদ্যান আদৌ কারো সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জানে? ফুল মনে করে উদ্যান নিজের কাজে এতটাই ডুবে আছে যে তাকে নিয়ে ভাবার ফুরসতটুকু পাচ্ছে না। তাই নিতান্তই বাধ্য হয়ে ফুলকে তার দুয়ারে আসতে হয়েছে।
​খট শব্দে দরজা খুলতেই ফুলের আকাশকুসুম ভাবনার স্রোত থমকে গেল। বিস্ময়ে নিঃশ্বাস আটকে এল। চোখের সামনে দানবকে এমন ফরমাল লুকে দেখে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে রইল। উদ্যান ভ্রু উঁচিয়ে একবার তাকে পুরোদস্তুর পর্যবেক্ষণ করে নিল, তারপর স্বরে ভার নামিয়ে বলল, “পুরো তিনদিন পর আমার ওয়াইফির মনে পড়ল আমার কথা?”

​ফুল হালকা কেঁপে উঠল। দৃষ্টি ফ্লোরে ছুড়ে বলল, “আপনি হয়তো আমাকে আশা করেননি, তাই না?”

উদ্যানের চোখ ফুলের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এমনভাবে বিচরণ করছে যেন তার সামনে একগ্লাস টেকিলা রাখা। সে অত্যন্ত নিরাবেগ গলায় প্রত্যুত্তর করল, “আশা করিনি বললে ভুল হবে। উল্টো তুমিই হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলতে চাওনি। সেই জন্যই দরজায় নক না করে দাঁড়িয়ে ছিলে।”

​ফুল চায় না সেই রাতের বিব্রতকর পরিস্থিতির কথা স্মরণ করতে। এমনিতেই সে উদ্যানের চোখে চোখ রাখতে পারে না। তার ওপর সেই ঘটনা তার ভেতরে গড়ে তোলা প্রতিরোধে ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে। ফুল নিজের অস্বস্তি লুকাতে প্রয়োজনীয় কথা তুলল, “শুনুন, আপনাকে আমার কিছু বলার ছিল।”

​উদ্যান ফুলের অঙ্গভঙ্গি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে করতে বলল, “আমাকে যখন কিছু বলারই ছিল তখন শুধু শুধু পনেরো মিনিট ওয়েস্ট করলে কেন পেটাল? তুমি কি জানো না সময় কতটা মূল্যবান?”

​ফুল যতই অস্থিরতা এড়াতে চাইছে, ততই যেন উদ্যান নিজের ঘায়েল করা কণ্ঠে তাকে অস্থিরতার ঘূর্ণিপাকে নিক্ষেপ করছে। সে অযাচিত চিন্তাগুলো পাশে রেখে বলল, “আমি ভেবেছি আপনি ঘুমাচ্ছেন। তাই নক করিনি।” থামল ফুল, ঠোঁটের বাঁক হালকা ফুলিয়ে বলল, “আপনি এত সকাল সকাল রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছেন? আমার জানামতে তো আপনি দুপুরের আগে ঘুম থেকে ওঠেন না।”

​উদ্যান কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে সরে দাঁড়াল। কাফলিংক লাগাতে লাগাতে বলল, “তুমি আমার ব্যাপারে একটু-আকটু জানো তাহলে, ভালো লাগল। স্বামীর অভ্যাস-স্বভাব সম্পর্কে স্ত্রীর জানা থাকা ইতিবাচক লক্ষণ। ভেতরে এসে কথা বলো।”

ফুল মুখ বাড়িয়ে রুমের ভেতর উঁকি দিল। উদ্যান বুঝতে পারল সে তানের উপস্থিতির বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছে। ব্লেজারের কলার ঠিক করতে করতে উদ্যান নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “তান রুমে নেই। কেয়ারটেকারের সাথে ওয়াকে গেছে।”

চেপে রাখা নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগ করল ফুল। দু কদম ভেতরে ঢুকে বলল, “বললেন না তো কোথায় যাচ্ছেন?”
​উদ্যান ঘড়িতে সময় দেখে বলল, “বিজনেস পারপাসে এক জায়গায় যাচ্ছি।”

​ফুলের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “কোথায়?”

​উদ্যান প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, “তুমি কিছু বলতে এসেছিলে। অ্যাকচুয়ালি আমার হাতে বেশি সময় নেই। তাড়াতাড়ি বললে উপকার হতো। ঠিক টাইমে পৌঁছাতে না পারলে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা তোমার হবে আই থিংক।”
​“মানে? আপনার বিজনেসের সাথে আমার সুবিধা-অসুবিধার কী যোগসূত্র?”
​“এই জন্যই বললাম কারণ আমি নিজের কাজটুকু শেষ করে তোমাকে নিয়ে যেতে আসব।”
​ফুল বেকুবের মতো চেয়ে রইল। “আমি কোথায় যাব আপনার সাথে?”
​“দেশে আসার পর কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি, তাই আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাব।”
​“কোথায় ঘুরতে যাব?”
​“সেটা আপাতত সিক্রেট থাক। গেলেই দেখতে পারবে।”

উদ্যান খাটের ওপর বসে জুতো পরতে উদ্যত হলো। ফুল এই সুযোগে তার ওপর একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিল। দানবটাকে বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট কম, মাফিয়া বেশি লাগছে। সে বিড়বিড়িয়ে বলল, “এই প্রথম আমি কাউকে ফরমাল লুকের সাথে হেডব্যান্ড পরতে দেখলাম।”

​কালো লেদারের জুতোর ফিতা লাগাতে লাগাতে উদ্যানের আঙুল থেমে গেল। তৎক্ষণাৎ ফুলের চোখে চোখ রেখে ভরাট কণ্ঠে আওড়াল, “খারাপ দেখাচ্ছে?”

​ফুলের হৃদয় ছলকে উঠল। দৃষ্টি সরিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, “মোটেই না, সুন্দর দেখাচ্ছে।”

​উদ্যানের ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো। তবুও না শোনার ভান করে বলল, “কী বললে?”

অজানা শিহরণে ফুলের সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলো। বুঝতে পারল সে এমন কিছু বলে ফেলেছে যা তার বলার কথা ছিল না। উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে সামনে অবস্থানরত রমণীর অস্থিরতা উপভোগ করছে। ফুল মাথার কাপড় সামলে নিয়ে জোরপূর্বক হেসে বলল, “বললাম, খারাপ দেখাচ্ছে না।”

​উদ্যান ঠোঁট কামড়ে জুতোর ফিতা লাগানোতে মনোনিবেশ করল। “তুমি কি যা বলার এখনই বলবে নাকি কাল ফিরে আসার পর বলবে?”

​ফুল একটু অবাক হলো। “আপনি কাল আসবেন?”

​উদ্যান জুতো পরে ফোন হাতে নিল। “হ্যাঁ, সঠিক সময়ে যেতে পারলে কাল আসব, আর নইলে পরশু।”

​ফুল এবার আরও কয়েক পা এগিয়ে এল। শুকনো ঢোক গিলে নিচু গলায় বলল, “আপনি আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেবেন কি?”

​উদ্যান প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চাইল। ফুল ঠোঁট নেড়ে বলল, “আমি কক্সবাজারের ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। ক্লাস শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। আমি বর্তমানে কোথায় আছি সেটাই তো জানি না। এমন পরিস্থিতিতে কি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আশা করতে পারি?”

​উদ্যান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর মুখে বলল, “আমরা এই প্রসঙ্গে পরে কথা বলি?”

​ফুল প্রত্যুত্তর করল না। বরং চোখেমুখে নেমে এল অদ্ভুত এক কঠোরতা, যা উদ্যানের দৃষ্টি এড়ায়নি। সে ফুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতে যাবে অমনি ফুল পিছিয়ে গেল অনেকটা। উদ্যান চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করল। তারপর কণ্ঠে অচেনা শীতলতা যোগ করে বলল, “লুহানকে রেখে যাচ্ছি, ও তোমার পছন্দসই ভার্সিটিতে তোমাকে ভর্তি করে দিয়ে আসবে।”

​ফুল হতচকিত হয়ে উদ্যানের পানে চোখ ফেরাল। সে এইমাত্র ঠিক শুনেছে তো? উদ্যান সত্যিই তাকে পড়াশোনা করতে দেবে? সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “আপনি সত্যি বলছেন?”

​উদ্যান ফুলের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। ফুল টালমাটাল হয়ে উদ্যানের বাহু আঁকড়ে ধরল। উদ্যান নিচু অথচ দৃঢ় গলায় বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু যাওয়া-আসার পুরোটা সময় তোমার হাত আর চোখ বাঁধা থাকবে।”

​ফুলের ঠোঁট বেঁকে গেল। কপালে পড়ল বিরক্তির স্পষ্ট ভাঁজ। কিন্তু সে জানে, বেশি আশা করার পরিণাম ভালো হবে না। উদ্যান একমনে ফুলের নরম তুলতুলে হাতের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। সে বুঝে উঠতে পারে না এই মেয়ের শরীর এত কোমল আর স্পর্শকাতর কেন? এই মেয়ে কি জানে, উদ্যান তার মতো দুর্বল-ভঙ্গুর বস্তু ভাঙতে কতটা পছন্দ করে? আচমকা খসখসে হাতের শক্ত চাপে ফুল ভাবনার জগৎ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে, “আহ্!”

​সঙ্গে সঙ্গে উদ্যান ফুলের হাত ছেড়ে দেয়। ফুল নিজের লাল হয়ে আসা হাত আঁকড়ে ধরে ব্যথাতুর সুরে বলল, “আপনি আসলেই একটা দানব।”

উদ্যান দরজা পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ফুলের চোখে চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল, “Yes, I’m the beast, and you’ve become my beauty. Congratulations.”

​উদ্যানের পিছু পিছু ফুলও রুম ত্যাগ করল। উদ্যানের বলা কথাটা ফুলের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাকে পেছন পেছন আসতে দেখে থমকে দাঁড়ায় উদ্যান। সে আচমকা থেমে যাওয়াতে ফুল তার শক্তপোক্ত পেটানো পিঠে ধাক্কা খেল। উদ্যান পিছু না ফিরে বলল, “আমার পিঠে কপাল না ঠুকে রেডি হয়ে এসো গিয়ে। আমি যাওয়ার সময় লুহানকে বলে যাব।”

​ফুল নিজের কপালে হাত বুলাতে বুলাতে সেখানেই জমে গেল। আসলেই তো, সে উদ্যানের পিছু পিছু যাচ্ছে কেন? তার তো ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে নেওয়া উচিত।

​লিভিংরুমে উদ্যানের অপেক্ষায় বসে ছিল: লুহান, মেলো, অনি আর সোহম। উদ্যান সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তারা হাঁটা ধরল।

​“লুহান, তুই আমাদের সঙ্গে যাচ্ছিস না।” উদ্যানের কথা কানে পৌঁছাতেই থেমে গেল লুহান। পিছু ফিরে প্রশ্ন ছুড়ল, “আমি যাব না তো কী করব?”

​“ওয়াইফিকে ভার্সিটিতে নিয়ে যাবি।”

​লুহান ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। “তুই ওকে বাইরে নিয়ে যেতে বলছিস?”

​“হুম, ও যেখানে ভর্তি হতে চাইবে সেখানেই ভর্তি করিয়ে দিবি। ছুটি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবি। আর হ্যাঁ, সাথে করে নাদিয়া বা রুমাকে নিয়ে যাস—ওর হাত আর চোখ বেঁধে দেওয়ার জন্য।” উদ্যান এমনভাবে সবকিছু বলল যেন এগুলো একদম স্বাভাবিক ব্যাপার। লুহান উত্তরে মাথা চুলকে বলল, “আমিই কেন? সোহমকে যেতে বল ওর সাথে।”

​সোহমের মুখাবয়ব উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নাচতে নাচতে এসে বলল, “হ্যাঁ, তুই চাইলে আমি হোপফুলের পার্সোনাল ড্রাইভার হয়ে যেতেই পারি।”

​উদ্যান তেতো গলায় বলল, “ওর ড্রাইভারের নয়, বডিগার্ডের প্রয়োজন। সেই জন্যই তুই না, লুহান যাবে ওর সাথে।”

​সোহমের মুখ চুপসে গেল। নিচু গলায় বলল, “আমিও বডিগার্ডের থেকে কম নই।”

​লুহান তাল মিলিয়ে বলল, “হ্যাঁ, সোহম প্রতিদিন ওয়ার্ক আউট করে আমার সাথে। ও খুব ভালো গার্ড করতে পারবে তোর ওয়াইফকে। তাছাড়া তোকে একা ছাড়া ঠিক হবে না। ফুলের চেয়ে বেশি প্রটেকশন তোর প্রয়োজন।”

​উদ্যান ঘাড় হালকা কাত করে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি নিজেকে প্রটেক্ট করতে পারি লুহান। সেদিন অনির ফোন পেয়ে মনোযোগ সরে গিয়েছিল। ভবিষ্যতে তেমন কিছু হবে না। আমি চাই না রিহানের লোকেরা পেটাল অবধি এত সহজে পৌঁছে যাক। আশা করি তুই বুঝতে পেরেছিস ওর প্রটেকশনের কতটা প্রয়োজন।”

​লুহান মেলোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মেলো তখন ফোনে ব্যস্ত ছিল। লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদ্যানের কথায় রাজি হয়ে গেল। “ঠিক আছে। তোরা যা, আমি থাকছি।”


​জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে ছুটে চলেছে একটা গাড়ি। গাড়ির ভেতর ফুল, রুমা আর লুহান আছে। রুমা অবশ্য আসতে চায়নি, নাদিয়ার শরীর খারাপ থাকায় তাকে আসতে হয়েছে। ফুলের চোখ-হাত বাঁধার দায়িত্ব তার কাঁধে পড়েছে। ফ্রন্ট সিটে বসে ড্রাইভ করছে লুহান। ফুল ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল, “লুহান স্যার, আপনি খুব ভালো করেই জানেন, আমি আপাতত কোথাও পালিয়ে যাব না। কারণ হসপিটালে থাকাকালীন পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম আমি। তারপরও কেন চোখ-হাত বেঁধে রাখতে হবে? খুলে দিতে বলুন না।”

লুহান সাবলীল গলায় বলল, “সরি ফুল, মাস্টারের আদেশ এড়াতে পারব না।”

​ফুলের মন খারাপ হয়ে গেল। চোখে কালো কাপড় থাকায় সে কিছুই দেখতে পারছে না। “এর আগেও আমরা বাইরে এসেছিলাম তখন সে এমন কিছু করেনি। তাহলে আজকেই কেন?”

​লুহান বলল, “কারণ দু-একবার আসা-যাওয়া করেই কারো পক্ষে এই রাস্তা মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত যাতায়াত করলে তুমি চিনে ফেলতে পারো।”

​“তাহলে রুমা আপুর চোখ বাঁধেননি কেন? সে পালিয়ে যাবে না?” ফুলের অকস্মাৎ প্রশ্নে রুমা থতমত খেয়ে গেল। একমুহূর্তের জন্য মনে হলো লুহানও কথা হারিয়ে ফেলেছে। পরক্ষণেই কথা খুঁজে বের করে বলল, “কেউ ওকে আটকে রাখেনি ফুল। ও চাইলেই পালিয়ে যেতে পারে। কারো কিছু যাবে আসবে না। এস্টেটে কাজের লোকের অভাব নেই।”

ফুল চমকে উঠল। সে এগুলো শোনার জন্য কথাটা বলেনি। রুমার চোখে অশ্রুকণা ভর করল। গলা ফাটিয়ে কিছু কথা বলে দিতে মন চাইল। তবুও ফুল আছে ভেবে সব অভিযোগগুলো গলাতেই দাফন দিয়ে দিল। রুমার নিস্তব্ধতা ফুলের মধ্যে অনুশোচনা জাগাল। সে তার মন ভালো করার জন্য বলল, “আমি মনে করি আমার চেয়ে রুমা আপুই ভালো আছে। আর যাই হোক, তাকে কেউ আটকে রাখেনি। সে নিজের ইচ্ছায় চলতে পারে। কারো অধীনস্থ নয় সে।”

​রুমার শরীর শক্ত হয়ে এল। দু-হাতে হাঁটু চেপে ধরে ঠোঁট কামড়ে বসে রইল। লুহান অস্ফুট স্বরে বলল, “রিদম তোমাকে বোকাফুল বলে ভুল করেনি। তুমি আসলেই বোকাফুল। তোমার জানার পরিসীমা খুবই নগণ্য। নইলে ওর সঙ্গে নিজের তুলনা করতে না।”

​ফুল তার কথাগুলো শুনতে পায়নি। “কিছু বললেন?”

​লুহান মাথা নেড়ে বলল, “তোমাকে মনস্টারের গুহা থেকে পালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তুমিই সেই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে স্বেচ্ছায় মনস্টারের অধীনস্থ হয়ে থেকে যেতে চেয়েছো। তাই নিজের বোকা মস্তিষ্কের সাথে অন্য কারো তুলনা করো না।”

​কথাটা ফুলের অস্থিমজ্জা কাঁপিয়ে দিলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বগোতক্তি করল, “আমি আসলেই বোকা, সবকিছু বুঝেশুনেও কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। কিন্তু রুমা আপুর মতো কারো প্রতি যদি আমার ঝোঁক না থাকত, তাহলে অনায়াসে পালিয়ে যেতে পারতাম।” মুখে বলল, “আচ্ছা রুমা আপু, তুমি কেন পালিয়ে যাচ্ছ না? এস্টেটের মতো দানবের গুহায় থাকতে তোমার ভালো লাগে?”

​রুমার চোখ ছলছল করছে। যদিও ফুল তার অভিব্যক্তি পরীক্ষণ করতে পারছে না। রুমা চোখ মুছে বলল, “আমাদের মতো মানুষদের জন্মই হয়েছে অন্ধকারে থাকার জন্য। তাই মাস্টারের আশ্রয় ব্যতীত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে গেলে দম আটকে যাবে মিস্ট্রেসা, বুঝলেন।”
​“আমি তোমার কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।” ফুলের কথার পৃষ্ঠে লুহান বলল, “তুমি শুধু মাস্টারকে বোঝার চেষ্টা করো। আর কাউকে বুঝতে হবে না।”

​কথায় কথায় তারা ভার্সিটির সামনে এসে পড়ে। রুমা ফুলের চোখ ও হাতের বাঁধন খুলে দেয়। তারপর লুহান তাকে নিয়ে ভেতরে যায়। প্রিন্সিপালের সাথে কথাবার্তা বলে ফুলকে সেখানে ভর্তি করে দেয়। লুহান বলে, “আজ এস্টেটে ফিরে চলো। একেবারে ট্যুর কমপ্লিট করে তারপরই ক্লাস কোরো নাকি?”

​ফুল মাথা নেড়ে বলল, “না, অনেকদিন পর বাইরের হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ হাতছাড়া করব না। আমি ক্লাস করেই ফিরে যাব।”

​লুহান একটু সময় নিয়ে চাপা স্বরে বলল, “ক্লাস শেষে সোজা চলে এসো। আমাকে যেন ভেতরে আসতে না হয়। তোমার কিন্তু কোনো ধারণাও নেই ভার্সিটির চতুর্দিকে কতজন লোক তোমাকে পাহারা দিচ্ছে।”

​ফুল তার কথায় পাত্তা না দিয়ে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়াল। ক্লাসরুমে ঢুকতেই তার দেখা হয়ে গেল সেকেন্ড বেঞ্চে বসে থাকা মেহেকের সাথে। ফুলকে দেখে মেহেক রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। ফুলের অবস্থাও তার মতোই।
​“আরে মেহেক, তুমি?”

​মেহেক অবচেতন পায়ে উঠে দাঁড়াল। ফুলের সামনে এসে অবাক চোখে চেয়ে রইল। “আমি তো এই ভার্সিটিতেই ভর্তি হয়েছি। কিন্তু তুমি এখানে কীভাবে?”

​ফুল ঠোঁট নেড়ে বলল, “আমিও আজ এখানে ভর্তি হয়েছি।”

​মেহেকের কণ্ঠরোধ হয়ে এল। যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না উদ্যান ফুলকে পড়াশোনা করার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। ফাঁকা ঢোক গিলে বলল, “শুনে খুশি হলাম, অ্যাটলিস্ট তোমার ডেভিল হাজব্যান্ড তোমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে।”

ফুলের হাসি পেল না। তবুও হাসার চেষ্টা করে বলল, “হ্যাঁ, আমিও এক্সপেক্ট করিনি সে আমাকে বাইরে আসার অনুমতি দেবে। যাক বাদ দাও, বাড়ির বাকিরা কেমন আছে?”

​মুহূর্তেই মেহেক স্তব্ধ হয়ে গেল। ফুল তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “কী হয়েছে? তুমি খানজাদা নিবাসে থাকো সেই জন্যই জিজ্ঞেস করেছি। বলতে না চাইলে থাক।”

​মেহেক তার হাত ধরে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসল। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “তোমার মা আর মামি ভালো আছে ফুল। শুধু ভালো নেই আবেশ ভাই।”

​ফুল চমকে তাকাল। অস্থির হয়ে বলল, “কী হয়েছে আবেশ ভাইয়ের? সে কি এখনো সুস্থ হয়নি?”

​মেহেক ফুলের প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চোখ রেখে পরমুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ভাঙা গলায় বলল, “তোমাকে সে অনেক ভালোবাসে ফুল। ভালো নেই তোমাকে ছাড়া, শুধু তোমার খেয়ালে থাকে সারাক্ষণ। সে পাগল হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।”

​ফুলের শরীর ঢিলে হয়ে এল। যেন সব বোধবুদ্ধি হারিয়ে নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। মেহেক তার বাহু ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, “সে আমাকেও ফুল বলে ডাকে। তুমি বুঝতে পারছো সে কোন পর্যায়ে চলে গেছে? আচ্ছা ফুল, তুমি কি আবেশ ভাইকে ভালোবাসো না?”

​ফুলের মুখাবয়ব থমথম করছে। ঠোঁট জোড়ায় কম্পন দৃশ্যমান। সে শূন্য চোখে চেয়ে আছে।
​“কী হলো, বলো না ফুল। তুমি কি ভালোবাসো না তাকে?”

​ফুল ধীরে ধীরে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। মেহেক আশাহত হয়ে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সংযত করতে চাইল। “তুমি কেন আবেশ ভাইকে ভালোবাসো না ফুল? সে কী করেনি তোমার জন্য?”

​সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফ্লোরে নিক্ষেপ করল ফুল। বুকের ভেতর অনুতাপ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সে কীভাবে বোঝাবে? আবেশকে ভালোবাসতে না পারাই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
​যেই মনেপ্রাণে অনেক আগে থেকেই অন্য কারো রাজত্ব চলছে, সেই মনে আবেশকে কী নামে ঠাঁই দিত সে? তবুও তো ঠাঁই দিয়েছে সে ‘বন্ধু আর ভাই’ নামে। কিন্তু আবেশ যে সেই নামে ঠাঁই নিতে নারাজ। সে যে চায় না ফুলের বন্ধু কিংবা ভাই হতে।
​ফুল আস্তে আস্তে দিশেহারা হয়ে পড়ল। মেহেকের থেকে হাত ছাড়িয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে লাগল। পথিমধ্যে ক্লাসে শিক্ষক প্রবেশ করলেও ফুল থামেনি। যান্ত্রিক পায়ে সিঁড়ি বেয়ে একদম শেষ তলায় এসেই থেমেছে। তার হাঁটু যেন এই পর্যায়ে এসে দুর্বল হয়ে পড়েছে। হাঁটুতে হাত রেখে হাঁপাতে লাগল সে। ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছে পুনরায় হাঁটা ধরল।

​“তোমাদের বাড়ির দূরত্ব বেশি নয়। চাইলে চলে যেতে পারো।” হঠাৎ লুহানের প্রস্তাবে জানালার বাইরে চোখ ফেরাল রুমা।
গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে লুহান। রুমা নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল, “আমার পৃথিবী খুব ছোট হয়ে এসেছে। কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা নেই এখন আর।”

​লুহান নিঃশ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া টেনে নিয়ে শূন্যে ছেড়ে দিল। ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে ভেসে ভেসে মিলিয়ে যেতে লাগল হাওয়ায়।
​“নিজের ইচ্ছায় আবদ্ধ থেকে শুধু শুধু আমাকে দোষারোপ করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছো কেন?”
​“মুক্ত হওয়াই জীবনের অর্থ নয় লুহান স্যার। আমার জীবনের কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আর সবকিছুর জন্য দায়ী ছিলেন আপনি। সেদিন যদি আপনি আমাকে চুজ না করতেন, তাহলে আমার জীবন এতটা বিভীষিকাময় হতো না।”

​লুহান ধীরস্বরে বলল, “যা হওয়ার হয়ে গেছে। বারবার আমাকে দোষারোপ করা বন্ধ করো।”

​রুমা থামল না। অবশ্য এই প্রসঙ্গ এলে সে থামেনি কখনো। “আপনি আমাকে চুজ করার আগে কেউ করেনি। কেউ ফিরেও তাকায়নি আমার দিকে। আপনি তবে কেন চুজ করলেন? সেখানে অনেক অনেক সুন্দর মেয়েরা ছিল। তাদেরকে আপনার চোখে কেন পড়েনি?”

​লুহান দাঁত কিড়মিড়িয়ে সিগারেট নিচে ছুড়ে পা দিয়ে পিষে ফেলল। গাড়ির গায়ে ঘুষি মেরে দিয়ে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি খুশি হবে। আর সেটা আমারও ফার্স্ট টাইম ছিল। আমি চেয়েছিলাম… ভার্জিন মেয়ের সঙ্গে নাইট স্পেন্ড করতে। যখন শুনলাম কেউ তোমাকে কখনো পছন্দ করেনি, তখন আমার খারাপ লেগেছিল। আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি টাকা দিয়ে সিলেক্ট করেছিলাম। তুমি তখন কিছু বলোনি। আর এখন যখন আমি ক্ষমা চাইছি, তুমি ইগো দেখাচ্ছো? তাও আবার আমাকে? তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কে। ক্ষমা চেয়েছি বলে যা ইচ্ছা তাই বলে দেওয়ার ভুল করবে না। যথেষ্ট সহ্য করেছি তোমার বিরক্তিকর আচরণগুলো। আমাকে নিজের আসল রূপ দেখাতে বাধ্য কোরো না।”

​নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে রুমা। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল, “আমাকে ওনারা ড্রাগস দিয়েছিল। তাই সেদিন কিছু বলার মতো অবস্থাতে ছিলাম না। আর সবচেয়ে বেশি দামে সিলেক্ট করাটাই আমার জীবন বিষাদময় করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। যখনই কেউ শুনত আপনি দ্য গ্রেট লোবো আমাকে কয়েক গুণ বেশি টাকা দিয়ে পছন্দ করেছিলেন, তখনই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ত আমার ওপর। তারপর আমার সাথে কী কী হয়েছে জানেন আপনি? কোনো ধারণা আছে আপনার?”

​লুহান কিছু বলার জন্য পাশ ফিরে মুখ খুলতেই ফুলকে আবিষ্কার করে স্তব্ধ হয়ে গেল। ভাষা হারিয়ে ফেলে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ফুল কিছু না শোনার ভান করে গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসল। তৎক্ষণাৎ মুখ আড়াল করে চোখের পানি মুছে নিল রুমা।
লুহান ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর প্রশ্ন করল, “তুমি তো বলেছিলে ক্লাস করেই আসবে। তাহলে হঠাৎ চলে এলে কেন?”

​ফুল নিজেই নিজের চোখ বেঁধে রুমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। রুমা কাঁপা কাঁপা হাতে তার হাতদুটো বেঁধে দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। যেন তার অস্তিত্ব গাড়ি থেকে বিলীন হয়ে গেছে নিমিষেই। ফুল লুহানের প্রশ্নের জবাবে বলল, “মাঝেমধ্যে কিছু সত্যের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। পালিয়ে আসা ছাড়া উপায় থাকে না। আমিও তেমনই এক সত্যের মুখোমুখি হয়ে পালিয়ে এসেছি।”

​স্টিয়ারিংয়ে রাখা লুহানের হাত শক্ত হয়ে গেল মুহূর্তেই। “পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে গেছে নাকি?”
​ফুল নিরুত্তর রইল। লুহানের চরিত্র সম্পর্কে আভাস পেয়ে কিছু বলার মতো রুচি আপাতত তার নেই।


​ঠিক দুদিন পর উদ্যান সোলার এস্টেটে ফিরে আসে। এই দুদিন ফুল ভার্সিটিতে যায়নি। সে মনে মনে এক দৃঢ় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। আবেশকে যে করেই হোক এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে হবে।
​সন্ধ্যা নামার আগে ফুল পিওনি গাছগুলোতে পানি দিতে দিতে ভাবনা-চিন্তার ছক কষছিল, তখনই দমকা হাওয়ার মতো কারো আগমন ঘটল। আচানক কারো পদচারণায় ফুল গ্রীবা বাঁকিয়ে দরজা বরাবর দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দানব-মানব নজরে এল। উদ্যানের পা থামল না। ফুলের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে বলল, “পুরো তিন ঘণ্টা বায়ান্ন মিনিট আগে আমি বাড়িতে ফিরেছি। অথচ আমার ওয়াইফি চোখের দেখাও দেখতে গেল না। অন্তত তার দেখতে যাওয়া উচিত ছিল তার একমাত্র স্বামী জীবিত ফিরেছে নাকি লাশ হয়ে ফিরেছে।”

​ফুলের হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হয়ে এল। চোখমুখের আদল পরিবর্তন হয়ে গেল। জলদানি সোজা করতে ভুলে গেল বেমালুম। উদ্যান ফুলের বিস্ময়জোড়া চোখে দৃষ্টি স্থির রেখে জলদানি সোজা করল। উদ্যানের হাত ফুলের হাতের সংস্পর্শে আসতেই ফুলের ভ্রম কাটল। চোখ নামিয়ে দেখল টবে পানি ভরে গিয়ে টাইলসে উপচে পড়েছে।
​“পিওনিগুলোকে আগামী কয়েকদিনের পানি একসঙ্গে খাইয়ে খুব ভালো করেছো।”

​ফুল জলদানি রেখে অন্যদিকে চলে গেল। ঘেমে আসা মুখশ্রী এলোমেলো হাতে মুছে নিয়ে বলল, “আপনি যখন বাড়িতে ঢুকেছেন আমি তখন ডাইনিং হলে ছিলাম। আপনাকে নিজের পায়ে হেঁটে আসতে দেখেছি আমি। তাই আর ঘটা করে দেখতে যাইনি।”

​উদ্যান ফুলকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার কী প্রয়োজন ছিল পেটাল? আমি পুরোটাই তোমার। তুমি যেকোনো অ্যাঙ্গেল থেকে আমাকে দেখতে পারো।”

​ফুলের মনে হলো উদ্যান মাত্রই তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দিয়েছে। এত গরম লাগছে যেন কান দিয়ে আগুন বের হচ্ছে। সে হাঁপিয়ে উঠে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সরাসরি বলল, “আমি খানজাদা নিবাসে যেতে চাই। কখন নিয়ে যাবেন বলুন।”

​ফুলের এই কথা যেন উদ্যানের শ্রবণেন্দ্রিয়ে নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত বলে গণ্য হলো। সে ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “কী বললে তুমি? ওই বাড়িতে কেন যেতে চাইছো?”

​ফুল অনড় গলায় বলল, “আপনি নিয়ে যাবেন কিনা বলুন। আমি পাল্টা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেব না।”

​উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে তার কপালের আর ঘাড়ের শিরা ফুলে উঠল। উদ্যান দাঁত খিঁচিয়ে মাথাচাড়া দেওয়া রাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এল। কণ্ঠে অচেনা নমনীয়তা ফুটিয়ে বলল, “আমরা আর কিছুক্ষণ পর ট্যুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ব পেটাল। উল্টোপাল্টা চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে চটজলদি ব্যাগপ্যাক করে নাও।” ​উদ্যানের কণ্ঠ ঠিক নরম শোনায়নি, উল্টো কেমন যেন গম্ভীর শোনাল। এই কথার প্রেক্ষিতে ফুল আর বিক্ষুব্ধ গলায় কিছু বলতে পারল না।
বহু চেষ্টা করে খানিক তেজ মিশিয়ে বলল, “আমি এমনি এমনি কোথাও যাব না আপনার সাথে। আগে আমাকে খানজাদা নিবাসে নিয়ে যাবেন, তারপর ভেবে দেখব।”

​উদ্যানের মনে হলো রাগ ধামাচাপা দিতে গিয়ে তার ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। সে এক হাতে নিজের ঘাড় চেপে ধরে বলল, “তুমি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছো পেটাল।”

​ফুলের শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। তবুও ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। উদ্যান শেষমেশ বলতে বাধ্য হলো, “তোমাকে আমি পড়াশোনা করার সুযোগ দিয়েছি। তাই তোমার উচিত আমাকে নিরাশ না করা।”

​ফুল মনে মনে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও সাহস জুগিয়ে বলল, “আপনি আমাকে নিরাশ করছেন। মুখে ভালোবাসি ভালোবাসি বলে বেড়ালেও এখন পর্যন্ত আপনার আচরণ কিংবা কাজকর্মে ভালোবাসার কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়নি।”

একমুহূর্তের জন্য উদ্যান পুরোপুরি অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ল। ফুলের শেষ কথাটা যেন তার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে আঘাত হানছে। সে অতর্কিত টানে ফুলকে দেয়ালের সাথে আবদ্ধ করে ফেলল।
রমণীর দু-হাত মাথার ওপর নিয়ে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল, “তুমি আমার অনুভূতিতে আঘাত করছো পেটাল। আমি প্রতি পদে পদে তোমাকে ভালোবাসা অনুভব করাতে চাইছি। আর তুমি বলছো আমার আচরণে ভালোবাসা প্রকাশ পাচ্ছে না? ভালোবাসার লক্ষণ যদি তোমাকে আবেশের কাছে রেখে আসার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তবে আমি সেভাবে ভালোবাসা প্রকাশে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই।”

​ফুলের বুকের মধ্যে থাকা হৃৎযন্ত্র অচেনা তালে দপদপ করতে লাগল। যেন সেই হৃৎস্পন্দনের শব্দ সে নিজের কানেও শুনতে পাচ্ছে। উদ্যানের আচরণে ভালোবাসার লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও ফুলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁট আর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। উদ্যান তার প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওয়েট, তুমি এমন করছো কেন?”

​অক্সিজেন সংকটে ফুলের ঠোঁট আপনা-আপনি আলাদা হয়ে গেল। উদ্যানের হাতের বাঁধন আলগা হতেই ফুল হাত ছাড়িয়ে উদ্যানকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল। উদ্যান তার অস্থিরতা টের পেল ঠিকই, কিন্তু তার পেছনের কারণ উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হলো। তবুও নিজ মর্জিতে সে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। ফুল ছাড়া পেয়ে অনেক দূরে ছিটকে পড়ল। উদ্যান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে বলল, “ট্যুর থেকে ফিরে এসে তোমাকে তোমার সো-কল্ড মায়ের সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাব। এখন এত হাইপার হয়ো না। নিজেকে সামলে নিয়ে রেডি হয়ে নাও। আমাদের বেরোতে হবে।”

​ফুল মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। উদ্যানের সাথে তর্কে জড়ানোর শখ মিটে গেছে তার। তাকে অনবরত কাঁপতে দেখে উদ্যান আগ বাড়িয়ে বলল, “ডাক্তার ডাকব?”

​ফুল উল্টো ঘুরে ওয়াশরুমে গিয়ে ধাম করে দরজা লাগিয়ে দিল। ফুলের ধারণা একমাত্র ওয়াশরুমে গিয়েই সে উদ্যানের হাত থেকে রক্ষা পাবে। কারণ কারো ওয়াশরুমে অন্তত উদ্যান পারমিশন ছাড়া ঢুকে পড়বে না। উদ্যান কিয়ৎক্ষণ বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড়িয়ে বলল, “ও আচ্ছা, বাথরুম পেয়েছিল বলেই এমন অদ্ভুত আচরণ করলে?”
​উদ্যান অযথা দাঁড়িয়ে না থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল।

চলবে,,,

(আজ সবাই একটু বেশি রেসপন্স করবেন। পরবর্তী পর্ব গুলো জলদি দেওয়ার চেষ্টা করবো।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply